‘বৃটিশ শাসনের অবসানে ভারতে’ কি হয়েছিল তা অজানা নয়। গান্ধীর ভবিষ্যদবাণী সত্য হয়নি। উচ্চ তিনবর্ণ এখনো রয়েছে। এবং সত্যি কথা বলতে কি এমন সোনার পাথর বাটি সম্ভবও নয়। তিনি নিজে সারাজীবন ধরে নিজেকে, উচ্চবর্ণের না হোক, হিন্দু বলে মনে করবেন এবং হিন্দুধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলি পড়ানোর সুপারিশ করবেন (-রামায়ণ, মহাভারত বা ভাগবতের মত যেসব গ্ৰন্থ বৰ্ণাশ্রমের ব্যাপক প্রচারে ভরা,)—আর শেষ সময়ে আশা করবেন বৰ্ণভেদ লুপ্ত হবে, এটি যে হওয়ার নয় তা সহজবুদ্ধিতেও বোঝা যায় এবং এইভাবেই সম্ভব হয় নি হিন্দুমুসলমান বিভাজনকে আটকাতে, এদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের উত্থানকে রুখতে। এই উত্থানের পেছনে গান্ধী তথা কংগ্রেসের ভূমিকা,-’তাদের সাম্প্রদায়িক না বলা গেলেও এবং তারা ধর্মনিরপেক্ষ ভারত গড়ার কথা বল্লেও, ছিল।
তাই দেখি তাঁর উত্তরসূরী শ্ৰীমতী ইন্দিরা গান্ধী হিন্দু মৌলবাদীদের উৎসাহিত করছেন। (‘বিশেষত ১৯৮০ সালের পর থেকে শ্ৰীমতী ইন্দিরা গান্ধী হিন্দু ভোটের উপর নির্ভর করতে শুরু করলেন, কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সংখ্যালঘু ভোটের উপর তিনি আর ভরসা করতে পারবেন না। ১৯৮১ সালে মীনাক্ষীপুরমে কয়েকটি হরিজন পরিবার ধর্মান্তরিত হয়। এই ঘটনার পর তিনি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ গঠন ও তার প্রসারকে প্রচ্ছন্নভাবে উৎসাহ দিতে লাগলেন। হিন্দুদের ভিতর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রভাব বাড়তে লাগল, বাড়তে লাগল তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা। এই ব্যাপারটিও শ্ৰীমতি গান্ধীকে আরো বেশি ঠেলে দিল হিন্দু ভোট জয়ের লক্ষ্যে এগনোর পথে।’-আসগর আলি ইঞ্জিনীয়ার-এর প্রবন্ধ ‘বন্ধ হোক এই পাগলামি’) এমনকি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পৃষ্ঠপোষক (যান্ত্রিক!) হিসেবে প্রচারিত রাজীব গান্ধীও অপরিণামদর্শীর মত, নিতান্তই সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে মুসলিমও হিন্দুমৌলবাদীদের উৎসাহিত করেছেন ও তোষণ করেছেন। শাহবানু মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় মুসলমান মৌলবাদীদের ক্ষুব্ধ করলে তাদের আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে সেই রায়কে নাকচ করিয়ে ১৯৮৬-এর মে মাসে মধ্যযুগীয় মুসলিম মহিলা বিল সংসদে পাশ করানো হল। সংসদে বিলটি ২৫শে ফেব্রুয়ারী পেশ করার আগে হিন্দুমৌলবাদীদের খুশি করতে ফৈজাবাদ জেলা আদালতের মাধ্যমে বাবরি মসজিদের দরজা হিন্দুদের জন্য খুলে দেওয়া হল। তার আগের ও পরের ইতিহাস অনেকের জানা, এখানে বিস্তারিত জানানোরও প্রয়োজন নেই। কিন্তু অমৌলবাদীর মুখোশ পরা ব্যক্তিদের হাতেও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ও মৌলবাদের তোষণ কেমন জঘন্যভাবে হতে পারে—এসব তারই ইতিবৃত্ত। এগুলিকে ‘পাগলামি’ বলা অনেকটা ক্ষমা করে দেওয়ার সামিল। মৌলবাদকে সস্তুষ্ট ও উৎসাহিত করতে এ ধরনের কাজ ও কথাবার্তা মৌলবাদী ক্রিয়াকাণ্ডেরই একটি দিক। ঈশ্বরও ধর্ম-বিশ্বাসের দ্বারা নিষিক্ত হয়ে গান্ধীবাদী কংগ্রেসী রাজনীতির মধ্যে হিন্দু মৌলবাদ একদা এভাবেই পরিপুষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে একসময় বামপন্থীদের মত জয়প্রকাশ নারায়ণও হিন্দু মৌলবাদীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭৩-৭৪ সালে তাঁর নেতৃত্বে ইন্দিরা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ও ভারতীয় জনসঙ্ঘ তার সহযোগী হয়ে যায়। ১৯৭৪-এর ডিসেম্বরে আর এস এস-এর সরীসংঘচালক বালাসাহেব দেওরস। জয়প্ৰকাশকে ‘সন্ত’ বলে অভিনন্দিত করেছেন। আর ১৯৭৫-এর মার্চে জয়প্রকাশও প্রকাশ্যে ফ্যাসিস্ট রাজনীতির অভিযোগ থেকে জনসঙ্ঘকে মুক্তি দেন।(১) ১৯৭৫-এর ২৫শে জুন (জরুরী অবস্থা ঘোষণার ঠিক আগে) লোক সংঘর্ষ সমিতি গড়া হলে প্রাক্তন আর এস এস প্রচারক ও শীর্ষস্থানীয় বিজেপি নেতা নানাজি দেশমুখকে তার সম্পাদক করে দেওয়া হয়। ঐ সময় ধর্মীয় মৌলবাদীদের সঙ্গে এ ধরনের আঁতাত কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল তার বিচার করার সুযোগ ও সামৰ্থ্য এখানে নেই। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, দেশের মানুষের কাছে তাদের ক্রমশ গ্রহণযোগ্য করে তোলার এবং তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এধরনের পদক্ষেপের কিছু ভূমিকা আছেই। স্বৈরতন্ত্র, দক্ষিণপন্থা ইত্যাদির চেয়ে ধর্মীয় মৌলবাদীরা যে তবু গ্রহণযোগ্য—এই ধরনের একটি সর্বনাশা ধারণাও তা তৈরী করতে পেরেছে। এখন তার ফল ফলতে শুরু করেছে।
আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশে আরো সুস্পষ্টভাবে ইসলামী মৌলবাদীরা তথাকথিত অ-মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তিদের দ্বারা উৎসাহিত ও পরিপুষ্ট হয়েছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-এর ভূমিকা সর্বজনবিদিত। পাকিস্থানী শাসন মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের জন্ম সারা পৃথিবীর শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের মধ্যে যেমন, তেমনি ভারতে, বিশেষত ভারতীয় বাঙালীদের মধ্যে একটি আবেগ ও আশার সঞ্চার করেছিল। এও হয়তো আশা করা গেছিল যে, সাম্প্রদায়িক মুসলীম লীগ-এর উত্তরাধিকারী মৌলবাদী জামাতে ইসলামীর কারাল গ্রাস থেকে বাংলাদেশের জনগণ মুক্ত হতে পারবেন। কিন্তু এ ছিল আকাশকুসুম কল্পনা।
আওয়ামী লীগ আসলে ছিল মুসলিম লীগ থেকে ভেঙ্গে আসা একটি অংশের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। প্রথমে এর নাম ছিল ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ, পরে নাম পাল্টে হয় ‘আওয়ামী লীগ’। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এভাবে নাম পাল্টালেও নেতৃত্বের অধিকাংশই তাঁদের সাম্প্রদায়িক ইসলামী চরিত্র এবং নিজেদের গোঁড়া মুসলিম পরিচয়কে অক্ষুন্ন রাখেন। এই অবস্থায় স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিলেও অবশেষে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের দোসরে পরিণত হওয়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তার ভালভাবেই ছিল।
