অশোক কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বটে, তবে একইসঙ্গে মসৃণ ভঙ্গিতে পকেট থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করে আমার গলায় চেপে ধরেছেন।
চেঁচালেই গলা ফাঁক করে দেব। বল, রেখা কোথায়।
আমি ভয় পেলাম। হঠাৎই গলা শুকিয়ে জিভটা শিরীষ কাগজের টুকরোর মতো ঠেকল। কিন্তু বেশ কষ্ট করে মুখের হাসি-হাসি ভাবটা বজায় রাখলাম। কারণ, কানের নীচে ছুরির ধারালো চাপটা টের পাচ্ছিলাম। কোনওরকমে আওয়াজ বের করে বললাম, বলছি সব বলছি। আপনি প্লিজ ঠান্ডা হয়ে বসুন। প্লিজ…।
অশোকেন্দু কী ভাবলেন। গলায় ছুরির চাপটা নরম হল। বুঝলাম, মানুষটার একরোখা ভাব একটু কমেছে। তাই লোহা গরম থাকতে-থাকতে পেটানো দরকার সেই সূত্র মেনে অনুরোধ উপরোধের বন্যা বইয়ে দিলাম।
কাজ হল। অশোকেন্দু আমার মুখোমুখি চেয়ারে বসলেন। ছুরিটাকে ঢুকিয়ে ফেললেন পকেটে। তারপর ও এবার বলুন, সীমারেখা কোথায়?
আমি গলায় বারকয়েক হাত বুলিয়ে বললাম, আপনি এক্সাইটেড হয়ে এসব কী কাণ্ড করতে যাচ্ছিলেন? যদি সত্যিই ওই ছুরিতে একটা অঘটন ঘটে যেত, আপনি কি পার পেতেন? সীমারেখাই পুলিশে খবর দিত। হয়তো একথাও বলত যে, আমার মার্ডারের ব্যাপারে আপনাকেই ও সন্দেহ করে…।
অশোকেন্দু অদ্ভুতভাবে হাসলেন, বললেন, অত ভেবে মানুষ খুন করে না। তা ছাড়া খুনের সাক্ষী পুলিশ পাবে কোথা থেকে? আপনার অফিসে তো এখন একটা দারোয়ান ছাড়া আর কেউ নেই। ঢোকার সময় ওকে পাঁচশো টাকা বকশিশ দিয়েছি। টাকা নিয়ে ও হাওয়া খেতে গেছে। ও ফিরতে-ফিরতে আমার কাজ শেষ হয়ে যাবে। তা ছাড়া আপনার চেম্বারে ঢোকার প্যাসেজের দরজাটা আমি ভেতর থেকে লক করে দিয়েছি। এখানে আমাদের কেউ ডিসটার্ব করতে আসবে না…। টেবিলে আঙুলের টোকা মেরে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন। তারপর : আর সীমারেখার কথা বলছেন? আপনি খরচ হয়ে গেলে প্রথম কদিন হয়তো ও কান্নাকাটি করবে। তারপর সামলে নেবে। আর পুলিশ- টুলিশে খবর ও দেবে না। আপনিই যখন আর নেই তখন পুলিশে খবর দিয়ে ও শুধু শুধু কেন কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির পাবলিসিটি করবে? বরং দু-বেলা খাওয়া-পরা-ফুর্তির নিশ্চিন্ত জীবনকেই বেছে নেবে। আমার টাকায় লাইফকে এনজয় করতে রেখা ভালবাসে…আবার হাসলেন– তবে এবারের হাসিটা আত্মবিশ্বাসের : …তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে বুঝতে পারছেন?
আমি ধীরে-ধীরে মাথা নাড়লাম, বললাম, হু, বুঝতে পারছি।
তা হলে শিগগির বলে ফেলুন, সীমারেখা কোথায়।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম : নাঃ, আর লুকিয়ে লাভ নেই। সত্যি কথাটা আপনাকে বলেই ফেলি…।
গুড। ঠোঁট বেঁকিয়ে সামান্য হাসলেন অশোকেন্দু।
ওঁর গ্লাসটার দিকে ইশারা করে বললাম, নিন। চিয়ার্স।
অশোক গ্লাসটা এবার নিলেন, চুমুক দিলেন। আমার কথা শোনার জন্যে ওঁর চোখ আগ্রহ নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
টেবিলের একপাশে একটা শৌখিন টিফিনবক্স রাখা ছিল। সামান্য ঝুঁকে পড়ে ওটা কাছে টেনে নিলাম।
স্টিলের ঢাকনাটা খুলতেই মাটন কাবাবের ফুরফুরে গন্ধ ঝাপটা মারল। পেঁয়াজ আর ক্যাপসিকাম দিয়ে ফ্রাই করা ছোট-ছোট বোনলেস মাংসের টুকরো।
আমার চেয়ারের পেছনের পরদা সরিয়ে একটা টমেটো সসের শিশি বের করে নিলাম। শিশিটায় কঁকুনি দিয়ে টিফিন কৌটোর চিত করা ঢাকনায় সস ঢালোম। অশোকেন্দুকে ইশারা করে বললাম, নিন, দারুণ খেতে…। তারপর আমি একটুকরো কাবাব তুলে নিয়ে সসে ঠেকিয়ে মুখে ফেললাম : আঃ, গ্র্যান্ড।
অশোক হাত বাড়িয়ে একটুকরো কাবাব পেঁয়াজ আর ক্যাপসিকাম সমেত গুছিয়ে নিলেন। সস মাখিয়ে মুখে দিয়ে তৃপ্তি করে চিবোতে চিবোতে বললেন, ঊ, একসেলেন্ট। হ্যাঁ, আপনি কী যেন বলছিলেন…।
হ্যাঁ…বলছি। শুনলে আপনার অবাক লাগবে…সীমারেখা কখনও সেভাবে আমাকে ভালোবাসেনি। ও আমাকে।
আমাকে বাধা দিয়ে অশোকেন্দু বললেন, ওসব গালগল্প ছেড়ে আসল কথা বলুন। তারপর গ্লাসে চুমুক দিলেন।
বিশ্বাস করুন, এটাই আসল কথা। এটাই ভেতরের কথা। আর এটা আমি জেনেছি মাত্র তিনদিন আগে। অথচ ওকে বিয়ে করব বলে আমি মনে-মনে তৈরি ছিলাম। আমি..মানে, আমরা দুজনেই তৈরি ছিলাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, সবই আমার কপাল! সেদিন যখন রেখাকে বললাম, এসো, এবার একটা দিন ঠিক করে সাতপাক হয়ে যাক, তখন ও বেঁকে বসল। বলল, কেন, এই তো বেশ চলছে–এটা খারাপ কী! ডিভোর্সের ব্যাপারটা খুব ডেলিকেট। আমি অনেক ভেবে দেখেছি..আমি ওসব পারব না। প্লিজ, তুমি একটু আমার দিকটা ভেবে দ্যাখো…।
ব্যস, সব আশনাই শেষ। বললাম না, সবই আমার কপাল। সারাটা জীবন আমি ব্যর্থ প্রেমের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। তাই আমি ড্রিঙ্ক করি মনের দুঃখে।
আমি একটুকরো কাবাব মুখে দিলাম। স্বাদ নিতে নিতে আয়েস করে চিবোতে লাগলাম। অশোকেন্দু কৌতূহলী চোখে আমাকে দেখছিলেন। চোখ না সরিয়েই টিফিনবাক্সের দিকে হাত বাড়ালেন। বললেন, আপনার কাবাবে ভাগ বসাচ্ছি…আপনি কিছু মাইন্ড করছেন না তো?
দুর, কী যে বলেন! রেখার খোঁজে আপনি আসতে পারেন ভেবেই বেশি করে তৈরি করেছি।
আপনি এটা রান্না করেছেন নাকি? ব্যঙ্গের সুরে প্রশ্ন করলেন অশোক।
হ্যাঁ। কেন, খেতে খারাপ লাগছে?
না, না। দারুণ…।
আসলে ব্যাচিলার মানুষ। একা-একা থাকি। তাই রান্না শিখতে হয়েছে বহুকাল আগেই…। যাকগে, যা বলছিলাম…।
