প্রথম আমি ভালোবেসেছিলাম তানিয়া চৌধুরীকে। হয়তো ও-ও আমাকে। তারপর একদিন বিয়ের কথা উঠল। তাতে ও অসভ্যের মতো হেসে ফেলল। বলল, আমার সঙ্গে নাকি বন্ধুত্ব করা যায়, কিন্তু বিয়ে করা যায় না। হঠাৎ আমার মধ্যে এমন বিয়ের বাতিক জেগে উঠল কেন…বেশ তো চলছিল। তো এইরকম সব কথাবার্তা বলল তানিয়া। বিয়ে করার সাধটা যে একটা বাতিক সেটা ওর কাছেই প্রথম জানলাম।
কিন্তু আমার মুশকিলটা কোথায় জানেন, মিস্টার বোস? আমি কখনও হার মানতে শিখিনি। তাই একদিন ডেকে পাঠালাম তানিয়াকে…ওকে গঙ্গার ধারে আসতে বললাম…আউটরাম ঘাটে।
কথার ফাঁকে-ফাঁকে কাবাব আর গ্লাস চলছিল। গ্লাস খালি হলেই আমি সোডা, জল আর ইয়ে মিশিয়ে দিচ্ছিলাম। আর আয়েস করে কাবাব চিবোচ্ছিলাম দুজনেই।
তারপর? আগ্রহে জানতে চাইলেন অশোক। ওঁর চোখে কৌতুকের খেলা দেখে বুঝতে পারছিলাম আমার গল্পটা এখনও গল্পই থেকে গেছে ওঁর কাছে।
…তানিয়া এল। সন্ধে হল। দুজনে বসে অনেক গল্প করলাম। আমি অনেক কান্নাকাটি করলাম। তারপর হঠাৎ ওকে খুন করে ফেললাম।
নির্জন রাত। নরম গলা। আর আমার শক্ত হাত। কোনও অসুবিধেই হল না ওকে খতম করতে। মুখের কাবাবের টুকরোটা শেষ করে গ্লাসে চুমুক দিলাম : পরদিন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ওর ডেডবডি পাওয়া গিয়েছিল। ওর প্রেমিক হওয়ার সুবাদে পুলিশ আমাকে প্রচণ্ড হ্যারাস করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই করতে পারেনি। কারণ, কোনও প্রমাণ ছিল না ওদের হাতে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ব্যস। তানিয়া শেষ–তানিয়ার গল্পও শেষ। এবার কুন্তলিনীর গল্প শুরু…।
অশোকেন্দুর মুখ থেকে কৌতুকের আস্তরণ অনেকটা সরে গেছে। শান্তভাবে গ্লাসে চুমুক দেওয়ার চেষ্টা করলেও লক্ষ করলাম, ওঁর হাত কাঁপছে। একটু যেন উশখুশ করছেন এখন।
কুন্তলিনী কে?
আমার দ্বিতীয় প্রেমিকা। কুন্তলিনী রায়। ও ম্যারেড ছিল সীমারেখার মতো। ওর হাজব্যান্ডের নাম ছিল অলক।
যাই হোক, দ্বিতীয়বারেও সেই একই গল্প। কুন্তলকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসতাম। ওর পাতলা চেহারা, টানা-টানা চোখ আর চওড়া ঠোঁটে যে কী ম্যাজিক ছিল কে জানে! তা ছাড়া খুব সুন্দর গান গাইতে পারত। ওর দিকে তাকিয়ে আমি সব ভুলে যেতাম। তাই ওকে ছেলেভোলানো মেয়ে বলে ডাকতাম–ওকে খ্যাপাতাম।
মাসছয়েক চলেছিল আমাদের প্রবল প্রেম। তারপর, এক সন্ধ্যায়, ওর একক সংগীতের আসর শেষ হওয়ার পর ওকে বিয়ের কথা বললাম।
না, কুন্তল তানিয়ার মতো বাজে ভাবে হেসে ওঠেনি। বরং খুব সিরিয়াস মুখ করে বলে উঠেছে, অলককে আমি ভীষণ ভয় পাই। বেসিক্যালি হি ইজ আ বিস্ট। ড্রিঙ্ক করলে ওর আর কোনও জ্ঞান থাকে না। ডিভোর্স-টিভোর্সের কথা বললে হি উইল জাস্ট গো ওয়াইল্ড। সব রাগে ছারখার করে দেবে, তছনছ করে দেবে। তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো, প্লিজ…।
ক্ষমা শব্দটা আমি খুব ঘেন্না করি, মিস্টার বোস। আমার দিকটা কুন্তলিনী মোটেই ভাবেনি। ও আমার সঙ্গে রিলেশানটা শেষ করে দিতে চাইল। তাই আমিও ওকে শেষ করে দিলাম…শেষ…চিরকালের মতো।
আমি একটুকরো কাবাব তুলে নিয়ে সস ছুঁইয়ে কামড় দিলাম। বললাম, দারুণ টেস্টফুল, না? আসলে এটা একটা স্পেশাল কাবাব…।
অশোকেন্দুও কাবাব চিবাচ্ছিলেন। একটু যেন থমকে গেলেন। জিগ্যেস করলেন, শেষ করে দিলেন মানে?
হাসলাম আমি : শেষ মানে শেষ। ফুলস্টপ। ওকে আমি ডিনারে নেমন্তন্ন করেছিলাম। বাড়িতেই। সে-রাতে ঝমাঝম বৃষ্টি হচ্ছিল রাত নটায় রাস্তায় কোনও লোক ছিল না। ও এল ভিজে একসা হয়ে। বলল, ওর হাজব্যান্ড ড্রিঙ্ক করে বেহেড হয়ে পড়ে আছে।
বেশ জুত করে আমরা ডিনার সারলাম। তারপর ভারী চপারের এক কোপে কুন্তলের গলার নলি কেটে দিলাম। ডাইনিং টেবিলে সে একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড।
যাই হোক, মাঝরাত পর্যন্ত খুব খাটুনি গেল আমার। ওর বডিটা টেনে নিয়ে গেলাম বাড়ির পেছনের ছোট বাগানটায়। রক্ত-টক্ত সব ধুয়ে-মুছে নিলাম। তারপর বডিটা ছোট-বড় টুকরোয় কুচিয়ে ছড়িয়ে দিলাম বাগানে।
আপনাকে বলা হয়নি, আমার কুকুর পোষার শখ আছে। তিনটে ডোবারম্যান। কালো রঙের। কান ক্রপ করা। ওদের দু-দিন না খাইয়ে চেন বেঁধে রেখেছিলাম। চেন খুলে দিতেই গন্ধের টানে ওরা ছুটল বাগানে। নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি চলল–তার সঙ্গে চাপা হিংস্র গর্জন। সেদিন প্রায় সারারাত ধরে ওদের ফুর্তি চলেছিল। এবং কুন্তলিনী জাস্ট ভ্যানিশ হয়ে গেল এই দুনিয়া থেকে।
আমি চাপা বিষণ্ণ গলায় একঘেয়ে সুরে কুন্তলিনীর শেষকৃত্যের কথা শোনাচ্ছিলাম। লক্ষ করলাম, অশোকেন্দু বেশ গোল-গোল চোখ করে আমাকে দেখছেন। প্রাণপণে বুঝতে চেষ্টা করছেন, গল্পটা বানানো, না সত্যি।
গ্লাসে মদিরা ঢালোম। অশোকেন্দুর গ্লাসেও। তারপর আমরা প্রায় একইসঙ্গে চুমুক দিলাম।
পরশু সকালে, এই নটা নাগাদ, সীমারেখা আমাকে ফোন করেছিল। ওকে আবার রিকোয়েস্ট করলাম। হতভাগার মতো কেঁদেও ফেললাম। কিন্তু ও অটল-অনড়। যেমন চলছে চলুক না। ডিভোর্সের কথা বলে আমি নাকি ফর নাথিং কমপ্লিকেশান তৈরি করছি। এত অবুঝ হওয়ার কোনও মানে হয়।
আমি কান্না থামিয়ে মন শক্ত করলাম। সীমাকে বাড়িতে ডেকে পাঠালাম…।
হ্যাঁ, পরশু সন্ধে থেকেই ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। উত্তেজিতভাবে বললেন অশোকেন্দু। সামনে ঝুঁকে কাবাব তুলে নিলেন আবার। চিবোতে চিবোতে জড়ানো গলায় বললেন, আপনি জানেন রেখা কোথায় আছে। বলুন, ও কোথায়?
