পারিবারিক শাসন ও সামরিক শাসনকে উচ্ছেদ করার কর্মসূচীকে খারাপ কিছু ভাবার কারণ নেই। কিন্তু তার জন্য সুস্থতর কোন উপায় না গ্ৰহণ করে ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাত শক্ত করা ও তাদের উত্থানে সাহায্য করার ভয়াবহ ঢেঁকীশালের মধ্যে শুধু অবক্ষয়, চরিত্রহীনতা, দেউলিয়াপনা ও সৃজনশীলতার অভাব নয়, মৌলবাদের প্রতি তাদের প্রচ্ছন্ন সহানুভূতির ব্যাপারেও সন্দেহ জাগে। আর বাংলাদেশের কম্যুনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সহ অনেক নেতারাই তো নিজেদের নির্বাচনী ইস্তাহারে (১৯৯১) আল্লা হো আকবর’ যুক্ত করেছিলেন; এও জানা আছে যে পার্টির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ ফরহাদ-এর মত কম্যুনিষ্ট নেতার মৃত্যুতে পার্টি অফিসে মিলাদ-এর মত ধর্মীয় অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছিল। এদেশের একম্যুনিষ্টরাও জনসংযোগের নাম করে পাড়ার দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে যমপূজার মত নানা ধৰ্মীয় অনুষ্ঠানে মদত দেন, ভোটের স্বার্থে জাত পাতের রাজনীতি করতে পিছপা হন না, সংরক্ষণের নাম করে জাত-পাতের বিভাজনকে শক্তিশালী করেন। আর ‘কম্যুনিষ্ট’ সদস্যরাও পূজা-শ্ৰাদ্ধ-বৈদিক মন্ত্র পড়ে বিয়ে করা জাতীয় নানা ধরনের ধর্মীয় অনাচার করেন হাজারো গালভরা যুক্তি দেখিয়ে। এদেশের একদা কত কম্যুনিষ্ট কর্মর মার্কসবাদের প্রতি নিষ্ঠ, ত্যাগ, সংগ্রাম ও রক্তক্ষরণের স্মৃতিকে পায়ে মাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অধুনা এই সব মার্কসীয় দর্শনে অশিক্ষিত ও এই ধরনের ক্ষমতালোভী, স্বার্থপর কমীবৃন্দ ও নেতৃবৃন্দের বেশিরভাগই। তাঁদের চরিত্র বদলের সঙ্গেই যুক্ত ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানে সাহায্য করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা। এঁরা ধর্মীয় মৌলবাদের প্রচ্ছন্ন সুহৃদ, রাজনৈতিক মৌলবাদী। আপাত ধৰ্মবিরোধী ব্যক্তিদের মধ্যেও নিজের বন্ধু খুঁজে নেওয়ার ও এইভাবে নিজেকে সঙ্গোপনে লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা ধর্মীয় মৌলবাদের একটি বৈশিষ্ট্য। আর এই বৈশিষ্ট্য যার আছে সে যে অন্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে তার আরো বেশি সংখ্যায় কাছের লোক পাবে তাতে তো কোন সন্দেহ নেই। জন্মসূত্রে হিন্দু কিন্তু কোনভাবে কম্যুনিষ্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত, এমন মানুষদের মধ্যেও বেশ কিছু জন আছে যারা হিন্দু মৌলবাদী সংগঠনগুলির মতই মনে মনে, মনে করে যে, মুসলিমদের একটু কড়কে দেওয়া দরকার, বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে বেশ আচ্ছা শিক্ষাই দেওয়া গেছে ইত্যাদি। আর কংগ্রেসের মত অন্যান্য দলগুলিতে তো কথাই নেই। ভোটের সময় বিজেপি যাদের ভোট পায় তাদের একটা অংশই একসময় কংগ্রেসকে ভোট দিত বা কংগ্রেসের সমর্থক ছিল। তাই ত্রিপাক্ষিক ভোটযুদ্ধে কংগ্রেস-বিজেপি বাদে তৃতীয়পক্ষের লাভ হয়ে যায় বেশি।
ব্যাপারটি খুব একটা অস্বাভাবিক নয়, যখন এটি অজানা নয় যে কংগ্রেসের তথাকথিত স্বাধীনতা আন্দোলন, মুখে যাই হোক না কেন, কার্যত দাঁড়িয়েছিল হিন্দুদের (বর্ণহিন্দুদের!!) স্বাৰ্থবাহী আন্দোলন। স্বদেশী যখন জন্মসূত্রে হিন্দু তখন তার কাছে এই হিন্দুত্বই বড় এবং মুসলমানকে, এমনকি সহযোদ্ধা মুসলিমকেও, অস্পৃশ্য বলে। ঘূণা করেছে। এরই একটি বাস্তব চিত্র বর্ণনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ-’হিন্দু মুসলমানের পার্থক্যটাকে আমাদের সমাজে আমরা এতই কুশ্রীভাবে বেআব্রু করিয়া রাখিয়াছি যে, কিছুকাল পূর্বে স্বদেশী অভিযানের দিনে একজন স্বদেশী প্রচারক এক গ্লাস জল খাইবেন বলিয়া তাহার মুসলমান সহযোগীকে দাওয়া হইতে নামিয়া যাইতে বলিতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করেন নাই।’ (লোকহিত)
স্পষ্টতঃ এইসব কর্মীদের অন্য যা শেখানো হোক না কেন, ধর্মমোহমুক্ত হবার শিক্ষাটিকে অন্যতম প্রাথমিক প্রয়োজন হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলত যা হওয়ার হয়েছে, —তথাকথিত স্বাধীনতার আগেও যেমন, পরেও তেমনি, ধর্ম সুযোগ পেলেই মৌলবাদে পরিণত হওয়ার নিজস্ব প্রবণতা নিয়ে ভারতের এই বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটির মধ্যে নিজেকে পরিপুষ্ট করেছে।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষে কর্মীদের ধর্মমোহমুক্ত করা সম্ভবও ছিল না,–বড়জোর কিছু ধর্মীয় সংস্কারের কথা বলা ছাড়া। এর জন্য বেশি গবেষণা করার প্রয়োজন নেই। জাতির জনক হিসেবে প্রচারিত যে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে ছাড়া এই কংগ্রেসকে ভাবা যায় না, তিনি তার অন্যান্য ইতিবাচক ও ঐতিহাসিক বহু দিক সত্ত্বেও প্রথমেই ছিলেন ঈশ্বরভক্তি ধর্মপ্ৰাণ ব্যক্তি এবং হিন্দু। ভারতের স্বাধীনতা বা ‘স্বরাজ’ আনার ব্যাপারে তার মূল বক্তব্যই ছিল, ‘সংগ্রামের মাধ্যমে নয়, ভগবানের আশীৰ্বাদরূপেই এই স্বরাজ স্বৰ্গ থেকে ভারতের উপর নেমে আসবে।’(ইন্ডিয়ান হোমরুল, ১৯২১) এমনকি নোয়াখালির দাঙ্গাবিধ্বস্ত পরিবেশে দাঁড়িয়েও তিনি হিন্দুদের ঈশ্বরবিশ্বাস ও রামনামে আস্থা রাখতে উপদেশ দিয়েছেন।–
‘ঈশ্বরে যদি আপনাদের অকপট বিশ্বাস থাকে তাহা হইলে আপনাদের স্ত্রীকন্যার উপর, কেহই অমর্যাদাজনক আচরণ করিতে সাহসী হইবে না। আপনারা আপনাদের মুসলমান ভীতি ত্যাগ করুন; রামনামে যদি আপনাদের আস্থা থাকে তাহা হইলে আপনারা কখনোই পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করিয়া যাইবেন না।’ (নোয়াখালি ডাইরি) এই ‘রাম’ হিন্দুমৌলবাদীদেরও আদর্শ চরিত্র।
কুসংস্কারমুক্ত হয়ে, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর কথা বল্লেও যেন আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টদের মত, হিন্দুধর্মের আদি গ্রন্থগুলির প্রতি ছিল ভগবদভক্ত গান্ধীর গভীর শ্রদ্ধা।–
