সে কথাই জিগ্যেস করলাম অশোকেন্দুকে। এবং আশ্চর্য! তিনি মুখের ওপরে সোজাসাপটা বলে দিলেন, হ্যাঁ–আমিই। আপনি সীমার সঙ্গে বৃন্দাবনটা এবার বন্ধ করুন। নইলে…।
নইলে কী? শান্ত চোখে অশোকেন্দুর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম।
নইলে আজেবাজে কিছু হয়ে যেতে পারে। আমি সিরিয়াসলি বলছি। সেইজন্যেই ফোন ছেড়ে আপনার অফিসেই সোজা চলে এসেছি। আপনাকে এটাই আমার লাস্ট রিকোয়েস্ট…।
একবার মনে হল, লোকজন ডেকে হতচ্ছাড়া স্বামীটাকে কষে পালিশ করাই। কারণ, এই অফিসটার মালিক আমি। আমার মুখের কথা এই অফিসের সংবিধান।
কিন্তু একটু পরেই মনে হল, না, তাতে কেচ্ছা ছড়াবে। তাই ওঁকে বসতে বলে ঠান্ডা গলায় কথা বলেছি। এমনকী বেয়ারাকে ডেকে কোল্ড ড্রিঙ্কও আনিয়ে দিয়েছি।
অনেক করে বুঝিয়েছিলাম অশোকেন্দুকে। বলেছিলাম, দেখুন, ব্যাপারটা শুধু আমার একার নয় সীমাও জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। ওকে আমি যেমন ভালোবাসি, তেমনই ও-ও আমাকে…। মানে, আপনি ডির্ভোস টাইপের কিছু ভাবতে পারলে ভালো হত। মানে, আমাদের বাকি লাইফটা…।
অসম্ভব। সীমারেখাকে আমি হার্ট অ্যান্ড সোলমানে, ওকে ছাড়া লাইফ আমি ভাবতেই পারি না। ও আমার কাছে.আমার কাছে…।
অশোকেন্দুর গলা কাঁপছিল। কিছু কিছু হাজব্যান্ড এমন সেন্টিমেন্টাল হয় যে, লজিক বুঝতে চায় না। এটাও দেখছি সেই টাইপের।
আমার চেম্বারে এসি চলছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও সীমারেখার স্বামী ঘামছিল। লোকটা কি অন্য কোনও মতলব নিয়ে এসেছে নাকি? বারবার প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাচ্ছে, বের করছে। কেমন যেন উশখুশ করছে।
আমার সন্দেহ ধীরে ধীরে বাড়ছিল। লোকটা কেমন যেন একটা দোটানায় ভুগছে।
আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম, কিন্তু কোনও লাভ হল না। অশোকেন্দু তীক্ষ্ণ নজরে আমাকে মাপছিলেন। সীমারেখাকে হারানোর ভয়টা ওঁর মুখে ছেয়ে ছিল।
আশ্চর্য! কদিন আগেও যে-মানুষটা আমাকে মোবাইল ফোনে হুমকি দিচ্ছিল, আজ সে একেবারে তুলতুলে টুলটুলি!
অশোকেন্দুর চোখের কোণে দু-একফেঁটা জলও দেখতে পেলাম। মনে হল, বউকে তিনি সত্যি সত্যিই ভালোবাসেন। কিন্তু কী করব? আমিও যে ওঁর বউকে ভালোবাসি!
অশোককে আমি বললাম, দেখুন, প্রবলেমটা ডিসকাস করার জন্যে আমার এই চেম্বারে আপনি আসতে পারেন…তবে একটু সন্ধে করে আসবেন। তখন অফিস একেবারে কঁকা হয়ে যায়– ডিসটার্ব করার কেউ থাকে না। আমি তো মাঝে-মাঝে একা-একা বসে একটু এনজয়ও করি… হাত বাড়িয়ে আমার ঠিক পেছনে টাঙানো একটা ভারী পরদা সরিয়ে দিলাম। তাকে সাজানো গ্লাস আর বোতলগুলো দেখা গেল। একটা শ্বাস টেনে বললাম, একদিন সন্ধের পর আসুন…দুজনে মিলে একটু ঠুনঠুন পেয়ালা করা যাবে। সঙ্গে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও রাখব। আপনার ভালো লাগবে…আই প্রমিস…।
অশোকেন্দু এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন আমি ঘেন্না করার মতো একটা কুপ্রস্তাব দিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমি ওঁর চাউনি গায়ে মাখলাম না। জীবন কখন কী বাঁক নেয় কে বলতে পারে! হয়তো একদিন এই লোকটাই ছুটে আসবে আমার কাছে আমার আসরে ভাগ বসাতে চাইবে।
শেষ পর্যন্ত আমাকে অনেক অনুরোধ উপরোধ করে অশোকেন্দু চলে গেলেন।
অশোকেন্দু যখন দ্বিতীয়বার হানা দিলেন তখন ঠিক, যা ভেবেছিলাম, তাই হল। আমার একক আসরে ভাগ বসালেন তিনি। তবে তার আগে যেসব কাণ্ড হল তা রীতিমতো মারাত্মক।
রাত প্রায় আটটার কাছাকাছি। অফিসে আমার চেম্বারে একা-একা বসে একটু ঢুকুটুকু করছিলাম। হঠাৎই এসি রুমের কাচের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল অশোকেন্দুন্দ্র বোস।
ওঁর যা চেহারা দেখলাম তাকে এককথায় বলা যায় উদভ্রান্ত।
চোখের কোল বসে গেছে। মাথার চুল উশকোখুশকো। শার্টের দুটো বোতাম খোলা। কপালে ঘামের ফোঁটা। অল্প-অল্প হাঁপাচ্ছেন।
ঘরে ঢুকেই আমার গ্লাসটপ টেবিলের ওপরে একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন অশোক : সীমারেখা কোথায়?
আমি হাসলাম। বললাম, উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? বসুন।
শিগগির বলুন–রেখা কোথায়? অশোকেন্দুর গলা কাঁপছিল।
আমি আর-একটা গ্লাস তৈরি করলাম। সুরা, সোডা এবং জল যথাযথ অনুপাতে মেশালাম। ওঁর সামনে এগিয়ে দিয়ে শান্তভাবে বললাম, বসুন। এটা খেয়ে একটু রিল্যাক্স করুন। আপনি এসেছেন…ভালোই হয়েছে। আপনার সঙ্গে কতকগুলো জরুরি কথা আছে।
আমার নির্লিপ্ত মেজাজ দেখে অশোক কেমন যেন হকচকিয়ে গেলেন। ওঁর উত্তেজনার বারুদে ধীরে-ধীরে যেন জল পড়ল। জামার হাতা দিয়ে মুখ মুছলেন। চোখও। তারপর ধরা গলায় বললেন, পরশু থেকে রেখাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আসলে আপনার ইস্যুটা নিয়ে ওর সঙ্গে একটু ঝগড়া হয়েছিল। তাতে ও রাগ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ভেবেছিলাম দু-চার ঘণ্টা পর ফিরে আসবে– কিন্তু আসেনি। পরদিন আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে খোঁজ নিয়েছি। সরাসরি সব কথা তো সবাইকে বলা যায় না–তাতে নিজেদেরই কেচ্ছা বেরিয়ে পড়বে। বড়-বড় শ্বাস নিলেন অশোক। চেয়ারে বসতে গিয়েও বসলেন না। গ্লাসটা ধরতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বললেন, ..তবু যতটা সম্ভব ঠারেঠোরে খোঁজ নিয়েছি। খোঁজ পাইনি। সীমারেখা কোথায় কেউই বলতে পারল না। তখন বাকি রইলেন আপনি…।
কথা বলতে বলতে টেবিলটাকে পাশ কাটিয়ে আমার কাছাকাছি চলে এলেন অশোক। আচমকা কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, তুই-তুই সব জানিস। বল, রেখা কোথায়?
