‘সত্য’ (Truth) সম্পর্কে পূর্বোক্ত কিছু চরম সত্য (যাও হয়তো আপাত) ছাড়া, সাধারণভাবে কোন কিছুকে এইভাবে চিহ্নিত করা অবৈজ্ঞানিক। মরিস কনফোর্থ মন্তব্য করেছেন, ‘সাধারণভাবে, বিজ্ঞান চরম সত্যে আদৌ আগ্রহী নয়। প্রকৃতপক্ষে একবার যদি কোন সিদ্ধান্তকে চরম সত্য হিসেবে বলে দেওয়া হয়, তাহলে পরবর্তী অনুসন্ধানের সমস্ত দরজাই বন্ধ করে দেওয়া হয় : চরম সত্যই যদি জানা হয়ে যায়, তবে তো আরো গবেষনার কোন প্রয়োজনই থাকে না, চরম সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার বা জেনে নেওয়ার দাবী তাই প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞান-বিরোধী, কারণ এমন দাবী আমাদের আরো গবেষণা চালাতে, আমাদের জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে, সত্যের কম কাছাকাছি অবস্থা থেকে বেশি কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছতে, অন্য কথায় বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের বাধা দেয়’।
বিচ্ছিন্নভাবে মার্কসবাদকে ‘ইহা সত্য’ বলার মধ্যে ঐ চরম সত্য জেনে ফেলার দাবীই যেন বোঝায়। মার্কসবাদের সত্যতা ও চমৎকারিত্ব এইখানেই যে, কোন কিছুই যে ঐভাবে সত্য নয়, এটি উপলব্ধি করতে তা আমাদের শেখায় এবং এই কোন কিছুর মধ্যে সে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতেও দ্বিধা করে না। অ্যান্টি ডুরিং-এ এঙ্গেলস যেমন বলেছেন, ‘প্রকৃত পক্ষে ‘ভুল’ ও ‘ঠিক এই কথাগুলির মত গোঁড়া ও নীতিগত ভাবপ্রকাশকে বৈজ্ঞানিক কাজ নিয়ম করেই এড়িয়ে চলে, যদিও এই ধরনের কথার সঙ্গে কাজেকর্মে আমরা সর্বত্রই পরিচিত হই.এদের মাধ্যমে একটি সর্বোচ্চ চিন্তার সর্বোচ্চ ফলাফলকে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে; যে চেষ্টায় এক একটি উক্তির ব্যবসা করার শূন্যগর্ভ প্রবণতা থাকে।’ (‘Really scientific works therefore as a rule avoid such dogmatic and moral expressions as error and truth, while these expressions meet us everywhere in works…in which empty phrase mongering attempts to impose on us as the sovereign result of sovereign thought.’) সুবিধাজনক ভাবে এইভাবে এক একটি উক্তি বা ফ্রেজ (phase) তুলে নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে তার ‘প্রচার করার প্রবণতা না থাকলেই ভাল।
সত্য সম্পর্কে এ ধরনের বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গীর পাশাপাশি এটিও বারংবার মনে রাখা দরকার এবং আবারো বলা দরকার যে, মার্কসবাদের মত কোন তত্ত্বই হোক বা পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে জাতীয় কোন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণই হোক বা বিবর্তনবাদের মত কোন যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তই হোক, যেটি সাম্প্রতিক জ্ঞান ও তথ্যের পরিপূর্ণ প্রয়োগ ঘটিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সেগুলিকে তখনকার মত সত্য বলে গ্রহণ না করাটাও গোঁড়ামি, যা মৌলবাদী মানসিকতার সঙ্গে যুক্ত এবং যা মৌলবাদী ক্রিয়াকান্ডের জনক। সেগুলিকে ‘আরো সংশোধন করতে হবে, তাদের উন্নতি ঘটাতে হবে, নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন জ্ঞানের আলোয় তাদের নতুন করে ব্যাখ্যা করতে হবে। কিন্তু এই কারণেই সেগুলি অসত্য নয় : সেগুলি আংশিক ও তুলনামূলকভাবে সত্যের কাছাকাছি।’ (‘They require to be corrected, improved upon, restated in the light of new experience and new knowledge. But they are not for that reason untrue : they are partial, relative, approximate truth.’–Dialectical Materialism, Maurice Cornforth) ব্যাপারটি মার্কসবাদ সম্পর্কেও সত্যি। রাজনৈতিক অন্ধবিশ্বাস ও অসূয়া থেকে মুক্ত হয়ে ব্যাপারটি উপলব্ধি করলে, লেনিনের একটি বাক্যকে আক্ষরিক অর্থে ও বিচ্ছিন্নভাবে প্রচার করার প্রয়োজনীয়তা কমে আসে।
মার্কসীয় দর্শন প্রসঙ্গে একটু বেশি আলোচনা করা হলেও, প্রকৃতপক্ষে আরও একটু স্থূলভাবে তুলনা করলে, এই ধরনের সমস্ত দলীয় রাজনৈতিক মৌলবাদীদের মানসিকতা-আচার-আচরণের মধ্যে ধর্মীয় মৌলবাদের সাধারণ লক্ষণগুলিও দেখা যায়—(১) তারা ধর্ম-এর স্থানে নিজের দলীয় রাজনীতিকে বসায়, (২) ধর্মগ্রন্থের জায়গায় বসায় রাজনৈতিক দলিলপত্ৰকে, (৩) নিজের দলীয় রাজনীতিকে যা বিরোধিতা করে বা সমালোচনা করে, তাকে খোলামনে রাজনৈতিক বিতর্কে না। নিয়ে গিয়ে উগ্র ও হিংস্রভাবে বিরোধিতা করে, (৪) রাজনৈতিক উদারতা ও বিরোধী বা ভিন্ন রাজনৈতিক কর্মর প্রতি নৃত্যুনতম সন্ত্ৰমবোধ হারিয়ে ফেলে, (৫) দলীয় রাজনীতির প্রতি শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রিকতার নামে একসময় দল ও নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন বিশ্বাস ও দ্বিধাহীন আনুগত্য প্রকাশ করতে থাকে; দলে বা গোষ্ঠীতে যেই কেউ কিছু প্রশ্ন তোলে বা সমালোচনা করে তাকেই শত্রু বা শ্রেণীশত্ৰু, প্রতিক্রিয়াশীল, চক্রান্তকারী, পার্টিবিরোধী ইত্যাদি নানাভাবে চিহ্নিত করা হয়; অন্তত তার সঙ্গে সহজ সম্পর্ক আর থাকে না। মৌলবাদী সংগঠনের মত এই রাজনৈতিক নেতৃত্বও কর্মীদের কাছ থেকে চূড়ান্ত আনুগত্য প্রত্যাশা করে (৬) দলীয় রাজনীতির স্বার্থে হিংস্র আচরণ, খুন-জখম, দৈহিক-মানসিক-সামাজিক অত্যাচার চালানো ইত্যাদি তত্ত্ব লিপ্ত হয়। (৭) রাজনৈতিক ক্ষমতা তো লাভ করতেই চায়। তবে অবশ্যই সামাজিক সংস্কারমূলক কিছু ভূমিকা তার থাকে, ধর্মীয় মৌলবাদীদের থেকে এক্ষেত্রে তাদের কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে কিংবা নাও থাকতে পারে।
