‘হিন্দুধর্মের দুইটি দিক আছে, একদিকে ঐতিহাসিক হিন্দুধর্ম—তাহার অস্পৃশ্যতা, কুসংস্কার, প্রস্তুরাদির পূজা ও পশুবলি প্রভৃতি; আর অপরদিকে গীতা, উপনিষদ এবং পতঞ্জলি যোগসূত্রের হিন্দুধর্ম-সেখানে অহিংসার চরম স্মৃর্তি, সর্বভূতের ঐক্য এবং সর্বব্যাপী, নিরাকার, অবিনশ্বর, অদ্বিতীয় ভগবানের পূজা। আমার কাছে অহিংসাই হইল হিন্দুধর্মের সর্বোত্তম মহিমা।’ (ঐ) আবার এই উদারনৈতিকতা ও সর্বধর্মের মানুষের (সর্বভূতের) ঐক্যের মানসিকতার মত নানা দিকের কারণে তাঁকে মৌলবাদী কখনই বলা চলে না, যদিও আবার তাদেরই মত তিনিও ছিলেন। কম্যুনিজম বিরোধী এবং কম্যুনিস্টদের সাহায্য করার জন্য ভগবানের কাছে আবেদনও জানিয়েছেন—
“পুজিপতিদের বিরুদ্ধে আমার কোন অনিষ্ট করার মনোভাব নেই। তাঁদের কোন ক্ষতি করার কথা ভাবতে পারি না। …ভগবান আপনাদের (কম্যুনিষ্টদের) বুদ্ধি ও যোগ্যতা দিয়েছেন। সেগুলিকে উপযুক্ত কাজে আপনার প্রয়োগ করুন। আপনাদের কাছে আমার নিবেদন এই যে, আপনারা আপনাদের বুদ্ধির দ্বার রুদ্ধ করবেন না। ভগবান আপনাদের সাহায্য করুন।’ (ইয়ং ইন্ডিয়া; ২৬শে মার্চ, ১৯৩১)
হিটলার থেকে হিন্দু-মুসলিম মৌলবাদীরা নারীদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে হুবহু প্রায়ই একই দৃষ্টিভঙ্গী ছিল গান্ধীরও —
‘জীবিকা অর্জনের জন্য নারী চাকরি বা ব্যবসা করুক—এ নীতিতে আমার বিশ্বাস নেই। …মেয়েদের বিদ্যালয়েও ইংরাজী শিক্ষা প্রবর্তন করার একমাত্র অর্থ হচ্ছে আমাদের অসহায় অবস্থার মেয়াদ বৃদ্ধি করা।’ (বোম্বাই ভগ্নী সমাজের সভাপতির অভিভাষণ; ১৯১৮)
‘…গৃহস্থলীর ব্যাপারে ও শিশুপালন এবং তাদের শিক্ষা সম্বন্ধে নারীর অধিকতর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।’ (ঐ) এবং মাধ্যমিক শিক্ষার সময় মেয়েদের ‘ইংরেজি শেখানোর অর্থ তাদের মেরে ফেলা।’ ‘আমার মতে মেয়েদের সংস্কৃত শেখানো উচিত।’ ‘হিন্দুধর্মের মূলনীতি এত প্রচ্ছন্ন যে কিভাবে এ ধর্ম শেখানো যেতে পারে হঠাৎ তা বলা যায় না। তবে মোটামুটি এই কথা বলা যায় যে, গীতা রামায়ণ মহাভারত ও ভাগবতকে হিন্দুরা সবাই শ্রদ্ধা-দৃষ্টিতে দেখেন এবং এই সব ধর্মগ্রন্থের আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সমৃদ্ধ ভাণ্ডারের হয় তাহলে যথেষ্ট কাজ হবে মনে হয়।’ (আত্ম্যোদ্ধার)
(তুলনীয়–হিন্দুমৌলবাদীদের অনুমোদিত ও ক্ষমতাশীল থাকার সময় উত্তর প্রদেশে কিছুদিন আগেও সরকারীভাবে উৎসাহিত পাঠ্যপুস্তকের কিছু অংশ–’নারীমুক্তি শুরু হয়েছে। এই কিছুদিন আগেও মেয়েরা চার দেওয়ালের মধ্যে থাকত ও সংসারকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখত। এখন তারা কাজে বেরুচ্ছে-পেছনে ফেলে যাচ্ছে তার সংসারকে। নারী-স্বাধীনতা পরিবারে এক ধরনের চাপ-এর সৃষ্টি করে এবং অনেক পরিবার এই স্বাধীনচেতা, মুক্ত মনোভাবের জন্য ভেঙ্গে যায়।.’
‘যে সব আইন নারীদের অধিকার দিয়েছে সেগুলিও পারিবারিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন, ১৯৫৬; হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কিত আইন, ১৯৩৭; বিশেষ বিবাহ আইন, ১৯৫৪; হিন্দু বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৫৫-এ সবগুলিই মেয়েদের অবস্থানকে উন্নত করেছে। মেয়েরা তাদের বাবা-মোর সম্পত্তির উত্তরাধিকারীও হচ্ছে। মেয়েদের অনুকূলে সরকারের শুরু গ্রগতিশীল আইনগুলির সমধিক ফল হচ্ছে পরিবারে উত্তল ও বিবাদের সৃষ্টি।’
নাৎসীদের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলসের এ ব্যাপারে মত ছিল, ‘মেয়েদের দায়িত্ব হচ্ছে নিজেরা সুন্দরী থাকা ও সন্তান ভূমিষ্ট করা…’
হিটলার-এর বক্তব্য ছিল, ‘মেয়েদেরও তাদের নিজস্ব যুদ্ধক্ষেত্ৰ আছে। দেশের জন্য প্রত্যেকটি শিশুর জন্ম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, দেশের স্বার্থে সে তার নিজস্ব লড়াই চালিয়ে যায়।’–ফ্রন্টলাইন, ৯.৪.৯৩ থেকে সংগৃহীত)
কিন্তু হিটলার বা হিন্দুমৌলবাদীর হুবহু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গান্ধীর মধ্যে নেই। তাই দেখি তিনি এও বলেন যে,–
‘পুরুষদের মত নারীদের ভিতর নিরক্ষরতার কারণ আলস্য ও জাড্য নয়। যে হীন অবস্থার বোঝা নারীকে স্মরণাতীত কাল থেকে অন্যায়ভাবে নিচিপষ্ট করে মারছে, নারীর বর্তমান অবস্থার প্রত্যক্ষ কারণ তাই। পুরুষ নারীকে তার কর্মসহচরী ও অর্ধাঙ্গীর মর্যাদা দেওয়ার পরিবর্তে তাকে গৃহস্থলীর নীরস কৃত্য সম্পাদনাযন্ত্র ও সম্ভোগপত্রে পরিণত করেছে। ফলে সমাজ প্রায় পঙ্গু হয়ে পড়েছে। নারীকে অতি সঙ্গত কারণেই জাতির মাতা আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতি আমরা যে মহা অবিচার করেছি, তাঁদের ও আমাদের উভয়ের খাতিরে তার নিরাকরণ করতে হবে।’ (হরিজন; ১৮.২৯৩৯)
এবং এও তাঁর বলিষ্ঠ উচ্চারণ যে, ‘আমি যে বিশেষ কোন বর্ণের অন্তর্গত একথা তো আমি বহুদিনই ভুলিয়া গিয়াছি। কাজেই আমি নিজেকে ভাঙ্গী বলিয়া অভিহিত করিতে এবং সেইমত কাজ করিতে আনন্দ পাই। সমাজকে তো উচ্চনীচ স্তরে ভাগ করা চলে না। তাহা ছাড়া বৰ্ণহিন্দু সমাজ যদি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের লইয়াই হয় তাহা হইলে তাহারা তো শোচনীয়ভাবে সংখ্যালঘু। বৃটিশ শাসনের অবসানে ভারতে যখন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হইবে তখন উচ্চবর্ণ হিসাবে এই তিনশ্রেণীর বিলোপ সাধন ঘটিবে। সকল অসামাই তখন অতীতের কাহিনী বলিয়া গণ্য হইবে এবং তখনই তথাকথিত দলিত শ্রেণী তাহাদের স্বকীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হইবে।’ (নোয়াখালি ডাইরি, ১৯৪৭)।
