এ ব্যাপারে অবশ্যই কোন সন্দেহ নেই যে, যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন বা বিশেষ কোন রাজনৈতিক মতবাদ অনুযায়ী কাজ করেন, তাদের একটি অংশ যে অন্তত একটি স্তর অব্দি উদার ও মানবিক তাতে কোন সন্দেহ নেই। পরমত সহিষ্ণুতা, সমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথ কাজকর্ম করা, মত ও পথের পার্থক্য থাকলেও সুস্থ বিতর্কের মধ্য দিয়ে সামাজিক উন্নয়নের জন্য চেষ্টা চালানো ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলা-এগুলি বিরল কোন ঘটনা নয়।
ধর্মের প্রসঙ্গে ধর্মনিষ্ঠ বা ধামিক ব্যক্তির সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদীদেরও এইভাবে একটি বড় তফাৎ রয়েছে। ধর্মনিষ্ঠ বা ধামিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে, নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসকে, সেটি ঠিক ভুল যাই হোক না কেন, সৎভাবে অনুসরণ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তা করেন। তার মধ্যে প্রশ্নহীন দ্বিধাহীন আনুগত্য ও বিশ্বাসের ব্যাপারগুলিও থাকে, কিন্তু মৌলবাদের অন্যান্য যে কয়েকটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছিল সেগুলি অনুপস্থিত। তাঁর মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা, উদারতা ইত্যাদি অপ্রত্যাশিত নয়। অন্য ধর্মের বা গোষ্ঠীর মানুষের প্রতি ঘূণা বর্ষণ করা ও বিষোদগার করার ব্যাপারটি তাঁর মনেও আসে না। সবচেয়ে বড় কথা তার মধ্যে সংকীর্ণভাবে শুধু নিজ ধর্মের মানুষের নয়, সবার মঙ্গলের সামগ্রিক ইচ্ছাটাই বড় হয়ে দেখা দেয়। গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর, যিশু খৃস্ট থেকে গুরু নানক, শ্ৰীচৈতন্য, রামকৃষ্ণ-ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক ধর্মনিষ্ঠ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। এদের মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক বলার মত অবস্থা নেই, যদিও ধর্ম তাঁদের জীবন ও কাজের সবচেয়ে বড় জায়গা জুড়ে থাকে।
একইভাবে রাজনৈতিক মৌলবাদীদের সঙ্গে সৎ রাজনৈতিক কামীদের পার্থক্য রয়েছে। একদা একনিষ্ঠ গান্ধীবাদী বা কম্যুনিষ্ট কর্মীদের কথা আমরা জানি। মানুষ ধ ও তার সমাজকে ভালবেসে, নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শকে সামনে রেখে, তার ত্রুটি বা সীমাবদ্ধত হয়তো থাকলেও, নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের কথা মাথায় না। রেখে তারা কাজ করে গেছেন। এই ব্যক্তিগত স্বার্থবোধ ছিল না বলেই, তাদের মধ্যে উদারতা ও মুক্তমনের পরিচয় পাওয়া যেত। প্রয়োজনে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথ কাজ করা, তাদেরও বন্ধু ও সহযোদ্ধা হিসেবে গ্রহণ করার মহত্ত্ব বিরল কোন ঘটনা ছিল না। ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমী মানেই সে শত্রুস্থানীয়, তাকে প্রয়োজনে হত্যাও করা দরকার এবং কোনভাবেই তাকে ভালবাসা যায় না–এমন সংকীর্ণ মৌলবাদী মানসিকতা ছিল অনুপস্থিত। ধাৰ্মিক বা ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির মত এমন রাজনৈতিক কামী এখনো নিশ্চয়ই আছেন, কিন্তু পুরষ্কার রাজনৈতিক গোষ্ঠীতন্ত্র, তীব্র মেরুকরণ ও অনুদার মৌলবাদী মানসিকতার এর অর্থ এ অবশ্যই নয় যে, মৌলবাদী বলে প্রমাণিত কোন গোষ্ঠীর সঙ্গেও ঐক্য স্থাপন করা অমৌলবাদী মানসিকতার লক্ষণ। বরং উল্টোটাই। মৌলবাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলে নিজেকেও কিছুটা মৌলবাদী হতে হয়। না হলে ঐভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মানসিকতটাই সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। এ ধরনের রাজনৈতিক গাঁটছড়ার সঙ্গে প্রকৃত পক্ষে আদর্শের চেয়ে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, সংকীর্ণ গোষ্ঠী স্বাৰ্থ ব্যক্তিগত নোংরামির ব্যাপারটিই বেশি।
তাই দেখা যায় রাজনৈতিক মৌলবাদীরা মার্কসবাদ বা গান্ধীবাদকে সামনে রেখেও মুসলিম লীগ বা বিজেপি-র মত সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকার গড়া থেকে পঞ্চায়েত বানানো পর্যন্ত নানা স্তরে ক্ষমতা লাভ করার চেষ্টা করে। ভারতের তথাকথিত মার্ক্সবাদীরা মুসলিম লীগের সঙ্গে কেরলে একদা সরকার গঠন করেছে। হিন্দু মৌলবাদীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েও কংগ্রেসকে সরিয়ে জাতীয় ফ্রন্টের বিশ্বনাথপ্রতাপ সিং-কে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে; তখন যুক্তি দেখিয়েছিল কংগ্রেসের পরিবারতন্ত্রকে উচ্ছেদ করা ছিল সব চেয়ে বড় কাজ। কিন্তু এসবে প্রকৃত লাভ হয়েছে হিন্দুমৌলবাদী রাজনৈতিক দলটির। লোকসভায় প্রতিনিধি সৎখ্যা তারা এক অঙ্কের থেকে তিন অঙ্কে নিয়ে যেতে পেরেছে। ধর্মীয় মৌলবাদীদের এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা নিয়েছিল তথাকথিত কম্যুনিষ্টরা।
বাংলাদেশেও কমিউনিষ্ট পার্টি অব বাংলাদেশ (সি পি বি) জামাতে ইসলামীর মত মুসলিম মৌলবাদীদের সঙ্গে আটের দশকের শেষদিকে ‘ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে লিপ্ত হয়েছিল। তখনো তারা কৌশল হিসেবে সামরিক শাসনকে উচ্ছেদ করাকে প্রধান কাজ হিসেবে মনে করেছে। তখন (১৯৮৭) বদরুদিন উমর মন্তব্য করেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বি এন পি, বাকশাল, সিপি বি এবং বামপন্থী নামধারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জামাতে ইসলামী এখন আওয়ামী লীগ ও সিপিবি মার্ক লোকেদের কাছেও রাজনৈতিক, মিত্র হিসাবে বেশ ভালভাবেই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। জামাতে ইসলামের পক্ষে এই কীর্তি অর্জন করা উপরে উল্লিখিত তথাকথিত গণতান্ত্রিক, বামপন্থী ও কমিউনিষ্ট নামধারী সংগঠনগুলির নিদারুণ অবক্ষয় ও চরিত্রহীনতার ফলেই যে অনেকাংশে সম্ভব হয়েছে একথা বলাই বাহুল্য।’ ভারতের ক্ষেত্রে জামাতে ইসলামীর পরিবর্তে ভারতীয় জনতাপাটিকে (ও তার ধর্মভাইদের) বসালে, ঐ একই মন্তব্য এদেশের ‘তথাকথিত গণতান্ত্রিক, বামপন্থী ও কমিউনিষ্ট নামধারী সংগঠনগুলির’ জন্য ব্যবহার না করার কোন কারণ নেই। শ্রদ্ধেয় বিমলকৃষ্ণ মতিলাল এই কারণেই মন্তব্য করেছেন, ‘উদারনৈতিক নেতারা যখন ক্ষমতার লোভে মিথ্যার ব্যবসা আরম্ভ করেন-মৌলবাদের অভ্যুত্থানকে তখন আর রোধ করা যায় না।’ (মৌলবাদ কি ও কেন?)
