জ্যোতিষ : না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান

লিঙ্গপুরাণ – অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রথম প্রকাশ :  মাঘ, ১৪২৪
উৎসর্গ : প্রাণপ্রিয় কবি দেবযানী দত্তকে

.

সূচিমুখ

জ্যোতিষ : না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান

গোহত্যা, গোমাংস ও গোমাতার ইতিবৃত্ত

সরস্বতী : বাস্তবে এবং অবাস্তবে

ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ভারতীয় সমাজ

মনু, মনুসংহিতা এবং হিন্দুত্ববাদের ভারতবর্ষ

লিঙ্গপুরাণ

মোহে-নির্মোহে নগ্নতা

.

কথামুখ

গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া নয়। গতানুগতিকতায় প্রথাবদ্ধ হয়ে বন্দি না-হয়ে উল্টো সুরে উল্টো পথে যা ভাবি তাই লিখি। পূর্বপুরুষের শিখিয়ে দেওয়া তোতাপাখির বুলি আওড়ানোতে আমি স্বভাবসিদ্ধ নই। ভিন্ন ভাবনায়, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথানির্মাণে আমার অক্ষরমালার চরৈবেতি। প্রচলিত বিশ্বাস ও ধারণাকে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেছি গভীর নিবিড়তায়। উচিত-অনৌচিতের জ্ঞানবর্ষণ নয়, নিজের জীবন এবং যাপনেও এই বদলের রূপরেখা অনুসরণের চেষ্টা করি।

জ্যোতিষীগিরি একটা লাভজনক ব্যবসা। পাড়ায় পাড়ায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে জ্যোতিষীদের রমরমা ব্যবসা আমরা সবাই দেখেছি। জেনেছি তাঁরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, মানুষের হাত-পা-কপাল দেখে ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে। যদিও জ্যোতিষীদের কোনো বক্তব্য কোনোদিন কখনোই সত্য প্রমাণিত হয়নি, তা সত্ত্বেও জ্যোতিষীদের প্রতি মানুষের অগাধ ভক্তি। এইসব ভণ্ড জ্যোতিষীদের খপ্পরে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। তবু জ্যোতিষীরা যেন দেবদূত, অন্তর্যামী। অথচ এই জ্যোতিষীরা অন্তরালে এক একটা পাক্কা শয়তান, যমদূত। যে যত বড়ো জ্যোতিষী, সে তত বড়ো মিথ্যা, তার চেয়ে বড়ো ভণ্ড, প্রতারক। এঁরা নাকি কেউ কেউ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। জ্যোতিষীকে কেউ বলেন শাস্ত্র, কেউ বলেন বিজ্ঞান। আসলে জ্যোতিষজ্ঞান না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান। পাথর ধারণ করলে ভাগ্য বদলে যায় না। জ্যোতিষবিদ্যা ও জ্যোতিষীদের পর্দাফাঁস করা হয়েছে ‘জ্যোতিষ : না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে।

ছাগল, ভেড়া, মুরগি, শুয়োরের মাংসের মতো গোরুর মাংসও খেয়ে থাকে। আসলে মানুষ খায় না এমন একটি প্রাণী এ পৃথিবীতে নেই। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মানুষের খাদ্যাভ্যাস হয়। তবুও মাংস খাওয়াকে কেন্দ্র ঘৃণা, হত্যা ইত্যাদি। যত গণ্ডগোল গোরুকে ঘিরে। গোমাংস কি শুধু মুসলিমরাই খায়? ‘গোহত্যা, গোমাংস ও গোমাতার ইতিবৃত্ত’ প্রবন্ধে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করা হয়েছে গোমাংসের ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান। ‘সরস্বতী : বাস্তবে এবং অবাস্তবে’ প্রবন্ধে হিন্দুদের পরমপূজ্য দেবী সরস্বতীর উৎস ও বিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হিন্দুসমাজ ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। ভারতীয় সমাজ কীভাবে ব্রাহ্মণদের কজায় চলে এলো? এই ব্রাহ্মণ্যবাদ হিন্দুসমাজে কতটা ক্ষতি করেছে? ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ভারতীয় সমাজ’ প্রবন্ধে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।

‘মনু, মনুসংহিতা এবং হিন্দুত্ববাদের ভারতবর্ষ’ প্রবন্ধের শিরোনামই বলে দিচ্ছে ভারতবর্ষের হিন্দুত্ববাদে মনুসংহিতার প্রভাব কতখানি। বাবা সাহেব মনুসংহিতা পুড়িয়ে দিয়েছিল। কী এমন আছে মনুসংহিতায়? মনু কে? মনুর বিধান কীভাবে হিন্দুসমাজে কীভাবে বর্ণবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষের শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে এই প্রবন্ধে সেটাই উপজীব্য।

লিঙ্গপুরাণ প্রবন্ধে ‘লিঙ্গ’ শব্দটি থাকলেও কোনো যৌনতা নেই। তবে সমগ্র আলোচনাই হয়েছে লিঙ্গ নিয়ে। এসেছে শিবলিঙ্গ বিষয়ও। আলোচনা হয়েছে জাপানের পেনিস ফেস্টিভাল থেকে অমরনাথের প্রাকৃতিক বরফের লিঙ্গ নিয়ে। রহস্য উদ্মাটনের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত কয়েকটি জরুরি কথা বলে রাখা প্রয়োজন– প্রথমত, লিঙ্গপুরাণ কখনোই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গ্রন্থ নয়। অনেকেই বইয়ের নাম দেখে ভাবেন, বইটিতে অ্যাডাল্ট কনটেন্ট আছে। ১৮ অনুৰ্ধদের জন্য অপাঠ্য। ভুল ভেবে ভুল করবেন না। ইতোমধ্যে অনেকগুলি সাইট আমার চোখে পড়েছে, যেখানে আমার ‘লিঙ্গপুরাণ’ নামে বইটি অ্যাডাল্ট ক্যাটাগরিতে রেখেছেন। তাঁদের অনুরোধ করছি ক্যাটাগরি বদলে ফেলুন। বইটি অবশ্যই প্রাপ্তমনস্কদের জন্য, কখনোই প্রাপ্তবয়স্কদের নয়। সকল বয়সের পাঠকরা বইটা পড়তে পারেন। দ্বিতীয়ত, যারা এই বইটি পিডিএফ করে বিভিন্ন সাইটে রেখেছেন, তাঁরা কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করেছেন। আমি কারোকে পিডিএফ করার অনুমতি দিইনি। যত বেআইনি পিডিএফ আছে সব সাইট থেকে সরিয়ে ফেলুন। তৃতীয়ত, বিভিন্ন সাইটে ‘লিঙ্গপুরাণ’ নামে যে পিডিএফ আপনারা ডাউনলোড করে পড়ছেন, তাঁদের বলি ওই বইটার সঙ্গে এই বইটার অনেক অমিল। প্রচ্ছদ একই থাকলেও বিষয় এক নেই। বেশ কিছু নতুন প্রবন্ধ যেমন সংযোজন করা হয়েছে, কিছু প্রবন্ধ বাতিলও করা হয়েছে। আগের যে প্রবন্ধগুলি বর্তমান বইতে আছে সেগুলিতেও প্রচুর সংযোজন, সংশোধন, বর্জন, পরিমার্জন করা হয়েছে। বলা যায় সম্পূর্ণ নতুন রূপে এই বইটি আপনাদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ এই বইয়ের আসল স্বাদ নিতে হলে পাইরেটেড পিডিএফ নয়, ই-বুক পড়ন।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাবগম্ভীর বিষয় হলেও যতটা সম্ভব প্রাঞ্জল ভাষায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই সংকলনে যেসব প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে তা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। বিদগ্ধ ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের দাবিতে পাঠকদের কাছে সেগুলি দুই মলাটে করে বন্দি পৌঁছে দিতে পারলাম। এই গ্রন্থটির বিষয়বৈচিত্র্য নিশ্চয় পাঠকদের মন জয় করতে পারবে।

অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

জ্যোতিষ : না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান

প্ল্যাটফর্মে ধাতুর আংটি বিক্রেতা অক্লান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে আংটিটি আঙুলে ঢোকানোর। শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হলেন। ব্যর্থ হবেন নাই-বা কেন! আঙুলগুলিতে তো আর আংটি ঢোকানোর জায়গাই নেই। দশ আঙুলে কুড়িটা রত্নখোচিত আংটির উপর ওই আড়াই প্যাঁচের তামার আংটি কোথায় ঢুকবে? পোখরাজ, গোমেদ, পান্না, চুনি, প্রবাল– কী নেই সেই দশ আঙুলে! ডাবল ডাবলও আছে। ‘রহিস আদমি’ পেয়ে জ্যোতিষীরা ওর দশ আঙুলে বিশটা আংটি ভজিয়ে দিয়েছে। ওই বিশটা আংটিতেও যে কাজ হয়নি, তা ওই আড়াই প্যাঁচের তামার আংটি পরার ব্যাকুলতাতেই আন্দাজ করা যায়।

আর-একটা ঘটনা বলি : বছর কুড়ি আগে আকাশবাণীর ‘বিজ্ঞানরসিকের দরবারে’ শিরোনামে অনুষ্ঠান হত। কোনো একদিনের অনুষ্ঠানে কলকাতার স্বনামখ্যাত পাঁচজন জ্যোতিষীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট কোষ্ঠী বিচারের জন্য। পাঁচ জ্যোতিষীই জানতেন এই কাজটি করতে শুধুমাত্র তাঁকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যদিও ট্যবলেট বিক্রেতা এক স্বনামধন্য লাল জ্যোতিষী ছাড়া বাকি চারজন জ্যোতিষী আকাশবাণীতে গিয়েছিলেন নিজেকে যথার্থ ‘ভবিষ্যৎদ্রষ্টা’ প্রমাণ করতে। চারজন জ্যোতিষীকে চারটি ভিন্ন ঘরে বসতে দেওয়া হয়েছিল একই ব্যক্তির কোষ্ঠী দিয়ে। নির্দিষ্ট সময়ে চারজন জ্যোতিষীর কাছ থেকে একই ব্যক্তির চারটি কোষ্ঠী জমা নেওয়ার পর দেখা গেল চার ধরনের বিচার। কারোর সঙ্গে কারোর মিল নেই। এখানেই শেষ নয় বিস্ময়ের। সেই কোষ্ঠীর জাতক ছিলেন একজন মৃত শিশুর। সেই মৃত শিশুর কোষ্ঠী দেখে জ্যোতিষীরা বলেছিলেন যে জাতকের কবে বিয়ে হবে, কবে চাকরি হবে, কবে ফাড়াইত্যাদি ইত্যাদি হাস্যকর কথাবার্তা।

২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে যে কজন জ্যোতিষীর কাছে সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করেছিল–নির্বাচনে জিতে কোন্ দল আসছে? সব জ্যোতিষী একবাক্যে বলেছিল –বিজেপিই বিপুল আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসছে। জ্যোতিষীদের মিথ্যা প্রমাণ করিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস আসন নিয়ে ক্ষমতায় তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতা চলে এলো। বিশ্বজুড়ে করোনা ‘অতিমারি’-র কোনো পূর্বাভাস একজন জ্যোতিষীও দিতে পারেনি।

এরকম ঘটনার ঝুড়ি ঝুড়ি উল্লেখ করা যায়। তাতে লাভ কিছু নেই। মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে, জ্যোতিষ এবং জ্যোতিষী যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে। আমরা বরং দেখার চেষ্টা করি জ্যোতিষ আসলে কী? জ্যোতিষ কি শাস্ত্র? নাকি বিজ্ঞান? প্রচুর বিতর্ক, প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এ বিষয়ে। তবুও আমি আমার মতো চেষ্টা করি। বোঝার এবং বোঝাবার।

‘জ্যোতির্বিদ্যা’(Astronomy) আর ‘জ্যোতিষবিদ্যা’(Astrology) কি একই বিষয়? না, একই বিষয় নয় তো! যদিও উচ্চারণের দিক থেকে দুটি শব্দ খুবই কাছাকাছি। অর্থ কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত। জ্যোতিষবিদ্যা যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা জ্যোতিষী এবং জ্যোতির্বিদ্যা যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা জ্যোতির্বিদ। জ্যোতিষী হলেন কিরো, ভৃগু, পরাশর, অমুক সম্রাট, তমুক সমুদ্ররা। এঁরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা! অপরদিকে জ্যোতির্বিদ হলেন উইলিয়ম হার্শেল, ভেইনু বাপ্প, মেঘনাদ সাহা, জয়ন্ত বিষ্ণু নার্লিকার, আর্যভট্ট, গ্যালিলিও, কোপারনিকাস প্রমুখ। এঁরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নন। জ্যোতির্বিদ্যার বিষয় সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ছায়াপুঞ্জ, উল্কা, ধূমকেতু। জ্যোতিষবিদ্যার বিদ্যার বিষয় হাত-পা-মুখ-কপাল গুনে ব্যক্তির ভূত-ভবিষ্যত বলে দেওয়া। জ্যোতির্বিদ্যায় সূর্যের চারপাশে পৃথিবী সহ অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহরা ঘুরপাক খায়। জ্যোতিষবিদ্যায় পৃথিবীর চারপাশে সূর্য সহ অন্যান্য গ্রহরা ঘুরপাক খায়। পৃথিবী নামে কোনো গ্রহের অস্তিত্ব নেই। জ্যোতির্বিদ্যায় উপগ্রহ আছে, জ্যোতিষবিদ্যায় কোনো উপগ্রহ নেই। জ্যোতির্বিদ্যায় রাহু ও কেতুর কোনো অস্তিত্ব নেই, জ্যোতিষবিদ্যায় রাহু ও কেতুর অস্তিত্ব প্রবল। মানুষের জীবন উলটপালট করে দেওয়ার বিপুল ক্ষমতা রাখে! জ্যোতির্বিদ্যার গ্রহ বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন, প্লুটো ইত্যাদি। জ্যোতির্বিদ্যার গ্রহরা বালি-পাথর-গ্যাসীয় মহাজাগতিক নিথর বস্তু বিশেষ। জ্যোতিষবিদ্যার গ্রহ সূর্য বা রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু এবং কেতু। জ্যোতিষবিদ্যার গ্রহরা সবাই দেবতা, তাঁদের কোপে মানুষের ‘সব্বোনাশ’ হয়। জ্যোতিষবিদ্যায় গ্রহরত্ন, গ্রহমূল, অষ্টধাতুর ব্যবহার আছে। জ্যোতির্বিদ্যায় এসবের কোনো ব্যবহারই নেই। জ্যোতিষবিদ্যায় মামলা-মোকদ্দমা জিতিয়ে দেওয়া, বিয়ে হওয়া, পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেওয়া, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার দাবি করে। জ্যোতির্বিদ্যায় এসবের কোনো চর্চা নেই। জ্যোতির্বিদ্যায় পদার্থবিদ্যা, গণিত, দূরবীক্ষণ যন্ত্র প্রয়োজন হয়। জ্যোতিষবিদ্যায় কোনো বিদ্যাই লাগে না– লাগে ব্যক্তির দুর্বলতা খুঁজে বের করার ক্ষমতা, কৌশল-চাতুরতা, সম্মোহনী আর রত্ন-মাদুলি-কবচ গছানোর ক্ষমতা। গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে দূরবীক্ষণ যন্ত্র লাগে না, দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়াই বহুদূরে থাকা ভবিষ্যত আর অতীত দেখাই জ্যোতিষীদের কর্মকাণ্ড।

ভারতে বৈদিক যুগের মাঝামাঝি মায় ব্রাহ্মণ সাহিত্যাদি রচনার যুগ থেকেই জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ অগ্রগতি হয়েছিল। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রামশরণ শর্মা বলেন– প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে জ্যোতিষীর ভবিষ্যবিচারের কোনো ইঙ্গিত নেই। হস্তরেখা বিচারের প্রাচীনতম আলোেচনা গরুড়পুরাণে পাওয়া যায়। এ বিষয়ে প্রথম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের ‘বৃহৎসংহিতা’, যে গ্রন্থটির রচয়িতা বরাহমিহির। বরাহমিহির ছিলেন শক জাতিভুক্ত। সেসময় আফগানিস্তান, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও রাজপুতানার নিয়ে গঠিত এক বিরাট এলাকা জুড়ে শকস্তান নামের এক রাজ্য ছিল। শকরা ছিল মূলত পূর্ব ইরান থেকে আগত একটি গোত্রগোষ্ঠী।

অন্য এক কাহিনিতে জানা যাচ্ছে তাঁর বাবার নাম আদিত্যদাস, আদিত্যদাস মানে এখানে সূর্যের দাস। বরাহমিহির ৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে উজ্জয়নীর নিকটবর্তী গ্রাম কাপ্তিঠে ব্রাহ্মণদের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন সূর্য দেবতার উপাসক এবং তিনিই বরাহমিহির জ্যোতিষ শিক্ষা দিয়েছিলেন। তবে বরাহমিহির একাধারে জ্যোতির্বিদ এবং জ্যোতিষী। কুসুমপুরা (পাটনা) সফরে যুবক বরাহমিহির জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ আর্যভট্টের সাথে দেখা করলেন। তিনি তাকে এতটাই অনুপ্রাণিত করেছিল যে তিনি জ্যোতিষশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিদ্যাকে আজীবন অনুসরণ হিসাবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

বিক্রমাদিত্যের এই রত্ন ‘বরাহ’ উপাধি পেলেন। কীভাবে পেলেন তার একটা গল্প প্রচলন আছে। রাজকীয় জ্যোতিষ মিহিরের ভবিষ্যদ্বাণী শুনে রাজা বিক্রমাদিত্য অশান্ত ছিলেন। তিনি সুসজ্জিত এবং জনাকীর্ণ আদালতের চারপাশে তাঁকিয়ে বললেন, “এটা কি সত্য হতে পারে?” কোনো উত্তর ছিল না। রাজকীয় জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণীতে শব্দের বাইরে সবাই হতবাক হয়ে যাওয়ায় নীরবতা ছিল। নীরবতা ভঙ্গ করে এবং নিজেই দুঃখের সঙ্গে রাজকীয় জ্যোতিষ এই ভবিষ্যদ্বাণীটির সত্যতা নিশ্চিত করেছিলেন, “গ্রহগুলির অবস্থানটি ১৮ বছর বয়সে রাজপুত্রের মৃত্যুর পূর্বাভাস দেয়।” যদিও রাজা তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। কিন্তু রানি নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি এবং বলে ওঠেন– “প্রভু আপনাকে এই ভবিষ্যদ্বাণীটি মিথ্যা প্রমাণিত করতে হবে।” যদিও রাজা তাঁর জ্যোতিষী মিহিরের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখেছিলেন, তবে তিনি পুত্রকে রক্ষা এবং বাঁচাতে প্রতিটি সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু পূর্বাভাসের দিন, একটি শুয়োর রাজপুত্রকে হত্যা করেছিল। সম্রাটের কাছে এই সংবাদ পৌঁছোলে তিনি মিহিরাকে তাঁর দরবারে ডেকে বললেন, “আমি পরাজিত, তুমি জিতেছিলে, তুমি জিতেছ।” জ্যোতিষী রাজার মতোই দুঃখিত ছিলেন এবং তিনি উত্তর দিলেন– “আমার প্রভু। আমি জিতিনি। এটি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিষবিজ্ঞানের জয়!” রাজা বললেন –“এটি যাই হোক না কেন, আমার শ্রদ্ধেয় জ্যোতিষী। এটি আমাকে নিশ্চিত করেছে যে, আপনার বিজ্ঞান সত্য ছাড়া কিছুই নয়। এবং এই বিষয়ে আপনার দক্ষতার জন্য, এখন আমি আপনাকে মাগধ রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার, বরাহর প্রতীক (শুয়োর) দেব। সুতরাং সেই সময় থেকেই মিহির বরাহমিহির নামে পরিচিতি লাভ করে।

অন্য আর-এক কাহিনি থেকে জানা যায় খনার স্বামী মিহির। সেই মিহিরের বাবা বরাহ। খনা জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী বিদূষী নারী। কথিত আছে, বিক্রমপুরের রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজসভার প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহ তাঁর পুত্রের জন্ম গোষ্ঠী গণনা করে পুত্রের আয়ু এক বছর দেখতে পেয়ে শিশুপুত্র মিহিরকে একটি পাত্র করে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেন। পাত্রটি ভাসতে ভাসতে সিংহল দ্বীপে পৌঁছেলে সিংহলরাজ শিশুটিকে লালনপালন করেন এবং খনার সঙ্গে বিয়ে দেন। খনা, বরাহ ও মিহির সকলেই একাধারে জ্যোতির্বিদ ও জ্যোতিষবিদ ছিলেন। একদিন শ্বশুর বরাহ ও স্বামী মিহির আকাশের তারা গণনায় সমস্যায় পড়লে খনা সমস্যার সমাধান বের করে দেন। খনার দেওয়া পূর্বাভাসে রাজ্যের কৃষিজীবীরা উপকৃত হতেন বলে রাজা বিক্রমাদিত্য খনাকে দশম রত্ন হিসাবে নিযুক্ত করেন। এতে বরাহ ও মিহির প্রচণ্ড ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়েন। রাজসভায় প্রতিপত্তি হারানোর ভয়ে প্রতিহিংসায় বরাহের আদেশে মিহির খনার জিভ কেটে দেয়, যাতে খনা কোনোদিন ভবিষ্যদ্বাণী তথা পূর্বাভাস দিতে না না পারে। জিভ কাটার ফলে কিছুকাল পরে খনার অকালমৃত্যু হয়। পরে বরাহ ও মিহিরের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হতে থাকে– বরাহমিহির।

ব্রাহ্মণ্য যুগে জ্যোতর্বিদ্যাকে একটি স্বতন্ত্র বিদ্যা হিসাবে গণ্য করত। ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে জ্যোতিষকে বলা হয়েছে ‘নক্ষত্রবিদ্যা’ এবং জ্যোতির্বিদকে ‘নক্ষত্র দর্শক’ বলা হয়েছে। আর্যভট্টই প্রথম ভারতীয় জ্যোতির্বিদ, যিনি পৃথিবীর আহ্নিক গতির কথা বলেন। গ্রিকদের অনেক আগে থেকেই ব্যাবিলনীয়, মিশরীয় এবং ভারতীয়রা ২০০০ বছর ধরে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করে এসেছে। সেই জ্ঞান চর্চা অর্থাৎ জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের পরিপূর্ণ সদব্যবহার গ্রিক বিজ্ঞানীরা করেছেন। গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কখনোই জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় ধর্ম এবং ফলিত জ্যোতিষের প্রতি বেশি গুরুত্ব আরোপ করেনি।

ভারতের যেমন বরাহ ও মিহিররা একাধারে জ্যোতির্বিদ ও জ্যোতিষবিদ ছিলেন, প্রাশ্চাত্যের কিরো কিন্তু আগ মার্কা জ্যোতিষবিদ। জ্যোতিষবিদ হিসাবেই তাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি। বলতে গেলে এই কিরোই বিশ্বজুড়ে জ্যোতিষ ব্যাবসার জন্ম দিয়েছে। কিরো, বেনহ্যাম, সেন্ট জারমেইন, নোয়েন জ্যাকুইন এঁরা সকলেই পাশ্চাত্যের জ্যোতিষবিদ। তবে জানা যায়, কিরো ভারত ও মিশর থেকে জ্যোতিষশাস্ত্রের বিরাট জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। কিরোকে একটু জানার চেষ্টা করা যাক। কিরোর প্রকৃত নাম কাউন্ট-লুই হ্যামন। কিরোকে নিয়ে এক কৌতূহলোদ্দীপক গল্প চালু আছে। গল্পটি এরকম –কিরো যখন আমেরিকায় পা দিলেন, তখন তাঁকে যাচাই করার জন্য একটি বিখ্যাত আমেরিকান সংবাদপত্র তাঁর সামনে চারটি হাতের ছাপ রাখা হয় এবং বলা হয়– এই চারটি হাতের ছাপ দেখে তাঁদের সম্পর্কে সঠিক বলে দিতে পারলে আমেরিকায় তাঁর বিরাট খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। আর বলতে না পারলে তাঁকে পরের জাহাজে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে হবে। কিরো সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। এরপর একে একে চারটি হাতের ছাপ পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রথম তিনজনের পেশা, জীবনের উন্নতি অবনতি সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে বললেন। চতুর্থ হাতের ছাপ দেখে বললেন– “ইনি একজন চিকিৎসক, কিন্তু বিরাট ক্রিমিনাল। তাঁর অপরাধের জন্য ধরা পড়ে জেলে যাবেন। কিন্তু তাঁর ফাঁসির হুকুম হলেও শেষপর্যন্ত ফাঁসি হবে না। জেলখানাতেই তাঁর মৃত্যু হবে।” শেষপর্যন্ত সেই ক্রিমিনাল চিকিৎসকের কী হয়েছিল, তা অবশ্য জানা যায়নি। দ্বিতীয় একটি ঘটনা প্রচলিত আছে। সেই ঘটনাটি এরকম –একবার এক বিখ্যাত নারী গোয়েন্দা মাতাহারির হাত দেখে কিরো বললেন –“তুমি অবিলম্বে এই পেশা ত্যাগ করো। তা না-হলে তোমার মৃত্যু অনিবার্য।” মাতাহারি বলেন– “তোমার কথা আমি মেনে নিতে প্রস্তুত কিরো। কিন্তু এইভাবে মৃত্যুবরণ করা ছাড়া আমার কাছে দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই।” একথা সবাই জানেনে গোয়েন্দা, পুলিশ, সেনা সর্বদাই ঝুঁকির চাকরি, যাঁরা প্রাণ বাজি রেখে প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অনেকেরই মৃত্যু হয়। ঝড়ে কাক মরলে গুণিনের নাম তো ফাটবেই। চাইলে যে কেউ এমন গুণিন হতে পারেন।

আরিস্টটল মনে করতেন –“বিশ্ব দুটি ভাগে বিভাজিত। (১) পার্থিব, যেখানে পাপে পরিপূর্ণ এবং (২) গাগনিক বা স্বর্গীয়, যেখানে সবই নিখুঁত ও অপরিবর্তনীয়। বিশ্বের কেন্দ্রে আছে অনড় পৃথিবী, আর তাকে কেন্দ্র করে পূর্ব থেকে পশ্চিম ঘুরে চলেছে ৫৬টি গোলক, যেখানে আছে গাগনিক বস্তুগুলি। সবচেয়ে নীচের গোলকে আছে চাঁদ, এই চাঁদই পাপী পৃথিবী এবং পবিত্র স্বর্গীয় অঞ্চলের সীমারেখাকে নির্দেশ করছে।” অ্যারিস্টটলের এই ধারণাই চার্চের মতবাদ হিসাবে প্রচারিত হত। সাধারণ মানুষও এটাই জেনেছিল। এই মতবাদের বিরুদ্ধাচরণ করা মানে ধর্মদ্রোহিতার সমতুল। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ টলেমি চিন্তাবিদ দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ধারণার উপর ভিত্তি করে ভূকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের এক সম্পূর্ণ ছবি সামনে আনেন। তিনি বলেন –অনড় পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সাতটি নিখুঁত গোলক (যথাক্রমে চাঁদ, বুধ, শুক্র, সূর্য, মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনি) সুসম বৃত্তাকারে আবর্তিত হচ্ছে এবং অষ্টম গোলকে নক্ষত্রের অবস্থান করছে। বহু পরে জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপারনিকাস ১৫৪৩ সালে এক গ্রন্থে বললেন –“পৃথিবী নয়, বিশ্বের কেন্দ্রে আছে সূর্য। সূর্যকে কেন্দ্র করে সমস্ত গ্রহগুলো বৃত্তাকার পথে ঘুরছে।” ইতালির চিন্তাবিদ জিওনার্দো ব্রুনো কোপারনিকাসের এই সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বকে ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় প্রচার করতে থাকলেন। এটা প্রচার করার অপরাধে ব্রুনো অপরাধী সাব্যস্ত হলেন। দীর্ঘ সাত বছর ধরে বিচার চলল এবং বিচারে মৃত্যুদণ্ড আদেশ হল। প্রকাশ্যে জনসমক্ষে ব্রুনোকে দাউদাউ আগুনে পুড়িয়ে মারা হল। সাল ১৬০০। মারা গেলেন জ্যোতির্বিদ, কিন্তু সত্য আজও বেঁচে আছে। সৌরতত্ত্ব আজও সত্যে অটুট। সাল ১৬০৯, জার্মানির জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও বললেন– “কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বটি সঠিক।”

সভ্যতার উষাকাল থেকে বহুকাল পর্যন্ত জ্যোতিষবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিদ্যার মধ্যে কোনো ফারাক ছিল না। বিষ্ণুপুরাণে চতুর্দশ বিদ্যার কথা বলা হয়েছে– চার বেদ, ছয় বেদাঙ্গ, মীমাংসা, ন্যায়, ধর্মশাস্ত্র এবং পুরাণ। ছয় বেদাঙ্গের মধ্যে জ্যোতিষ অন্যতম। পাণিনীয় শিক্ষায় জ্যোতিষকে বেদপুরুষের দুই চক্ষুরূপে কল্পনা করা হয়েছে –“জ্যোতিষাময়নং চক্ষঃ”। শাস্ত্রজ্ঞরা বলেন –“যে শাস্ত্রের মাধ্যমে আমরা জ্যোতিষ্কসমূহের পরিভ্রমণকাল, তাদের স্বরূপ, সঞ্চার, অবস্থান এবং তৎসম্বন্ধীয় যাবতীয় ঘটনাবলি মানুষের জীবনে তাদের প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে জানতে পারি তাই জ্যোতিষ।” বোঝাই যাচ্ছে এ জ্যোতিষের প্রবক্তা ব্রাহ্মণ্যবাদ। মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার অছিলায় ‘ভগবান সাজার শ্রেষ্ঠ উপায়। বিস্ময়াভূত মানুষদের কাছে জ্যোতিষের আসন ভগবান শ্রদ্ধার। তাই জ্যোতিষচর্চায় পোপ-পাদরি-ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া অধিকার।

ভারতে জ্যোতিষচর্চার সূত্রপাত ঋগবেগের কাল থেকে। ক্রান্তদর্শী ঋষিগণ চন্দ্র সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান বৈচিত্র্য ও তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজতে চেয়েছেন। বৈদিক ধর্মকর্ম, যাগযজ্ঞের জন্য কাল নির্ধারণে জ্যোতিষের জ্ঞান থাকা একান্ত অপরিহার্য ছিল। ফলে সূর্য-চন্দ্রের গতি, উত্তরায়ণ-দক্ষিণায়ন বিভাগ, সূর্যগ্রহণ-চন্দ্রগ্রহণ নির্ণয়, মাস-পক্ষ-দিন-তিথি নির্ণয়, পূর্ণিমা-অমাবস্যা, ঋতুবিভাগ প্রভৃতি নির্ণয়ে জ্যোতির্বিদ্যায় জ্ঞান থাকা আবশ্যিক। জ্যোতিষবিদ্যায় হাত-পা-মুখ দেখে ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেওয়া নয়।

জ্যোতিষবিদ্যাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয় –(১) গণিত জ্যোতিষ এবং (২) ফলিত জ্যোতিষ। গণিত জ্যোতিষে জ্যোতিষ্ক পরিবারের অন্তর্গত বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের স্থান, তাদের গতি ও কার্যকলাপ এবং সে বিষয়ে গাণিতিক সূত্রাবলি অর্থাৎ পাটিগণিত, বীজগণিত, পরিমিতি প্রভৃতি আলোচিত হয়েছে। এই শাখার প্রাচীন এবং অন্যতম মনীষীগণ হলেন প্রথম আর্যভট্ট, বরাহমিহির (গ্রন্থ : পঞ্চসিদ্ধান্তিকা), ব্রহ্মগুপ্ত (গ্রন্থ : ব্ৰহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত), ভাস্করাচার্য (গ্রন্থ : সিদ্ধান্তচূড়ামণি) প্রমুখ। অপরদিকে ফলিত জ্যোতিষ হল গ্রহ-নক্ষত্রাদির জ্যোতিষ্ক পদার্থগুলির আবর্তন ও অবস্থান ভেদে মানবজীবনে তথা পৃথিবীর উপর তাদের অনুসন্ধান এবং তার জন্য শুভাশুভ ফল গণনা। ফলিত জ্যোতিষীর প্রাচীন মনীষীগণ হলেন বিষ্ণুগুপ্ত, জীবশর্মা, দেবস্বামী, যবনাচার্য, সত্যাচার্য, সিদ্ধসেন, পৃথু প্রমুখ। ফলিত জ্যোতিষীর গ্রন্থগুলি হল– বৃহৎবিবাহপটল, পল্লববিবাহপটল, বৃহজ্জাতক, লঘুজাতক, বৃহৎসংহিতা ইত্যাদি। বৃহৎবিবাহপটল, পল্লববিবাহপটল গ্রন্থদুটিতে জ্যোতিষবিদ্যা অনুসারে বিবাহের শুভাশুভ কাল বর্ণিত হয়েছে। ফলিত জ্যোতিষকে বরাহমিহির তিনটি শাখায় ভাগ করেছেন। যেমন–

(১) তন্ত্র : জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিত। গ্রহগতির আলোচনা গণিতাংশে আছে।

(২) হোরা বা জাতক : কোষ্ঠী সম্পর্কিত বিভাগ। অহোরাত্র’ শব্দের আদি ও অন্ত্যাক্ষর বাদ দিয়ে ‘হোরা’ শব্দ উদ্ভূত হয়েছে। মানুষের ভাগ্য ও কর্মফল, গ্রহের প্রভাব প্রভৃতি আলোচনা হয়েছে।

(৩) সংহিতা : সাধারণ জ্যোতিষ বিষয়ক আলোচনা। যেমন –‘বৃহৎসংহিতা’।

বৃহৎসংহিতা বিষয়বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এক উল্লেখযোগ্য ফলিত জ্যোতিষগ্রন্থ। এই গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়গুলি কি তা দেখা যাক–

(১) রবি প্রভৃতি অষ্টগ্রহের এবং সপ্তর্ষি, ধূমকেতু প্রভৃতির রাশির স্থানান্তর হেতু শুভ ও অশুভ ফল।

(২) নতুন গ্রহের আগমনে তার প্রভাব, বর্ষফল, বৃষ্টিপাত, উল্কাপাত ও পরিবেশের প্রভাব।

(৩) বিভিন্ন রত্ন পরীক্ষার বিধান, স্ত্রী ও পুরুষের লক্ষণ, বৈবাহিক নক্ষত্র ও লগ্ন বিষয়ক আলোচনা।

(৪) পূর্তকর্ম, স্থাপত্য, জাতকশাস্ত্র, অঙ্গবিদ্যা, রাজব্যবহার, বাস্তুবিদ্যা, ভূবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা প্রভৃতি।

(৫) বিভিন্ন গ্রহ বক্র হলে তার খারাপ ফল কেমন হতে পারে তার বিস্তৃত আলোচনা।

(৬) গর্গ, পরাশর, কশ্যপ, ভৃগু, বশিষ্ঠ, বৃহস্পতি, মনু প্রমুখ মনীষীদের নাম ও তাঁদের মতামত আছে। পঞ্জিকাগুলি আসলে সেই জ্যোতিষবিদ্যার ফল।

অতএব জ্যোতিষশাস্ত্র বলতে যা বোঝায় একজন ব্যক্তির বা জাতকের জন্মপত্রিকা অনুশীলনসাপেক্ষে তাঁর চরিত্র ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা আপাত ধারণা তৈরি করা এবং এই কাজে জাতকের জন্ম সময়ের চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ নক্ষত্রদের অবস্থান পর্যালোচনা করা। জ্যোতিষবিদ্যার এই সাম্প্রতিক সংস্করণ প্রকৃতপক্ষে সুমেরীয় যুগের অপরিণত জ্যোতিষবিদ্যারই ক্রমবিকাশ। জন্মপত্রিকা থেকে একজন ব্যক্তি বা জাতকের ভাগ্য আগাম বলে দেওয়ার ভাবনা জ্যোতিষীয় পদ্ধতি দৃশ্যমান কোনো ঘটনার উপর তৈরি হয়নি, এর উদ্ভব হয়েছিল জন্মকালে গ্রহ-নক্ষত্রদের সঙ্গে জাতকের তৈরি হওয়া এক অদৃশ্য বন্ধনের অলীক কল্পনা থেকে। বস্তুত জ্যোতিষশাস্ত্র গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সভ্যতার ধর্মীয় ভাবনাকে ভিত্তি করে। প্রাচীন মিশর এবং মেসোপটেমিয়ায়

প্রতিটি গ্রহ-নক্ষত্রকে কোনো-না-কোনো ঈশ্বর বা অতিমানবের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। তাঁরা মনে করতেন, ঐশ্বরিক শক্তিসম্পন্ন এইসব বস্তু সত্ত্বা পার্থিব জীবনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাই বুঝি পৃথিবীর প্রাণীজগত এক অদৃশ্য বন্ধনে মহাজাগতিক গ্রহ-নক্ষত্রদের সঙ্গে আবদ্ধ। অবশ্য এখানে প্রাণীজগত বলতে মানুষের জগত বুঝতে হবে। কেননা মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীদের ভাগ্য-গ্রহ-প্রতিকার নিয়ে বিন্দুমাত্রও মাথাব্যথা নেই।

অপরদিকে জ্যোতির্বিজ্ঞান হল মহাবিশ্ব, মহাবিশ্বের প্রশ্নোত্তর। মহাবিশ্বের অধিকাংশই ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং শূন্যস্থান। তাপমাত্রা–২৭৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এর মধ্যে অনেক দূরে দূরে ভেসে আছে গ্যালাক্সি (Galaxy)। চক্রাকার, ডিম্বাকৃতি, এরকম নানা আকৃতির জ্বলন্ত তারা, গ্যসের পুঞ্জ এবং ধুলোর মেঘের সমন্বয়ে গঠিত তারাজগত। এক একটি তারাজগতে ১০০ কোটি থেকে ৫০ হাজার কোটিরও বেশি তারা আছে। আছে ছায়াপথ, এই ছায়াপথে আছে প্রায় ১০ হাজার কোটি তারা। এই ছায়াপথ, অ্যান্ড্রোমিডা, কোলস্যাক, অশ্বমুণ্ড, বৃহৎ ও ক্ষুদ্র মাজেনিক ক্লাউড ইত্যাদি প্রায় ২৪ টি তারাজগত মিলে তৈরি করেছে একটি মহাতারাজগত। এরকম হাজার হাজার মহারাজগত মহাশূন্যের বিপুল নিকষ কালো অন্ধকারে পুঞ্জে পুঞ্জে অবস্থান করছে। তারাজগতের বিশাল বস্তুপুঞ্জগুলো তাদের নিজ নিজ কেন্দ্রের প্রচণ্ড অভিকর্ষ বলে সারাক্ষণ পাক খেয়েই চলেছে। যে বস্তু তারাজগতের কেন্দ্রের কাছাকাছি তার গতি দ্রুত এবং যে বস্তু প্রান্তবর্তী তার গতি মন্থর। সূর্য তার গ্রহমণ্ডলী নিয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রের চারিদিকে প্রতি সেকেন্ডে ২৫০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে। যাই হোক, এবার আমরা দেখে নিতে পারি জ্যোতিষবিদ্যার জ্যোতিষীবাবুদের গ্রহ আর জ্যোতির্বিদ্যার গ্রহদের চেহারা কেমন। প্রথমেই আসি সূর্যের প্রসঙ্গে। যেটি জ্যোতিষবিদ্যার নক্ষত্র বলা হয় না, বলা হয় গ্রহ।

সূর্য (Sun): সূর্য একটি জি-ধরণের প্রধান ধারার তারা যার ভর সৌরজগতের মোট ভরের শতকরা ৯৯.৮৬৩২ ভাগ। এর গঠন প্রায় নিখুঁত গোলকের মতো, কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে কমলালেবুর মতো একটু চাপা। এই কমলাকৃতির পরিমাণ প্রতি ৯০ লক্ষ ভাগে এক ভাগ। অর্থাৎ সূর্যের মেরু অঞ্চলীয় ব্যস বিষুবীয় ব্যাসের চেয়ে মাত্র ১০ কিলোমিটার কম। যেহেতু সূর্য প্লাজমা তথা আয়নিত গ্যাস দিয়ে গঠিত, সেহেতু এটি বিষুবীয় অঞ্চলে মেরু অঞ্চলের চেয়ে বেশি বেগে ঘোরে। এই পরিবর্তনশীল বেগকে বলা হয় ব্যাবকলনীয় বেগ। এ ধরনের বেগের কারণ, সূর্যের মধ্যকার পরিচলন এবং কেন্দ্রের চেয়ে পৃষ্ঠের দিকে তাপমাত্রার ঢাল বেশি বাঁকা হওয়ায় ভরের স্থানান্তর। ভূকক্ষের উত্তর মেরু থেকে দেখলে সূর্যের যে বামাবর্তী কৌণিক ভরবেগ পর্যবেক্ষণ করা যায় তার কিছু অংশ এই ভর স্থানান্তরের কারণে পুনর্বণ্টিত হয়। অর্থাৎ এক স্থানের ভরবেগ কমে গিয়ে অন্য স্থানে বেড়ে যায়। এই প্রকৃত ঘূর্ণন বেগের মান হচ্ছে বিষুবীয় অঞ্চলে ২৫.৫ দিন এবং মেরু অঞ্চলে ৩৩.৫ দিন। তবে পৃথিবীর সাপেক্ষে সূর্যের অবস্থান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকায় আমরা এই আবর্তন বেগের মান পাই ২৮ পার্থিব দিন। দেখা যাচ্ছে, সূর্যের নিজ কক্ষের চারদিকে আবর্তন বেগ খুবই কম, এই ঘূর্ণন বেগ থেকে যে কেন্দ্রাতিগ বলের সৃষ্টি হয় তা সূর্যের পৃষ্ঠ অভিকর্ষের তুলনায় ১৮০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। গ্রহগুলির জোয়ার বলও এ তুলনায় এত নগণ্য যে তারা সূর্যের আকার-আকৃতির কোনো পরিবর্তন করতে পারে না।

সূর্য একটি পপুলেশন-১ তারা, অর্থাৎ এতে ভারী মৌলিক পদার্থের পরিমাণ বেশি। তারাটির উৎপত্তির পিছনে খুব সম্ভবত আশপাশের এক বা একাধিক অতিনব তারা বিস্ফোরণের ভূমিকা আছে। উল্লেখ্য অতিনব তারা বিস্ফোরণ বিশাল গ্যাসীয় মেঘকে সংকুচিত করার মাধ্যমে নতুন তারা সৃষ্টির সূচনা ঘটাতে পারে। সৌরজগতে সাধারণ পপুলেশন-২ তারার (যাদের মধ্যে ভারী পদার্থ কম থাকে) চেয়ে বেশি ভারী মৌল দেখা যায়। যেমন, ইউরেনিয়াম এবং স্বর্ণ। এই ভারী মৌলগুলো সম্ভবত অতিনবতারা বিস্ফোরণের সময় তাপহারী বিক্রিয়ার মাধ্যমে, অথবা কোনো বৃহৎ দ্বিতীয় প্রজন্ম তারার অভ্যন্তরে নিউট্রন শোষণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়েছিল। পার্থিব গ্রহগুলোর মত সূর্যের কোন নির্দিষ্ট পৃষ্ঠসীমা নেই এবং এর গ্যাসের ঘনত্ব ব্যসার্ধ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সূচকীয় হারে হ্রাস পায়। তথাপি এর প্রায় সুনির্দিষ্ট একটি অভ্যন্তরীন গঠন রয়েছে যা নীচে বর্ণনা করা হবে। সূর্যের ব্যাসার্ধ নির্ণয় করা হয় কেন্দ্র থেকে আলোকমণ্ডলের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত। আলোকমণ্ডল সূর্যের এমন একটি অঞ্চল যার বাইরে গ্যাস এত পাতলা হয়ে যায় যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিকিরণ নিঃসরণ করতে পারে না। এজন্যই দৃশ্যমান আলোয় আমরা সাধারণত সূর্যের আলোকমণ্ডলই দেখি। সূর্যের অভ্যন্তরভাগ সরাসরি দেখা যায় না, সূর্য তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণের প্রতি অনচ্ছ। কিন্তু সৌরকম্পনবিদ্যার মাধ্যমে অভ্যন্তরভাগ সম্পর্কে ধারণা লাভ সম্ভব, ঠিক ভূকম্পনবিদ্যার মতো। ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট তরঙ্গের মাধ্যমে যেমন পৃথিবীর অভ্যন্তরীন গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, ঠিক তেমনই সূর্যের অভ্যন্তরভাগ দিয়ে চলমান অবশাব্দিক চাপ তরঙ্গের মাধ্যমে সূর্যের অভ্যন্তরীন গঠনও জানা সম্ভব। এছাড়া কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমেও সূর্যের অদেখা ভুবন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।

সূর্যের কেন্দ্র থেকে শুরু করে মোট ব্যাসার্ধের শতকরা ২০-২৫ ভাগ পর্যন্ত যে অঞ্চলটি আছে তার নাম কোর বা কেন্দ্রভাগ। এই অঞ্চলের ঘনত্ব ১৫০ গ্রাম/ঘনসেন্টিমিটার (জলের ঘনত্বের ১৫০ গুণ) এবং তাপমাত্রা প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ কেলভিন। অথচ সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাত্র ৫৮০০ ডিগ্রি কেলভিন। সোহো মহাকাশ মিশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সূর্যের কেন্দ্রভাগে ঘূর্ণন বেগ বিকিরণ অঞ্চলের অন্যান্য স্থানের তুলনায় বেশি। এই অঞ্চলে প্রোটন প্রোটন শিকলের মাধ্যমে হাইড্রোজেন সংযোজনের (ফিউশন) মাধ্যমে হিলিয়াম তৈরি হয়। এটিই সূর্যের শক্তির প্রধান উৎস। সূর্যে উৎপাদিত মোট হিলিয়ামের শতকরা মাত্র ২ ভাগ সিএনও চক্র থেকে আসে। কেন্দ্রভাগে সূর্যের মোট শক্তির প্রায় পুরোটাই উৎপাদিত হয়। ব্যাসার্ধের ২৪%–এর মধ্যে ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্যের মোট শক্তির শতকরা ৯৯ ভাগ উৎপাদিত হয়, ৩০% এর পর আর কোনো ফিউশন বিক্রিয়া দেখাই যায় না। সুতরাং সূর্যের বাকি অংশ কেন্দ্রভাগের শক্তি দিয়েই চলে, কেন্দ্রভাগ থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় শক্তি বাইরের স্তরগুলির দিকে প্রবাহিত হয়। অনেকগুলি স্তর ভেদ করে অবশেষে এই শক্তি আলোকমণ্ডলে পৌঁছোয়, এরপর পদার্থ কণার গতিশক্তি বা সূর্যালোক হিসাবে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি সেকেন্ডে ৯.২×১০^৩৭ টি প্রোটন-প্রোটন শিকল বিক্রিয়া ঘটে। প্রতিটি বিক্রিয়ায় যেহেতু ৪টি হাইড্রোজেন মিলে একটি হিলিয়াম তৈরি হয় সেহেতু বলা যায়, প্রতি সেকেন্ডে সূর্য ৩.৭x১০^৩৮ টি প্রোটনকে (প্রায় ৬.২×১০^১১ কিলোগ্রাম) আলফা কণা তথা হিলিয়াম কেন্দ্রিনে রূপান্তরিত করে। সূর্যে মোট মুক্ত প্রোটনের সংখ্যা প্রায় ৮.৯x১০^৫৬ টি। হাইড্রোজেনের সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে সংযোজিত ভরের শতকরা ০.৭ ভাগ শক্তিতে পরিণত হয়। হিসাব করলে দেখা যায় ভরশক্তি রূপান্তরের মাধ্যমে সূর্যে প্রতি সেকেন্ডে ৪২ লক্ষ মেট্রিক টন শক্তি বিমুক্ত হয়। ভর ধ্বংস হয় না, বরং এই ভরশক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা বিকিরণ হিসাবে মহাশূন্য ছড়িয়ে পড়ে। আইনস্টাইনের ভরশক্তি সমতুল্যতা দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করা যায়। তবে কেন্দ্রেভাগের সব স্থানে একই হারে বিক্রিয়াটি ঘটে না। কেন্দ্র থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিবর্তিত হয়। তাত্ত্বিক মডেল থেকে দেখা যায় সূর্যের কেন্দ্রে শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ প্রতি ঘন মিটারে ২৭৬.৫ ওয়াট। পরিমাণটি কিন্তু মোটেই বেশি নয়। এই সংখ্যা পারমাণবিক বোমার বদলে আমাদেরকে সরীসৃপদের বিপাক ক্রিয়া ব্যবহৃত শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। সূর্যের প্রতি একক আয়তনে উৎপাদিত সর্বোচ্চ শক্তিকে খাদ্যশস্যের বর্ধনে ব্যবহৃত সারের ব্যয়িত শক্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সূর্য থেকে যে আমরা এত শক্তি পাই তার কারণ এই নয় যে, এই গ্যাসপিণ্ডের প্রতি একক আয়তনে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদিত হয়, বরং এইজন্যে যে সূর্যের আয়তন অনেক বেশি। একক আয়তনে শক্তির পরিমাণ অনেক কম হলেও সমগ্র আয়তনে সংখ্যাটি অনেক বড়ো হয়ে যায়।

কেন্দ্রভাগের সংযোজন বিক্রিয়া একটি আত্মসংশোধনযোগ্য সাম্যাবস্থায় আছে। বিক্রিয়ার হার যদি একটু বেড়ে যায় তাহলে কেন্দ্রভাগ উত্তপ্ত হয়ে সম্প্রসারিত হতে শুরু করে, এতে গ্যাসের ঘনত্ব কমে যায়, বিক্রিয়া হারও কমে যায়। আবার বিক্রিয়ার হার স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেলে কেন্দ্রভাগ সামান্য সংকুচিত হয়ে গ্যাসের ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে বিক্রিয়ার হার আবার বেড়ে যায়। এভাবেই সাম্যাবস্থা রক্ষিত হয়। বিক্রিয়া যেসব উচ্চ শক্তির গামা রশ্মি উৎপন্ন হয় তারা বিকিরিত হওয়ার মাত্র কয়েক মিলিমিটারের মধ্যেই সৌর প্লাজমা দ্বারা আবার শোষিত হয়, এরপর সামান্য নিম্ন শক্তিতে আবার বিকিরিত হয়। এভাবে বিকিরিণ-শোষণের খেলা চলতেই থাকে। এজন্যই সূর্যের কেন্দ্র থেকে পৃষ্ঠে শক্তি পৌঁছোতে অনেক সময় লাগে। কেন্দ্র থেকে পৃষ্ঠে ফোটনের আসতে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৭০,০০০ বছর লাগে বলে অনুমান করা হচ্ছে। পৃষ্ঠমুখী যাত্রার পথে ফোটন পরিচলন অঞ্চল পার হয়ে শেষে আলোকমণ্ডলে পৌঁছোয়, এই স্তর পেরোলেই অবারিত মহাশূন্য, যাতে দৃশ্যমান আলো হিসাবে ফোটনগুলি ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতিটি রশ্মি সূর্য থেকে পালানোর পূর্বে কয়েক মিলিয়ন দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ফোটনে রূপান্তরিত হয়। সংযোজন বিক্রিয়া গামা রশ্মির পাশাপাশি নিউট্রিনোও উৎপন্ন হয়, কিন্তু গামা রশ্মির মতো তারা পদার্থের সঙ্গে এত মিথস্ক্রিয়া করে না, আসলে মিথস্ক্রিয়া করে না বললেই চলে। সুতরাং উৎপাদিত নিউট্রিনোর প্রায় সবগুলিই তৎক্ষণাৎ সূর্য থেকে পালাতে সক্ষম হয়। অনেক বছর ধরে সূর্য থেকে যে পরিমাণ নিউট্রিনো পাওয়ার কথা তার চেয়ে প্রায় ৩ গুণ কম পাওয়া যাচ্ছিল। এই সমস্যার নাম দেয়া হয়েছিল সৌর নিউট্রিনো সমস্যা। কিন্তু ২০০১ সালে নিউট্রিনো স্পন্দন আবিষ্কৃত হওয়ার পর এর সমাধান হয়েছে। আসলে সূর্য থেকে অনেক নিউট্রিনো আসে, কিন্তু পৃথিবীতে দুরবিনের মাধ্যমে আমরা মাত্র ৩ ভাগের ২ ভাগ নিউট্রিনো সনাক্ত করতে পারি, কারণ পৃথিবীতে আসতে আসতে নিউট্রিনোগুলো স্বাদ পাল্টায়।

সূর্যের বয়স বের করার কোনো সরাসরি উপায় না-থাকলেও পরোক্ষভাবে তা করা হয়েছে। যেমন পৃথিবীতে প্রাপ্ত সবচেয়ে প্রাচীন প্রস্তর ও উল্কাপিণ্ডের বয়স হচ্ছে ৪৬০ কোটি বৎসর। ধারণা করা হয়, সমগ্র সৌরজগতের সৃষ্টি একই সময়ে। সেক্ষেত্রে সূর্যেরও বয়স হয় একই। সূর্যের ভরের শতকরা ৭৪ ভাগই হাইড্রোজেন, বাকি অংশের মধ্যে ২৫% হিলিয়াম। এছাড়াও আছে উচ্চ ভরসম্পন্ন কিছু বিরল মৌলিক পদার্থ। সূর্যের নাক্ষত্রিক শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে এর শ্রেণি হচ্ছে জি২ভি (G2v)। “জি২’ দ্বারা বোঝায় এর পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ৫,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি K দ্বারা বোঝায় এর বর্ণ সাদা, অবশ্য পৃথিবীর পরিবেশে বিচ্ছুরণের কারণে এর বর্ণ হলুদ দেখায়। এর বর্ণালি রেখা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় তাতে আয়নিত ও নিষ্ক্রীয় উভয় ধরনের ধাতুর বর্ণালি রয়েছে, এছাড়াও রয়েছে খুব দূর্বল হাইড্রোজেন রেখা। V-বর্ণটি দ্বারা বোঝায়, অন্যান্য অধিকাংশ তারার মতোই সূর্য একটি প্রধান ধারার তারা। অর্থাৎ সূর্য তার প্রয়োজনীয় শক্তি হাইড্রোজেন কেন্দ্রীনকে কেন্দ্রীন সংযোজন প্রক্রিয়ায় হিলিয়াম কেন্দ্রীনে পরিণত করার মাধ্যমে উৎপাদন করে। এছাড়া প্রধান ধারার তারায় hydrostatic balance লক্ষ করা যায়, তথা এরা সম্প্রসারিত বা সংকুচিত হয় না। আমাদের ছায়াপথে ১০০ মিলিয়নেরও বেশি G2 শ্রেণির তারা রয়েছে। সূর্যের সমগ্র আকারের লগারিদমভিত্তিক বিন্যাসের কারণে এই ছায়াপথের ৮৫% তারার চেয়ে এর উজ্জ্বলতা বেশি। অবশ্য আমাদের আকাশগঙ্গার অনেকগুলি তারাই লাল বামন পর্যায়ে রয়েছে। সূর্যের অবস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ২৫,০০০– ২৮,০০০ আলোক বর্ষ, আর এই দূরত্বে থেকেই এটি অবিরত ছায়াপথের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে। একবার কেন্দ্রের চারদিক দিয়ে সমগ্র পথ ঘুরে আসতে সূর্যের সময় লাগে ২২৫– ২৫০ মিলিয়ন বছর। এর কক্ষপথীয় দ্রুতি ২১৭ কিমি/সে; এ থেকে দেখা যায় সূর্য ১,৪০০ বছরে এক আলোক বর্ষ দূরত্ব এবং ৮ দিনে এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক (AU) দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। সূর্য একটি তৃতীয় প্রজন্মের তারা, কাছাকাছি কোনো একটি অতি নব তারা থেকে উদ্ভূত অভিঘাত তরঙ্গ এর উৎপত্তিতে একটি চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করেছিল। পুরো সৌরজগতে স্বর্ণ বা ইউরেনিয়ামের মতো ভারী মৌলসমূহের প্রাচুর্য লক্ষ করে চালিকাশক্তি হিসাবে এই ঘটনাটি প্রস্তাব করা হয়েছে। খুব সম্ভবত একটি অতি নব তারার বিবর্তনের সময় ক্রিয়াশীল endergonic কেন্দ্রীন বিক্রিয়া অথবা দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি বৃহৎ তারার অভ্যন্তরে নিউট্রন শোষণের ফলে উদ্ভূত ট্রান্স্যুটেশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই মৌলসমূহ সৃষ্টি হয়েছে। এই সূর্যকে বশে রাখার জন্য জ্যোতিষীরা চুনি (রত্ন Ruby) বা তামা/সোনা (ধাতু) বা স্টার রুবি (উপরত্ন) বা বিল্বমূল (মূল) বা মাতঙ্গী (কবচ) বা ১ মুখী/১০ মুখী রুদ্রাক্ষ) ধারণ করার নিদান দিয়ে থাকেন।

চন্দ্র বা চাঁদ (Moon) : চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং সৌর জগতের পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ, কোনোভাবেই গ্রহ নয়। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে চাঁদের কেন্দ্রের গড় দূরত্ব হচ্ছে ৩৮৪,৩৯৯ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় ৩০ গুণ। চাঁদের ব্যাস ৩,৪৭৪.২০৬ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর ব্যাসের এক-চতুর্থাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, চাঁদের আরতন পৃথিবীর আয়তনের ৫০ ভাগের ১ ভাগ। এর পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বল পৃথিবী পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বলের এক-ষষ্ঠাংশ। অর্থাৎ, পৃথিবী পৃষ্ঠে কারও ওজন যদি ১২০ পাউন্ড হয় তাহলে চাঁদের পৃষ্ঠে তার ওজন হবে মাত্র ২০ পাউন্ড। বেরিকেন্দ্র নামে পরিচিত একটি সাধারণ অক্ষের সাপেক্ষে পৃথিবী এবং চন্দ্রের ঘূর্ণনের ফলে যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং কেন্দ্রবিমুখী বল সৃষ্টি হয় তা পৃথিবীতে জোয়ারভাটা সৃষ্টির জন্য অনেকাংশে দায়ী। জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির জন্য যে পরিমাণ শক্তি শোষিত হয় তার কারণে বেরিকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে পৃথিবী-চাঁদের যে কক্ষপথ রয়েছে তাতে বিভব শক্তি কমে যায়। এর কারণে এই দুইটি জ্যোতিষ্কের মধ্যে দূরত্ব প্রতি বছর ৩.৮ সেন্টিমিটার করে বেড়ে যায়। যতদিন-না পৃথিবীতে জোয়ারভাটার উপর চাঁদের প্রভাব সম্পূরণ প্রশমিত হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত চাঁদ দূরে সরে যেতেই থাকবে এবং যেদিন প্রশমনটি ঘটবে সেদিনই চাঁদের কক্ষপথ স্থিরতা পাবে। চাঁদই একমাত্র জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু যাতে মানুষ ভ্রমণ করেছে এবং যার পৃষ্ঠতলে মানুষ অবতরণ করেছে। চাঁদের আবর্তনের পর্যায়কাল এবং তার কক্ষপথের পর্যায়কাল একই হওয়ায় আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের একই পৃষ্ঠ সবসময় দেখতে পাই। চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন, ৭ ঘন্টা, ৪৩ মিনিট এবং ১১ সেকেন্ড সময় নেয়, কিন্তু সমসাময়িক আবর্তনের ফলে পৃথিবীর পর্যবেক্ষকরা প্রায় ২৯.৫ দিন হিসাবে গণনা করে। একটি ঘণ্টা আবর্তনের পর্যায়কাল অর্ধেক ডিগ্রি দূরত্ব অতিক্রম করে। চাঁদ পৃথিবীকে যে অক্ষরেখায় পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করছে, সে অক্ষরেখায় চাঁদ একদিন বা ২৪ ঘন্টায় ১৩° কোণ অতিক্রম করে। সুতরাং পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ চাঁদের সময় লাগে ২৭ দিন, ৭ ঘণ্টা, ৪৩ মিনিট এবং ১১ সেকেন্ড। এই জন্য আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের একই পৃষ্ঠ দেখে থাকি। পৃথিবী থেকে আমরা চাঁদের শতকরা প্রায় ৫৯ ভাগ দেখতে পেয়ে থাকি। চাঁদ আকাশের সবসময় একটি অঞ্চল থাকে তাকে জোডিয়াক বলে। যা ক্রান্তিবৃত্তের প্রায় ৮ ডিগ্রি নীচে এবং গ্রহণরেখা উপরে অবস্থান করে। চাঁদ প্রতি ২ সপ্তাহে একে অতিক্রম করে। পৃথিবী-চন্দ্র সমাহারের অবিরত পরিবর্তন হচ্ছে। চাঁদের আকর্ষণে চাঁদের দিকে অবস্থিত সমুদ্রের জল তার নীচের মাটি অপেক্ষা বেশি জোরে আকৃষ্ট হয়। এ কারণে চাঁদের দিকে অবস্থিত জল বেশি ফুলে উঠে। আবার পৃথিবীর যে অংশে অবস্থিত জল চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে, সেদিকের সমুদ্রের নীচের মাটি তার উপরের জল অপেক্ষা চাঁদ কর্তৃক অধিক জোরে আকৃষ্ট হয়। কারণ এই মাটি জল অপেক্ষা চাঁদের বেশি নিকটবর্তী। ফলে সেখানকার জল মাটি থেকে দূরে সরে যায়, অর্থাৎ ছাপিয়ে উঠে। এক্ষেত্রে ফুলে উঠার কাহিনিটিই ঘটে। পৃথিবী যে সময়ের মধ্যে নিজ অক্ষের চারদিকে একবার আবর্তন করে (একদিনে) সে সময়ের মধ্যে পৃথিবীর যে-কোনো অংশ একবার চাঁদের দিকে থাকে এবং একবার চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে। এ কারণে পৃথিবীর যে-কোনো স্থানে দুইবার জোয়ার এবং দুইবার ভাটা হয়। তবে জোয়ারভাটার জন্য সূর্যের আকর্ষণও অনেকাংশে দায়ী। তবে অনেক দূরে থাকায় সূর্যের আকর্ষণ চাঁদের আকর্ষণের থেকে কম কার্যকর। সূর্য এবং চাঁদ যখন সমসূত্রে পৃথিবীর একই দিকে বা বিপরীত দিকে অবস্থান করে তখন উভয়ের আকর্ষণে সর্বাপেক্ষা উঁচু জোয়ার হয়, জোয়ারের জল বেশি ছাপিয়ে পড়ে। এই চন্দ্রকে বশে রাখার জন্য মুক্তো (রত্ন Pearl) বা মুন স্টোন (উপরত্ন) বা রূপো (ধাতু) বা ক্ষীরিকা (মূল) বা কমলা (কবচ) বা ২ মুখী (রুদ্রাক্ষ) জ্যোতিষীরা ধারণ করার নিদান দিয়ে থাকেন।

মঙ্গল (Mars): সৌরজগতের চতুর্থতম গ্রহ হচ্ছে মঙ্গল। মঙ্গল সৌরজগতের শেষ পার্থিব গ্রহ। অর্থাৎ এরও পৃথিবীর মত ভূত্বক আছে। এর অতি ক্ষীণ বায়ুমণ্ডল রয়েছে, এর ভূত্বকে আছে চাঁদের মতো অসংখ্য খাদ, আর পৃথিবীর মতো আগ্নেয়গিরি, মরুভূমি এবং মেরুদেশীয় বরফ। সৌরজগতের সর্ববৃহৎ পাহাড় এই গ্রহে অবস্থিত। এর নাম অলিম্পাস মন্‌স। সর্ববৃহৎ গভীর গিরিখাতটিও এই গ্রহে যার নাম ভ্যালিস মেরিনারিস। মঙ্গলের ঘূর্ণন কাল এবং ঋতু পরিবর্তনও অনেকটা পৃথিবীর মতো। মঙ্গলের ব্যাসার্ধ পৃথিবীর অর্ধেক এবং ভর পৃথিবীর এক দশমাংশ। এর ঘনত্ব পৃথিবী থেকে কম এবং ভূপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল পৃথিবীর শুষ্ক ভূমির মোট ক্ষেত্রফল থেকে সামান্য কম। মঙ্গল বুধ গ্রহ থেকে বড় হলেও বুধের ঘনত্ব মঙ্গল থেকে বেশি। এর ফলে বুধের পৃষ্ঠতলের অভিকর্ষীয় শক্তি তুলনামূলকভাবে বেশি। মঙ্গল দেখতে অনেকটা লাল রঙের কমলার মতো। এর কারণ মঙ্গলের পৃষ্ঠতলে প্রচুর পরিমাণে আয়রন (৩) অক্সাইডের উপস্থিতি। এই যৌগটিকে সাধারণভাবে রাস্ট বলা হয়। মঙ্গলের পৃষ্ঠ মূলত ব্যাসল্ট দ্বারা গঠিত। মঙ্গলের কিছু কিছু অংশে ব্যাসল্টের চেয়ে সিলিকা জাতীয় পদার্থ বেশি রয়েছে। এই অঞ্চলটি অনেকটা পৃথিবীর অ্যান্ডেসাইট (এক ধরণের আগ্নেয়শিলা) জাতীয় পাথরের মতো। পৃষ্ঠের অনেকটা অংশ সূক্ষ্ণ আয়রন (৩) অক্সাইড যৌগ দ্বারা আবৃত। ধূলিকণা নামে পরিচিত এই যৌগটি অনেকটা ট্যালকম পাউডারের মতো। মঙ্গলের কোনো অভ্যন্তরীণ চৌম্বক ক্ষেত্র নেই। কিন্তু কিছু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে এর ভূত্বকের কিছু অংশ চুম্বকায়িত হয়ে আছে। চুম্বকীয়ভাবে susceptible খনিজ পদার্থের কারণে সৃষ্ট এই চৌম্বকত্বকে প্যালিওম্যাগনেটিজম বলা হয়। এই প্যালিওম্যাগনেটিজমের ধরন অনেকটা পৃথিবীর মহাসাগরীয় গৰ্ভতলে প্রাপ্ত অলটারনেটিং ব্যান্ডের মতো। গ্রহটির কেন্দ্রীয় অংশটির (core) ব্যাসার্ধ প্রায় ১,৪৮০ কিলোমিটার। এই কেন্দ্রভাগ মূলত লোহা দিয়ে গঠিত, অবশ্য লোহার সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭% সালফার রয়েছে বলে জানা যায়। এ হিসাবে মঙ্গলের কেন্দ্রভাগ আয়রন সালফাইড দ্বারা গঠিত, যা অনেকাংশে তরল। এই পদার্থগুলোর ঘনত্ব পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত পদার্থের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কেন্দ্রের চারদিক ঘিরে সিলিকেট দ্বারা গঠিত একটি ম্যান্টল আছে, যা গ্রহটির অনেকগুলি শিলাসরণ এবং আগ্নেয় প্রকৃতির কাঠামো তৈরিতে মূল ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বর্তমানে ম্যান্টলটি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। মঙ্গলের ভূত্বকের গড় পুরুত্ব ৫০ কিলোমিটার। তবে এই পুরুত্ব সর্বোচ্চ ১২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে দেখা যায়। অন্যদিকে পৃথিবীর ভূত্বকের পুরুত্ব গড়ে ৪০ কিলোমিটার। পৃথিবী এবং মঙ্গল এই গ্রহ দুটির আকৃতির অনুপাত বিবেচনায় আনলে পৃথিবীর ভূত্বক মঙ্গলের ভূত্বক থেকে মাত্র তিনগুণ পুরু। মঙ্গলকে বশে রাখার জন্য জ্যোতিষীরা লাল প্রবাল (রত্ন Coral) বা তামা (ধাতু) বা অনন্ত (মূল) বগলা (কবচ) বা ৩ মুখী (রুদ্রাক্ষ) ধারণ করার নিদান দিয়ে থাকেন।

বুধ (Mercury): বুধ সৌরজগতের প্রথম এবং ক্ষুদ্রতম গ্রহ। এটি সূর্যের সর্বাপেক্ষা নিকটতম গ্রহ। এর কোনো উপগ্রহ নেই। এটি সূর্যকে প্রতি ৮৮ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে। এর উজ্জ্বলতার আপাত মান–২.০ থেকে ৫.৫ পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু একে পৃথিবী থেকে সহজে দেখা যায় না। কারণ সুর্যের সঙ্গে এর বৃহত্তম কৌণিক পার্থক্য হচ্ছে মাত্র ২৮.৩ ডিগ্রি। কেবল সকাল ও সন্ধ্যার ক্ষীণ আলোয় একে দেখা যায়। গ্রহটি সম্বন্ধে তুলনামূলক অনেক কম তথ্য জানা গেছে। ভৌত বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে বুধ অনেকটা চাঁদের মতো। কারণ এই গ্রহেও রয়েছে প্রচুর খাদ। গ্রহটির কোনো স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল নেই, নেই কোনো প্রাকৃতিক উপগ্রহ। এর একটি সুবৃহৎ লৌহকেন্দ্র আছে। এই কেন্দ্র কর্তৃক উৎপাদিত চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের তুলনায় ০.১ শতাংশের বেশি শক্তিশালী। বুধের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ৯০ থেকে ৭০০ কেলভিনের মধ্যে থাকে। সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান হচ্ছে অর্ধসৌর বিন্দু এবং শীতলতম স্থান হল এর মেরুর নিকটে অবস্থিত খাদসমূহের নিম্ন বিন্দু। বুধ চারটি পার্থিব গ্রহের একটি অর্থাৎ এরও পৃথিবীর মতো কঠিন পৃষ্ঠভূমি আছে। চারটি পার্থিব গ্রহের মধ্যে এর আকার সবচেয়ে ছোটো; বিষুবীয় অঞ্চলে এর ব্যাস ৪৮৭৯ কিলোমিটার। বুধের গাঠনিক উপাদানসমূহের মধ্যে ৭০ শতাংশ ধাতব এবং বাকি ৩০ শতাংশ সিলিকেট জাতীয়। এর ঘনত্ব সৌরজাগতিক বস্তসমূহের ঘনত্বের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ৫.৪৩ গ্রাম/সেমি; পৃথিবী থেকে সামান্য কম। মহাকর্ষীয় সংকোচনের প্রভাব সম্পূর্ণ উদ্ধার করতে পারলে বুধের গাঠনিক উপাদানসমূহের ঘনত্ব আরও বেশি হত। বুধের অভ্যন্তরীণ গঠন বোঝার ক্ষেত্রে এর ঘনত্ব ভাল ভূমিকা রাখতে পারে। পৃথিবীর উচ্চ ঘনত্বের মূল কারণ হচ্ছে মহাকর্ষীয় সংকোচন যার পরিমাণ কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি। বুধ অনেক ছোটো এবং এর কেন্দ্র পৃথিবীর মতো অতটা দৃঢ় ও সংকুচিত নয়। তাহলে বুধের এত উচ্চ ঘনত্বের মূল কারণ হতে পারে, এর কেন্দ্র অনেক বড়ো এবং লৌহসমৃদ্ধ। আধুনিককালে ভূতত্ত্ববিদরা আবিষ্কার করেছেন যে বুধের সমগ্র আয়তনের ৪২ শতাংশই হল এর কেন্দ্র। যেখানে পৃথিবীর কেন্দ্র মাত্র ১৭ শতাংশ কেন্দ্রের চারপাশে ৬০০ কিমি অঞ্চল জুড়ে রয়েছে ম্যানটেল। ধারণা মতে বুধের ভূত্বকের পুরুত্ব ১০০ থেকে ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে। এর পৃষ্ঠতলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে প্রচুর সরু ridge রয়েছে যার কয়েকটি প্রায় কয়েকশো কিলোমিটার পর্যন্ত প্রলম্বিত। আমাদের সৌর জগতের অন্যান্য বৃহৎ গ্রহগুলোর যে কোনটির তুলনায় বুধে লৌহের পরিমাণ বেশী। বুধ গ্রহের পৃষ্ঠতলের গড় তাপমাত্রা হচ্ছে ৪৫২ কেলভিন (৩৫৩.৯° ফারেনহাইট, ১৭৮.৯° সেলসিয়াস)। তবে এই মান স্থানভেদে ৯০ কেলভিন থেকে ৭০০ কেলভিনের মধ্যে উঠানামা করে। দেখা যাচ্ছে বুধ পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৬১০ কেলভিন পর্যন্ত উঠানামা করে যেখানে পৃথিবীতে পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৮০ কে পর্যন্ত উঠানামা করতে পারে। এর মূল কারণ বুধের কোন বায়ুমণ্ডল নেই। পৃথিবীর তুলনায় বুধ পৃষ্ঠে সূর্য রশ্মির তীব্রতা ৬.৫ গুণ বেশী। তবে এই সমানুপাতিক সম্পর্কের মধ্যে একটি সৌর ধ্রুবক রয়েছে যার মান ৯.১৩ কিলোওয়াট/বর্গমি.। যদিও বুধ দীর্ঘ ১৭৬ দিনে একবার নিজ অক্ষে আবর্তন করে তথাপি এর একটি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী এবং আপাতভাবে আঞ্চলিক চৌম্বক ক্ষেত্র আছে। এটি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের ০.১ শতাংশ। বুধের চৌম্বক ক্ষেত্রের উৎপত্তির কারণ পৃথিবীর মতো হতে পারে। বুধ গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র এর চারপাশের সকল সৌরবায়ুকে বিক্ষিপ্ত করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী। প্রকৃতপক্ষে এই চৌম্বক ক্ষেত্র গ্রহটির চারপাশে চুম্বক গোলক নামক একটি আস্তরণের সৃষ্টি করেছে, সৌরবায়ু যাকে অতিক্রম করতে পারে না। চাঁদের সঙ্গে বুধের মূল পার্থক্য এখানেই। চাঁদের চৌম্বক ক্ষেত্র বেশ দুর্বল হওয়ায় কোনো চুম্বক গোলক নেই, যার ফলে সৌরবায়ু চন্দ্রপৃষ্ঠে চলে আসে অতি সহজেই। এহেন বুধকে বশে রাখার জন্য পান্না (রত্ন Emerald) বা ওনেক্স (উপরত্ন) বা রূপো (ধাতু) বা বৃহদ্বারক (মূল) বা ত্রিপুরেশ্বরী (কবচ) বা ৪ মুখী (রুদ্রাক্ষ) জ্যোতিষীরা নিদান দিয়ে থাকেন।

বৃহস্পতি (Jupiter) : বৃহস্পতি গ্রহ সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে পঞ্চম এবং আকার আয়তনের দিক দিয়ে সৌরজগতের বৃহত্তম। বৃহস্পতি ব্যতিত সৌরজগতের বাকি সবগুলি গ্রহের ভরকে একত্র করলেও বৃহস্পতির ভর তা থেকে আড়াই গুণ বেশি হবে। বৃহস্পতিসহ আরও তিনটি গ্রহ অর্থাৎ শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনকে একসঙ্গে ‘গ্যাসদানব’ বলা হয়। পৃথিবী থেকে দেখলে বৃহস্পতির আপাত মান পাওয়া যায় ২.৮। এটি পৃথিবীর আকাশে দৃশ্যমান তৃতীয় উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। কেবল চাঁদ এবং শুক্র গ্রহের উজ্জ্বলতা এর থেকে বেশি। অবশ্য কক্ষপথের কিছু বিন্দুতে মঙ্গল গ্রহের উজ্জ্বলতা বৃহস্পতির চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। সুপ্রাচীনকাল থেকেই গ্রহটি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও জ্যোতিষীদের কাছে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রচুর পৌরাণিক কাহিনী। এবং ধর্মীয় বিশ্বাসও আবর্তিত হয়েছে বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে। রোমানরা গ্রহটির নাম রেখেছিল পৌরাণিক চরিত্র জুপিটারের নামে। জুপিটার রোমান পুরাণের প্রধান দেবতা। এই নামটি প্রাক-ইন্দো-ইউরোপীয় ভোকেটিভ কাঠামো থেকে এসেছে যার অর্থ ছিল আকাশের পিতা। গ্রহটিকে ঘিরে এবটি দুর্বল গ্রহীয় বলয় এবং শক্তিশালী ম্যাগনেটোস্ফিয়ার রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কমপক্ষে ৬৩টি উপগ্রহ যাদের মধ্যে চারটি উপগ্রহ বৃহৎ আকৃতির। এই চারটিকে গ্যালিলীয় উপগ্রহ বলা হয়। বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের উৰ্দ্ধাংশের গাঠনিক উপাদানের মধ্যে পরমাণু সংখ্যার দিক দিয়ে ৯৩ শতাংশ হাইড্রোজেন ও ৭ শতাংশ হিলিয়াম আছে। আর গ্যাস অণুসমূহের ভগ্নাংশের দিক দিয়ে ৮৬ শতাংশ হাইড্রোজেন এবং ১৩ শতাংশ হিলিয়াম। হিলিয়াম পরমাণুর ভর যেহেতু হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের চারগুণ সেহেতু বিভিন্ন পরমাণুর ভরের অনুপাত বিবেচনায় আনা হলে শতকরা পরিমাণটি পরিবর্তিত হয়। সে হিসাবে বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের গাঠনিক উপাদানের অনুপাতটি দাঁড়ায় ৭৫ শতাংশ হাইড্রোজেন, ২৪ শতাংশ হিলিয়াম এবং বাকি ১ শতাংশ অন্যান্য মৌল। অন্যদিকে অভ্যন্তরভাগ খানিকটা ঘন। এ অংশে রয়েছে ৭১ শতাংশ হাইড্রোজেন, ২৪ শতাংশ হিলিয়াম এবং ৫ শতাংশ অন্যান্য মৌল। বৃহস্পতির ৬৩টি নামকরণকৃত উপগ্রহ রয়েছে– (১) মেটিস (২) অ্যাডরাস্টে (৩) অ্যামালথে (৪) থিব (৫) আয়ো (৬) ইউরোপা (৭) গ্যানিমেড (৮) ক্যালিস্টো (৯) থেমিস্টো (১০) লেডা (১১) হিমালিয়া (১২) লিসিথে (১৩) এলারা (১৪) এস/২০০০ জে ১১ (১৫) কার্পো (১৬) এস/২০০৩ জে ১২ (১৭) ইউপপারি (১৮) এস/২০০৩ জে ৩ (১৯) এস/২০০৩ জে ১৮ (২০) থেলজিনো (২১) ইউয়ান্থে (২২) হেলিকে (২৩) ওর্থোসাই (২৪) লোকাস্টে (২৫) এস/২০০৩ জে ১৬ (২৬) প্র্যাক্সিডাইক (২৭) হার্পালাইক (২৮) মিরিনেমে (২৯) হারমিপ্পে (৩০)। থাইয়োনি (৩১) আনাকে (৩২) হার্সে (৩৩) অ্যাল্টনে (৩৪) কেল (৩৫) টাইগেটে (৩৬) এস/২০০৩ জে ১৯ (৩৭) চালডেনে (৩৮) এস/২০০৩ জে ১৫ (৩৯) এস/২০০৩ জে ১০ (৪০) এস/২০০৩ জে ২৩ (৪১) এরিনোম (৪২) এওয়েডে (৪৩) ক্যালিচোরে (৪৪) ক্যালাইক (৪৫) কারমে বা কার্মে (৪৬) ক্যালিরহ (৪৭) ইউরিডোম (৪৮) প্যাসিথি (৪৯) কোর (৫০) সাইলিন (৫১) ইউকেল্যাড (৫২) এস/২০০৩ জে ১৪ (৫৩) প্যাসিফাই (৫৪) হেজেমোনি (৫৫) আর্কে (৫৬) আইসোনো (৫৭) এস/২০০৩ জে ৯ (৫৮) এস/২০০৩ জে ৫ (৫৯) সিনোপে (৬০) স্পোন্ডে (৬১) অটোনো (৬২) মেগাক্লাইট (৬৩) এস/২০০৩ জে ২। বৃহস্পতিকে বশে রাখার জন্য পীত পোখরাজ (রত্ন Topaj বা Sapphire) বা ইয়োলো টোপাজ (উপরত্ন) সোনা (ধাতু) বা ব্ৰহ্মষষ্ঠী (মূল) বা তারা (কবজ) ৫ মুখী (রুদ্রাক্ষ) জ্যোতিষীরা নিদান দিয়ে থাকেন।

শুক্র (Venus) : শুক্র গ্রহ সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে সৌরজগতের দ্বিতীয়। এই পার্থিব গ্রহটিকে অনেক সময় পৃথিবীর ‘জমজ বোন গ্ৰহ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়, কারণ পৃথিবী এবং শুক্রের মধ্যে গাঠনিক উপাদান এবং আচার আচরণে বড়ো রকমের মিল আছে। বাংলায় সকালের আকাশে একে ‘শুকতারা এবং সন্ধ্যার আকাশে একে ‘সন্ধ্যাতারা’ বলে ডাকা হয়ে থাকে। শক্রের কোনো উপগ্রহ শুক্রগ্রহে বিশাল পাহাড়, সমতলভূমি ও অনেক আগ্নেয়গিরি আছে। গ্রহটির অন্তঃসংযোগের সময় শুক্র অন্য যে-কোনো গ্রহের তুলনায় পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে, তখন এ থেকে পৃথিবীর দূরত্ব হয় চাঁদ থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্বের প্রায় ১০০ গুণ। ১৮০০ সালের পর থেকে শুক্র গ্রহ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে পৌঁছেছিল ১৮৫০ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে। কখন তাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল ০.২৬৪১৩৮৫৪ জ্যোতির্বিজ্ঞান একক = ৩৯,৫৪১,৮২৭ কিলোমিটার। ২১০১ সালের ডিসেম্বর ১৬ তারিখের পূর্ব পর্যন্ত এটিই হবে শুক্র থেকে পৃথিবীর সর্বনিম্ন দূরত্ব। উক্ত তারিখে গ্রহদ্বয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব দাঁড়াবে ০.২৬৪৩১৭৩৬ জ্যোতির্বিজ্ঞান একক = ৩৯,৫৪১,৫৭৮ কিলোমিটার। শুক্রকে বশে রাখার জন্য হিরা (রত্ন Daimond) বা হোয়াইট জারকন (উপরত্ন) রূপো (ধাতু) বা রামবাসক (মূল) বা ভুবনেশ্বরী (কবচ) ৬ মুখী/১৩ মুখী (রুদ্রাক্ষ) জ্যোতিষীরা নিদান দিয়ে থাকেন।

শনি (Saturn) : শনি সৌরজগতের ষষ্ঠতম গ্রহ। এটি সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহ। সূর্যের দিক থেকে এর অবস্থান ষষ্ঠ। হিন্দু পৌরাণিক দেবতা শনির নামানুসারে এই গ্রহের নামকরণ করা হয়েছে। রোমান দেবতা Saturn নামানুসারে ইংরেজি নামটি গ্রহণ করা হয়েছে। নিরক্ষীয় এলাকায় এর ব্যাস ১২০৮০ কিলোমিটার। সূর্য থেকে এর গড় দূরত্ব ১৪৭,২০,০০,০০০ কিলোমিটার। মেরু অঞ্চলের ব্যাস ১০৯০০০। এর ঘনত্ব জলের ০.৬৮ গুণ। সূর্যপ্রদক্ষিণকাল ২৯.৪৬ পার্থিব বৎসর। এটি নিজ অক্ষের উপর একবার আবর্তিত হতে সময় নেয় ১০ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট ২৪ সেকেন্ড। এই গ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে পাথুরে উপকরণ। মধ্য ও উপরিভাগের অধিকাংশই হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে তৈরি। এর সঙ্গে আছে জল, মিথেন এবং অ্যামোনিয়া। আর এই গ্রহকে ঘিরে রয়েছে বিস্তৃত বলয়। শনির উপরিভাগের ৭০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত মেঘরাশির উপর থেকে এই বলয়ের শুরু এবং তা প্রায় ৭৪০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বলয়রাশির ভিতর বিভিন্ন পরিমাপের ফাঁকা জায়গা আছে। এই ফাঁকা স্থানের বিচারে এর বলয়গুলিকে কয়েকটি নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ভাগগুলি হলো- ডি, সি, বি, এ, এফ, জি, ই। এর সবচেয়ে বড় ফাঁকা স্থানের নাম ক্যাসিনি বিভাজন, এর বিস্তৃতির পরিমাণ প্রায় ১২০,৬০০ কিলোমিটার। পক্ষান্তরে এ এবং বি বলয়ের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ৪৮০০ কিলোমিটার। বলয়টি এতটাই বিশাল যে, এর ভেতর একশ কোটি পৃথিবী ভরে রাখার মতো জায়গা আছে। বলয়টির মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বরফ, ধুলাবালি ইত্যাদি ধরা পড়ে। মূলত শনি গ্রহের রয়েছে ১৫০ টিরও বেশি উপগ্রহ, কিন্তু এর মধ্যে নাম দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫৩ টি উপগ্রহের এবং আকার বিবেচনায় ১৮টি উপগ্রহকে মূল উপগ্রহ ধরা হয়। (১) প্যান, (২) ড্যাফনিস, (৩) অ্যাটলাস, (৪) প্রমিথিউস, (৫) প্যান্ডোরা বা প্যানডোরা, (৬) এপিমেথিউস, (৭) জ্যানাস, (৮) এগিয়ন, (৯) মাইমাস, (১০) মেথোনে, (১১) এন্থে, (১২) প্যালেন, (১৩) এনসেলাডাস, (১৪) টেথিস, (১৫) টেলেস্টো, (১৬) ক্যালিপ্সো, (১৭) ডাইয়োনে, (১৮) হেলেন, (১৯) পলিডিউসেস, (২০) রিয়া, (২১) টাইটান, (২২) হাইপেরিয়ন, (২৩) আইয়াপেটাস, (২৪) কিভিউক, (২৫) ইজিরাক, (২৬) ফোবে, (২৭) পালিয়াক, (২৮) স্কাথি, (২৯) অ্যালবাইয়োরিক্স, (৩০) এস/২০০৭ এস ২, (৩১) বেভিওন, (৩২) এরিয়াপাস, (৩৩) স্কল, (৩৪) সিয়ারনাক, (৩৫) তাকেক, (৩৬) এস/২০০৪ এস ১৩, (৩৭) গ্রেয়িপ, (৩৮) হাইরোক্কিন, (৩৯) জারুনসাক্সা, (৪০) তারভোস, (৪১) মানডিলফারি, (৪২) এস/২০০৬ এস ১, (৪৩) এস/২০০৪ এস ১৭, (৪৪) বার্গেলমির, (৪৫) নার্ভি, (৪৬) এস/২০০৪ এস ১২, (৪৭) ফারবাউটি, (৪৮) গ্রাই, (৪৯) এজির, (৫০) এস/২০০৭ এস ৩, (৫১) বেস্টলা, (৫২) এস/২০০৪ এস ৭, (৫৩) এস/২০০৬ এস ৩, (৫৪) ফেনরির, (৫৫) সুরতুর, (৫৬) কারি, (৫৭) ইমির, (৫৮) লোগে, (৫৯) ফোনজোট। সাধারণ মানুষ শনিগ্রহকে খুব ভয় করে। ভয় করার কারণ পুরাণে ভয়ংকর ভয়ংকর সব শনিকে ঘিরে কাহিনি। শনিকে বশে রাখার জন্য নীলা (রত্ন Blue Supphire) বা এমিথিস্ট (উপরত্ন) বা রূপো (ধাতু) বা শ্বেতবেড়েলা (মূল) বা দক্ষিণাকালী (কবচ) বা ৭ মুখী/১৫ মুখী (রুদ্রাক্ষ) জ্যোতিষীরা নিদান দিয়ে থাকেন।

রাহু (Rahu or Dragon’s head) ও কেতু (Ketu or Dragon’s tail) : জ্যোতিষীরা অবশ্য ‘রাহুর দশা’ ‘কেতুর দশা’ এসব বলে বটে! তাতেই মানুষ থরহরি কম্প! যদিও এখনও পর্যন্ত জ্যোতির্বিদরা রাহু ও কেতুর কোনো অস্তিত্বের কথা বলেননি। তবে এই রাহু-কেতু ব্যাপারটা কী? আমরা জানি যেমন পৃথিবীর কক্ষতলকে বলা হয় পৃথিবীর কক্ষতল, তেমনই চাঁদের কক্ষপথের তলকে বলা হয় চাঁদের কক্ষতল। এই দুই কক্ষতল পরস্পরের সঙ্গে ৫ ডিগ্রি কোণ করে আছে। যার কারণে চাঁদের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষতলকে দুটি বিন্দুতে ছেদ করে। এই বিন্দু দুটিকে বলে রাহু ও কেতু, জ্যোতিষীরা একে গ্রহ হিসাবে কল্পনা করেন কেন কে জানে! হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে রাহু জনৈক দানববিশেষ। বলা হয়েছে দানব বিচিত্তির ঔরসে ও সিংহিকার গর্ভে এঁর জন্ম হয়। উল্লেখ্য, সমুদ্রমন্থন শেষে উত্থিত অমৃত অসুরদের বঞ্চিত করে দেবতারা পান করেছিল। ইনি কৌশলে গোপনে অমৃতপান করতে থাকলে চন্দ্র ও সূর্য এঁকে চিনতে পেরে অন্যান্য দেবতাদের জানান। এই সময় বিষ্ণু সুদর্শন চক্রের রাহুর মাথা কেটে দেন। কিছুটা অমৃত পান করায় এই দানব ছিন্নমস্তক হয়ে অমরত্ব লাভ করেন। এঁর মস্তকভাগ ‘রাহু’ (Head) ও দেহভাগ ‘কেতু’ (Tail) নামে পরিচিত। সেই থেকে রাহু এবং চন্দ্র ও সূর্যের সঙ্গে চিরশত্রুতা শুরু হয়। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই রাহু চন্দ্র ও সূর্যকে গ্রাস করার জন্য অগ্রসর হয়। কিছুটা গ্রাস করতে সক্ষম হলেও তার কর্তিত দেহ থেকে চাঁদ বা সূর্য বেরিয়ে আসে। রাহুর এই গ্রাসকালীন সময়ে গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ রাহু যখন সূর্যকে গ্রাস করে তখন সূর্যগ্রহণ হয়। অন্যদিকে রাহু যখন চন্দ্রকে গ্রাস করে তখন চন্দ্রগ্রহণ হয়। জ্যোতিষীরা এই মতই বিশ্বাস করেন এবং বিশ্বাস করান। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন সৌরজগতে সূর্যকে ঘিরে উপবৃত্তাকার পথে আবর্তিত হচ্ছে পৃথিবী, আবার পৃথিবীকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে চন্দ্র। চন্দ্র এবং পৃথিবীর এই আবর্তন চলার সময় কখনো-কখনো পৃথিবী, চন্দ্র ও সূর্যের মাঝখানে একই সরল রেখায় অবস্থান নেয়। এই সময় পৃথিবীর মানুষেরা চন্দ্রের আলো দেখতে পায় না। অর্থাৎ, পৃথিবীর ছায়ায় চাঁদ ঢাকা পড়ে যায়। পৃথিবী চাঁদের চেয়ে বড়ো হওয়ায় পৃথিবীর ছায়া চন্দ্রপৃষ্ঠকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে। এই কারণে চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবীর কোনো কোনো অংশে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায়। যেখানে সূর্যগ্রহণ পৃথিবীর খুব অল্প জায়গা থেকেই দেখা যায়, সেখানে চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীর সর্বত্র থেকেই দেখা যায়। রাহু গোমেদ (রত্ন Gomed) বা গোয়া গোমেদ (উপরত্ন) বা রূপো (ধাতু) বা শ্বেতচন্দন (মূল) বা ছিন্নমস্তা (কবচ) বা ৮ মুখী/১৫ মুখী (রুদ্রাক্ষ) এবং কেতুকে বৈদুর্যমণি (Cats eye) বা সিসা/রূপো (ধাতু) বা অশ্বগন্ধা (মূল) বা ধূমাবতী (কবচ) বা ৯ মুখী/১৬ মুখী রুদ্রাক্ষ) বশে রাখার জন্য জ্যোতিষীরা নিদান দিয়ে থাকেন।

জ্যোতিষীগণ মনে করেন এইসব গ্রহদের রশ্মিও আছে। তবে এই রশ্মি নাকি দেখা যায় না। দেখা যায় না, কিন্তু আছে –আধ্যাত্মিক বা Spiritual রশ্মি বলে কথা! দেখা যায় না বটে, কিন্তু জ্যোতিষীরা সেই রশ্মি আবার গুণেও ফেলেছেন। যেমন– রবির ২০টি রশ্মি, মেষের ৮টি, মঙ্গলের ১০টি, বুধের ১০টি, বৃহস্পতির ১২টি, শুক্রের ১৪টি, শনির ১৬টি ইত্যাদি। এমন রশ্মির কথা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন আলফা, বিটা, গামা, কসমিক ইত্যাদি মহাজাগতিক রশ্মির কথা। আরও আছে জ্যোতিষীদের ব্যাপার স্যাপার। যেমন গ্রহদের স্বক্ষেত্র বা বাসস্থান বা জন্মভূমিও আছে। যেমন ধরুন–(১) সূর্য বা রবির স্বক্ষেত্ৰ কলিঙ্গ (বর্তমানে ওডিশা), (২) চন্দ্রের যবন দেশ (গ্রিস?), (৩) মঙ্গলের অবন্তী, (৪) বুধের মগধ (পাটনা ও গয়া), (৫) বৃহস্পতির সিন্ধুদেশে, (৬) শুক্রের ভোজকটকে, (৭) শনির সৌরাষ্ট্রে (বর্তমানে গুজরাট), (৮) রাহুর অম্বর অথবা সিংহল (বর্তমানে শ্রীলঙ্কা) এবং (৯) কেতুর (না, জন্মভূমির খোঁজ পাওয়া যায়নি)। মহাকাশের বেশির ভাগ গ্রহদের জন্মস্থান ভারতেই? মহাকাশের বাকি অংশে শূন্য কেন?

জ্যোতিষীয় ব্যাবসার ক্ষেত্রে মূল যে চারটি বিষয় জ্যোতিষীরা মাথায় রাখেন, সেগুলি হল– (১) গ্রহ, (২) নক্ষত্র, (৩) গণ (৪) রাশি এবং (৫) লগ্ন। একটু দেখে নেওয়ার চেষ্টা করব এগুলি কী বস্তু। জ্যোতিষীদের জন্য খুবই প্রয়োজন জন্মরাশি, জন্মলগ্ন, জন্মনক্ষত্র। এতেই জাকতের আমৃত্যু হালহকিকৎ বলে দেওয়া সম্ভব– এটা জ্যোতিষীদের দাবি এবং মানুষের প্রশ্নহীন বিশ্বাস। জন্মরাশি, জন্মলগ্ন, জন্মনক্ষত্র –এগুলি কী? নবজাতকের জন্মক্ষণে চন্দ্র যে রাশিতে থাকে তাকে জন্মরাশি বলে। নবজাতকের জন্মক্ষণে পূর্ব আকাশে যে রাশি দেখা যায় তাকে জন্মলগ্ন বলে। নবজাতকের জন্মক্ষণে চন্দ্রের সবচেয়ে কাছাকাছি উজ্জ্বলতম নক্ষত্রকে জন্মনক্ষত্র বলে।

আগেই উল্লেখ করেছি জ্যোতিষীদের গ্রহের কথা। রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র। শনি, রাহুও গ্রহ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আবার ইউরেনাস, নেপচুন, প্লুটো মায় পৃথিবী গ্রহ নয়। রইল এখন নক্ষত্র– যে বারটি রাশির কথা আগে বলা হয়েছে, সেগুলি বেষ্টন করে ২৭ টি নক্ষত্র রয়েছে। ৩৬০ ডিগ্রিতে যদি ২৭ টি নক্ষত্র থাকে তবে এক-একটি নক্ষত্রের ব্যপ্তি ১৩ ডিগ্রি ২০ মিনিট করে অর্থাৎ মেষরাশির শুরু থেকে ১৩ ডিগ্রি ২০ মিনিট অন্তর পর পর একটি করে নক্ষত্র রয়েছে। ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে নক্ষত্র হল চন্দ্রপথের ২৭টি ভাগের প্রতিটির নাম। নক্ষত্রগুলির নাম ও সংখ্যা হল– (১) অশ্বিনী, (২) ভরণী, (৩) কৃত্তিকা, (৪) রোহিণী, (৫) মৃগশিরা, (৬) আদ্রা, (৭) পুনর্বসু, (৮) পুষ্যা, (৯) অশ্লেষা, (১০) মঘা, (১১) পূর্বফাল্গুনী, (১২) উত্তরফাল্গুনী, (১৩) হস্তা, (১৪) চিত্রা, (১৫) স্বাতী, (১৬) বিশাখা, (১৭) অনুরাধা, (১৮) জ্যেষ্ঠা, (১৯) মূলা, (২০) পূর্বাষাঢ়া, (২১) উত্তরাষাঢ়া, (২২) শ্ৰবণা, (২৩) ধনিষ্ঠা, (২৪) শতভিষা, (২৫) পূৰ্ব্বভাদ্রপদ, (২৬) উত্তরভাদ্রপদ এবং (২৭) রেবতী। এই ২৭টি নক্ষত্রের প্রত্যেকটির একটি করে অধিপতি গ্রহ আছে। এই গ্রহগুলির ক্রম হল– কেতু, শুক্র, রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, রাহু, বৃহস্পতি, শনি ও বুধ। অর্থাৎ অশ্বিনীর অধিপতি গ্রহ কেতু, ভরণী নক্ষত্রের অধিপতি গ্রহ শুক্র, কৃত্তিকার অধিপতি গ্রহ রবি ইত্যাদি।

বিয়ের ব্যাপারে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়। পাত্র বা পাত্রীর কী গণ। বস্তুত এই গণ তিন রকমের হয়– (১) দেবগণ, (২) নরগণ, (৩) দেবারিগণ বা রাক্ষসগণ। কী গণ সেটা নির্ভর করবে পাত্র বা পাত্রীর কোষ্ঠীতে চন্দ্র কোন্ নক্ষত্রে আছে তার উপরে। চন্দ্র যে যে নক্ষত্রে থাকলে ঐ তিন গণ হয় সেটা নীচে দেওয়া হল–

(১) দেবগণ : অশ্বিনী, মৃগশিরা, পুনর্বসু, পুষ্যা, হস্তা, স্বাতী, অনুরাধা, শ্রবণা ও রেবতী।

(২) নরগণ : ভরণী, রোহিণী, আদ্রা, পূর্বফাল্গুনী, উত্তরফাল্গুনী, পূৰ্বাষাঢ়া, উত্তরাষাঢ়া, পূর্বভাদ্রপদ ও উত্তরভাদ্রপদ।

(৩) রাক্ষসগণ : কৃত্তিকা, অশ্লেষা, মঘা, চিত্রা, বিশাখা, জ্যেষ্ঠা, মূলা, ধনিষ্ঠা ও শতভিষা।

সূর্যের গতিপথকে যেমন ১২ ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগের নাম রাখা হয়েছে রাশি, তেমনই চন্দ্রপথকে ২৭ ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগের নাম রাখা হয়েছে। নক্ষত্র। বিভিন্ন দেশে এই চন্দ্রনিবাসসমূহের নাম বিভিন্ন। যেমন গ্রিসে এই ধরনের কোনো চন্দ্রনিবাসের কল্পনাও করা হয়নি। সাধারণত দেখা যায় ২.২৫ নক্ষত্রে এক রাশি হয়। আগেই বলা হয়েছে যে ১২টি রাশি ২৪ ঘণ্টায় ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আসছে। অর্থাৎ একটি রাশি সরে গিয়ে পরের রশিটি উদয় হতে সময় লাগে ২ ঘণ্টা। এই রাশিগুলি মেষ থেকে শুরু হয় এবং এক-একটি রাশির ব্যাপ্তি ৩০ ডিগ্রি করে। সাধারণত পূর্ব ভারতে যে পদ্ধতি অনুসরণ করে এই রাশিগুলিকে সাজানো হয় মেষ থেকে শুরু করে বামাবর্তে (anti clockwise) পরপর এগিয়ে যেতে হবে। রাশিগুলি হল– মেষ (Aries), বৃষ (Taurus), মিথুন (Gemini), কর্কট (Cancer), সিংহ (Leo), কন্যা (Virgo), তুলা (Libra), বৃশ্চিক (Scorpio), ধনু (Sagittarius), মকর (Capricorn), কুম্ভ (Aquarius) ও মীন (Pisces)। এই রাশিগুলির প্রত্যেকটির একটি করে অধিপতি গ্রহ বা lord আছে। যেমন– মেষ ও বৃশ্চিকের অধিপতি মঙ্গল, বৃষ। ও তুলার অধিপতি শুক্র, মিথুন ও কন্যার অধিপতি বুধ, কর্কটের অধিপতি চন্দ্র, সিংহের অধিপতি রবি, ধনু ও মীনের অধিপতি বৃহস্পতি এবং মকর ও কুম্ভের অধিপতি শনি। যেটা দাঁড়াল তা হল মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনি– এদের প্রত্যেকটির দুটি রাশির উপর আধিপত্য আছে। কিন্তু চন্দ্র ও রবি কেবল একটি করে রাশিরই অধিপতি। রাহু ও কেতু কোনো রাশির অধিপতি নয়। তবে তাদের বলাবল নির্ণয়ের জন্য কয়েকটি রাশিকে তাদের স্বক্ষেত্র, মূলত্রিকোণ ও তুঙ্গস্থান হিসাবে ধরা হয়। আকৃতি ও গুণ অনুযায়ী রাশিগুলিকে অগ্নি, পৃথ্বী, বায়ু, জল এই চারভাগে ভাগ করা হয়। আবার চর, স্থির ও দ্যাত্মক এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। মেষ থেকে শুরু করে রাশিগুলিকে অগ্নি, পৃথ্বী, বায়ু, জল অথবা চর, স্থির, দ্যাত্মক হিসাবে পর পর ভাগ করে যেতে হবে। অর্থাৎ মেষ, সিংহ, ধনু হল অগ্নি রাশি (Fiery Signs); বৃষ, কন্যা, মকর পৃথ্বী রাশি (Earthly Signs); মিথুন, তুলা, কুম্ভ বায়ু রাশি (Airy Signs) এবং কর্কট, বৃশ্চিক ও মীন জল রাশি (Watery Signs)। অন্য রকম বিভাগে, মেষ, কর্কট, তুলা, মকর চর রাশি (Movable Signs); বৃষ, সিংহ, বৃশ্চিক, কুম্ভ স্থির রাশি (Fixed Signs) এবং মিথুন, কন্যা, ধনু ও মীন দ্যাত্মক রাশি (Common Signs)। ফলাফল বিচারে জ্যোতিষীরা রাশিগুলির এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে অনেক সময় কাজে লাগায়। রাশিগুলির অন্য একটি শ্রেণিবিভাগ হল পুরুষ রাশি (Masculine Signs) ও স্ত্রী রাশি (Feminine Signs)। বিজোড় সংখ্যার যে রাশিগুলি অর্থাৎ মেষ, মিথুন, সিংহ, তুলা, ধনু, কুম্ভ– এই ছয়টি পুরুষ রাশি এবং বৃষ, কর্কট, কন্যা, বৃশ্চিক, মকর ও মীন– এই ছয়টি স্ত্রী রাশি। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী একজন জাতকের রাশি নির্নয় করা হয় তার জন্মমূহুর্তে সূর্য যে রাশিতে অবস্থান করে। তাদের মতে এই রাশি অনুযায়ী নাকি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয়। তাহলে ভুলটা কোথায়! দৈনিক-সাপ্তাহিক পত্রিকায় রাশিফল বিভাগে প্রথম যে রাশিটি আমরা দেখি সেটি হল মেষ রাশি (২১ মার্চ থেকে ২০ এপ্রিল সময়ে জন্মগ্রহণকারীরা এই রাশির জাতক)। বর্তমান শতকে তথা এই সময়ে সূর্য মেষ রাশিতে নয়, মীন রাশিতে অবস্থান করে। এই গোলমাল অবশ্যই অন্য রাশির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই গোলমালের মূল কারণ হল পৃথিবীর ‘অয়নচলন’। বিষুববৃত্ত ও ক্রান্তিবৃত্ত ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে পৃথক এবং এই বৃত্ত দুটি পরস্পরকে দুটি বিন্দুতে ছেদ করে। এই বিন্দু দুটিকে বলা হয় মহাবিষুব এবং জলবিষুব বিন্দু। আরও সহজ করে যদি বলি, তা হল ‘খ’ গোলকে এই দুটি বিন্দু হচ্ছে বছরে দু-দিন বিষুববৃত্তের উপর সূর্যের অবস্থান। এই দুই দিন হল ২১ মার্চ (দিন ও রাত্রি সমান) এবং ২৩ সেপ্টেম্বর। মহাবিষুব বিন্দুকে ক্রান্তিবৃত্তের শূন্য ডিগ্রি বিন্দু বা প্রারম্ভ বিন্দু ধরা হয়। এই কারণেই ২০০০ বছর আগে ২১ মার্চ এই মহাবিষুব বিন্দু হতে পরবর্তী ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত সূর্য মেষ রাশিতে অবস্থান করত বলেই মেষ রাশিকে রাশিচক্রের প্রথম রাশি ধরা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রতিবছর এই বিষুব বিন্দুদ্বয় তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। প্রতি ৭২ বছরে এই বিন্দু দুটির ১ ডিগ্রি করে অগ্রগমন ঘটে এবং বর্তমান অবস্থায় ফিরে আসতে তাদের লাগবে ঠিক ২৬ হাজার বছর। বিষুব বিন্দুদ্বয়ের এই চলনকেই বলে ‘অয়নচলন’ কেন এমনটি ঘটে? এর কারণ হল পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের স্বল্প গতির ঘূর্ণন। পৃথিবী যেমন নিজ অক্ষে ঘুরে চলছে, তেমনই এর ঘূর্ণন অক্ষটিও নিজ অবস্থান থেকে নিয়মমতোই সরে যাচ্ছে। এই ঘূর্ণন অক্ষটি প্রতি ২৬ হাজার বছরে একবার পূর্ণ ঘূর্ণন সম্পন্ন করে। পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের এই সরণের ফলে ক্রান্তিবৃত্তেরও সরণ ঘটছে এবং এর ফলেই বিষুব বিন্দুদ্বয়ের “অয়নচলন ঘটছে। ঘূর্ণন অক্ষের সরণের ফলে কিছু চমকপ্রদ ঘটনাও ঘটে। যেমন উত্তর আকাশে বর্তমানে যে স্থানে ধ্রুবতারা। দেখি ১৩ হাজার বছর পর সেখানে বীণা মণ্ডলের অভিজিৎ নক্ষত্রটিকে দেখা যাবে এবং এরও ১৩ হাজার বছর পর সেখানে পুনরায় ধ্রুবতারাকে দেখা যাবে। তাহলে এখন প্রশ্ন হল অয়নচলনের সঙ্গে রাশিচক্রের রাশির অবস্থান পরিবর্তনের সম্পর্কটা কী? আজ থেকে ২০০০ বছর আগের কোনো একসময় রাশিচক্র তৈরি হয় তখন সূর্য ২১ মার্চ তারিখে সূর্য মেষ রাশিতে প্রবেশ করত, যা টলেমির ‘টেট্রাবিবলস’ থেকে জানা যায়। টলেমে তাঁর ‘টেট্রাবিবলস’-এ। বলেছেন “সূর্য তখন ২১ মার্চ তারিখে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে এবং ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করত। কিন্তু আজ ২০০০ বছর পর মহাবিষুব বিন্দুর প্রায় ২৭ ডিগ্রি সরণের ফলে সূর্য এখন ২১ মার্চ মীন রাশিতে (নক্ষত্রমণ্ডল) প্রবেশ করে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করে এবং ১৪ এপ্রিলে গিয়ে সূর্য মেষ রাশিতে প্রবেশ করে। রাশিচক্রের অন্যান্য রাশির ক্ষেত্রে একই অবস্থা এবং রাশিগুলিতে সূর্যের অবস্থানের সময় কালেরও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। যেমন সূর্য কন্যা রাশিতে অবস্থান করে ৪৪ দিন, আবার বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থান করে মাত্র ৭ দিন। জ্যোতিষ মতে জন্মমুহূর্তে সূর্যের অবস্থানই মানুষের রাশি নির্ণয় করে। এই শাস্ত্র (?) মতে ১ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী হবে সিংহ রাশির, তবে বর্তমানে এইদিন সূর্য অবস্থান করে কর্কট রাশিতে। জ্যোতিষের সব্বোনাশ এখান থেকেই, অর্থাৎ একই ব্যক্তি একই সঙ্গে আলাদা-আলাদাভাবে দু-ধরনের ভাগ্যর অধিকারী হবেন। এমনকি কারও জন্ম যদি ২৯ নভেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে হয়, তাহলে তার জন্য বর্তমানে রাশিচক্রের কোনো রাশিই বরাদ্দ নেই। কারণ এইসময় সূর্য সর্পধারী নক্ষত্রমণ্ডলে (ophiucus) অবস্থান করে। তাই কারও সঙ্গে যদি পত্রিকার রাশিফল বা কোনো জ্যোতিষীর ভবিষৎবাণী কাকতালীয় ভাবে মিলেও যায়, তাহলে তৃপ্তির পাওয়ার কিছু নেই, কারণ আপনি নিজেকে যে রাশির জানেন আদতে আপনি মোটেও সেই রাশির নন।

জ্যোতিষীদের ভাগ্যগননার আর-একটি বড় উপাদান হল গ্রহ ও তাদের অবস্থান। জ্যোতিষ মতে গ্রহ-নক্ষত্রদের সময় ভেদে অবস্থানের উপরেই নাকি অর্থপ্রাপ্তি, ব্যাবসার লাভ-ক্ষতি, মামলা-মোকদ্দমায় হারা-জেতা, সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনা, স্বামীর পরস্ত্রীতে অনাসক্ত হওয়া, বিদেশ গমন, দুরারোগ্য অসুখ নিরাময়, প্রেমে জয়ী হওয়া, না-হওয়া বিয়ে হওয়া, পরীক্ষায় পাশ/ফেল ছাড়াও ইহ জাগতিক সকল কর্মই নির্ভর করে। তাহলে এখন খালি চোখে তাদের দাবিগুলির আসড়তাটা স্পষ্ট হয়। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্রহের সংখ্যা হাজারেরও উপরে। আর সেখানে জ্যোতিষীদের গণনায় আছে শুধুমাত্র প্রাচীন পৃথিবীর আবিষ্কৃত সেই ৫টি গ্রহ। আর ইউরেনাস ও নেপচুনকে তাদের এই গণনায় খুঁজে পাওয়া না গেলেও রাহু কেতু নামে দুটি কাল্পনিক গ্রহকে তাদের গণনায় পাওয়া যায়, সে তো আগেই বলেছি। মহাবিশ্বের এত গ্রহের মাঝে জ্যোতিষীরা গ্রহ স্বল্পতায় পরে সূর্যকে একটি গ্রহ হিসেবেই বিবেচনা করে! বাস্তবিক অর্থে গ্রহনক্ষত্রগুলির কোনো শক্তি বা বলের এমন কোনো প্রভাবই নেই, যা মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর পৃথিবীর উপর যদি কোনো বলের প্রভাব থেকে থাকে, তা হল মহাকর্ষীয় বল। তবে গ্রহনক্ষত্রগুলি পৃথিবী থেকে এত দূরে যে তারা পৃথিবীর উপর মহাকর্ষীয় বা অভিকর্ষজনিত যে বল বা শক্তি প্রয়োগ করে তার পরিমাণ অতি নগণ্য। তাই কারও জন্মমুহূর্তে গ্রহনক্ষত্রের আকর্ষণ বলের ক্রিয়া জন্মগ্রহণকারীর ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনটি ভাবার কোনো যুক্তি নেই। প্রাচীনকালে মানুষ আকাশের বিভিন্ন অংশের এলোমেলো নক্ষত্রগুলির মাঝে তাদের ঘটমান জীবনের পরিচিত বিষয়ের সঙ্গে সাদৃশ্য খোঁজ করত বলেই কোনো নক্ষত্রমণ্ডলকে মেষের মতো আবার কোনো নক্ষত্রমণ্ডলকে কন্যা ইত্যাদি রূপে কল্পনা করেছিল। তাই বর্তমান সময়ে নক্ষত্রমণ্ডলগুলির নাম ও কল্পিত চিত্রগুলি তাদের মতোই রয়ে গিয়েছে। অবশ্য অন্য কিছু খুঁজেও পেতে পারি।

বাকি রইল লগ্ন। প্রতিটি লগ্নের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে জ্যোতিষের বইগুলিতে অনেক বিস্তৃত ভাবে লেখা আছে। কোষ্ঠী বিচারের ক্ষেত্রে জ্যোতিষীরা লগ্ননির্ণয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। জ্যোতিষীদের মতে বারোটি পরপর পূর্ব দিগন্তে উদিত হয় এবং ক্রমাগত পশ্চিমগামী হয়ে অবশেষে পশ্চিম দিগন্তে অস্ত যায়। আসলে পৃথিবীর আবর্তনের জন্যই এরকম মনে হয়। যেহেতু পৃথিবী ২৪ ঘণ্টায় একবার আবর্তন সম্পূর্ণ করে। সেই কারণেই পূর্বদিকে এক-একটি রাশির স্থায়িত্বকাল ২ ঘণ্টা। সকাল ৬ টায় পূর্বদিকে যদি মেষ রাশি উদয় হয় তবে সেটি ৮ টা পর্যন্ত থাকবে, ৮ টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত পূর্বদিকে থাকবে বৃষরাশি, ১০ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত পূর্বদিকে থাকবে মিথুন রাশি– এইভাবে দুই ঘণ্টা অন্তর একটি করে রাশি মিলবে, মোট ১২ রাশি। জ্যোতিষ মতে, বৈশাখ মাস থেকে শুরু করে চৈত্রমাস পর্যন্ত সূর্যোদয় মেষ থেকে শুরু করে মীন রাশিতে হবে। যেটি দাঁড়াল– বৈশাখ মাসে সূর্যোদয়ের সময় পূর্বদিকে থাকবে মেষ রাশি, জ্যৈষ্ঠ মাসে সূর্যোদয়ের সময় পূর্বদিকে বৃষ রাশি থাকবে ইত্যাদি। জাতকের জন্মের সময় যে রাশিটি থাকে, সেটিই হল জাতকের লগ্ন, জন্মলগ্ন। তবে এগুলি যে সবার ক্ষেত্রে নির্ভুল ভাবে মিলবে এমন কোনো কথা নয়। গ্রহের বল ও অবস্থান অনুযায়ী বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হতে পারে বলে জ্যোতিষীরা বলে থাকেন। তাই মিলতেও পারে, আবার নাও মিলতে পারে। কারণ কোনো জাতকের চেহারা বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শুধু লগ্ন কোন রাশিতে তার উপর নির্ভর করে না। বিভিন্ন গ্রহের বল ও অবস্থানের উপর সেটা অনেকাংশেই নির্ভরশীল বলে জ্যোতিষীরা মনে করেন। বস্তুত এই নক্ষত্র, রাশি, মাসই হল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিষয়-আশয়। আর জ্যোতিষীরা এইসব গ্রহনক্ষত্র দিয়ে ছলনার কাজে লাগান, প্রতারণার কাজে লাগান, বুজরুকির কাজে লাগান। মানুষজনদের মাথা মোড়াতে সুবিধা হয়। বোঝাতে চায় –দেখো, আমরা কেমন বিজ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যদ্রষ্টা। প্রতারণার অভিযোগে চিটফান্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হলে জ্যোতিষীদের গ্রেফতার করা হবে না কেন?

জ্যোতিষীবাবুদের গ্রহ, নক্ষত্র, রাশি, লগ্নের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

(১) ১৮ ডিগ্রির এক টুকরো আকাশে যদি ১২ টি রাশি থাকে, তাহলে ৩৬০ ডিগ্রি আকাশে ডিগ্রির আকাশে কত লক্ষ রাশি থাকতে পারে ভাবুন। তবে তো খুব ভয়ানক ব্যাপার, এত লক্ষ লক্ষ রাশির প্রভাব হিসাবে উচিত নয়? জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকেন।

(২) জন্মকালে চন্দ্র যে রাশিতে থাকে সেটিই জাতকের রাশি বলা হয়। শুধু চন্দ্র কেন, সৌরজগতে তো আরও অসংখ্য গ্রহ আছে উপগ্রহ আছে –সেগুলি বিচার্য নয় কেন? জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকেন।

(৩) জাতকের জন্মসময় কোনটি? এটা বড় গোলমেলে ব্যাপার! কেউ মনে মনে করেন মাতৃজঠরে জ্বণের প্রথম দিন, কেউ মনে করেন মাতৃজঠরে থাকাকালীন যেদিন শরীরে প্রাণসঞ্চার হয়, কেউ মনে করেন যেদিন শিশু মাতৃগর্ভ ত্যাগ বেরিয়ে আসে, আবার কেউ মনে করেন শিশুর নাড়ি কাটার সময়, কেউ আবার এত ঝামেলায় না-গিয়ে চিকিৎসকের দেওয়া সার্টিফিকেটের জন্মসময় গ্রাহ্য করে –এক্ষেত্রে আবার সংশয়, চিকিৎসক বা চিকিৎসা-কর্মীরা যে সময় নথিভুক্ত করেছেন সেটা কতটা অথেনটিক! যাই হোক, জ্যোতিষীবাবুরা কোন জন্মসময় বিচার করে জাতকের কোষ্ঠী বিশ্লেষণ করবেন? ভিন্ন ভিন্ন। সময়কে জন্মসময় ধরলে ভিন্ন কোষ্ঠী বিচার হবে না? হবেই তো। রাশির অবস্থান পালটালে নির্ণয়ও পালটাতে বাধ্য। এক্ষেত্রে অবশ্য জ্যোতিষীবাবুরা বলেন, লগ্ন পরিবর্তনের সন্ধিকাল ব্যতীত লগ্ন-মধ্যবর্তী সময়ে গ্রহ-নক্ষত্রের সন্নিবেশের এমন কিছু তারতম্য হয় না, ফলে রাশি পালটে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ও মা, সে কি কথা! যদি জমজ সন্তান হয়? তাদের কোষ্ঠীবিচার তো একই হবে। মানে তারা একই সময়ে পটি করতে যাবে, একই শিক্ষকের কাছে পড়বে, একইরকম বিদ্বান হবেন, একই ক্লাসে পড়া শেষ করবে, একই জায়গায় একই চাকরি করবে, একই মেয়ে বা ছেলেকে বিয়ে করবে, একই দিনে একই সময়ে একই কারণে মরবে –তাই-ই হবে, জ্যোতিষ বিজ্ঞান হলে। হয় কী? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় জন্মানোর পরপরই একটি সন্তান মারা যায়। তাহলে একই লগ্ন, একই গ্রহস্থান, একই রাশিচক্র হওয়া সত্ত্বেও দুইজন জাতকের আয়ুষ্কাল দুই রকমের হবে কেন? তাহলে কী পৃথিবীর সকল জমজ জাতকই লগ্ন পরিবর্তনের সন্ধিকালে জন্ম নেয়? জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? অবশ্যই নিরুত্তর থাকেন।

(৪) পুব আকাশে রাশি উদয় হয়–এই বিষয়টি এক্কেবারেই আপেক্ষিক। বস্তুত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থানীয় সূর্যোদয়কাল বিভিন্ন হওয়ার ফলে পুবদিকে উদিত রাশিটি ভিন্ন হবে। ফলে একই সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জন্মানো জাতকের লগ্ন বিভিন্ন রকমই হবে, কোষ্ঠীও হবে বিভিন্ন। অতএব একই সময়ে জন্মানো সত্ত্বেও আলাদা আলাদা জাতকের আলাদা লগ্নফল এবং কোষ্ঠীচক্র হবে না, তাই তো? জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকেন।

(৫) জ্যোতিষীদের যে শাস্ত্র, তা ভূকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বকে মেনে চলে। অর্থাৎ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য সহ সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্ররা ঘুরপাক খাচ্ছে। এ তত্ত্ব তো অচল তত্ত্ব, আস্তাকুড়ে তার ঠিকানা। এই ধরনের তত্ত্ব কে. সি. পালের মতো বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে পারেন, যারা ভাঙা রেকর্ডের মতো এখনও চলেছেন ‘সূর্য পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে’। এই তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে থাকলে জ্যোতিষকে বিজ্ঞান বলতে অসুবিধা আছে। ভুল হবে রাশি-গ্রহের অবস্থান। সঠিক হবে না রাশিচক্র, কোষ্ঠী-ঠিকুজি। এ তত্ত্ব সঠিক হলে গ্রহ-উপগ্রহগুলিতে মহাকাশযান কিংবা কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানো সম্ভব হত না। ওই তত্ত্ব ভুল, তাই জ্যোতিষ ভুল। জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকেন।

(৬) কোষ্ঠী দেখে জ্যোতিষীবাবুরা যোটক বিচার করে। অর্থাৎ পাত্রপাত্রীদের রাজযোটক হলে দাম্পত্যজীবন বড়োই সুখময় হয়!!! যোটক বিচার কাকে বলে? এককথায় –“বিবাহের পূর্বে পাত্র এবং পাত্রীর পরস্পরের জন্মরাশ্যাদি থেকে যে শুভাশুভ বিচার করা হয়, তাকে রাজযোটক বলে”। এই বিচার আট প্রকার, অর্থাৎ আট প্রকারের কূট। কূট’ কথাটির অর্থ জটিল। জ্যোতিষীবাবুরা প্রবল কূট বলে দু-হাতেই আট প্রকারের কূট’ সামাল দিতে পারেন। এই কূটগুলি হল– বর্ণকূট, বশ্যকূট, তারাকূট, যোনিকূট, গ্ৰহমৈত্রীকূট, গণমৈত্রীকূট, রাশিকূট এবং ত্রিনাড়িকূট। এদের আবার ‘গুণ’ আছে। বর্ণকূট’ থেকে ‘ত্রিনাড়িকূট’ পর্যন্ত গুণ হবে ১,২,৩ ইত্যাদি। মোট নম্বর ৩৬-এর মধ্যে ১৮ নম্বর পেতেই হবে, আর তা না-হলে ডাহা ফেল। যদি ৩০-এর উপর নম্বর হয় তাহলে লেটার মার্কস হবে। একটু ‘যোনিকূট’ নিয়ে বিশ্লেষণ করা যাক –যোনি চোদ্দ প্রকার। দুটি করে নক্ষত্র নিয়ে এক-একটি যোনি। অভিজিৎ নক্ষত্রকে ধরে নক্ষত্রের সংখ্যা ২৮। অবশ্য সবকটি যোনিই ইতর-যোনি, অর্থাৎ ঘোড়াযযানি, মোষযযানি, বাঘযোনি, সিংহযোনি, হাতিযোনি, কুকুরযোনি, বেড়ালযোনি, ইঁদুরযোনি, বানরযোনি ইত্যাদি। না, মানুষের জন্য মনুষ্যযোনি নেই। তামাম মনুষ্যকুল ইতর-যোনির অংশ। ছাগল, কুমির, হাঙ্গর, গোরিলা, গোসাপ, শিম্পাঞ্জি, টিকটিকিদের কি যোনি নেই!

আমার বিয়ের সময় আমার শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিস পাত্রের কোষ্ঠী দেখাতে হবে। বড়ই বিপদে পড়ে গেল আমার অভিভাবক। কারণ আমার কোনো কোষ্ঠী-ঠিকুজি ছিল না। অতএব জ্যোতিষে শরণাপন্ন। জ্যোতিষীকে বলে আমার একটা ‘রাজযোটক’-এ মিল হয়েছে এমন একটা কিছু করিয়ে আনা হল। কেল্লা ফতে, বিয়ে পাক্কা। আদতে আমার রাশি, লগ্ন, কোষ্ঠী কিছুই নেই– তার আবার রাজযোটক! আমার ১২ বছরের সংসার দিব্য চলছে। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড়ো মেয়ের বিয়ে ছিল রাজযোটক। ভাটপাড়ার জনৈক জ্যোতিষী মেয়ে আর হবু জামাইয়ের কোষ্ঠীবিচার করে সেটাই বলেছিলেন। রাজযোটকের বিয়ে, তা সত্ত্বেও বিয়ের দুই বছরের মধ্যেই বঙ্কিমচন্দ্রের বড়ো মেয়ে বিধবা হয়ে যান। এরকম হাজার হাজার দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা যায়, যেখানে রাজযোটক হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে অকালে নষ্ট হয়ে গেছে। জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকেন।

(৭) একদা, মানে দেড়শো বছর আগে পর্যন্ত জ্যোতিষীবাবুরা বলবান সপ্তমপতি কেন্দ্রে কোণে থাকলে বাল্যবিবাহের নিদান দিতেন। তাই ওই সময় প্রায় সকল মেয়েদেরই বলবান সপ্তমপতি কেন্দ্রে কোণে থাকার ফলে বাল্যবিবাহ হত। ১৯৯৯ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ১৯৯৯’ চালু হওয়ার পর থেকে বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়ে গেল। বলবান সপ্তমপতি গেল কোথায়? কেন্দ্রের কোণে আর থাকেন না? গেছে। ভুল। জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকবেন।

“পৃথিবীর ১০জন সেরা মনীষীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের দেখা সবচেয়ে অপদার্থ জিনিসটিকে নিয়ে আসতে বলুন। দেখবেন, সবাই একজন করে জ্যোতিষীকে ধরে এনেছেন।” –বলেছেন গটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতজ্ঞ ডেভিড হিলবার্ট। না-হলে কয়েকশো কোটি বছর সৃষ্ট গ্রহ-নক্ষত্রকে দিয়ে মানুষের ভাগ্য নির্ণয় করে! মানুষের সৃষ্টি তো কয়েকশো কোটি বছর নয়!!! বর্তমানে সূর্যের বয়স প্রায় ৫০০ কোটি বছর। চন্দ্র বা চাঁদের বয়স পৃথিবীর বয়সের প্রায় সমান, যা প্রায় ৪.৬ কোটি বছর। পৃথিবীতে প্রাপ্ত উল্কার বয়স ৪.৩ কোটি থেকে ৫ কোটি। মহাবিশ্বে এরকম ব্রহ্মাণ্ডের সংখ্যা কম নয়। এখনও পর্যন্ত ১০০টি ব্রহ্মাণ্ডের সন্ধান পাওয়া গেছে। আমাদের ব্রহ্মাণ্ড ছাড়া খালি চোখে আর মাত্র ৩টি ব্রহ্মাণ্ড দেখা সম্ভব। এই ৩টির মধ্যে ২টি দক্ষিণ গোলার্ধে, আর-একটি মাত্র উত্তর গোলার্ধে। ২০ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত শেষের ব্রহ্মাণ্ডটির নাম দেওয়া হয়েছে অ্যানড্রোমিডা (Andromeda)। একটি ব্ৰহ্মাণ্ড থেকে আর-একটি ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যবর্তী অংশের নাম ‘আন্তব্রহ্মাণ্ড মহাকাশ’। এই শতাধিক ব্ৰহ্মাণ্ড ও আন্তর্বহ্মাণ্ড মহাকাশ নিয়েই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। নানা পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, ব্রহ্মাণ্ড জোটবদ্ধ অবস্থায় আছে। প্রতিটি ব্ৰহ্মাণ্ড জোট অপর প্রতিটি জোট থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। দূরত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেগও বৃদ্ধি পায়। ব্রহ্মাণ্ডের এহেন অস্থির গ্রহ-নক্ষত্র নিয়েই জ্যোতিষীবাবুদের কারবার। জ্যোতিষীবাবুরা এখানেই থেমে থাকেননি –তাঁরা রাজা-উজির, জীবজন্তু, জীবজন্তু, পশুপাখি, বৃক্ষলতা, পাহাড়-পর্বত– এমনকি ভারতের ভাগ্য, পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যও বলে দেওয়ার সাহস রাখে –আবার দিল্লির সিংহাসনে কে বসবেন, পশ্চিমবঙ্গের মসনদের কে উপবেশন করবেন তাও বলে থাকেন –অনেকটা সাপ মরবে লাঠি ভাঙবে না কায়দায়– যদিও এ যাবৎকাল পর্যন্ত সবই ভুলভাল বলেছেন। জ্যোতিষীবাবুরা জানেন লাগলে রাতারাতি বিখ্যাত, না-লাগলে কেউ ফাঁসি তো দূরের কথা, কেউ কৈফিয়তই নেবে না।

জ্যোতিষীর জ্যোতিষী সেরা জ্যোতিষী হলেন বি. ভি. রমন। ইনি ‘অ্যাস্ট্রোলজিক্যাল ম্যাগাজিন’ নামে পত্রিকাও করেন। এহেন জ্যোতিষীর কয়েকটি ঐতিহাসিক ভাগ্যনির্ণয় এখানে উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। ১৯৭৯ সালে অ্যাস্ট্রোলজিক্যাল ম্যাগাজিনে লিখলেন, “জনতা দল সরকারের উপর এখন বৃহস্পতির কোনো ক্রোধ নেই। ফলে জনতা সরকার এবারের মতো টিকে যাবে।” দেশের রাজনীতির খবর যাঁরা রাখেন তাঁরাই জানেন জনতা সরকারের কী হাল হয়েছিল। ১৯৮০ সালে লেখা হল, “তিন গ্রহের যা অবস্থান দেখছি তাতে দিল্লিতে পাকাঁপোক্ত সরকার হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।” সেবার ইন্দিরা গান্ধি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জিতলেন। তাঁর দল ব্যাপক ফল করল। সরকার হল পাকাঁপোক্তই। রাজনীতির এলেম না-থাকলে এরকম ভুলভাল ভবিষ্যৎ বাণীই হয়। ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের ভবিষ্যৎ কী যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে বিনা জ্যোতিষ গণনায় বলে দেওয়া যায়– “২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলই দ্বিতীয়বার সরকার গড়বে, কোনো অঘটন ছাড়াই। আসন সংখ্যা গতবারের থেকে বাড়ার সম্ভাবনা।” এটা বলার জন্য জ্যোতিষবিদ্যা-গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান জানার প্রয়োজন নেই। এমনকি এও বলা যায় –“আগামী লোকসভা নির্বাচনে দিল্লির মসনদে বিজেপি সরকারের দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করার সম্ভাবনা, যদি কোনো অঘটন না ঘটে।” বলা যায়– “আগামী বছর অতি বর্ষণের সম্ভাবনা। মুম্বাই, কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলমগ্ন হতে পারে। আগামী বছর বেশ কিছু নক্ষত্রপতনের যোগ আছে” ইত্যাদি। ফললে নিশ্চয় আমার পসার বাড়বে, না ফললে কে মনে রাখবে! মানুষের ক্ষেত্রেও প্রায় ৮০% মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব বিনা জ্যোতিষবিদ্যায়। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা আছে। যে ভবিষ্যদ্বাণীটি আমি উল্লেখ করলাম, সেটিতে তথাকথিত কোনো অ্যাস্ট্রোলজিক্যাল ক্যালকুলেশন নেই, আছে পলিটিক্যাল ক্যালকুলেশন। এইভাবে অনেক কিছুরই ক্যালকুলেশন করে বলা সম্ভব হতে পারে। তার জন্য জ্যোতিষ, জ্যোতিষবিদ্যা, জ্যোতিষ-গণনার প্রয়োজন পড়বে না। তবে মিলতে পারে, নাও মিলতে পারে। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু বলেছিলেন–”যেটা মেলে সেটাই বিশ্বাস করি। আর যেটা মেলে না সেগুলি ভুলে যাই।” এ প্রসঙ্গে আরও একটু বলতে পারি। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথের জন্য তাঁর বাড়িতে একটা কোষ্ঠী করা হয়েছিল। সেই কোষ্ঠীতে বলা হয়েছিল– মঙ্গলের যা অবস্থান, তাতে সত্যেন্দ্রনাথের পড়াশোনা হবে না। কোষ্ঠীকে উড়িয়ে দিয়ে হিন্দু স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক তাঁকে ১০০-র মধ্যে ১১০ দিয়েছিলেন। এই মহাবিশ্বের মৌলকণা তাঁর নামেই ‘বোসন’ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। পরের ঘটনা তো ইতিহাস, সবাই জানেন। সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যয় বলেছেন– “জ্যোতিষশাস্ত্রের গণনার উপর কিছুমাত্র বিশ্বাস করিবে না। আমি উহার অনেক পরীক্ষা করিয়া এক্ষণে ইহাতে বিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়াছি।” একদা জ্যোতিষী বিশ্বাসী বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সংগ্রহের সমস্ত জ্যোতিষ বিষয়ক বইপত্র আগুনে পুড়িয়ে দেন।

জ্যোতিষীবাবুদের ভবিষ্যত বাণী যে বহুবার মিথ্যা হয়েছে তার ঝুড়ি ঝুড়ি প্রমাণ আছে। মানুষ সেসব ভুলে যাবে কেন?! জ্যোতিষীবাবুরা অনেক সময় অনেক প্রমাণ-ট্রমাণ দিয়ে আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে আসলেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। যে যত যুক্তি দিক, আর না-দিক– সত্যি কিন্তু পৃথিবী একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সেটা জ্যোতিষীবাবুরা বাণী না-ছাড়লেও হবে। এখন এমন দশটি ভবিষ্যৎ বাণীর কথা বলব যেগুলি বিশ্বজুড়ে আতঙ্কিত এবং আলোড়িত হয়েছে, অথচ মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে।

(১) অপ্রামাণ্য রচনা (The Apocrypha), এই ভবিষ্যৎ বাণীটি করা হয়েছিল ১০০০ সালে। ইঞ্জিল শরিফের কয়েকটা লাইনের উৎস ধরে সবার মধ্যে আতঙ্ক ভাইরাল হয়ে যায় যে, ঈসার মৃত্যুর পর এক প্রজন্ম পরে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। কী ছিল ইঞ্জিল শরিফের সেই লাইনটি?– “Christ would be back in generation and that the genetation shall not pass.” opette, “জিশু আবার ফিরে আসবেন আগামী প্রজন্মে। এবং সেই প্রজন্ম পরিত্রাণ পাবে না“। তৎকালীন সময়ে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী চার্চ থেকে অর্থের বিনিময়ে মানুষেরা নিজেদের জন্য স্বর্গে জমি কিনে রাখতে পারতেন এবং মানুষজন সংশ্লিষ্ট চার্চে অর্থ প্রদান পাপ থেকে মুক্তি পেলেন বলে বিশ্বাস করতেন। যেহেতু সেসময় পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এমন ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়েছে, সেইহেতু অনেকেই নিজেদের সর্বস্ব সম্পদ বিক্রিবাটা করে চার্চে অনুদান দিয়ে পাপমুক্তির হিড়িক পড়ে গেল। সেই সুযোগে এক লপ্তে চার্চগুলিতে কোটি কোটি টাকা রোজগার হয়েছিল, বলাই বাহুল্য। যেহেতু সেসময়ে ঘড়ি বা ক্যালেন্ডার সহজলভ্য ছিল না, তাই সাধারণ মানুষ ধ্বংসের দিন হিসাবের জন্য মহান চার্চের উপরই নির্ভর করত। তখনকার দিনে পোপ/পাদরিদের বাণী বা ঘোষণাই ছিল শেষ কথা। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পৃথিবী ধ্বংসের ভবিষ্যৎ বাণী। শুনিয়ে প্রচুর অর্থ কামিয়ে নয়েছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

(২) “The Watchtower Society” এক ধরনের অদ্ভুত সোসাইটি। এরা অনেকবার পৃথিবী ধ্বংসের তারিখ নির্ধারণ করছে। বারবার মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, তবুও নিয়ম করে ভবিষ্যৎ বাণী আওড়াতে কখনো কার্পণ্য করেনি। আর এমন প্ররোচনাকারী সোসাইটিকে মানুষ বিশ্বাস করে এবং মানুষের এই অটুট বিশ্বাসের জন্য সোসাইটিটি আজও টিকে আছে। ১৮৭৪ সাল, ১৯৪১ সালে পৃথিবী ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট দিন-তারিখ উল্লেখ করেই। আর বারবার সেই ভবিষ্যৎ বাণী ভণ্ডুল হয়েছে। অবশ্য এখন আর দিন-তারিখ নির্দিষ্ট করে ঘোষণা দেন না, একটু সুর পালটে শুধু “পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে”– এটুকু বলে ছেড়ে দেন। এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

(৩) “Heavens Gate’ বা স্বর্গের দরজা বলে পরিচিত এটি এমন একটি সংস্থা, যাঁরা মনে করত পৃথিবীটা সম্পূর্ণ ভিন গ্রহের বাসিন্দা বা এলিয়েন দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। এমন কি সরকারের বেশির ভাগ মনুষই নাকি এলিয়েন! তারা মনে করেছিলেন, ১৯৯৭ সালে এক উল্কাকে অনুসরণ করে এলিয়েনরা পৃথিবীতে আসবে এবং পৃথিবীর সমস্ত মানুষদের ক্রীতদাসে পরিণত করবে। এই দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে একমাত্র উপায় হল আত্মহত্যা করা। এইসব ধারণা বিশ্বাস করে শতাধিক মানুষ আত্মহত্যা করেছিল সে সময়ে। না, ১৯৯৭ সালে পৃথিবীতে একজন এলিয়েন এসেও একজন মানুষকেও দাস করতে পারেনি। এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

(৪) নস্ত্রাদামুস ছিলেন একজন বিখ্যাত গণক, যিনি তাঁর জীবনে অনেক ভবিষ্যৎ বাণী লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি অনেক বড়ো বড়ো ঘটনার ভবিষ্যৎ বাণী আগেই করে দিতেন অনেকে বিশ্বাস করেন। এনার লিপিবদ্ধ হেঁয়ালি পাঠ করে জ্ঞানীরা (?) মর্মোদ্ধার করেছিলেন, ১৯৯৯ সালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না! নস্ত্রাদামুসের তথাকথিত ভবিষ্যৎ বাণী মুখ থুবড়ে পড়ে।

(৫) ওয়াই টু কে (Y2K) মনে পড়ছে? সালটা তখন ২০০০। ২০০০ সালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে এই আশঙ্কা এবং আতঙ্ক নিয়েই জন্ম হল Y2K ধারণা। কোন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা এই ভবিষ্যৎ বাণীর ঘোষক ছিলেন মনে পড়ছে না। যেটা মনে পড়ছে সেটা হল তৎকালীন সময়ে কম্পিউটারে ৯৯ সালের পরে পরের সাল, অর্থাৎ ২০০০ সাল উল্লেখ করা ছিল ০০ দিয়ে। অনেকে ধরে নেন ২০০০ সালে পৃথিবীর সব কম্পিউটার আপনা-আপনি অচল হয়ে যাবে। সযত্নে গচ্ছিত রাখা নিউক্লিয়ার বোমাগুলি এই বিগরে যাওয়া কম্পিউটারের জন্য নিক্ষেপিত হতে থাকবে। এই আতঙ্ক এতটাই ছিল যে, সাধারণ মানুষ তো বটেই, খোদ আমেরিকা সরকার খাদ্য মজুতকরণ, অস্তর মজুত, বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিউক্লিয়ার বোমা দুর্ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার সরঞ্জাম মজুত, পর্যাপ্ত অর্থ জমিয়ে ফেলা যাতে পরবর্তীতে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করা যায় ইত্যাদি। এত শ্রম সবই পণ্ড হল। ২০০০ সাল অতিক্রান্ত হয়ে এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

(৬) ২০১৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরে ধ্বংস হবে পৃথিবী। এমনটাই দাবি ছিল কন্সপিরাসি তাত্ত্বিকদের। তারা দাবি করছেন, তিন মাসের মধ্যেই ধ্বংস হতে চলেছে মানব সভ্যতা। ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ হয়ত আমাদের শেষ দিন। বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে পৃথিবী ধ্বংসের নতুন তথ্য। তাঁদের দাবি, ২০১৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মহাকাশে পৃথিবীর সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে একটি বড়ো গ্রহাণুর। আর এই আঘাতেই শুরু হবে প্রলয়। ধ্বংস হবে পৃথিবীর সাজানো বাগান। পৃথিবী ধ্বংসের এই খবর নাকি আছে পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহের কাছেও ছিল। এই বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য সেইসব দেশের বেশকিছু ক্ষমতাবান ব্যক্তি ঘর গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। এ বিষয়ে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রী লরেন্ত ফ্যাবিয়াস জানান, একটি বড়ো গ্রহাণু পৃথিবীকে আঘাত হানতে পারে। এর ধ্বংসযজ্ঞ হবে কল্পনাতীত। তবে এটি পৃথিবীতে আঘাত হানার আগেই এটিকে ভেঙে ছোটো ছোটো টুকরো করে ফেলার চেষ্টা করা হবে, যেন ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায়। তিনি আরও জানান, এই গ্রহাণুটি আটলান্টিক মহাসাগরে আঘাত হানতে পারে। তবে এই তথ্য সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দিয়েছিলেন নাসা। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন– “তাদের কাছে। পৃথিবীর সঙ্গে কোনো গ্রহাণু বা ধূমকেতুর সংঘর্ষ হওয়ার কোন খবর নেই। এমনকী আগামী একশো বছরেও এইরকম কিছু ঘটবে না।” এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

(৭) এই তো সেদিনের কথা, ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর– এ পর্যন্ত পৃথিবীর ধ্বংসের শেষতম দিন ঘোষণা হল। দামামা বেজে উঠল সমগ্র পৃথিবী জুড়ে। ফেসবুকের কল্যানে এমন একজন মানুষ ছিল না যে জানেন না। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এ সংবাদ ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেল। সেকি তুলকালাম কাণ্ড!!! এ নিয়ে আবার অনেকে কোরান শরিফের সঙ্গে সংখ্যার গুণ/ভাগ করে কত কিছুই-না বানিয়েও ফেলেছিল। এ নিয়ে “২০১২ এবং ইসলাম তথা ইসলাম তথা ১৪৩৩ আরো কিছু অজানা তথ্য” শিরোনামের লেখায় বিস্তর আলোচনাও হল। সব দোষ কিন্তু ওই মায়ানদের। তাদের ক্যালেন্ডার ২০১২ পর্যন্তই ছিল, অর্থাৎ ২০১২ সালের পরে আর কোনো সাল নেই। ২০১২ সালে পৃথিবী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেই বলেই পরের সালগুলি নেই। অবশ্য মায়ানদের এই ভবিষ্যৎ বাণী নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিলই। অতএব এদের ভবিষ্যৎ বাণীও মিথ্যা প্রমাণিত হল।

(৮) ২০১৫ সাল। কেয়ামতের ঘড়িতে (ডুমসডে ক্লক) পৃথিবী ধ্বংস হতে আর মাত্র তিন মিনিট বাকি রয়েছে –এমনই খবর ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে। ওই ঘড়ির কাঁটা তিন মিনিট পার হয়ে মধ্যরাতে, অর্থাৎ ১২টায় পৌঁছোলে মহাপ্রলয়ের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন হবে এ পৃথিবী! একই অবস্থানে রয়েছে কেয়ামতের ঘড়ির কাঁটাটি। সময়টা খুব কম, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এ সময়ের মধ্যে পৃথিবীকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না-নিলে, ঘড়ির কাঁটা পেছনে ফিরিয়ে

আনা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছিল বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে দুটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের দুই বছর পর ১৯৪৭ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সাইন্টিস্ট’ ‘কেয়ামতের ঘড়িটি তৈরি করে। বুলেটিনের পরিচালক পর্ষদ এর দেখভাল করে। এ ঘড়িতে মধ্যরাত হতে যত সময় বাকি, সেটা দিয়ে পরমাণু অস্ত্র, পরিবেশ ও প্রযুক্তিগত হুমকির তীব্রতা বিবেচনা করা হয়। মধ্যরাত হওয়ার অর্থ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া। পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে ঐশ্বরিক কোনো প্রভাব এখানে বিবেচনা করা হয় না। ঘড়িটির নিয়ন্ত্রণকারীরা জানিয়েছিলেন, ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতের দিকে এগিয়ে আসছে, যা মানবজাতির ধ্বংসকে নির্দেশ করে। এটা সত্যিই মানুষের কবর রচনার মতো সংবাদ। বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সাইন্টিস্ট’-এর গবেষক লরন্সে ক্রায়াস বলেছিলেন, “আমরা যদি আমাদের পন্থা পরিবর্তন না করি, তাহলে আমরা মনে করি, মানবজাতি মারাত্মক বিপদের মধ্যে রয়েছে।” ওয়াশিংটন থেকে তিনি ঘোষণা দেন, কার্যকরী পদক্ষেপ এসব হুমকি কমাতে পারে। কিন্তু আমরা যদি সেগুলোকে (হুমকিগুলোকে) স্বীকৃতি দিই, তাহলে সত্যিই আমাদের সেগুলোর মুখোমুখি হতে হবে অচিরেই। ’ ‘বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সাইন্টিস্ট’-এর ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ঘড়িটি স্থাপনের সময় মহাপ্রলয়ের সাত মিনিট বাকি ছিল। কিন্তু পরে পরমাণু ও মানুষের তৈরি হুমকি মোকাবিলায় বিশ্ব জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ায় এর অবস্থান পিছনে চলে আসে বেশ কয়েকবার। কিন্তু বিশ্বে পরমাণুশক্তির ব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘কেয়ামতের ঘড়ির কাঁটা ফের সামনের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে। ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, ২০১০ সাল পর্যন্ত ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতে পৌঁছাতে বাকি ছিল মাত্র পাঁচ মিনিট। কিন্তু ওই বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ পরমাণু অস্ত্র ধ্বংসের ব্যাপারে অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় ঘড়ির কাঁটা এক মিনিট পিছিয়ে চলে আসে। তবে পারমাণবিক অস্ত্রাগার ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে না-পারায় ২০১২ সালে ফের আগের অবস্থায় ফিরে আসে এটি। ২০১৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ও যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকীকরণের ফলে ঘড়ির কাঁটা চলে আসে ১১টা ৫৭ মিনিটে। এখনও পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে।

(৯) ২১ মে ২০১১ সাল। পৃথিবীর আজই শেষ দিন। কারণ আজই পৃথিবী ধ্বংস হতে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক বাইবেলের উদ্ধৃতি দিয়ে এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তাদের মতে ২০১১ সালের ২১ মে সন্ধ্যা ৬টায় পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। নিউইয়র্কজুড়ে ধর্মযাজক ও ধর্ম প্রচারকরা টি-শার্ট পরে ও ব্যানার-ফেস্টুন, বাইবেল, পোস্টার নিয়ে সমাবেশ করে সবাইকে সতর্ক করছেন। সমাবেশে অংশ নেওয়া ধর্ম প্রচারক ম্যানি বলেন, ‘বাইবেলের বুক অব রেভুলেশন’ অনুসারে ২১ মে সারা বিশ্ব প্রলয়ংকরী এক ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিশ্বের সব স্থানে একই সময়ে ভূমিকম্পটি আঘাত হানবে কি না সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই। কারণ, পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সময়ের তারতম্য রয়েছে। তবে তা একই সময়ে সংঘটিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওদিকে বাইবেলের নানা সংখ্যাতাত্ত্বিক বিষয় বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করার পর হারল্ড ক্যাম্পিং (৮৯) পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে এ ভবিষ্যদ্বাণীটি করেছেন। তিনি এর আগেও ১৯৯৪ সালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তবে সেবার তার গণনা ভুল হয়েছিল বলে ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনি। হারল্ডের অনুসারীরা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পৃথিবী ধ্বংসের প্রচারণা চালাচ্ছেন। আর এ ঘটনায় বিশ্বাসীদের দলে যোগ দিয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। এদিকে পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ক্যাম্পিং শেষ দিনটি তার উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে কাটানোর পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার খবর দেখতে আমি টেলিভিশনে চোখ রাখব সেদিন। হারল্ড ক্যাম্পিং ভবিষ্যদ্বাণীর পিছনে কিছু যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। যার মধ্যে আছে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণও। খ্রিস্ট ধর্মানুসারীদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে একটি খণ্ড জেনেসিসে উল্লেখ রয়েছে, খ্রিস্টপূর্ব ৪৯৯০ অব্দে নূহের সময়কালে পৃথিবীতে একটি মহাপ্লাবন সংঘটিত হয়েছিল। ঈশ্বর সে সময় নূহকে বলেছিলেন, ৭ দিনে তিনি পৃথিবী ধ্বংস করবেন। এদিকে বাইবেলের অপর একটি খণ্ড ২ পিটার ৩:৮ এ বলা হয়েছে, পৃথিবীর এক হাজার বছর ঈশ্বরের এক দিনের সমান। ক্যাম্পিং এ যুক্তি দেখিয়ে বলেন, মহাপ্লাবনের সময় থেকে এ পর্যন্ত ৭ হাজার বছর পার হয়ে গেছে। আর ঈশ্বর ৭ দিনে পৃথিবী ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে হিসাবে ১ হাজার বছর ঈশ্বরের ১ দিনের সমান হলে ৭ হাজার বছর নিশ্চয়ই ৭ দিনের সমান হবে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৯৯০ অব্দের সঙ্গে ২০১১ খ্রিস্টাব্দ যোগ করলে দাঁড়ায় ৭ হাজার বছর। আরও এক জটিল গণনার হিসাবে হারল্ড ক্যাম্পিং আজই অর্থাৎ ২১ মে ২০১১ সালকেই পৃথিবী ধ্বংসের দিন বলে চিহ্নিত করেন। তবে বহু খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও অনুসারীকে তার এ গণনাকে অমূলক বলে দাবি করেছিলেন। এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে। হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

(১০) সুদূরের জন্য একটি ভবিষ্যৎ বাণী উচ্চারিত হয়ে আছে। এতদিন আমি অবশ্যই বেঁচে থাকব না, যাঁরা ভবিষ্যৎ বাণী শোনাচ্ছেন তাঁরাও বেঁচে থাকবেন না। ৩৭৯৭ সাল। ধ্বংস হবে পৃথিবী! অন্য গ্রহে বাসা বাঁধবে মানুষ। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি অবশ্য জনৈক ‘বাবা ভাঙা’-র। তাঁকে নাকি বলা হয় ‘এ যুগের নস্ত্রাদামুস’। ২০ বছর আগে তিনি মারা গিয়েছেন। কিন্তু আইএস-এর উত্থান বা টুইন টাওয়ারের হামলার কথা নাকি তিনি বলে গিয়েছিলেন। বাবা ভাঙা যা বলে গিয়েছেন, তার মধ্যে থেকেই তুলে ধরা হল কয়েকটি। মিলিয়ে নিন।

(১) বারাক হুসেন ওবামাই হবেন আমেরিকার শেষ প্রেসিডেন্ট।

(২) ২০১৬ সালেই ইউরোপ শেষ হয়ে যাবে। রাসায়নিক অস্ত্রে ইউরোপকে শেষ করে দেবে সন্ত্রাসীরা।

(৩) ইউরোপ ছেয়ে ফেলবে মুসলিম জঙ্গিরা। আর এই সন্ত্রাসের সূত্রপাত হবে সিরিয়ায়।

(৪) ২০১৮ সালের মধ্যে সুপারপাওয়ার হিসাবে উত্থান হবে চিনের। পর্যন্ত হবে আমেরিকা।

(৫) ২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে ক্ষুধা দূর হবে।

(৬) শুক্র গ্রহে বাসা বাঁধবে মানুষ।

(৭) ২০৪৫ সালের মধ্যে মেরু অঞ্চলের আইসক্যাপ গলে যাবে।

(৮) ২০৭৬ সালে কমিউনিজম ফিরবে পুরোদস্তুর।

(৯) ২১৩০ সালের মধ্যে জলের তলায় বসবাস শুরু করবে মানুষ।

(১০) ৩৭৯৭ সালে ধ্বংস হবে পৃথিবী। ততদিনে অবশ্য অন্য গ্রহে থাকতে শুরু করবে মানুষ। সত্য/মিথ্যার সাক্ষী থাকুন আপনি। সময় তো আছেই।

হাত দেখা বা হস্তরেখা বিচার সম্ভবত জ্যোতিষীবাবুদের মধ্যে সবচেয়ে জয়প্রিয়তম ব্যবস্থা। জাতকরাও কেউ হাত দেখতে জানে জানতে পারলে তার দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে দিতে এক সেকেন্ডও দেরি করেন না। অবশ্য এই ‘হস্তরেখা বিচার’ পদ্ধতির পুষ্টিলাভ খুব বেশিদিনের কথা নয়। পঞচদশ শতকে হস্তরেখা বিদ্যার উপর কিছু পরিমাণ বিক্ষিপ্তভাবে লেখালেখি হলেও মূলগতভাবে এই বিদ্যার রমরমা শুরু ঊনবিংশ শতাব্দীতে। মহাভারতের যুগেও অনুমান করেই ভবিষ্যৎ বাণী করা হত। শকুন্তলাকে দুর্বাসাও ভবিষ্যৎ বাণী দিয়েছিল, যা অভিশাপ বলেই বিদিত। দুর্বাসা জানতেন রাজা দুষ্যন্ত জন্ম-পরিচয়হীন শকুন্তলাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করবে না। করার কথাও নয়। কারণ একজন বনবাসীকে কিছুতেই রাজপরিবারে জায়গা দিতে পারে না। সামাজিক অবস্থান তো ভিন্ন মেরুতে।

যাই হোক, হাত দেখার মহিমাই অপরিসীম। বন্ধুমহলে বেশ কদর পাওয়া যায়। অফিসের বসকেও খুব সহজে কবজা করা যায় হাত দেখে পজিটিভ বাণী শুনিয়ে। বিনা মূলধনে বিনা পরিশ্রমে টু-পাইস কামানোর সুযোগ হাতছাড়া করা যায়! কী আছে হাতে? কী দেখা হয় হাতে? হাতে কী অতীত-বর্তমান ভবিষ্যৎ লেখা থাকে? জ্যোতিষীবাবুরা তো সেটাই বলে, হাতে লেখা থাকে! শুধু হাতেই নয়– কপাল, হাতের কবজি, শরীরের তিল, পায়ের রেখা সবেতেই নাকি অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ লেখা থাকে। গতকাল এবং আগামীকাল, ভূত এবং ভবিষ্যৎ– যত গণ্ডগোল তো এখান থেকেই, আদিকাল থেকেই। ‘ভূত’ শব্দটি বস্তুত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হলেও ব্যঞ্জনা প্রায় কাছাকাছিই। একটি অর্থ। ‘অতীত’, অন্যটি হল ‘প্রেত-প্রতিনী’, ‘প্রেত-প্রতিনী’ তো যিনি অতীত বা মৃত হয়েছেন তার অশরীরী। আমরা ভূত জেনে অবাক হই, বর্তমান জেনে খুশি হই এবং ভবিষ্যৎ জেনে আতঙ্কিত হতে ভালোবাসি। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে না হলেও অতীত আমাদের মনে থাকে অনেকটাই, আমরা তাই জন্য স্মৃতিচারণ করতে পারি। আমার অতীত জানতে আমি জ্যোতিষবাবুর কাছে যাব কেন! জ্যোতিষীবাবুরা মানুষের সেই অতীতই বলে থাকেন, সেগুলি সকলের জন্য খুবই কমন (Common)। আপনার মনে হয় উনি আপনার ‘অতীত’ বলতে পারলেন। আপনি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকলেন, এই বুঝি অতীতে করা আপনার অপকর্মগুলিও বলে ফেলল! তবুও বারাবার জ্যোতিষীর কাছে যাই, গিয়ে একবার ঝালিয়ে নিই। আপনার মতে না মিললে সেই জ্যোতিষী খারাপ, অন্য ‘বিখ্যাত’ জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হবেন নিশ্চয়। আর মতে মিললে তো ভগবান– আপনি সব উজার করে দিতে রাজি হয়ে যান। বস্তুত সব জ্যোতিষীর মধ্যে ওই ‘মেলানোর’ পারদর্শিতা বা অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা থাকে না।

কীভাবে? বলব। আমি তো আমার কথা বলব, যুক্তিবাদীদের কথা বলব, বিজ্ঞানের কথা বলব। তার আগে জ্যোতিষীবাবুদের বক্তব্য শুনব না কি করে হবে?

জ্যোতিষীবাবুরা বলেন– “জ্যোতিষ একটি ঐশ্বরিক ব্যাপার। আসলে এটা কোন মত পোষণ করা বা বিশ্বাসের ব্যাপার নয়। জ্যোতিষে এমন কিছু বিষয় আছে, যা চট করে দেখলে একেবারেই মন-গড়া, বা বানানো মনে হয়। অথচ সেগুলিই বাস্তবে খুব ভালো মতো কাজ করে বা ফল দেয়। যেমন, রাশিচক্রের বিন্যাসের (Arrangement) ব্যাপারটি বলা যেতে পারে। জ্যোতিষে ৯টি গ্রহ বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে আসল গ্রহ ৫টি– বুধ, শুক্র, মঙ্গল, শনি, এবং বৃহস্পতি। সূর্য ও চাঁদকেও ‘গ্রহ’ নামে ডাকা হয়। এছাড়া রাহু ও কেতু নামে দুটো অবস্থানগত বিন্দুকেও (Positional Points) গ্রহ ধরে মোট ৯টি ‘গ্রহ’ পাওয়া যায়। এদেরকে ‘নবগ্রহ’ বলা হয়। এই নবগ্রহের মধ্যে সূর্য ও চাঁদের অবশ্যই একটা আলাদা অবস্থান বা গুরুত্ব আছে। কেননা সূর্য আসলে গ্রহ নয়, বরং নক্ষত্র। সব গ্রহগুলির চেয়ে বহুগুণ বড়ো হওয়াতে এর একটা আলাদা প্রভাব আছে। সৌরজগতের সব গ্রহগুলি সূর্যকে কেন্দ্র করেই ঘুরছে। তাছাড়া পৃথিবীতে দিন-রাত, ঋতু পরিবর্তন ইত্যাদিতে সূর্যের এমন প্রভাব আছে, যা অন্য কারও নেই। আবার চাঁদ গ্রহদের থেকে ছোটো হলেও, পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে হওয়ার জন্য এর আলাদা এক রকম প্রভাব আছে, যা জোয়ারভাটা, মানুষের শরীরের বাত, আরও বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে। সুতরাং সূর্য ও চাঁদের এমন একটা অবস্থান বা প্রভাব আছে, যা বুধ, শুক্র, শনি ইত্যাদির নেই। রাশিচক্রে ১২টি রাশির প্রত্যেকটি রাশি কোন না-কোন গ্রহের মালিকানাধীন। আপনার যে রাশিই হোক না-কেন, তার একটি মালিক বা অধিপতি (owner) আছে বলে রাশিচক্রের বইয়ে বা পত্রিকাতে পাবেন। রাহু কেতু অবস্থানগত বিন্দু, তাদের আসলে কোনো দৃশ্যমান কাঠামো (Physical Structure) নেই। তাই তারা সেভাবে কোনো রাশির মালিক নয়। বাকি ৭টা গ্রহ এই ১২টি রাশির মালিক। আবার, রাহু-কেতু বাদে এই ৭টা গ্রহ, সপ্তাহের ৭টা দিনেরও মালিক। এবং সেই সেই দিনে সেই সেই গ্রহের প্রভাব, বাস্তব জীবনে খুব পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। ১২টি রাশিকে কীভাবে ৭টি গ্রহের মধ্যে ভাগ করা যায়? প্রত্যেক গ্রহ ২টি করে রাশি পেলে রাশি দরকার ১৪টি, আবার ১টি করে হলে ৭টি গ্রহের ৭টি রাশি পাওয়ার পর আরও ৫টি থেকে যায়। তাহলে? জ্যোতিষে বিষয়টির সুরাহা করা হল এভাবে– সূর্য ও চাঁদ যেহেতু ৭টি গ্রহের মধ্যে একটু আলাদা (Special), এদেরকে ১২টি রাশি থেকে ১টি করে রাশি দেওয়া হোক (মোট ২টি)। আর বাকি থাকল ১০টা, এই ১০টা রাশি বাকি ৫টি গ্রহের মধ্যে ২টি করে ভাগ করে দেওয়া হোক। তাহলে সূর্য ও চাঁদ = ১ + ১ = ২, আর বাকি ৫টি গ্রহ ২টি করে = ৫ x ২ = ১০, মোট ২ + ১০ = ১২, মিলে গেল। বিষয়টি খুব সাধারণ, মনে হয় কোন একটা ঘরোয়া আলোচনায় ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। কিন্তু এটাই বাস্তব জীবনে খেটে যায়। কেননা এটাই জ্যোতিষের ভিত্তি, আর সব হিসাব-নিকাশ এর উপর ভিত্তি করেই করা হয়। তাই এটা ঠিক না-হলে, কোনো কিছুই মিলত না। এখন, রাশির বিন্যাস (Positioning/Arrangement) কীভাবে করা হবে? এটাও এমন একটা ব্যাপার, দেখলে মনে হবে কারও বানানো বা কল্পনাপ্রসূত, কিন্তু এটাই বাস্তবে খেটে যায়। কীভাবে দৃশ্যমান ভৌত শরীর (physical body) -থাকায় রাহু-কেতুকে রাশির মালিকানা না-দেওয়া, এরপর বাকি ৭টি গ্রহের মধ্যে সূর্য ও চাঁদকে আলাদা বিবেচনা করে ১টি করে রাশি দিয়ে এরপর দু-পাশে একই গ্রহের ১টি করে রাশি বসিয়ে বসিয়ে সম্পূর্ণ রাশিচক্রটি (Zodiac) সাজানো বা বিন্যাস করা (Arrange) একেবারেই মানুষ বা অন্য কারও বানানো মনে হয়, যা খুব সাধারণ বিবেচনা নিয়ে (Casually) করা হয়েছে। এতে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, ইত্যাদির মতো কোনো জটিলতা নেই। তাই দেখে যদিও মনগড়া মনে হয়, এই জিনিসটাই বাস্তবে মিলে যায়, বা খেটে যায়। এটা অবশ্যই একটা ঐশ্বরিকত্ব।” আধুনিক তত্ত্বের সঙ্গে জ্যোতিষের তত্ত্বকে মেলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। ইনি বাংলাদেশে বসবাসকারী বহু প্রচারিত এক জ্যোতিষীবাবু। এনার একটি ওয়েব সাইটও আছে বটে, জ্যোতিষের সমর্থনে প্রবন্ধ-ট্রবন্ধও লেখেন লেখকের নাম-পরিচয় ছাড়াই।

ভারত তথা হিন্দুধর্মের মানুষদের মধ্যেই জ্যোতিষচর্চা খুব বেশি প্রচলন। বস্তুত ব্রাহ্মণ তথা মুনিঋষিরাই ভবিষ্যৎ বলার কাজটা করতেন। ভারতে জ্যোতিষচর্চা মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদের হাত ধরেই এসেছে। একটু নজর রাখলেই জানতে পারবেন জোতিষীদের একটা বড়ো অংশই ব্রাহ্মণসম্প্রদায়ের। একমাত্র ভারতেই ঘরে ঘরে জ্যোতিষী পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গে তো জ্যোতিষ-ব্যাবসা কুটিরশিল্প পর্যায়ে চলে গেছে। যিনি হাত-পা দেখেন তিনিও জ্যোতিষী, যিনি হাত-পা দেখান তিনিও জ্যোতিষী। খ্রিস্টানদের মধ্যেও এ বিদ্যা চর্চা অল্পবিস্তর আছে। তবে মুসলিমদের মধ্যে ধর্মীয়ভাবে জ্যোতিষচর্চা নিষিদ্ধ। নক্ষত্র ও গ্রহ সংক্রান্ত গণনা অর্থাৎ জ্যোতিষচর্চাকে পূর্ববর্তী মুসলিম পণ্ডিতেরা সামগ্রিকভাবে ‘তানজিম’ বলে অভিহিত করেন। সমগ্র বিশ্ব যেহেতু জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর প্রভাবে প্রভাবিত, তাই ভবিষ্যতে ঘটবে এমন সব ঘটনাসমূহ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে প্রকাশ করা সম্ভব। এটা বিশ্বাস করা সর্বসম্মতিক্রমে বড়ো ধরনের কুফরি এবং ইব্রাহিম এর জাতির শিরকের মতো শিরক। “যে ব্যক্তি কোনো গণক তথা ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে গেল, অতঃপর তাকে (ভাগ্য সম্পর্কে) কিছু জিজ্ঞেস করল অমনি ৪০ দিন পর্যন্ত তার সালাত কবুল হবে না।” (সহিহ মুসলিম ২২৩, মুসনাদ আহমাদ ৪/৬৭)। গণক বা জ্যেতিষীদের কথা বিশ্বাস করা আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করার নামান্তর জাদুবিদ্যা শিক্ষা করা, শিক্ষা দেওয়া কুফরি গোনাহ বা পাপ। যে সাতটি জিনিস মানুষকে ধ্বংস করে তার মধ্যে একটি হচ্ছে জাদু। আল্লাহ বলেন, “যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত কোনো জ্ঞান নেই, তার পিছনে ধাবিত হোয়য়া না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।” (বনি ইসরাঈল ৩৬)। আল্লাহ আরও বলেন –“জাদুকর যেখানেই থাকুক সফল হবে না।” (ত্বহা ৬৯)। পক্ষান্তরে কেউ সত্যায়ন না করে, তাদের নিকট অভিজ্ঞতা লাভের জন্য বা পরখ করার জন্য গেলে এটা কুফরের পর্যায়ভূক্ত নয়, কিন্তু ৪০ দিন পর্যন্ত তার নামাজ ও ইবাদ কবুল হবে না। এ সম্পর্কে রাসুলাল্লাহ বলেছেন– “যারা গণক কিংবা এই জাতীয় লোকের নিকট গিয়ে কোনো কিছু জানতে চাইবে, ৪০ দিন পর্যন্ত তাদের নামাজ কবুল হবে না।” (মুসলিম শরিফ) জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া, হাত দেখানো তাঁর কথা বিশ্বাস করা একেবারে নাজায়েজ।

ইসলাম মতে, গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টি হওয়ার কথা বিশ্বাস করা যেমন কুফরি, তেমনি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রাশিফলের আশ্রয় নেওয়াও কুফরি। যে ব্যক্তি রাশিফলের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবের কথা বিশ্বাস করবে, সে সরাসরি মুশরিক হয়ে যাবে। পত্র-পত্রিকা ও বইপত্রে রাশিফলের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে সেগুলি পাঠ করা শিরক। তবে বিশ্বাস না-করে কেবল মানসিক সান্ত্বনা অর্জনের জন্য পড়লে তাতে শিরক হবে না বটে, কিন্তু সে গোনাহগার হবে। কেন-না শিরকি কোনো কিছু পাঠ করে সান্ত্বনা লাভ করা বৈধ নয়। তা ছাড়া শয়তান কর্তৃক তার মনে উক্ত বিশ্বাস জন্মিয়ে দিতে কতক্ষণ? তখন এ পড়াই তার শিরকের মাধ্যম হয়ে দাঁড়াবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “গণকের নিকটে কোনো ব্যক্তি গমন করে যদি তাকে কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তাহলে ৪০ দিন ও ৪০ রাত পর্যন্ত তাঁর সলাত কবুল হবে না।” (সহিহ মুসলিম)। “যদি কেউ গণকের বা জ্যোতিষীর নিকট গমন করে তাঁর কথায় বিশ্বাস করল, তাহলে সে মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ বিষয়কে অবিশ্বাস করল।” (সুনান আবু দাউদ)। হাদিসগুলিতে দৈব জ্ঞানের দাবিদার, গণক, জাদুকর ও তদনুরূপ লোকদের কাছে আসতে এবং তাদেরকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করতে ও তাদের বক্তব্য সত্য বলে বিশ্বাস করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে ভয় প্রদর্শন ও করা হয়েছে। সুতরাং শাসকবর্গ ও মানুষকে সৎ কাজের আদেশদানের এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ –যাদের হাতে ক্ষমতা ও শক্তি রয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই উচিত গণক, দৈব জ্ঞানের দাবিদার ও অনুরূপ পেশাজীবীদের কাছে আসতে লোকদের নিষেধ করা, হাটে-বাজারে ও অন্যত্র যেকোনো ধরনের দৈবজ্ঞান আদানপ্রদান নিষিদ্ধ করা, দৈবজ্ঞ ও তাদের কাছে যারা আসে সবার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। তাদের কথা কোনো কোনো ব্যাপারে সত্য বলে প্রমাণিত হওয়ার ফলে এবং এক শ্রেণির লোক তাদের কাছে বেশি আনাগোনা করার ফলে তাদের দ্বারা কারও প্রতারিত হওয়া ঠিক নয়। কারণ ওই শ্রেণির লোকেরা মূলত মূর্খ। তাই তাদের দ্বারা প্রতারিত হওয়া অনুচিত। কেননা এতে গুরুতর পাপ, মহাবিপদ ও খারাপ পরিণতি থাকায় এবং যারা এসব কাজে লিপ্ত তারা মিথ্যাবাদী ও দুষ্ট প্রকৃতির লোক হওয়ায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে আসতে, প্রশ্ন করতে এবং তাদেরকে সত্যবাদী হিসাবে প্রতিপন্ন করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে আলোচ্য হাদিসগুলিতে এও প্রমাণিত হয় যে, গণক ও জাদুকররা কাফির। কেননা তারা অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার দাবি করছে, যা কি না কুফুরি। তদুপরি তারা আল্লাহকে ছেড়ে জিনের সেবা ও ইবাদাঁতের মাধ্যমেই তাদের উদ্দেশ্য সাধন করছে। অথচ এ কাজও কুফুরি এবং আল্লাহর সঙ্গে শরিক করারই নামান্তর। যে ব্যক্তি তাদের অদৃশ্য জ্ঞানের দাবিকে সত্য প্রতিপন্ন করে সে ও তাদেরই অনুরূপ। আর যেসব ব্যক্তি এ বিষয়গুলি এমন লোকদের কাছ থেকে গ্রহণ করে, যারা তা পরস্পর আদানপ্রদান করে থাকে, সে সব ব্যক্তির সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সম্পর্ক নেই। এসব লোক যাকে চিকিৎসা বলে ধারণা করে থাকে, তাকে মেনে নেওয়া ও গ্রহণ করা কোনো মুসলিমের জন্য জায়েজ নেই। যেমন বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ কিংবা জলে ইস্পাত চুবানো ইত্যাদি আরও অনেক কুসংস্কার যা তারা করে থাকে, তার কোনোটাই জায়েজ নয়। কেননা তা দৈবকর্ম চর্চা ও মানুষকে বিভ্রান্ত করারই নামান্তর। এসব ব্যাপারগুলোকে যারা মেনে নেয়, তারা মূলত এ লোকদেরকে তাদের বাতিল ও কুফুরি কাজে সহযোগিতা করল। অনুরূপভাবে কোনো মুসলিম ব্যক্তির জন্য জ্যোতিষী ও দৈবজ্ঞানের দাবিদারদের কাছে গিয়ে একথা জিজ্ঞেস করা জায়েজ নেই যে, তার ছেলে কিংবা তার কোন আত্মীয় কাকে বিয়ে করবে? কিংবা স্বামী-স্ত্রী ও তাদের উভয়ের পরিবারে ভালবাসা ও মিল-মহব্বত হবে নাকি শত্রুতা ও দূরত্বের সৃষ্টি হবে ইত্যাদি। কেন-না এসব সে গায়েবি ও অদৃশ্য জ্ঞানেরই অন্তর্গত যা শুধু মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। সকল মুসলিম মনীষীদের সর্বসম্মত মতানুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ বৈধ। আর যে কোনো মুসলিম ব্যক্তিরই অধিকার রয়েছে যে, সে অভ্যন্তরীণ রোগের ডাক্তার কিংবা শৈল চিকিৎসক অথবা মানসিক রোগের ডাক্তার কিংবা অনুরূপ যে কারও কাছে যেতে পারে, যাতে তিনি তার রোগব্যাধি চিহ্নিত করে চিকিৎসাশাস্ত্রে তার জ্ঞান অনুযায়ী শরিয়ত কর্তৃক অনুমোদিত পথ্য দ্বারা তার চিকিৎসা করেন। কেননা এটা সাধারণ বৈধ পন্থাগুলিরই অবলম্বনেরই অন্তর্গত। উপরন্তু এ ধরনের পন্থাবলম্বন আল্লাহর উপর নির্ভরতার পরিপন্থী নয়। কারণ আল্লাহ রোগ দিয়েছেন এবং সে রোগ নিরাময়ের ঔষধও বাতলে দিয়েছেন। যার জানার সে তা জেনেছে এবং যে জানেনি, এ পথ্য তার অজ্ঞাতই থেকে গেছে। অবশ্য আল্লাহ বান্দার উপর হারাম করেছেন এমন কোনো বস্তুকে তার রোগ নিরাময়ের উপায় নির্ধারণ করেননি। সুতরাং অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সেই সব গণক, জ্যোতিষী ও দৈবজ্ঞদের কাছে যাওয়া বৈধ নয়, যারা দাবি করে যে, তাদের কাছে অসুস্থ ব্যক্তির রোগ চিহ্নিত করার গায়েবি জ্ঞান আছে। অনুরূপ অসুস্থ ব্যক্তির জন্যও এসব গণক ও দৈবজ্ঞদের দেওয়া তথ্য ও সংবাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা বৈধ নয়। কেননা তারা গায়েবি বিষয়ে অনুমানের উপর ভিত্তি করেই এসব বলে থাকে কিংবা তারা তাদের ঈপ্সিত বিষয়ে সাহায্য নেওয়ার জন্য জিনদের হাজির করে থাকে। তার মানে এই নয় যে মুসলিমরা জ্যোতিষচর্চা করেন না। জ্যোতিষীদের চেম্বারে মুসলিম জাতকরাও গ্রহশান্তির জন্য আসেন। রত্ন ধারণও করেন। মুসলিম দেশে হয় কি না আমার জানা নেই। তবে ভারতে এক-আধজন মুসলিম জ্যোতিষী পাওয়া যায়। পিরবাবাদের আমি ভবিষ্যৎ বাণী শোনাতে দেখেছি। ধর্ম ধর্মের জায়গায় আছে, ব্যাবসা ব্যাবসার জায়গায়।

জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চায় মুসলমানদের বেশ সুনাম অদ্যাবধি কাল থেকেই আছে। পেশাগত জীবনযাপনের তাগিদে এবং স্থল ও জলপথে বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাদের প্রয়োজন হত আকাশের গ্রহ-তারকাদের অবস্থান জানার। মুসলমানদের বিজ্ঞানে অগ্রসরতা এবং সপ্তম শতক হতে পনেরো শতক পর্যন্ত যে সকল মুসলমান বিদূষী জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখায় প্রভূত অবদান রেখেছেন তারা আর যে বিষয়ই নিয়েই পড়ে থাকুন না-কেন, তারা সবাই কিছু-কিছু অবদান রেখেছেন এই জ্যোতিষশাস্ত্র বিজ্ঞানে। তারা গবেষণা করে গেছেন আর লিখেছেন একের পর এক বই।

আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ আত্মনিবেদন করতে শেখে। আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে গর্ব অনুভব করে, দুঃখ-যন্ত্রণা-বঞ্চনাকে ভুলে থাকতে শেখে। এরা লড়াই জানে না, লড়াই দেখলে ভীত হয়। এমতাবস্থায় অদৃষ্ট বা নিয়তির শরণাপন্ন হয়। জেগে ওঠে জ্যোতিষ এবং জ্যোতিষীবাবুরা। হাত বড়িয়ে দেয়– একপক্ষে

জ্যোতিষীবাবুর হাত, অপরপক্ষে জাতকের হাত। কী আছে হাতে? রেখা? রেখায় কী আছে? আছে স্বল্প রেখাযুক্ত পরিষ্কার হাত এবং বহু সূক্ষ্ম রেখাযুক্ত হাত। লালচে হাত, গোলাপি হাত, সাদাটে হাত, হলদেটে হাত। আছে চওড়া তালু, বেঁটে ও মোটা আঙুল, কুশ্রী নখ। আছে চৌকো হাত, চৌকো হাতে লম্বা আঙুল, দার্শনিক হাত, শিল্পী হাত, আধ্যাত্মিক হাত। আছে নমনীয় বুড়ো আঙুল, অনমনীয় বুড়ো আঙুল। খুব লম্বা নখ, খুব লম্বা ও সরু নখ, খুব লম্বা নীলচে অথবা মলিন বর্ণের চোখ, ছোটো নীলচে নখ, ছোটো গোলাকার নখ, ছোটো অথচ নখের তলার দিকটা চ্যাপটা, ছোটো অথচ নখের তলার দিকে সাদা। চাঁদ, শরীরের ভিতর গভীরভাবে চেপে বসা চ্যাপটা নখ, নখে সাদা দাগ ইত্যাদি।

এমন কোনো মানুষ নেই যাঁর হাতে ভাঁজ বা কোঁচকানো দাগ বা রেখা নেই। কারোর ঘন দাগ, কারোর-বা অনেকটা ফাঁকা ফাঁকা। এইসব দাগগুলি আবার বিভিন্ন নামে পরিচয় আছে। যেমন–আয়ুরেখা, হৃদয়রেখা, ভাগ্যরেখা, রবিরেখা, বিবাহরেখা ইত্যাদি। এছাড়া হাতের উঁচুনীচু অংশগুলিতে আছে গ্রহস্থল– মানে কোথায় রবি অবস্থান করছে, কোথায় মঙ্গল অবস্থান করছে, কোথায় রাহু অবস্থান করছে ইত্যাদি। হাতের রং দেখেও জ্যোতিষবাবুরা ভাগ্যগণনা করে থাকেন। আছে তারা চিহ্ন, ক্রশ চিহ্ন, চতুষ্কোণ, যব বা দ্বীপ চিহ্ন, বৃত্ত বা চক্র চিহ্ন, ত্রিশূল, জাল চিহ্ন ইত্যাদি– এইসব চিহ্নগুলিও অনেক ভবিষ্যৎবার্তা দেয় বলে জ্যোতিষবাবুরা নিদান দেন।

মানুষের হাতের তালুতে থাকা যেসব ছাই-ছাতার উপর জ্যোতিষবাবুরা ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন বলে দাবি করেন সেগুলি আসলে কী? মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা হাতের তালু মুঠো করতে পারে। হাতের তালু মুঠো করতে পারার কারণ তালুর এই ভাঁজগুলি। এই ভাঁজগুলি (গভীর রেখা ও সূক্ষ্ম রেখা) প্রাথমিকভাবে মানুষের মাতৃগর্ভে থাকাকালীনই তৈরি হয়। শিশু মায়ের গর্ভে যখন থাকে তখন তার হাত মুষ্ঠিবদ্ধ অবস্থায় থাকে। ভ্রূণ অবস্থায় শিশুর চামড়া ও মাংসপেশি সাত/আট সপ্তাহ নাগাদ তৈরি হয়। এই অবস্থায় মাংসপেশিতে জলের পরিমাণ যথেষ্ট বেশি থাকে। এরপর আস্তে আস্তে যতই মাংসপেশিগুলিতে জলের পরিমাণ কমতে থাকে ততই সংকোচনের ফলে মাংসপেশির উপর টান হয়ে এঁটে থাকা চামড়া ক্রমশ শিথিল হতে থাকে এবং কুঁচকে যেতে থাকে। ফলে হাতের তালুর চামড়ার বিভিন্ন জায়গায় ভাঁজ পড়ে যায়। শিশুর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে এই কোঁচকানো চামড়াই দাগ হিসাবে দেখি। এ দাগ ব্যক্তির মৃত্যু পরও থাকে। পেশিতন্তুর সংকোচনে। তৈরি হয় সূক্ষ্মরেখা এবং দুটি পেশি-অংশের সংযোগস্থলে সৃষ্টি হয় গভীর রেখা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতের তালুতে চামড়ার নীচের মাংসপেশির সংকোচন প্রসারণের উপর নির্ভর করে হাতের তালুতে ছোটো ছোটো রেখা তৈরি হয়। মানুষের শরীরের যে অংশ সবচেয়ে বেশি ফোল্ড হয় এবং নড়াচড়া হয়, তা হল হাতের তালু, সে কারণে হাতের তালুতেই এত ভাঁজ সৃষ্টি হয়। যদি হাতের তালুর মতো পায়ের তালুও ভাঁজ করার প্রয়োজন হত, তাহলে পায়েও এরকম দাগ আমরা পেতাম। মানুষ ছাড়াও গেরিলা, বাঁদর, শিম্পাঞ্জী গোত্রীয় প্রাণীদের হাতের তালুতে ভাঁজ লক্ষ করা যায়। তবে মানুষের তালুর মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়। এই রেখা মানুষের কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে না, করতে পারে না। নানা কারণে মানুষের হাতের কবজি বা আঙুল কেটে বাদ হয়ে যায়, কিংবা দুর্ঘটনায় দুটো হাতই বাদ চলে যায়– এই যে যাদের হাত বা কবজি বা আঙুল কেটে বাদ হয়ে যায়, তাদের ভূত-ভবিষ্যৎ কোথায় লেখা থাকে ভেবে দেখব না আমরা! যেমন ধরুন, কোনো ব্যক্তির বুড়ো আঙুলটা যদি না থাকে, তবে তো তার আয়ুরেখাও নেই– আয়ুরেখা নেই মানে, মৃত্যুও নেই। তাই হয় নাকি! জ্যোতিষবিদ্যার সবচেয়ে বেশি প্রচলিত হচ্ছে কিনোর বই। কিয়োর বই আমিও পড়েছি। তবে কলকাতায় ভৃগু প্রণীত জ্যোতিষ শিক্ষার বইও পাওয়া যায়। এই ভৃগু একাধারে জ্যোতিষজ্ঞ, যৌনবিষয়ক লেখক, গোয়েন্দা গল্পকার। এই কিতাব পড়েও অনেকে জ্যোতিষী ফলায় গ্রামেগঞ্জে। যাই হোক, কিরোর বই আপনিও পড়ে দেখতে পারেন। হাতের রেখা কীরকম হলে সেই হাতের মালিক কেমন ভাগ্যের অধিকারী হবেন, সেগুলিই উল্লেখ করা আছে। কিন্তু কার্যকারণ নেই। কোনো সংগতি তথ্য নেই। আশাও করবেন না। কোনো কেনর উত্তর নেই। কারণ হস্তরেখাবিদদের সেই দায় আছে বলে তাঁরা মনে করেন না। বরং বেশি লাফালাফি করলে মাসলম্যানদের দিয়ে কিমা করে দিতে পারে আপনাকে।

জ্যোতিষীদের আর-একটি ভাগ্যগণনার পদ্ধতি হল সংখ্যাতত্ত্ব বা নিউমেরোলজি। অনেকে সংখ্যা-জ্যোতিষ বা অংক জ্যোতিষও বলে। তা অংকটা কী? অবশ্য বলার চেষ্টা করব। সংখ্যাতাত্ত্বিক বা জ্যোতিষ মতে, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি মূহূর্তেই মানুষ নিজেকে, নিজের পরিমণ্ডলকে, সময়কে এককথায় সবকিছুকে একমাত্র সংখ্যা দ্বারাই পরিচিত করে। আর তা করে প্রায় অসচেতন থেকেই। যেমন– ব্যক্তি বা বস্তুর নাম, স্থানের নাম, বিষয়ের নাম বা দিন, তারিখ, সময় ইত্যাদি যা কিছুই বলি না-কেন সব কিছুর মাঝেই লুকিয়ে আছে সংখ্যা। সংখ্যার সেই আধিভৌতিক দিক নিয়েই আলোচনা করে সংখ্যাতত্ত্ববিদ্যা। জগতের সকল কর্মকাণ্ডই সংখ্যা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সংখ্যার যে। একটি আধিভৌতিক (Mistrious) ভূমিকা জীবনে ও জগতে আছে। সংখ্যার এই অতিন্দ্রীয় প্রভাবই আধুনিক সংখ্যাতত্ত্ববিদ্যার (Modern Numerology) আলোচ্য বিষয়।

জ্যোতিষ মতে, সংখ্যাতত্ত্ববিদ্যা বস্তুত জ্যোতিষবিদ্যার চেয়েও প্রাচীন। জগতের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থসমূহে এর উল্লেখ আছে বলে দাবি করেন। বেদ, বাইবেল প্রভৃতিতে যেমন এর উল্লেখ দেখা যায়, তেমনি পবিত্র কোরান শরিফের সুরাগুলিতেও নাকি সংখ্যায়িত লিখন পদ্ধতি দেখতে পাওয়া যায়। তাবিজ-কবজ লেখকগণ প্রায়শ সংখ্যায়ন পদ্ধতিতে লিখে থাকেন। সংখ্যাতত্ত্বের আবিষ্কার মানুষকে জ্যোতিষবিদ্যা (Astrology) এবং জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) প্রতি আকৃষ্ট করেছে। গ্রিক দার্শনিক পিথাগোরাসকে (খ্রিস্টপূর্ব ৫৮২-৬০৭) আধুনিক সংখ্যাতত্ত্বের জনক বলা হয়ে থাকে। অবশ্য তারও বহু পূর্বে ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যাবিলনীয় সভ্যতার যুগেও এই বিদ্যার অনুশীলন হত বলে প্রমান পাওয়া গেছে। জ্যোতিষবিদরা মনে করেন, পিথাগোরাসের অনুসারী ফিলোলাস, নিকোমাকাস ছাড়াও হেরোডোটাস, সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল প্রমুখ গ্রিক পণ্ডিতগণ, এমনকি আইনস্টাইন সহ অন্যান্য খ্যাতিমান পণ্ডিতগণ এই বিদ্যার অনুশীলন করেছেন। সংখ্যাতত্ত্বের সঙ্গে ফলিত জ্যোতিষের (Applied Astrology) সম্পর্ক অতি নিবিড়। ফলিত জ্যোতিষে ১২টি রাশি আছে এবং ৯টি গ্রহ তাদের অধিপতি (Ruling Planet)। অঙ্কের জগতে মৌলিক সংখ্যা ৯টি (১ থেকে ৯)। শূন্য কোনো সংখ্যা নয়, তবে সংখ্যার পাশে বসে তার মান বৃদ্ধি করে মাত্র। তা পৃথিবী (Univers) এর প্রতীক। গাণিতিক অঙ্ক যত বড়ই হোক তার পারস্পরিক যোগফল মৌলিক একক সংখ্যায় রূপান্তর করা যায়। আর এই মৌলিক রূপান্তরই হচ্ছে সংখ্যাতত্ত্বের প্রতিপাদ্য বিষয়। যেমন ৯৮৭৬ সংখ্যাটি পরস্পর যোগ করলে হয় ৯ + ৮ + ৭ + ৬ = ৩০। আবার ৩০ কে পরস্পর যোগ করলে হয় ৩ + ০ = ৩। অর্থাৎ যতক্ষণ-না একক সংখ্যায় আসবে ততক্ষণ পরস্পরকে যোগ করতে হবে। এক সময় তা ১ থেকে ৯ এর মধ্যে আসবেই। আর এই ১ থেকে ৯ সংখ্যা হল ৯টি প্রধান গ্রহের আধিভৌতিক বা অতিন্দ্রীয় প্রতিভূ যার প্রভাব মানব জীবনে অপরিসীম।

সংখ্যাতাত্ত্বিকগণ (Numerologist) প্রতিটি ব্যক্তি, বস্তু বা নামকে ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে সংখ্যায়িত করে মূল্যায়ন করেছে। কিন্তু অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো সংখ্যাতত্ত্বভিত্তিক গণনা পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে ANIRBAN BANDYOPADHYAY নামে। প্রশ্ন দেখা দিতে পারে পৃথিবীতে এত ভাষা থাকতে ইংরেজি ভাষাকে বেছে নেওয়া হল কেন? এ প্রশ্নের উত্তর সংখ্যাতাত্ত্বিকগণই দিয়েছেন, বলছেন– প্রাচীনকালের বিভিন্ন প্রতীকই মূলত কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন প্রাচীন ভাষায় সংখ্যাতত্ত্ব বর্ণিত হলেও আধুনিক সংখ্যাতত্ত্ববিদ্যা ইংরেজিকে বেছে নিয়েছেন এর আন্তর্জাতিক আবেদনের কথা বিবেচনা করেই। কেননা এটি একটি আন্তর্জাতিক ভাষা এবং পৃথিবীর সকল গোলার্ধে এই ভাষা কমবেশি চর্চা হয়। অপরদিকে অন্যান্য প্রধান ভাষাগুলির আ-কার, ই-কার প্রভৃতি অথবা অক্ষর সংখ্যার প্রাচুর্যে বর্ণমালা অত্যন্ত জটিল। তাই ইংরেজিকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া পৃথিবীর আলাদা আলাদা ভাষায় আলাদা আলাদা সংখ্যাতাত্ত্বিক ভাগ্যবিচার ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে। কারণ সর্বশেষ যোগফল সংখ্যা একেক রকম হবে। সে ব্যাপারটা হবে বড়োই বিভ্রান্তকর।

তাহলে আসুন জেনে নেওয়া যাক আমাদের প্রত্যেকের সংখ্যাগুলি। সংখ্যা দুই প্রকারে নির্ণয় করা যায়– একটি জন্মসংখ্যা, অপরটি নামসংখ্যা। সঠিক জন্মতারিখ জানা থাকলেই শুধু জন্মসংখ্যায় নির্ণয়, নতুবা নামসংখ্যাই ধরতে হবে। জন্মসংখ্যার মতো নামসংখ্যা অতটা ভূমিকা রাখতে পারে না বলে জন্মসংখ্যার গুরুত্বই বেশি। আবার জন্মসংখ্যাও দুই প্রকারের, একটি জন্মদিনের সংখ্যা, অপরটি জন্মতারিখের সংখ্যা। আমরা জানি একক সংখ্যা হল ১ থেকে ৯। শূন্য কোনো সংখ্যা নয়। বাকি সংখ্যাগুলি এই ১ থেকে ৯ এরই পুনরাবৃত্তি শুধু বা যৌগিক সংখ্যা। অতএব পুনরাবৃত্তির সংখ্যাগুলিকে পরস্পর যোগ করে একক সংখ্যায় আনতে হবে যতক্ষণ-না একক সংখ্যায় আসে। যেমন, ২৪ জানুয়ারি ২০১৬ এর জন্মতারিখের সংখ্যা ৭ হল যেভাবে। ২ + ৪ + ১ (জানুয়ারি মাসের সংখ্যা) + ২ + ০ + ১ + ৬ = পরস্পর যোগ করে হয় ১৬। যেহেতু ১৬ কোনো একক সংখ্যা নয়, তাই এটিকেও পরস্পর যোগ করতে হবে। যেমন, ১ + ৭ = ৮। আর জন্মদিনের সংখ্যা ৬ হল ২ আর ৪ এর যোগফল (২ + ৪ = ৬)। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাসকে ১ থেকে ১২

ধরতে হবে। অর্থাৎ যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ১, ১০, ১৯ ও ২৮ তারিখে, তাদের ১ হল জন্মদিনের সংখ্যা। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ২, ১১, ২০ ও ২৯ তারিখে, তাদের ২ হল জন্মদিনের সংখ্যা। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৩, ১২, ২১ ও ৩০ তারিখে, তাদের ৩ হল জন্মদিনের সংখ্যা। যাদের জন্ম যে কোনো মাসের ৪, ১৩, ২২ ও ৩১ তারিখে, তাদের ৪ হল জন্মদিনের সংখ্যা। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৫, ১৪ ও ২৩ তারিখে, তাদের জন্মদিনের সংখ্যা ৫। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৬, ১৫ ও ২৪ তারিখে, তাদের জন্মদিনের সংখ্যা ৬। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৭, ১৬ ও ২৫ তারিখে, তাদের জন্মদিনের সংখ্যা ৭। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৮, ১৭ ও ২৬ তারিখে, তাদের জন্মদিনের সংখ্যা ৮। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৯, ১৮ ও ২৭ তারিখে তাদের জন্মদিনের সংখ্যা ৯।

নামসংখ্যা নির্ণয়ের সূত্র হল– ইংরেজি বর্ণমালার ২৬টি বর্ণ আছে। এই ২৬টি বর্ণকে ১ থেকে ৯ সংখ্যায় আনতে হবে এইভাবে–

A, I, J, Q, Y এর মান হল ১

B, K, R এর মান হল ২

C, G, L, S এর মান হল ৩

D, M, T এর মান হল ৪

E, H, N, x এর মান হল ৫

U, V, W এর মান হল ৬

০, z এর মান হল ৭

F, P এর মান হল ৮। এই হল ২৬টি বর্ণের মান।

এবার নির্ণয় করি কারও নাম। ধরুন ANIRBAN নাম হলে তার নামসংখ্যা কত? A ১ + N ৫ + ১ + R 2 + B ২ + A ১ + N ৫ = ১৭ অর্থাৎ ১ + ৭ = ৮ এবং B ২ + A ১ + N ৫ + D ৪ + Y ১ + ০ ৭ + P ৮ + A ১ + D ৪ + H ৫+ Y ১ + A ১ + Y ১= ৪২। অর্থাৎ ৪ + ২ = ৬। পূর্ণ নামের সংখ্যা ৮ + ৬ = ১৪ অর্থাৎ ১ + ৪ = ৫। তাহলে দেখা যাচ্ছে ৮ ও ৫ দুটি সংখ্যাই এক্ষেত্রে প্রভাব রাখছে। এভাবেই সমস্ত নামের সংখ্যা নির্ণয় করা হয়।

সংখ্যা তো হল। কিন্তু সংখ্যা দিয়ে কী হবে? সংখ্যা দিয়ে ভাগ্যগণনা কীভাবে হবে? সব উল্লেখ করব না। কলেবর বৃদ্ধি না-করে দু-চারটে উল্লেখ করছি। যে জাতকের নাম সংখ্যাতত্ত্ব বিচারে ১ হয়, তাহলে তাকে ধীরস্থির ও গম্ভীর মনে হলেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে জানে, কর্মে সক্রিয়, তেজি, নির্ভীক, পরাক্রমশালী, আত্মবিশ্বাসী, অহংকারী, চতুর, বাস্তববাদী এবং উচ্চাকাঙ্খী। উচ্চাকাঙ্খ বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকে। সহজে হার স্বীকার করে না। মনোবল প্রচুর বলে ভয় পেয়ে পিছু হটে না। প্রবল বিপর্যয়ের মধ্যেও ধীরস্থিরভাবে কুটিল বুদ্ধির দ্বারা এগিয়ে যেতে পারে। অন্যকে বোকা বানাতে পারে। নিজের অবস্থান দৃঢ় করার জন্য যা করা দরকার করতে পারে। চেহারায় আকর্ষণীয় শক্তি থাকায় সহজেই অন্যেরা আকৃষ্ট হয়। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বলে সবসময় নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। কথাবার্তায় শাণিতভাব প্রকাশ পায়। নিজের ঢোল নিজে পেটায়। চাটুকাররা মন জয় করতে পারে। কোন্ কাজ কখন করতে হবে তা বোঝে। সব বিষয়ে সূক্ষ্ম দৃষ্টি রাখে। একরোখা স্বভাবের জন্য নিজের পছন্দমত না-হলে কারও কথা শুনে না। সব বিষয়ে সবার উপর কর্তৃত্ব করতে চায়। কারও অধীনে থাকা পছন্দ নয়। যে-কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। হঠাৎ রেগে যাওয়ার প্রবণতা আছে। সাংগঠনিক দক্ষতা থাকায় অন্যকে পরিচালনা করা, নেতৃত্ব দেওয়া এবং বড় বড়ড়া পরিকল্পনা ও চিন্তাধারার জন্য জনমনে

প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে। সম্মান এবং উচ্চপদও পেতে পারে। আবার নিজেই সব ভালো বুঝে এই খামখেয়ালির জন্য অনেক সময় মাশুলও দিতে হতে পারে। গ্রহ অশুভ কালে বড়ো ধরনের পতনও ঘটতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কাজে মন না দিয়ে যে-কোনো মুহূর্তে কাজে উৎসাহী। উদারতা, মানবতা, বিচক্ষণতা, ন্যায়পরায়ণতা, ধর্মভীরুতা এবং প্রতিভা যেমন আছে– তেমনি ক্রুরতা, নিষ্ঠুরতাও অসম্ভব নয়। ভ্রমণে সদা উৎসুক বলে বন, জঙ্গল, শহর ও বিদেশ ভালোবাসে। সন্তানদের প্রতি স্নেহপ্রবণ। ভাবপ্রবণতা থাকলেও বাস্তবতার বাইরে যায় না। প্রেমের ব্যাপারে কোনো চিন্তা না-করেই হৃদয় দিতে পারে। আবার সামান্য আঘাতে ভালবাসার মানুষটিকে চিরতরে ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনা। কারো ক্ষেত্রে একাধিক প্রেমে জড়িয়ে পড়াও অসম্ভব নয়।

আবার কোনো জাতকের নাম সংখ্যাতত্ত্ব বিচারে ২ হয়, তাহলে আবেগপ্রবণ, অনুভূতিশীল, কোমল হৃদয়, কল্পনাপ্রিয়, ভদ্র, নম্র, লাজুক, বৈচিত্র্যপ্রিয় ও শিল্পীমনা। তারা ভাবপ্রকাশে কুণ্ঠিত এবং তাদের মন ও চিন্তা দ্বি-ধারায় প্রবাহিত হয়। তাদের মনের স্থিরতা নেই বলে ভাবধারায় দ্রুত পরিবর্তন আসে। তাদের আত্মসম্মান জ্ঞান প্রচণ্ড। তাই আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে তারা কোনো কিছু করতে পারে না। তারা সামাজিক রীতি-নীতির প্রতি আকৃষ্ট। জীবন ও ঘর-সংসার তাদের কাছে প্রিয়। তারা আত্মত্যাগী বলে প্রিয়জনদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে জানে। তাদের জীবনের ট্র্যাজেডি হল তবুও মানুষ তাদের ভুল বুঝতে পারে! তারা সহজেই ভুল স্বীকার করতে পারে। তারা খুব অল্পতেই কষ্ট পায় এবং খুব সহজেই ভেঙে পড়ে। অন্যের বক্তব্য শোনার জন্য আগ্রহী।

কোনো জাতকের নাম সংখ্যাতত্ত্ব বিচারে ৩ হয়, তাহলে এটি বৃহস্পতির প্রতীক। চাকরি, ব্যাবসা বা ধর্মীয় বিষয়ে তারা কর্মদক্ষতা প্রমাণ করতে পারে। তারা ধীর স্থির, নিয়মানুবর্তী, বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন ও ধার্মিক। সবার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করে। তাদের জীবনে উত্থান-পতনজনিত জীবননাট্যের ক্লাইমেক্স খুব কমই দেখা যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে লোভনীয় নেতা হওয়ার সুযোগ এলেও অনেকে অনাগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। তাদের মধ্যে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একটা আধ্যাত্মিক চেতনা বৃদ্ধি পায়। এরা বিশিষ্ট সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, ধর্ম প্রচারক, শিক্ষক ও কর্মক্ষেত্রে বড়ো কর্তা হতে পারেন। কর্মক্ষেত্রে দ্রুত পদোন্নতির দৌড়ে তারাই এগিয়ে থাকেন। তাদের উচ্চাকাঙ্খা তীব্র, বুদ্ধি তীক্ষ্ণ এবং তারা পরিশ্রমী বলেই সাফল্য ধরতে তাদের দেড়ি হয়না। অনেক সময় টুকরো কথা দিয়ে তারা ঠাট্টা করতে পারে। অনেক সময় অনেক ক্ষেত্রে বেশি। কথা বলার জন্য সব কথার মধ্যে সামঞ্জস্য নাও থাকতে পারে। কেউ কেউ আবার অন্তঃমুখীও হতে পারে। তাদের যারা শত্রু হয় তারা সবাই প্রায় বুদ্ধিমান শত্রু। অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার বোঝা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে ইত্যাদি।

সংখ্যাতত্ত্ব শুধু মানবজীবনেই নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রেই সংখ্যার প্রভাব আছে বলে জ্যোতিষবাবুরা দাবি করেন। মনে করুন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। বিশ্ব বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখে যুক্তরাষ্ট্রের উপর হামলার এক মর্মান্তিক দৃশ্য। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, অর্থাৎ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার টুইন টাওয়ারটি তাসের ঘরের মতো মাটিতে মিশে গেল। গোটা বিশ্ব কেঁপে উঠল। তারপর থেকে বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সামাজ্যবাদীদের সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা হল। আর আমরা দেখতে পাই এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে এক সর্বগ্রাসী দানবের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে। সবাই যখন নাচছে, তখন জ্যোতিষীবাবুরাই-বা বসে থাকবেন কেন! তাঁরা নেচে উঠলেন, নেমে পড়লেন কোমর বেঁধে। ঘোলা জলে মাছ ধরার ফন্দি সম্বল করে। বললেন– রাষ্ট্রপতি George W. Bush–এর মোট অক্ষর সংখ্যা হল ১১টি। ১১ সংখ্যাটি হল দারুণ অশুভ সংখ্যা। সমস্ত কিছুর মূলেই আছে এই ১১।

এক নজরে তাহলে সেটাই দেখি :

(১) হামলার তারিখ ১১ সেপ্টেম্বর,

(২) হামলার তারিখ ৯/১১, অর্থাৎ ৯ + ১ + ১ = ১১,

(৩) ১১ সেপ্টেম্বর হল বছরের ২৫৪ তম দিন = ২ + ৫ + ৪ = ১১,

(৪) ১১ সেপ্টেম্বেরের পরে বছর শেষ হতে আর ১১১ দিন বাকি ছিল,

(৫) টুইন টাওয়ার পাশাপাশি দাঁড়ানো, যা দেখতে ১১,

(৬) প্রথম বিমান যেটি আঘাত হানে, সেটি ১১ নম্বর ফ্লাইট,

(৭) American Airlines মানে AA, অর্থাৎ A হচ্ছে ইংরেজি বর্ণমালার প্রথম অক্ষর, মানে American Airlines = AA = ১১,

(৮) নিউইয়র্ক স্টেট হচ্ছে ইউনিয়নে যুক্ত হওয়া ১১ নাম্বার স্টেট,

(৯) New York City, এখানেও ১১টি অক্ষর,

(১০) Afghanistan, এখানেও ১১ টি অক্ষর,

(১১) The Pentagon, এখানেও ১১ টি অক্ষর,

(১২) ফ্লাইট ১১– ৯২ অন বোর্ড –৯ + ২ = ১১,

(১৩) ফ্লাইট ৭৭– ৬৫ অন বোর্ড– ৭৭ = ১১ x ৭– ৬ + ৫ = ১১,

(১৪) Air Force One = ১১ অক্ষর,

(১৫) Saudi Arabia = ১১ অক্ষর,

(১৬) ww terrorism = ১১ অক্ষর,

(১৭) ইউ এস স্টেট সেক্রেটারি Colin Powell = ১১ অক্ষর,

(১৮) ১১ নভেম্বর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের Remembrance day, আবার নভেম্বর হল ১১তম মাস,

(১৯) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় আঘাত হানা বিমানের পাইলট ছিল Mohamed Atta, Mohamed Atta = ১১ অক্ষর।

উল্লিখিত আলোচনা থেকে আমরা কোন্ সিদ্ধান্তে আসতে পারি দেখা যাক– সিদ্ধান্ত : ১১ একটি অলৌকিক সংখ্যা, তাই ১১ সেপ্টম্বরের ঘটনাটি একটি অলৌকিক ঘটনা। বাইবেল ও বিভিন্ন প্রাচীন মিথে শয়তানের চিহ্নের সঙ্গে ১১ সংখ্যার একটা যোগ পাওয়া যায়। নিউ টেস্টামেন্টে শয়তানের চিহ্ন ৬৬৬, যা ১১ দ্বারা বিভাজ্য। ধর্মকথা শব্দটি ইংরেজি বর্ণমালা বা রোমানে লিখি, তবে দেখা যায় ‘dharmakatha’, গুনে দেখুন ১১টি অক্ষর।

১১ তে মিল পেলেন অনেক, ১১ তে অমিলও পাবেন অনেক। টুইন টাওয়ারের দুর্ঘটনায় এমন অসংখ্য বিষয়-পূর্বাপর পাওয়া যাবে যার সঙ্গে ১১ সংখ্যার বা অক্ষরের কোনো সম্পর্ক নেই। দেখুন–

(১) হামলার বছর ২০০১ = ২ + ০ + ০ + ১ = ৩– ১১ নয়।

(২) এরোপ্লেনগুলি আঘাত হানে সকাল ৯টার দিকে– ১১ টার দিকে নয়।

(৩) ৪টি বিমান হামলা করেছে– ১১ নয়।

(৪) এরোপ্লেনে লোকের সংখ্যা ২৬৬ = ২ + ৬ + ৬ = ১৪– ১১ নয়।

(৫) একটি এরোপ্লেনের নম্বর ৭৬৭ = ৭ + ৬ + ৭ = ২০– ১১ নয়।

(৬) আরেকটি এরোপ্লেনের নম্বর ৭৫৭ = ৭ + ৫ + ৭ = ১৯– ১১ নয়।

(৭) ৭৫৭ নম্বর এরোপ্লেনের ফুয়েল ক্যাপাসিটি ২০,০০০ গ্যালন– ১১ হাজার

গ্যালন নয়।

(৮) ৭৫৭ নম্বর এরোপ্লেনের ডানার দৈর্ঘ্য ১২৪ ফুট = ১ + ২ + ৪ = ৭– ১১

নয়।

(৯) ৭৫৭ নম্বর এরোপ্লেনের ডানার দৈর্ঘ্য ১৫৬ ফুট = ১ + ৫ + ৬ = ১২– ১১

নয়।

(১০) একটি টাওয়ারের উচ্চতা ১৩৬২ ফুট = ১ + ৩ + ৬ + ২ = ১২– ১১

নয়।

(১১) অন্যটির উচ্চতা ১৩৬৮ = ১ + ৩ + ৬ + ৮ = ১৮– ১১ নয়।

(১২) অন্য ফ্লাইটগুলি UA ৯৩ = ৯ + ৩ = ১২– ১১ নয়।

(১৩) UA ১৭৫ = ১ + ৭ + ৫ = ১৩– ১১ নয়।

(১৪) ফ্লাইট ১১ এর প্যাসেঞ্জার ছিল ৮১ জন = ৮ + ১ = ৯– ১১ নয়।

(১৫) Boston = ৬টি অক্ষর– ১১ নয়।

(১৬) Massachusetts = ১৩টি অক্ষর– ১১ নয়।

(১৭) Pennsylvania = ১২টি অক্ষর– ১১ নয়।

(১৮) Washington D.C. = ১২টি অক্ষর– ১১ নয়।

(১৯) Los Angeles = ১০ অক্ষর– ১১ নয়।

(২০) হাইজ্যাকারদের সংখ্যা ১৯ = ১ + ৯ = ১০– ১১ নয়।

(২১) Tony Balair = ১০ অক্ষর– ১১ নয়।

একই ঘটনাকে অন্য সংখ্যা দিয়েও প্রমাণ করা যাবে আরেকটি অলৌকিক সংখ্যা দিয়ে। ২ সংখ্যা দিয়েও কিছু ঘটনা মেলানো যাচ্ছে। দেখুন–

(১) হামলার তারিখ ১১/৯ = ১১– ৯ = ২,

(২) হামলার তারিখ ১১ সেপ্টেম্বর = ১ + ১ = ২,

(৩) ১১ সেপ্টেম্বর হচ্ছে বছরের ২৫৪ তম দিন =

২ + ৫ + ৪ = ১১ = ১ + ১ = ২,

(৪) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা => ২ টি টাওয়ার,

(৫) World Trade Center কে আঘাত হেনেছে ২ টি বিমান,

(৬) প্রতি বিমানে ২ টি ডানা আছে,

(৭) প্রথম আঘাতকারী বিমানের ফ্লাইট নাম্বার ১১ = ১ + ১ = ২,

(৮) New York = ২টি শব্দ,

(৯) The Pentagon = ২ টি শব্দ।

অনেকে ১৯ সংখ্যাটিকে খুব গুরুত্ব দেন। অথচ অনেক কিছুই আছে যা ১৯ সংখ্যার সঙ্গে খাপ খায় না। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরানের সংখ্যা দেখা যেতে পারে। যেমন দেখুন–

(১) কোরানে পারা ৩০, যা ১৯ দিয়ে বিভাজ্য নয়।

(২) কোরানে রুকু ৫৫৮ টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

(৩) সিজদাহ ১৫টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

(৪) মাক্কি সুরা ৮৬, মাদানি সুরা ২৬টি, কোনোটিই ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

(৫) নোকতা ১,০৫,৬৮৪টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

(৬) ‘আল্লাহ’ শব্দটি সংখ্যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য ধরে নিলেও (আসলে নয়)– রসুল, মোহাম্মদ সা, জিব্রাইল, মানুষ প্রভৃতি অসংখ্য শব্দ আছে যার সংখ্যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

(৭) বিসমিল্লায় ১৯টি অক্ষর থাকলেও কলেমা তাইয়েবা (“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ..”), কলেমা শাহাদাত, আউজুবিল্লাহ., এমন অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বাক্যের অক্ষর ১৯টি নয়।

(৮) সুরা ৯৬ এর অক্ষর সংখ্যা ৩০৪টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য হলেও সুরা ১, ২, ….., এমনকি ১১০ বা অন্য সুরাগুলি অক্ষর সংখ্যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

(৯) ১১০ নম্বর সুরায় শব্দের সংখ্যা ১৯টি, বাকি সুরাগুলির শব্দসংখ্যা ১৯ নয়।

৪ সংখ্যা দিয়েও অলৌকিক তত্ত্ব দেওয়া যেতে পারে। দেখুন–

(১) আল্লাহ শব্দটিতে অক্ষর ৪টি।

(২) ৪ নম্বর সুরায় আয়াত ১৭৬ = ৪ x ৪৪ = ১৭৬।

(৩) সুরা এখলাসের আয়াত সংখ্যা ৪।

(৪) সুরা এখলাসের প্রথম আয়াত যেখানে আল্লাহর একত্ব সম্বন্ধে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে (কুলহু আল্লাহু আহাদ), প্রথম আয়াতটিতে শব্দ সংখ্যা ৪টি।

(৫) সুরা এখলাস ১১২ নম্বর সুরা, যা ৪ দ্বারা বিভাজ্য =

১১২/৪ = ২৮ = ২ + ৮ = ১০ = ১ + ০ = ১ অর্থাৎ আল্লাহ এক।

(৬) কোরানে আয়াত সংখ্যা ৬২৩৬, যা ৪ দ্বারা বিভাজ্য।

(৭) আসমানি কিতাবের সংখ্যা ৪টি।

(৮) আসমানি কিতাব নাজিলকৃত রসুল ৪ জন।

(৯) প্রধান ফেরেশতা ৪ জন। অতএব প্রমাণিত হল যে কোরান অলৌকিক এবং এই ৪ সংখ্যাটি একটি অলৌকিক সংখ্যা। প্রকৃতিতেও এরকম ‘অলৌকিক’ সংখ্যার উদাহরণ হাজার হাজার পাওয়া যাবে।

নিউমেরোলজিস্টরা ১ থেকে ৯ পর্যন্ত প্রতিটি সংখ্যার জন্য আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এই বৈশিষ্ট্য উল্লেখের ব্যাপারে নিউমেরোলজিস্টদের মতামতও ভিন্ন, স্ববিরোধিতায় ভরপুর। এ ব্যাপারে অবশ্য নিউমেরোলজিস্টদের কোনো ব্যাখ্যা নেই। নিউমেরোলজি বিজ্ঞানের কোনো শর্তকেই তোয়াক্কা করে না। সংখ্যা কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে নিউমেরোলজিস্টরা বলেন –“প্রত্যেকটি সংখ্যার একটি করে তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ আছে। সেই তরঙ্গই মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে”। মনে রাখতে হবে, তড়িৎ ও চুম্বকত্ব পদার্থের দুটি মৌলিক ধর্ম, এটি পদার্থের বিশেষ অবস্থায় প্রকাশ পায়। কিন্তু সংখ্যা কোনো পদার্থ নয়, এটি একটি গাণিতিক ধারণা। অতএব সংখ্যায় তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ থাকার ব্যাপারটা হল একটি লোক ঠকানো উদ্ভট কল্পনা। আমি একজন কমুনিস্ট তথা বামপন্থী

প্রাবন্ধিককে চিনতাম, যার পিতৃদত্ত নাম ছিল জ্যোতির্ময় ঘোষ– তিনি নিউমেরোলজিস্টের পরামর্শে নাম বদলে করলেন জ্যোতি ঘোষ। তিনি পেশায় ফিজিক্সের অধ্যাপক ছিলেন। নামের বানান থেকেই যদি ভাগ্য নির্ধারিত হয়। তাহলে যে ব্যক্তিরা একাধিক নামেই বিখ্যাত, তাদের ক্ষেত্রে কোন নামটি সঠিক বলে ধরবেন? দেখুন– মানিক, সত্যজিৎ রায়; রীনা, অপর্ণা সেন; রমা, সুচিত্রা সেন; মোহর, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়; বুম্বা, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়; সুভাষচন্দ্র বসু, নেতাজি, নেতাজি সুভাষ; গান্ধিজি, বাপুজি, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি; মার্ক টোয়েন, স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লিমেন্স; এপিজে আবদুল কালাম, আবুল ফকির জয়নুলাবউদ্দিন আবদুল কালাম; পিভি নরসিংহ রাও, পামুলাপ্রতি ভেঙ্কটনরসিমহা রাও; পিটি উষা, পিলাভুল্লাকান্দি থেক্কেপরম্বিল উষা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ টেগোর ইত্যাদি। নিউমেরোলজিস্টরা যদি এদের ভাগ্যগণনা করতে নামে তাহলে তো ন্যাজে আর গোবরে হয়ে যাবেন। নাম ভিন্ন, সংখ্যাও ভিন্ন– অতএব ভাগ্যবিচারও ভিন্ন হবে। তাহলে হলটা কী! আর-একটা মোক্ষম উদাহরণ দিয়ে সংখ্যাতত্ত্বের আলোচনা শেষ করব। আডলফ হিটলার, এই ব্যক্তিকে চেনেন না এমন কোনো শিক্ষিত ব্যক্তি আছেন বলে মনে হয় না। সেই বিশ্বাস হিটলার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহানায়ক হিটলার– জন্মেছিলেন ১৮৮৯ সালে ২০ এপ্রিল। হিটলারের জন্মসংখ্যা হল ২ + ০ + ০ + ৪ + ১ + ৮ + ৮ + ৯ = ৩২ = ৩ + ২ = ৫। নিউমেরোলজিস্টদের বিচারে ৫ জন্মসংখ্যা ব্যক্তিরা দয়া ও ন্যায়নিষ্ঠায় ভরপুর হয়ে থাকেন। ইতিহাস কাঁদবে, না হাসবে?

জ্যোতিষীবাবুরা মানুষের ভাগ্য বলে দেওয়ার জন্য আরও একটি পথ খুঁজে পেয়েছেন। সেই পদ্ধতিটি হল ‘তিল’। আমি আগে কখনো শুনিনি যে মানুষের শরীরে যে তিল দেখতে পাওয়া যায়, সেই তিল দেখে নাকি ভাগ্য বলে দেওয়া যায়। বছর পঁচিশ আগে হাবড়ায় এক জ্যোতিষালয়ে বিশাল গণ্ডগোল এবং জ্যোতিষবাবুকে উত্তমমধ্যম কেলানো। জ্যোতিষীবাবু তাঁর খরিদ্দার এক তরুণীর ডান স্তনে তিল আছে বলে দাবি করেন। তরুণীটি যতই বলে তাঁর ডান স্তনে কোনো তিল নেই, জ্যোতিষবাবু ততই বলতে থাকেন তাঁর ডান স্তনে তিল আছে, থাকতেই হবে। লক্ষণ তাই-ই বলছে। তিনি আরও একবার স্তন খুলে যাচাই করতে বলে। তরুণীটি মেজাজ ঠিক রাখতে না-পারে জ্যোতিষীবাবুর ফর্সা টুকটুকে গালে সপাটে চড় কষিয়ে লাল করে দেয়। চেম্বারে নারীঘটিত গন্ধ পেয়ে বাইরে লোকজনও চলে আসে এবং জ্যোতিষীবাবুর চেম্বার তুলে দেয়। এরপর থেকে তিলের উপর আমারও বেশ আগ্রহ জন্মালো। কারণ আমার শরীরেও যে গোটা কয়েক তিল আছে! বইপত্রও কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করতে হল। যত্তসব!

প্রাচীন সমুদ্র শাস্ত্রে তিল দেখে ভাগ্য নির্ধারণের পদ্ধতি বর্ণনা করা আছে। মানুষের দেহে তিলের উপস্থিতি নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলে থাকেন।

তিল দেখে ভাগ্য নির্ধারণের প্রথা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এখনও অনেকে এ প্রথাতে বিশ্বাসী। শরীরের বিভিন্ন অংশে তিলের উপস্থিতি, রং, আকৃতি প্রভৃতি দেখে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করা। বলা হয়– পুরুষের শরীরে ডান দিকে এবং নারীদের শরীরে বাঁ দিকে তিল থাকা শুভ। আবার কোনো ব্যক্তির শরীরে ১২টির বেশি তিল হওয়া শুভ বলে মনে করা হয় না। ১২টার কম তিল হওয়া শুভ ফলদায়ক। দেশের একেক অংশে তিল একেক অর্থ বহন করে।

ভ্রূ : যাদের ভ্রুতে তিল থাকে তারা প্রায়ই ভ্রমণ করেন। ডান ভ্রুতে তিল থাকলে ব্যক্তির দাম্পত্য জীবন সুখী হয়। আবার বাঁ ভ্রুর তিল দুঃখী দাম্পত্য জীবনের সঙ্কেত দেয়।

মাথা : মাথার মাঝখানে তিল থাকলে তা নির্মল ভালোবাসার প্রতীক। ডান দিকে তিল থাকা কোনো বিষয়ে নৈপুণ্য বোঝায়। আবার যাদের মাথার বাঁ দিকে

তিল আছে তারা অর্থের অপচয় করেন। মাথার ডান দিকের তিল ধন ও বুদ্ধির চিহ্ন। বাঁ দিকের তিল নিরাশাপূর্ণ জীবনের সূচক।

চোখের মণি : ডান চোখের মণিতে তিল থাকলে ব্যক্তি উচ্চ বিচারধারা পোষণ করেন। বাঁ দিকের মণিতে যাদের তিল থাকে তাদের বিচারধারা ভালো নয়। যাদের চোখের মণিতে তিল থাকে তারা সাধারণত ভাবুক প্রকৃতির হন।

চোখের পাতা : চোখের পাতায় তিল থাকলে ব্যক্তি সংবেদনশীল হন। তবে যাদের ডান পাতায় তিল থাকে তারা বাঁ পাতায় তিলযুক্ত লোকের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল।

কান : কানে তিল থাকা ব্যক্তি দীর্ঘায়ু হন।

মুখ : স্ত্রী বা পুরুষের মুখমণ্ডলের আশপাশের তিল তাদের সুখী ও ভদ্র হওয়ার সঙ্কেত দেয়। মুখে তিল থাকলে ব্যক্তি ভাগ্যে ধনী হন। তার জীবনসঙ্গী খুব সুখী হন।

নাক : নাকে তিল থাকলে ব্যক্তি প্রতিভাসম্পন্ন হন এবং সুখী থাকেন। যে নারীর নাকে তিল রয়েছে তারা সৌভাগ্যবতী হন।

ঠোঁট : যাদের ঠোঁটে তিল রয়েছে তাদের হৃদয় ভালোবাসায় ভরপুর। তবে তিল ঠোঁটের নিচে থাকলে সে ব্যক্তির জীবনে দারিদ্র্য বিরাজ করে।

গাল : গালে লাল তিল থাকা শুভ। বাঁ গালে কালো তিল থাকলে, ব্যক্তি নির্ধন হয়। কিন্তু ডান গালে কালো তিল থাকলে তা ব্যক্তিকে ধনী করে।

থুতনিঃ যে স্ত্রীর থুতনিতে তিল থাকে তিনি সহজে মেলামেশা করতে পারেন না। এরা একটু রুক্ষ স্বভাবের হন।

কাঁধ : ডান কাঁধে তিল থাকলে সে ব্যক্তি দৃঢ়চেতা। আবার যাদের বাঁ কাঁধে তিল থাকে তারা অল্পেই রেগে যান।

হাত : যার হাতে তিল থাকে তারা চালাক-চতুর হন। ডান হাতে তিল থাকলে ব্যক্তি শক্তিশালী হন। আবার ডান হাতের পেছনে তিল থাকলে তারা ধনী হয়ে থাকেন। বাঁ হাতে তিল থাকলে সে ব্যক্তি অনেক বেশি টাকা খরচ করতে পছন্দ করেন। আবার বাঁ হাতের পেছনের দিকে তিল থাকলে সে ব্যক্তি কৃপণ স্বভাবের হন।

বাহু : যে ব্যক্তির ডান বাহুতে তিল থাকে তারা প্রতিষ্ঠিত ও বুদ্ধিমান। বাঁ বাহুতে তিল থাকলে ব্যক্তি ঝগড়াটে স্বভাবের হন। তার মাথায়ও খারাপ চিন্তাভাবনা থাকে।

আঙুল : যাদের আঙুলের তর্জনীতে তিল থাকে তারা বিদ্বান, ধনী এবং গুণী হয়ে থাকেন। তবে তারা সব সময় শত্রুদের কারণে সমস্যায় থাকেন। বৃদ্ধাঙ্গুলে তিল থাকলে ব্যক্তি কর্মঠ, সদ্ব্যবহার এবং ন্যায়প্রিয় হন। মধ্যমায় তিল থাকলে ব্যক্তি সুখী হন। তার জীবন কাটে শান্তিতে। যে ব্যক্তির কনিষ্ঠায় তিল রয়েছে তারা ধনী হলেও জীবনে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়। অনামিকায় তিল থাকলে ব্যক্তি জ্ঞানী, যশস্বী, ধনী ও পরাক্রমী হন।

গলা : গলার সামনের দিকে তিল থাকলে ব্যক্তির বাড়িতে বন্ধু-বান্ধবের আনাগোনা লেগে থাকে। গলার পিছনে তিল থাকলে সে ব্যক্তি কর্মঠ হন। কোমর : যে ব্যক্তির কোমরে তিল থাকে, তার জীবনে সমস্যার আনাগোনা লেগেই থাকে।

বুক : ডান দিকের বুকে তিল থাকা শুভ। এমন স্ত্রী খুব ভালো হয়। পুরুষ ভাগ্যশালী হয়। বাঁ দিকের বুকে তিল থাকলে স্ত্রীপক্ষের তরফে অসহযোগিতার সম্ভাবনা থাকে। বুকের মাঝখানের তিল সুখী জীবনের সঙ্কেত দেয়।

পা : যে জাতকের পায়ে তিল রয়েছে তারা অনেক ভ্রমণ করেন।

পেট : যে ব্যক্তির পেটে তিল আছে তারা খুব খাদ্যরসিক হয়। মিষ্টি তাদের অত্যন্ত প্রিয়। তবে তারা অন্যকে খাওয়াতে খুব একটা পছন্দ করে না।

হাঁটু : ডান হাঁটুতে তিল থাকলে গৃহস্থজীবন সুখী হয়। বাঁ হাঁটুতে তিল থাকলে দাম্পত্য জীবন দুঃখময় হয়।

উঃ, ভাবা যায় না। জ্যোতষীবাবুদের কী সৃজনশীলতা! তিলকে তাল করা জ্যোতিষীবাবুদের তিল প্রসঙ্গে কী বলছেন চিকিৎসা বিজ্ঞান? তিল কখনোই মানুষের ভাগ্য নির্ণায়ক ও নিয়ন্ত্রক নয়। মানুষের শরীরের তিল আদতে আপাতনিরীহ স্কিন ডিজিজ। তিল আমরা সবাই কম বেশি ফ্রিকেলস শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। যার বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে তিল বা ক্ষুদ্র চিহ্ন। এটি এমন ধরনের দাগ যার বর্ণ বাদামি, আকারে ২ থেকে ৪ মিলিমিটারের মত গোলাকার, ত্বকের সমান স্তরে অবস্থান করে এবং মূলত ত্বকের কোনো ক্ষতিসাধন করে না। তবুও সবাই এর থেকে পরিত্রাণ চেয়ে থাকেন। যদিও এটা কোনো রোগ বা শারীরিক সমস্যা নয়, এটি অনেকের কাছেই বিব্রতকর। ফর্সা ত্বকে এ দাগ বেশি পরিলক্ষিত হয়। এটা অনেকটাই বংশগত, পরিবারের কারও এ সমস্যা থেকে থাকলে আপনার হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ফ্রিকেলস সূর্য রশ্মিতে আরও বেশি প্রকট আকার ধারণ করে তাই সান এক্সপোজড জায়গাগুলিতে বেশি হতে দেখা যায়। এছাড়া সারা শরীরেই ফ্রিকেলস হতে পারে। বাজারে অনেক ব্র্যান্ডের ফ্রিকেলস আউট ক্রিম পাওয়া যায়, যার সবই কম-বেশি ব্লিচিং উপাদান দিয়ে তৈরি। আর ব্লিচিং পদার্থ আমাদের স্পর্শকাতর ত্বকের জন্য হুমকি স্বরূপ।

তিল বা ফ্রিকেলস সাধারণত দুই ধরনের হয়–

(১) এফিলাইডস এরা সমতল এবং লালচে বাদামি রঙের হয়ে থাকে। মূলত গ্রীষ্মকালে দেখা দেয় এবং শীত এলেই চলে যায়। এই রকমের ফ্রিকেলস বংশগত হতে পারে।

(২) লেনটিজাইন্স লেনটিজাইন্স সম্ভবত ছোটো ছোটো ট্যানের দাগের মতো বাদামি বা কালো রঙের হতে দেখা যায়। এ ধরনের তিল এফিলাইডস থেকেও গাঢ় রঙের হয়। আর শীতকালে চলেও যায় না। সারা বছর ব্যাপী এটি আপনার সুন্দর ত্বকে রাজত্ব করে বেড়ায়। এটিও অনেকটা বংশগত সমস্যা।

ফ্রিকেলস প্রধানত কালো বা বাদামি দাগ যা মুখের ত্বকেই বেশি হয়ে থাকে, বিশেষ করে নাকের দুই পাশের জায়গাগুলিতে। ফর্সা বা ফ্যাকাসে ত্বক এতে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। রোদের আলোতে ফ্রিকেলস আরও স্পষ্ট ও তীব্রভাবে পরিলক্ষিত হয়। এর আসল কারণ জেনিটিকাল। কারও পরিবারে বাবা-মা দুই জনের তিল থাকলে তার হওয়ার সম্ভবনা ৮০ %। আর যে-কোনো একজনের থাকলেও এ মাত্রা ৬০ থেকে ৬৫ %। রোদ ফ্রিকেলসের প্রধান শত্রু। অতিরিক্ত সূর্য রশ্মিতে ঘোরাঘুরির ফলেও হতে পারে। অনেকে আছেন গাড়িতে চলাফেরা করেও ফ্রিকেলস কবলিত হন এবং ভাবেন গাড়িতে থাকার কারণে তাঁর ত্বক হয়তো সূর্যরশ্মির দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। এটা ভুল ধারণা। গাড়ির কাঁচ ভেদ করে খুব সহজেই সূর্যরশ্মি পৌঁছে যেতে পারে আপনার ত্বকে এবং তৈরি করতে পারে ফ্রিকেলস।

এই তিল বা ফ্রিকেলস শরীর থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সম্ভব, প্রয়োজন হলে। মুখের অতিরিক্ত তিল দূর করার কতকগুলি উপায় —

(১) প্রতিদিন টক দই ব্যবহার করুন। এটি ধুয়ে ফেলবেন না, ময়েশ্চারাইজারের মতো করে লাগান এবং রেখে দিন ত্বকে।

(২) লেবুর রসে যদি আপনার এলার্জি না থাকে তবে নিয়মিত লেবুর রস লাগান। দিনে যতবার ইচ্ছা ব্যবহার করুন। দ্রুত ফল পাবেন।

(৩) মৌসুমি ফল ও সবজি দিয়ে ফেসপ্যাক বানিয়ে ব্যবহার করুন। এতে থাকতে পারে আলু, শশা, গাজর, লাউ, বাঁধাকপি, এপ্রিকট, স্ট্রবেরি, টমেটো ইত্যাদি।

(৪) দুধ দিয়ে মুখ ধুতে পারেন।

(৫) মধু সামান্য গরম করে আক্রান্ত স্থানে লাগালেও উপকার পাবেন।

(৬) পার্সলি রসের সঙ্গে লেবুর রস, কমলার রস এবং গাজরের রস মিশিয়ে নিন সমান পরিমাণে। এটি ব্যবহার করতে পারেন আপনার রেগুলার ক্রিম ব্যবহার করার ঠিক আগে। এতে ফ্রিকেলস দেখা যাবে না।

(৭) চিনি ও লেবুর রসের স্ক্রাব ভালো কাজে দেয়।

(৮) কাঁচা হলুদের রস ও তিলের গুঁড়ো একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। জল দিয়ে পেস্টের মতো তৈরি করে আক্রান্ত জায়গায় লাগান।

(৯) নিয়মিত তরমুজের রস ব্যবহারে ফ্রিকেলসের দাগ হালকা হয় অনেকটাই।

অতিরিক্ত তৈলাক্ত থাকা, বয়সের প্রভাব, রোদে পোড়া, ড্রাগ নেওয়া, হরমোনের প্রভাব বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে মুখের ত্বকে কালো বা ফ্যাকাশে অগণিত তিল দেখা যায়। এর কোনোটি সামান্য উঁচু হয়, আবার কোনোটি চামড়ার উপর অযাচিত তিলের রং ধরে। এই স্কিন পিগমেন্টেশন তৈলাক্ত ত্বকের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। লোমকূপের ফাঁকে ফাঁকে তেল জমে থেকে একসময় সমস্যাটি হতে পারে। এই সমস্যা সমাধানে নিজেই নিতে পারেন। আরও কয়েকটি কার্যকরী ব্যবস্থার মাধ্যমে। শিখে নেওয়া যাক, প্রাকৃতিকভাবে স্কিন পিগমেন্টেশন সারিয়ে তোলার সহজ উপায়।

(১) টমেটো মাস্ক; এক চামচ পাকা টমেটোর রসের সঙ্গে এক চামচ ভেজানো ওটস ও আধা চামচ টকদই ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এবার মিশ্রণটি আক্রান্ত স্থানে ভালোভাবে লাগিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর কুসুম গরম জলে মুখ ধুয়ে হালকা মশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন। টমেটোর রস পিগমেন্টেশনের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত কাজ করে থাকে। তাই সপ্তাহে কমপক্ষে ৪ দিন নিয়মিত ব্যাবহার করলে দ্রুত পিগমেন্টেশন দূর হবে।

(২) হলুদের মাস্ক : রোদে পোড়ার জন্য যে তৈরি পিগমেন্টেশন সারাতে হলুদ গুড়ো অনেক উপকারী। এক টেবিল চামচ হলুদ গুড়োর সঙ্গে এক টেবিল চামচ লেবুর রস দিয়ে পেস্ট তৈরি করে নিন। এবার ঘুমানোর আগে আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে কুসুম গরম জলে মুখ ধুয়ে নিন। এই প্যাকটি দিনেও ব্যাবহার করা যাবে। কিন্তু এটা লাগিয়ে কখনো রোদে মুখ শুকানো যাবে না, এতে করে স্কিন কালো হয়ে যেতে পারে।

(৩) এলোভেরা জেল : শুধু এলোভেরা জেল সম্পূর্ণ মুখে ৩০ মিনিট অথবা সারারাত লাগিয়ে রাখুন। এরপর সকালে ঘুম থেকে উঠে অথবা লাগানোর ৩০ মিনিট পর কুসুম গরম জলে মুখ ধুয়ে নিন। যে-কোনো ধরনের পিগমেন্টেশনের জন্য এলোভেরা জেল খুবই উপকারী। সবচেয়ে ভালো ফলাফল পাওয়ার জন্য এটি প্রতিদিন রাতে ব্যাবহার করতে পারেন।

(৪) কমলার মাস্ক : স্কিন পিগমেন্টেশন থেকে মুক্তি পেতে আরেকটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি হচ্ছে কমলার রস। এক্ষেত্রে ১ চামচ কমলার রসের সঙ্গে ১ টেবিল চামচ লেবুর রস ও আধা চামচ গোলাপ জল মিশিয়ে আক্রান্ত স্থানে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য লাগিয়ে রাখুন। ফ্রেশ কমলার রশ না-পাওয়া গেলে কমলার শুকনো খোসা গুড়ো করেও এই ফেসপ্যাকটি তৈরি করা যায়। এটা সপ্তাহে দুই থেকে তিন বার করলে অনেক উপকার পাওয়া যাবে।

তিল বিশ্বাসীরা এবার নিশ্চয় খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন! ভাবছেন তিল ভ্যানিশ করে দিলে কী হবে ভাগ্যের ভবিষ্যৎ? আপনি ভাগ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেই পারেন, কিন্তু আমি ভাবব গবেষকদের নিদান। ব্রিটেনের প্রায় তিন হাজার জনের উপর সমীক্ষা চালিয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ জার্নাল অব ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হচ্ছে, তিল বা আঁচিলের যে-কোনো অস্বাভাবিকতাই ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। গবেষকদের মতে, শরীরে তিল বা আঁচিলের সংখ্যা থেকে ত্বকের ক্যান্সারের বিষয়ে ধারণা করা যায়। কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষকেরা প্রায় আট বছর ধরে নারীদের ওপর গবেষণা চালিয়েছেন এবং সেসব নারীদের ত্বকের ধরন, তিল ও আঁচিলের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করেন। এর পাশাপাশি ত্বকের বিশেষ এক ধরনের ক্যানসার যেটিকে মেলানোমা বলা হয় ওই মেলানোমায় আক্রান্ত চারপোজন নারী ও পুরুষের ওপর গবেষণা চালান গবেষক দল। গবেষণা ফলাফলে দেখা যায়, যেসব নারীর ডান হাতে সাতটির বেশি তিল বা আঁচিল রয়েছে, তাদের ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। আর যাদের ডান হাতে ১১টির বেশি তিল বা আঁচিল আছে এবং সারা শরীরে একশোটির বেশি তিল বা আঁচিল আছে, তাদের মেলানোমার ঝুঁকি অনেক বেশি। গবেষকদের মতে, শরীরে কোনো তিল বা আঁচিল দেখে অস্বাভাবিক মনে হলে বা ব্যথা হলে অবশ্যই তাড়াতাড়ি কোনো ত্বকের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। প্রয়োজনে সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে।

বর্তমানে জ্যোতিষবাবুরা জ্যোতিষকে শাস্ত্র বলে চালাতে চায়, অনেকে আবার একটু দুঃসাহসিক হয়ে বিজ্ঞানও বলে থাকেন। বেদে জ্যোতিষশাস্ত্রের কথা নেই। বৈদিক যুগে জ্যোতিষ বলতে বোঝাত দিন, বছর, ঋতু ইত্যাদির গণিতসিদ্ধ বিচার পদ্ধতি। সেখানে আছে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের সঙ্গে বৃষ্টি ও কৃষি সম্বন্ধীয় বিষয়। এই গ্রহ-নক্ষত্রদের সঙ্গে মানুষের ভাগ্য যুক্ত করা হয়নি। এই জ্যোতিষে ভবিষ্যকথন নেই, ভাগ্যকথা নেই, গ্রহ-নক্ষত্রের অহেতুক রাগরোষের কথা নেই। শুভাশুভ বিচার মুখ্য নয়। সংখ্যার রহস্যে আরোপ নেই। এই জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রিস যাযাবরদের হাত ধরে জ্যোতিষ হয়ে গেল। বস্তুত ভারতে গ্রিক শাসনের অবসানের পর রেখে গেছে মূর্তিপুজোর ধারণা, গণিত এবং অবশ্যই জ্যোতিষ। গ্রিকদের এই জ্যোতিষের মধ্যেই যেমন জ্যোতির্বিদ্যা ছিল, ছিল ঋতুকাল নির্ণয়। তেমনই গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণের আজগুবি বকওয়াস। এই বকওয়াসের জনক ছিলেন ব্যাবিলনের রাজারা, যাঁরা একইসঙ্গে পুরোহিত। তৎকালীন সমাজে ধর্মযাজকরাই শাসক হতেন। সম্ভবত ইরানের আয়াতোল্লা খোমেইনিই ছিলেন সর্বশেষ ধর্মীয় শাসক। যাই হোক, ব্যাবিলন থেকে গ্রিস, গ্রিস থেকে ভারতে সংক্রামিত হল জ্যোতিষ ভণ্ডামি। আলেকজান্ডারের আগমনের পর থেকে ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়কাল ফলিত-জ্যোতিষ’, অর্থাৎ মানুষের ভাগ্য গণনার বকওয়াস পদ্ধতি ভারতে টিমটিম করত– যত দিন যাচ্ছে, মানুষের চাহিদা বাড়ছে, না-পেয়ে হতাশ হচ্ছে ততই জ্যোতিষীবাবুদের রমরমা বাড়ছে। গলিতে গলিতে এখন জ্যোতিষী গড়াচ্ছে। হোর্ডিংয়ে ছড়াছড়ি। কত জ্যোতিষবাবু সরকারি চাকরিও করছেন, তৎসহ অতিরিক্ত রোজগার করছেন হাত দেখে, পাথর বেচে। অফিসের কলিগদের কাছেও পাথর বেচছেন। অথচ তৎকালীন সময়ে এইসব গ্রিক যাযাবর সম্প্রদায়ের মানুষরা ব্রাত্য বা পতিত বলে বিবেচিত হত (‘বৃহৎসংহিতা’ পড়ুন)। বৈদিক যুগে যে ভাগ্য বিচার ছিল ব্রাত্য, সেই ব্রাত্য সমাজের উঁচুস্তরে উঠে এসেছে এক শ্রেণির অন্ধ মানুষদের জন্য।

ভারতীয় জ্যোতিষীদের কাছে বরাহমিহিরই ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের জনক। তিনিই ভারতীয় ফলিত-জ্যোতিষের, অর্থাৎ গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে ভাগ্যযুক্ত তত্ত্ব আদলটি সৃষ্টি করেন। কোন্ গ্রহদোষ কাটাতে কোন্ রত্ন ধারণ করতে হবে সেটাও বরাহমিহিরের মস্তিষ্কপ্রসূত। বরাহমিহিরের সময়কালে ফলিত জ্যোতিষকে ‘যবনশাস্ত্র বলা হত। আর্যরা এদেরকে ঘৃণা করতেন। গ্রিক যাযাবরেরাই মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে রোজগার করত, পেট চালাত। বস্তুত সমাজে ভাগ্য-গণকদের কোনো মর্যাদা ছিল না। ম্লেচ্ছ’ বলে অবজ্ঞা করা হত। অবশ্য ভাগ্য-গণকদের হয়ে বরাহমিহিরই এগিয়ে এলেন। বরাহমিহির বুঝলেন মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিলে মানুষ খুব খুশি হয়। মানুষকে খুশি করলে রোজগারও মন্দ হয় না। অতএব বরাহমিহিরই ভাগ্য-গণকদের জাতে তুলতে উঠেপড়ে লাগলেন। কিছু বইপত্রও লিখে ফেললেন। মনে রাখতে হবে, এই বরাহমিহিরই আর্যভট্টের আহ্নিক গতি তত্ত্ব মানতেন না। আর্যভট্টের সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ তত্ত্বও বিশ্বাস করতেন না। আমরাও কি আর্যভট্টের সিদ্ধান্ত বা তত্ত্ব মানলাম! যদি মানতাম তাহলে আর্যভট্টের চাইতে বরাহমিহির কিংবদন্তি হতে পারত না। ভারতে আজ আর্যভট্ট চরম উপেক্ষিত, অপরদিকে বরাহমিহিরের পুজো হচ্ছে। বরাহমিহিরের মতো ব্রহ্মগুপ্তও আর্যভট্টকে মানতেন না। ব্রহ্মগুপ্ত আর্যভট্টের গ্রহণতত্ত্বকে না-মেনে রাহু-কেতুর গল্পকেই বিশ্বাস করতেন। ভাবা যায়, ইনিই নাকি ষষ্ঠ শতকে ভারতীয় বিজ্ঞান চর্চায় বিশিষ্ট ব্যক্তি!

বিজ্ঞানের কিছু প্রাচীন শাখার মতো জ্যোতির্বিজ্ঞানও একটি সময় পর্যন্ত জ্যোতিষশাস্ত্রের মতো অপ-বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ভেবে দেখুন তো, কেমিস্ট্রি মানে রসায়ন ছিল অ্যালকেমি বিদ্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারণ প্রাচীনকালে পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা ও গাণিতিক হিসাব পদ্ধতি অনুন্নত থাকার ফলে সে সময় ব্যক্তি বিশ্বাসের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ তালগোল পাকিয়ে এ ধরনের অপ-বিজ্ঞানের জন্ম নেয়। যাই হোক, সেই সময়কার মানুষজন রাতের আকাশ দেখে বুঝতে পেরেছিল যে, বছরের বিভিন্ন সময়ে কিছু নিদিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলের আবির্ভাব ঘটে। এসব পর্যবেক্ষণ তাদেরকে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সম্পর্কে বেশ আগে থেকেই পূর্বাভাস দিতে পারত। যেমন মিশরের প্রাণ নিলনদের বন্যা বছরের একটি নিদিষ্ট সময়ে হত এবং বন্যায় ভেসে আসা পলিতে উর্বর জমিতে ভালো চাষ হত। একটি নিদিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলে সূর্যের অবস্থানই তাদের বন্যার আগমনের কথা জানান দিত। এইভাবে ক্রমেই তারা চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্রের নিয়মবদ্ধ চলাচল আবিষ্কার করেছিল এবং আকাশে চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্রের অবস্থান ধীরে ধীরে তাদের ধর্মীয়, সামাজিক রীতিনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। আকাশে চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্রের নিয়মবদ্ধ চলাচল আবিষ্কার হওয়ার ফলে বর্ষপঞ্জি তৈরি হয়। কোথাও তৈরি হয় সৌর বর্ষপঞ্জি, আবার কোথাও চন্দ্র বর্ষপঞ্জি। সুমেরীয়রা ও ব্যাবিলনীয়ানরাই প্রথম বছরকে ১২ টি মাসে ভাগ করে। জ্ঞাত তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন মাসে বিভিন্ন নক্ষত্র মণ্ডলের উপস্থিতি দেখে ব্যাবিলনীয়ানরাই ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সর্বপ্রথম রাশিচক্র প্রণয়ন করে। পরে তা মহাবীর আলেকজান্ডারের হাত ধরে মিশর, গ্রিসে, ভারতে আসে। এছাড়া ব্যাবিলনীয়ানরা ৭৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই তখনকার আবিষ্কৃত পাঁচটি গ্রহের সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক তালিকা প্রণয়ন করেন। এর প্রায় ৯০০ বছর পর এই তালিকা ব্যবহার করে টলেমি গণিত সহযোগে ভূকেন্দ্রিক মানে পৃথিবী কেন্দ্রিক বিশ্ব মডেলের ধারণা দেন। কোপার্নিকাসের পূর্ব পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই মডেলের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আর এটিই এখন জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রামাণ্য মডেল। এই টলেমিতেই জ্যোতির্বিজ্ঞান আর জ্যোতিষশাস্ত্র মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। একদিকে তার ‘আলমেজেস্ট’ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক অনন্য গ্রন্থ, অপরদিকে তাঁর ‘টেট্রাবিবলস’ জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, বলতে গেলে এটি জ্যোতিষীদের কাছে বাইবেলের মতো। অর্থাৎ, সে সময় একই ব্যক্তি একসঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা করত। আর সে। সময়ের রাজা বাদশাহদের জ্যোতির্বিজ্ঞানের বদলে জ্যোতিষশাস্ত্রে পৃষ্ঠপোষকতা এর অন্যতম একটি কারণ। তবে জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান আলাদা বা স্বতন্ত্র হতে শুরু করল ষোড়শ শতকে কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক সৌর মডেলের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে। এর ফলে টলেমির ভূকেন্দ্রিক মডেল বাতিল হয়ে যায়। তবে মোটা দাগে বলতে গেলে কেপলারের (১৫৭১-১৬৩০) পর থেকেই এই দুটি বিষয় পৃথকভাবে চর্চা হতে শুরু করে। কেপলারের সকল কাজ জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর হলেও তাঁর মাঝে জ্যোতিষশাস্ত্রের ভালো রকমের চর্চা লক্ষ করা যায়। পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক হিসাব পদ্ধতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কোপার্নিকাস, টাইকো, কেপলার, গ্যালিলিওদের হাত ধরে ধারাবাহিক ক্রমবিকাশের মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞান তাঁর আজকের অবস্থানে এসেছে। অপরপক্ষে ধীরে ধীরে রাজতন্ত্র বিলোপ এবং জ্যোতিষীদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় উপস্থিতি, কদর হ্রাস পেতে থাকলে এই শাস্ত্রটির ব্যাপক ভাবে সামাজিকীকরণ ঘটে।

কাকে বলবেন! ভূত তো সরষের মধ্যেই ঢুকে বসে আছে। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে তাবড় তাবড় শিক্ষিতজন বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত জ্যোতিষ বিশ্বাস করে, এরাও কোনো যুক্তি-ব্যাখ্যা-কার্য-কারণের ধার ধারে না। এ যেন আর্ক লাইটের নীচে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের গায়ে কালি ঢেলে দেওয়া। সেই কারণে এরাও দিন-ক্ষণ-তিথি-নক্ষত্র বিচার করেই বিয়ে-শ্রাদ্ধ-অন্নপ্রাশন গৃহপ্রবেশ করে থাকেন। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীও দিন-ক্ষণ মেনেই প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসনে বসেন। চলচ্চিত্রের পরিচালক- অভিনেতাও দিন-ক্ষণ দেখেই শুভ মহরৎ করেন। এমনকি সেই মুভি যদি জ্যোতিষ ও জ্যোতিষীদের বিরুদ্ধেও হয়, সেটাও দিন-ক্ষণ দেখেই হবে। দিন-ক্ষণ-তিথি-নক্ষত্রের কথাই যখন উঠল, তাহলে বাঙালিদের একমাত্র প্রিয় গ্রন্থ ‘পঞ্জিকা’ নিয়ে আলোকপাত করা যাক। এমন একটি বাঙালি হিন্দুঘর পাওয়া যাবে না, যাঁর ঘরে ‘পঞ্জিকা নেই। অবশ্য শুধু বাঙালি-হিন্দু নয়, ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও ‘শুভদিন’ দেখার প্রথা আছে।

বর্ষপঞ্জি বা পঞ্জিকাকে বাদ দিয়ে ধর্মপ্রাণা ভিতু মানুষদের এক দণ্ডও চলে না। জ্যোতিষবাবুদের মতে ‘পঞ্জিকা বছরের প্রতিদিনের তারিখ, তিথি, শুভাশুভ ক্ষণ, লগ্ন, যোগ, রাশিফল, বিভিন্ন পর্বদিন ইত্যাদি সংবলিত গ্রন্থ। একে পঞ্জি বা পাঁজিও বলা হয়। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে একে বলা হয়েছে ‘পঞ্চাঙ্গ। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও এটি এই নামে পরিচিত। এর কারণ এতে বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণ প্রধানত এই পাঁচটি অঙ্গ থাকে। বাংলায় অবশ্য এটি ‘পঞ্জিকা’ নামেই সুপরিচিত। সভ্যতা বিকাশের শুরু থেকেই সমাজসচেতন ব্যক্তিদের চিন্তা-চেতনায় কালবিভাগের ধারণাটি আসে। প্রয়োজনের তাগিদে তখন বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন উপায়ে বছর, মাস, দিন ও তারিখ গণনার কৌশল আবিষ্কৃত হয়। কালক্রমে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের পাশাপাশি পূজা-পার্বণের সময় নিরূপণও পঞ্জিকা প্রণয়নের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কালনিরূপণে বিভিন্ন দেশে ভিন্নরকম পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। বৈদিক যুগের ঋষিরা বিভিন্ন ঋতুতে নানারকম পূজা-পার্বণ করতেন। সেই কারণে তাঁরা বিশেষ ঋতুবিভাগের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। এসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তাঁরা ঋতুভিত্তিক বছর হিসাব করে বছরকে উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন এই দু-ভাগে ভাগ করতেন। সূর্য উত্তরদিকে আগমন করা থেকে উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণদিকে যাত্রা করা থেকে দক্ষিণায়ন গণনীয় হত। প্রাচীন মনীষিগণ বছরকে বারো ভাগে বিভক্ত করেন। যেমন– তপঃ, তপস্যা, মধু, মাধব, শুক্র, শুচি, নভস্, নভস্য, ইষ, ঊর্জ, সহস্ ও সহস্য। তপঃ থেকে শুচি পর্যন্ত উত্তরায়ণ এবং নভস্ থেকে সহস্য পর্যন্ত দক্ষিণায়ন। অনুমান করা হয় যে, এরূপ সময়বিভাগ যর্জুবেদের কালে (১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) প্রচলিত ছিল। তিথির প্রচলন হয় অনেক পরে। শুধু সেই সময়কালে পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও অষ্টকা ব্যবহৃত হত। কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে গণনা করে ২৭টি বা ২৮টি নক্ষত্রে ভূচক্রকে বিভক্ত করা হত। এটাই এতদঞ্চলের পঞ্জিকা গণনার আদিরূপ। বৈদিক সাহিত্যে ফাল্গুনী পূর্ণিমার উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে অনুমিত হয় যে, তখন চান্দ্রমাস গণনার প্রচলন ছিল, যা পূর্ণিমান্ত মাস নামে পরিচিত।

১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি পঞ্জিকায় বছর আরম্ভ হত উত্তরায়ণ দিবস থেকে এবং তাতে ১২টি চান্দ্রমাস ব্যবহৃত হত। এই পঞ্জিকায় ৩০টি তিথি এবং ২৭টি নক্ষত্র গণনার নিয়ম ছিল। তখন প্রতি পাঁচ বছরে একটি যুগ গণনা করা। হত এবং এক যুগ পরপর এই পঞ্জিকা গণনার পদ্ধতি আবর্তিত হত। ওই সময় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তিথ্যন্ত প্রভৃতি কাল গণনার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। মাত্র মধ্যমমানে প্রতিদিন এক তিথি এক নক্ষত্র এই হিসেবে তিথ্যাদি নির্ণয় করা হত এবং মাঝে মাঝে এক-একটি তিথি হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হত। পঞ্চবর্ষাত্মক যুগ ব্যতীত কোনো অব্দ গণনার প্রথা তখনও প্রবর্তিত হয়নি। দেড় হাজার বছর ধরে কালগণনা ও পূজা-পার্বণের সময় নিরূপণের কাজে এরূপ বেদাঙ্গজ্যোতিষ পঞ্জিকা খুবই সমাদৃত ছিল। গবেষকরা খ্রিস্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে তাঁরা সূক্ষ্ম গণনার কৌশল আয়ত্ত করেন। এসব বিষয়ে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তাঁরা হলেন আর্যভট্ট, বরাহমিহির, ব্ৰহ্মগুপ্ত প্রমুখ। তাঁরা পঞ্জিকার গণনাকে জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তিথ্যাদির সূক্ষ্ম কালগণনার সূত্রাদি দ্বারা দৈনিক গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, লগ্ন, ক্ষণ, তিথি প্রভৃতির পূর্তিকাল পঞ্জিকার মধ্যে পরিবেশনের ব্যবস্থা করেন। এতে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সহজেই পঞ্জিকা থেকে পাওয়া যেত। এক্ষেত্রে সূর্যসিদ্ধান্ত জ্যোতির্বিদ্যার একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও মূল্যবান গ্রন্থ। পরে সূর্যসিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পঞ্জিকার সবকিছু গণনা করা হত। পঞ্জিকার মধ্যে তখন স্থান পেত বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণযুক্ত প্রতিদিনের পঞ্চাঙ্গ এবং তা তালপাতায় লিপিবদ্ধ করে গণকঠাকুর বা ব্রাহ্মণরা বছরের প্রারম্ভে গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে মানুষদেরকে অবহিত করতেন বা জনগণের সুবিধার্থে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এর অনুলিপি সংরক্ষণ করতেন। এসবের ভিত্তিতে পূজা-পার্বণাদি বা ধর্মকৃত্য সাধনের কালও নির্ণয় করা হত।

সিদ্ধান্ত জ্যোতিষশাস্ত্রের উদ্ভবের আগে পঞ্জিকায় দৈনন্দিন গ্রহাবস্থান লেখা হত না। ক্রমে ক্রমে পঞ্চাঙ্গের সঙ্গে গ্রহসঞ্চারকালও পঞ্জিকায় লিপিবদ্ধ হতে থাকে। বিগত ১০০ বছরের অধিককাল যাবৎ বাংলা পঞ্জিকা মুদ্রিত হচ্ছে। পঞ্জিকায় এখন ফলিত জ্যোতিষের অনেক কিছু অর্থাৎ গ্রহ-নক্ষত্রের দৈনিক অবস্থানসমূহও পাওয়া যাচ্ছে। এখনকার পঞ্জিকায় ফলিত জ্যোতিষও বিশেষ স্থান দখল করেছে। জনগণের চাহিদার দিকে দৃষ্টি রেখে এখন পঞ্জিকায় বর্ষফল, মাসফল, রাষ্ট্রফল, দৈনিক রাশিফল প্রভৃতি মুদ্রিত হচ্ছে।

প্রাচীনের মধ্যে স্মার্ত রঘুনন্দন সম্পাদিত নবদ্বীপ পঞ্জিকার নাম পাওয়া যায়। রঘুনন্দনের পরে এর গণনার দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে রামরুদ্র বিদ্যানিধি (রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ে) এবং বিশ্বম্ভর জ্যোতিষার্ণব। কিছুদিন পরে এর গণনাকার্য বন্ধ হয়ে যায়। ইংরেজ আমলে কৃষ্ণনগরের জনৈক সমাহর্তার প্রচেষ্টায় বিশ্বম্ভর পুনরায় পঞ্জিকা প্রকাশের কার্যক্রম আরম্ভ করেন। এটি তখন পুথির আকারে লিখিত হত। ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে পঞ্জিকাটি মুদ্রিতাকারে প্রকাশিত হতে থাকে। তখন এটিই ছিল প্রথম মুদ্রিত পঞ্জিকা। পরবর্তীকালে ১২৯৭ বঙ্গাব্দ (১৮৯০) থেকে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা প্রকাশিত হতে থাকে। অনুরূপ পঞ্জিকা বোম্বাই ও পুনা থেকেও প্রকাশিত হয়। পঞ্জিকার সর্বশেষ সংস্কার করা হয় ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকারের তত্ত্বাবধানে। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সভাপতিত্বে একটি পঞ্চাঙ্গ শোধন সমিতি (ক্যালেন্ডার রিফর্ম কমিটি) গঠন করে প্রচলিত পঞ্জিকাগুলির গণনাপদ্ধতির নিরীক্ষা ও প্রয়োজনবোধে সংস্কারের জন্য সুপারিশ করা হয়। এই সমিতির পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পঞ্জিকা প্রকাশনার দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়। সে মতে ভারতে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে পঞ্জিকা প্রকাশিত হতে থাকে। বর্তমানে তা ১২টি ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলা পঞ্জিকায় বাংলা, ইংরেজি ও হিজরি সনের তারিখ, মাস ও বছরের উল্লেখ থাকে। বাংলা বর্ষপঞ্জি গণনার সনাতন নিয়মে কোন্ বছরের কোন্ মাস কত দিনে হবে তা আগে থেকে নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তা ছাড়া উক্ত গণনাপদ্ধতিতে কোনো মাস ২৯ দিনে আবার কোনো মাস ৩২ দিনে হয়ে থাকে। এ বিষয়টিকে জীবনের সর্বত্র বাংলা সন ব্যবহারের প্রধান অন্তরায় হিসাবে বিবেচনা করে ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে মোহম্মদ শহিদুল্লাহর সভাপতিত্বে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত সংস্কার কমিটির প্রস্তাব অনুসারে বছরের প্রথম ৫ মাস ৩১ দিনের এবং পরবর্তী ৭ মাস ৩০ দিনের করা হয়। ১৯৮৮ সাল থেকে সরকারিভাবে খ্রিস্টীয় সনের পাশাপাশি বাংলা সন লেখার রীতি চালু হয় এবং তখন থেকে শহিদুল্লাহ কমিটির প্রস্তাবিত গণনাপদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে বাংলা বর্ষপঞ্জির সম্পৃক্তির বিষয়টি মনে রেখে এবং প্রস্তাবিত গণনাপদ্ধতিকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও গ্রেগরীয় বর্ষগণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে একই বছর বাংলা একাডেমিতে একটি শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। পঞ্জিকাকে আরও উন্নত ও ত্রুটিমুক্ত করার জন্য ১৯৯৫ সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রেরণায় একটি ‘টাস্ক ফোর্স’ গঠন করা হয়। পঞ্জিকা সংস্কারের জন্য তাদের সুপারিশ ছিল এরকম– (১) সাধারণভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জি বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাস ৩১ দিনে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত প্রতিমাস ৩০ দিনে গণনা করা হবে।

(২) গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অধিবর্ষে যে বাংলা বছরের ফাল্গুন মাস পড়বে, সেই বাংলা বছরকে অধিবর্ষরূপে গণ্য করা হবে এবং সেই বছরের ফাল্গুন মাস ৩১ দিনে গণনা করা হবে।

(৩) ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে এটি কার্যকর হবে এবং তারিখ পরিবর্তনের সময় হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুসারে রাত ১২টায়। জনকল্যাণে গৃহীত এ পদক্ষেপ সর্বত্র প্রশংসিত হয়।

পঞ্জিকার ক্ষেত্রে চাঁদের তিথি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়। পূর্ণ চান্দ্রমাসের স্থায়িত্ব ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা, ৪৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড বা ২৯.৫ দিন। চাঁদ ৩৬০ ডিগ্রি অতিক্রম করে ২৯.৫ দিনে, তা হলে এক দিনে অতিক্রম করে ৩৬০ + ২৯.৫ = ১২.২০ ডিগ্রি, অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় অতিক্রম করে ১২.২০ ডিগ্রি। তার মানে এক দিনের চাঁদ পশ্চিম দিগন্তের ১২.২০ ডিগ্রি ওপরে ওঠে। আবার চাঁদ যখন অস্ত যায় তখন ১ ডিগ্রি অতিক্রম করতে সময় লাগে ৪ মিনিট, তা হলে ১২.২০ ডিগ্রি অতিক্রম করতে লাগে ১২.২০ x ৪ = ৪৮.৮০ মিনিট এবং সর্বোচ্চ ৫০.৫২ মিনিট বা ৫১ মিনিট। অর্থাৎ প্রথম দিনের চাঁদ ৫১ মিনিটের বেশি পশ্চিম আকাশে থাকতে পারে না।

এই হল পঞ্জিকা। বস্তুত তিথি ও দিনের অংশকে বিভিন্ন করণ এবং যোগ নাম দিয়ে, তাদের শুভ অথবা অশুভ হিসাবে নির্ণয় করা সম্পূর্ণভাবে কল্পনাবিলাস, অবৈজ্ঞানিক জ্যোতিষগিরি! একটু আলোচনা করা যাক। মূলগতভাবে ভারতে দুই প্রকারের পঞ্জিকা দেখা যায়। একটি দৃকসিদ্ধ, অপরটি অদৃকসিদ্ধ। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ ইত্যাদি হল দৃকসিদ্ধান্ত। অন্যটি গুপ্তপ্রেস, পি এম বাগচি ইত্যাদি পঞ্জিকাগুলি অদৃকসিদ্ধ (বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিরা ‘লোকনাথ ডাইরেক্টরি পঞ্জিকা’ এবং মুসলিম বাঙালিরা মোহাম্মদী পকেট পঞ্জিকা অনুসরণ করেন)। দূরবীন দিয়ে দেখা জ্যোতিষ্কদের অবস্থানের সঙ্গে গণিতের অবস্থানের সমন্বয় সাধনের নিরন্তর প্রক্রিয়ার ফলে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এফিমেরিসে অবস্থানগত নির্ভুল তথ্যাদি পাওয়া যায়। দৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা জ্যোতিষ্কদের অবস্থান সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এফিমেরিস থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রতিনিয়ত সব তথ্য আপডেট হয়ে থাকে। অপরদিকে, আনুমানিক ৪০০

খ্রিস্টাব্দে রচিত ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ গ্রন্থের উপর ভিত্তি করেই অদৃকসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার প্রণেতাদের যত দৌড়াদৌড়ি। সূর্যসিদ্ধান্ত যে সময় রচিত হয়েছিল তখনও পর্যন্ত দূরবীন আবিষ্কার হয়নি। খালি চোখে জ্যোতিষ্কদের কতটুকু দেখা যায়! বস্তুত অদৃকসিদ্ধ পঞ্জিকার প্রণেতারা সূর্যসিদ্ধান্ত অনুসারে যে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান। গণনা করেন তা প্রকৃত অবস্থানের সঙ্গে এক্কেবার মেলে না। কারণ বিশাল মহাকাশে গ্রহদের নির্ভুল অবস্থান জানার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের ‘অয়নচলন’ সূর্যসিদ্ধান্ত গ্রন্থে নেই। অদৃকসিদ্ধান্ত অনুসারে সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ নির্ণয় করলে সব গুবলেট হয়ে যাবে। তাই এঁরা সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ নির্ণয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারেই করে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে অদৃকসিদ্ধান্তের প্রণেতাদের একমাত্র অবলম্বন ‘বাণবৃদ্ধিরসক্ষয়’। বাণবৃদ্ধিরসক্ষয়’ সূত্র অনুসারে তিথি বৃদ্ধি ৬৫ দণ্ডের বেশি এবং তিথি হ্রাস ৫৪ দণ্ডের কম হবে না, জ্যোতির্বিজ্ঞান এ সংজ্ঞা মেনে চলে না।

আমাদের পঞ্জিকায় যেন দেবতার বাণী। পঞ্জিকা ছাড়া এক পা-ও চলতে পারে না। কতটুকু মানেন? ঠিক যতটুকু ব্যক্তিগতভাবে কোনো অসুবিধা হয় না ততটুকুই। সামান্যতম অসুবিধা থাকলে নিকুচি করেছে পঞ্জিকার! অতএব নৈব নৈব চ। পঞ্জিকা বলছে –রবিবারের পঞ্চম, সোমবারের দ্বিতীয়, মঙ্গলবারের ষষ্ঠ, বুধবারের তৃতীয়, বৃহস্পতিবারের সপ্তম, শুক্রবারের চতুর্থ, শনিবারের যামাৰ্দ্ধ এগুলিকে বলে কালবেলা। কালবেলা মানে, এ সময় যাত্রা করলে মৃত্যু হয়, বিবাহ দিলে কন্যার মৃত্যু হয়, মাথা ন্যাড়া করলেও মৃত্যু অনিবার্য। কে আছেন? কোন্ নিকম্ম মেনে চলেন এসব নিষেধাজ্ঞা? ভাবুন তো, বলছে আপনি যদি এমন কোনো বারে সেই বারের অধিপতির দিকে পিছন ফিরে যাত্রা শুরু করে, তাহলে তার মৃত্যু ঠেকায় কে! কে ঠেকায় জানি না। তবে আমি নিজে বহুবার এ ধরনের যাত্রা করেছি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বহাল তবিয়তেই আছি। দিকশূলের বিধান শুনবেন নাকি? শুনুন– রবিবার ও শুক্রবারে পশ্চিমদিক, মঙ্গলবার ও বুধবারে উত্তরে, সোমবার ও শনিবারে পূর্বে এবং বৃহস্পতিবারে দক্ষিণে যাত্রা করলে ভয়ানক বিপদ। যাত্রা নাস্তি’ বলছে যে! বিবাহ প্রকরণে বলছে– দিনের বেলা বিয়ে করা চলবে না। দিনের বেলায় বিয়ে করলে কন্যা পুত্রকন্যাবিবর্জিত হন, বিরহানলদগ্ধা ও স্বামীঘাতিনী হয়, উচ্চবর্ণের কোনো মেয়েকে যদি নিম্নবর্ণের ছেলে বিয়ে করে তাহলে নির্ঘাত মৃত্যু। আমি প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে দেখেছি রাত্রিবেলা অভ্যাগত অতিথিদের জন্য নিরাপদ নয় বলে দিনেরবেলাতেই বিয়ে সহ সমস্ত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। অন্যান্য ধর্মেও বিয়ে অনুষ্ঠান দিনেরবেলাতেই হয়। এ নিয়ম এ বিধান যদি বুজরুকি না-হয়, তাহলে তো গ্রাম-গঞ্জ-অন্য ধর্মের সমাজ তো বিধবায় ভরে যেত, পুত্রকন্যাহীনা কন্যায় ভরে যত সেসব অঞ্চল। এখানেই শেষ নয়, পঞ্জিকা বলছে– “সুখপ্রসবমন্ত্র অশথপত্রে লিখিয়া প্রসূতির কেশের সহিত বাধিয়া দিলে প্রসবে কষ্ট হয়না।” হয়েছে নাকি এমন কোনো মিষ্টিমধুর অভিজ্ঞতা, কোনো অভিজ্ঞতা? এমন ঘটনা কি ঘটেছে কারোর, কখন আপনার সন্তান যন্ত্রণাহীন ভূমিষ্ঠ হয়ে গেছে আপনি বুঝতেই পারেননি?

সাহা পঞ্জিকা কমিটির প্রস্তাব অনুসারে ভারত সরকার বাংলা দৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা ‘রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ’ রচিত হয়। রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গতেও সংযোজিত হয়েছে পৈতে, অন্নপ্রাশন, বিয়ের দিনক্ষণ, গণ-দশা, শুভাশুভ বিচার। দৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা ‘বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত’-এ পাওয়া যাবে শুভদিনের নির্ঘণ্ট, তর্পণবিধি, নিত্যপূজাবিধি, জ্যোতিষ বচনার্থ, শবদাহ ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত বর্ষফল, রাষ্ট্রগত বর্ষফল, স্তব-কবচ প্রকরণ, ব্রত প্রকরণ ইত্যাদি। ভাষাচার্য সুকুমার সেন পঞ্জিকা বা পাঁজি প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন –প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের পাঁজির মূল পার্থক্য হল, আমাদের পাঁজি ধর্মকর্ম করার জন্য। ওদের পাঁজি জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করে। পাওয়া যায় কবে জোয়ারভাটা হবে, কোনদিন চাঁদের আলো পাওয়া যাবে, কোনদিন চাঁদের আলো পাওয়া যাবে না ইত্যাদি। অপরদিকে আমাদের পাঁজি জ্যোতিষবিজ্ঞানের চর্চা করে। তার সঙ্গে শ্রাদ্ধ-শান্তি জাতীয় পারফরমেন্স মিলেছে। তাই বলি আমাদের পাঁজিটা বুজরুকি।

আমি কালিদাস নামে এক জ্যোতিষবাবুকে জানতাম তিনি হাত-পা দেখতেন না, তিনি কেবলই রাশি রাশি কোষ্ঠী তৈরি করতেন। বেশিরভাগ হাত-পা দেখা জ্যোতিষবাবুরা কোষ্ঠী তৈরি করেন না। ওটা করা নাকি খুবই হ্যাপা! তাই অন্য কোনো অভিজ্ঞ জ্যোতিষবাবুকে দিয়ে অল্প কিছু অর্থের বিনিময়ে করিয়ে নেন। কোষ্ঠীর বিজ্ঞান-অপবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনার আগে জ্যোতিষবাবুরা কী বলছেন সেটা দেখে নিই।

কোষ্ঠী হল জন্মপত্রিকা। এতে নবজাতকের জন্মসময়ে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও সঞ্চরণ অনুযায়ী তার সমগ্র জীবনের শুভাশুভ নির্ণয় করা হয়। খ্রিস্টপূর্বকালে ভারতবর্ষে কোষ্ঠী গণনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের পরে শাকদ্বীপ (পারস্য-কান্দাহার-সাইথিয়া-কাশ্মীরের উত্তরের দেশ) থেকে আগত জনগোষ্ঠী এ দেশে কোষ্ঠী গণনা পদ্ধতি প্রবর্তন করে বলে মনে করা হয়। খ্রিস্টীয় ছয় শতকের ভারতীয় জ্যোতিষী বরাহমিহিরের গ্রন্থে কোষ্ঠীপদ্ধতির প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়। তাই অনুমান করা হয়, এর দু-তিনশ বছর পূর্বে ভারতবর্ষে কোষ্ঠী গণনা শুরু হয়। কোষ্ঠী গণনা পাশ্চাত্যের অনেক দেশেও প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত আছে। কোষ্ঠী গণনার ক্ষেত্রে রাশি, গ্রহ ও লগ্ন তিনটি প্রধান বিষয়। মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন– এই বারোটি রাশি এবং রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু ও কেতু– এই নয়টি গ্রহকে একটি চক্র বা ছকে বারোটি প্রকোষ্ঠে এ রাশিগুলি দেখানো হয়। পরে পঞ্জিকা অনুযায়ী জাতকের জন্মকালে গ্রহগুলির রাশিভিত্তিক অবস্থান নির্ণয়পূর্বক উক্ত চক্র বা ছকে রাশি অনুযায়ী গ্রহগুলির নামের আদ্যক্ষর লেখা হয়। এরপর লগ্ন নির্ণয় করে লগ্নবোধক রাশিটিকে ‘লং’ শব্দ দ্বারা নির্দেশ করলেই জন্মপত্রিকা তৈরি হয়ে যায়।

কোষ্ঠী গণনার এই চক্র বা ছকের অঙ্কনপদ্ধতি সর্বত্র একরকম নয়। ভারতবর্ষেই তিন রকম এবং পাশ্চাত্যে অন্যরকম। দক্ষিণ ভারত ব্যতীত অন্য সব স্থানের চক্রের গতি বামাবর্তী। বঙ্গদেশ ও দক্ষিণ ভারতের রাশিচক্র স্থির– মেষ রাশি থাকে সর্বদা শীর্ষদেশে এবং লগ্ন পরিবর্তনশীল। কিন্তু উত্তর ভারত ও পাশ্চাত্যে রাশিচক্র স্থির নয়, যে-কোনো স্থানে রাশি অবস্থান করতে পারে, তবে লগ্ন সর্বদাই একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে। উত্তর ভারতের ছকে লগ্ন থাকে শীর্ষদেশে এবং পাশ্চাত্যে থাকে বাম পাশে। প্রতিটি রাশির নির্দিষ্ট অধিপতি গ্রহ থাকে, যেমন মকর ও কুম্ভ রাশির অধিপতি শনি, মীন ও ধনু রাশির বৃহস্পতি, মেষ ও বৃশ্চিক রাশির মঙ্গল, বৃষ ও তুলা রাশির শুক্র, মিথুন ও কন্যা রাশির বুধ, কর্কট রাশির চন্দ্র এবং সিংহ রাশির রবি। লগ্ন হল সূর্য কর্তৃক মেষাদি রাশি সংক্রমণের মুহূর্ত, অর্থাৎ সূর্য যখন যে রাশিতে অবস্থান করে তখন লগ্নও হয় সে রাশির নামানুসারে। যেমন সূর্যের মেষ রাশিতে অবস্থানকালে যদি কারও জন্ম হয় তাহলে তার লগ্ন হবে মেষলগ্ন। লগ্নের মেয়াদ হল দুই ঘণ্টা, অর্থাৎ দুই ঘণ্টা পরপর লগ্ন পরিবর্তিত হয়। কোষ্ঠী তৈরির সময় এ রাশি, গ্রহ ও লগ্ন নির্ণয়ে কোনোরূপ ভুল হলে জাতকের ভবিষ্যৎ গণনাও ভুল হবে। কোষ্ঠী অনুযায়ী কারও ভবিষ্যৎ গণনার সময় তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা বারোটি ভাগে ভাগ করা হয়, যার নাম ‘ভাব’। বারোটি ভাব হচ্ছে তনু (শরীর), ধন, সহজ (সহোদর), বন্ধু (এবং মাতা), পুত্র (এবং বিদ্যা), রিপু (এবং রোগ), জায়া (বা স্বামী), নিধন (মৃত্যু), ধর্ম (এবং ভাগ্য), কর্ম (এবং পিতা), আয় ও ব্যয়। যে রাশিতে লগ্ন অবস্থিত সেখান থেকে তনুর বিচার শুরু হয়, তারপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ভাব গণনা করা হয়। কোষ্ঠীবিচারের এসব মূল সূত্র প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সর্বত্রই প্রায় একরকম। তবে ভারতীয় জ্যোতিষে একটি বিশেষ বিষয় হল দশা গণনা পদ্ধতি। জাতকের ভবিষ্যৎ জীবনে কখন কী ঘটবে তা এ পদ্ধতিতে নির্ণয় করা হয়। জাতকের জন্মনক্ষত্র অনুযায়ী দশা নির্ণীত হয়। দশা গণনার ৪২ রকম পদ্ধতি থাকলেও অষ্টোত্তরী ও বিংশোত্তরী পদ্ধতি দুটিই বেশি ব্যবহৃত হয়। অতীতে সম্ভ্রান্ত পরিবারে নবজাতকের কোষ্ঠী তৈরি একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। কোষ্ঠী তার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষত বিবাহের ক্ষেত্রে গুরুত্ব সহকারে বিচার করা হত। পাত্রপাত্রী উভয়ের কোষ্ঠী বিচার করে কোনো বিষয়ে কোনো অশুভযোগ দেখা না-গেলে তবেই তাদের মধ্যে বিবাহ অনুষ্ঠিত হত। বর্তমানে কোষ্ঠী তৈরির তেমন প্রচলন না-থাকলেও জন্মানোর ও জন্মক্ষণ অনুযায়ী রাশি নির্ণয় করে হস্তরেখাবিদগণ মানুষের ভাগ্যগণনা করে থাকেন এবং হস্তরেখাবিদ্যা এখন একটি প্রায়োগিক বিদ্যা হিসেবে সমাজে প্রচলিত। (কৃতজ্ঞতা : দুলাল ভৌমিক)

জটিলতা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা আমাদের জীবন। জীবন ছোটোই হোক কিংবা বড়ো –অনেক চড়াই-উৎড়াই পথ বেয়ে চলতে হয় সকলকে। অনেক ঘটনার স্রষ্টা আমরা নিজেরা হলেও, সব ঘটনাই আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তবে আপনি আমগাছ পুঁতলে কখনোই সেই গাছে আম না-ফললেও জাম ফলতে পারে না। ফলাতেও পারবেন না। যেমনভাবে জীবন গড়বেন ফল পাবেন। তেমনই। খুব বেশি অন্যথা হয় না, যদি ফাঁকি না-থাকে। কোষ্ঠীতে যাই-ই লেখা থাক, সব বদলে যাবে আপনার অধ্যবসায়ে। কত বদলে যায় এরকম! কোষ্ঠীতে লেখা অনেক কিছুই মেলে না। আমরা মেলানোর ভান করি। ছল করি। যা মেলে তাতে মানুষের কিছু যায় আসে না। কোষ্ঠীতে হয়তো আছে ২৩ বছর বয়সে জাতক/জাতিকা মাথার কোনো সমস্যা হতে পারে। দেখা গেল ২৩ বছর বয়সে জাতকের পিতৃবিয়োগ হওয়ার দরুন মস্তক মুণ্ডন করতে হল। কোষ্ঠী পিতৃবিয়োগের সংবাদ আগাম না-জানাতে পারলেও মাথার মুণ্ডন অবস্থাকে ‘মাথার সমস্যা’ বলে মিলিয়ে দেওয়া যাবে।

সিন্ধুলিপি এখনও পড়তে পারিনি ঠিকই, কিন্তু মানুষের বিধিলিপি পড়ে ফেলতে জ্যোতিষবাবুরা খুবই পটু। আপনার মৃত্যু পর্যন্ত জ্যোতিষবাবুরা দেখতে পান কোষ্ঠী-কোডে। চ্যানেলে চ্যানেলে কী আওয়াজ তাঁদের! সব ভেক ধরে বসে আছে ছক হাতে ছকবাজিতে। কোষ্ঠী যে সম্পূর্ণ ভাঁওতা তা আমি প্রবন্ধের শুরুতেই আকাশবাণীর ঘটনাতেই (দুর্ঘটনাই বলতে পারেন) জানিয়েছি।

শুধু হাত-পা দেখলেই কি জ্যোতিষবাবুদের পেট মানবে! শুধু হাত দেখে বেড়ানো মানে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো বোঝায়। তাই হাত দেখে জাতককে খুশি করার জন্য যতই ভালো ভালো কথা বলি-না কেন, মন্দ কথা তো বলতেই হবে। আপনাকে ভয় পাইয়ে দিতে না-পারলে আমার রোজগার আসবে কোত্থেকে! পাথর বেচতে না-পারলে ফায়দা কীসের? আপনি ভিখারি হবেন, আমার অট্টালিকা। সেটা অবশ্য আপনার আর্থিক অবস্থা কেমন সেটা আঁচ করে নেওয়া হবে। তারপর রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শুক্র, রাহু, কেতু– যেকোনো একটার অবস্থা খুব খারাপ এবং খারাপ থাকার জন্য আপনার ভয়ংকর হতে পারে। যদি পাথরের ব্যবস্থা নেন– তবে আপনি মামলা মোকদ্দমায় জিতে যাবে, আপনার বা আপনার ছেলের বা মেয়ের চাকরি হয়ে যাবে, স্বামী বা স্ত্রী পরকীয়া ছেড়ে ঘরে ফিরে আসবে ইত্যাদি। ঘরের সোনা বিক্রি করেই হোক বা জমি জমি বিক্রি করেই হোক, পাথর যে আপনাকে ধারণ করতেই হবে। জ্যোতিষবাবু বলেছেন! কত রকম ভয় দেখিয়ে যে জ্যোতিষবাবুরা পাথর বেচেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। সত্যিই পাথর পারে এসব করে দিতে? পাথর কী?

রত্নের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরদিনের। সুপ্রাচীন কাল হতে রত্ন-পাথর ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মানুষ বিশেষ ভাবে মূল্য দিয়েছে রত্নকে আজও দিচ্ছে। পান্না, হীরা, মুক্তা, পোখরাজ, ওপ্যাল, গোমেদ ইত্যাদি রত্ন-পাথরগুলোর বেশীর ভাগই খনিজ পদার্থ। যুগ যুগ ধরে প্রচন্ড চাপ ও তাপে ভূগর্ভে সৃষ্টি হয়ে থাকে রত্ন-পাথর। সে কারণেই প্রাকৃতিক বা খাঁটি রত্নগুলো দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান। অনেক সাধারণ মানুয়ের ক্রয়ক্ষমতা ও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আসল রত্নের মূল্য প্রচুর। রাজা-বাদশারাই সেগুলি ব্যবহার করতে পারে। যেমন কোহ-ই-নুর বা কোহিনুর হিরে। একরকম বহু মূল্যবান রত্ন মণিমাণিক্য দিয়ে রাজা-বাদশা রানিদের মুকুট, কোমরবন্ধ, বাজুবন্ধে খোচিত করে বারফাট্টাই দেখাত। কোন্ রাজা কত শৌখিন কত তাঁর রত্নভাণ্ডার আছে তা দেখানোর আয়োজন চলত পোশাকে-মুকুটে। কোহিনুর হিরে ছিল শাহজাহানের অহংকার, এখন ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথের অহংকার।

সেই মহামূল্যবান রত্নের মর্যাদা এখন গ্রহশান্তির জন্য তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন ঠগ-প্রতারক জ্যোতিষীবাবুদের রুজিরোজগারের পথ দেখাচ্ছে। রত্ন (Gems) এখন পাথরে (Stone) এসে জলের দামে বিকোচ্ছে। মামলা মোকদ্দমা জিতিয়ে দিচ্ছে, সন্তানের চাকরি পাইয়ে দিচ্ছে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে, অশান্ত সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। মুরগি, থুড়ি রোগীদের মহামূল্যের রত্ন ব্যবহার করতে বললে তো সব অজ্ঞান হয়ে যাবে। তাই ভুখা থেকে চোখা –সকলেই যাতে পাথর কিনে ব্যবহার করতে পারে তার ব্যবস্থা হল। আধুনিক প্রযুক্তি আজ এগিয়ে এসেছে রত্নকে সুলভ করার কাজে। যাতে জ্যোতিষবাবুরা খেয়েপড়ে বেঁচে থাকে। কৃত্রিম উপায়ে রত্ন-পাথর তৈরি করতেও সক্ষম হয়েছে মানুষ। ফলে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে কৃত্রিম রত্ন, যেগুলি সৌন্দর্যে প্রাকৃতিক রত্নের মতোই। কৃত্রিম রত্ন তৈরি হওয়ার ফলে রত্ন পাথর চলে এসেছে সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার নাগালের ভিতর এবং পাওয়া যাচ্ছে দেশে দেশে। কৃত্রিম রত্ন তৈরির প্রচেষ্টাটি প্রচীনকালেও ছিল। প্রাচীন মিশরীয় এবং রোমানদের তৈরি বিভিন্ন রকম নমুনা জাদুঘরে দেখা যায়। তবে সেগুলি গুণগত মানে ও রূপে অক্ষম। কৃত্রিমভাবে তৈরি রত্ন-পাথরকে কয়েকটি সম্পূর্ণ আলাদা দলে বিভক্ত কর যায়। যেমন —

(১) ইমিটেশন অর্থাৎ নকল রত্ন।

(২) সিনথেটিক অর্থাৎ সংশ্লেষিত রত্ন এবং

(৩) কৃত্রিম ভাবে তৈরি ডাবলেট রত্ন।

(i) ইমিটেশন বা নকল রত্ন প্রাকৃতিক রত্নের অনুকরণেই করা হয়। চোখে দেখার মিলটুকু ছাড়া আর কোনো অর্থেই এরা প্রাকৃতিক বা আসল রত্নের মতো সাধারণত হয় না। এতে একই রকম দেখতে অন্য জিনিসকে সুকৌশলে রত্নের মতো করে তোেলা হয়। কিছুটা আসলের মতোই এই রত্ন প্রচুর তৈরি করে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। এদিক থেকে এদের উপযোগিতা আছে বৈকি। ইমিটেশন বা নকল রত্নের অধিকাংশ তৈরি হয় বিশেষ ধরনের কাঁচ থেকে। এ কাঁচ যেন খুব বিশুদ্ধ হয়, ক্ষুদ্র বাবলস বা বুদবুদ ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়, সে ব্যাপারে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয় প্রাকৃতিক বা খাঁটি রত্নের মতো অনুরূপ রং দেওয়ার জন্য গলিত অবস্থায় এ কাঁচের সঙ্গে বিভিন্ন রকম ধাতব অক্সাইড মেশানো হয়। যেমন নীলের জন্য– কোবালট অক্সাইড, সবুজের জন্য– কুৎপ্রিক অক্সাইড, বেগুনির জন্য– ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড ইত্যাদি। কাঁচকে বিভিন্ন তলে ঘষে কাটা প্রাকৃতিক রত্নের রূপ ও ঔজ্জ্বল্য দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সব কাটা তলের নিম্ন পৃষ্ঠগুলিতে অনেক সময় আয়নার মতো প্রতিফলকের ব্যবস্থা করা হয় যাতে প্রাকৃতিক বা আসল রত্নের দীপ্তিও খানিকটা আসে। এ ধরনের নকল রত্নকে অবশ্য প্রাকৃতিক রত্ন থেকে আলাদা করা মোটেই কোনো কঠিন কাজ নয়। এরা কম শক্ত বলে অনায়াসে এদের গায়ে আঁচড় কাটা যায়। খনিজ বা প্রাকৃতিক রত্নের তুলনায় এদেরকে স্পর্শে উষ্ণ অনুভূত হয়। আলোর প্রতিসরণাঙ্কের ক্ষেত্রেও এদের সঙ্গে প্রাকৃতিক রত্নের অনেক তফাত। তা ছাড়া এক্সরে ছবি নিলেই বোঝা যায় যে নকল রত্নের সত্যিকার কোনো কেলাসিত রূপ নেই।

(ii) অপরদিকে সংশ্লেষিত রত্ন সব অর্থেই প্রাকৃতিক রত্নের অনুরূপ। প্রকৃতিতে ধীরে ধীরে তৈরি না-হয়ে এটি বিভিন্ন উপাদানের সংশ্লেষণে যন্ত্রপাতির মাধ্যমে তৈরি হয়, এই অর্থেই শুধু এটি কৃত্রিম। বস্তুগত দিক থেকে, যেমন রাসায়নিক গঠন, কেলাসন, আলোকগুণ এবং অন্যান্য সব ভৌত গুণে এরা প্রাকৃতিক রত্নের সঙ্গে অভিন্ন। সংশ্লেষিত রত্ন তৈরি অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ, তাই শুধু দামি রত্নগুলির ক্ষেত্রেই এটি করা হয়। আজকাল সংশ্লেষিত হিরে, চুনি, নীলা, পান্না সবই পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লেষিত হিরের একটি সুবিধা হল একে ইচ্ছামতো রঙিন করা সম্ভব নানা রকম বিজাতীয় পদার্থের স্বল্প অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে। প্রথমদিকে কৃত্রিম হিরের আকার এত ছোটো হত যে তা রত্ন-পাথর হিসাবে ব্যবহারের উপযুক্ত ছিল না। কিন্তু সত্তরের দশক থেকে আকারে ও সৌন্দর্যে রত্ন হওয়ার উপযুক্ত হিরে সংশ্লেষিত হচ্ছে, এদের উৎপাদন ব্যয়ও ধীরে ধীরে কমে আসছে। চুনি ও নীলা আসলে একই রত্ন-পাথর, শুধু এদের রংটুকু ছাড়া অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের প্রবাহের মাধ্যমে সৃষ্ট তীব্র উত্তাপে অ্যালুমিনিয়াম অক্সাসাইডের গুঁড়োকে গলিয়ে এবং পরে তাকে কেলাসিত হতে দিয়ে চুনি ও নীলা সংশ্লেষিত করা হয়। তৈরির সময় সঙ্গে পরিমাণমতো ক্রোমিয়াম অক্সাইড মেশালে তা চুনির লাল রং হয়। আবার এর বদলে টিটানিয়াম অক্সাইড দেওয়া হলে সৃষ্টি হয় নীল রঙের নীলা। ১৯৩০ সালে প্রথম পান্না তৈরি সম্ভব হয়।

(iii) কৃত্রিম ডাবলেট রত্নগুলি হল এতে উপরে সত্যিকার রত্নের পাতলা করে কাটা একটু আবরণ থাকলেও তাকে জুড়ে দেওয়া হয় নকল অথবা নিকৃষ্ট রত্নের ব অংশের সঙ্গে। ডাবলেট রত্ন তৈরি করার কৌশলটিও কিন্তু বেশ লক্ষণীয়। এতে উপরের পাতলা দামি রত্নের অংশ নীচের নকল অংশের সঙ্গে উপযুক্ত আঠা দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়। হিরের ডাবলেটের ক্ষেত্রে পাতলা আসল হিরে, জারকন অথবা রক ক্রিস্টালের মতো অপেক্ষাকৃত সস্তা। কিন্তু অনুরূপ কেলাসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। অন্যান্য দিক থেকে একইরকম দেখতে হলেও চুনি, নীলা বা পান্নার ডাবলেটের জন্য সাধারণত উপরে এলমেডাইন নামক স্বচ্ছ কেলাসের পাতলা আবরণ এবং নীচে সঠিক রঙের কাঁচ ব্যবহৃত হয়।

কৃত্রিম রত্ন আধুনিক প্রযুক্তির একটি চমৎকার সুকৌশল। ইমেটেশন বা নকল রত্ন ও কৃত্রিম ভাবে তৈরি ডাবলেট রত্ন-পাথরগুলি বিচার-বিশ্লেষণের অনুপযুক্ত।

যদিও আসল রত্ন আপনি কোনোদিন দেখতে পাবেন না দু-একটা ছাড়া (কারণ সেগুলি পাথর নয়), তবুও সুযোগ পেলে রত্ন-পাথর আসল কি নকল কীভাবে বুঝবেন সেটা জেনে নেওয়া যেতেই পারে। বাজারে নানারকম রত্ন-পাথর পাওয়া যায়। চোখ ধাঁধিয়ে যায় তাদের রং আর উজ্জল বর্ণচ্ছটার আভা দেখলে। জ্যোতিষবাবু কিংবা জুয়েলারি থেকে যে রত্ন-পাথরটি কিনছেন হাজার হাজার টাকা গাঁটগচ্ছা দিয়ে, সেসব রত্ন-পাথরের ভিড়ে কী করে চেনা যাবে কোনটা আসল। রত্ন-পাথর আসল কি নকল বোঝার জন্য অভিজ্ঞ চোখ প্রয়োজন। প্রথমত, রত্ন-পাথরের আকৃতি, রং, স্বচ্ছতা ও এর ভিতর সুক্ষ যেসব অবাঞ্চিত পদার্থ থাকে, তার বিন্যাস দেখে প্রাথমিক ধারণা তৈরি করতে হবে। এ ব্যাপারে সঠিক ধারণা পাওয়ার জন্য অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্য নিতে হবে। তবে রত্ন পাথর যাচাই করার সব চেয়ে ভাল উপায় হল রত্ন-পাথরের প্রতিসরণাংক (Refractive Index)যাচাই করা। রত্ন-পাথরের প্রতিসরণাংক জানা থাকলে তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে রত্ন-পাথরের সঠিক পরিচয় পাওয়া সম্ভব। কারণ কোনো বিশেষ রত্ন-পাথরের প্রতিসরণাঙ্ক নির্দিষ্ট, এর হেরফের বিশেষ দেখা যায় না। যেমন হিরের প্রতিসরণাংক ২.৪১৭। এ ছাড়া বিচ্ছুরণ (Dispersion) ধর্ম যাচাই করেও রত্ন-পাথর আসল কিংবা নকল তা যাচাই করা সম্ভব। তাছাড়া রত্ন-পাথরের কাঠিন্যতা (hardness), আপেক্ষিক গুরুত্ব (Specific gravity) ইত্যাদি ধর্ম যাচাই করে সহজেই নকল ও আসল রত্ন-পাথর চেনা যায়।

আসল রত্ন রাসায়নিক বিশ্লেষণ করলে —

(১) চুনি বা Ruby : লাল রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম কোরান্ডাম (Corundum), অ্যালুমিনিয়াম এবং অক্সিজেনই হল এর মূল উপাদান।

(২) নীলা বা Blue Sapphire : নীল বা হলুদ রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নামও কোরান্ডাম (Corundum), অ্যালুমিনিয়াম এবং অক্সিজেনই হল এর মূল উপাদান।

(৩) পান্না বা Emerald : সবুজ বা স্বচ্ছ রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম বেরিল (Beryl)। বেরিলিয়াম, সিলিকন, অক্সিজেন এবং অ্যালুমিনিয়াম হল মূল উপাদান।

(৪) বৈদুর্যমণি বা Cats Eye : হলুদ বা সবুজ বা খয়েরি রঙের রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম ক্রাইসোবেরিল (Chrysoberyl)। বেরিলিয়াম, অক্সিজেন, অ্যালুমিনিয়াম এই রত্নটির মূল উপাদান।

(৫) গোমেদ বা Garnet : লাল বা বাদামি বা কমলা রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম গারনেট (Garnet) লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন এবং অক্সিজেনই মূল উপাদান।

(৬) চন্দ্রকান্ত বা Moon Stone : ধূসর রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম ফেলসপার (Feldspar) পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন এবং অক্সিজেন এই রত্নটির মূল উপাদান।

(৭) সূর্যকান্তমণি বা Sun Stone; স্বচ্ছ এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম কোয়ার্টজ (Quartz) মূল উপাদান সিলিকন, অক্সিজেন।

(৮) সন্ধ্যামণি বা Amethyst : স্বচ্ছ এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম কোয়ার্টজ (Quartz) মূল উপাদান সিলিকন, অক্সিজেন।

(৯) পোখরাজ বা Sapphire : স্বচ্ছ বা হালকা হলুদ বা হালকা নীল রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম টোপাজ (Topaz) মূল উপাদান অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন এবং ফ্লোরিন।

(১০) নীলকান্তমণি বা Tarquous : অস্বচ্ছ নীল বা নীলাভ সবুজ রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম টারকোয়েস (Tarquous)। কপার, ফসফরাস, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, ফ্লোরিন হল মূল উপাদান।

(১১) বৈক্ৰান্তমণি বা Zircon : অস্বচ্ছ এই রত্নের বৈজ্ঞানিক নাম জারকন। (Zircon) মূল উপাদান জার্কনিয়াম, সিলিকন ও অক্সিজেন।

(১২) মুক্তা বা Pearl : এটি খনিজ পদার্থ নয়, প্রাণীজ পদার্থ। স্বাভাবিক মুক্তা ঝিনুকের মাংসল শরীরের ভিতর পাওয়া যায়। সাদা রঙের এই জৈব রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম Organic Gems। মূল উপাদান হল ক্যালসিয়াম, কার্বন ও অক্সিজেন।

(১৩) প্রবাল বা Corel : এটি খনিজ পদার্থ নয়, প্রাণীজ পদার্থ। এক ধরনের ক্ষুদ্র জীবের মৃতদেহ। শুধুমাত্র সমুদ্রের নীচেই পাওয়া যায়। গাঢ় রক্তবর্ণ বা হলুদাভ রক্তবর্ণ, গেরুয়া সাদা রঙের রত্নটির বৈজ্ঞানিক নামও Organic Gems। মূল উপাদান হল ক্যালসিয়াম, কার্বন ও অক্সিজেন।

রত্নগুলি কীরকম ভাটের জিনিস দেখুন :

(১) চুনি এবং নীলার মূল উপাদান একই। অথচ গ্রহ আলাদা। অথচ গ্রহরোষও আলাদা। অথচ রবি খারাপ হলে চুনি দেওয়া হয় এবং শনি খারাপ হলে নীলা ধারণ করতে বলা হয়। মানে আমার হার্টের সমস্যা হলে যে ওষুধ নেব, আমাশয় হলেও সেই একই কন্টেন্টের ভিন্ন নামেরওষুধ নেব?

(২) সূর্যকান্তমণি এবং সন্ধ্যামণি রত্নের উপাদান একই। গ্রহ আলাদা। গ্রহরোষও আলাদা। রবি খারাপ হলে সূর্যকান্তমণি এবং শনি খারাপ হলে সন্ধ্যামণি। চুনি ও নীলার উপাদান এবং সূর্যকান্তমণি ও সন্ধ্যামণির উপাদান একেবারেই এক নয়। তাহলে ভিন্ন উপাদানে একই গ্রহের মাথা ঠান্ডা হয় কী করে? জ্যোতিষবাবুরা উত্তর দিতে পারেন না। কোনো জ্যোতিষীবাবু উপর চালাকি করতে গিয়ে বা ওভার স্মার্ট ন্যাজে-গোবরে হয়ে যান।

রত্ন আসল হোক কিংবা নকল হোক– জ্যোতিষবাবুরা সেগুলি ব্যবহার করার নিদান দেন গ্রহশান্তির জন্য। এই রত্নগুলি কীভাবে ক্রোধী গ্রহদের মাথা ঠান্ডা রাখার দায়িত্ব নেয়! জ্যোতিষবাবুরা কী বলেন সেটা আগে জেনে নিই– “মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ পরমাণুর সমন্বয়ে সৃষ্ট। সৌরমণ্ডলের গ্রহগুলিও পরমাণুর সমষ্টি। আর বিভিন্নপ্রকার রত্নগুলি এমন সব পদার্থের সমন্বয়ে সৃষ্ট যার উপস্থিতি মানবদেহেও বিদ্যমান। বিভিন্ন প্রকার রত্ন সরাসরি মানবদেহের ত্বককে স্পর্শ করে শরীরের উপর ইলেকটো ম্যাগনেটিক (Electro Magnetic) প্রভাব বিস্তার করে, মানবদেহের বিদ্যমান যে-কোনো পদার্থের অসামঞ্জস্যপূর্ণ উপস্থিতির সামঞ্জস্য রক্ষা করে বিভিন্নপ্রকার রত্ন বিভিন্ন গ্রহের রশ্মি অতিমাত্রায় আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করতে পারে। তাই রত্ন ধারণ করে স্নায়ুর উপর বিশেষ বিশেষ গ্রহের রশ্মি যোগ বা বিয়োগ করে শক্তিশালী করা সম্ভব। ফলে স্নায়ুগুলি শক্তিশালী হবে ও নতুন চিন্তা চেতনায় জীবন প্রবাহের ক্ষেত্রে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নেবে। আলোকরশ্মি, বায়ুমণ্ডল ভেদ করে পৃথিরীর ভূভাগের উপর পতিত হয়। গ্রহদের যেমন নিজস্ব তেজ বিকিরণের ক্ষমতা আছে, প্রতিটি রত্মেরও তেমনই পৃথক পৃথক তেজ আহরণের ক্ষমতা আছে। সূর্য এবং গ্রহমণ্ডল থেকে বেরিয়ে আসা এই আলোকরশ্মিই আমাদের উপর নানাভাবে কাজ করে। ভুগর্ভে বা সমুদ্রগর্ভে যে সকল রত্ন-পাথর সৃষ্টি হয় তাহাও ওই সৌররশ্মিরই রাসায়নিক ক্রিয়ার ফল। মানবদেহের উপর কসমিক রশ্মির (Cosmic Ray) প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত। সূর্যের আন্ট্রাভায়োলেট রশ্মি (Ultra-Violet Ray) ও অপরাপর রং বিভিন্ন প্রকার রত্ম-পাথর এবং এর অভ্যন্তরীণ প্রচ্ছন্ন শক্তির উপর পরোক্ষ ও প্রত্যেক্ষভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে মানবদেহে সংক্রামিত বিভিন্ন প্রকার ব্যাধির প্রতিকার করতে পারে। উল্লেখ্য, রত্নগুলিতেও বিভিন্ন রং বিদ্যমান। প্রাচীন জ্যোতিষবিগদগণ হাতের বিভিন্ন স্থানে বিবিধ গ্রহের অবস্থান ধরে সে স্থানগুলিকে বিবিধ রঙের Reflection উল্লেখ করেছেন। আর বিভিন্ন প্রকার রত্ন-পাথরের রং যে ভিন্ন ভিন্ন তার সঙ্গে গ্রহ ও নক্ষত্রের রঙর সাদৃশ্যও তাঁরা এভাবে পেয়েছেন। সুতরাং জ্যোতিষে রত্নের ব্যবহার অভ্রান্ত নয় বলেই মনে হয়। তবে রত্ন-পাথরের যথাযথ প্রয়োগ কৌশল। সম্পর্কে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ অবহিত। একথা মনে রাখতে হবে যে, ভুল ঔষধ সেবনের কারণে বা প্রয়োজন ব্যতিত ঔষধ ব্যবহারে যেমন জীবননাশ বা ক্ষতি হতে পারে, তেমনই প্রয়োজন ছাড়া রত্ন ব্যবহার বা যথার্থ রত্নের ভুল ব্যবহারের কারণেও মারাত্বক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও প্রচুর। তাই রত্ন-পাথর ব্যবহারে বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ জ্যোতিষের পরামর্শ একান্ত কর্তব্য। ভুললে চলবে না যে অণুর সমম্বয়েই রত্নের উৎপত্তি আর দ্রব্য গুণ অনস্বীকার্য।”

এই হল জ্যোতিষবাবুদের রত্ন-পাথরের সপক্ষে বিবৃতি। পশু বা মানুষের রক্ত গায়ে মাখলে মানুষের শরীরের রক্তাল্পতা কমে যায়? যদি কেউ বলেন –হ্যাঁ, যায়। মাফ করবেন, তবে তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে সন্দেহ জাগছে। তাহলে কি আপনি আয়রন ট্যাবলেট বা কুলেখাড়া শাকের রস না-খেয়ে পাথর বা ধাতু বা শিকড় ধারণ করবেন? তাই কি করেন? মানবদেহে অল্প বা নির্দিষ্ট পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের মৌলিক দ্রব্যের বা ধাতুর উপস্থিতি আছে, শরীরে তার প্রভাবও আছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সেইসব ধাতুর সঠিক ভারসাম্য রাখতে পরোক্ষভাবে প্রয়োগ করা হয়। সরাসরি লোহা চিবিয়ে চিবিয়ে খেলে বা শরীরে টন টন লোহা বাঁধলেও রক্তাল্পতা সারবে না।

তবে রত্নগুলির সৌন্দর্য অস্বীকার করা যায় না। রত্ন দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ সাজিয়ে নিতে কার না ভালো লাগে। সে তো অন্য কথা। পাঁচ রতি ছয় রতি নয়, শয়ে শয়ে রতি রত্ন দিয়ে শরীর সাজিয়ে ফেলুন না। কে বারণ করেছে? কিন্তু গ্রহশান্তির নামে নীলা-পোখরাজ মানুষকে পরিয়ে দেবেন মাথায় বাড়ি দিয়ে, সেটি হবে না। ভয় দেখিয়ে, রত্ন কিনতে বাধ্য করানো মানুষের জন্য আমরা লড়াই করব। মানুষের শরীরে রত্ন-পাথরের কোনো ভূমিকা নেই। রত্ন পাথরের কোনো ক্ষমতা নেই। ভালো কিছু করার ক্ষমতাও নেই, খারাপ কিছু করারও ক্ষমতা নেই। দুষ্ট প্রভাব বলতে যেমন কিছু নেই, তেমনি দুষ্ট প্রভাব হটানোরও কোনো ক্ষমতা রত্ন-পাথরের। রত্ন-পাথর আমাদের কোনো অবস্থা থেকেই বিচ্যুত ঘটাতে পারে না। রত্ন-পাথর মানুষের শরীরে কোনো বিক্রিয়া করে না। সারা শরীরে যেখানেই আপনি রত্ন-পাথর বাঁধুন-না কেন, একটাই কাজ করবে– সৌন্দর্য বৃদ্ধি। বেশ বিজ্ঞের মতো জ্যোতিষবাবুরা চরম আত্মবিশ্বাসের উপর ভর দিয়ে বলে থাকেন –রত্ন-পাথর বিভিন্ন ক্ষতিকারক রশ্মি শোষণ করে মানুষের শরীরকে রক্ষা করে। সেকি, কীসের রশ্মি? সেই রশ্মি আমাদের কী ক্ষতি করে? মামলা-মোকদ্দমায় হারিয়ে দেয়? আমার মেয়ের পরীক্ষায় পাস আটকে দেয়? আমার ছেলের চাকরি হতে বাধা দেয়, আমার পরকীয়ায় কাঠি দেয়? আমার জীবনের জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিলাম কোনোরকম রত্ন-পাথর ছাড়াই। আমার পুরো জীবনটাই কুসুমাস্তীর্ণ। কণ্টক এলে দু-হাতে উপড়ে ফেলে দিয়েছি। যে ক্ষতিকারক রশ্মির কথা জ্যোতিষবাবুরা বলে থাকেন সেগুলি কী ওই গ্রহগুলি আসে? নাকি অন্য কোথা থেকে? গ্রহদের নামে যখন রত্ন-পাথর দেওয়া হয়, তাহলে ধরে নিতেই রশ্মি গ্রহগুলি থেকেই আসে। নানারকম মহাজাগতিক রশ্মি আছে বইকি। সেগুলি সত্যিই ক্ষতিকর। সেইসব ক্ষতিকর কোনোভাবেই পৃথিবীতে আসতে পারে না। বাস্তবে মহাজাগতিক রশ্মি হল এক ধরনের তড়িৎকণার অদৃশ্য বিকিরণ। শব্দ বা বিদ্যুতের মতোই অদৃশ্য এই বিকিরিত তড়িৎকণা বর্ণহীন। মহাকাশ থেকে নেমে আসা এই মহাজাগতিক রশ্মির অনেকটাই পৃথিবীতে পৌঁছোবার আগে বাধা পায় পৃথিবীকে ঘিরে রাখা চৌম্বক ক্ষেত্রে। এরপর যেটুকু মহাজাগতিক রশ্মি এসে পড়ে আমাদের পৃথিবীতে তা ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া পৃথিবীর ওজোনস্তর পেরিয়ে সরাসরি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা অসম্ভব। এক-আধটু রশ্মি যে পৃথিবীতে আসে না, তা নয়। সেই রশ্মি রত্ন-পাথর কেন– পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত এমন কিছু আবিষ্কার হয়নি, যা দিয়ে ওইসব রশ্মি আটকে মামলা-মোকদমা ইত্যাদি জিতিয়ে দেওয়া যায়। অনেক জ্যোতিষবাবু বলেন– বিভিন্ন রত্ন-পাথরের মধ্য দিয়ে সূর্যরশ্মি প্রতিসৃত হয়ে শরীরে প্রবেশ করে গ্রহশান্তির কাজ করে। তাই নাকি? প্রতিসৃত হয়ে শরীরে প্রবেশ করে? প্রবাল বা পলা, মুক্তা, সূর্যকান্তমণি ইত্যাদি রত্নগুলি তো অস্বচ্ছ। অস্বচ্ছ বস্তুর মধ্য দিয়ে রশ্মি প্রতিসৃত কোনো সম্ভাবনা নেই। কোনো কোনো জ্যোতিষবাবুদের (জেম থেরাপিস্ট!!!) মতে– মানবদেহের নানা রোগের কারণ নাকি রং রামধনুর সাতটি রং নাকি মানবদেহে বিদ্যমান সাতটি স্নায়ুচক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানবদেহের সমস্ত অসুখবিসুখের নিয়ন্ত্রক নাকি ওই রং। কোন্ রঙের অভাবে কোন অসুখ হবে সেটা তাদের জানা। যেমন হলুদ রঙের অভাবে অর্শ, নীল রঙের অভাবে মৃগী হয়। এই রংগুলি শরীরে গুঁজে দিতে পারলে রোগমুক্তি। কীভাবে খুঁজবে? কেন? লাল রঙের জন্য চুনি পরিয়ে দেওয়া হবে, নীল রঙের জন্য নীলা বা নীলকান্তমণি বা পোখরাজ, খয়েরি বা সবুজ রঙের জন্য বৈদুর্যমণি বা পান্না, কমলা বা বাদামি রঙের জন্য গোমেদ ইত্যাদি। নাঃ, বিজ্ঞানে এসব ধান্দাবাজির কোনো জায়গা নেই।

জ্যোতিষ বিষয়ক বইগুলিতে দেখলাম কেতু খারাপ হলে ক্ষয়রোগ ও শুচিবাই আনে। কেতুর সঙ্গে শনিও যদি খারাপ হয় তবে অর্শ, ক্যান্সার ইত্যাদি হতে পারে। তা বৈদুর্যমণি রত্ন বা ক্যাটস আই ধারণ করালে ক্যান্সার ইত্যাদি সেরে যাবে? নীলা ধারণ করলেও ক্যান্সার সেরে যাবে। হিরে বা পীত পোখরাজ ধারণ করলে ডায়াবেটিস থেকে মুক্তি হবে। পীত পোখরাজ ধারণ করে বৃহস্পতিকে খুশি করতে পারলেই বন্ধ্যা নারীও গর্ভবতী হবে। নেতা-মন্ত্রীও হওয়া যায়। এরকম কঠিন কঠিন রোগ সারাতে পারে রোগীরা। তাহলে আর দরকার কী চিকিৎসা আর চিকিৎসকের?

জুয়েলারির মালিক, রত্ন-পাথরের ভেন্ডার-বিক্রেতা, উৎপাদনকারী, খননকারী, উত্তোলনকারীদের একমাত্র ভরসা এই জ্যোতিষবাবুরা। জ্যোতিষবাবুরাই একমাত্র সক্ষম নিন্মবিত্ত মধ্যবিত্ত সাধারণদের রত্ন-পাথর বিক্রি করা। রত্ন-পাথর বিক্রির বাজার তৈরি করে দিয়েছেন এই জ্যোতিষবাবুরাই। নাহলে একচেটিয়াভাবে ধনীরাই শুধুমাত্র রত্ন ব্যবহার করত। ব্যাবসা কী জমত? গ্রহরত্ন বা অন্য কোনো যদি মানুষের ভাগ্যকে বদলে দিতে পারে, তবে তো বলতে হবে মানুষের ভাগ্য এক্কেবারেই পূর্বনির্ধারিত নয়। প্রচেষ্টা এবং পরিবেশই মানুষের ভাগ্যের নির্ণায়ক।

গ্রহশান্তির জন্য জ্যোতিষবাবুরা রত্ন-পাথর ছাড়াও গাছের মূল বা শিকড় ও ধাতু বা মেটাল ব্যবহারের নিদান দেন। নাকের বদলে নরুন আর কী! কী আছে শিকড়-বাকড়ে? শরীরে শিকড়-বাকড় বাঁধলে দুষ্ট গ্রহরা পালিয়ে যায়? শিকড় বাকড়ের দোকানে লোকজন দেখি ভিড় করে থাকে, বিশেষ করে শনি মঙ্গলবারে। মূল-বিক্রেতারা মূল-ক্রেতাদের একটা কার্যকরী আপ্তবাক্য শুনিয়ে থাকে, তা হল– গাছ কথা বলে। গাছ তো কথা বলেই। কিন্তু জ্যোতিষবাবু, গাছকে কথা বলানোর ক্ষমতা আপনাদের নেই। মানে গাছদের কথা বলিয়ে গ্রহদের খেদাতে পারবেন না। ওটা চিকিৎসকদের কাজ, চিকিৎসকরাই পারেন। চিকিৎসকরাই পারেন চিকিৎসা পদ্ধতিতে। দেখুন কীভাবে পারে– জ্যোতিষবাবুদের মতে সূর্য বা রবি গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে বিল্বমূল অর্থাৎ বেলের শিকড় হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য বলছেন

(১) বেলের শিকড়ের ছাল ৩/৪ গ্রাম মাত্রায় গরম জলে ৪/৫ ঘণ্টা ভিজিয়ে ছেকে তার সঙ্গে একটু বার্লি বা খইয়ের মণ্ড ও অল্প চিনি মিশিয়ে খাওয়ালে শিশুদের বমি ও অতিসার বন্ধ হয়ে যায়।

(২) বেলের মূলের ছালচূর্ণ ৬ থেকে ১২ মাত্রায় দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে হৃদ্দৌর্বল্য দূর হয়। এছাড়া অনিদ্রা ও ঔদাসীন্যভাবও কেটে যায়।

(৩) বিল্বমূলের ছাল ১২ থেকে ১৪ গ্রেনের সঙ্গে ৬ গ্রেন জিরে বেটে গাওয়া ঘিয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ধাতুতারল্যে বা শুক্রতারল্যে উপকার পাওয়া যায়। জ্যোতিষবাবুরা বলেন রবির প্রকোপে হৃদরোগ, শিরঃপীড়া হয়। আয়ুর্বেদশাস্ত্র এ অসুখগুলি সারবে বলেনি যে। তাহলে বিল্বমূল ব্যবহার করবেন কেন? ভেবেছেন?

জ্যোতিষবাবুদের মতে চন্দ্র বা চাঁদ গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে ক্ষীরিকা বা ক্ষীরা বা শশার মূল হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য বলছেন–

(১) সৌন্দর্য পিপাসু নারী-পুরুষেরা শশা ত্বকের যত্নে ব্যবহার করতে পারেন।

(২) পরিপাকতন্ত্র সুস্থ রাখতে এবং শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরাতে শশার বিকল্প নেই।

(৩) জলশূন্যতা দূর করে সারাদিন কাজের ব্যস্ততার কারণে পর্যাপ্ত জল পান করা হয় না অনেকেরই। এই জল ঘাটতি দূর করতে শশার তুলনা হয় না। শোয় ৯০ ভাগ জল থাকায় শরীরের প্রয়োজনীয় জলের অভাব দূর করে শরীর সুস্থ রাখে।

(৪) শশা আমাদের শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। বাইরে রোদে ঘুরা ফেরা করার কারণে সূর্যের তাপে শরীরের চামড়ায় যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তা থেকে শশা আমাদেরকে অনেকটাই স্বস্তি দিতে পারে। এজন্য শশা চাক চাক করে কেটে শরীরের রোদে পোড়া অংশে লাগালে উপকার পাওয়া যায়।

(৫) শশার ভিতরের জলীয় অংশ শরীরের অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য শরীর থেকে বের করে দিতে সক্ষম। নিয়মিত শশা খেলে কিডনিতে পাথর হওয়া থেকে মুক্ত থাকা যায়।

(৬) সুস্থ থাকার জন্য আমাদের শরীরে প্রতিদিন যে পরিমাণ ভিটামিন দরকার হয় তার অধিকাংশের অভাব পূরণ করে থাকে শশা। ভিটামিন এ, বি ও সি– যেগুলি শরীরে শক্তি উৎপাদন ও শরীরের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখে, তার অধিকাংশই পূরণ করে থাকে শশা।

(৭) শোয় রয়েছে উচ্চ মাত্রায় পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও সলিকন। তাই শরীরে এসবের অভাবজনিত সমস্যার মূল সমাধান হলো শশা।

(৮) শোয় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে জল এবং অত্যন্ত কম পরিমাণে ক্যালরি। তাই আমার যারা শরীরের ওজন কমানোর ব্যাপারে সচেতন তাদের জন্য শশা বা ক্ষীরিকার একটি প্রধান উপাদান।

আয়ুর্বেদশাস্ত্র তন্নতন্ন করে তালাশ করেও শিকড় বা মূলের সন্ধান পেলাম না। জ্যোতিষবাবুরা বলেন চন্দ্রের প্রকোপে অতি আবেগপ্রবণতা, মানসিক অসুস্থতা, বাত, শ্লেষ্ম হয়। আয়ুর্বেদশাস্ত্র এ অসুখগুলি সারবে বলেনি যে। তাহলে ক্ষীরিকা মূল ব্যবহার করবেন কেন? ভেবেছেন?

জ্যোতিষবাবুদের মতে মঙ্গল গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে অনন্তমূল হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য বলছেন–

(১) ৩ গ্রাম আন্দাজ অনন্তমূল জলে বেটে দুধের সঙ্গে জ্বাল দিয়ে সেই দুধ দই পেতে পরের দিন সকালে খেতে হবে। অর্শে ভালো কাজ করে।

(২) অনন্তমূল ৩ গ্রাম আন্দাজ জলে বেটে অল্প সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে সরবতের মতো দু-বেলা খেলে একজিমা ও হাঁপানি সেরে যায়।

(৩) ৩ গ্রাম আন্দাজ অনন্তমূল বেটে সকালে ও বিকালে দুধ বা জল সহ খেলে অনিয়মিত ঋতুস্রাবে উপকার হয়।

(৪) অনন্তমূল বেটে অল্প ঘি মিশিয়ে গায়ে মেখে কিছুক্ষণ বাদে স্নান করে নিলে গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয়।

(৫) অনন্তমূলের কাথ সেবনে স্তনে দুধ বাড়ে।

(৬) গোরুর দুধে অনন্তমূল বেটে খাওয়ালে পাথুরি রোগে যন্ত্রণার উপশম হয়। জ্যোতিষবাবুরা বলেন মঙ্গল প্রকোপে অর্শ, রক্তপাত, ফোঁড়া, হাম, বসন্ত হয়।

আয়ুর্বেদশাস্ত্র কিছু কিছু অসুখ সারবে বললেও সেগুলি নির্দিষ্টভাবে তৈরি করে সেবন করতে হবে, বাঁধতে বলেনি। তাহলে অনন্তমূল ব্যবহার করবেন কেন? ভেবেছেন?

জ্যোতিষবাবুদের মতে রাহু গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে শ্বেতচন্দন মূল হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য বলছেন–

(১) যাদের ঋতুস্রাবে দুর্গন্ধ, পুঁজ বা মজ্জাবৎ স্রাব হতে থাকে, সেক্ষেত্রে চন্দন ঘষা অথবা ওই কাঠের গুঁড়ো গরম জলে ভিজিয়ে রেখে হেঁকে নিয়ে দুধে মিশিয়ে খেতে হবে।

(২) ঘামাচি নিশ্চিহ্ন করতে শ্বেতচন্দন ঘষার সঙ্গে হলুদবাটা ও অল্প একটু কর্পূর মিশিয়ে অথবা চন্দন ও দারুহরিদ্রা একসঙ্গে ঘষে মাখতে হবে।

(৩) হিঞ্চে শাকের রসে শ্বেতচন্দন ঘষা মিশিয়ে খেতে দিলে গুটি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ে এবং ভয়াবহতার উপশম হয়।

জ্যোতিষবাবুদের মতে কেতু গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে অশ্বগন্ধা মূল হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য বলছেন–

(১) শ্বেতী রোগে অশ্বগন্ধার মূল চূর্ণ করে দেড় বা দুই গ্রাম মাত্রায় সকালে ও বিকালে দু-বেলা দুধসহ খেতে হবে।

(২) অশ্বগন্ধার মূল চূর্ণ এক বা দেড় গ্রাম মাত্রায় নিয়ে গাওয়া ঘি এক চা-চামচ ও মধু আধ চা-চামচ মিশিয়ে সকালের একবার এবং বিকালে দিকে একবার একটু একটু করে চেটে খেলে ক্রনিক বঙ্কাইটিস সারে।

জ্যোতিষবাবুদের মতে বুধ গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে বৃহদ্বারক বা বিদ্যাধারক মূল, বৃহস্পতি গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে ব্ৰহ্মষষ্ঠী মূল এবং শুক্র গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে রামবাসক মূল হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য রচিত ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’ গ্রন্থে এই গাছটি সম্বন্ধে কিছু পাইনি। যা পাওয়া গেছে তাতে কোথাও বলা নেই মূলগুলি হাতে-পায়ে শনি/মঙ্গলবার বাঁধতে হবে। তা ছাড়া এই বিশেষ নিয়মে কিছু অসুখ-বিসুখ সারে বইকি, গ্রহ তুষ্ট হয় বলে কোথাও কিছু উল্লেখ নেই। নিমের ডাল বা শিকড় হাতে-পায়ে বাঁধলে যদি কারর তেতো স্বাদ অনুভূত হয় তাহলে মানবো শ্বেতচন্দনের মূল হাতে-পায়ে বাঁধলে রাহু তুষ্ট হবে।

জ্যোতিষবাবুরা ধাতু বা মেটাল ব্যবহার করতে বলেন। এইসব ধাতু ফুটপাথে বিক্রি হয়, জ্যোতিষবাবুদের কাছে থাকে না। এইসব ধাতুবিক্রেতারাও আবার অল্পবিস্তর জ্যোতিষী হাতফাতও দেখেন। রবির জন্য তামা বা সোনা ব্যবহার, চন্দ্রের জন্য রূপো, মঙ্গলের জন্য রূপো ইত্যাদি। মানবদেহে বিভিন্ন পরিমাণে ধাতুর উপস্থিতি আছে। ধাতুর কম/বেশি উপস্থিতিতে নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ হয়। আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথ, অ্যালাপ্যাথিতে ওষুধ প্রস্তুতিতে ধাতুর প্রয়োগ হয়, ধাতুর ভারসাম্য রক্ষা হয়। মানুষ এবং অন্যন্য প্রাণীরা তাদের আহার্য ফল-মূল সবজি-মাছ-মাংস-ডিম খাওয়র মাধ্যমে তার শরীরের ধাতুর চাহিদা মেটায়। ফল-মূল-সবজি-মাছ-মাংস-ডিমে নির্দিষ্ট পরিমাণে লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক সালফেট, দস্তা, সোনা, রূপা থাকে। এইসব ধাতুর অভাবে বা ধাতুর প্রাবল্যে মানুষের নানাবিধ অসুখবিসুখ হয়। সরাসরি কোনো ধাতু খাওয়া যায় না। তাই ওষুধ তৈরি করতে সেইসব ধাতুর প্রবেশ ঘটাতে হয়। ওষুধের স্ট্রিপ বা প্যাকেটে Composition পড়ে দেখুন। আয়ুর্বেদে স্বর্ণভস্ম, রৌপ্যভস্ম প্রয়োগ করা হয় নিশ্চয়। তাই বলে তামা-লোহা-সোনা-রূপা হাতে-পায়ে বাঁধলে অসুখবিসুখ সেরে যাবে? গ্রহরা সব পালিয়ে যাবে? তা কোনোদিন হয়? তাহলে দিল্লিতে উনুন জ্বালিয়ে কলকাতায় বসে ভাত রান্না করা যায় বিশ্বাস করতে হবে!

ভেবেছিলাম ধাতুর কথা লেখার পর উপসংহারে চলে যাব। হঠাৎই আমার এক বন্ধু রুদ্রাক্ষের কথা মনে করিয়ে দিলেন। রুদ্রাক্ষও নাকি গ্রহশান্তিতে করিৎকর্মা। দেখা যাক– আয়ুর্বেদের সংহিতাগ্রন্থে রুদ্রাক্ষ নামের কোনো বস্তুর ব্যবহার, এমনকি নামোল্লেখ পর্যন্ত পাওয়া যায় না। তবে অন্য নামে এটি ব্যবহৃত হয়েছে কি না সেটা আজও আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। রাজনিঘণ্ট’ নামে এক বৈদ্যক দ্রব্যাভিধানে এই গাছটির গুণাগুণের বর্ণনা দেওয়া আছে– এটি উষ্ণগুণসম্পন্ন; বাত, কৃমি, শিরোরোগ, ভূতগ্রহ, বিষনাশক এবং রুচিৎকারক। অসুখবিসুখের ব্যাপারে পরে আসছি। তার আগে দেখে নিই রুদ্রাক্ষের মাহাত্ম্য কতটা? একমুখী থেকে শুরু করে আটত্রিশমুখী পর্যন্ত রুদ্রাক্ষের সন্ধানও পাওয়া যায়। সহজলভ্য নয় বলে চোদ্দোমুখী থেকে একুশমুখী রুদ্রাক্ষের মূল্যও বেশি। গৌরীশঙ্কর, ত্ৰিযুতি– রুদ্রাক্ষ জগতে অত্যন্ত সুবিদিত হলেও সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। “গৌরীশঙ্কর রুদ্রাক্ষ” দেখলে মনে হয় দুটি রুদ্রাক্ষ বীজ একসঙ্গে জোড়া দেওয়া হয়েছে– যাকে শিব ও পার্বতীর প্রতীক বলে মনে করা হয়। যাঁরা বৌদ্ধ অনুসারী তাঁদের মধ্যে কলাবতীর শক্ত বীজের সঙ্গে রুদ্রাক্ষের দানা মিশিয়ে সংকর মালা তৈরি করতে দেখা যায়। রুদ্রাক্ষের মধ্যে সবচেয়ে দুর্লভ বোধ হয় সুশ্রী এবং গোলাকার একমুখী রুদ্রাক্ষ, যা আজকাল অতিশয় দুর্লভ। শোনা যায়, টাটা কোম্পানি ৭০ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি একমুখী রুদ্রাক্ষ বংশপরম্পরায় রক্ষা করে আসছে।

জ্যোতিষবাবুদের ব্যাবসায়িক প্রবণতার কারণে প্রচার হয়েছে, রুদ্রাক্ষ যে-কোনো ধর্মের এবং যে-কোনো বয়সের নারী-পুরুষই ধারণ করতে পারে। গলায়, বাজুতে এবং কবজিতে। প্রচার হয়েছে গাছের তলায় পড়ে থাকা রুদ্রাক্ষ ব্যবহার্য নয়, গাছ থেকে চয়ন করতে হবে তবেই কাজে দেবে। রুদ্রাক্ষের লাল কালো হলুদ ধূসর নানা রং এবং এর সঙ্গে গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাব, পাপস্খলন, দাম্পত্য জীবনে সুখ, ব্যাবসায়িক সাফল্য ইত্যাদি বিষয়গুলিকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যার পরিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পর্কে আমরা অজ্ঞাত।

অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া রুদ্রাক্ষ ও ভদ্রাক্ষ নির্ণয় করা কঠিন ব্যপার। বাজারে নকল রুদ্রাক্ষ প্রায় ৯৮ শতাংশ। ২ শতাংশ খাঁটি রুদ্রাক্ষ ব্যবহার উপযোগী, তাও অনেক মূল্য। বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাঠের গুড়ার সঙ্গে লোহা, সিসা, গ্যালিলিথ নামক রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রণ করে রুদ্রাক্ষ তৈরি করা হয়, যার বড়ো বাজার হচ্ছে নেপাল, বোম্বে ও বাঙ্গালোরে সহ গোটা বিশ্বে। যেহেতু নেপালে রুদ্রাক্ষ বৃক্ষ জন্মে, তাই বিদেশিরা মনে করে থাকেন নেপালেই খাঁটি রুদ্রাক্ষ পাওয়া যায়। নেপালে ব্যবসায়ীরা ৩/৪ হাজার টাকায় খাঁটি রুদ্রাক্ষের একটি পিসও সরবরাহ করতে পারেন না অপরদিকে ৮/৯ টাকায় নকল পেয়ে যাবেন। আগে নকল জিনিস চেনার চেষ্টা করতে হবে, কারণ নকল না চিনলে নকল সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে আসল চেনা যায় না। খাঁটি রুদ্রাক্ষের দানাতে ৫০.০৩১% কার্বন, ০.৯৫% নাইট্রোজেন, ১৭.৮৯% হাইড্রোজেন এবং ৩০.৫৩% অক্সিজেন বিদ্যমান। ভালো বা আসল রুদ্রাক্ষ চেনার উপায় বা লক্ষণ– যে রুদ্রাক্ষ সবদিকে সমান, কোথাও বিকৃত, বাঁকা, উঁচু-নীচু বা ভাঙ্গা-চোরা নেই সেই রুদ্রাক্ষ সব থেকে ভালো। এর কিনারাগুলি বেশ স্পষ্ট থাকবে আর গায়ের কাঁটা কাঁটা দাগগুলি বাইরে বেরিয়ে থাকে। যে রুদ্রাক্ষ জলে ডুবে যায়, দুটো তামার টুকরোর মধ্যে রাখলে ঘুরতে থাকে উজ্জল ও ভারী হয় এমন রুদ্রাক্ষ সবচেয়ে ভাল। একে সর্বোত্তম বলে মানা হয়। এই রুদ্রাক্ষ সবচেয়ে বেশি উপকারী। হিসাবে বলা যায়। কবিরাজি মতানুসারে যে ব্যক্তি রুদ্রাক্ষ সঠিক নক্ষত্র, তিথি, সময় অনুযায়ী ধারণ করেন তার কোনো রোগ হতে পারে না। সেকি, পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষ যদি সকলেই রূদ্রাক্ষ ধারণ করে বসে থাকে তবে তো সব চিকিৎসকদের চিকিৎসা ছেড়ে আকাশের তারা গুণতে হবে! বিশ্বাসীদের ধারণা– রুদ্রাক্ষের ক্ষমতা, ধারণ করার নিয়ম, পুজো মন্ত্র যা সঠিকভাবে অনুসরণ করলে মানুষের জীবনে শান্তি আসবেই। বাপ রে, এদের তো ধরে দশ-পাঁচটা নোবেল দিয়ে দেওয়া দরকার।

জ্যোতিষবাবুরা বলেন যেমন মুখ, তেমন ফল। এটাই মানুষের বিশ্বাস। যেমন ধরুন–

(১) সপ্তমুখী রুদ্রাক্ষ: এই শ্রেণির রুদ্রাক্ষের নাম ‘অনন্ত মাতৃকা’। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে সামাজিক প্রতিষ্ঠা, অর্থ মান, যশ ও প্রতিপত্তি লাভের পথ সুগম হয়ে থাকে। রাশিচক্রে রাহুগ্রহ রবি ও চন্দ্র যুক্ত হয়ে লগ্নে দ্বিতীয়ে, চতুর্থে, পঞ্চমে, ষষ্ঠে, সপ্তম, অষ্টমে, নবম, দশমে এবং দ্বাদশে অবস্থান করলে বা কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করতে হয়। ১০৮ বার মন্ত্র জপ করে উক্ত রুদ্রাক্ষ কণ্ঠে ধারণ করলে রাহু গ্রহের সমস্ত কুফল বিনষ্ট হয় অনেকের বিশ্বাস।

(২) অষ্টমুখী রুদ্রাক্ষ: এই রুদ্রাক্ষের দুটি নাম ‘বিনায়ক’ ও ‘বটুকভৈরব’। শনিগ্রহ ও রাহুর অশুভ প্রভাব খর্ব করে। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে হঠাৎ আঘাত পাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। দুষ্কৃতকারীদের হাতে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। রাশিচক্রে শনি ও রাহু অশুভ থাকলে উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক পুরুষের ডান বাহুতে এবং স্ত্রীলোকের বাম বাহুতে ধারণীয়। এ রূপে বিনায়ক মন্ত্র পাঠ করে বা বটুক ভৈরব মন্ত্র এ মন্ত্রে বটুক ভৈরবের পুজো করে এবং পরে জপ করে ও পরে বীজমন্ত্র জপ করে উক্ত রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে সমস্ত অশুভ প্রভাব দূরীভূত হয়।

(৩) নবমুখী রুদ্রাক্ষ: এই রুদ্রাক্ষের অন্য নাম ‘মহাকাল ভৈরব’। ধারণে জীবনে উন্নতির সূচনা যায়, সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জয়লাভ করা হয়। দুর্ঘটনা ও হঠাৎ মৃত্যুর হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। ধারণের পূর্বে মন্ত্র উচ্চারণ করে এ রুদ্রাক্ষের উজ্জীবন বা প্রাণসঞ্চার করে নিতে হয়। মন্ত্র পাঠের পর উচ্চারণ করতে হয়। বুদ্ধিবৃত্তিজনিত কাজকর্মের ক্ষেত্রে নানাভাবে প্রচুর সুফল দান করে এ রুদ্রাক্ষ। রাশিচক্রে বৃহস্পতি গ্রহ মকরে নীচস্থ, মকরস্থানে অবস্থান করলে, বা মারকস্থ হলে এবং ষষ্ঠ, অষ্টম, দ্বাদশ স্থানে অবস্থান করলে কিংবা কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উপরোক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কার পূর্বক ধারণের পর মন্ত্র জপ করে ‘বৃহস্পতয়ে’ এ বীজমন্ত্র জপের পর পুরুষের দক্ষিণ বাহুতে এবং স্ত্রীলোকের বামবাহুতে ধারণ করলে সকল অশুভ বিনাশ হয়।

(৪) দশমুখী রুদ্রাক্ষ: এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষ দুর্লভ। এর অন্য নাম ‘মহাবিষ্ণু’। মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা, সুনাম, খ্যাতি, সম্মান, পার্থিব সমৃদ্ধি, কর্মদক্ষতা এবং ব্যাবসায়িক সাফল্য অর্জনে সহায়ক এ রুদ্রাক্ষ। প্রেতাদি কর্তৃক অনিষ্টকর প্রভাব থেকেও মুক্ত হওয়া যায়। রাশিচক্রে বুধ গ্রহ নীচস্থ শযুক্ত ও শত্রুক্ষেত্রগত, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ, অষ্টম ও দ্বাদশ স্থানে অবস্থান করলে বা কোনোভাবে পীড়িত হলে উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক সংস্কার করে ধারণ করতে হয়। মন্ত্র পাঠ ও জপ করে জপের পর উক্ত রুদ্রাক্ষ কণ্ঠে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ দূরীভূত হয়।

৫) একাদশমুখী রুদ্রাক্ষ: এটি একটি বিশেষ জাতের রুদ্রাক্ষ। এর অন্য নাম ‘মহামৃত্যুঞ্জয়’। মেয়েদের নানা অসুখের ক্ষেত্রে একান্তভাবেই সুফল প্রদানকারী, আত্মবিশ্বাসের অভাব ঘটলে, আত্মহনন চিন্তা এসে মনকে ও মেজাজ খিটখিটে স্বভাবের হয়ে উঠলে এ রুদ্রাক্ষ ধারণে তার উপশম হয়। মন্ত্র উচ্চারণযোগে রুদ্রাক্ষ উজ্জীবিত করে ধারণ করা প্রয়োজন। রাশিচক্রে শুক্র ও মঙ্গল অশুভ থাকলে মন্ত্রে যথাবিধি সংস্কার করে মন্ত্র জপ করে ডান হাতে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ প্রভাব নাশ হয়।

(৬) দ্বাদশমুখী রুদ্রাক্ষ: এর অন্য নাম ‘অর্ক’ বা ‘আদিত্য’। এ রুদ্রাক্ষ রবি ও রাহুর অশুভ প্রভাবকে প্রশমিত করে। রবি যখন মকরে বা কুম্ভরাশিতে অবস্থিত হয়ে অশুভদশা প্রাপ্ত হয় তখন এ রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে সকল কুফল নষ্ট হয়। ব্যাবসায়িক মন্দা বা অসাফল্য নিবারণ করতে মন্ত্র সহযোগে এ রুদ্রাক্ষকে উজ্জীবন করে ধারণ করতে হয়। মন্ত্র উচ্চারণ করে ১০৮ বার জপের পর রুদ্রাক্ষটি কণ্ঠে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ বিনষ্ট হয়।

(৭) এয়োদশমুখী রুদ্রাক্ষ: এর অপর নাম কাম। এর ধারণে সর্বভাবেই কামনীয় বিষয়ের প্রাপ্তিযোগ ঘটে। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিপূরণ হয়। চিন্তামণি মন্ত্র সহযোগে এ রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করতে হবে। অতঃপর মন্ত্র ১০৮ বার বীজমন্ত্র জপ করে ডান হাতে ধারণ করলে সমস্ত পাপ দূর হয় ও সকল মনোরথ সিদ্ধি হয়। এর ধারণে চন্দ্র ও শুক্রের অশুভ প্রভাব নাশ হয়ে থাকে।

(৮) চতুর্দশমুখী রুদ্রাক্ষ: এই রুদ্রাক্ষ ‘শ্রীকণ্ঠ’ নামে পরিচিত। এই রুদ্রাক্ষ ইন্দ্রিয় সংযমে সাহায্য করে। পঞ্চমুখ হনুমানমন্ত্র সহযোগে একে উজ্জীবিত করতে হয়। মন্ত্র পাঠ করে বীজমন্ত্র জপ করে ধারণ করলে শুক্রগ্রহের সমস্ত অশুভ বিনষ্ট হয়। মন্ত্র ১০৮ বার জপ করে ধারণ করলে বৃহস্পতি ও রবির সমস্ত অশুভ প্রভাব নষ্ট হয়ে থাকে।

রুদ্রাক্ষ মৃগীরোগীদের জন্যেও উৎকৃষ্ট। সংক্রামক রোগ, বিশেষত বসন্তরোগ প্রতিষেধক বলে বহু মানুষ শরীরে ধারণ করে। রাজস্থানের বৈদ্য সম্প্রদায় এই রোগে রুদ্রাক্ষ ঘষে গায়ে লাগাতে দিয়ে থাকেন। শ্লেষ্মর আধিক্যে যেসব রোগ বিসুখ সৃষ্টি হয়, কোনো কোনো প্রদেশে এটি ঘষে খাওয়ানো হয়। যক্ষারোগের প্রথমাবস্থায় তুলসীমঞ্জরীর সঙ্গে রুদ্রাক্ষ ঘষে খাওয়ালে চমৎকার ফল দেয় শুনেছি। এছাড়া রোগীর নাড়ী ক্ষীণ হয়ে আসতে থাকলে হৃদযন্ত্র সক্রিয় রাখতে গ্রামবাংলার প্রাচীন বৈদ্যকুলের ‘কোরামিন’ ছিল, রুদ্রাক্ষ ঘষা ও মধু দিয়ে মকরধ্বজ খাওয়ানো হত। ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রকে যাঁরা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন তাঁদেরই উত্তরসূরি আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য এ বিষয়ে বলেন– আয়ুর্বেদের মূল সিদ্ধান্ত হল, প্রতি দ্রব্যের মধ্যে চারটি জিনিসের অস্তিত্ব বর্তমান। যেমন– রস, বীর্য, বিপাক ও প্রভাব। প্রথমোক্ত তিনটির প্রত্যক্ষতা প্রমাণ করা যায়, শেষোক্ত ‘প্রভাব’-টি কিন্তু দ্রব্যগুণাদির সম্পর্কশূন্য নয়। কারণ প্রতিটি দ্রব্যের প্রভাবের ক্ষেত্রটিও বিশেষ গুণান্বিত। অর্থাৎ শ্লেম্মানাশক দ্রব্যের প্রভাব কখনো বাত-পিত্তকে প্রকুপিত করে হয় না, বিরোধীও হয় না।

এতক্ষণ নিশ্চয় আপনি হাজারো সংশয় নিয়ে ভাবছিলেন– জ্যোতিষ যদি অযৌক্তিকই হবে তবে এত মানুষ যে এতকাল ধরে জ্যোতিষ এবং জ্যোতিষীদের পিছনে ছুটছে, কেন? আপনার উত্তর নিশ্চয় এরকম –তারা জ্যোতিষের অভ্রান্ততার প্রমাণ পেয়েছেন বলেই-না জ্যোতিষীদের কাছে যাচ্ছে। শুধু আপনি নন, জ্যোতিষীবাবুদের যুক্তিও এরকমই হয়। এর বেশি কুলায় না যে! বড়ো রকমের ফাঁপড়ে পড়ে গেলে মাসলম্যান তো আছেই। মাসলম্যান অবশ্য সবার নেই। যাঁদের নেই ন্যাজে-গোবরে হন, অথবা ত্যাদোর পাবলিকের ধোলাই খান। আর যাঁদের মাসলম্যান আছে তাঁরা হলেন জ্যোতিষজগতের রাঘববোয়াল। সাংবাদিকদের ক্যামেরার ‘দেখে নেব’ বলে হুমকি দিতে ছাড়েন না। ট্যাবলেট-জ্যোতিষীর এহেন হুমকি নিশ্চয় অনেকেই নিশ্চয় দূরদর্শনে দেখেছেন।

১৯৯৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। কাঁকুড়গাছির শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত তথাকথিত প্রাচ্য-পাশ্চাত্য জ্যোতিষ সম্মেলনে “ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি”-র সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। উদ্দেশ্য : উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে খোলামেলা চ্যালেঞ্জের আবেদন। আবেদন : ‘ভবিষ্যদ্বক্তা’ জ্যোতিষীরা পাঁচজন বিখ্যাত ব্যক্তির মৃত্যুদিন আগাম গণনা করে বলে দিন। আর সেই গণনার ফলগুলি আলাদা আলাদাভাবে খামবন্দি করে একটি নিরপেক্ষ জায়গায় সংরক্ষণ করে রাখা হবে। ওই পাঁচজন ব্যক্তির মধ্যে যে দিন যিনি মারা যাবেন সেসময় সেই ব্যক্তির নামাঙ্কিত খামটি খুলে দেখা হবে জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী মিলেছে কি না। এই পদ্ধতিতে যদি কমপক্ষে চারজনের ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায়, তাহলে “ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি” জ্যোতিষীদের হাতে চ্যালেঞ্জের টাকা (ভারতীয় রূপিতে ৫০,০০০ টাকা) তুলে দেবে এবং সমিতির পক্ষ থেকে জ্যোতিষবিরোধী সমস্ত আন্দোলন বন্ধ করে দেবে।

জ্যোতিষ-বিশ্বাসীরা কী ভাবছেন? জ্যোতিষীবাবুরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন? না, জ্যোতিষীবাবুরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেননি। উলটে সম্মেলনের কক্ষটির সমস্ত বন্ধ করে দেওয়া হল, যাতে যুক্তিবাদী সমিতির সদস্যরা ঘরের বাইরে বেরোতে না পারে। এরপর জনাকয়েক মাসলম্যান এসে প্রচণ্ড প্রহার করল। বাধা দিতে গিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক, দ্য টেলিগ্রাফের সাংবাদিকরাও লাঞ্ছনা ও নিগ্রহের শিকার হন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় এক যুবকও প্রহৃত হন। এক্কেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটেছিল সেদিন। জ্যোতিষীদের ফাঁদে ফেলতে চাইলে জ্যোতিষবাবুরা এভাবেই উত্তর ফেরত দিয়ে থাকে। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।

পদার্থ বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা তাঁর এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন। একটি হল– “গণয়তি গণনে গণকশ্চন্দ্ৰেন সমাগমং বিশাখায়া। বিবিধ-ভুজঙ্গ-ক্রীড়াসক্তাং গৃহিণীংন জানাতি।।”– গণক আকাশে বিশাখা নক্ষত্রে চন্দ্রের সমাগম গণনা করছে। (ওদিকে) নানান উপপতির সঙ্গে ক্রীড়ায় আসক্ত (নিজের) গৃহিণীকে (অর্থাৎ তার খবর) সে জানে না। অপরটি হল– “গণিকা গণকৌ সমান ধর্মে নিজপঞ্চাঙ্গ-নিদৰ্শকাবুভৌ। /জনমানস মোহকারিনৌ তৌ বিধিনা বিত্তহরৌ বিনির্মিতৌ।।” গণিকা আর গণক– দুয়েরই এক ধর্ম। দুজনেই নিজের পঞ্চাঙ্গ দেখায়। দুজনেই লোকের মনকে মোহগ্রস্ত করে। বিধাতা এই বিত্তহরণকারীদের তৈরি করেছেন। পঞ্চাঙ্গ হল দুটি হাত, দুটি পা ও মাথা (গণিকা পক্ষে)। বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ, করণ– এই পাঁচ (গণক পক্ষে)। গণক লোকের সত্য মিথ্যা ঠিকুজি তৈরি করার পর যদি ফলে যায় তাহলে নিজের কেরামতি জাহির করে। না ফললে সেটাকে বলে লগ্নদ্রষ্টার ভুল। না মিললে বলে –“জ্যোতিষীরা ভুল করেন, তাঁদের গণনা ভুলও হতে পারে অনেক সময়। নামী ডাক্তারদেরও তো ভুল হয়। অঙ্কের ভালো শিক্ষকরাও অঙ্ক ভুল করে। বানান সংশোধকরাও (Proof Reader) বানান ভুল করেন। প্যাথোলজিস্টরা ভুল রিপোর্ট দেয়। বিশ্বের এক নম্বর ইঞ্জিনিয়ারদের তৈরি ব্রিজও ভেঙে পড়ে। তার মানে কি সেই বিদ্যা বা শাস্ত্রগুলি মিথ্যা? তা ছাড়া জ্যোতিষ গণনা-পদ্ধতি ভুল না ঠিক সেটা একমাত্র জ্যোতিষীরাই বলতে পারবেন, আপনি নন।” ভণ্ড গণকরা এভাবেই মানুষকে ঠকিয়ে তাদের টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়।

আপাতদৃষ্টিতে জ্যোতিষীবাবুদের যুক্তিগুলি সঠিক মনে হতেই পারে। কিন্তু জ্যোতিষবাবুদের ভুলের সঙ্গে অন্য ভুলগুলির কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। ডাক্তার অথবা শিক্ষকদের ভুলটা বিমূর্ত নয়, সম্পূর্ণটাই চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণিত। জ্যোতিষবাবুদের ভুলটি বিমূর্ত, প্রমাণ করা যায় না। ভুলটা প্রমাণ করা গেলেও ঠিকটা প্রমাণ করা যায় না। যেমন ধরুন আপনার বর্তমান বয়স ৩০। আপনাকে বলা হল ৪০ বছর বয়সে গিয়ে আপনার বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এমনকি মৃত্যু হওয়ারও আশঙ্কা আছে। আপনি আর আপনার পরিবার খুব ভয় পেয়ে গেলেন এবং মুক্তির উপায় জানতে চাইলেন। জ্যোতিষবাবু আপনাকে পাঁচ রতির একটা নীলা ব্যবহার করতে বললেন। ৪০ বছর বয়সে গিয়ে আপনার কোনো দুর্ঘটনা ঘটল না, মৃত্যুও হল না। কিংবা ওই সময় আপনি এমনভাবে হোঁচট খেয়ে পড়লেন যে আপনার সামনের দুটো দাঁত ভেঙে গেল। জ্যোতিষীবাবু বলবেন– সঠিক ভবিষ্যদ্বাণীই উনি করেছিলেন ও বিধানও সঠিক দিয়েছিলেন। পাথর কথা বলে। সেদিন পাথরটি ব্যবহার না করলে মৃত্যু ঠেকানো যেত না। আপনার ৪০ বছর বয়সে দুর্ঘটনা বা মৃত্যু হত কি না, সেটা আর প্রমাণ করা গেল না। কিন্তু যদি উলটোটা হত, অর্থাৎ ৩৫ বছর বয়সে আপনি কোনো দুরারোগ্য অসুখে মারা গেলেন। তখন কি আপনার পরিবার ভুল বলার জন্য জ্যোতিষবাবুর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেবেন? এরকম ঘটনা আকছার ঘটে থাকে। কিন্তু আমাদের চরম উদাসিনতার জন্য জ্যোতিষবাবুদের এই বুজরুকির ব্যাবসা চালিয়ে যেতে একেবারেই বেগ পেতে হয় ন। জ্যোতিষবাবুরা যখন ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং ভাগ্য বদলানোর কথা বলেন, তা এমনই অস্পষ্ট ও অর্থহীন যে তার ঠিক-ভুল বিচারের কোনো মানেই হয় না। বিজ্ঞানের তত্ত্বকে নির্দিষ্টভাবে ভুল প্রমাণ করা যায়, তাই ভুল বলে প্রমাণিত না-হলে সেটি ‘ঠিক’-এর মর্যাদা পায়। জ্যোতিষবাবুদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই, কাজেই ‘ঠিক’-এর মর্যাদাও প্রাপ্য নয়।

অদ্বৈত আশ্রম থেকে প্রকাশিত “কমপ্লিট ওয়ার্কস অফ স্বামী বিবেকানন্দ, বার্থ সেন্টিনারি এডিশন”- এর অষ্টম খণ্ডে “ম্যান দি মেকার অফ হিজ ডেস্টিনি” 91567 791 oncs– I have seen some astrologers who predicted wonderful things; but I have no reason to believe they predicted them only from the stars, or anything of the sort. In many cases it is simply mind-reading some times wonderful predictions are made, but in many cases it is arrant trash. অর্থাৎ, “আমি কোনো কোনো জ্যোতিষীকে দারুণ দারুণ ভবিষ্যদ্বাণী করতে দেখেছি; কিন্তু একথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, তারা শুধুমাত্র নক্ষত্র বা ওই জাতীয় জিনিস থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করে। অনেকক্ষেত্রেই এ হচ্ছে নিছক মনের কথা আঁচ করার ব্যাপার। কখনো-কখনো চমৎকার ভবিষ্যদ্বাণী হয়, কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই সেগুলি পুরোপুরি ভূষিমাল।”

যৌবনের প্রারম্ভে আমিও বইপত্র কিনে জ্যোতিষগিরি শুরু করেছিলাম। বইপত্র পড়ে দেখলাম এ বিদ্যা কোনো কাজে আসবে না। শুধু টার্মসগুলি আয়ত্ব করে নিলাম। প্রত্যেক পেশারই একটা নির্দিষ্ট স্টাইল থাকে, এক্ষেত্রেও সেটা আয়ত্ব করলাম। কথায় বলে ভেক না থাকলে ভিখ মেলে না। ভেকও বদলে ফেললাম। মুখে মুখে প্রচার চালাতে লাগলাম, যাকে বলে বিজ্ঞাপন করা। প্রথম প্রথম বিনাপয়সাতেই ভবিষ্যদ্বাণী করে দিতাম। লিখিতভাবেই ভবিষ্যদ্বাণী করতাম। বেশ পসার হল। পারিশ্রমিক নিতে শুরু করলাম। আমি ঠিক বলতে পারি সেটা সবাই বলতে থাকল। পূর্ণ উদ্যোমে কাজে লেগে পড়ার আগে বিবেকের ডাকে থমকে গেলাম। লোক ঠকানোর এ কাজ করাটা কি ঠিক! আমি তো জানি এসব বলায় কোনো ভিত্তি নেই। পুরোটাই ‘মন পড়া’ ব্যাপার। ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে রোগীকে পড়ে ফেলা। ব্যস, কেল্লা ফতে। আপনিও পারবেন মানুষের অতীত ও ভবিষ্যৎ বলে দিতে। কোনো জ্যোতিষবিদ্যার পাঠ নিয়ে সাগর-সম্রাট হওয়ার প্রয়োজন নেই। কৌশলটুকু আয়ত্ব করলেই হবে। কীভাবে?

আমি যেভাবে কিছুদিন জ্যোতিষগিরিতে পসার জমিয়ে জমিয়ে ছিলাম, সেটা তো আপনাদের শেয়ার করবই, এর সঙ্গে যুক্তিবাদী প্রবীর ঘোষেরও কিছু মূল্যবান টিপস দেব। তার আগে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : এটি একটি মানুষকে প্রতারণা, অর্থাৎ প্রতারক হওয়ার টিপস। প্রতারক হতে চাইলে নিজের দায়িত্বেই হবেন। এই টিপস সচেতন ও যুক্তিনির্ভর ব্যক্তিদের স্বার্থেই নিবেদিত হচ্ছে।

টিপস–১; আমি মনে করি জ্যোতিষ ব্যাবসায় শিখরে উঠতে চাইলে জ্ঞানী অবশ্যই হতে হবে। জ্যোতিষ ব্যাবসা অজ্ঞানী বা মূর্খদের জন্য নয়। মনে রাখতে হবে আপনার জ্ঞানবুদ্ধি দিয়েই আপনার প্রতি জাতক-জাতিকাকে আকৃষ্ট করতে হবে। “বিদ্বান সর্বত্র পূজতে”, জ্ঞানেই নারীপুরুষনির্বিশেষে মুগ্ধ হয়। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞানের কিছু শাখায় জ্ঞান থাকলে উত্তম। ইংরেজি ভাষাটাকে ভালোভাবে আয়ত্ত করা প্রয়োজন। মানুষ ইংরেজি ভাষাকে সমীহ করে। জানতে হবে সংস্কৃত ভাষাও। আমাদের সমাজে এ ভাষাও সমীহ আদায় করে নেয়। জাতক বা জাতিকার সঙ্গে কথা বলার সময় ঠিকঠাক সংস্কৃত বাক্য বা শ্লোক গুঁজে দিতে পারলে কেল্লা ফতে। আপনি দোষেগুণে মানুষ থেকে ঈশ্বর বা ক্রান্তিদর্শীতে উন্নীত হবেন খুব সহজেই।

টিপস– ২ : ফোর টোয়েন্টিগিরি (ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার দায়ে শাস্তির বিধান) করে এভাবে বাকিজীবন চালিয়ে যেতে পারবেন, এরকম মানসিক জোর ও আত্মবিশ্বাস চাই।

টিপস –৩: দূরদর্শী, নির্লজ্জ, দুঃসাহসী, তুখোড় বুদ্ধি, ধূর্ত এবং বিচক্ষণ হতে

হবে।

টিপস– ৪: সাগর, সম্রাট ইত্যাদি সার্টিফিকেট নিয়ে নিন কোনো জ্যোতিষ সংস্থা থেকে। সার্টিফিকেট দেনেওয়ালে সংস্থা ভুড়ি ভুড়ি আছে। নগদ রেস্তো খরচ করে কিনে নিন ডিগ্রি, পদক, পি এইচডি ইত্যাদি।

টিপস– ৫: স্পেশালিস্ট হিসাবে নিজেকে প্রচার করুন। বিদ্যার জন্য সরস্বতী কবচ, বিয়ের জন্য প্রজাপতি কবচ, ব্যাবসার উন্নতির জন্য বিশ্বকর্মা কবচ ইত্যাদির ব্যবস্থাও রাখুন।

টিপস– ৬: ৫০০ বছরের কিংবা ২০০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পারিবারিক জ্যোতিষী বলে বিজ্ঞাপন দিন।

টিপস –৭: আপনার নামের সঙ্গে শাস্ত্রী, আচার্য, আনন্দ জুড়তে ভুলবেন না।

টিপস –৮ : আপনার নামে ওজন না থাকলে পালটে ফেলুন।

টিপস– ৯ : আপনার নামের শেষে প্রথম বন্ধনীর ভিতর ‘তন্ত্রসিদ্ধ’, ‘অলৌকিক মাতা’, ‘কামাখ্যাসিদ্ধ’, ‘বাকসিদ্ধ’ ইত্যাদি প্রচারে রাখবেন।

টিপস– ১০: ভালো কপি রাইটারদের একটা জুতসই বিজ্ঞাপন তৈরি করান।

টিপস– ১১ : কোনো চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত থাকুন। এমন প্রচুর জ্যোতিষের চ্যানেল আছে। স্লট কিনুন। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বললে তারাই আপনাকে বলে দেবে কী করতে হবে, কীভাবে করতে হবে, কত দিতে হবে ইত্যাদি।

টিপস –১২ : ভেক বদলান। কথায় বলে ভেক না-হলে ভিখ মেলে না।

টিপস– ১৩ : বাড়িতে বড়ো করে পূজো দিন। বাড়িতে মন্দির থাকলে ভালো। আপনি যে দেবতাকে জড়িয়ে জ্যোতিষ ব্যাবসা চালাবেন সেই দেবতার পুজো করবেন বছরের নির্দিষ্ট সময়ে। খুব ভালো কাজ দেয় কালীপুজো করলে। টিভিতে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করুন আপনার পুজো।

টিপস– ১৪: বিপদের হাত থেকে বাঁচতে স্থানীয় থানা এবং ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।

টিপস –১৫ : আপনার ব্যাবসা রমরমিয়ে চললে দু-একটি মাসলম্যান পুষবেন। দুঃসময়ে কাজে দেবে।

টিপস –১৬ : বাজারে প্রচুর জ্যোতিষবিদ্যার বই পাওয়া যায়। কিনে জ্যোতিষী ভাষা বা টার্মগুলি রপ্ত করুন। প্রতিটি পেশার নিজস্ব ভাষা আছে, জ্যোতিষেও আছে।

টিপস –১৭ : আবহাওয়া তথা রাজনীতিতে ভবিষ্যদ্বাণী করতে হলে সে বিষয়ে এলেম না থাকলে বিষয়টি এড়িয়ে যওয়াই শ্রেয়। যেমন আগামী লোকসভায় কোন দল সরকার গড়বে? পশ্চিমবঙ্গে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন? ভবিষ্যতে ভারতবর্ষ হিন্দু রাষ্ট্র হবে কি না? ইত্যাদি।

টিপস –১৮ : অবশ্যই পাথর বেচুন। পাথরই আপনাকে ধনী করবে। “বিফলে মূল্য ফেরত’ বলে দিন। পাবলিক এটা খুব খায়। ঘাবড়াবেন না, মূল্য ফেরত দিতে হয় না। কেউ দাবিও করে না। যদি কেউ মূল্য ফেরত নিতেও আসে, সেটা বুদ্ধি খরচ নিজের নিয়ন্ত্রণে আনুন। সবাই পারে, আপনিও পারবেন।

টিপস– ১৯ : আপনি যদি আপনার বা অন্য মন্দিরে বসতে পারেন, তাহলে হাত দেখার জন্য কোনো পয়সা নেবেন না। পাশে প্রণামীর বাক্স দেখিয়ে দেবেন। বলবেন– মায়ের পুজোর জন্য আপনার সাধ্য অনুযায়ী দিলেই হবে।

টিপস– ২০ : বিখ্যাত মানুষদের হাত দেখার সুযোগ পেলে অনুমতি সাপেক্ষে ফোটো তুলে রাখতে ভুলবেন না। ওটা বিজ্ঞাপনে দারুন কাজে দেবে।

টিপস– ২১ : মানুষের কিছু কমন জিজ্ঞাস্য বা জানাবার কৌতূল থাকে, সেগুলিই সে জানতে আগ্রহী। একজন অবিবাহিত মেয়ে এবং একজন অবিবাহিত ছেলে জিজ্ঞাস্য ভিন্ন, একজন বিবাহিত মহিলা এবং একজন বিবাহিত পুরুষের জিজ্ঞাস্য আলাদা। একজন অবিবাহিতের প্রেম বিষয়ক, চাকরি বিষয়ক, বিয়ে বিষয়ক প্রশ্ন থাকে। অপরদিকে একজন বিবাহিতের স্বামী/স্ত্রী বিষয়ক, সন্তান বিষয়ক ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর জানে আগ্রহী। প্রশ্ন যেমনই হোক, উত্তর দিতে হবে বিচক্ষণতার সঙ্গে। হবেই এমন কথা কখনোই বলবেন না, ‘সম্ভাবনা’ উল্লেখ করে বলুন। ‘সম্ভাবনা’ শব্দটির মানে হতেও পারে, হতে পারে।

টিপস– ২২ : ভয় দেখাতে ভুলবেন না। না-হলে পাথর/কবচ বেচতে পারবেন না। পাথর/কবচই আপনার ভবিষ্যৎ যে!

টিপস– ২৩ : সব বয়সের মেয়েদের ‘মা’ বলে সম্বোধন করে কথা বলুন।

অবশ্যই সকলকে ‘তুই’ সম্বোধন করাটা রপ্ত করে নেবেন।

টিপস– ২৪ : মানুষ নিজের সম্বন্ধে ভালো ভালো কথা শুনতে ভালোবাসে। প্রথম দর্শনেই সেই ভালো ভালো কথাগুলি বলুন। যেমন –আপনি খুব দয়ালু, আপনি খুব উদার, আপনি মানুষকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন কিন্তু আপনি তেমন ভালোবাসা পান না ইত্যাদি। খুব বেশি বেশি পজিটিভ কথা বলুন। দু একটা নেগেটিভ কথা বলবেন পেটের জন্য।

টিপস– ২৫ : আপনার ‘মুরগি’-কে যে মোক্ষম বাণীগুলি শোনাতেই হবে। ৯৯%ভাগ মিলে যাবে, আপনি অব্যর্থ হয়ে যাবেন। দুটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে– (১) মানুষ নিজের সম্বন্ধে যে কথাগুলি শুনতে ভালোবাসে এবং (২) প্রতিটি মানুষ সে যে স্তরেই অবস্থান করুক না-কেন কিছু বিষয় আছে যেগুলি সকলের সঙ্গেই মিলে যাবে। যেমন এই পয়েন্টগুলো বলুন– আপনি স্পষ্টবক্তা, দৃঢ়চেতা। আপনি অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী। স্পষ্টবাদিতার জন্য আপনি অপ্রিয় হন, কিন্তু আপনি আপনার জ্ঞানতৃষ্ণার জন্য অনেকের কাছে শ্রদ্ধাভাজনও হন। সংসারের জন্য আপনি অনেক করেন, কর্মক্ষেত্রেও আপনি অনেক করেন– কিন্তু আপনার মূল্যায়ন কেউ করতে পারে না। জীবনে যত বিপদেই পড়েছেন শেষপর্যন্ত আপনি উদ্ধার পেয়েছেন আপনার কনফিডেন্সের জন্য। আপনি খুব তাড়াতাড়ি মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন। আপনি মানুষকে খুব বিশ্বাস করেন, বিশ্বাস করে কখনো-কখনো ঠকেনও, তবু বিশ্বাস হারান না। আপনি রেগে গেলে সাংঘাতিক হয়ে ওঠেন, কিন্তু রেগে গেলেও আপনার বুদ্ধিভ্রম হয় না। আপনি সাধারণভাবে জীবনযাপন করতে চাইলেও বাঁকা পথ ধরতেও বাধ্য হন। সুশ্রী-সুন্দরী জাতিকা হলে বলুন– আপনার কাছে অনেক পুরুষই প্রেম নিবেদন করতে চায়। আপনি পাত্তা দেন না। আপনার গুণমুগ্ধ পুরুষের সংখ্যা বেশ ভালো। পুরুষরা অবলীলায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, সান্নিধ্য প্রত্যাশা করে। আপনি চাইলেই যে-কোনো পুরুষকেই দখলে নিতে পারেন, কিন্তু আপনি খুবই ক্যালকুলেটেড। বিভ্রান্ত হন না। ইত্যাদি– দেখবেন আপনার ‘মুরগি’ কী খুশি। আসলে সাধারণত মানুষ তোষামোদে খুব খুশি হয়। নিজের সম্বন্ধে ভালো ভালো কথা শুনতে কার-না ভালো লাগে! মানুষ স্বীকৃতি চায়। আবিষ্কার চায়। নিজেকে জানতে চায়। পিঠ চাপড়ানো মানুষের মন্দ লাগে না।

এবার মিলতেও পারে, না-ও মিলতে পারে এমন কিছু বলুন। তবে মেলার সম্ভাবনা বেশি। বলুন –মাঝেমধ্যেই আপনাকে একাকীত্বে পেয়ে বসে। আপনার প্রচুর ভালো বন্ধু আছে, শত্রুও আছে ঘাপটি মেরে। সন্মান আপনি পেয়েছেন, কিন্তু যতটুকু আপনার প্রাপ্য ততটুকু আপনি পান না। গোপন প্রণয় আপনার অজ্ঞাতসারে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। পেট ও অম্বল নিয়ে মাঝে মাঝে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইত্যাদি। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করলে জ্যোতিষী হিসাবে সফল হবেনই।

টিপস– ২৬; কোনো বিবাহিত এসে আপনার কাছে এসে জানতে চাইত পারেন– তার বিয়ে হবে কি না, হলে কবে হবে? কোনো সরকারি চাকুরে এসে আপনার কে এসে জানতে চাইতে পারে তার চাকরি হব কি না, হলে কবে হবে? এমন ফাঁপড়ে পড়লে ধূর্ততার সঙ্গে উত্তর দিতে হবে। না-হলে কেলানি একটাও মাটিতে পড়বে না। অবশ্য তাবড় তাবড় জ্যোতিষীবাবুরা এ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারেন না।

টিপস– ২৭: সবশেষে সবাইকে একথা বলতে ভুলবেন না– “আপনার হাতখানি খুব সুন্দর। এমন অপূর্ব হাত খুব একটা পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও কোটিতে গুটি। যাকে তাকে এ হাত দেখাবেন না। নষ্ট করে দেবে।”

দেশের রোজকার দৈনিক পত্রিকাগুলোয় দিনের অনেক গুরুত্বপুর্ণ খবর বাদ গেলেও “আপনার দিনটি কেমন যাবে” বা “আপনার রাশিফল” বিভাগটি কখনো বাদ যায় না। আবার কিছু কিছু টিভি চ্যানেলে সকালের বিশেষ আয়োজন থাকে এই রাশিফল নিয়ে। অথচ এমন অনেক পত্রিকা রয়েছে যাদের বিজ্ঞান নিয়ে সাপ্তাহিক আয়োজনটুকুও নেই। বরঞ্চ বিজ্ঞাপন কম আসে বলে কোনো কোনো পত্রিকা সেই সাপ্তাহিক আয়োজনটুকুও বাদ দিয়ে দেয়। কিন্তু এই বিশেষ বিভাগ চালু রাখতে তাদের কোনো সমস্যা নেই। কারণ একটাই এদেশে তো এই কু-খাদ্যের ভোক্তার অভাব নেই। হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন তাদের কাছে বিষয়টি নিছক বিনোদনের। হ্যাঁ, সেটা হতেই পারে। কিন্তু বিষয়টি যদি শুধু বিনোদনের জায়গায় থাকত তাহলে কি জ্যোতিষীদের চেম্বার, পাথরের দোকান বড়ো বড়ো শপিং মলে কি দেখা যেত? রাস্তার মোড়ে মোড়ে পত্রিকার দোকানগুলিতে কি দেখা যেত মাসিক, বাৎসরিক ভাগ্যলিপির পঞ্জিকা? আর টিভি চ্যানেলগুলিতেই-বা কি দেখা যেত এদের রমরমা বিজ্ঞাপন? না, মোটেই দেখা যেত না।

কোনো কোনো জ্যোতিষীবাবু জ্যোতিষকে বিজ্ঞান বলে প্রমাণ করতে চায়, কোনো কোনো জ্যোতিষবাবু আবার শাস্ত্র বলে প্রমাণ করতে চায়, কাউকে আবার শাস্ত্রও বলতে শুনেছি বিজ্ঞানও বলতে শুনেছি। যাঁরা বিজ্ঞানের তর্কে পর্যদস্ত হয়, তাঁরা বলেন জ্যোতিষকে শাস্ত্র বলে মেনে নিতে অসুবিধা কোথায় আপনাদের! যেন শাস্ত্র হলেই অব্যর্থ, দৈব কিছু! বিজ্ঞানের প্রথম শর্ত হল ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন’। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার পর। সেইসব পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ফলাফল। সুনির্দিষ্টভাবে নথিভুক্ত ও প্রকাশ করা হয়। যে কেউ তা যাচাই করে দেখে নিতে পারে। বিজ্ঞানে দ্ব্যর্থকতার কোনো জায়গা নেই। পটাশিয়াম সায়ানাইড শরীরে প্রবেশ করালে মৃত্যু অবধারিত। যে এটি করবেন তারই এ ঘটনা ঘটবে। অন্যথা হবে না। এটাই বিজ্ঞান, ফল সবসময় সকলের জন্য একই হবে। নিমপাতা চিবালে তেতো লাগবে সকলের, কারোর মিষ্টি লাগবে না –এটাই বিজ্ঞান। বারবার একই ফল পাওয়ার নামই বিজ্ঞান। যুক্তির কাছে অন্ধবিশ্বাস বা ব্যক্তিবিশ্বাসের কোনো জায়গা নেই, মূল্যও নেই। যুক্তি সিদ্ধান্তে পৌঁছায় পরীক্ষার পথ ধরে, পর্যবেক্ষণের পথ অতিক্রম করতে করতে।

জ্যোতির্বিদা বাস্তবিকই জ্যোতির্বিজ্ঞান হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যে অবিরাম গতিতে বিশ্লেষিত হয়ে চলল পার্থক্যের ব্যাপকতা। বহু পরীক্ষানিরীক্ষা এবং নিয়ত গবেষণার মধ্য দিয়ে জ্যোতির্বিদ্যা প্রতিষ্ঠা পেল বিজ্ঞানের অলিন্দে। তৎসহ জ্যোতিষশাস্ত্র অবিজ্ঞান হিসাবে ডাস্টবিনে পরিত্যক্ত হল।

ভারতে দারিদ্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৪০%, অতি নিম্নবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সংখ্যাও ৪০%। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষ বাকি শতংশের মধ্যে পড়ে। ৫% উচ্চবিত্ত ধরলে ১৫% মধ্যবিত্ত –এরা বেশ সচ্ছল প্রজাতির। দেখা যায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরাই মূলত জ্যোতিষের সমর্থক। বহু বছর আগে ‘ফলিত জ্যোতিষ’ শিরোনামে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী লিখেছেন –“কোনও একটা ঘটনার খবর পাইলে সেই খবরটা কি না এবং ঘটনাটা প্রকৃত কি না তাহা ……জানিবার অধিকার বিজ্ঞানবিদদের প্রচুর পরিমাণে আছে। এই অনুসন্ধান। কার্যই বোধ করি তাঁর প্রধান কার্য। প্রকৃত তথ্য নির্ণয়ের জন্য তাঁহাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। … তিনি অতি সহজে অত্যন্ত ভদ্র ও সুশীল ব্যক্তিকেও বলিয়া বসেন, তোমর কথায় আমি বিশ্বাস করিলাম না। … নিজের উপরেও তাঁর বিশ্বাস অল্প। … কোথায় কোন্ ইন্দ্রিয় তাঁহাকে প্রতারিত করিয়া ফেলিবে …… এই ভয়ে তিনি সর্বদা আকুল। …..ফলিত জ্যোতিষে যাঁহারা অবিশ্বাসী তাঁহাদিগের সংশয়ের মূল এই। তাঁহারা যতটুকু প্রমাণ চান ততটুকু পান না। তাহার বদলে বিস্তর কুযুক্তি পান। …. একটা ঘটনার সহিত মিলিলেই দুন্দুভি বাজাইব। আর সহস্র ঘটনার যাহা না মিলিবে তাহা চাপিয়ে যাইব, অথবা গণকঠাকুরের অজ্ঞতার দোহাই দিয়া উড়াইয়া দিব এরূপ ব্যাবসাও প্রশংসনীয় নহে। …একটা সোজা কথা বলি। ফলিত জ্যোতিষকে যাঁহারা বিজ্ঞানবিদ্যার পদে উন্নীত দেখিতে চাহেন তাঁহারা এইরূপ করুন। প্রথমে তাঁহাদের প্রতিপাদ্য নিয়মটা খুলিয়া বলুন। মানুষের জন্মকালে গ্রহনক্ষত্রের স্থিতি দেখিয়া কোন্ নিয়মে গণনা হইতেছে তাহা স্পষ্ট ভাষায় বলিতে হইবে। … ধরি মাছ না ছুঁই পানি হইলেও চলিবে না। তাহার পর হাজার খানেক শিশুর জন্মকাল ঘড়ি ধরিয়া দেখিয়া প্রকাশ করিতে হইবে; এবং পূর্বের প্রদত্ত নিয়ম অনুসারে গণনা করিয়া তাহার ফলাফল স্পষ্ট ভষায় নির্দেশ করিতে হইবে। ….. পূর্বে প্রচলিত ফলাফলের সহিত প্রত্যক্ষ ফলাফল মিলিয়া গেলেই ঘোর অবিশ্বাসীও ফলিত জ্যোতিষে বিশ্বাসে বাধ্য হইবে। হাজারখানা কোষ্ঠীর মধ্যে যদি নয়শো মিলিয়া যায় তবে মনে করিতে হইবে যে ফলিত জ্যোতিষে অবশ্য কিছু আছে। যদি পঞ্চাশখানা মার মেলে তবে মনে করিতে হইবে, তেমন কিছু নাই। হাজরের বলে যদি লক্ষটা মিলাইতে পারো, আরও ভালো। সহস্র পরীক্ষাগারে ও মানমন্দিরে বৈজ্ঞানিকেরা যে রীতিতে ফলাফল গণনা ও প্রকাশ করিতেছেন সেই রীতি আশ্রয় করিতে হইবে। কেবল নেপোলিয়নের ও বিদ্যাসাগরের কোষ্ঠী বাহির করিলে অবিশ্বাসীর বিশ্বাস জন্মিবে না। চন্দ্রের আকর্ষণে জোয়ার হয়, তবে রামকান্তের জজিয়তি কেন হইবে না, এরূপ যুক্তিও চলিবে না।”

জ্যোতিষী নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের অভিমত : “জ্যোতিষে বিশ্বাস সাধারণত দুর্বল মনের লক্ষণ। সুতরাং মনে এরকম দুর্বলতা এলেই আমাদের উচিত সুচিকিৎসক দেখিয়ে ভালোভাবে ওষুধ খাওয়া, ভালো পথ্য খাওয়া। আর বিশ্রাম করা।” বলেছেন –“In many cases it is simply mind-reading some times wonderful predictions are made, but in many cases it is arrant trash.”

এহেন বিষয়কেই ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে রেখে যুবকযুবতীদের স্বনির্ভরতার সন্ধান দিতে আগ্রহী হয়ে পড়েছে। এরপর কি ডাইনি বিদ্যা, ভূত প্রেত-জিন চর্চা, ডাকিনী চর্চা, ওঝা-গুণিন বিদ্যা, কালাজাদু, ঝাড়ফুঁক বিদ্যা, তেল-পড়া, জল-পড়া, বাটি চালান, ক্ষুর চালান, বশীকরণ বিদ্যাও সিলেবাসে আনবেন? অবাক হব না। কারণ আদি যুগ থেকে রাষ্ট্রই এইসব বিষয়ের পৃষ্ঠপোষক। রাষ্ট্রকে নির্বিঘ্নে থাকতে হলে নিয়তী বা অদৃষ্টবাদকে প্রতিপালন করতে হবে। তাই পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই অবিশ্বাসী বা নাস্তিকদের সুরক্ষা দেয় না, আস্তিকদের মদত জোগান। নাস্তিকরা এইসব অবৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোর সমালোচনা করলে সবক শেখাতে চান। বলেন– অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কথা নাস্তিকদের বলা উচিত হয়নি। আস্তিকরা নাস্তিকদের উপর হামলা করলে রাষ্ট্র প্রায় নির্লিপ্ত থাকে। এবার ইউজিসির কথা একটু উল্লেখ করা যাক ইউজিসি (University Grant Commission) বলছেন–জ্যোতিষ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তিন বছরের স্নাতক পাঠক্রম এবং দুই বছরের স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণাভিত্তিক পাঠক্রম চালু করবেন। আর এই জ্যোতিষচর্চায় নতুন নামকরণ করা হবে জ্যোতির্বিজ্ঞান। অ্যা, হাসবেন না কাঁদবেন! আরও শুনুন –উৎসাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে দেওয়া হবে এককালীন ১৪ লক্ষ টাকা। দেওয়া হবে জ্যোতিষবিদ্যার উপযুক্ত সরঞ্জাম কেনার জন্য। ইউজিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেইসব জ্যোতিষ বিভাগে একজন অধ্যাপক, দুইজন লেকচারার, একজন লাইব্রেরিয়ান এবং একজন কম্পিউটার চালক থাকবেন। এর ফলে যদি দেশে কুড়িটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পাঠক্রম চালু করা হয় তাহলে এই পাঁচজনের জন্য বাৎসরিক খরচ হবে ১ কোটি টাকা। বুজরুকি জারি রাখার জন্য এত অর্থের অপচয়! এ সংবাদ শুনে ভারতের অগ্রগণ্য পদার্থবিদ ও ইউজিসির প্রাক্তন চেয়ারম্যান অধ্যাপক যশপাল ক্ষোভ করে বললেন–”এ খবর শুনে আমি মর্মাহত। এ এক নিদারুণ লজ্জা, এক কলঙ্ক। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি ইউজিসির সভ্যদের মতোই আজ এদেশে মশা মাছির মতো অজ্ঞানদের অভাব নেই।” বেঙ্গালুরু রামন রিসার্চ সেন্টারের বৈজ্ঞানিকগণও একসুরে বললেন– “পশ্চাদে এগিয়ে চলার এ এক বিরাট পদক্ষেপ। এরপরে ভারতের বৈজ্ঞানিক গবেষণার আর কোনো মূল্যই রইল না।” ইন্ডিয়ান ডেমোক্র্যাটিক টিচার্স ফ্রন্টের বক্তব্য– “এই প্রস্তাব অবান্তর, হাস্যকর এবং ভয়ংকরও।”

আত্মপক্ষসমর্থনে ইউজিসি কী বলছেন বিজ্ঞপ্তি জারি করে, একটু দেখে নেব–

(১) বৈদিক জ্যোতিষবিদ্যা শুধু আমাদের জ্ঞানার্জনের শাস্ত্র নয়, বরং এটি এমন এক বিদ্যা যা আমাদেরকে সুশৃঙ্খলভাবে চলার পথ দেখায়। জ্যোতিষবিদ্যা আমাদের জানায় জীবনে ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রতিনিয়ত কেমন করে ঘটনাগুলি ঘটে চলেছে।

(২) বিভিন্ন সময়ে যে ঘটনাগুলি ঘটে তা আমাদের জীবনের উপর কীভাবে প্রভাব ফেলে এ বিষয়ে আমাদের অবহিত করে। সাহায্য করে প্রতিকূল অবস্থাকে অনুকূলে আনতে।

(৩) এটি এমন এক বৈদিক শাস্ত্র যার থেকে আমরা জানতে পারি কীভাবে কখন আমাদের জীবন হতাশা, দুঃখ, অস্থিরতা আসে। যা আমরা আমরা বুঝতে পারি না সে সম্বন্ধে অবহিত করা।

(৪) বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতিষচর্চা শুধু মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি ঘটাবে তা নয়– বৈদিক গণিত, বাস্তুশাস্ত্র, কৃষিবিজ্ঞান, মহাকাশবিজ্ঞান ইত্যাদি সম্পর্কেও একটা পরিপূর্ণ ধারণা দেবে।

(৫) এই মূল্যবান পাঠক্রম থেকে একদিকে যেমন শিক্ষক ও ছাত্র উপকৃত হবেন– অপরদিকে চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ সহ সকল পেশার মানুষজন সুফল লাভ করবে ইত্যাদি। রামা রামো!!

বাকি রইল এবার বশীকরণবিদ্যার পাঠক্রম, তাবিজ-কবচবিদ্যার পাঠক্রম, ঝাঁড়ফুকবিদ্যার পাঠক্রম, জল-পড়া আর তেল-পড়াবিদ্যার পাঠক্রম, ধর্ষণ-খুনের পাঠক্রম ইত্যাদি। গেরুয়া-সংস্কৃতি নিশ্চয় সেই স্বপ্ন পূর্ণ করবে। নিষ্পাপ প্রতারকরাই রাষ্ট্র চালাবেন, এবার থেকে প্রতারকরাই রাষ্ট্রের নাগরিকরা কী করবেন কী করবেন না ঠিক করে দেবেন? প্রতারকরা ফলাও করে বিজ্ঞাপন দেবেন, বলবেন –“আসুন, সাক্ষাৎ ধর্ষণ-খুন করলেও অকাট্য সাক্ষ্যসবুত থাকলেও মামলায় জিতিয়ে দেব। পরস্ত্রীতে আসক্ত? বিছানায় আনতে পারছেন না কিছুতেই? পাঁচ মিনিটে অব্যর্থ বশীকরণের মাধ্যমে স্বর্গসুখ অনুভব করুন। আপনার সন্তানকে সৌরভ গাঙ্গুলি কিংবা শচীন তেণ্ডুলকর কিংবা কল্পনা চাওলা কিংবা সানিয়া মির্জা কিংবা সানি লিওনে বানাতে চান? খাঁটি গ্রহরত্ন ব্যবহার করে অব্যর্থ ফল পান।”

এ পোড়া দেশে আইন আছে প্রচুর। কিন্তু আইন রক্ষা করার কেউ নেই। আইন প্রয়োগ করার কেউ নেই। প্রতারক জ্যোতিষীদের বিরুদ্ধে কি মামলা করা যায় এমন আইন আছে? বুজরুকির বিরুদ্ধে কি ভারতে কোনো আইন নেই? গোখলে বলেছিলেন– “what Bengal thinks today, India think tomorrow.” বেঙ্গল, মানে পশ্চিমবঙ্গ কি এইসব অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে? দিল্লি হাইকোর্টের এক বেঞ্চ দিল্লি সরকারকে নোটিস পাঠিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন– অলৌকিক ক্ষমতা বলে অসুখ বা কোনো সমস্যার সমাধানের প্রলোভন দেখালে তান্ত্রিক, জ্যোতিষী, বিজ্ঞাপনদাতা ও বিজ্ঞাপন, প্রকাশক ও প্রচার মাধ্যমের বিরুদ্ধে যেন ‘ড্রাগস অ্যান্ড ম্যাজিক রেমেডিজ (অবজেকশনাবল অ্যাডভার্টাইজমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৫৪’ অনুসারে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করা হবে। (দৈনিক বর্তমান ১ মে, ২০০৩) এই নোটিস জারি করা হয় ২৮ নভেম্বর ২০০১ সালে। বলা হয়েছে –ম্যাজিক বা অলৌকিক ক্ষমতাবলে অসুখ সারানো বা মানসিক কোনো সম্যা সমাধানের প্রলোভন দেখানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এসবের বিজ্ঞাপন দেওয়াও বেআইনি। এই আইন চালু আছে ১৯৫৪ সাল থেকেই। এই আইন প্রথমবার ভাঙলে ছয় মাসের জেল ও ১০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে। পরবর্তী অপরাধের জন্য এক বছর কারাদণ্ড হতে পারে। এই আইনের ঠ্যালায় যেসব স্বনামধন্য জ্যোতিষীরা দিল্লিতে জ্যোতিষগিরি করতে যেতেন তাঁদের ক্ষমতা হল খতম। দিল্লির তল্পিতল্পা গুটিয়ে জ্যোতিষীবাবুরা কলকাতায় পিছটান দিলেন। যাবে কোথায়! আইনের হাত অনেক লম্বা। ১৯৯৭ সালের ১৮ জানুয়ারি, The Indian Express’ পত্রিকায় যে খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল তা দেখে তাবড় তাবড় জ্যোতিষী এবং জ্যোতিষবিশ্বাসীদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়েছিল, তা হল –“Gang of six impostors arrested”। এরা হলেন পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত ছয় জ্যোতিষী। অপরাধ অবশ্যই ‘দ্য ড্রাগস অ্যান্ড ম্যাজিক রিমেডিস (অবজেকশনাল অ্যাডভার্টাইজমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৫৪ আইনের ৪, ৫, ও ৭ ধারা ভঙ্গ। তবু আজও জ্যোতিষচর্চা আর জ্যোতিষবাবুদের লোক ঠকানোর ব্যাবসা বহাল তবিয়তে চলছে। পাশাপাশি চলছে এই বুজরুকি ব্যাবসার অবলুপ্তির আন্দোলন। নিষিদ্ধ হোক প্রতারণা, জ্যোতিষ ব্যবসা। কঠোর থেকে কঠোরতর হোক আইন।

আমার এই লেখা পড়ে কোনো জ্যোতিষবাবু যদি বলেন জ্যোতিষ শাস্ত্র জ্যোতিষ বিজ্ঞান জ্যোতিষ চাঁদ-সূর্যের মতো সত্য, তবে তাঁদের জন্য আমার কাছে সুখবর আছে। রেইকি গ্রান্ডমাস্টার, ফেং শুই ক্ষমতার দাবিদার, জ্যোতিষ ও অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদারদের জন্য ২০ লক্ষ ভারতীয় টাকার চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেছেন যুক্তিবাদী প্রবীর ঘোষ। এই চ্যালেঞ্জ ওনার মৃত্যু পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, যতদিন প্রথম অলৌকিক ক্ষমতাবানের সাক্ষাৎ না হবে। অংশগ্রহণকারীরা কীভাবে তাঁদের সত্যতা প্রমাণ করবেন, তার বিস্তারিত প্রবীরবাবুর কাছেই পাবেন। প্রবীরবাবু আপনার জন্য আপনার অলৌকিক ক্ষমতা দর্শন করার জন্য অপেক্ষা করে আছেন। যোগাযোগের ঠিকানা : প্রবীর ঘোষ, ৭২/৮ দেবীনিবাস রোড, কলকাতা –৭০০০৭৪।

কৃতজ্ঞতা সূত্র : (১) রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী– ফলিত জ্যোতিষ (২) বিজ্ঞান বার্তা প্রকাশনী– জ্যোতিষের জালিয়াতি (৩) অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়– জ্যোতিষ কি আদৌ বিজ্ঞান? (৪) রত্নজিজ্ঞাসা– পীযূস দাস (৫) অর্জুন রায়– জ্যোতিষ সম্পর্কে কয়েকটি অপ্রিয় প্রশ্ন (৬) ডাঃ পার্থসারথী গুপ্ত– বিজ্ঞানের আলোয় জ্যোতিষ (৭) গৌরীপ্রসাদ ঘোষ– মহাবিশ্বে মহাকাশে (৮) নন্দলাল মাইতি– ইতিহাসে জ্যোতিষ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান (৯) অরূপরতন ভট্টাচার্য– প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান (১০) প্রবীর ঘোষ –জ্যোতিষীর কফিনে শেষ পেরেক (১১) প্রবীর ঘোষ –অলৌকিক নয়, লৌকিক (তৃতীয় খণ্ড)।

গোহত্যা, গোমাংস ও গোমাতার ইতিবৃত্ত

সম্প্রতি স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা সমগ্র পড়ে আমি চমকে গেলাম। গ্রন্থের একটি অংশে স্বয়ং বিবেকানন্দ বলেছেন, একদা হিন্দুগণ গো-মাংস ভক্ষণ করত। পৈতে, উপনয়ন অনুষ্ঠানে বৃষ বা ষাঁড় বলি দেওয়ার প্রথাই করে একদা গোমংস খেত। যদিও এখন আর এ অনুষ্ঠানে এসব বলি-টলি না-হলেও প্রতিকী হিসাবে জালি লাউ/কুমড়ো চারটে কাঠি পুঁতে দাঁড় করিয়ে রাখা অনুষ্ঠানে। এটা সম্ভবত মনুর যুগেই গো-সম্পদ রক্ষার তাগিদেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংস্কৃত ভাষায় ‘গোঘ্ন’ বলে একটা শব্দ পাই। এই শব্দটির অর্থ গোহত্যাকারী। আবার অতিথির একটি প্রতিশব্দ। অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে অতিথি। কেউ গৃহে এলে তাঁকে গোহত্যা করে আপ্যায়ন করা হত।

ঋগ্বেদের যুগে আর্যদের কাছে গোরু ছিল খুব মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ। বিত্তবানদের ‘গোমত’ এবং গোষ্ঠীপতিদের ‘গোপ’ বা ‘গোপতি’ নামে ডাকা হত। গোরু নিয়ে আর্যদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ হত। সেই সংঘর্ষকে বলা হত ‘গভিষ্টি’, ‘গব্যু’ বা ‘গবেষণ’ নাম দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন পৌরাণিক উপাখ্যানগুলিতে গোরুর দেবত্ব ও তার সঙ্গে অনেক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে। মহেঞ্জোদারোর সিলে ভীমকায় ষাঁড় বা বৃষের চিত্র আমরা পেয়েছি।

অথর্ব বেদের দশম কাণ্ডে অবধনীয় গোরুর গৌরবকথা আছে। এটা থেকেই প্রমাণ হয় যে, প্রাচীন ভারতে গোরু অবধ্য মানা হত। গোরুকে শুধু ‘অগ্ন’ বা ‘অগ্ন’ বলা হত তা নয়, বেদে আরও অনেক গৌরবজনক নামে ডাকা হয়েছে। ঋগ্বেদে ‘অগ্ন’ ও ‘অম্লা’ কথাগুলি চারবার উল্লেখ আছে। অথর্ব বেদে স্ত্রীলিঙ্গে ও পুংলিঙ্গে আরও ৪০ বার উল্লেখ আছে। গৌ, উস্র, ধেনু, সুদুগ্ধা, বৃষ ইত্যাদি গোরুর মোট ২১টি সমার্থক শব্দ পাওয়া যায়। বিভিন্ন শব্দরূপ ও সমার্থক মিলিয়ে ঋগ্বেদে গোরু প্রায় ৭০০ বার উল্লেখিত হয়েছে।

বৈদিক যুগের পশুপালন ও কৃষিভিত্তিক সমাজের কেন্দ্রে গোরুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গোরুই ছিল মুদ্রা। গোরুর বিনিময়ে কেনাকাটা হত। গোরুই ছিল অর্থনীতি। ঋগ্বেদে আছে, “পণি’ বলে একদল মানুষ ইন্দ্রের গোরু চুরি করেছিল। তাতে ইন্দ্ৰ ক্ষেপে গিয়ে সরমা নামে এক কুকুরকে পাঠিয়ে পণিদের ধমক দেন –“গোরু ফেরত দাও। না-হলে ইন্দ্র এসে তোমাদের মজা দেখিয়ে দেবে।” এটা থেকে বোঝা যায় ইন্দ্রের মতো মহাশক্তিধরও গোরু ছাড়া শক্তিহীন।

বৈদিক যুগের ভারতীয়রা গোরুকে শুধুমাত্র পশু হিসাবেই দেখতেন তা নয়। তৎকালীন যুগে সমাজ, অর্থনীতি ও ধর্মে গোরুর একটা বিরাট স্থান ছিল। গোরুই ছিল সম্পদশালীর মাপকাঠি। তাই গোরুকে বৈদিক সাহিত্যে অনেক গৌরবজনক বিশেষণে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের পঞ্চম সূক্তে অগ্নিকে বলা হয়েছে– ‘বৃষভশ্চ ধেনুঃ’, অর্থাৎ তিনি বৃষ ও গাভী দুই-ই। নবম মণ্ডলের ৭২ সূক্তে সোমকে বলা হচ্ছে ‘প্রিয়ঃ পতিগৰ্বাৎ’, অর্থাৎ গাভীর স্বামীস্বরূপ (Lord of Cows)। অন্যত্র সূর্যকে বলা হয়েছে এক উজ্জ্বল। বর্ণধারী বৃষ বা ষাঁড়, ইন্দ্রকে সুদুগ্ধা ধেনুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। গোদুগ্ধকে তুলনা করা হয়েছে উজ্জ্বল রশ্মির সঙ্গে। গোরুকে অভিহিত করা হয়েছে রুদ্রের মাতা, বসুগণের দুহিতা ও আদিত্যের ভগ্নী বলে। আহ্লাদ করে ডাকা হয়েছে ‘অদিতি’, ‘ঋত’, বাক’ এরকম বিভিন্ন নামে। বৃহস্পতিকে বলা হয়েছে ‘গোপতি’, মরুৎকে বলা হয়েছে ‘গোবন্ধু’।

প্রাচীন ভারতে যে গোরু অবধ্য ছিল সে বিষয়ে প্রথম ও অকাট্য প্রমাণ হল ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলে ১৬৪ সূক্তের ৪০ ঋকে গোরুকে ‘অগ্ন’ অর্থাৎ ‘অবধনীয়’ বলা হয়েছে। আবার ৪৩ নম্বর ঋকে বৃষ মাংস ভক্ষণের কথা আছে। পঞ্চম মণ্ডলের ২৯ সূক্তের ৮ নম্বর ঋকে মহিষের মাংস ভক্ষণের কথা আছে। অথর্ব বেদের দ্বাদশ কাণ্ডের চতুর্থ ও পঞ্চম সূক্তে গোবধের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় লেখা এবং কেউ গোবধ করলে সে ‘মৃত্যু পাশেমু বধ্যতাম’ হবে। এছাড়াও ওই সূক্তেরই ২২ ঋকে গোরুকে আবার ‘অঘ্না’ বলা হয়েছে।

ঋগ্বেদে দুই ধরনের তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি ধরন হল গোরুকে ‘অঘ্নেয়’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋগ্বেদে ‘অঘ্নেয়’ কথাটির অর্থ হল যাকে হত্যা করা অনুচিত। কাঠহিন্দুরা এটা থেকেই যে যুক্তিটা খুঁজে পায়, সেটা হল গোহত্যা সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা। বলা হয় গোমাংস ভক্ষণ করা তো দূরের কথা, গোহত্যাও করা যেত না। না, ‘অগ্নেয়’ কথাটি সারসত্য হয়ে যায়নি। বৈদিক যুগেও নয়। শতপথ ব্রাহ্মণে (তৃতীয়–১:২: ২১) দুটি জায়গায় প্রাণী উৎসর্গ ও গোমাংস ভক্ষণ সম্পর্কে বলা হয়েছে– “অর্ধ্বেয়ু তখন তাঁকে গৃহাভ্যন্তরে নিয়ে এলো। তাঁকে বলা হল সে যেন গাভী ও ষাঁড়ের মাংস না খায়। কারণ গাভী ও ষাঁড় পৃথিবীতে অনেক উপকার করে। দেবতারা বললেন –গাভী ও ষাঁড় জগতের অনেক উপকার করে, তাই গাভী ও ষাঁড় যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করে। এজন্য সে গাভী ও ষাঁড়ের মাংস খেতে ইচ্ছুক।” ঋগ্বেদে বলা হয়েছে আর্যরা খাদ্য হিসাবে গোহত্যা করত এবং গোমাংসকে উত্তম খাদ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে ৮৫ : ১৪ শ্লোকে ইন্দ্র বলছেন–“তাঁরা ১৫/২০ টি গোরুর মাংস রান্না করেছে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ৭২ : ৬ শ্লোকে তরবারি বা কুঠার দ্বারা গোহত্যার উল্লেখ আছে। অপস্তম্ভ ধর্মসূত্রের ১৪, ১৫ ও ২৯ শ্লোকে বলা হয়েছে –“গাভী এবং ষাঁড় হচ্ছে পবিত্র। সুতরাং তাদের মাংস অবশ্য ভক্ষ্য।”

আপস্তম্ভ ধর্মশাস্ত্রের একটি পরিচ্ছেদে কোন্ কোন্ খাদ্যদ্রব্য ভক্ষণ করা উচিত বা অনুচিত, তার তালিকা আছে। ওই সূত্রটিতে উল্লেখ আছে এক ক্ষুরবিশিষ্ট উট, শূকর, শরভ ও গায়ল নামের এক ধরনের পশু খাওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু তার পরের ঋষি বলেছেন গোরু ও ষাঁড়ের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। আপস্তম্ভ ঋষি ওই অধ্যায়েই পেঁয়াজ, রসুন, মাশরুম এবং মুরগি ভক্ষণে নিষেধ করেছেন।

সংস্কৃতে একটা প্রাচীন শব্দ হল ‘গো-সঙ্খ্য’। এই শব্দটার অর্থ হল ‘গো পরীক্ষক’। কেন গোরু পরীক্ষার প্রয়োজন হত? কারণ যে গোরু বা ষাঁড় বা বলদ কর্তন করা হবে, তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা। অর্থাৎ সব গোরু চোখ বুঝে ভক্ষণ করা যেত না। নিরোগ শরীর হতে হবে। ডাঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদের প্রণীত ‘Beef in Ancient’ ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘জাতি গঠনে বাধা’ গ্রন্থে বৌদ্ধযুগের আগে হিন্দুরা যে প্রচুর গোমাংস ভক্ষণ করত, তার উল্লেখ আছে। এসব গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের আগে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ মোটেই নিষিদ্ধ ছিল না। মধু ও গোমাংস না খাওয়ালে তখনকার সময়ে অতিথি আপ্যায়নই অপূর্ণ থেকে যেত। সেই কারণেই অতিথির আর-এক নাম ‘গোঘ্ন’। রামপ্রসাদের গুরু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ তাঁর ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’ গ্রন্থে অষ্টবিধ মহামাংসের মধ্যে গোমাংসের উল্লেখ প্রথমেই আছে।

বৈদিক যুগে বিভিন্ন যজ্ঞে দেবতাদের উদ্দেশ্যে যে পশুবলি উৎসর্গ করা হত, সেখানে অন্যান্য পশুদের সঙ্গে গোরুর কথাও উল্লেখ আছে অনেকবার। ঋগ্বেদে দশম মণ্ডলের ১৬৯ সূক্তটির দেবতাই হচ্ছেন ‘গাবঃ’। কিন্তু সেখানেও এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, গোরুরা দেবতাদের যজ্ঞের জন্য নিজেদের শরীর সমর্পণ করে থাকে। দশম মণ্ডলেরই ৮৬ সূক্তে ইন্দ্র বড়াই করে ইন্দ্রাণীকে বলছেন–“আমি পনেরো বা বিশ বৃষের মাংস খেতে পারি।” অষ্টম মণ্ডলের ৪১ সূক্তে ঋগ্বেদের আর-এক মুখ্য দেবতা অগ্নিকে ঘিয়ের সঙ্গে যেসব মাংস আহুতি দেওয়া হত, তার মধ্যে অশ্ব, ঋষভ (বলদ), উক্ষ (ষাঁড়), মেষ এবং ভশা। এই ভশা শব্দটি যে গোরু সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ না-থাকলেও এটি কোন্ ধরনের গোরু তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। অনেক পণ্ডিতদের মতে ভশা হল বন্ধ্যা বা দুগ্ধবতী নয় এমন গোরু।

যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতাতে অশ্বমেধ যজ্ঞের শেষে যেসব প্রাণী উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ আছে, তার মধ্যে গোরুও আছে। যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে রাজসূয় ও বাজপেয় যজ্ঞের ‘গোসভ’ নামে যে অংশটি আছে, তাতেও একই কথা লেখা। আরও অন্যান্য যজ্ঞগুলিতেও (অগ্নিষ্টোম যজ্ঞ, দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞ, চতুর্মাস্য যজ্ঞ, সৌত্ৰামণি যজ্ঞ) ‘পশুবন্ধ’ অংশে গোরু বা বৃষ উৎসর্গের উল্লেখ পাই। কোনো সন্দেহ নেই যে, বিভিন্ন যজ্ঞে অন্য পশুর সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া, গোরু, বলদ এবং ষাঁড়ের বলি দেওয়া হত।

বৈদিক যুগে শুধুমাত্র যে যজ্ঞের উপলক্ষ্যে গোমাংস ও অন্যান্য পশুমাংস খাওয়া হত তা নয়। ‘গবাময়ন’ নামে একটি সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল, যে অনুষ্ঠানের শেষে বন্ধ্যা গোরু মিত্রবরুণ ও অন্যান্য দেবতাকে উৎসর্গ করা হত। সে যুগে মধুপর্কের প্রচলন ছিল। বাড়ি অতিথিরা এলে তাঁদের অর্ঘ বা মধুপর্ক খেতে দেওয়ার নিয়ম ছিল। প্রাচীনকালে মধুপর্কে দই-মধুর সঙ্গে গোমাংস দেওয়া হত। আপস্তম্ব, সাখ্যায়ণ, গোভিল, খাদির, পারস্কার, হিরণ্যকেশী প্রমুখ ঋষিদের রচনা গৃহ্যসূত্রে মধুপর্কে গোমাংসের কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। শ্রাদ্ধে পিতৃপুরুষকে তৃপ্ত করতে যে গোমাংস দেওয়া হত তারও উল্লেখ আছে। এ বিষয়ে আরও জানতে ‘ভারতরত্ন’ পণ্ডিত পাণ্ডুরঙ্গ কাণের ‘History of Dharmasastra’ পড়ে দেখতে পারেন।

ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সপ্তম অধ্যায়ে বলি দেওয়া পশুটি যজ্ঞের পুরোহিতদের মধ্যে কে, কীভাবে, কোন্ ভাগটা পাবে তারও উল্লেখ আছে। তৈত্তিরীয় সংহিতাতে বলির পশুর শরীর কেমনভাবে কাটা হবে তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। অথর্ব বেদের গোপথ ব্রাহ্মণে ‘সমিতার’ অর্থাৎ যিনি পশু বলি দেন, তিনি কীভাবে ছত্রিশ ভাগে পশুটি কাটবেন সেই হিসাবও দেওয়া হয়েছে। যজ্ঞে যে পশু বলি বা উৎসর্গ করা হত, তা খাদ্য হিসাবেও ব্যবহার করা হত। যজ্ঞের পশু যে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হত, সে কথা শতপথ ব্রাহ্মণের তৃতীয় ও পঞ্চম উল্লেখ আছে– “পশ্বে বৈ অনুম” এবং “অন্নম বৈ পশ্বঃ”। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণের তৃতীয় অধ্যায়ের একটি শ্লোকে স্পষ্টভাবে লেখা আছে –“অথো অন্নং বৈ গৌঃ”। অতএব গোমাংস খাদ্যই। শতপথ ব্রাহ্মণের তৃতীয় কাণ্ডে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন যে, তিনি গোমাংস খেতে ভালোবাসেন, যদি তা অংসল (নরম) হয়। যজ্ঞের মাংস যে খাওয়া হত এবং গোমাংস খাদ্যবিশেষ ছিল এ বিষয়ে কোনো প্রশ্নচিহ্ন থাকছে না। বৃহদারণ্যক উপনিষদে উল্লেখ আছে– কেউ যদি জ্ঞানী, সর্ববেদবিদ্ ও দীর্ঘ পরমায়ুযুক্ত সন্তান চায়, তাহলে সেই দম্পতি ঘি দিয়ে বৃষমাংস বেঁধে খেতে হবে। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে ‘পঞ্চশারদীয় সেবা’ নামে একটি ভোজন অনুষ্ঠানের কথা জানা যায়, সেই ভোজনানুষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য হল –১৭টি পাঁচ বছরের নিচে গোবৎস কেটে রান্না করে অতিথিদের পরিবেশন করা। ঋগ্বেদ সংহিতাতেও ‘বিবাহসূক্ত’-এ কন্যার বিবাহ উপলক্ষ্যে সমাগত অতিথি-অভ্যাগতদের গোমাংস পরিবেশনের জন্য একাধিক গোরু বলি দেওয়ার বিধান আছে। (১০ : ৮৫ : ১৩)

ধর্মশাস্ত্র ছাড়াও প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যেও গোমাংস ভক্ষণের কথা জানতে পারি। সাহিত্য সমাজের দর্পণ, ইতিহাসও। বাল্মীকির রামায়ণে উল্লিখিত রামচন্দ্রের খাদ্যতালিকায় ছিল তিন প্রকার মদ (আসব) ছিল– (১) গৌড়ী : এটা গুড় থেকে তৈরি হত। (২) পৌষ্টি : পিঠে পচিয়ে তৈরি হত। (৩) মাধ্বী : মধু থেকে তৈরি হত। এই মদের সঙ্গে থাকত শূলপক্ক গোবৎসের মাংস। ভবভূতির ‘উত্তররামচরিত’ নাটকের চতুর্থ অঙ্কে বাল্মীকির দুই শিষ্যের মধ্যে একটি কথোপকথন এখানে উল্লেখ করা যাক। বশিষ্ঠ ঋষি বাল্মীকির আশ্রমে এসেছেন। ফলে বাল্মীকির এক শিষ্য অন্য এক শিষ্যকে জিজ্ঞাসা করছেন –“এই দাড়িওয়ালা বুড়োটা কে রে, বাঘ নাকি? উনি এসেই মেটে রঙের বেচারা বাছুরটিকে খেয়ে ফেললেন।” অন্য শিষ্য সতীর্থকে শাস্ত্র মনে করিয়ে দিয়ে বললেন –“সমাংস মধুপর্ক দিয়ে অতিথি সৎকার করতে হয়, এটা ধর্মশাস্ত্রে লেখা আছে।” বরাহমিহিরের ‘ভরতসংহিতা’-য় বিভিন্ন পশুর মাংসের পাশাপাশি গোমাংসের কথাও উল্লেখ আছে। মহাভারতের বনপর্বে আছে রাজা রন্তিদেবের হেঁশেলে রোজ ২০০০ গোরু রান্না করা হত। মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের পূর্বমেঘ পর্বে ৪৬ নম্বর শ্লোকে যক্ষ মেঘকে বলছে –“গো-নিধনের রক্তে যিনি নদী বইয়েছিলেন, সেই রন্তিদেবকে তোমার যাত্রাপথে যোগ্য সম্মান দিও।” প্রাচীন তামিল সাহিত্যে প্রায় ২০০০ বছর পুরোনো সঙ্গম সাহিত্য ‘অকানানুরু’ গ্রন্থের ২৪৯ ও ২৬৫ পদদুটিতে একদল দস্যুর মোটাসোটা বাছুরের মাংস খাওয়ার বিবরণ আছে।

ডঃ আম্বেদকর তাঁর ‘why Did The Brahmins Give Up Beef-Eating’ গ্রন্থে বেদ-স্মৃতি-পুরাণ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন– তৎকালে ব্রাহ্মণরা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে গোমাংস ভক্ষণ করত। সেইজন্য ব্রাহ্মণদের বলা হত ‘গোঘ্ন’। গোয় মানে গোহত্যাকারী। কশাইকে গোমাংসের অংশ বঞ্চিত করার জন্য ব্রাহ্মণরা নিজেরাই নিজ হাতে গোরু কাটত। মহভারতের অনুশাসন পর্বের ৮৮ অধ্যায়ে শ্রাদ্ধাদি কাজে অতিথিদের গোমাংস ভক্ষণ করালে পূর্বপুরুষ এক বছর পেতে পারে। এই উপদেশ যুধিষ্ঠিরকে দিচ্ছেন পিতামহ ভীষ্ম। বিরাট রাজার গোশালায় অজস্র গোহত্যা করা হত, তার উল্লেখ আছে। আগেই বলেছি রামায়ণের রাম গোমাংসের সঙ্গে মদ্যপান করতে পছন্দ করতেন। বনবাসকালে রাম তাঁর মায়ের কাছে আক্ষেপ করে বলছেন, সে চোদ্দো বছর গোমাংস ভক্ষণ করতে পারবেন না, সোমরস পান করতে পারবেন না এবং স্বর্ণ পালঙ্কে শয়ন করতে পারবেন না। পৌরাণিক যুগে গোমাংস ভক্ষণের প্রত্যক্ষ এবং বিস্তারিত প্রমাণ রামায়ণের তুলনায় মহাভারতে অনেক বেশি। বলা হয়েছে –(১) “বশিষ্ঠ মুনি মদ্য ও গোমাংস প্রভৃতি দিয়া বিশ্বামিত্রকে তাঁহার সেনাগণের সহিত ভোজন করাইয়াছিলেন।” হুইলার প্রমুখ সাহেবরা রামায়ণের যুগে যে গোমাংস ভক্ষণের ব্যবস্থা ছিল, সেকথা উল্লেখ করতে দ্বিধা করেননি। (২) “ভরদ্বাজ মুনি ভরতকে গোমাংসাদি দিয়া পরিতুষ্ট সহকারে ভোজন করাইয়াছিলে এবং তৎকালে বিশ্বামিত্রের যজ্ঞে ব্রাহ্মণেরা দশ সহস্র গোভক্ষণ করিয়াছিলেন।” বেদব্যাস বিরচিত মহাভারতের শান্তিপর্বে (১২ : ২৬৬) ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে যে রাজা বিচষ্য গো-মেধ যজ্ঞে একদিকে অসংখ্য গোরুর আর্তনাদ এবং ছিন্ন দেহ, আর অন্যদিকে ব্রাহ্মণদের নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন।

মহর্ষি পাণিনি কী বললেন, দেখা যাক–“অতিথি আগমন করলে তাঁহার জন্য গো-হত্যা করবে।” কৃষ্ণ যজুর্বেদের মৈত্ৰায়ণীয় শাখার অন্তর্ভুক্ত মানবগৃহ্যসূত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “বাড়িতে অতিথি এলে তাকে আপ্যায়ন করতে গোরুর মাংস দিতে হবে এবং গৃহস্থের কর্তব্য হচ্ছে অতিথির সঙ্গে আরও চারজন ব্রাহ্মণকে গোমাংস ভোজনে আমন্ত্রণ জানানো।” (পৃ: ২৮) মহাত্মা গান্ধী 261694, “I know there are scholars who tell us that cow sacrifice is mentioned in the Vedas. … read a sentence in our Sanskrit text-book to the effect that Brahmins of old (period) used to eat beef.” ( M.K.Gandhi, Hindu Dharma, New Delhi, 1991, p. 120). অর্থাৎ, “আমি জানি (কিছু সংখ্যক পণ্ডিত আমাদের বলেছেন) বেদে গো-উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ আছে। আমি আমাদের সংস্কৃত বইয়ে এরূপ বাক্য পড়েছি যে,পূর্বে ব্রাহ্মণরা গো-মাংস ভক্ষণ করতেন।” (হিন্দুধর্ম, এম.কে. গান্ধী, নিউ দিল্লি, ১৯৯১,পৃ. ১২০)।

একবার দেখা যাক ‘বৃহদারণ্যকোপনিষদ’ কী বলছে। বলছে –“কোনো ব্যক্তি যদি এমন পুত্র লাভে ইচ্ছুক হন, যে পুত্র হবে প্রসিদ্ধ পণ্ডিত, সভাসমিতিতে আদৃত, যার বক্তব্য শ্ৰতিসুখকর, যে সর্ববেদে পারদর্শী এবং দীর্ঘায়ু, তবে তিনি যেন বাছুর অথবা বড়ো বৃষের মাংসের সঙ্গে ঘি দিয়ে ভাত রান্না করে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে আহার করেন” (বৃহদারণ্যকোপনিষদ ৬/8/১৮)। বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রে গো-মাংস ভক্ষণের সমর্থন পাওয়া যায়। বশিষ্ঠস্মৃতি’-তে বলা হয়েছে– ব্রাহ্মণ, রাজা, অভ্যাগতদের জন্য বড়ো ষাঁড় কিংবা বড়ো পাঁঠার মাংস রান্না করে আতিথেয়তা করা বিধেয় (বশিষ্ঠস্মৃতি ৪/৮)। মনু অবশ্য কোনো কোনো প্রাণীর মাংস খেতে বারণ করেছেন। বলার বিষয় হল, তার মধ্যে গোরু পড়ে না। কারণ, যেসব প্রাণী এক খুর বিশিষ্ট তাদের মাংস খাওয়া বিশেষ বিধান ছাড়া বারণ (মনুস্মৃতি ৫/১২)। এই শ্রেণিতে গোরু পড়ে না। অন্যদিকে, যেসব প্রাণীর শুধু এক পাটি দাঁত আছে তাদের মাংস খাওয়া যেতে পারে (মনুস্মৃতি ৫/১৮)। এখানেই শেষ নয়, মনুস্মৃতি বলছে– অতিথিদের খেতে দেওয়ার জন্য, পোষ্যদের প্রতিপালনের জন্য, অথবা ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য প্রয়োজনে যে-কোনো মাংস বিধিসম্মত (মনুস্মৃতি ৫/২২)। চাণক্য বা কৌটিল্য কী বলেছেন তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’-এ, সেটি জানবেন না? জানুন– (১) গোপালকেরা মাংসের জন্য ছাপ দেওয়া গোরুর মাংস কাঁচা অথবা শুকিয়ে বিক্রি করতে পারে (অর্থশাস্ত্র ২/২৯/১২৯)। (২) মাংসের জন্য ছাপ মারা গোরু ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণীর গোরু হত্যা নিষিদ্ধ (অর্থশাস্ত্র ২/২৬/১২২)। (৩) রাজ্যের গবাদি পশুর তত্ত্বাবধায়কের পদে একজন সরকারি কর্মচারী থাকবেন। তিনি গোরুদের ছাপ দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করবেন। যেমন– দুগ্ধবতী গাভী, হালটানা বা গাড়িটানা বলদ, প্রজননের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত ষাঁড় এবং মাংসের জোগানের জন্য অন্যান্য গোরুসমূহ (অর্থশাস্ত্র ২/২৯/১২৯)। গৃহ্যসূত্রগুলির সুরও প্রায় এক। বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্গত গৃহ্যসূত্রগুলিতে গোরু বলি এবং গোমাংস। ভক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। অধিকাংশ গৃহ্যসূত্রে ব্রাহ্মণ, আচার্য, জামাই বা জামাতা, রাজা, স্নাতক, গৃহস্থের প্রিয় অতিথি, অথবা যে-কোনো অতিথির জন্য মধুপর্ক অনুষ্ঠানের বিধান আছে। আর সেইসব অনুষ্ঠানে গোমাংস পরিবেশন করাই ছিল সাধারণ বিধান ও রীতি। বিভিন্ন পুরাণেও গোরুর মাংস ভক্ষণ এবং বিশেষ করে ব্রাহ্মণদের পরিবেশন করার স্পষ্ট নির্দেশ এবং প্রশংসা আছে। বিষ্ণুপুরাণে গোরু, শূকর, গন্ডার, ছাগ, ভেড়া প্রভৃতি বিভিন্ন পশুর মাংস খাইয়ে ব্রাহ্মণদের হবিষ্য করার বিধান দিয়ে সেই সঙ্গে কোনো মাংস ব্রাহ্মণদের ভক্ষণ করালে পিতৃপুরুষেরা কতদিন পরিতৃপ্ত থাকবেন তার একটা পরিসংখ্যানের উল্লেখ আছে। বিষ্ণুপুরাণ বলছে, ব্রাহ্মণদের গোমাংস খাইয়ে হবিষ্য করালে পিতৃগণ ১১ মাস পর্যন্ত তৃপ্ত থাকেন। আর এ স্থায়িত্বকালই সবচেয়ে দীর্ঘ (বিষ্ণুপুরাণ ৩/১৬)। গোরুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ আয়ুর্বেদাচার্য চরক এবং সুশ্রুত। চরক বলছেন– গোমাংস বাত, নাক ফোলা, জ্বর, শুকনো কাশি, অত্যাগ্নি (অতিরিক্ত ক্ষুধা বা গরম), কৃশতা প্রভৃতি অসুখের প্রতিকারে বিশেষ উপকারী (চরকসংহিতা ১/২৭/৭৯)। সুশ্রুতও একই সুরে বলেছেন– গোমাংস পবিত্র এবং ঠান্ডা। হাঁপানি, সর্দিকাশি, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অতি ক্ষুধা এবং বায়ু বিভ্রাটের নিরাময় করে (সুশ্রুতসংহিতা ১/৪৬/৪৭)। এত গেল অতীতে, অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে হিন্দুগণের গোমাংস ভক্ষণ প্রসঙ্গে তথ্যসূত্র সংবলিত আলোচনা।

এত কিছু আলোচনার পর হিন্দুরা গোমাংস ভক্ষণ করত কি না সে প্রশ্ন অবান্তর। হ্যাঁ, ঠিক। একটা ছোট্ট অংশের হিন্দু আজও গোমাংস ভক্ষণ করলেও বড় অংশের হিন্দুরা বহুকাল গোমাংস ভক্ষণ করে না। সে ব্যাপারে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু কোনোকালেই হিন্দুরা গোমাংস ভক্ষণ করত না, একথা বলা মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করার সামিল। বিশেষ করে ব্রাহ্মণরা যখন বলেন তাঁরা কখনোই গোমাংস ভক্ষণ করতেন না, সেটাকে মিথ্যাচার অথবা অজ্ঞানতা বলে। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থগুলি কিন্তু গোমাংস ভক্ষণের পক্ষেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

ইসলাম ধর্মে শুয়োয়ের মাংস ভক্ষণে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মতো হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে গোমাংস ভক্ষণের বিরুদ্ধে ফতোয়া না থাকলেও হিন্দুরা কেন গোমাংস ভক্ষণের অভ্যাস ত্যাগ করল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদের জানতে হবে হিন্দুদের বিভিন্ন শ্রেণির খাদ্যাভ্যাস তাঁদের গোষ্ঠী অনুসারে স্থিরীকৃত করা হয়েছিল। হিন্দুদের গোষ্ঠীবিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসও বদলে গেল। একটি গোষ্ঠী হল শিবভক্ত শৈব, অন্যটি হল বিষ্ণুভক্ত বৈষ্ণব। একটি মাংসাহারী আমিষভোজী এবং অন্যটি শাকাহারী নিরামিষভোজী। আর-একটু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করলে মাংসাহারীদের দুটি উপবিভাগে ভাগ করা যায়– (১) যাঁরা মাংস খায় বটে, কিন্তু গোমাংস ভক্ষণ করে না। (২) যাঁরা গোমাংসসহ সব মাংসই ভক্ষণ করে। অনুরূপভাবে হিন্দুসমাজকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন –(১) ব্রাহ্মণ, (২) অ-ব্রাহ্মণ এবং (৩) অস্পৃশ্য।

ব্রাহ্মণদের মধ্যে একটা শ্রেণি আছে যাঁরা নিরামিষভোজী। কারণ ভারতের ব্রাহ্মণরা দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। যেমন– পঞ্চ দ্রাবিড় ও পঞ্চ গৌড়। পঞ্চ দ্রাবিড়েরা নিরামিষভোজী। পঞ্চ গৌড়রা আমিষভোজী। অব্রাহ্মণরা মাংসভোজী হলেও গোমাংস ভক্ষণ করে না। তবে তথাকথিত অস্পৃশ্যরা গোমাংস সহ সব ধরনের মাংস ভক্ষণ করে।

যাঁরা মাংসভোজী তাঁরা কেন গোমাংস ছাড়লেন? সেইসব বিধিনিষেধের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় বৌদ্ধ-সম্রাট অশোকের বিধানে। বোঝাই যায় হিন্দুধর্মের উপর বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। অশোকের বিধান স্তম্ভের গাত্রে ও পর্বতগাত্রে ঘোষিত নির্দেশ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে –“এইসব নির্দেশ মহামান্য রাজার আদেশে লিখিত হয়েছে। রাজধানীর মধ্যে কেউ কোনো প্রাণীকে বলি দিতে পারবে না, বা কোনো পবিত্র ভোজ দিতে পারবে না। কারণ মহামান্য রাজার নিকট ওসব আপত্তিকর।” যদিও কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে মহামান্য রাজা এমন ভোজকে আপত্তিকর বলে মনে করেন না, সেটারও উল্লেখ আছে– “পূর্বে মহামান্য রাজার রসুই ঘরে হাজার হাজার প্রাণী রান্নার জন্য হত্যা করা হত। কিন্তু যখন এই পবিত্র নির্দেশ ঘোষিত হয়েছিল তখন বলা হয়েছিল তখন বলা হয়েছিল সারাদিনে কেবলমাত্র তিনটি প্রাণী খাদ্যের উদ্দেশে হত্যা করা যেতে পারে। যেমন –দুটি ময়ুর ও একটি হরিণ, অবশ্য যদি প্রয়োজন হয়। এখন থেকে এই তিনটি প্রাণীও হত্যা করা যাবে না।” সম্রাট অশোক বিশেষ করে যেসব প্রাণীদের হত্যা ও ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছিলেন, তার একটা তালিকা পাওয়া যায়। যেমন –টিয়া পাখি, হরবোলা পাখি, হাড়গিলা পাখি, পাতিহাঁস, মণ্ডিমুখ, গেলটাস, বাদুড়, বড়ো পিঁপড়ে, মেয়ে কচ্ছপ, অস্থিহীন মাছ, বেদবেয়াক, গঙ্গাপুপুটক, শঙ্কর মাছ, নদী কচ্ছপ, সজারু, কাঠবিড়ালি, বড়ো শিংওয়ালা হরিণ, ষাঁড়, বানর, গণ্ডার, ঘুঘু, পায়রা, সব প্রজাতির চতুষ্পদ প্রাণী, ভেড়ী, গাভী ইত্যাদি।

এছাড়া অশোকের বিধানে আছে– মোরগকে খাসি করা যাবে না। জীবন্ত প্রাণীসহ ভূষি পোড়ানো চলবে না। জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে প্রাণী হত্যা করা যাবে না। কোনো প্রাণীকে দিয়ে কোনো প্রাণীকে হত্যা করা যাবে না। তিষ্যা মাসের পূর্ণিমা, প্রথম পক্ষের চতুর্দশ ও পঞ্চদশ দিবসে, দ্বিতীয় পক্ষের প্রথম দিনে মাছ ধরা বা বিক্রয় করা যাবে না। এইসব দিনে অন্য প্রাণীও হত্যা করা যাবে না। পক্ষের অষ্টম, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ দিবসে এবং তিষ্য ও পুনর্বাসা দিবসে এবং উৎসবের দিনে ষাঁড়, পাঁঠা বা শূকরের মুষ্ক ছেদন করা যাবে না। তিষ্যা, পুনর্বাসা, পূর্ণিমার দিনে কোনো ঘোড়া এবং ষাঁড়কে গরম লৌহ বা জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ড দ্বারা দাগানো যাবে না।

মনু কিন্তু গোমাংস করতে নিষেধ করেননি। বরং ভক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি কোনো কোনো অনুষ্ঠানে গোমাংস ভক্ষণ বাধ্যতামূলক করেছেন। মনুসংহিতার পঞ্চম অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে বলেছেন —

“শ্বাবিধং শল্যকং গোধাং খঙ্গকূর্মশশাংস্তথা।
ভক্ষ্যান্ পঞ্চনখেহুরনুষ্ঠাংশ্চৈকতোদতঃ।।”

অর্থাৎ সজারু, গোসাপ, কচ্ছপ ও খরগোশ প্রভৃতি পঞ্চ নখবিশিষ্ট প্রাণীগুলি খাওয়া যায়। উষ্ট্র ব্যতীত এক পাটি দন্তবিশিষ্ট গৃহপালিত প্রাণীর মাংস ভোজন করা যেতে পারে। গোরু, মোষ এরা সকলেই এক পাটি দন্তবিশিষ্ট।

বাবাসাহেব বলেন– “এই যে গোমাংস ভক্ষণ বন্ধ হল এবং গো-পুজো শুরু হল, এটা অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট অব্রাহ্মণদের দ্বারা উৎকৃষ্ট ব্রাহ্মণকে অনুকরণ ছাড়া আর কিছু নয়। … অব্রাহ্মণদের জীবনে একটা বিপ্লব ঘটে গেল। গোমাংস ত্যাগ করা একটা বিপ্লব বইকি। যদি অব্রাহ্মণরা একটা বিপ্লব করত, তবে ব্রাহ্মণরা দুটি বিপ্লব করত। একটি বিপ্লব হল গোমাংস ত্যাগ, দ্বিতীয়টি হল মাংস ত্যাগ করে একেবার নিরামিষাশী হয়ে যাওয়া।” এটা কী যে সে বিপ্লব! অথচ এই– “ব্রাহ্মণরা ছিল সবচেয়ে বড়ো গোমাংস ভক্ষণকারী। অব্রাহ্মণরা গোমাংস ভক্ষণ করলেও তাঁরা সব দিন গোমাংস পেত না। গোরু ছিল মূল্যবান সম্পদ এবং হত্যার জন্য গোরু পাওয়া অব্রাহ্মণদের পক্ষে সবসময় সম্ভব হত না। এটি তাঁদের পক্ষে তখনই সম্ভব হত যখন কোনো ধর্মীয় ধর্মীয় বিশেষ অনুষ্ঠানে দেবদেবীর তুষ্টি সাধনার্থে তাঁরা গোরু উৎসর্গ করতে বাধ্য হত। কিন্তু ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে এটা ছিল অন্যরকম। তাঁরা ছিলেন পুরোহিত। সে সময় এত বেশি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হত যে, এমন কোনো দিন থাকত না যেদিন কোনো গোরু উৎসর্গের অনুষ্ঠান হত না। ব্রাহ্মণদের পক্ষে প্রতিদিনই গোমাংস লাভের দিন। তাই ব্রাহ্মণরা ছিল সবচেয়ে অধিক গোমাংসভোজী। ব্রাহ্মণদের যজ্ঞ ছিল নিরীহ প্রাণীহত্যার একটা বাহানা। আসলে যজ্ঞ ব্রাহ্মণদের গোমাংসের ক্ষুধা মেটানোর একটা ধর্মীয় কলাকৌশল মাত্র।” খুব নিষ্ঠুরভাবে হোতর নির্দেশে গোরু হত্যা করতেন যজ্ঞের নামে। সেই নিষ্ঠুর হত্যার বর্ণনা ‘আত্রেয়ী ব্রাহ্মণ’ পাঠ করলেই পেয়ে যাবেন। আত্রেয়ী ব্রাহ্মণের বর্ণনায় ব্রাহ্মণরা কেবল গোমাংস ভক্ষণ করতেন তা নয়, তাঁরা নিজেরাই হত্যা করতেন।

বৌদ্ধ-সম্রাট অশোকের নিযেধাজ্ঞাকে ব্রাহ্মণরা মেনে নিয়েছিল, একথা মোটেই মেনে নেওয়া যায় না। দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে এটা আশাই করা যায় না যে বৌদ্ধধর্মের কোনো এক রাজার আদেশ ব্রাহ্মণ শিরোমণিরা মাথা নীচু করে মেনে নেবেন। তবে মনুর কয়েকটা নির্দেশে ব্রাহ্মণরা গোমাংস খাওয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল কি না, সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।

পঞ্চম অধ্যায়ের ৪৬ নম্বর শ্লোকে মনু বলছেন– “যিনি প্রাণীদের বন্ধন ও বধের দ্বারা ক্লেশ দিতে চান না, তিনি সকলের হিতকামী, তিনি অনন্ত সুখ ভোগ করেন।” ৪৭ নম্বর শ্লোকে বলছেন–“যিনি কাউকে হত্যা করেন না, তিনি যা কিছু ধ্যান করেন বা যা কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেন এবং যে বিষয়ে মনঃসংযোগ করেন, তাতেই সিদ্ধিলাভ করেন।” ৪৮ নম্বর শ্লোকে বলেছেন –“প্ৰাণীহত্যা না করে মাংস পাওয়া যায় না। প্রাণীহত্যা স্বর্গলাভের কারণ হতে পারে না। সুতরাং মাংসাহার ত্যাগ করো।” ৪৯ নম্বর শ্লোকে বলেছেন –“মাংসের উৎস প্রাণীবধ ও বন্ধন যন্ত্রণার কথা বিবেচনা করলে সকল প্রকার মাংস ভক্ষণ থেকে নিবৃত্ত থাকতে হয়।”

মনুর এইসব কথাগুলো নির্দেশ বলা যায় না, বরং উপদেশ বলা যায়। উপদেশ মানা না-মানা ঐচ্ছিক, বাধ্যতামূলক নয়। কারণ মনুর পরের শ্লোকগুলো অনুধাবন করুন। একই অধ্যায়ের ২৮ নম্বর শ্লোকে বলছেন–“পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে সবই প্রজাপতি জীবের অন্নস্বরূপ সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং স্থাবর-জঙ্গম সবই জীবের খাদ্য।” ২৯ নম্বর শ্লোকে আরও পরিষ্কার করে বলেছেন– “স্থাবর-জঙ্গম সবই জঙ্গমদের খাদ্য। দন্তহীন প্রাণী দন্তবান প্রাণীদের খাদ্য। হস্তহীন প্রাণীরা হস্তবান প্রাণীদের খাদ্য এবং ভীরু প্রাণীরা বলবান প্রাণীদের খাদ্য।” ৩০ নম্বর শ্লোকে বলছেন– “ভক্ষ্য জীবকে প্রত্যহ ভক্ষণ করলে ভোক্তার কোনো পাপ হয় না। কারণ ঈশ্বর কোনো কোনো প্রাণীকে ভোজ্য এবং কোনো কোনো প্রাণীকে ভোক্তা করে সৃষ্টি করেছেন।”

যজ্ঞে পশু উৎসর্গ করে তা ভক্ষণ করার সমর্থন রয়েছে মনুর। পঞ্চম অধ্যায়ের ৩১ নম্বর শ্লোকে বলছেন– “যজ্ঞের প্রসাদস্বরূপ যে মাংস, তা বৈধ। আর

প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে যে মাংস ভক্ষণ করে তাঁকে রাক্ষসাচার বলা যায়।” ৩৯ নম্বর শ্লোকে– “যজ্ঞের নিমিত্ত ব্রহ্মা পশুদের সৃষ্টি করেছেন। সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্য যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সুতরাং যজ্ঞে পশুবধকে হত্যা বলা চলে না। বা কাজে কোনো পাপ হয় না।” ৪২ নম্বর শ্লোকে –“বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ কর্তৃক মধুপর্ক বা যজ্ঞ প্রভৃতি কার্যে যেসব প্রাণী বধ করা হয় তাতে নিজের এবং প্রাণীর উভয়েরই কল্যাণ সাধিত হয়।”

এখানেই শেষ নয়, মনু বলেছেন “যজ্ঞ প্রভৃতি পবিত্র অনুষ্ঠানে যে ব্যক্তি মাংস ভক্ষণ করে না, সে পরবর্তী ২১ বার পশুরূপে জন্মগ্রহণ করবে” (৫ : ৩৫)। অতএব মনু তাঁর মনুসংহিতার কোথাও মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন, এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে না।

মনুসংহিতার একাদশ অধ্যায়ের ৫৫ নম্বর শ্লোকে যে মহাপাপগুলির কথা উল্লেখ করেছেন, গোহত্যা নেই। তিনি বলছেন–“ব্রাহ্মণ হত্যা, সুরাপান, ব্রাহ্মণের স্বর্ণহরণ, গুরুপত্নী গমন এবং এইসব পাপে পাপীদের সংসর্গ হল মহাপাপ।” ৬০ নম্বর শ্লোকে গোহত্যা নিন্দাজনক বলা হলেও জঘন্য অপরাধ নয়। বলছেন– “গোহত্যা, অযাজ্য যাজন, পরস্ত্রীগমন, আত্মবিক্রয়, গুরু-পিতা-মাত-পুত্র ত্যাগ, বেদ অধ্যায়ন না করা এবং অগ্নিত্যাগ –এগুলি লঘুপাপ।”

তাহলে ব্রাহ্মণ তথা হিন্দুদের গোমাংস ভক্ষণ না করার কোনো সমর্থনই ধর্মীয় শাস্ত্রগুলিতে মিলছে না। মনুসংহিতার মতো মহাধর্মশাস্ত্রও নিযেধ করেনি। তাহলে? বাবাসাহেব বলছেন– “দুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। গোরুকে দেবতারূপে গণ্য করার অন্যতম কারণ হল ‘অদ্বৈত দর্শন’। এই দর্শনে বলা হয়েছে যে, সমস্ত বিশ্বই পরমাত্মার প্রকাশ। ফলে সমস্ত প্রাণীর মধ্যেই তাঁর অস্তিত্ব বিদ্যমান। এই মতবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত, এটার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। যে বেদান্তসূত্র সমস্ত প্রাণীকে এক বলে বর্ণনা করেছে, তা কিন্তু যজ্ঞের বলি হিসাবে প্রাণী হত্যা বন্ধ করতে বলেনি। দ্বিতীয়ত, যদি এই পরিবর্তন অদ্বৈত দর্শনকে উপলব্ধি করে হত, তাহলে কেবলমাত্র গোরুর ক্ষেত্রে নয়, তা সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই কার্যকর হত। অন্য একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যা প্রথমটির চেয়ে অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। এটা হল আত্মার দেহান্তরের দর্শন। এই দর্শনটা ঘটনার সঙ্গে তেমন মেলে না। বৃহদারণ্যক উপনিষদ আত্মার দেহান্তর গ্রহণের দর্শনের প্রবক্তা। এতে বলা হয়েছে যে, যদি কেউ জ্ঞানীপুত্র লাভ করতে ইচ্ছুক হয়, তবে সে ষাঁড়ের মাংস চাল ও ঘি সহযোগে রান্না করবে। এই মতবাদটা যা উপনিষদে প্রচার করা হয়েছে তা ৪০০ বছর ধরে অর্থাৎ মনুস্মৃতি কার্যকরী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্রাহ্মণ সমাজে কোনোই প্রভাব ফেলতে পারেনি।”

স্বামী বিবেকানন্দ এই গোহত্যা বা গোমাংস ভক্ষণ বন্ধের অর্থনৈতিক কারণের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। তাঁর মতে, “কালক্রমে দেখা গেল যে আমরা যেহেতু কৃষিজীবী জাতি, অতএব সবচেয়ে ভালো ষাঁড়গুলিকে মেরে ফেলা জাতিকে হত্যা করারই সমার্থক। সুতরাং, এই সব প্রথা বন্ধ করা হল এবং গো-হত্যার বিরুদ্ধে একটি মত গড়ে উঠল”। এই আর্থিক কারণের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবত কিছ সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কারণও যুক্ত হয়েছিল। কারণ– (১) ভারত ইতিহাসে প্রাচীন যুগের শেষ ভাগ থেকে মধ্যযুগের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ-দেশে বৌদ্ধধর্ম এবং অনেক ক্ষেত্রেই জৈনধর্ম ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। বৌদ্ধধর্মে এবং জৈনধর্মে সবরকম প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ এবং সর্বজীবে অহিংসাকে শ্রেষ্ঠ নীতি বলে গণ্য করা হত। এই বিষয়টি হিন্দুগণের কাছে চ্যালেঞজ হিসাবে উপস্থাপিত হল, উদয় হল সমূহ হিন্দুদের অস্তিত্বের সংকট। অতঃপর এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে গিয়ে হিন্দুসমাজকে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক কিছুর সঙ্গেই আপস করতে হয়েছিল। আর্থিক কারণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সাংস্কৃতিক কারণও সম্ভবত গো-হত্যা এবং গো-মাংস ভক্ষণের উপর নিষেধাজ্ঞায় শক্তি সঞ্চারিত হয়েছিল। এভাবেই গো-হত্যা এবং গো-মাংস ভক্ষণ বন্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলি ক্রমে ক্রমে দানা বেঁধে মিথ্যা ধর্মীয়তার আধারে ঢাকা পড়ে গেল। কালে কালে গোরু হল গো-মাতা, তেত্রিশ কোটি দেবতার অধিষ্ঠান এবং মলমূত্র হল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পবিত্র উপকরণ। বেড়ে গেল গোরুর গুরুত্ব। মহাভারত রচনার শেষ পর্যায়ে গোরুর একটা অর্থনৈতিক পুনর্মূল্যায়ন আরম্ভ হয়েছিল। আনুমানিক খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে মহাভারতে সংযোজিত অনুশাসন পর্বে সমকালীন অর্থব্যবস্থায় গোরুর। বিশেষ গুরুত্বের নিরিখে খাদ্যদ্রব্য হিসাবে তার মূল্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ধন বা ক্যাপিটাল হিসাবে অধিকতর মূল্যের স্বীকৃতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ সময়ে গোরুর বিশেষ অর্থনৈতিক উপযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ধন হিসাবে এর গুরুত্ব ক্রমে ক্রমে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। এহেন আর্থিক প্রয়োজনকে স্বীকার করে নিয়ে ধর্মীয় তত্ত্বের আধারে উপস্থাপন করা হল। কারণ স্বর্গ-নরকের লোভ বা ভয় না দেখালে গোরুর মতো সহজলভ্য এবং পুষ্টিকর খাদ্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না।

বাবা সাহেব স্পষ্টভাবে বলেছেন –“আমার মনে হয় এটা একটা কৌশল, যার দ্বারা ব্রাহ্মণরা গোমাংস ত্যাগ করে একেবারে নিরামিষাশী হয়ে গেল এবং গোরুর পুজো করতে আরম্ভ করল। গোরুকে পুজোর আসল রহস্য হল, ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যে গোমাংস খাওয়া তো দূরের কথা, গোরুকে পুজো করতে আরম্ভ করল। বৌদ্ধ মতবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের লড়াই ভারতের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। … ভারতে ৪০০ বছর ধরে এই দুটি মতবাদের মধ্যে প্রাধান্য লাভের যে লড়াইটা চলছিল তা সমাজ, ধর্ম, রাজনীতির উপর যথেষ্ট পরিবর্তন এনেছে। … বৌদ্ধ মতবাদ একসময় ভারতের বেশিরভাগ মানুষের ধর্ম ছিল। এটা শত শত বছর ধরে জনগণের ধর্ম হিসাবে ভারতে প্রচলিত ছিল। এটা ব্রাহ্মণ্যধর্মকে এমনভাবে আক্রমণ করেছে, যা পূর্বে কখনো ঘটেনি। ব্রাহ্মণ্যধর্ম তখন ব্যাপকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল এবং তাকে আত্মরক্ষার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে লড়তে হচ্ছিল। বৌদ্ধধর্মের দ্রুত প্রসারের ফলে ব্রাহ্মণ্যধর্ম কী রাজসভায় কী জনসাধারণের কাছে সর্বত্র মর্যাদাচ্যুত হয়ে পড়েছিল। পরাজয়ের তীব্র যন্ত্রণা তাঁরা প্রতিমুহূর্তে অনুভব করছিল। কীভাবে তাঁদের শক্তি ও মর্যাদা ফিরে পেতে পারে তার জন্য বিভিন্ন প্রকারের পথ খুঁজতে লাগল।”

সেই পথ কেমন? বাবাসাহেব বলছেন–“বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর অনুগামীরা তাঁর মূর্তিস্থাপন ও স্তূপ তৈরি করতে আরম্ভ করে। ব্রাহ্মণরাও তাঁদের অনুসরণ করতে শুরু করল। তাঁরা মন্দির তৈরি করতে শুরু করল এবং তার মধ্যে শিব, বিষ্ণু, রাম ও কৃষ্ণের মূর্তি স্থাপন করতে থাকল। এইভাবে তাঁরা বৌদ্ধমূর্তির ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে। পূর্বে হিন্দুদের কোনো মন্দির বা দেবদেবীর মূর্তি ছিল না। বৌদ্ধদের অনুকরণে ব্রাহ্মণরা এগুলি শুরু করল। বৌদ্ধরা ব্রাহ্মণ্যধর্মের যজ্ঞ এবং গোহত্যা পরিত্যাগ করেছিল। কারণ গোরু ছিল জনগণের জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রাণী। জনসাধারণ ব্রাহ্মণদের প্রবলভাবে ঘৃণা করতে থাকে। … বৌদ্ধধর্মের প্লাবন থেকে আত্মরক্ষার জন্য ব্রাহ্মণদের যজ্ঞ এবং গোহত্যা দুটি রীতিকেই সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করল। .. ব্রাহ্মণদের গোমাংস খাওয়া বন্ধ করার অন্যতম উদ্দেশ্য হল, বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ সমাজে যেরূপ সম্মান লাভ করেছিল সেটা যাতে পেতে পারে।”

বর্তমানে সময় বদলেছে। ব্রাহ্মণরা যেমন বদলে গেছে, তৎসহ হিন্দুরা বদলেছে। এখনকার ব্রাহ্মণরা গোমাংস ভক্ষণ না করলেও মোটেই নিরামিষাশী নয়। এক-আধজন না খেলেও অনেক ব্রাহ্মণ কচ্ছপ, মুরগি, খাসি সবই ভক্ষণ করে। কিছু ব্রাহ্মণ অবশ্য লুকিয়ে হলেও গোমাংস ভক্ষণ করে থাকেন। ২০১৫ সালে প্রকাশ্যে ধর্মতলার কার্জন পার্কে আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্যকে তো আমরা সবাই দেখেছি গোমাংস ভক্ষণ করতে। সেদিন গোমাংস ভক্ষণ করেছিলেন প্রখ্যাত কবি সুবোধ সরকারও। এছাড়াও বেশকিছু বুদ্ধিজীবীও এদিন গোমাংস ভক্ষণ করেছিলেন। বর্তমান ভারতে যদি নিখাত নিরামিষাশী গোষ্ঠী বুঝতে হয়, সেটা হল বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব। এঁরা গোমাংস তো অনেক দূরের কথা, ভক্ষণের উদ্দশ্যে কোনো প্রাণীই তাঁরা হত্যা করে না। এমনকি অন্যের হত্যা করা প্রাণীও তাঁরা ভক্ষণ করেন না।

অতীতে, অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে ব্রাহ্মণ তথা হিন্দুগণেরা গো-মাংস ভক্ষণ করত একথা তো তথ্যপ্রমাণ দিয়ে জানানো গেল। ভারতের কেরল, পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে কয়েকটি রাজ্য বাদ দিয়ে বাইশটি রাজ্যে গো-হত্যা বেআইনি। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ একটি (গোরুর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ বিল-২০০৩) বিল উপস্থিত করার চেষ্টা করেছিলেন। বিলটির উদ্দেশ্য ছিল গোহত্যা ও গোমাংসের রপ্তানি নিষিদ্ধ করা, গোমাংস বিক্রি করা, গোরুকে আঘাত করা জামিন অযোগ্য অপরাধ। ব্যাঙ্গালোর ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের প্রাক্তন ফ্যাকাল্টি সদস্য অধ্যাপক এন এস রামস্বামী একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, গোরুর দুঃখে জর্জরিত হয়ে যদি গোহত্যা বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়, তবে ওই প্রাণীটির দুর্দশা আরও বাড়বে। তা ছাড়া যতক্ষণ সেটি কোনো সম্প্রদায়ের খাদ্য ততক্ষণ নিষিদ্ধ করে দেওয়াটা অমানবিক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা যায়। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় সংকট (?) ছাড়া অন্য কোনো কারণ তো দেখি না, তাই না? গোরু তো আর বিরল প্রজাতি নয়! গোহত্যা বন্ধ হলেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে গোরুর চালান হতে থাকবে।

এখনও পর্যন্ত ভারতে পৌরসভা অনুমোদিত ৩০০০ শ্লটার হাউস আছে। তা সত্ত্বেও মাংস খাওয়ার উপযুক্ত এমন ২ কোটি পশু বেআইনিভাবে হত্যা করা হয় দেশ জুড়ে। গবেষক রামস্বামী বলেছেন, পূজ্যপাদ ও প্রয়োজনীয় বলদগুলি আমাদের দেশে পাঁচনের আঘাত হজম করে ৫০ কোটি বার। দেবতাকে এভাবে কোনো ভক্ত মারতে পারে! হিন্দুভক্তগণ বলতে পারেন গোরু যদি মাতাই হয় তাহলে প্রয়োজন ফুরালে বাড়িতে না রেখে রাস্তায় ছেড়ে দেন কেন? কেন মুসলিম বা দলিতদের কাছে বিক্রি করে দেন যখন সে আর দুধ দিতে পারে না?

আপনি জানেন কি ১৯৮০ সালে মাংসের জন্য গোরু ও মোষ মারা হয়ে ছিল ১ কোটি ৫৬ লক্ষ, এই ভারতে। ২০০০ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৪৩ লক্ষ। আদতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও গবাদি পশুর বাজারের শতকরা ৮০ ভাগই হল গোমাংস। ইন্ডিয়ান ভেটেরেনারি কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী ভারতে মাত্র ৬০ ভাগ গবাদি পশুকে খাওয়ানোর মতো সংগতি আছে। বাকিরা নির্মমভাবে পরিত্যক্ত হয়। তাদের ভবিষ্যৎ অনাহারে মৃত্যু, পথ দুর্ঘটনায় অথবা বিষাক্ত খাবার অথবা খিদের তাড়নায় অখাদ্য খেয়ে মৃত্যু হয়। ধর্মীয় বিধানে এমন কিছু যজ্ঞ আছে যা করতে হলে পঞ্চগব্য খেয়ে পবিত্র হতে হবে। পঞ্চগব্য কী? পঞ্চগব্য হল গোরুজাত পাঁচটি দ্রব্য– দই, দুধ, ঘি, গোবর এবং গো-মূত্র। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বলেন, গো-মূত্রের ভিতর নাকি গঙ্গা বসত করে। তার মানে গো-মূত্র সেবন করলেই গঙ্গাপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত!

ভারতে প্রায় ৫০ কোটি গবাদি পশু আছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি, মোষের সংখ্যা ২ কোটি– সারা পৃথিবীর অর্ধেক। পৃথিবীর সাড়ে আট কোটি গোরু, বাচ্চা বলদ, ষাঁড়। বলদের মধ্যে ভারতে আছে শতকরা ১৫ ভাগ।

একটি সাক্ষাৎকারে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী ডি ডি লাপাং বলেছেন, “মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ডে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই গোরুর মাংস খেয়ে থাকে, উত্তর-পূর্ব ভারতের মাথাপিছু আয় এমনিতেই কম। এখানকার মানুষের পক্ষে বিকল্প খাদ্য হিসাবে মুরগি কেনা সম্ভব নয়।” প্রসঙ্গত বলি, মণিপুরের অধিবাসীদের বক্তব্য হল, গোরুর মাংস যে শুধু সস্তা তাই নয়, এখানকার ঠান্ডা আবহাওয়ায় বেশ মানানসই।

কেরল রাজ্য দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোমাংস ভোজন করে। ২০০৩ সালের একটা হিসাবে দেখতে পাচ্ছি, সেই বছরে ২ লক্ষ ৪৯ হাজার টন গোমাংস একমাত্র কেরলেই বিক্রি হয়েছে। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানই নাকি ১৩০ টন গোমাংস বিক্রি করেছে। কেরলে গোমাংসের চাহিদা এত বেশি যে প্রতি বছর প্রতিবেশী রাজ্যগুলি থেকে ৫ লক্ষ গোরু আমদানি হয়। কেরল আবার গোহত্যা বেআইনি এমন রাজ্যগুলিতে গোমাংস রপ্তানি করে। তাই অনেকেই মনে করেন, গোহত্যা বন্ধ হলে কেরলের মানুষ ও পশু দুটোরই স্বাস্থ্য বিপন্ন হবে। কারণ গোমাংস হল সবচেয়ে সস্তা মাংস। কেরলের মাংস বিক্রির শতকরা ৪০ ভাগই হল গোমাংস। হিন্দু, মুসলিম, সন্ত, খ্রিস্টানরা গোমাংস খেয়ে থাকেন। দক্ষিণ ভারতে তপসিল জাতি এবং তপসিল উপজাতির বেশিরভাগ মানুষই গো-মাংস খেয়ে থাকেন।

পশ্চিমবাংলার করিডর দিয়ে সারা ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ গোরু বাংলাদেশে প্রতিবছর পাচার হয়। বাংলাদেশের মানুষ সেই গোরুগুলির মাংস তো খানই, উপরন্তু বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বিদেশি মুদ্রা আয় করেন।

মুসলিমরা যখন ভারতবর্ষ আক্রমণ করে দিল্লিতে ঘাঁটি গেড়ে বসল, তখন শুধু শাসনযন্ত্র করায়ত্ত করেই ক্ষান্ত হল না; বিজিত দেশে নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের প্রভাব স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। গ্রামের পর গ্রাম আক্রমণ করে মন্দির ভেঙে মসজিদ বানিয়ে, পুরুষদের হত্যা করে নারীদের বন্দি করে ধর্মান্তর করে জবরদস্তি বিবাহ করে বংশবিস্তারে মনোযোগী হয়েছিল কোনো কোনো শাসক। সেই সময়ে আমাদের ব্রাহ্মণকুল ধর্মীয় ‘পবিত্রতা রক্ষার নামে, নিজেদের জ্ঞান জাহির করার তাগিদে, নিদান হাঁকতে শুরু করলেন, যে বা যারা গোমাংস ভক্ষণ করেছেন (জবরদস্তি করে খাওয়ানো হলেও), বা এমনকি পেঁয়াজ বা রসুনের গন্ধ শুঁকেছেন; তাঁরা সবাই স্বধর্মচ্যুত হয়েছেন! ব্রাহ্মণকুলের অজ্ঞতার কারণে আক্রমণকারী মুসলিম শাসকদের হাত শক্ত হল; নিমেষে গ্রামকে গ্রাম হিন্দুসম্প্রদায় মুসলিমে পরিণত হয়েছিল। আজ ভারতবর্ষ সহ পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে যে বিপুল সংখ্যক মুসলমান আছেন তাঁদের প্রায় অনেকেই শিকড় হিন্দু! নানা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কারণে রূপান্তরিত।

তবে অতি প্রাচীনকালে অর্থাৎ অতীতে সনাতনধর্মীরা যে গোমাংস ভক্ষণ করত তা নয়, বর্তমানেও হিন্দুদের মধ্যে গোমাংস ভক্ষণের রীতি আছে। বিশ্বের একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র নেপালে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গাধীমাই মন্দিরে পশুবলি দেওয়া হয় এবং ভক্ষণ করা হয়। এই উৎসবে লাখো লাখো গোরু, মহিষ, শূকর, ছাগল, মুরগি, পায়রা এবং এমনকি ইঁদুর প্রাণী বলি দেওয়া হয়। মহিষই বেশি পছন্দ। সত্যি কথা বলতে এইরকম নৃশংস বলি পৃথিবীতে আর কোথাও হয় বলে আমার জানা নেই। বলি না বলে হত্যালীলা বলা যায়। দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীগুলিকে অতর্কিতে গলায় কোপ বসিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। একপ্রকার কচুকাটা যাকে বলে। ২০০৯ সালে প্রায় ২,৫০,০০০ পশু হত্যা করা হয়। ভারত থেকেও প্রচুর গবাদি পশু চলে যায় নেপালে গাধীমাইয়ের সেবার জন্য। এ ঘটনায় সারা বিশ্ব প্রতিবাদে মুখর হচ্ছে। জনমত গঠন করা হচ্ছে। নেপালে বলি বন্ধ হবে কি না জানি না, তবে ভারত থেকে পশু রপ্তানি বন্ধ হবে আশা করি।

বর্তমান ভারত গোহত্যা, গোমাংস নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে। গোমাংস ঘরে রাখার কারণে মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে। এটা কি গোরুর প্রতি প্রেম? নাকি রাজনীতির উদ্দেশ্যে মুসলিম বিদ্বেষ? আমরা সবাই জানি গোরু ও মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে রাজনীতি করে আরএসএস তথা বিজেপি নামে একটি রাজনৈতিক দল। আমাদের দেশে অহিংস বেচারা একটি প্রাণীকে নিয়ে সহিংস রাজনীতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ২০১৫ সালে গোরক্ষার নামে আখলাক খানকে গণপিটুনি দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। স্বাধীন ভারতের এক জন নাগরিক আখলাক খাসি খাবেন, না গোরু খাবেন তার বিচার সমাজ বা রাজনৈতিক নেতারা করতে পারেন না। যদি সেই অজুহাতে কোনো নাগরিককে হত্যা করা হয়, তা হলে আমাদের সমাজ অসভ্য এবং বর্বর আখ্যা পাবে।

প্রথমটি আর্যাবর্তে, মানে গো-বলয়ে সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতির মাথাচাড়া দেওয়া নিয়ে। আশঙ্কাটা খুবই তাড়াতাড়ি সত্য হয়ে যায়। লোকজন খামাখা খুন হয়। টেনশন বেড়ে যায়। মানুষ মানুষকে সন্দেহ করতে শুরু করে। ঘৃণাও। বহু বছরের চেনা এলাকা থেকে ঠাঁইনাড়া হয় বহু সাধারণ মানুষ। এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার সাপটা সবসময় কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। দ্বিতীয় আশঙ্কাটা ছিল অর্থনীতিকে ঘিরে। বিজেপির ক্ষমতায়নের ফলে রাজ্যে রাজ্যে গোহত্যা যেভাবে নিষিদ্ধ হতে থাকে এবং সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার ঝাঁপটা শুরু হয়, তাতে আশঙ্কা হচ্ছিল, এই অশান্তির ফলে ভারতের গোমাংস রপ্তানি না মার খায়। পৃথিবীতে ভারত থেকে গোমাংস (‘বিফ’ বললেও অধিকাংশই অবশ্য মহিষ বা বলদের মাংস) ও গোপণ্য রপ্তানি হয় বছরে ৩৩ হাজার কোটি টাকার। ভারতের পরেই স্থান ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়ার। দ্বিতীয় আশঙ্কাটাও যদি সত্যি হয়ে ওঠে, তাহলে ব্রাজিল-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পোয়াবারো চিনেরও। এ দুই আশঙ্কা চূড়ান্ত সত্যি হলে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা হয়তো আনন্দে দু-হাত তুলে নাচবে, কিন্তু ভারতের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল একটা দেশের পক্ষে সেটা মোটেই ভালো বিজ্ঞাপন হবে না। বিজেপি দিল্লি ও অন্যান্য রাজ্য দখলের পর থেকে গো-হত্যা বন্ধে ও গো-সংরক্ষণের নামে যা চলেছে, তাতে রপ্তানির এই বিপুল বাণিজ্য ইতিমধ্যে ভয় পেতে শুরু করেছে। দেশে মোট ২৪টি মিট প্রসেসিং কারখানা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ১৩টি ১০০ শতাংশ রপ্তানি করে থাকে। এগুলোর অধিকাংশই উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাবে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দৌরাত্মে এই কারখানাগুলোতে সরবরাহ কমতে শুরু করেছে। ফলে কমছে মাংস রপ্তানি। মাংস রপ্তানি কমার পাশাপাশি মার খেতে শুরু করেছে। চামড়াশিল্প। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দৈনন্দিন জীবিকার প্রশ্নও। গোরু মারা গেলে যাঁরা তার চামড়া ছাড়ানোর কাজ করেন অথবা গোমাংস বিক্রির সঙ্গে জড়িত, মার খেতে শুরু করেছেন তাঁরাও। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে শুরু করেছেন সাধারণ চাষিও। যে গোরু আর কাজে লাগছে না, সেগুলো রাখতে হচ্ছে, খাওয়াতে হচ্ছে। এদের বিক্রি করে আগে চাষিদের কিছুটা অর্থ সাশ্রয় হত। একটা হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এর ফলে দেশে অকর্মণ্য ও ছেড়ে দেওয়া গোরুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ।

গোরু, মহিষ, ভেড়া বা ছাগলের চামড়া ছাড়ান যাঁরা, যাঁদের অনেকেই চামড়াশিল্পের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের সংখ্যা কমবেশি ৮ লাখ। এই শ্রেণির মানুষ সাধারণত মুসলমান ও দলিত হিন্দু। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তিন দশক ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের যিনি খুব কাছ থেকে দেখছেন, তিনি দিল্লি সায়েন্স ফোরামের ডি রঘুনন্দন। তাঁর কথায়, এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা সমাজের একেবারে দরিদ্র শ্রেণির। ক্রমবর্ধমান ভয়, হুমকি ও জবরদস্তির ফলে এঁরা যে শুধু রোজগার হারাচ্ছেন তা নয়, গরিব মানুষদের সস্তার প্রোটিন (গোমাংস) থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই মানুষজনের সংখ্যা কত? একটি সরকারি হিসাবও ওই সংবাদপত্রে দাখিল করা হয়েছে। ভারতের প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ দরিদ্র মানুষ শুধু গোরু-মহিষের মাংস থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহ করেন। এঁদের সবাই কিন্তু মুসলমান নন। হিন্দু আছেন, খ্রিস্টান আছেন, উপজাতি আছেন, বৌদ্ধ আছেন, আছেন সব মতাবলম্বীরাই। মিল তাঁদের এক ক্ষেত্রেই, সবাই অতি দরিদ্র। গোরু নিয়ে বিতর্ক এঁদেরই পেটে কষিয়ে লাথি মেরেছে সবচেয়ে বেশি। গোরু-বিতর্কের জের ভারতকে শেষ পর্যন্ত যেখানে দাঁড় করাবে, সেটা যে দেশের পক্ষে মোটেই ভালো নয়।

হিন্দুত্ববাদের শিরোমণি সাভারকার বলেছিলেন– “গোরু হিন্দু জাতির প্রতীক হওয়া উচিত নয়। গোরু কিন্তু হিন্দু জাতির দুগ্ধ প্রতীক। কোনো উপায়েই এটিকে হিন্দুত্বের প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। হিন্দুত্বের প্রতীক গোরু নয়, নৃসিংহ (নৃসিংহের উল্লেখ, ভগবান বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার হিসাবে বিবেচিত)। গোরুকে ঐশী হিসাবে বিবেচনা করে এবং তাঁর উপাসনা করার সময় গোটা হিন্দু জাতি গোরুর মতো সহজবশ্যে পরিণত হয়েছিল। গোটা জাতি যেন ঘাস খাওয়া শুরু করে। আমরা যদি এখন কোনো প্রাণীর আদলে আমাদের জাতিকে খুঁজে পেতে চাই, তবে সেই প্রাণীটিকে সিংহ হতে দিন। আমাদের এখন নরসিংহ পুজো করা দরকার এবং গোরুর খুর হিন্দুত্বের চিহ্ন নয়।” নৃসিংহ অবতারের হিংস্র ভয়াল মৃর্তি সাভারকার প্রতিটি হিন্দুর মনে গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন যারা প্রতিপক্ষের পেট চিরে রক্তপান করবে। গৌতম বুদ্ধের অহিংসার শক্তি উপলব্ধির ক্ষমতা সাভারকারের ছিল না। নেহাতই জান্তব ও মাংসল হিংস্র দর্শনের প্রতীক করে তোলেন বিষ্ণুর নৃসিংহ রূপকে। যদিও তাঁর অনুগামীরা নৃসিংহের বদলে গোরুতেই আটকে থাকেন, কেন-না তুলে ধরার পক্ষে সিংহের চাইতে গোরুই আদর্শ।

হায় হিন্দু! গোরু যতদিন দুধ দেয় ততদিনই মা। দুধ দেওয়া বন্ধ করলেই গোরু খেদাও। মাতার মাংস পরিণতির নিমিত্ত মুসলিমদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বলদেরও যতদিন গতর ততদিনই কদর। ষাঁড় না-হলে বংশবৃদ্ধির ক্রিয়া জারি রাখবে কে? তাই ষাঁড় দু-একটা রেখে বাকিটা ধর্মের নামে উৎসর্গ করা হয়। ওরা হাটেবাজারে তোলা তুলে খায় আর বেগরবাই করলে পিটানি খায়। তোমাদের সীমাহীন গোভক্তি দেখে চমকিত হই!

সহায়ক গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকা :

(১) The Sanctity of the Cow in Hinduism– W Normal Brown, The Economic Weekly, Feb 1964, Madras

(২) The Myth of the Holy Cow– D N Jha, Verso, London

(৩) Science and Society in Ancient India– Debiprasad Chattopadhyay

(৪) Concept of Cow in the Rigveda– Doris Meth Srinivasan

(৫) Why did the Brahmins give up beef-eating– BR Ambedkar

(৬) মহাকাব্য ও মৌলবাদ –জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়

(৭) ফ্রন্টলাইন (২০০৩)

(৮) আউটলুক (২০০৩)

(৯) সাহারা টাইমস (২০০৩)

(১০) গোরু ও ত্রিশূল– শ্যামল চক্রবর্তী

সরস্বতী : বাস্তবে এবং অবাস্তবে

ভৌগোলিক দিক থেকে নিশ্চিতভাবেই বলা যাবে কি সরস্বতী নদী শতদ্রু ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ছিল? অনুমান করা যায় যে বৈদিক সরস্বতী (আঞ্চলিক নাম সরসুতী) হরিয়ানার থানেশ্বর অঞ্চলে প্রবাহিত। ঋগ্বেদে (অষ্টম মণ্ডল, ৩৬.৬ সূক্ত) বলা হয়েছে সপ্তথি সরস্বতী নদীগুলির মাতা (সিন্ধুমাতা) একসঙ্গে দুগ্ধ ও স্রোতস্বিনীদের নিয়ে বিপুল গর্জনে তীব্র স্রোতে প্রভূত জলধারায় স্ফীত হয়ে প্রবাহিত।

ঋগ্বেদে দুই ধরনের সরস্বতীর উল্লেখ আছে। একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। সরস্ ধাতু তদুত্তরে অস্থর্থে বতু এবং স্ত্রী লিঙ্গে ঈ প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন হয়েছে সরস্বতী– এ মত স্বামী নির্মলানন্দের। আলোকময়ী বলে সর্বশুক্লা। শংকরনাথ ভট্টাচার্যের মতে, সরস + বতী = সরস্বতী। অর্থ জ্যোতিময়ী। ঋগ্বেদে এবং যর্জুবেদে অনেক জায়গায় ইড়া, ভারতী, সরস্বতাঁকে একসঙ্গে দেখা যায়। বেদের মন্ত্রগুলো পর্যালোচনায় প্রতীতী জন্মে যে, সরস্বতী মূলত সূর্যাগ্নি। দেবীভাগবতে সরস্বতী জ্যোতিরূপা। ভৃগুপনিষদে জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী ও জলময়ী সরস্বতীর সমীকরণ করা হয়েছে। এই উপনিষদে জলে জ্যোতি প্রতিষ্ঠিত, জ্যোতিতে জল প্রতিষ্ঠিত। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী সারদামঙ্গল কাব্যে জ্যোতির্ময়ী সরস্বতীর আবির্ভাব বর্ণনা করেছেন। রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি যখন ক্রৌঞ্চ হননের শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন, সে সময় জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী তার ললাটে বিদ্যুৎ রেখার মতো প্রকাশিত হয়েছিলেন।

পুরাণগুলো একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই পেয়ে যাবেন ঋগ্বেদে ইন্দ্রের সঙ্গে সরস্বতীর সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ ছিল, তেমনি ঘনিষ্ঠ মরুদ ও অশ্বিনীদ্বয়ের সঙ্গেও ছিল। সরস্বতী কখনো ইন্দ্রের পত্নী, আবার কখনো শত্রু, কখনো-বা ইন্দ্রের চিকিৎসক। শুক্ল যজুর্বেদে তিনি চিকিৎসক রূপে রুদ্র অশ্বিনীদ্বয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। সরস্বতীর রোগ নিরাময় শক্তির কথা পরবর্তী সময়েও জনশ্রুতিতে ছিল। ‘কথাসরিৎসাগর’ গ্রন্থে রচয়িতা সোমদেব (একাদশ শতক) জানিয়েছেন, পাটলিপুত্রের নারীরা রুগ্ন ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য সরস্বতীর ওষুধ ব্যবহার করতেন।

নিরুক্তকার যাস্কের মতে, সরস্বতী শব্দের অর্থ যাতে জল আছে। সৃ ধাতু নিস্পন্ন করে সর শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ যাতে জল আছে তাই সরস্বতী। নদী সরস্বতী আর্যভূমির অন্যতম নদীরূপে ঋগ্বেদে বহুবার কীতি ও স্তোত হয়েছে। ঋগ্বেদে সরস্বতী সিন্দু ও তার পাঁচটি উপনদী নিয়ে সপ্তসিন্ধুর বারংবার উল্লেখ আর্যভূমিতে এদের অপরিসীম গুরুত্ব প্রমাণ করে। ‘অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী’ –অর্থাৎ নদী হিসাবে সরস্বতীকে দেখা হয়েছে। সম্ভবত সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব। তাই হয়ত শিক্ষার সঙ্গে সরস্বতীর অচ্ছেদ্য বন্ধন এবং এর জন্যই পৌরাণিক যুগে সরস্বতী বিদ্যার দেবী হয়ে উঠেছেন। সরস্বতীর আর-এক নাম ভারতী। তিনি ‘ব্রাহ্মণ’-এ বাক্ নামে পরিচিতা। দেবী সরস্বতীর সঙ্গে নদী সরস্বতীর এই একাত্মতা সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত থাকলেও সরস্বতাঁকে ব্রহ্মার মানসকন্যা হিসাবে কল্পনা করা হয়।

ষোড়শ ঋকে সরস্বতী মাতৃগণের, নদীগণের ও দেবগণের শ্রেষ্ঠা বলে বর্ণিত হয়েছেন। ইনি ব্রহ্মাবতের একতর সীমা এবং কুরুক্ষেত্রে অন্তরিত হয়ে প্রয়াগে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। তাই পরবর্তী বৈদিক যুগে নদীদেবতা হিসাবে মাহাত্ম্য হারিয়ে সরস্বতী সাহিত্য, শিল্প ও সঙ্গীতকলার দেবী হিসাবে পরিচিত হন।

স্কন্দপুরাণে সরস্বতীর উৎস হলেন বিষ্ণু এবং সরস্বতীর অবস্থান হল বিষ্ণুর জিহ্বাতে। নারদপুরাণে বলা হয়েছে, চরম অবস্থায় রাধা এবং কৃষ্ণ একই দেহে বিরাজ করেন এবং তাঁদের মধ্যে কোনো ভেদ নেই। এই অবস্থায় রাধা থেকে পাঁচটি রূপ আবির্ভূত হয়। তাঁরা হলেন– লক্ষ্মী, দুর্গা, সাবিত্রী, সরস্বতী এবং রাধার নিজেরই আর-একটি রূপ। কারও কারও মতে শক্তির রূপভেদ পাঁচটি নয় আটটি। যেমন –শ্রীদেবী, ভূদেবী, প্রীতি, কৃতি, শান্তি, তান্তি এবং পুন্তি।

বামনপুরাণে বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠের কোন্দলের ঘটনা উল্লেখ আছে। বশিষ্ঠ তাঁর আশ্রমে একটি প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ এবং সরস্বতীর একটি বিরাট মূর্তির পুজো করতেন। বশিষ্ঠের ওখানে এভাবে পুজো করা বিশ্বামিত্রের মনে ক্রোধ উৎপন্ন হওয়ায় তিনি নদী সরস্বতাঁকে বলেন বশিষ্ঠকে ধরে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে। যাতে উপযুক্ত সাজাটা তিনি বসে বসেই দিতে পারেন। সরস্বতী বিশ্বামিত্রের ক্ষমতা জানতেন। তাই তিনি বিশ্বামিত্রের কাছে বশিষ্ঠকে নিয়ে যেই হাজির হলেন অমনি বিশ্বামিত্র তাঁকে (বশিষ্ঠকে) হত্যার জন্য একটা অস্ত্র আনতে গেলেন। ইত্যবসরে সরস্বতী, যিনি ছিলেন নদী, তিনি নিজের জলধারার মাঝে বশিষ্ঠকে লুকিয়ে রাখলেন। বিশ্বামিত্র রেগে গিয়ে অভিশাপ দিলেন সরস্বতাঁকে– সরস্বতী এবার রক্তনদী হবেন। আর যত অসুর রাক্ষস আছে, তাঁদের পান করে স্ফুর্তি করবে। সেটাই ফলে গেল! শেষে একদল সাধুর প্রার্থনায় সৃষ্টি হল প্রয়াগে গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর সঙ্গম –আর যত দুরাত্মা সেখানে স্নান করল এবং সবাই পবিত্ৰাত্মা হয়ে গেল।

হিন্দু পুরাণে বলা হয়েছে, ব্রহ্মা তাঁর কন্যার সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হন। এহেন বিষয়ে কলকাতার জাদুঘরের একটি প্রস্তর মূর্তি থেকে তার যথেষ্ট প্রমাণ মেলে। এই মূর্তিটি ব্রহ্মার বামজানুর উপর সরস্বতী বসে আছেন, তাঁর এক হাতে ব্রহ্মার স্কন্ধবেষ্টিত। সরস্বতীর সঙ্গে ব্রহ্মার এই সম্বন্ধের সন্ধান ঋগ্বেদেও পাওয়া যায়। এখানে ব্রহ্মার সঙ্গে বাকদেবীর একটি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ সূচিত হয়েছে। বাই যে সরস্বতী তা নিয়ে তো কোনো দ্বিমত নেই। ব্রাহ্মণ যুগে এই সম্বন্ধ আরও ঘনিষ্ঠতর। এখানে দেখা যাচ্ছে “প্রজাপতি ব্রহ্মা পুনরায় নিজেকে আপ্যায়িত করিলেন, বাক্ তাঁহার দিকে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি বাককে আত্মবশ করিলেন। এখানে তিনি বাক্য দ্বারা আপ্যায়িত হইলেন, বলবান হইলেন।” এইভাবেই বোধহয় আমরা সরস্বতাঁকে ব্রহ্মার অঙ্কশায়িনী তথা স্ত্রী হিসাবে পাই। বেদের উষাকেও পরবর্তীতে সরস্বতী রূপে পাই। তাই উষার মতো সরস্বতীও শুভ্র এবং জ্ঞানের প্রতীক। সেই কারণে সরস্বতী একদিকে সূর্যের কন্যা ও অন্যদিকে স্ত্রী।

মহাভারতের শল্যপর্বে উল্লেখ আছে যে, দধীচি একবার এক অপ্সরাকে অবলোকন করে উত্তেজিত হয়ে বীর্যস্খলন করে ফেলেন। সেই বীর্য সরস্বতী নদীতে পতিত হয়, আর সেটা অতি যত্নে ধারণ করে সরস্বতী এক শিশুর জন্ম দেন। মহাভারতের আদিপর্বেও শান্তনু যিনি গঙ্গাকে বিবাহ করেছিলেন, তার এক পূর্বপুরুষ সরস্বতীর পুত্র ছিলেন বলে বলা হয়েছে –এক্ষেত্রে ছিলেন এক মুনি।

সরস্বতীর বাহন হাঁস ছাড়াও মেষ আর বরাহকে পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক এন এস ভট্টসারি একটি লেখায় বলেছেন, “একসময় ইন্দ্রের শরীরের শক্তি চলে যাওয়ার ফলে তিনি মেষ আকৃতি গ্রহণ করেন। সেসময় ইন্দ্রের চিকিৎসার দায়িত্ব ছিল স্বর্গের অশ্বিনীদ্বয়ের উপর এবং সেবা-শুশ্রূষার ভার ছিল সরস্বতীর হাতে। সংগীত ও নৃত্যপ্রেমী ইন্দ্র সরস্বতীর গানবাজনা ও সেবায় সুস্থ হওয়ার পর তাকে মেষটি দান করেন। সেই থেকেই সরস্বতীর সঙ্গী এই মেষ। তাহলে কি সরস্বতী স্বর্গের সেবাদাসীও! সরস্বতীর বাহন বরাহ (শুয়োর), কারণ তিনি নাকি বিষ্ণুরও স্ত্রী ছিলেন। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ রচিত ‘সরস্বতী’ গ্রন্থটিতে এ তথ্য পাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণকেও স্বামী হিসাবে কামনা করেছিলেন তিনি —

“ইয়েষ কৃষ্ণং কামেন কামুকী কামরূপিনী”

“ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ’-এ শ্রীকৃষ্ণ-সরস্বতীর কেচ্ছাকাহিনি যথাযথভাবেই বর্ণিত আছে। ডঃ শ্যামল চক্রবর্তী ‘নারী’ প্রবন্ধে বলেছেন, সরস্বতী গণেশেরও স্ত্রী। মহারাষ্ট্রের কোনো কোনো পূজারী মনে করেন, গণেশের পত্নী সরস্বতী কিংবা সারদা। হয়তো সরস্বতী এবং গণেশ দুজনই বিদ্যা ও সংগীতের অধিষ্ঠাতা দেবতা বলেই এই পতি-পত্নীর কল্পভিত্তি। আর-এক তথ্য অনুসারে জানা যাচ্ছে, দুর্গার কন্যা এই সরস্বতী দুর্গার কুমারী সত্তা। আবার বাঙালিরা মনে করেন গণেশ ও সরস্বতী ভাইবোন, দুর্গার সন্তান। অথচ চিরকুমারী (!) সরস্বতাঁকে স্বর্গের দেবতারা কখনও স্ত্রী, কখনও সেবাদাসী, কখনও গণিকা, আবার কখনও অসুরদের রূপে ভুলিয়ে কাত করাবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

পণ্ডিতদের মতে সরস্বতী হলেন সৃজন শক্তি। অর্থাৎ ‘Essence of the self’। আপন সত্তার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গুণাবলি। তাঁর চারটি হাত। এক হাতে গোলাপ, এক হাতে বই –এ দুটি হল পিছনের হাত। সামনের দু-হাতে তিনি বীণা বাজাচ্ছেন। তাঁর পরিধানে সাদা বস্ত্র, যা শুদ্ধ জ্ঞানের প্রতীক। বীণাবাদন জাগতিক কর্ম আর পদ্মধারণ আধ্যাত্মিক জগতের প্রতীক বলা হয়েছে। পদ্ম পরম সত্তার প্রতীক। এর দ্বারা মনোযোগ, ধ্যানসমাধি এবং পরম সত্তার সঙ্গে একাত্মতা বোঝায়। তাঁর কাছ একটি ময়ুর থাকলেও বাহন রাজহাঁস। ময়ুরের মেজাজ আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। তাই তিনি পছন্দ করেননি। অপরদিকে রাজহাঁস অসার-সার একসঙ্গে মেশানো দ্রব্য থেকে অসার দ্রব্য নিখুঁতভাবে ত্যাগ করে সারদ্রব্য গ্রহণ করে বলে বাহন হিসাবে বেশি পছন্দ।

হিন্দুদের দেবী হওয়া সত্ত্বেও বৌদ্ধ ও জৈনদের কাছেও পুজো পেয়েছেন সরস্বতী। গান্ধারের পাওয়া বীণাবাদিনী সরস্বতীর মূর্তি থেকে বা সারনাথে সংরক্ষিত মূর্তিতে এর প্রমাণ মেলে। পাথরের একটি ছোটো মূর্তি আছে তাতে সরস্বতী বীণা বাজাচ্ছেন, এর সঙ্গে হিন্দুদের সরস্বতীর কোনো পার্থক্য নেই। মথুরায় জৈনদের প্রাচীন কীর্তির আবিষ্কৃত নিদর্শনে সরস্বতীর যে মূর্তি পাওয়া গেছে সেখানে দেবী জানু উঁচু করে একটি চৌকো পীঠের উপর বসে আছেন, এক হাতে বই। শ্বেতাম্বরদের মধ্যে সরস্বতী পুজোর অনুমোদিত ছিল। জৈনদের ২৪ জন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ১৬ জন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অন্যতম হলেন সরস্বতী। শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর জৈন সম্প্রদায় উভয়েই সরস্বতাঁকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে গৃহীত একজন প্রধান দেবীরূপে স্থান হয়ে গেল।

শ্রীপঞ্চমীর ‘শ্রী’ অর্থে লক্ষীকে বোঝায়। অর্থাৎ এই তিথি লক্ষ্মীর। তাই শ্রীপঞ্চমীর পুজো ধনের বা শস্যের বা তাঁর অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মীরও পুজো। এই কারণে দেখা যায় কৃষিজীবী মানুষের কৃষি উৎপাদনের উপাদানগুলি এই পুজোয় অন্তর্ভুক্ত। তাই সরস্বতী পুজোর অন্যতম উপাচার পঞ্চশস্য (ধান, যব, সাদা সর্ষে, মুগ ও মাসকলাই) এবং পঞ্চপল্লব (কাঁঠাল, আম, অশন্থ, বট ও বকুল)। অনেকে মনে করেন সরস্বতী নামে দেবী কৃষিকর্মের সহায়ক এবং উৎপাদক ব্যবস্থার সঙ্গেই বেশি যুক্ত। অমরসিংহের সময় পর্যন্ত প্রাচীন কোনো কোশগ্রন্থে ‘শ্রী’ শব্দের অর্থ সরস্বতী না থাকলেও মধ্যযুগের আচার্য রেদিনীবর হেমচন্দ্র প্রমুখের অভিধানে সরস্বতী আর-একটি নাম হিসাবে ‘শ্রী”-র সন্ধান পাওয়া যায়।

সরস্বতী আলোচনা প্রসঙ্গে লক্ষ্মীর প্রসঙ্গও এসে যায়। কারণ আমরা লক্ষ্মী ও সরস্বতীর দ্বন্দ্বের কাহিনি আমরা শুনেছি। দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে, লক্ষ্মী কৃষ্ণের জিহ্বাগ্র থেকে উৎপন্ন হয়েছেন। ব্রহ্মা প্রথম তাঁকে পুজো করেন। পরে জগতে তাঁর পুজো প্রতিষ্ঠিত হয়। দেবীপুরাণে বলা হয়েছে, একবার সত্যযুগের শুরুতে ভগবান বিষ্ণু ক্ষীর সাগরে যোগনিদ্রায় শায়িত ছিলেন। সেইসময় লক্ষ্মী তাঁর পদসেবা করছিলেন। সেইসময় হঠাৎ বৈকুণ্ঠলোকে সরস্বতী চলে আসেন। বিষ্ণুর পদসেবায় নিয়োজিত লক্ষ্মীকে দেখে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন সরস্বতী এবং লক্ষ্মীকে বৈকুণ্ঠ ছেড়ে চলে যেতে বললেন। তাঁর ক্রুব্ধ হওয়ার একমাত্র কারণ হল তিনি তখন ভেবেছিলেন বিষ্ণুই হয়তো তাঁর স্বামী। লক্ষ্মী অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন সরস্বতাঁকে। কিন্তু সরস্বতী কিছুতেই বুঝতে চাননি যে, বিষ্ণুই লক্ষ্মীর স্বামী। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মধ্যে এ নিয়ে তুমুল দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হল। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর তুমুল দ্বন্দ্ব দেখে গঙ্গা তাঁদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে উদ্যোগী হন। গঙ্গা স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্মীর পক্ষ নিলেন এবং সরস্বতীর বিপক্ষে দাঁড়ালেন। গঙ্গা সরস্বতাঁকে যারপরনাই বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, বিষ্ণুই একমাত্র লক্ষ্মীর স্বামী। এ ঘটনা কি এটাই প্রমাণ করে যে, সরস্বতী বিষ্ণুকে নিজের স্বামী করছিলেন? সরাসরি সদার্থক উত্তর পাওয়া না গেলেও বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। যাই হোক, সরস্বতী কি গঙ্গার এই বিচার মেনে নিলেন? না, মানেননি। তিনি লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিলেন, বললেন– “লক্ষ্মী মর্ত্যলোকে মানবী হয়ে জন্মাবেন, অসুরের স্ত্রী হয়ে দুঃখ সহ্য করবেন এবং অবশেষে বৃক্ষতে রূপান্তরিত হবেন।” সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিতেই গঙ্গাও সরস্বতাঁকে অভিশাপ দিলেন– সরস্বতী নদীরূপে পৃথিবীতে প্রবাহিত হবে। সরস্বতীও গঙ্গাকে পাল্টা অভিশাপ দিলেন –গঙ্গাও পৃথিবীতে নদীরূপে প্রবাহিত হবেন।

এক বিষ্ণুকে ঘিরে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গঙ্গা তিনজনেই একে অপরকে অভিশাপ দিলেন। এই পুরাণ-কাহিনি থেকে হিন্দুরা বিশ্বাস করে –সরস্বতীর অভিশাপে লক্ষ্মী তুলসীগাছ হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন, গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতী পৃথিবীর বুকে নদীরূপে প্রবাহিত হচ্ছেন এবং গঙ্গাও সরস্বতীর অভিশাপে পৃথিবীর বুকে নদীরূপে প্রবাহিত হচ্ছেন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে বলেন– সরস্বতী, গঙ্গা ও লক্ষ্মীর মধ্যে যে, দ্বন্দ্ব-বিবাদ হয়েছে, তা নিছকই দেবলীলা। আবার অনেকেই বলেন, এসব নিছকই মনোরঞ্জক গালগপ্পো, রূপকথা।

মহাভারতের এক জায়গায় উল্লেখ আছে, নগরে প্রবেশের আগে যুধিষ্ঠির তাঁকে প্রীতি ও সাদর সম্ভাষণ জানাতে গণিকাদের লোক মারফত প্রেরণ করেন। প্রাচীন ভারতে গণিকারাই ছিলেন নারীদের মধ্যে একমাত্র শিক্ষিত শ্রেণি। এঁদের চৌষট্টি কলায় পারদর্শিনী হতেই হয়। শুধু তাই নয়, অলংকার, ছন্দ ও কাব্য সম্পর্কেও তাঁদের বিশেষ জ্ঞান ছিল। সেই কারণেই তাঁরা রাজদরবারে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আমন্ত্রণ পেতেন। যে সময় সাধারণ নারীরা পড়াশোনা করতেন, সে সময় গণিকারাই কেবল কেবলমাত্র বিদ্যা, সঙ্গীত ও অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞানী ছিলেন। আর এইসব জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রীদেবী হিসাবে ছিলেন সরস্বতী। ধনী নাগরিক ও গণিকাদের দ্বারা পূজিত হতেন, সে বিষয়ে উল্লেখ আছে বাৎসায়নের কামসূত্র গ্রন্থে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে প্রাচীন যুগে ধনী নাগরিক ও গণিকাদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। বিদ্যা আজও গরিবদের জন্য নয়।

তবে গণিকাদের লক্ষ্মীপুজো থেকে বঞ্চিত করা হলেও সরস্বতী পুজো করতে পারেন। সরস্বতী কেন? সরস্বতীর অধিষ্ঠান কী তবে গণিকালয়ে? তা না-হলে লক্ষ্মী নয় কেন? গণিকাদের তো লক্ষ্মী বা ধনসম্পদের প্রয়োজন। দক্ষিণ ভারতে যে ময়ূরবাহন সরস্বতীর মূর্তি পাওয়া গেছে সেটা কৌমারীর সঙ্গে অনেকটা মিলজুল হয়। কৌমারী কার্তিকের পত্নী। তাই বোধহয় গণিকাদের দেবতা কার্তিকের পাশাপাশি সরস্বতীর পুজোও গণিকালয়ে হয়ে থাকে। যুগে যুগে ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন উপাসনালয় থেকে গণিকালয়– সর্বত্র পুজো পায় সরস্বতী। সরস্বতী তাঁর কৌমার্য হারিয়েছে বহু পুরুষের বাহুডোরে। নেপালে চতুর্দশ শতকের পাওয়া শিলালিপিতে লেখা আছে– “সারদা তুমি মাতৃরূপী, তুমি কামমূর্তি”। তাই কি স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের উচ্চারণ করতে হয়– “ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে”। তিব্বতে এমন অনেক সরস্বতী পাওয়া গেছে যাঁর উর্ধ্বাঙ্গে কোনো বসনই ছিল না। তাই হয়তো মকবুল ফিদা হোসেনের সরস্বতীর পরনে আব্রু নেই! সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশ– এরা কেউ কারোর ভাই-বোন নয়, এটা বাঙালিদের মনগড়া রূপকল্প। ভিত্তি নেই, সমর্থনও নেই।

আমরা বাঙালিরা সাধারণত সরস্বতীর যে মূর্তি কল্পনা করি, তা হল তিনি চতুর্ভুজা, শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা, শ্বেত পদ্মাসনা, শ্বেত হংস। এছাড়াও আমরা সরস্বতীর আরও দুটি রূপ পাচ্ছি– (১) মহা সরস্বতী ও (২) মহাবিদ্যা নীল সরস্বতী।

মহা সরস্বতী : দেবীমাহাত্ম অনুসারে ইনি মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতীর মিলিত রূপ। ইনি অষ্টভুজা, শ্বেত পদ্মাসনা, বীণাবাদনরত। তাঁর হাতে ঘণ্টা, ত্রিশূল, লাঙলের ফলা, শাঁখ, মুষল, চাকতি, ধনুক ও শর। শারদ পূর্ণিমার চন্দ্রের মতো তাঁর দীপ্তি। গৌরীর শরীর থেকে তাঁর জন্ম এবং তিনি শুম্ভ ইত্যাদি অসুরদের বধকারিণী। শুম্ভ ও নিশুম্ভ অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবী দুর্গার শরীর থেকে কৌশিকী দেবীর উৎপত্তি হয়েছিল।

মহাবিদ্যা নীল সরস্বতী : ইনি মহাবিদ্যা তারার আর-এক রূপ। তন্ত্রসারে তাঁর ধ্যানমন্ত্র পাওয়া যায়। কথিত আছে –বিদ্যাবতীর কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বনের মধ্যে এক জলাশয়ে কালিদাস যখন প্রাণ বিসর্জন দিতে যান, তখন নীল সরস্বতী আবির্ভূত হয়ে তাঁকে আত্মহত্যা থেকে নিরস্ত্র করেন। এরপর কালিদাসের প্রর্থনায় তুষ্ট হয়ে তিনি কালিদাসের জিহ্বার অগ্রভাগে সদা বিরাজ করতে থাকেন। এর ফলে কালিদাস মূর্খ থেকে মহাপণ্ডিত হয়ে একের পর এক মহাকাব্য লিখে ফেলেন।

আদি পুরাণ বলছে, সরস্বতী ব্রহ্মার মুখজাত। মুখজাত– এর অর্থ জ্ঞান। মুখনিঃসৃত কথাই তো বেদ। ফলে ব্রহ্মার মুখজাত সৃষ্টি সরস্বতী জ্ঞানেরই। আবার শিবপুরাণ তো অন্য কথা বলছে। কী বলছে? বলছে– ব্রহ্মা কাম পরবশ হয়ে সরস্বতীর পিছনে পিছনে গিয়েছিলেন, ছেলেদের বাধায় ব্রহ্মা দেহত্যাগ করেছিলেন। এখানেই আছে ব্রহ্মার এই কুপ্রস্তাবে সরস্বতী ব্রহ্মাকে অভিশাপ দেন, ফলে তার একটি মাথা খসে পড়ে। সেই থেকে ব্রহ্মা চতুরানন। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণেও সরস্বতী বিষ্ণুর মুখজাত, কিন্তু ব্রহ্মার স্ত্রী। বিষ্ণু ব্রহ্মাকে গোলকে পাঠাচ্ছেন। প্রকৃতির অংশরূপী ভারতাঁকে সেখানে মানে গোলকে দেখতে পাবেন এবং তাঁকে দেখার পর তাঁর সঙ্গে যৌনমিলনে ব্যস্ত হবেন। এও আছে ব্রহ্মা ভারতীর সঙ্গে রতিক্রিয়া করেছেন স্থানে স্থানে নির্জনে নির্জনে। যিনি ভারতী, তিনিই সরস্বতী।

‘মৎসপুরাণ’ অনুসারে পরমাত্মার মুখনিঃসৃত শক্তিগুলির মধ্যে সরস্বতী সর্বশ্রেষ্ঠা। তিনি রূপে দেবীর ন্যায় পরমা সুন্দরী। মহাশ্বেতা (সর্বশুক্ল বা যার সর্বাঙ্গ শ্বেতবর্ণের) ও বীণাবাদিনী। কিন্তু জন্ম নেওয়ার পর তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে ‘সৃষ্টিকর্তা’ ব্রহ্মা সরস্বতীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ব্রহ্মার কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে অগোচরে চলে যেতে থাকে সরে সরে। যেদিকেই তিনি সরছেন সেদিকেই ব্রহ্মার মাথা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সরস্বতাঁকে নজরের বাইরে যেতে দিচ্ছেন না রূপে মুগ্ধ ব্ৰহ্মা। এইভাবেই তৈরি হয়ে যায় পাঁচটি মাথা। এই রূপেই আমরা ব্রহ্মার মূর্তি পাই। অবশেষে সরস্বতী রাজহংসীর রূপ ধরে বনে পালিয়ে যান। ব্ৰহ্মাও রাজহংসীরূপী সরস্বতীর পিছু নেন এবং সেখানে জোর করে সরস্বতাঁকে ভোগ করেন।

স্কন্দপুরাণে আমরা অন্য এক কাহিনি পাই। সেখানে ব্রহ্মা তাঁর কন্যা সরস্বতীর প্রতি দুর্ব্যবহার করলে শিব তাঁকে শরবিদ্ধ করে হত্যা করেন। তখন ব্রহ্মার স্ত্রী গায়ত্রী কন্যা সরস্বতাঁকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে তপস্যা শুরু করে দেন। সেই থেকে শিবের নির্দেশে গায়ত্রী ও সরস্বতীর তপস্যাস্থলে দুটি প্রসিদ্ধ তীর্থ সৃষ্টি হয়। পৃথিবীতে সকল দেবতার তীর্থক্ষেত্র আছে, কেবল ‘সৃষ্টিকর্তা’ ব্রহ্মার নেই। একথা ভেবে ব্রহ্মা পৃথিবীতে নিজের তীর্থ স্থাপনে উদ্যোগী হলেন। তিনি একটি সর্বরত্নময়ী শিলা পৃথিবীতে নিক্ষেপ করলেন। সেটি চমৎকারপুরে এসে পড়ল। ব্রহ্মার সেখানেই নিজের তীর্থ স্থাপন। করবেন বলে ভাবলেন। ব্রহ্মার নির্দেশে সরস্বতী পাতাল থেকে উঠে এলেন। তখন ব্রহ্মা তাঁকে বললেন –“তুমি এখানে আমার কাছে সবসময় থাকো। আমি তোমার জলে ত্রিসন্ধ্যা তপণ করব।” সরস্বতী ভীত হয়ে বললেন– “আমি লোকের স্পর্শ ভয় পাই বলে সবসময় পাতালে থাক। কিন্তু আপনার আদেশ আমি অমান্যও করতে পারি না। আপনি সবদিক বিচার করে একটা ব্যবস্থা করুন।” তখন ব্রহ্মা সরস্বতীর অবস্থানের জন্য হ্রদ খনন করলেন। সরস্বতী সেই হ্রদে অবস্থান করতে লাগলেন। ব্রহ্মা ভয়ংকর সাপেদের সেই হ্রদে ও সরস্বতীর রক্ষক হিসাবে রাখলেন।

শুধু বৈদিক যুগে নয় পরবর্তীকালে মহাভারত, পুরাণ, কাব্যে পূতসলিলা সরস্বতীর মহিমা বর্ণিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল ছিল হিমালয়ের সিমুর পর্বতে, এখান থেকে পাঞ্জাবের আম্বালা জেলার আদবদ্রী নামক স্থানে সমভূমিতে অবতরণ করেছিল। যে প্রসবণ থেকে এই নদীর উৎপত্তি তা ছিল প্লক্ষাবৃক্ষের কাছে, তাই একে বলা হতো প্লহ্মাবতরণ। এতি হিন্দুদের তীর্থস্থান। ঋগ্বেদের যুগে গঙ্গা যমুনা ছিল অপ্রধান নদী, পক্ষান্তরে সরস্বতী নদী ছিল সর্বপ্রধান ও সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয়। এর তীরে ছিল প্রসিদ্ধ তীর্থভূমি। সরস্বতী ও দৃষদ্বতীর মধ্যস্থান দেবনির্মিত স্থান হিসেবে বিবেচ্য হত। ব্রাহ্মণ ও মহাভারতে উল্লেখিত সারস্বত যজ্ঞ এই নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হত। মহাভারত রচনা হওয়ার আগেই রাজপুতনার মরূভূমিতে সরস্বতী নদী অদৃশ্য হয়ে গেলেও কয়েকটি স্রোতধারা অবশিষ্ট ছিল। এই স্রোতধারা হল চমসেসাদ্ভেদ, শিবোদ্ভেদ ও নাগোদ্ভেদ। রাজস্থানের মরূভূমির বালির মধ্যে চলুর গ্রামের নিকটে সরস্বতী অদৃশ্য হয়ে ভবানীপুরে দৃশ্য হয়। আবার বলিচ্ছপুর নামকস্থানে অদৃশ্য হয়ে বরখের নামক স্থানে দৃশ্য হয়। তান্ডমহাব্রাহ্মণে সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল হিসাবে প্লপ্রস্রবণ ও বিনাশস্থল হিসেবে বিনশনের নামোল্লেখ আছে। ভারতের বর্তমান উদয়পুর, মেওয়াড় ও রাজপুতনার পশ্চিমপ্রান্তে মরু অঞ্চলে সিরসা অতিক্রম করে ভূটানের মরূভূমিতে সরস্বতীর বিলোপ স্থানই বিনশন। লাট্যায়ণের শ্রৌতসূত্র মতে, “সরস্বতী নামক নদী পশ্চিম মুখে প্রবাহিত, তার প্রথম ও শেষভাগ সকলের প্রত্যক্ষ গোচর, মধ্যভাগ ভূমিতে নিমগ্ন হয়ে প্রবাহিত, সে অংশ কেউ দেখতে পায় না, তাকেই বিনশন বলা হয়”। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের মতে, বৈদিক সরস্বতীর লুপ্তাবশেষ আজও কচ্ছ ও দ্বারকার কাছে সমুদ্রের খাড়িতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর বিনাশ ঘটেছিল অবশ্যই বৈদিক যুগের শেষভাগে। আচার্য যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে, খ্রিস্টের দেড় হাজার বছরেরও আগে। মহাভারতে আছে যে নিষাদদের চোখের আড়ালে থাকার জন্য বিনাশণ নামক স্থানে মরুভূমিতে অদৃশ্য হয়েছে। নদীর স্থানীয় নামই এই ঐতিহ্য বহন করছে। অনেকেই বলেন, সিন্ধুনদই সরস্বতী। সরস্বতী ও সিন্ধু দুটি শব্দের অর্থই নদী।

সরস্বতী পুজো হিন্দু বিদ্যা ও সঙ্গীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব। পুরোহিত দর্পণ (শাস্ত্রীয় বিধান?) অনুসারে মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পুজো আয়োজিত হয়। তিথিটি শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। উত্তর ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, নেপাল ও বাংলাদেশে সরস্বতী পুজো উপলক্ষ্যে বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। শ্রীপঞ্চমীর দিন অতি প্রত্যূষে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রীদের গৃহ ও সর্বজনীন পূজামণ্ডপে দেবী সরস্বতীর পুজো করা হয়। ধর্মপ্রাণ হিন্দু পরিবারে এই দিন শিশুদের হাতেখড়ি, ব্রাহ্মণভোজন ও পিতৃতর্পণের প্রথাও প্রচলিত। পূজার দিন সন্ধ্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সর্বজনীন পুজোমণ্ডপগুলিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয়। পুজোর পরের দিনটি শীতলষষ্ঠী নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে কোনো কোনো হিন্দু পরিবারে সরস্বতী পুজোর পরদিন অরন্ধন পালনের প্রথা রয়েছে।

নদী সরস্বতী বৈদিক সাহিত্য থেকে পুরোপুরি বাগ দেবী হয়ে দাঁড়ান ব্রাহ্মণ গ্রন্থে। সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পুজো বর্তমান রূপটি আধুনিক কালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকেরা সরস্বতী-সদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পুজো করতেন বলে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির উপর তালপাতার তাড়ি ও দোয়াতকলম রেখে পুজো করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্রেরা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পুজো করত। ইংরেজি স্লেচ্ছ ভাষা হওয়ায় সরস্বতী পুজোর দিন ইংরেজি বইয়ের পুজো নিষিদ্ধ ছিল। গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বিংশ শতাব্দীতেও প্রচলিত ছিল। শহরে ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পুজো করতেন। বর্ধমান মহারাজার পূজায় বিশেষ সমারোহের আয়োজন করা হয়। দূর দুরান্ত থেকে মানুষ এই পুজোর বিসর্জন দেখতে আসত। পুজো উপলক্ষে দুই ঘণ্টা আতসবাজিও পোড়ানো হত। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পুজোর প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে সরস্বতী দেবী হলেও মেয়েরা অঞ্জলি দিতে পারত না। কিছু পণ্ডিতের মতে সমাজপতিরা ভয় পেতেন হয়তো এই সুযোগে ধর্মের নামে মেয়েরা দাবি করে বসেন লেখাপড়ার স্বাধীনতা!

শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পুজো সম্পন্ন করা যায়। সরস্বতীর পুজো সাধারণ পুজোর নিয়মানুসারেই হয়। তবে এই পুজোয় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যেমন অভ্র-আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ। পুজোর জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলও প্রয়োজন হয়। লোকাঁচার অনুসারে, ছাত্রছাত্রীরা পুজোর পূর্বে কুল ভক্ষণ করেন না পুজোর দিন কিছু লেখাও নিষিদ্ধ। যথাবিহিত পুজোর পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পুজো করার প্রথা প্রচলিত আছে। পুজোর শেষে পুস্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের দল বেঁধে অঞ্জলি দিয়ে থাকে।

কেউ কেউ বলেন, মর্ত্যধামে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে প্রথম বারের মতো শ্রীশ্রী সরস্বতী দেবী পুজোর প্রচলন করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শৈশব কাল থেকেই সরস্বতী পুজো প্রচলন করে সমগ্র পৃথিবীর শিক্ষার্থীদের সরস্বতী পুজোর গুরুত্ববহ বিদ্যার্জন ও বিদ্যালয়সমূহে সরস্বতী পুজোর প্রচলন করে গেছেন, যা এখনও পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত রয়েছে। সরস্বতী পুজো স্বৰ্গমর্তে, উভয়লোকে দেবতা, গন্ধর্ব, কিন্নর, ঋষি, মহর্ষি, রাজা-প্রজা সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে করে আসছে। সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি দেওয়ার সময় পলাশ ফুলের ব্যবহার ভগবান শ্রীকৃষ্ণই প্রচলন করেন। বলে অনেকে মনে করেন। শ্রীকৃষ্ণের বয়স তখন ৭ বছর।

পুস্পাঞ্জলী মন্ত্রঃ

ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।
নমঃভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ।।
বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ।।
এস স-চন্দন পুষ্পবিল্ব পত্রাঞ্জলি সরস্বতৈ নমঃ।।

প্রণাম মন্ত্রঃ

নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী বিদ্যাংদেহি নমোহস্তুতে।।
জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।

সরস্বতীর স্তবঃ

শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেত পুষ্পোপশোভিতা।
শ্বেতাম্ভরধরা নিত্যা শ্বেতাগন্ধানুলেপনা।।
শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চ্চিতা।
শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারবভূষিতা
বন্দিতা সিদ্ধগন্ধর্বৈৰ্চিতা দেবদানবৈঃ।
পূজিতা মুনিভি: সৰ্ব্বৈঋষিভিঃ স্কয়তে সদা।।
স্তোত্রেণানেন তাং দেবীং জগদ্ধাত্রীং সরস্বতীম্।
যে স্মরতি ত্রিসন্ধ্যায়ং সৰ্বাং বিদ্যাং লভন্তি তে।।

নদী সরস্বতীর মহিমা ভারতবাসীর মনে এত রেখাপাত করেছিল যে, পরবর্তীকালে গঙ্গা সরস্বতীর স্থান দখল করলেও তাঁরা তাঁকে ভুলতে পারেনি। প্রয়োগে অন্তঃসলিলারূপে গুপ্তভাবে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গে সরস্বতীর সঙ্গম, পশ্চিমবঙ্গে হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে গঙ্গার স্রোত ধারা থেকে সরস্বতীর মুক্তি হিন্দুদের প্রিয় ও পবিত্র বিশ্বাস। সরস্বতী নিয়ে নানা ব্যাখ্যা নানা বিশ্লেষণ প্রচলিত আছে। তাই সঠিক সিদ্ধান্তে যাওয়ার চেষ্টা করা বৃথা, তবে অসম্ভব নয়। অতএব আমরা দেখলাম নদীরূপে, ব্রহ্মার কন্যারূপে, বিষ্ণুর জিহ্বায় অবস্থানকারী রূপে ইত্যাদি নানাভাবে আদি কাহিনিগুলিতে বারবার সরস্বতী এসে হাজির হয়েছেন। সরস্বতী শব্দের যা অর্থ তা নদীর সঙ্গে মিল খায় না। যদিও সেইকালে নদীর অপরিসীম গুরুত্ব ছিল। পরবর্তীকালে তাঁকে বাগদেবী হিসাব পুজো করা শুরু হয়। এইখানে আমরা বিগ ব্যাং থিয়োরির কথাটা একবার মনে করতে পারি, যা শব্দ থেকে ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি কথাটার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি করে। এবার আমরা যদি সহজ করে ভাবি তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে একটা পরমসত্তা ছিল, একটা শব্দ নির্গত হল আর ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি হল। সরস্বতী যদি সেই শব্দ হয় তবে সারা সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রয়েছে।

এতক্ষণ যাঁরা সরস্বতীর বিচিত্র কাহিনি পাঠ করলেন, তাঁদের বলি এইসব সরস্বতী একজন কেউ নন। ভিন্ন ভিন্ন সরস্বতী। একই নামে একাধিক সরস্বতীর একত্র রূপ। যেহেতু প্রাচীনকালে কারোর পদবি ছিল না বা পদবির উৎপত্তি হয়নি, তাই কারোকেই পৃথক করা যায় না। সবাইকেই একই সত্তা বলে মনে হয়।

লেখক মনোবর বলছেন–“সমস্ত জ্ঞান, যা শব্দ বা বাক্য দ্বারা ধারণা করা যায় তার এক চিন্ময়ী মূর্তি হিসাবে দেবী সরস্বতীর পুজো করা হয় এইটা হচ্ছে মোদ্দা কথা। সমস্ত প্রকার শক্তিকেই দেবীরূপে কল্পনা বা ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাই সরস্বতী হলেন বিদ্যাশক্তির অধিষ্ঠাত্রী। ব্যস! এবার আর কোনো সমস্যা নেই। এই প্রবল শক্তি, যা জগতের বিকাশের অন্যতম ভিত্তি তার পুজো পাওয়া মানে ওই বিদ্যার বিকাশের পথ সুগম হওয়া সেটা আমাদের জন্য আনন্দদায়ক হওয়ার কোন কারণ নেই। যা আমরা গুরুত্বপুর্ণ ভাবি তাকে শ্রদ্ধাভক্তি করায় দ্বিধার কোন কারণ তো নেই। এখানে আমরা বা আমাদের বলতে শুধুমাত্র হিন্দুদের কথা বলা হয়েছে বুঝতে হবে। কারণ মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের দেবী সরস্বতী নেই। তাঁরা কেউই সরস্বতীর বরে বিদ্যালাভ করে বিদ্বান হননি। তাঁরা সরস্বতীর বর বা আশীর্বাদ না পেলেও বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, গবেষক, দার্শনিক হওয়া তাঁদের আটকায়নি। আইনস্টাইন, নিউটন, কোপারনিকাস, প্লেটো, ডেকার্ত, পিট সিগার, ইবনে বতুতা, হিউয়েন সাঙ, আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, রুজভেল্ট, সামসুর রহমান, হুমায়ুন আজাদ, আবদুল্লাহ আবু সয়ীদ, হুমায়ুন আহমেদ, মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, সৈয়দ মুজতবা সিরাজ, আল্লামা ইকবাল, জসিমউদ্দিন, কার্ল মার্ক্স, লেনিন, স্তালিন হয়ে উঠতে কারোরই সরস্বতীর প্রয়োজন হয়নি।

উপসংহারে একটা বলতে চাই, সরস্বতী মূলত হিন্দুদের দেবী। বিশেষ করে বাঙালি বিদ্যার্থীদের কাছে একমাত্র উপাস্য। খ্রিস্টান, মুসলমান, শিখ এবং অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের দেবী নয়। তবে স্কুল-কলেজে সরস্বতী পুজোর আয়োজন। করা শুধু অশোভনীয়ই নয়, অন্যায়। ভারতবর্ষ কোনো হিন্দু রাষ্ট্র নয়, এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ভারতবর্ষের কোনায় কোনায় স্কুল-কলেজগুলিতে শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীরাই পাঠ নেন না, পাঠ নেয় সব ধর্মের ছাত্রছাত্রীরা। অন্য ধর্মের ছাত্রছাত্রীদের ভিন্ন ধর্মের সরস্বতী বন্দনা চাপিয়ে দেওয়া অসাংবিধানিক। যদি জোর করে সরস্বতী-বন্দনা চাপিয়ে হয়, তবে তা হবে সাংবিধানিক অধিকার হরণের সামিল। সরকারি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় পুজোর কোনো নিয়ম নেই, তবু বিদ্যার দেবী হিসাবে সরস্বতী স্কুল, পাঠশালা কিংবা কলেজে পুজো পেয়ে থাকে। হিন্দু ধ্বজাধারী কোনো স্কুল কলেজে পুজো-পার্বণ হতেই পারে, তাই বলে সর্বসাধারণের স্কুল-কলেজগুলিতে এই পুজো কতটা প্রাসঙ্গিক, প্রশ্ন উঠতে পারে। ভেবে দেখতে বলি সবাইকে।

ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ভারতীয় সমাজ

ব্রাহ্মণ কে বা কারা? ব্রাহ্মণ কেন? ব্রাহ্মণ্যবাদই-বা কী– এরকম হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমাকে। সোস্যাল মিডিয়াগুলিতে সারাদিন ব্রাহ্মণ্যবাদের পোস্ট দিচ্ছে বর্ণবাদে ক্ষিপ্ত মানুষ। তাঁদের কাছে ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ সমার্থক। সেই মুহূর্তে আমি উত্তর দিতে পারিনি– এতগুলি প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভবও ছিল না সেদিন। কিন্তু উত্তর তো খুঁজতে হবে। অতএব গাঁইতি-শাবল নিয়ে ইতিহাস খননের অভিযানে হাঁটতে হবে। আমরা সাধারণত দুটি ক্ষেত্রে ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দটির অস্তিত্ব জানতে পারি। একটি বেদের অংশ ব্রাহ্মণ (যা ব্রাহ্মণ সাহিত্য হিসাবে পরিচিত), অন্যটি বর্ণাশ্রমের প্রথম সারির বর্ণ ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণ হল হিন্দু শ্রুতি শাস্ত্রের অন্তর্গত গ্রন্থরাজি। এগুলি বেদের ভাষ্য। ব্রাহ্মণ গ্রন্থাবলির মূল উপজীব্য যজ্ঞের সঠিক অনুষ্ঠানপদ্ধতি। প্রত্যেকটি বেদের নিজস্ব ব্রাহ্মণ রয়েছে। যোড়শ মহাজনপদের সমসাময়িককালে মোট কতগুলি ব্রাহ্মণ প্রচলিত ছিল তা জানা যায় না। মোট ১৯টি পূর্ণাকার ব্রাহ্মণ অদ্যাবধি বিদ্যমান: এগুলির মধ্যে দুটি ঋগবেদ, ছয়টি যজুর্বেদ, দশটি সামবেদ ও একটি অথর্ববেদের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও কয়েকটি সংরক্ষিত খণ্ডগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণগুলির আকার বিভিন্ন প্রকারের। শতপথ ব্রাহ্মণ ‘সেক্রেড বুকস অফ দি ইস্ট’ গ্রন্থের পাঁচ খণ্ড জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে; আবার বংশ ব্রাহ্মণের দৈর্ঘ্য মাত্র এক পৃষ্ঠা। বেদোত্তর যুগের হিন্দু দর্শন, প্রাক বেদান্ত সাহিত্য, আইন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যামিতি, ব্যাকরণ (পাণিনি), কর্মযোগ, চতুরাশ্রম প্রথা ইত্যাদির বিকাশে ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য। কোনো কোনো ব্রাহ্মণের অংশগুলি আরণ্যক বা উপনিষদের মর্যাদাপ্রাপ্ত। ব্রাহ্মণের ভাষা বৈদিক সংস্কৃত থেকে পৃথক। এই ভাষা সংহিতা (বেদের মন্ত্রভাগ) অংশের ভাষার তুলনায় নবীন, তবে এর অধিকাংশই সূত্র সাহিত্যের ভাষার তুলনায় প্রবীন। ব্রাহ্মণগুলি লৌহযুগ অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব নবম, অষ্টম ও সপ্তম শতাব্দীতে রচিত। কয়েকটি নবীন ব্রাহ্মণ (যেমন শতপথ ব্রাহ্মণ) সূত্র সাহিত্যের সমসাময়িক, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত। ঐতিহাসিকভাবে ব্রাহ্মণ গ্রন্থাবলির রচনাকাল পরবর্তী বৈদিক যুগের উপজাতীয় রাজ্যগুলির ষোড়শ মহাজনপদ রূপে উত্তরণের কাল। বৈদিক মন্ত্রের নানাপ্রকারের ব্যাখ্যাসহ বেদের যে অংশে যাগযজ্ঞাদির বিবরণ পাওয়া যায় তাকেই ব্রাহ্মণ সাহিত্য বলে। অন্যভাবে বললে মন্ত্র-ব্রাহ্মণাত্মক বেদের অংশ হল ব্রাহ্মণ (অন্যটি সংহিতা)।

ব্রাহ্মণ শব্দটি ‘ব্ৰহ্মণ’ শব্দ থেকে উৎপন্ন। যার অর্থ গূঢ়শক্তিসম্পন্ন শব্দ। বলবর্ধক এবং আরোগ্যকর মন্ত্রগুলি যাঁরা উচ্চারণ করতেন তাঁদের ব্রহ্ম বলা হত। ব্রহ্ম-উক্তির যোগফল হল ব্রাহ্মণ সাহিত্য। অর্থাৎ পুরোহিত ব্রাহ্মণদের যজ্ঞ সংক্রান্ত বিভিন্ন উক্তি যেখানে লিপিবদ্ধ আছে তার নাম ব্রাহ্মণ। কারোর মতে বেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেই এই গ্রন্থ ব্রাহ্মণ সাহিত্য। এবার চতুর্বেদের ব্রাহ্মণগুলি জেনে নিতে পারি–

(১) ঋকবেদের ঐতরেয় এবং কৌষিকী (বা সাংখ্যায়ন) ব্রাহ্মণ,

(২) সামবেদের পঞ্চবিংশ, ষড়বিংশ, সামবিধান, আর্যেয়, দৈবত, ছান্দোগ্য, সংহিতোপনিষৎ, বংশ, শাট্যায়ন, জৈমিনীয় বা তলবকার ব্রাহ্মণ,

(৩) কৃষ্ণযজুর্বেদে তৈতিরীয় এবং শুক্লযজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণ,

(৪) অথর্ববেদের গোপথ ব্রাহ্মণ।

পণ্ডিত আপস্তম্ব বেদের ব্রাহ্মণভাগের বিস্তৃত বিবরণ দিয়ে বলেছেন প্রধানত ছয়টি বিষয় ব্রাহ্মণে আলোচনা করা হয়েছে–

(১) বিধি : বিশেষ বিশেষ যজ্ঞকর্ম অনুষ্ঠানের জন্য যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাকে বিধি বলে।

(২) অর্থবাদ : বেদমন্ত্রের অর্থ এবং বিবিধ ক্রিয়াকাণ্ড সম্পর্কে ব্রাহ্মণগুলিতে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে দর্শনগত, ব্যাকরণগত এবং ভাষা সংক্রান্ত আলোচনা হয়েছে।

(৩) নিন্দা ও বিরোধী মতের সমালোচনা তার খণ্ডন ও পরিহারকে বলে নিন্দা।

(৪) প্রশংসা : ব্রাহ্মণগুলিতে কোনো কোনো ক্রিয়ার অনুমোদনের জন্য সেগুলির স্তুতি বা প্রশংসা করা হয়েছে।

(৫) পুরাকল্প : অতি প্রাচীনকালে যেসব যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছে বা দেবতাগণের (?) অনুষ্ঠিত যাগযজ্ঞাদির যেসব কাহিনি ব্রাহ্মণগুলিতে উল্লিখিত হয়েছে সেইসব বৃত্তান্ত পুরাকল্পের মধ্যে পড়ে।

(৬) পরকৃতি : যজ্ঞকর্মে অভিজ্ঞ খ্যাতনামা পুরোহিতগণের কীর্তি, বিখ্যাত রাজাদের যাগযজ্ঞ, দান, দক্ষিণা প্রভৃতি বিবরণই প্রকৃতি।

ব্রাহ্মণ সাহিত্যে বৈশিষ্টগুলি লক্ষ্যণীয়। দেখা যাক–

(১) ঋগবেদের ব্রাহ্মণে হোতা, যজুর্বেদের ব্রাহ্মণে অধ্বর্য, সামবেদের ব্রাহ্মণে উদগাতার করণীয় বিষয়ের উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

(২) ব্রাহ্মণ সাহিত্যের অধিকাংশ গদ্যে লেখা।

(৩) ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলিতে বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা প্রসঙ্গে আখ্যায়িকার অবতারণা করা হয়েছে। কিছু কিছু বৈদিক ভাষা ব্যাখ্যা এবং বিশেষ বিশেষ বৈদিক শব্দের ব্যুৎপত্তি পাওয়া যায়।

(৪) ব্রাহ্মণের অর্থবাদ বাক্যের মধ্যে পরবর্তীকালে দর্শন, ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্বের বীজ নিহিত ছিল।

(৫) প্রতিটি ব্রাহ্মণে বিভিন্ন যজ্ঞের খুঁটিনাটি বর্ণনার সঙ্গে যজ্ঞকর্মে পুরোহিতের প্রাধান্যই বর্ণিত।

এখন প্রশ্ন ব্রাহ্মণ সাহিত্যে প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা কি কিছু আছে? প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা আছে কি না সেটা আপনারাই বিচার করুন। আমি শুধু উল্লেখ করব–

(১) যদি সমাজচিত্রটা দেখি, তাহলে দেখব বৈদিক ভারতের জাতিভেদ, ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণের মধ্যে শক্তির দ্বন্দ্ব, প্রত্যেক বর্ণের জীবিকা, শিক্ষা, স্ত্রীশিক্ষা, বিবাহসংস্কার, কৃষিবাণিজ্য, খাদ্য প্রভৃতি বর্ণিত আছে।

(২) ঐতিহাসিক মূল্যের দিকটা যদি দেখি, তাহলে দেখব ভারতের পরবর্তীকালের ধর্ম ও দার্শনিক তত্ত্বের ইতিহাসে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের মূল্য অপরিসীম।

(৩) আখ্যানভাগের দিকটা যদি বলি, তা অবশ্য যারপরনাই রোমাঞ্চকর এবং বহুমাত্রিক। যেমন –(ক) শতপথ ব্রাহ্মণের পুরূরবা-উর্বশীর কাহিনি (১১.৫.১), (খ) মনুমৎস্যকথা (১.৮.১), (গ) ঐতরেয় ব্রাহ্মণে শুনঃশেপ আখ্যান (৭/১৩ ১৮)।

(৪) নীতিবোধ শিক্ষাও পাওয়া যায়। যেমন –(ক) শতপথ ব্রাহ্মণের নীতিবোধে বিশেষত যৌন সম্পর্কিত নীতির আভাস পাই। সেখানে এক ব্যক্তির স্ত্রীর পক্ষে অপর ব্যক্তির সহবাস পাপজনক বিবেচিত হত। (খ) আমরা হরিশ্চন্দ্রপুর রোহিতের উদ্দেশ্যে ইন্দ্রের মুখে শুনি চরিষ্ণু মানবজীবনের এগিয়ে চলার মন্ত্র– “চরৈবেতি” অর্থাৎ “চল চল”।

(৫) ব্রাহ্মণ সাহিত্য বহুমুখী সভ্যতা ও কৃষ্টির আকর বলে পরিগণিত হয়েছে। এতে আমরা পাই নৃত্যবাদ্যাদি, ললিতকলা, রাজনীতি, যুদ্ধবিদ্যা, স্থাপত্যবিদ্যা, ব্যাকরণ, ভাষাতত্ত্ব, অপরাধশাস্ত্র, নৌবিদ্যা, পশুপক্ষী ও ভেষজবিজ্ঞান প্রভৃতি।

(৬) তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে ইন্দ্র-ভরদ্বাজের কাহিনিতে (৩/১০) ব্রহ্মচর্যের মহিমা কীর্তন বর্ণিত হয়েছে।

আর্যরা ভারতের মানুষকে চারটি জাতিকে ভাগ করেছে। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে– প্রকৃতির তিনটি গুণ ও কর্ম অনুসারে আমি মানবসমাজকে চারটি বর্ণবিভাগ সৃষ্টি করেছি। আমি এই প্রথার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অব্যয় বলে জানবে।

“চাতুবর্ণং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম।।”

ভাগবদগীতার সিদ্ধান্ত অনুসারে বর্ণবিন্যাস জন্মসূত্রে নয়, বরং গুণ অনুসারে নির্ণীত হয়। উপরের শ্লোক অনুসারে বর্ণবিভাগ যে জন্মানুসারে নয়, বরং কর্মানুসারে তা শতভাগ নিশ্চিত। তাই একই গোত্রের কর্ম ও গুণ অনুসারে চারটি বর্ণ থাকতে দেখা যায়। কেউ যদি শাস্ত্র অধ্যায়ন তথা বুদ্ধিভিত্তিক কাজে পারদর্শী হন এবং সেভাবে জীবিকা অর্জন করে তবে সে ব্রাহ্মণ। পরিচালনায় দক্ষ হলে ক্ষত্রিয়। ব্যাবসা-বাণিজ্যে জীবিকা নির্বাহ করলে সে বৈশ্য এবং সকল পেশার লোক পেশার লোকদের সেবাকারীর কোনো বৃত্তি হলে সে শূদ্র বলে গণ্য হবে।

ব্রাহ্মণ কে? মনুসংহিতায় বলা হয়েছে–

“লোকানান্তু বিবৃদ্ধ্যর্থং মুখবাহ্রুপাদতঃ।
ব্রাহ্মণং ক্ষত্রিয়ং বৈশ্যং শূদ্রঞ্চ নিরবর্তয়ৎ।।”

অর্থাৎ লোকবৃদ্ধির জন্য (স্রষ্টা) মুখ, বাহু, ঊরু ও পদ থেকে যথাক্রমে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ এবং শূদ্র সৃষ্টি করলেন।

ঋগ্বেদ বলছে–

“ব্রাহ্মণোহস্য মুখমাসীদ বাহু রাজন্য কৃতঃ।
উরু তদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদভ্যাং শুদ্ৰো অজায়ত।।”

অর্থাৎ ব্রাহ্মণেরা মানবসমাজের মুখ স্বরূপ, ক্ষত্রিয় বাহু স্বরূপ, বৈশ্য উরু স্বরূপ এবং শূদ্র পাদ স্বরূপ।

শাস্ত্র অনুসারে ব্রাহ্মণদের কয়েকটা ভাগ পাওয়া যায়। যেমন– (১) সারস্বত ব্রাহ্মণ (২) পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ (৩) পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ (৪) বৈদ্যব্রাহ্মণ (৫) চক্রবর্তী (পদবী) ব্রাহ্মণ (৬) রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ এবং (৭) বারেন্দ্রীয় কুলীন ব্রাহ্মণ।

(১) সারস্বত ব্রাহ্মণ : সারস্বত ব্রাহ্মণরাই মূল বৈদিক শ্রেণি। এঁরা শাকদ্বীপ (ইউরোপ) থেকে এসে ঋগ্বেদে উল্লেখিত সরস্বতী নদী বিধৌত অঞ্চল গান্ধার (আফগানিস্তান), আর্য (ইরান), পাকিস্তান অঞলে বসে বেদ দৃষ্ট হন। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে এই অঞ্চল গ্রিক রাজ্যের অধিনে যায় এবং ব্যাকট্রিয়া রাজধানী হয়। তাঁরা আস্তে আস্তে জম্বুদ্বীপ (বর্তমান ভারত) আসেন এবং বেদ প্রচার চালিয়ে যান। দ্বিতীয় শতাব্দীতে একজন সারস্বত ব্রাহ্মণ বিন্ধ্যাচল থেকে দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত রাজা হন, যা ‘বাকাটক রাজবংশ হিসাবে পরিচিত। এঁরাই সর্বপ্রথম পদবি হিসাবে ‘সেন’ ব্যবহার শুরু করেন। পুরাণে এঁদের ‘মূর্ধাভিষিক্ত ব্রাহ্মণ’ বা ‘ব্ৰহ্মক্ষত্রিয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এঁরা বৈদিক জাতির ‘মূর্ধা’ বা মস্তকে অভিষিক্ত এবং মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, ব্রহ্মার মস্তকের সর্বোচ্চ স্থান থেকে এঁদের জন্ম হয়েছে। এই বংশের দ্বিতীয় রুদ্রসেনের সঙ্গে গুপ্ত রাজবংশের প্রভাবতী গুপ্তের বিবাহ হয় এবং দুই রাজবংশের মিত্রতা হয়। ফলে সারস্বত ব্রাহ্মণরা পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে বেদ প্রচারের সুযোগ পান এবং সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েন। এই সময়কে বৈদিকধর্ম ও সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে ধরা হয়। কৌলিন্য ও বর্ণ সমীকরণের অধিকার শুধুমাত্র সারস্বত ব্রাহ্মণদের ছিল। এঁরা বিভিন্ন অঞ্চলের নাম অনুযায়ী ব্রাহ্মণ সমাজের নামকরণ করেছিলেন। দাক্ষিণাত্য শাসনের সুবাদে সবচেয়ে বেশি সারস্বত ব্রাহ্মণ দাক্ষিণাত্য ও বিন্ধ্যপর্বত অঞ্চলে বসবাস করে। পাল শাসনকালের সময় গৌড় এবং কামরূপের নিকটাধীন একটি অঞ্চলে এঁরা বাস করত বলে ষষ্ট শতাব্দীর ভাস্করবর্মার তাম্রশাসনে ব্রাহ্মণ জমিদানে এঁদের নাম দেখা যায়। পরবর্তীতে বরেন্দ্রসেন একটি ক্ষুদ্র রাজ্য গড়ে তোলেন, যা ‘বরেন্দ্রভূমি’ হিসাবে পরিচিত। এটি পাল সাম্রাজ্যের সময় সামন্ত রাজ্য হিসাবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এই রাজ্যের সারস্বত ব্রাহ্মণ বীরসেনের ঔরসে এবং গৌড় সারস্বত ব্রাহ্মণ কন্যা সোমটা দেবীর গর্ভজাত বংশধরেরা পাল সাম্রাজ্য অধিকার করে এবং আসমুদ্রহিমাচল সেন সাম্রাজ্যের সূচনা করে। বৌদ্ধ প্রধান। বাংলায় হিন্দু প্রাধান্য সৃষ্টি করে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্রাহ্মণ ডেকে আনেন। বিভিন্ন অঞ্চলে বৈদিকধর্ম প্রচারের জন্য দূত প্রেরণ করে। বেদানুসারে বর্ণ ও কৌলিন্য সমীকরণ করে। তিন যুগ বা ৩৬ বছর পরপর এই সমীকরণ হত এবং কর্মানুযায়ী বর্ণ ও কৌলিন্য নির্ধারণ হত। এই সমীকরণের কারণে সারস্বত সমাজে সম্প্রদায়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আধুনিক হিসাব অনুযায়ী ৪৬০ প্রকারের সারস্বত শ্রেণি আছে।

(২) পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ : পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণরা হল ভারতের হিন্দুধর্মের দুটি বৃহত্তর ব্রাহ্মণগোষ্ঠীর একটি। পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ ছাড়া দ্বিতীয় প্রকার গোষ্ঠীটি পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে কলহণের কাশ্মীরের ইতিহাস বিষয়ে রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’ গ্রন্থে বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণভাগে অবস্থিত পাঁচটি পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করা রয়েছে। এগুলি হল– (১) কর্ণাটক (কন্নড়ভাষী সহ তৎসংলগ্নভাষী ব্রাহ্মণ), (২) তৈলঙ্গ (তেলুগু ব্রাহ্মণ), (৩) দ্রাবিড় (তামিলনাড়ু ও কেরালা অঞ্চলের ব্রাহ্মণ), (৪) মহারাষ্ট্রক (মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ) এবং (৫) গুর্জর (গুজরাট ও রাজস্থানের দক্ষিণাঞ্চলের ব্রাহ্মণ)

মারাঠা সাম্রাজ্যের সময়কালে দক্ষিণাত্যের মারাঠাদের অঞ্চলে আমলাতান্ত্রিক জমি জরিপ ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। নথি অনুসারে ব্রাহ্মণদের মধ্যে পাঁচ প্রকার পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলি হল –(১) অন্ধ্র পূর্ব ব্রাহ্মণ, (২) অন্ধ্র-পশ্চিম ব্রাহ্মণ, (৩) কর্ণাটক ব্রাহ্মণ, (৪) দ্রাবিড় ব্রাহ্মণ এবং (৫) দেশাষ্ট ব্রাহ্মণ।

আমলাতান্ত্রিক সম্প্রদায়ভিত্তিক নথি ‘কৈফিয়ৎ’ অনুসারে গুর্জর ব্রাহ্মণরা পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণদের অন্তর্গত। নথিটিতে এই পঞ্চদ্রাবিড়দের ১৬ টি উপবিভাগে ভাগ করা হয়েছে, সেগুলি হল– (১) কোঙ্কণাষ্ট, (২) কহাড়ে, (৩) বড়কারি, (৪) মধ্যদিন, (৫) বনাস, (৬) কর্ণাটক, (৭) ষষ্টিক, (৮) নন্দবংশিক, (৯) তৈলঙ্গ, (১০) শ্রীবৈষ্ণব, (১১) শখিকন্থ, (১২) কীবন্ত, (১৩) সিহাবসৈ, (১৪) নুরচের, (১৫) সেনবী/সেনই/সেন এবং (১৬) গোবলকোণ্ডে।

(৩) পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ : পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণরা হল ভারতের হিন্দুধর্মের দুটি বৃহত্তর ব্রাহ্মণগোষ্ঠীর একটি। পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ ছাড়া দ্বিতীয় প্রকার গোষ্ঠীটি ‘পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ’ নামে পরিচিত। আগেই আলোচনা করেছি। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে কলহণের কাশ্মীরের ইতিহাস বিষয়ে রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’ গ্রন্থে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তরভাগে অবস্থিত পাঁচটি পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করা রয়েছে। স্কন্দপুরাণেও এই গোষ্ঠীবিভাগগুলির বিন্যাস রয়েছে। এগুলি হল– (১) সারস্বত ব্রাহ্মণ, (২) গৌড় ব্রাহ্মণ, (৩) কান্যকুজ ব্রাহ্মণ, (৪) মৈথিল ব্রাহ্মণ এবং (৫) উকল ব্রাহ্মণ।

স্কন্দপুরাণের একটি অংশ হিসাবে বিবেচিত সহ্যাদ্রিখণ্ডেও উপরোক্ত শ্রেণিবিন্যাসেরই উল্লেখ আছে। মারাঠা সাম্রাজ্যের সময়কালে দক্ষিণাত্যের মারাঠাদের অঞ্চলে আমলাতান্ত্রিক জমি জরিপ ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। নথি অনুসারে ব্রাহ্মণদের মধ্যে পাঁচ প্রকার পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণের উল্লেখ আছে। সেগুলি হল –(১) কান্যকুজ ব্রাহ্মণ, (২) কামরূপী ব্রাহ্মণ, (৩) উৎকল ব্রাহ্মণ, (৪) মৈথিল ব্রাহ্মণ এবং (৫) গুর্জর ব্রাহ্মণ। আমলাতান্ত্রিক সম্প্রদায়ভিত্তিক নথি ‘কৈফিয়ৎ’ অনুসারে পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণরা সাধারণত স্মার্ত, বৈষ্ণব কিংবা ভাগবতের অনুসারী হয়ে থাকেন।

(৪) বৈদ্য ব্রাহ্মণ : বৈদিক সময়ে বঙ্গ-বিহার ও নেপালের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল বিদেহ রাজ্য, বিদেহ রাজ্যের ব্রাহ্মণরা বৈদহ ব্রাহ্মণ বা বৈদ্য ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁরা বৈদিক যজ্ঞাদি এবং বৈদিক চিকিৎসাশাস্ত্র চর্চা করতেন। বৈদ্য অর্থ বেদজ্ঞ হলেও কালক্রমে এটি চিকিৎসক বোঝাতে বেশি ব্যবহৃত হয়। আধ্যাত্মিক ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্র ‘আয়ুর্বেদ অনুশীলনকারী সম্প্রদায় বৈদ্য ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচিত। এঁদেরকে ‘ত্রিজ’ বলেও অভিহিত করা হত। বিদেহ রাজ্যে ‘ত্রিজভূক্তি’ নামে একটি অঞ্চল ছিল, যা এখনও বিদ্যমান নেপালের ত্রিরাই নামক জায়গায়। বাংলাতেই সবচেয়ে বেশি বৈদ্য ব্রাহ্মণ দেখা যায়। সেন, গুপ্ত, সেনশর্মা, সেনগুপ্ত ইত্যাদি পদবির সম্প্রদায় বৈদ্য ব্রাহ্মণ বলে পরিচিত। যদিও সেনরা রাজশাসনে যুক্ত হলে ‘ব্ৰহ্ম-ক্ষত্রিয়’ বা ‘রাজন্য-ব্রাহ্মণ বলে আত্মপ্রকাশ করে।

প্রবীণ অনুশীলনকারী বা শিক্ষকদের সম্মানের চিহ্ন হিসাবে ‘বৈদ্যরাজ’ বলা হত। কিছু অনুশীলনকারী যাঁদের গ্রন্থগুলির সম্পূর্ণ জ্ঞান ছিল এবং অনুশীলনে দক্ষ ছিলেন তাঁরা প্রাণাচার্য’ নামে পরিচিত ছিলেন। ভারতের কিছু রাজপরিবারের ব্যক্তিগত বৈদ্য ছিল এবং তাঁদের রাজবৈদ্য (রাজার চিকিৎসক)। হিসাবে উল্লেখ করা হত। প্রচলিত একটি মতে দেবাসুরের সমুদ্র মন্থনকালে ধন্বন্তরীর জন্ম হয় এবং বৈদ্যরা তাঁর উত্তরপুরুষ। অন্য মতে ধন্বন্তরীর জন্ম হয়

জনৈক মুনির বৈদিক মন্ত্র জপের মাধ্যমে খড়ের গাদা থেকে, তাই তিনি বৈদ্য নামে পরিচিত হন। যেহেতু তাঁর পিতা ছিল না এবং তিনি এক পালিকা মায়ের আদর-যত্নে বড়ো হন, সেহেতু তাঁকে বলা হয় ‘অম্বষ্ঠ’। বৈদ্য ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একটি মতও প্রচলিত আছে যে, অম্বষ্ঠ নামে সিন্ধুনদের তীরে একটি অঞ্চল ছিল। সেখান থেকে বৈদ্যদের একটি দল দক্ষিণ ভারতে এবং অপর দলটি বাংলায় আসেন।

(৫) চক্রবর্তী (পদবি) ব্রাহ্মণ : বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণদের কোনো পদবি ছিল না। ব্রাহ্মণরা সবসময়ই সদাচারী, সত্যান্বেষী এবং সৎ ছিলেন। ব্রাহ্মণদের পুজো অর্চনা, বেদপাঠ ও যোগসাধনা ছিল প্রধান কর্ম। তা ছাড়া ব্রাহ্মণরা শিক্ষানুরাগী ছিলেন। প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে শিক্ষার গুরু দ্বায়িত অর্পিত ছিল ব্রাহ্মণদের উপর, তাই টোলের শিক্ষকতা ছিল তাঁদের অন্যতম পেশা। ব্রাহ্মণরা নিজেদের সংকল্পার্থে নিজিদের পদবি ‘দেবশর্মা ব্যবহার করতেন। কালক্রমে পুন্ড্র শাসন ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণদের ‘আচার্য’ বা ‘শাস্ত্রী’ উপাধি প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ‘দেবশর্মা’ পদবিটি হারাতে বসে। পাল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ধর্মপালের শাসনকালে বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রাহ্মণদের মধ্যে অনেকেই রাজকার্যে যোগদান করেন। তাই ব্রাহ্মণদের সম্রাট হিসাবে ‘চক্রবর্তী’ পদবির উদ্ভব হয়। চক্রবর্তী শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। চক্রবর্তী শব্দের অর্থ সম্রাট। চক্রবর্তীর ভাবার্থ হচ্ছে রাজ্যাধিপতি, অর্থাৎ রাজার রাজা। সহজভাবে বলতে গেলে চক্র অর্থ হচ্ছে ‘চাকা’ এবং বর্তী অর্থ হচ্ছে ‘সুশাসন’ চালিয়ে যাওয়া।

(৬) রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ : চোলরাজা দেবেন্দ্রবর্মনের ছয় শতকের শিলালিপিতে উত্তর রাঢ় সম্পর্কে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। রাঢ়ের এ অংশটিকে রাজেন্দ্র চোলের এগারো শতকের তিরুমুলাই শিলালিপিতে সুস্পষ্টরূপে একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক এলাকা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোজবর্মনের বেলাভ তাম্রলিপিতে উত্তর রাঢ়ের সিদ্ধলা গ্রামকে ভট্টভবদেবের জন্মস্থান হিসাবে নির্দেশ করা হয়েছে। সিদ্ধলাকে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বীরভূম জেলার সিদ্ধলা গ্রামের সঙ্গে এবং নৈহাটি লিপিতে উল্লিখিত বল্লহিহ গ্রামকে বর্ধমান জেলার উত্তর প্রান্তের বালুটিয়ার সঙ্গে শনাক্ত করা হয়েছে। শাণ্ডিল্য গোত্রীয় বন্ধ্যঘাটি গ্রামবাসী, কাশ্যপ গোত্রীয় চট্টগ্রামবাসী, ভরদ্বাজ গোত্রীয় মুখুটিগ্রামী, সাবর্ণী গোত্রীয় গাঙ্গুলি ও কুন্দলাল গ্রামী এবং বাৎস্য গোত্রীয়, ঘোষাল, কাঞ্জিলাল এবং পুতিতুন্ড– এই আট গ্রামীরা রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ।

(৭) বারেন্দ্রীয় কুলীন ব্রাহ্মণ : বরেন্দ্রভূমির নামকরণের পিছনে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। বর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে আশীর্বাদ এবং ‘ইন্দ্র’ শব্দের অর্থ দেবতাদের রাজা। অর্থাৎ ইন্দ্রের বর বা ইন্দ্রের আশীর্বাদ থেকে যে রাজার জন্ম। ‘অদ্ভুৎসাগর’ গ্রন্থে রাজা বরেন্দ্রসেনে এর উল্লেখ আছে, ইন্দ্রের বরে যাঁর জন্ম (পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে) এবং তাঁর রাজ্যটি বরেন্দ্র নামে পরিচিত ছিল। বরেন্দ্রসেন পালরাজা গোপালের সমসাময়িক ছিলেন। সমস্ত বাংলা বৌদ্ধ অধ্যুষিত ছিল, কিন্তু এই রাজ্যটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। সামন্ত রাজারা একজন রাজাকে মহারাজা হিসাবে নির্বাচন করতে সভা করেন। পরাক্রমশালী রাজা বরেন্দ্রসেন যোগ্য হলেও হিন্দু হওয়ায় বৌদ্ধ সামন্তরাজারা তাঁকে নির্বাচন না করে গোপালকে মহারাজা নির্বাচন করেন। কিন্তু সেনরাজারা নিজেদের শক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি করে পাল সাম্রাজ্যকে নিজেদের হিন্দু সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। বৌদ্ধদের পুনরায় হিন্দু সংস্কারে ফিরিয়ে এনে বর্ণ-কৌলিন্য সংস্কার করেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্রাহ্মণ ডেকে আনে। এই কাহিনির অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, বরেন্দ্রভূমি ইন্দ্রের পক্ষ থেকে আশীর্বাদস্বরূপ। কৌলিন্য বিচারে সেনরাজারা কুলশ্রেষ্ঠ রাজন্য-ব্রাহ্মণ ছিলেন। রামায়ণ ও মহাভারত গ্রন্থদ্বয়ে বরেন্দ্রভূমিকে ‘পুন্ড্র’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। পুন্ড্র অঞ্চলে বসবাসকারী ব্রাহ্মণ লাহিড়ী, সান্যাল, সরখেল, মৈত্র ও ভাদুড়ী পদবি ব্যবহার করেন।

প্রথম যে ব্রাহ্মণগোষ্ঠী বাংলায় ঘাঁটি গেড়েছিল, তাঁরা খ্রিস্টীয় পঞ্চম/ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারত থেকে এসেছিল। মধ্যদেশ থেকে ব্রাহ্মণদের এই আগমন ধারা অব্যাহত ছিল। অষ্টম শতাব্দী থেকে ব্রাহ্মণ অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়তে থাকল। ব্রাহ্মণরা উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে এসেছিল। এমনকি গুজরাটের লাত অঞ্চলের মতো দূরের দেশ থেকেও আসত। সেসময় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পালরাজারা বাংলা শাসন করতেন। এইসব ব্রাহ্মণরা এসে পালরাজাদের শাসনবিভাগের উচ্চবিভাগে নিযুক্ত হত। এইসব ব্রাহ্মণরা বহিরাগত ছিলেন বলেই হয়তো তাঁরা বেশি মান্যতা পেত। এইসব ব্রাহ্মণদের যাবতীয় বিবরণ আমরা কুলজি গ্রন্থগুলি থেকে পেতে পারি। এখানেই আছে বাংলার ব্রাহ্মণদের বংশবৃত্তান্ত। যেমন– ধ্রুবানন্দ মিশ্রের ‘মহাবংশাবলী’, নুলো পঞ্চাননের ‘গোষ্ঠীকথা’, বাচস্পতি মিশ্রের ‘কুলরাম’, ধনঞ্জয়ের ‘কুলপ্রদীপ’, হরি মিশ্র ও এড় মিশ্রের ‘কারিকা’, সর্বানন্দ মিশ্রের ‘কুলতত্ত্বার্ণব’, বরেন্দ্র কুলপঞ্জিকা ইত্যাদি। তবে কুলজি গ্রন্থগুলির লেখকরা যেসব বর্ণনা করেছেন, তা প্রায়ই পরস্পরবিরোধী ও অসংগতিতে পূর্ণ। আদিশূরের কাহিনি ছাড়া কোনো তথ্যের সঙ্গে কোনো তথ্য মেলে না। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন আদিশূরের কাহিনির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। সমসাময়িক কোনো পুথিপত্র ও লেখমালাতেও আদিশূর নামে কোনো রাজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিক নৃপেন্দ্রকুমার দত্ত বলেছেন, আদিশূরের কাহিনি কল্পিত ও বিভিন্ন টুকরো টুকরো অংশ জোড়াতালি দিয়ে পরে রচিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, এই কাহিনির ঐতিহাসিকতা নিয়ে এতটাই সন্দেহের অবকাশ আছে যে, এটাকে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের উপাদান হিসাবে একেবারেই গ্রহণ করা যায় না।

কুণাল চক্রবর্তী তাঁর ‘বহিরাগত’ প্রবন্ধে লিখেছেন– “মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলায় ব্রাহ্মণদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কয়েকটি তথ্য অনস্বীকার্যভাবে উঠে আসে। প্রথম, বাংলায় ব্রাহ্মণরা বহিরাগত। দ্বিতীয়, এদের অধিকাংশেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা যথেষ্ট ছিল না। তৃতীয়, এদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্নতা এতই ব্যাপক ও প্রকট ছিল যে এদের ব্রাহ্মণ– এই একটিমাত্র অভিধায় চিহ্নিত করাই কঠিন ছিল। তবু ব্রাহ্মণরা বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয়-সামাজিক জীবনে দীর্ঘদিন তাঁদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন। তা কী করে সম্ভব হয়েছিল, সেই ইতিহাস অনুসন্ধানের সময় এসেছে।”

যাই হোক, ব্রাহ্মণ হল হিন্দু বর্ণচতুষ্টয়ের প্রথম এবং উচ্চতম বর্ণ। হিন্দুধর্মানুসারে এই বর্ণজাত ব্যক্তিগণই সমাজে শিক্ষক, আধ্যাত্মিক গুরু, শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত এবং বিধানকর্তার ভূমিকা পালন করার অধিকারপ্রাপ্ত। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি মনে করেন, “সেই চরম সম্মানের জায়গাটা তাঁদের নির্ভুল বেদমন্ত্র উচ্চারণের মাহাত্ম্য থেকেও আসেনি, যাগযজ্ঞের আড়ম্বরে একটা মহান গভীরতা তৈরি করে সমাজকে ম্যাজিক দেখিয়েও এই সম্মান আসেনি। এই সম্মান এবং এই ব্রাহ্মণ্য ভারতবর্ষের সর্বোত্তম শিক্ষালাভের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল এবং সেই শিক্ষাও এসেছে ত্যাগ-বৈরাগ্য-তপস্যার চরম অনুশীলন থেকে।” শাস্ত্রানুসারে ব্রাহ্মণকুলজাত ব্যক্তিগণ বিপ্র (অর্থাৎ জ্ঞানী) এবং দ্বিজ (অর্থাৎ দু-বার জাত) হিসাবেও অভিহিত হয়ে থাকেন। ব্রাহ্মণ শব্দটা এসেছে ব্ৰহ্ম থেকে,এক অর্থে, যার রয়েছে ব্রহ্মজ্ঞান সেই ব্রাহ্মণ। বর্ণপ্রথা পাকাঁপোক্ত হয়ে সনাতন ধর্মে চেপে বসার আগে মন্ত্র রচনা করে ব্রাহ্মণ হতে পারতেন যে কেউ। এমনকি জন্মসুত্রে ব্রাহ্মণরা উপাসনার দায়িত্ব ছেড়ে বেছে নিতে পারত অন্য যে-কোনো পেশাও। মহাভারতের বশিস্ট তীর্থ, অর্ধকীল তীর্থ, বিশ্বামিত্র নামক তীর্থস্থানে গেলে ব্রাহ্মণ হতে পারে যে কেউ। পুরাণ মতেও ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত হলেই কেবল ব্রাহ্মণত্ব অর্জিত হয়। ঋগ্বেদের দশম মন্ডলে নববই সংখ্যক পুরুষসূক্তের বর্ণনা অনুসারে ব্রাহ্মণের জন্য পুরুষের (স্রষ্টার) মুখ থেকে। মহাভারতের শান্তিপর্বে উল্লিখিত হয়েছে যে, ব্রহ্মা প্রথমে সমগ্র জগৎ ব্রাহ্মণময় করেছিলেন, পরে কর্মানুসারে সকলে নানা বর্ণত্ব প্রাপ্ত হয়; কেউ হয় ব্রাহ্মণ, কেউ ক্ষত্রিয়, কেউ বৈশ্য এবং কেউ বা শূদ্র। মহাভারতে আরও বলা হয়েছে। যে, যিনি সদাচারী ও সর্বভূতে মিত্রভাবাপন্ন, যিনি কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ ত্যাগ করেছেন, যিনি সন্তোষকারী, সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয় ও শাস্ত্রজ্ঞ, তিনিই ব্রাহ্মণ; অর্থাৎ গুণ ও কর্মানুসারে ব্রাহ্মণাদি চতুর্বর্ণের সৃষ্টি, জন্মানুসারে নয়। পরবর্তীকালে অবশ্য জন্মসূত্রে বর্ণ নির্ধারণ-ব্যবস্থা প্রচলিত হয়। ব্রাহ্মণদের মধ্যে নানা শ্রেণিভেদ আছে। অনেকের মতে এই শ্রেণির সংখ্যা ২০০০। এক সারস্বত ব্রাহ্মণদের মধ্যেই ৪৬৯টি শাখা আছে। শ্রেণি অনুযায়ী ব্রাহ্মণদের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয়। বাংলায় আচার্য বা গণক এবং শাকদীপি ব্রাহ্মণেরা পতিত বলে গণ্য হয়। নিম্নবর্ণের পৌরোহিত্য করে বলে বর্ণ ব্রাহ্মণরাও পতিত। তেমনি অগ্রদানী, ভাট ও পিরালি ব্রাহ্মণরাও সমাজে হীনরূপে দেখা হয়। বাংলার বাইরে মন্দিরের পূজারী হওয়ার জন্য তামিল ও কর্ণাট ব্রাহ্মণরা সমাজে অপাঙক্তেয়। নাম্বুদ্ৰী ব্রাহ্মণরা সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। নৃতাত্ত্বিক বিচারে বাংলার ব্রাহ্মণদের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ব্রাহ্মণদের মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। সবচেয়ে বড়ো অমিল বাংলার ব্রাহ্মণরা আমিষাশী, বাংলার বাইরের ব্রাহ্মণরা নিরামিষাশী। বাংলার ব্রাহ্মণরা খুব কম সংখ্যকই আর্য বংশোদ্ভূত। তাঁরা চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকে বাংলায় আসেন এবং তাঁদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি করে। তবে পাল আমলে বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া এবং যাগ-যজ্ঞ ভুলে যাওয়ার ফলে তাঁদের পতিত ও শাস্ত্র অনুযায়ী শূদ্রে পরিণত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। মধ্যযুগীয় সমাজে ব্রাহ্মণরা সকল বর্ণ বা সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে জল গ্রহণ করত না। তবে তিলি, তাঁতি, মালাকার প্রভৃতি মাত্র নয়টি সম্প্রদায়ের হাত থেকে জলগ্রহণের রীতি চালু ছিল। ধর্মশাস্ত্রে ব্রাহ্মণদের অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে–

(১) ব্রাহ্মণ গুরু এবং সকলের কাছে শ্রদ্ধেয় ও প্রণম্য।

(২) তারা অপর জাতির কর্তব্য নির্ধারণ করবে।

(৩) রাজা সকলের প্রভু কিন্তু ব্রাহ্মণের প্রভু নয়।

(৪) বেত্রাঘাত, বন্ধন, অর্থদণ্ড, নির্বাসন, বাকদণ্ড এবং পরিত্যাগ– এই ছয় প্রকারের সাজা ব্রাহ্মণকে দেওয়া যাবে না।

(৫) শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণরা করমুক্ত।

(৬) তাঁদের ঘরে গুপ্তধন পাওয়া গেলেও রাজা তার সবটাই গ্রহণ করতে পারবে না।

(৭) আগে যাওয়ার জন্য তাকে পথ ছেড়ে দিতে হবে।

(৮) অন্য বর্ণের তুলনায় ব্রাহ্মণরা লঘুদন্ড পাবে।

(৯) তাকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা যাবে না।

(১০) তারা মৃতাশৌচ পালন করবে দশদিন।

(১১) তারা সুদ গ্রহণ করতে পারবে না।

(১২) আপদকালে তারা বৈশ্যদের বৃত্তি গ্রহণ করতে পারবে, প্রভৃতি।

পূজার্চনাসহ হিন্দুদের যে-কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করা ব্রাহ্মণদের একটি সাধারণ পেশা। তবে বর্তমানে শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যাবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তাঁরা অন্যদের চেয়ে অগ্রগণ্য। যদিও ব্রাহ্মণদের যজমানি করা ছাড়া অন্য পেশা গ্রহণ করার অধিকার শাস্ত্র দেয়নি।

সাধারণত বঙ্গীয় ব্রাহ্মণগণ সুশিক্ষিত পণ্ডিত হয়ে থাকেন এবং কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব বঙ্গীয় ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেছেন। কলহণ বিরচিত ‘রাজতরঙ্গিণী’-র শ্লোকানুসারে ব্রাহ্মণগণ মূলত পঞ্চ-গৌড় এবং পঞ্চ-দ্রাবিড়, এই দুই ভাগে বিভক্ত। কলহন কর্তৃক রচিত শ্লোকটি উল্লেখ করা হল–

“কর্ণাটকাশ্চ তৈলঙ্গা দ্রাবিড়া মহারাষ্ট্রকাঃ, গুর্জরাশ্চেতি পঞ্চৈব দ্রাবিড়া বিন্ধ্যদক্ষিণে।
সারস্বতাঃ কান্যকুজা গৌড়া উৎকলামৈথিলাঃ, পঞ্চগৌড়া ইতি খ্যাতা বিনেস্যাত্তরবাসিনঃ।।”

ব্রাহ্মণের মর্যাদাই-বা কতটা– এ ব্যাপারে ‘মনুসংহিতা’-য় মনু পরিষ্কারভাবে বলেছেন —

(১) “ভূতানাং প্রাণিনঃ শ্রেষ্ঠাঃ প্রাণিনাং বুদ্ধিজীবিনঃ।
বুদ্ধিমৎসু নরাঃ শ্রেষ্ঠা নরেষু ব্রাহ্মণাঃ স্মৃতাঃ।।”(১/৯৬)

অর্থাৎ, সৃষ্ট (স্থাবর জঙ্গমাদির মধ্যে) প্রাণী শ্রেষ্ঠ, প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিজীবীরা শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধিমানদের মধ্যে মানুষ এবং মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ বলে কথিত।

(২) “উৎপত্তিরেব বিপ্রস্য মূর্তিধর্মস্য শাশ্বতী।
স হি ধর্মার্থমুৎপন্নো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।”(১/৯৮)

অর্থাৎ, ব্রাহ্মণের দেহই ধর্মের সনাতন মূর্তি। তিনি ধর্মের জন্য জাত এবং মোক্ষলাভের যোগ্য পাত্র।

(৩) “ব্রাহ্মণো জায়মানো হি পৃথিব্যামধিজায়তে।
ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং ধর্মকোষস্য গুপ্তয়ে।।”(১/৯৯)

অর্থাৎ, জাতমাত্রেই ব্রাহ্মণ পৃথিবীতে সকল লোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হন এবং সকল সৃষ্ট পদার্থের ধর্মসমূহ রক্ষার জন্য প্রভু হন।

(৪) “সর্বং স্বং ব্রাহ্মণেসেদ্যং যৎকিঞ্চিৎজ্জগতীগতম।
শ্রৈষ্ঠ্যেনাভিজনেনেদং সর্বং বৈ ব্রাহ্মণোহহতি।।” (১/১০০)

অর্থাৎ, পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সেই সব ব্রাহ্মণের সম্পত্তি। শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য হেতু ব্রাহ্মণ এই সবই পাওয়ার যোগ্য।

(৫) “স্বমেব ব্রাহ্মণ্যে ভুঙতে স্বং বস্তে স্বং দদাতি চ।
আনৃশংস্যাদব্রাহ্মণস্য ভুঞ্জতে হীতরে জনাঃ।।”(১/১০১)

অর্থাৎ, ব্রাহ্মণ নিজের অন্নই ভক্ষণ করেন, নিজের বস্ত্র পরিধান করেন এবং নিজের দ্রব্য দান করেন। অন্য লোকেরা যা ভোগ করে, তা ব্রাহ্মণের দয়া হেতু

সেনযুগে ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। এই পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় বৌদ্ধদের বিলীন করে এবং বৌদ্ধদের অনুসরণ ও অনুকরণ করে। কথিত হয় যে, কর্ণাট থেকে পঞ্চ ব্রাহ্মণ এনে সেন রাজারা যজ্ঞক্রিয়া সম্পন্ন করেন। লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় ‘পঞ্চরত্ন’ নামে পরিচিত পঞ্চ ব্রাহ্মণ সংস্কৃত কবি ছিলেন। সেযুগের কবি-শাস্ত্রকারদের অধিকাংশই ছিলেন ব্রাহ্মণ; রাজপদোপজীবী ব্রাহ্মণ কর্মচারীর সংখ্যাও কম ছিল না। এ সময় সমাজে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য বিস্তৃত হয়। স্মৃতিশাস্ত্রের বিধি অনুযায়ী ব্রাহ্মণরা সমাজের বিধান দিতে থাকে। বল্লালসেন রাজ্যে কৌলীন্য প্রথা প্রচলন করেন। ব্রাহ্মণদের মধ্যে বন্দ্য (বন্দ্যোপাধ্যায়), চট্ট (চট্টোপাধ্যায়), মুখটী (মুখোপাধ্যায়), ঘোষাল, পুততুন্ড, গাঙ্গুলী (গঙ্গোপাধ্যায়), কাঞ্জীলাল ও কুন্দলাল হচ্ছে মুখ্য কুলীন। আর রাঢ়ী, গুড়, মহিন্ত, কুলভী, চৌতখন্ডী, পিপ্পলাই, গড়গড়ি, ঘণ্টাশ্বরী, কেশরকোণা, দিমসাই, পরিহল, হাড়, পিতমুন্ডী ও দীর্ঘতি গৌণ কুলীন হিসেবে পরিগণিত। কিংবদন্তি অনুযায়ী বল্লালসেনের আমলে কুলীন বলে স্বীকৃত হয় লাহিড়ী, বাগচী, মৈত্র, সান্যাল ও ভাদুড়ী এই পাঁচটি গোত্র।

বৌদ্ধমতে, ব্রাহ্মণ বলতে অনাসক্ত, রজঃমুক্ত, লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন এবং ব্রতপরায়ণ, শীলবান, বীতৃষ্ণ, সংযত ও অন্তিম দেহদারী ব্যক্তি ব্রাহ্মণ বলে কথিত হন। যিনি গৃহস্থ ও অনাগারিক উভয়ের প্রতি অসংশ্লিষ্ট, অল্পে ও আলয়বিহীন তিনিই ব্রাহ্মণ। বুদ্ধের জন্মের পূর্বে ভারতে ব্রাহ্মণেরা তাঁদের নিজ মাহাত্ম প্রচারছলে জাতি অভিমান প্রকাশ করত মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ। কিন্তু বুদ্ধের সঙ্গে তেবিজ্জের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, কেবল ত্রিবেদ জ্ঞাত হলে প্রকৃত ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করা যায় না। ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার জন্য অসমার্থক তর্ক ও বেদ, মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ভাবনা করা দরকার। যাঁরা এরূপ ভাবনার অধিকারী হয়ে অনাসক্ত নিষ্কলুষ, রজঃমুক্ত, লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন হয় এবং যিনি পাপ পঙ্কিল দুরতিক্রম্য মোহপূর্ণ সংসারাবর্ত মুক্ত হয়েছেন তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ। হিন্দুদের বিশ্বাস জাতি দ্বারাই প্রকৃত ব্রাহ্মণ অধিকারী হয় অর্থাৎ প্রকৃত ব্রাহ্মণ হতে হলে ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংম্বা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হতে হবে। কিন্তু বুদ্ধ মতে, ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংবা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হয়ে পাপ মল ত্যাগ না করলে তাঁকে প্রকৃত ব্রাহ্মণ বলা যাবে না। তাঁকে কেবল ব্রাহ্মণ বলে সম্বোধন করা যায়। বংশগৌরব অথবা উচ্চ বংশে জন্ম লাভ করেও শীল গুণে বিভূষিত না-হলে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারে না। বহুলোক নীচু কুলে জন্মগ্রহণ করেও শীলাচার সম্পন্ন হয়ে পরিশ্রমের দ্বারাই সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বর্গে গমন করতে পারে। তাই বুদ্ধ বলেছেন, জন্মের দ্বারা কেউ চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয় না, কর্মের দ্বারাই চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয়। যিনি বন্ধনমুক্ত কৃতঃকৃত্য অনাশ্রব, কামচিন্তা বিরহিত তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ নামের যোগ্য। ব্রাহ্মণ ধ্যানী, একক বিচরণশীল, বস্তুকাম ও ক্লেশকাম পরিহার করে চলেন। যিনি সর্ব সংযোজন ছিন্ন করে ভয়মুক্ত, অনাসক্ত, শৃংখলামুক্ত তিনিই তৃষ্ণাক্ষয়ী ব্রাহ্মণ। ক্রোধপূর্ণ, জটধারী, অজিনচর্ম পরিহিত ব্যক্তি ব্রাহ্মণের যোগ্য হতে পারে না। ক্রোধবিহীন, ব্রতপরায়ণ, শীলবান, সংযমী ও অন্তিম দেহদারী ব্যক্তি তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ বলে যোগ্য হন। যিনি গৃহস্থ ও অনাগরিক উভয়ের প্রতি অসংশ্লিষ্ট অল্পেচ্ছু ও আলয় বিহীন তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ। যিনি ছোট-বড় সর্বপ্রকার অদত্ত গ্রহনে বিরত, যাহার কোন প্রকার তৃষ্ণা বিদ্যমান নাই যিনি সংশয়মুক্ত ও নির্বাণ প্রাপ্ত তিনিই ব্রাহ্মণ। তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণেরা অভিমান বা অহংকার করে নিজের গৌরব করে বলত তারাই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে জাতি অভিমান ব্রাহ্মণের কাজ নয়। কারণ জাতি হিসেবে মানুষ সঙ্গে মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। তৎকালিন মানব জাতির মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শুদ্রের পদচিহৃ একই ধরনের। প্রাণীদের মধ্যে স্ত্রী, পুরুষ, বর্ণ, শারীরিক গঠন, লোম, চঞ্চু, প্রভৃতি পার্থক্য আছে। কিন্তু মানুষ মানুষে তেমন পার্থক্য দেখা যায় না। বুদ্ধ মতে, যে-কোন ব্যক্তি সকর্ম করলে ব্রাহ্মণের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন। সম্ভব ও কৃচ্ছসাধনের দ্বারা যে-কোনও লোক ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করতে পারেন। বনের প্রাণীরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। ঠিক তেমনি প্রকৃত শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ ধ্যানপরায়ণ হলে শোভা পায় এবং অনাসক্ত, নিষ্কলুষ, রজঃযুক্ত লোভ দ্বেষ-মোহবিহীন হয়। অবশ্য ২০০২ সালের ৫ অক্টোবর দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়টির কথাটি স্মর্তব্য। কেরালার আলাঙ্গাদ গ্রামের শিবমন্দিরে জন্মের ভিত্তিতে অব্রাহ্মন এক ব্যক্তিকে পুরোহিত করা নিয়ে স্থানীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের করা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি এস রাজেন্দ্র ও ডুরাই স্বামীর বেঞ্চ রায় দেয় যে যে-কোনও মন্দিরে যে-কোনও বর্ণ বা গোত্রের মানুষ পুজারী হতে পারবেন। কোর্ট আরও আদেশ দেয় যে “শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠানে অনভিজ্ঞ এবং শাস্ত্রজ্ঞানহীন অযোগ্য জন্মসুত্রে কোনো ব্রাহ্মণ বেদপাঠ করতে বা মন্দিরের পুজারী হতে পারবে না। সেখানে বলা হয় যে, “বেদপাঠ,শাস্ত্রজ্ঞান যে-কোনো সাধারণ হিন্দুর থাকলেই সে পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ হতে পারবেন। ভারতের সকল হিন্দু ধর্ম প্রতিষ্ঠান ও মন্দিরের ক্ষেত্রে এই আদেশ প্রযোজ্য হবে।” পবিত্র বেদ অনুযায়ী যে-কোনো কেউ-ই যদি শাস্ত্রপাঠের মাধ্যমে জ্ঞানী হতে পারে, তবে সে যজ্ঞ করতে সক্ষম। পবিত্র বেদের বর্ণাশ্রম কর্ম ও গুণভিত্তিক, জন্মভিত্তিক নয়। আর সেটাই আইন করে প্রতিষ্ঠিত করল দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট। আর এই রায়ের মাধ্যমে পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যবাদ ও মূর্খদের বর্ণপ্রথার দর্প চূর্ণ হল, বিজয় লাভ করল পৃথিবীর কোটি কোটি তথাকথিত দলিত, পদাহত, শূদ্র সনাতন ধর্মালম্বী মহৎ প্রাণগণ।

শাস্ত্র বলছে ব্রাহ্মণ-ঘরে জন্মালেই কেউ ব্রাহ্মণ হয়ে যায় না, যেমন মুসলমান ঘরে জন্মালেই কেউ মুসলমান হয় না। বিশেষ নিয়মের মধ্যে দিয়ে যেমন মুসলমান হতে হয়, তেমনই ব্রাহ্মণ হয়ে ওঠার জন্য বেশ কিছু নিয়ম করার বিধান দিয়েছে শাস্ত্র। বল্লালচরিত্র ধৃত পূর্ব খণ্ডের ১৩ অধ্যায়ে বলা হয়েছে–

“জন্মনা জায়তে শূদ্রঃ সংস্কারাদ্বিজ উচ্যতে।
বেদ পাঠী ভবেদ্বিপ্রঃ ব্রহ্ম জানাতি ব্রাহ্মণঃ।।”

অর্থাৎ, জন্মমাত্রেই সবাই শূদ্র। সংস্কারে দ্বিজ পদবাচ্য হয়। বেদ পাঠেই বিপ্র হন এবং ব্রহ্মকে জানলেই ব্রাহ্মণ পদবাচ্য।

ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত দশ প্রকার সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। যার একটি হল চূড়াকর্ম। চূড়াকর্ম বা চূড়াকরণ শ্রুতির বিধান অনুসারে ধর্মলাভের জন্য দ্বিজাতিগণের (ব্রাহ্মণ) উচিত এবং আবশ্যিক কর্ম। “চূড়া’ মানে শিখা বা টিকি। মনুর মতে শিশুর চূড়াকরণ বা প্রথম কেশচ্ছেদন/মস্তকমুণ্ডনের অনুষ্ঠান দুই সময়ে করা যায়। শিশুর এক বছর বয়সে বা তিন বছর বয়সে, এ বিষয়ে কোনো কঠোর বিধান নেই। কিন্তু “কুমারা বিশিখা ইব” এই বেদবচন অনুসারে চূড়াকরণ অবশ্য কর্তব্য। এই সংস্কারে শিখা বা টিকি রেখে মাথার অবশিষ্ট চুল কেটে ফেলা হয়, একে চৌলকর্মও বলে। এরপরের সংস্কারটি হল উপনয়ন, একেই পৈতে বা পইতা গ্রহণের অনুষ্ঠান বলে। ‘উপ’ মানে নিকটে বা কাছে এবং ‘নয়ন’ মানে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ বেদ শিক্ষার জন্য বালককে আচার্যের কাছে নিয়ে যাওয়ার অনুষ্ঠান। এটি হল দ্বিজাতির অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রারম্ভিক সংস্কার, এতে উপবীত বা যজ্ঞসূত্র ধারণ করতে হয়। বিধান অনুসারে ব্রাহ্মণদের আট বছর বয়সে, ক্ষত্রিয়দের এগারো বছর বয়সে এবং বৈশ্যদের দ্বাদশ বছর বয়সে উপনয়ন কর্তব্য। অবশ্য উপনয়নের ঊর্ধ্বসীমা ব্রাহ্মণের ষোলো বছর, ক্ষত্রিয়ের বাইশ বছর এবং বৈশ্যের চব্বিশ বছর নিদান আছে। শূদ্রের উপবীত ধারণের কোনো অধিকার নেই। ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের উপবীত ধারণের অধিকার দেওয়া হলেও আসলে উপবীত ধারণের অধিকারটা ব্রাহ্মণগণই আত্মসাৎ করে নিয়েছিল। কারণ ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কারোরই পূজা-পার্বণ করার অধিকার ছিল না, যাঁরা পূজা পার্বণ করার অধিকার কায়েম করলেন, তাঁদেরই পৈতে ধারণের প্রয়োজন হয়ে পড়ল, কারণ পূজা-পার্বণে পৈতার ভূমিকা সংযোজন করা হল। শাস্ত্রে আরও বলা হল ষোলো বছরে ব্রাহ্মণদের, বাইশ বছরে ক্ষত্রিয়দের এবং চব্বিশ বছরে যদি উপনয়ন সংস্কার না-হলে তাঁরা ব্রাত্য পরিগণিত হবে। ব্রাত্যরা আচার অনুষ্ঠানে কোনো অধিকার থাকে না। তাঁদের সঙ্গে ব্রাহ্মণদের অধ্যয়ন সংক্রান্ত এবং বৈবাহিক কোনো সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না। তবে হ্যাঁ, যথাবিধি প্রায়শ্চিত্ত করলে তবেই সমাজে তারা স্থান পায়। এইসব কথা অথর্ববেদের পঞ্চদশ কাণ্ডে বলা হয়েছে। আর-একটি সংস্কার হল কেশান্ত সংস্কার। ব্রাহ্মণাদি বর্ণের মধ্যে প্রচলিত এই প্রাচীন সংস্কারে উপনয়নের শেষ ঊর্ধ্বসীমায় চুল কাটা ও দাড়ি কামানোর অনুষ্ঠানই কেশান্ত সংস্কার। এই অনুষ্ঠানে গোরু দান করা হয় বলে আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্রে (১/১৮) একে গোদান বলা হয়েছে।

উপরে যে সংস্কারগুলি আলোচনা করা হল সেগুলি ব্রাহ্মণগণের অবশ্য কর্তব্য। এবার আমরা দেখে নেব ব্রাহ্মণগণের কর্ম-বিভাজনের কারণে শ্রেণি-বিভাজন।

(১) আচার্য : মনুর মতে যে ব্রাহ্মণ শিষ্যের উপনয়ন করিয়ে তাকে কল্প। (যজ্ঞবিদ্যা) ও রহস্য (উপনিষদ) সহ বেদ অধ্যয়ন করান তাকে আচার্য বলা হয় (যেমন –ভট্টাচার্য = ভট্ট + আচার্য)। কল্প ও রহস্যবিদ্যা না জানলে বেদাধ্যয়ন সম্পূর্ণ হবে না। তবে আগে শিষ্যকে উপনয়নের সময় সাবিত্রীমন্ত্র তার কানে কানে পড়বেন। ফলে সেই শিষ্যের দ্বিজাতিত্ব প্রাপ্তি ঘটবে। তখন সে বেদাধ্যয়ন করার অধিকার পাবেন। প্রায় সমস্ত স্মৃতিশাস্ত্রে এই কথা উল্লেখ আছে।

(২) উপাধ্যায় : মনুর মতে যে ব্রাহ্মণ জীবিকার জন্য বেদের অংশমাত্র বা বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করান তিনিই উপাধ্যায় (বন্দ্যোপাধ্যায় = বন্দ্য + উপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায় = মুখ + উপাধ্যায় ইত্যাদি)। সমগ্র বেদ নয়, বেদের অংশ যেমন– সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ প্রভৃতির যে-কোনো একটি। আর বেদাঙ্গ যেমন –শিক্ষা, নিরুক্ত, ব্যাকরণ, ছন্দ ও জ্যোতিষ, কল্প প্রভৃতি। উপাধ্যায়ও শিক্ষক, তবে আচার্যের থেকে কিছু পার্থক্য আছে। উপাধ্যায় অর্থের বিনিময়ে বেদের অংশ বা বেদাঙ্গ পড়ান। কিন্তু আচার্য কোনোরকম দক্ষিণা গ্রহণ করবেন না। তাই উপাধ্যায় অপেক্ষা আচার্য মান্যতর।

(৩) গুরু : মনুর মতে যে ব্রাহ্মণ শাস্ত্রের বিধান অনুসারে গর্ভাধান প্রভৃতি কর্ম সম্পাদন করেন এবং অন্নের দ্বারা প্রতিপালন করেন সেই ব্রাহ্মণ গুরু হিসাবে পরিগণিত হন। এখানে ‘নিষেক’ শব্দের দ্বারা দশবিধ সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, দশটি সংস্কারের মধ্যে গর্ভাধান অন্যতম। ভবিষ্যতের বা হবু পিতাই তাঁর পত্নীর জন্য এই সংস্কার সম্পাদন করেন। পিতাই অন্নের দ্বারা সন্তানদের প্রতিপালন করেন, ফলে পিতাই প্রকৃতপক্ষে গুরু।

(৪) ঋত্বিক : কোনো ব্যক্তি যাঁকে যজ্ঞের জন্য বরণ করে নেওয়ার তিনি ওই ব্যক্তির জন্য অগ্ন্যাধান, অর্থাৎ যজ্ঞকালে মন্ত্রসহকারে অগ্নি উৎপাদন ও স্থাপন, পাকযজ্ঞ এবং অগ্নিষ্টোম প্রভৃতি যজ্ঞ সম্পাদন করেন তাঁকে বলে। আচার্য প্রভৃতির মতো ঋত্বিকও যে সম্মানীয় তা দেখানোর জন্যই এই পদ। বৈদিক যজ্ঞে ঋত্বিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। মনুসংহিতায় দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৪৩ সংখ্যক শ্লোকে যে ঋত্বিকদের কথা বলা হয়েছে তিনি শুধু বৈদিক নন, স্মার্ত বা লৌকিক ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন করেন। গায়ত্রী মন্ত্র : যিনি যেই মুহূর্তে ব্রাহ্মণে উন্নীত হলেন, সেই মুহূর্ত থেকে তিনি প্রণব বা ওংকার এবং গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণের অধিকার অর্জন করলেন। উপনয়ন প্রাপ্ত ব্রহ্মচারীর কর্তব্য বিষয়ে উপদেশ দিতে গিয়ে মনু প্রণব বা ওংকার কথাটি ৭৬ সংখ্যক শ্লোকে বলেছেন, বেদপাঠের আগে ও পরে বেদপাঠার্থী শিষ্য প্রণব বা ওংকার উচ্চারণ করলে মনের একাগ্রতা, পবিত্রতা আছে। ওংকারহীন পাঠ কোনো কাজে আসে না। প্রণব বা ওংকারে আছে তিনটি অক্ষর। — ‘অ’, ‘উ’, ‘ম’– তিনটি অক্ষর মিলে উচ্চারণ হয় “ওঁ”– উচ্চারণ করলে ‘অউম’ হয়। গায়ত্রী মন্ত্রের তিনটি প্রয়োজনীয় বিভাগ আছে, সেগুলি হল –(ক) প্রণব বা ওংকার, (খ) ব্যাহতি এবং (গ) সাবিত্রী ঋক্‌। ব্যাহৃতি শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল– উক্তি, কথন, উচ্চারণ, বি-আ-হৃ + ক্তি = ব্যাহৃতি। ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ –এগুলি গায়ত্রী মন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত সাবিত্রী বচন, এগুলিকে ব্যাহৃতি বলে। অনেকে ব্যাহৃতি মানে শব্দ (word) বা স্থান বলেছেন। তিনটি ব্যাহৃতি-র মধ্যে ‘ভুঃ’ হল পৃথিবীলোক, অগ্নিদেবতা, ঋগ্বেদ ও প্রাণবায়ুস্বরূপ। ’ভুবঃ’ হল অন্তরিক্ষলোক, বায়ুদেবতা, সাম ও অপানস্বরূপ। স্বঃ হল দ্যুলোক, আদিত্যদেবতা, যজুঃ ও ব্যানবায়ুস্বরূপ। যেহেতু বেদ অধ্যয়নের আগে প্রণব, ভূঃ, ভুবঃ স্বঃ ব্যাহৃতি ও সাবিত্রী বা গায়ত্রী মন্ত্রপাঠ করতে হয়, সেহেতু এগুলিকে বেদের মুখ বা প্রবেশদ্বার বলা হয়েছে। ঋকের দেবতা সবিতা, কিন্তু মন্ত্রটি গায়ত্রী ছন্দে গ্রথিত। তাই সাধারণভাবে একে গায়ত্রী মন্ত্র বলা হয়। সাবিত্রী শব্দের দ্বারা গায়ত্রীকেই বোঝায়। সাবিত্রী হল ত্রিপাদযুক্ত গায়ত্রী মন্ত্র ব্রহ্মা ঋক্, সাম, যজুঃ– এই তিনটি বেদ থেকে গায়ত্রীর তিনটি পাদ –(ক) তৎসবিতুর্বরেণ্যং, (খ) ভর্গো দেবস্য ধীমহি, (গ) ধিয়ো যো নঃ প্রচোদ্দয়াৎ। অর্থাৎ প্রকাশমান (দেব) সবিতার সেই বরেণ্য তেজঃ (ভগ) আমরা ধ্যান করি, যিনি আমাদের বুদ্ধিসমূহকে প্রেরণ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় ওংকার (অ = ব্রহ্মা, উ = বিষ্ণু, ম = মহেশ্বর) এবং গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ করার অধিকার অব্রাহ্মণদের নেই, এ অধিকার শুধুমাত্র ব্রাহ্মণগণের। অবশ্য শাস্ত্রানুযায়ী বর্তমানে ‘ব্রাহ্মণ’ বলে যদি কোনো অস্তিত্ব থাকে! বেদ পাঠ তো দূরের কথা– ঋক্, সাম, যজুঃ বা সাম বেদ বেশিরভাগ ব্রাহ্মণগণ চোখেই দেখেননি। আর ব্রহ্মজ্ঞান? দেড় টাকা দিয়ে উপবীত বা পইতে পরে নিলেই ব্রহ্মজ্ঞান হয়ে যায় না। শাস্ত্রকার রঘুনন্দন বলেছেন– “বিপ্রাঃশূদ্র সমাচারাঃ ভবিষ্যন্তি কলিযুগে”। অর্থাৎ, “ভবিষ্যতে কলিযুগে বিপ্র এবং শূদর সবাই সমান আচার সম্পন্ন হবে”। তবে ‘ওঁ’ শব্দের পরিবর্তে অব্রাহ্মণগণকে সহজ মন্ত্র ‘নমঃ’ শব্দ উচ্চারণ করার ঢালাও অধিকার দেওয়া হয়েছে।

ভারতে কোন্ ব্রাহ্মণ কোথায় থাকতেন সেটা একবার দেখে নেব। মনুসংহিতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে ধর্মানুষ্ঠানের পক্ষে উপযুক্ত দেশরূপে ব্রহ্মাবর্তের কথা বলা হয়েছে–

(১) সরস্বতী এবং দৃষদ্বতী –এই দুটি দেবনির্মিত পবিত্র নদীর মধ্যবর্তী প্রদেশ ব্ৰহ্মাবর্ত বলে পরিচিত ছিল। এই স্থান ধর্মানুষ্ঠানের পক্ষে উপযুক্ত স্থান বলে কথিত। ব্ৰহ্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণগণ অধিক সংখ্যায় এই স্থানে বাস করতেন। এই ব্ৰহ্মাবর্তের ব্রাহ্মণাদি বর্ণের আচার-আচরণই মনু সদাচার বলেছেন।

(২) মনু কুরুক্ষেত্র, মৎস্য, পঞ্চাল ও শূরসেন– এই চারটি প্রদেশকে ব্রহ্মর্ষিদেশ বলা হয়েছে। উৎকর্ষের বিচারে ব্রহ্মাবর্তের পরেই ব্রহ্মর্ষিদেশ। ব্রহ্মর্ষিদেশের ব্রাহ্মণগণ পণ্ডিত, শাস্ত্রজ্ঞ, ধার্মিক এবং শ্রুতি ও স্মৃতি প্রতিপাদিত কর্মসমূহের অনুষ্ঠানে দক্ষ। তাই এঁদের কাছ থেকে অন্যান্য দেশের লোকেরা যথার্থ আচার-আচরণ শিক্ষা করবে।

(৩) মনু বলেন যে দেশে কৃষ্ণসার মৃগ স্বভাবত বাস করে অর্থাৎ যেখানে এইরকম মৃগ জোর করে অন্য জায়গা থেকে আনা হয় না বা এখানে কেউ কারোকে হিংসা করে না বলে কৃষ্ণসার মৃগ স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়, সেই দেশকে যজ্ঞীয় দেশ বলে। এবার দেখব উত্তরীয়, মেখলা, উপবীত, দণ্ড, ভিক্ষা প্রার্থনা ব্রাহ্মণ সহ বর্ণভেদে (শূদ্র ব্যতীত) কার কেমন (বিভাজন) হওয়া আবশ্যক।

উত্তরীয় : ব্রহ্মচারীর উত্তরীয় বা ঊধ্বসন হবে– ব্রাহ্মণদের কৃষ্ণমৃগের, ক্ষত্রিয়দের রুরু হরিণের এবং বৈশ্যদের ছাগের চামড়ায় তৈরি হবে। তেমনই অধোবসন হবে যথাক্রমে শণ, রেশম এবং পশমের তৈরি বস্ত্র পরিধান করবে।

মেখলা : ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচারীর মেখলা (কোমরবদ্ধ) হবে মুথা ঘাসের তৈরি, ত্রিগুণিত, সমান ও চিক্কণ। ক্ষত্রিয় ব্রহ্মচারীর মেখলা হবে তৈরি এবং ধনুকের গুণের মতো। বৈশ্য ব্রহ্মচারীর মেখলা হবে শণসূত্রে নির্মিত এবং ত্রিগুণিত (তিনটি সমান মোটা সুতোয় প্রস্তুত)।

উপবীত : ব্রহ্মচারীর উপবীত (পইতা) বাম কার্ধের উপর থেকে ডানদিকে ঝোলানো থাকবে এবং তিনটি সুতোর গোছায় তিন গোছা সুতোয় তৈরি হবে। অবশ্য ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যের ক্ষেত্রে সুতোর উপাদান হবে যথাক্রমে কাঁপাস, শণ ও পশম। অপরদিকে শরীরের যাজ্ঞাপবীতের অবস্থান অনুসারে ব্রাহ্মণদের তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।

(১) ব্রাহ্মণের উপবীত বাম কাঁধের উপর থেকে ডান হাতের নীচে পর্যন্ত ঝোলানো থাকলে তাঁকে উপবীতি বলে। কখন? দৈব কার্য ও যাজ্ঞ্যজ্ঞাদির সময় ব্যবহার হয়।

(২) ডান কাঁধ থেকে বাম হাতের নীচ পর্যন্ত উপবীত থাকলে প্রাচীনাবীতী বলে। কখন? পিতৃকার্যে বা শ্রাদ্ধাদিতে ব্যবহার হয়।

(৩) উপবীত গলায় হারের মতো লম্বমান থাকলে নিবীতী বলে। কখন? মনুষ্য কার্যের বা প্রাত্যহিক কাজের সময় ব্যবহার হয়।

দণ্ড : উপনয়নের পর ব্রহ্মচারীকে দণ্ড ধারণ করতে হয়। ব্রাহ্মণের দণ্ড হবে তার চুল পর্যন্ত লম্বা এবং বেল বা পলাশ কাঠের তৈরি। ক্ষত্রিয়ের দণ্ড হবে তার কপাল পর্যন্ত লম্বা এবং বট বা খয়ের কাঠের তৈরি। বৈশ্য ব্রহ্মচারীর দণ্ড হবে তার নাক পর্যন্ত লম্বা এবং পীলু বা ডুমুর কাঠের তৈরি। দণ্ডগুলি হবে সরল, অক্ষত, সুদর্শন, বল্কলযুক্ত এবং অগ্নিতে অদগ্ধ।

ভিক্ষা প্রার্থনা : উপনয়নের পর ব্রহ্মচারী দণ্ডধারণ ও অগ্নি প্রদক্ষিণ করে প্রথমে সে মা, বোন কিংবা মাসি অথবা এঁদের অভাবে যে তাকে অবজ্ঞা বা প্রত্যাখ্যান করবেন না এমন ব্যক্তির কাছে ভিক্ষা প্রার্থনা করবে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য ব্রহ্মচারী যথাক্রমে প্রর্থনা বাক্যে প্রথমে, মধ্যে ও অন্তে “ভবৎ” শব্দ গঠিত সম্বোধন পদ ব্যবহার করে ভিক্ষা প্রার্থনা করবে। হিন্দুসমাজে চতুর্বর্ণের সম্মান কাদের কোথায় দেখে নেব ছোট্টো করে। ধন, বন্ধু, বয়স, কর্ম ও বিদ্যা –এই পাঁচটি হল মান্যস্থান।

“বিত্তং বন্ধুয়ঃ কর্ম বিদ্যা ভবতি পঞ্চমী।
এতানি মান্যস্থানানি গরীয়ো য যদুত্তরম”।। (মনুসংহিতা ২/১৩৬)

এই পাঁচটির মধ্যে আগেরটির চেয়ে পরেরটি বেশি সম্মানযুক্ত। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য– এই তিন বর্ণের অন্তর্গত কোনো ব্যক্তির মধ্যে যদি ধন প্রভৃতি পাঁচটির আধিক্য ও উৎকর্ষ থাকে, তবে তিনি সকলের সম্মানের যোগ্য হবেন। কিন্তু শূদ্রের ক্ষেত্রে নব্বই বছরের বেশি বয়স হলে তিনিও সম্মানের যোগ্য হবেন। ব্রাহ্মণ বিদ্যার জন্য, ক্ষত্রিয় বীরত্বের জন্য, বৈশ্য ধনসম্পদের জন্য এবং শূদ্র বয়সে বড় হলেই শ্রেষ্ঠ হবেন। বুঝুন! শূদ্রের শুধু বয়সেই সম্মান, তাও আবার নব্বইয়ের অধিক হতে হবে। অর্থাৎ ধন, বন্ধু, কর্ম এবং বিদ্যার কোনো অধিকার নেই, অর্জন করলেও স্বীকৃতি নেই। মনুসংহিতায় মনুবাবু বলছেন, শূদ্রকে শিষ্য করবে না এবং শূদ্রের শিষ্য হবে না(মনুসংহিতা– ৩/১৫৬)। সে কারণেই দ্রোণ কর্তৃক নিষাদপুত্র একলব্যকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ হারিয়ে তুণ্ড হয়ে যেতে হয়, সে কারণেই রামচন্দ্র কর্তৃক শূদ্র শম্বুককে অকারণে (তপস্যা করার অপরাধে!) মৃত্যুবরণ করতে হয়। এ ঘটনা অস্বাভাবিক নয়, কেন-না এটা মনুসংহিতার মনুর নির্দেশ–

“নাবি স্পষ্ট মধীয়ীত ন শূদ্র জন সন্নিধ্য।
ন নিশান্তে পরিশ্রান্তো ব্রাহ্মাধীত্য পুনঃ স্বপেৎ”।

অবশ্য এক শ্রেণির ব্রাহ্মণগণ মিথ্যা একটা প্রচার চালালেন। ভাবটা এমন যেন তাঁরা কত উদার! কী বললেন? বললেন– শূদ্র যদি ব্রাহ্মণের বা ক্ষত্রিয়ের মতো কাজে পারদর্শী হয় তবে তাকে ব্রাহ্মণত্বে বা ক্ষত্রিয়ত্বে উন্নীত করা যাবে। কার্যে তার কোনো প্রমাণ আছে নাকি? বিশ্বামিত্রের কথা বলবেন বুঝি? প্রথমত বিশ্বামিত্র শূদ্রপুত্র নয়, ক্ষত্রিয়। দ্বিতীয়ত ক্ষত্রিয়রাজ বিশ্বামিত্রকে ক্ষমতায় রুখতে না-পারার কারণে ব্রাহ্মণগণ বাধ্য হয়েই ব্রাহ্মণ বলে মেনে নিয়েছিলেন। যে ব্রাহ্মণগণ মনুসংহিতা রচনা করে–

“সহাসনমভিপ্রেক্ষ্ণরুকৃষ্টস্যাপকৃষ্টজঃ।
কট্যাং কৃতাঙ্কো নিৰ্বাস্যঃ স্কিচং বাস্যাব কৰ্তয়েৎ”

অর্থাৎ ব্রাহ্মণেতর অধম জাতি যদি ব্রাহ্মণের সঙ্গে একাসনে উপবেশন করে তবে রাজা ওই তার কটিদেশে গরম লোহার দাগ দিয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত করবেন অথবা যেন না মরে এমনভাবে তার পাছা কেটে দেবে।

বলেন সেই ব্রাহ্মণগণ মঙ্গলদায়ক আর কী করতে পারে! অব্রাহ্মণ শিক্ষকতা করলেও সে অব্রাহ্মণই থাকে, তাকে কেউ ব্রাহ্মণ বলে অতিরিক্ত সম্মান করে না। কারণ ‘মনুস্মৃতি’ নিদান দিয়ে দিয়েছেন —

(১) ১০ বছরের ব্রাহ্মণ এবং ১০০ বছরের এক ক্ষত্রিয়ের সম্পর্ক যদি পিতা-পুত্র হয়, তাহলে এদের মধ্যে ব্রাহ্মণ হচ্ছে পিতা।

(২) একজন ব্রাহ্মণের গৃহে কোনো ক্ষত্রিয়, বৈশ্য অথবা শূদ্রকে অতিথি বলা যাবে না। একজন ব্রাহ্মণের গৃহে শুধু ব্রাহ্মণেরই অতিথি হওয়ার অধিকার আছে।

(৩) একজন ব্রাহ্মণ নিশ্চিন্ত মনে একজন শূদ্রের জিনিস নিয়ে নিতে পারে, কারণ শূদ্রের নিজের বলে কিছুই নেই।

মনুসংহিতায় শ্রীমান মনু বলছেন, কারা কাদের পিতা ব্রাহ্মণ হলেও কে ব্রাহ্মণ নয়। যিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ হয়েও আচার-আচরণে ব্রাহ্মণ নন, তাঁরা ব্রাহ্মণব্রুব হিসাবে পরিগণিত হবেন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য বর্ণের কোনো বালকের উপনয়নের বয়সের ঊর্ধ্বসীমা যথাক্রমে ষোলো, বাইশ এবং চব্বিশ বছর অতিক্রম করে গেলেও যদি তার উপনয়ন সংস্কার অনুষ্ঠিত না-হয় সে ব্রাত্য হিসাবে চিহ্নিত হয়। এই ব্রাত্যদের কোনো ব্রাহ্মণের সঙ্গে যাজন, অধ্যাপনা প্রভৃতি বেদসম্বন্ধ ছিল না এবং সংশ্লিষ্ট বর্ণের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কও নিষিদ্ধ ছিল। অবশ্য শাস্ত্র বলছে মূর্খ ব্রাহ্মণগণ শূদ্রের অধম। অতএব সাধু সাবধান! মূর্খ ব্রাহ্মণগণ দূর হোঠো। নারায়ণ-শিলা স্পর্শ করবেন না।

তাহলে এই যে এত এত ব্রাহ্মণ সৃষ্টি হল কিংবা সৃষ্টি করা হল ভারতে, তাতে কার কী কাজে লাগল, তারাই-বা কী করল সমাজে, কী রাখল সমাজে? মনুসংহিতা’-য় মনু ব্রাহ্মণদের জন্য বললেন —

“অধ্যাপনমধ্যয়নং যজনং যাজনং তথা।
দানং প্রতিগ্ৰহঞ্চৈব ব্রাহ্মণানামকল্পয়ৎ”। (১/৮৮)।

অর্থাৎ, ব্রাহ্মণদের জন্য সৃষ্টি করলেন অধ্যাপনা, অধ্যয়ন, যজন, যাজন, দান, প্রতিগ্রহ।

ব্রাহ্মণগণের আশ্চর্যজনক এবং অদ্বিতীয় আবিষ্কার ঈশ্বর বা দেবতা বা ভগবান। এটাই ব্রাহ্মণগণের একমাত্র পুঁজি বা মূলধন। এবং ঈশ্বরকে সামনে রেখে স্বর্গ নরক, পাপ-পূণ্য, আত্মা, ইহকাল-পরকাল, জন্মান্তর, কর্মফল ইত্যাদি মানুষের জীবন-মরণের সঙ্গে সংযোজন করে দিলেন। সাধারণ মানুষের মনে কোনো অদৃশ্য শক্তির ধারণাটা ছিলই, সেই সভ্যতার ঊষাকাল থেকে। কীভাবে এই ধারণা জন্মালো? বিধ্বংসী ঝড়, অনর্গল ভারী বর্ষণ, কড়কড়িয়ে মরণ বজ্রপাত, মুহুর্মুহু বিদ্যুতের ঝলকানি, নিথর মৃত-শরীর, দাবানল, প্লাবনই মানুষের মনে দানা বেঁধেছে কোনো অদৃশ্য শক্তির। প্রাকৃতজনের দেবদেবীদের উৎপত্তিস্থল ভীতি। তাই মনসা, চণ্ডী, শিব, ষষ্ঠি ইত্যাদি দেবদেবীদের জন্ম। তুর্কি আক্রমণের পরবর্তী সময়ে উন্নাসিক ব্রাহ্মণরা নীচু শ্রেণির মানুষদের সঙ্গে মেলবন্ধনের প্রয়োজন উপলব্ধি করেন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। তাই বৈদিক দেবদেবীদের সঙ্গে লৌকিক দেবদেবীদের একটা মনগড়া যোগ কল্পনা করে সংস্কৃত ছেড়ে লৌকিক ভাষায় মন্ত্র রচনায় মনোনিবেশ করেন।

দক্ষিণ রায়, বনদেবী, মারাংবুরু, ভাদু, টুসু, ইতু, মনসা, ওলাউঠা, শীতলা প্রভৃতি লৌকিক দেবতাগণও পেলাম কালে কালে, বিভিন্ন সময়ে। বেদের যুগে অগ্নি, বরুণ, ইন্দ্রও লৌকিক দেবতা। এমনকি বেদের যুগের আগেও পশুপতি (যা পরে ব্রাহ্মণগণ আত্মসাৎ করে শিব তথা মহেশ্বরে রূপান্তরিত করে নেয়) লৌকিক দেবতা। লক্ষ করুন এই দেবতারা ব্রাহ্মণদের সৃষ্ট দেবদেবী নয়, সাধারণের আত্মীয়। সংস্কৃত মন্ত্র নেই, ব্রাহ্মণ-পুরোহিত নেই। এই দেবতারা শান্ত, নরম, সন্তানসম, আদরের। ব্রাহ্মণদের দেবতারা ক্ষতিকর, হিংস্র, ত্রাস সৃষ্টিকারী, অসহিসষ্ণু, কামুক, কামার্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ, ছিদ্র অন্বেষক– দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনের নামে খুনোখুনি করে। এরা নরকের ভয় দেখায়, স্বর্গের লোভ দেখায়।

এ ছাড়া মানুষ যা যা করতে অক্ষম, ঈশ্বরের মধ্যে সেই গুণগুলিই আরোপিত হয়েছে। এর থেকেই স্পষ্ট যে মানুষের দুর্বলতা এবং অসহায়তাই ঈশ্বরের আঁতুরঘর। লক্ষ করুন, এইসব প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি সবই উপরের শূন্য থেকে মানে আকাশ থেকেই পতন হয়। অর্থাৎ এইসব অঘটনের ধারণা হল স্রষ্টা আকাশেই থাকেন এবং অবশ্যই নিরাকার। সে কথা লিপিবদ্ধ হল হিন্দুদের প্রধান এবং একমাত্র ধর্মগ্রন্থ বেদে। বেদে আমরা ঈশ্বরের নিরাকার রূপই পাই। একমেবাদ্বিতীয়। ঈশ্বর এক বেদে বর্ণিত বেশিরভাগ দেবতাকল্পই প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেবতা (অগ্নি আগুনের দেবতা, বরুণ বৃষ্টির দেবতা, ইন্দ্ৰ বজ্রের দেবতা ইত্যাদি। ) এবং এরা বেদের যুগে কেউ কেউ পুজো পেলেও পুরাণোত্তর যুগে ব্রাত্য হয়েছে। সে কথায় পরে আসছি। আগে দেখে নেব বেদে বর্ণিত দেবতা কারা।

শতপথ ব্রাহ্মণ (১৪.৫)-এ যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি শাকল্যকে বলছেন– দেব ৩৩টি যা পরমেশ্বরের মহিমার প্রকাশক। ৮ বসু, ১১ রুদ্র, ১২ আদিত্য, ইন্দ্র, প্রজাপতি। শতপথ ব্রাহ্মণ, মনুসংহিতা ও বৃহদারণ্যক উপনিষদে এর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে– বিদগ্ধ শাকল্য যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞেস করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব (শক্তি) কয়টি? যাজ্ঞবল্ক্য বললেন ৩৩টি। তখন শাকল্য আবার বললেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন তিনি আবার বললেন ৬টি। শাকল্য আবার বললেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দিলেন ৩টি। আবার শাকল্য জিজ্ঞেস করায় তিনি উত্তর দিলেন দুইটি। তখন শাকল্য আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন দেড়টি। শাকল্য আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন তিনি বললেন একটি! তখন শাকল্য জিজ্ঞেস করলেন, এই ৩৩টি দেব কী? যাজ্ঞবল্ক্য বললেন ৮ বসু যা হল অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরিক্ষ, আদিত্য, দ্যৌ, চন্দ্র, নক্ষত্র, ১১ রুদ্র যা হল প্রাণ (নিঃশ্বাস), অপান (প্রশ্বাস), ব্যন, সমান, উদাম, নাগ, কুৰ্ম্ম, কৃকল, দেবদত্ত, ধনঞ্জয় এবং জীবাত্মা, ১২ আদিত্য হল ১২ মাস, ইন্দ্র, প্রজাপতি অর্থাৎ মোট ৩৩টি। ইন্দ্র হল বিদ্যুৎ আর প্রজাপতি হল যজ্ঞ (যে কোনো শুভ কর্ম )। তখন শাকল্য আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে ৬টা দেব কী কী? তখন তিনি। উত্তর দেন– অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরিক্ষ, আদিত্য, দ্যুঃ। তখন তিনি বললেন, তাহলে ৩টি দেব কী? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, তিনলোক (ভ, দ্যু, অন্তরিক্ষ)। তারপর শাকল্য আবার বললেন, সেই দুইটি দেব কী কী,? খাদ্য এবং প্রাণ– উত্তর দিলেন যাজ্ঞবল্ক্য। তখন আবার শাকল্য জিজ্ঞেস করলেন, সেই দেড়টি কী? তখন যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দিলেন যিনি প্রবাহিত হন। তখন শাকল্য বললেন সেই এক এবং অদ্বিতীয় যিনি প্রবাহিত হন তাঁকে আপনি কীভাবে দেড় বললেন? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন যখন তা প্রবাহিত হয় তখনই সবকিছু উৎপন্ন হতে শুরু করে। তাহলে কে সেই এক? প্রাণ! হ্যাঁ প্রাণ (পরমাত্মা) সেই এক এবং অদ্বিতীয় দেব যাকে সবাই তৎ বলে জানে।”

অসাধারণ এই শৈল্পিক ও গভীর দার্শনিক কথোপকথন ব্যখ্যা করছে সেই এক এবং অদ্বিতীয় পরব্রহ্ম থেকে সবকিছু উৎপন্ন হতে শুরু করে। একে একে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য, ভু, দ্যু এবং অন্তরীক্ষলোক, বিদ্যুৎশক্তি সবকিছুই তার থেকে তৈরি হয় যাদেরকে ৩৩টি ভাগে ভাগ করা হয় এবং এদেরকে বলা হয় দেব অর্থাৎ শক্তি। আর দিন শেষে শক্তি একটাই যা থেকে সকল কিছু আপাতশক্তিপ্রাপ্ত হয়। আর এই শক্তিই এক এবং অদ্বিতীয় পরমাত্মা।

কী বুঝলেন? আপনি যাই-ই বুঝুন, অবশেষে ব্রাহ্মণগণ বুঝলেন বেদের দেবতাদের খাঁটিয়ে ধান্ধাপানি করা এক্কেবারেই অসম্ভব। অতএব বিকল্প পথের খোঁজে ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক রচিত হল ১৮টি মহাপুরাণ, ১৮টি উপপুরাণ এবং অবশ্যই মনুসংহিতা। এই গ্রন্থগুলির মূল উপজীব্য বিষয় ক্ষত্রিয়-ইতিহাস সংরক্ষণ, ব্রাহ্মণগণের চরম আধিপত্য বিস্তার এবং অবশ্যই রগরগে আদিরসাত্মক ভরপুর কাহিনি (ঈশ্বরিক নয়, মানবিক বৈশিষ্ট্যের সবকটি দোষগুণই প্রকট হয়েছে কাহিনির পরতে পরতে। মানবজাতির সবরকম অবদমিত ইচ্ছা পুরাণগুলিতে লিপিবদ্ধ হয়েছে)। সেই থেকেই ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়ের গাঁটছড়া। অর্থাৎ রাজনীতি আর ধর্মের সহবাস আদিকাল থেকেই। একে অপরের পরিপূরক। একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ধর্ম ছাড়া রাজনীতি অচল, রাজনীতি ছাড়া ধর্ম অচল। পতাকার রং যাই-ই হোক, ধর্মই তাঁদের তুরুপের তাস।

বেদ এবং উপনিষদে একেশ্বরবাদ বর্ণিত হলেও পুরাণে যেন দেবতাদের মিছিল চলতে লাগল। কাড়ি কাড়ি দেবতা। দেবতার দেবতা এবং তার দেবতার তস্য দেবতা। গৌণ দেবতা এবং মুখ্য দেবতা। প্রধান দেবতা এবং অপ্রধান দেবতা। দেবতারা কী ভয়ানক এবং একই সাথে কত করুণাময় সেটা বোঝাতে আমদানি করা হল দৈত্য, দানব, রাক্ষস-খোক্ষস, অসুরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অবশ্য সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে ত্রিমূর্তিবাদ, অর্থাৎ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। ক্রমশ হিন্দুধর্ম হয়ে উঠল পুরাণভিত্তিক ধর্ম। সারা ভারতে হিন্দুগণের পূজার্চনা, ব্রত, নিয়ম সবকিছুই পুরাণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেল। বৈদিক অগ্নি, বরুণ, ইন্দ্র দেবতার পরিবর্তে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ইত্যাদি ঈশ্বরগণ প্রতিষ্ঠা পেল। চিন্ময়ী উপাসনা মৃন্ময়ী মূর্তিতে চলার জন্য পুরাণেই ব্যবস্থা হল। হিন্দুধর্মে প্রবেশ ঘটল বহুত্ববাদিতার স্বরূপ পৌত্তলিকতার। এই পৌত্তলিকতা এবং পুরাণ কাহিনিগুলিকে আশ্রয় করে কায়েম হল ব্রাহ্মণ্যবাদ। দেবতাদের মূর্তি কল্পনা করে পুজো করতে থাকল বুদ্ধের মৃত্যুর পর। কারণ বুদ্ধের মৃত্যুর তাঁর শিষ্যরাই প্রথম মূর্তি কল্পনা করে। সেটাই ব্রাহ্মণ্যবাদীরা অনুকরণ ও অনুসরণ করে অস্তিত্বের বিপন্নতা থেকে।

ব্রাহ্মণগণের দ্বিতীয় মহার্ঘ আবিষ্কার হল সংস্কৃত ভাষা। এই সেই ভাষা যা দেবভাষা তথা দেবনাগরী বলে তকমা পেল। অর্থাৎ এ ভাষায় দেবতারা কথা বলেন– দেবতারা কথা বলেন, তাই ব্রাহ্মণগণ সেই ভাষায় কথা বলেন। অতএব দেবতাগণই ব্রাহ্মণ; ব্রাহ্মণগণই ঈশ্বর। ৩৬টি পুরাণ, একটি মনুসংহিতা এবং বেদ-পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারত অনুসরণে শত-সহস্র সাহিত্য লিখিত হল সংস্কৃত ভাষায়। এমন ভাষা, যা নিজেরাই লিখলেন, নিজেরাই পড়লেন, নিজেরাই বুঝলেন। ব্রাহ্মণগণের তৃতীয় আবিষ্কার আত্মা, স্বর্গ-নরক, পাপ-পুণ্য, জন্মান্তর, কর্মফলের ধারণা ইত্যাদি।

ব্রাহ্মণগণের চতুর্থ আবিষ্কার অভিসম্পাত এবং আশীর্বাদ।

একদা ব্রাহ্মণগণের মুখ হইতে কী অগ্নি নিঃসৃত হইত? এমন কথা অবশ্য অনেককে বুক ফুলিয়ে বলতে শুনেছি– “আগে ব্রাহ্মণদের মুখ দিয়ে আগুন বেরুত”। কী মনে হয় পাঠকবন্ধু? উঁহু, ব্রাহ্মণদের মুখ দিয়ে আগুন কোনোদিন নিঃসৃত হত না, এগুলি ব্রাহ্মণদের ভয়-সঞ্চারের কৌশল– গল্পকথা। মুখ দিয়ে যা বেরত, তা হল অভিসম্পাত। কথায় কথায় অভিশাপ আর ক্রোধ বর্ষণ হত। এই অগ্নিরূপ অভিসম্পাতই ব্রাহ্মণের প্রতি ভীতির কারণ। পুরাণগুলিতে পরতে পরতে ব্রাহ্মণগণ কখন অভিশাপ দেন এবং কী অভিশাপ দেন এবং অভিশাপের ফলে কী পরিণতি হয় সেই কাহিনিই বর্ণিত হয়েছে। দুর্বাশার অভিশাপে দুষ্যন্তের স্ত্রী শকুন্তলাকে ভুলে যাওয়া, ভরতমুনির অভিশাপে অপ্সরা উর্বশীর পৃথিবীতে পতন, এমনকি সব অসুর-দৈত্যরাই অভিশাপের পরিণাম ভোগ এবং অবশেষে মুক্তি– ইত্যাদি হাজারো সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কাহিনি। শুধু পুরাণই নয়, প্রাচীনকালে সংস্কৃত সাহিত্যগুলিতে ব্রাহ্মণের রোষে কী পরিণাম হতে পারে তার বর্ণনা পাওয়া যায়। মহাকবি কালিদাস বিরচিত ‘রঘুবংশম্’-এ দেখছি পূজ্য ব্যক্তিদের (পড়ুন ব্রাহ্মণদের) কোনোভাবেই অসম্মান করা উচিত নয়। পূজনীয় ব্যক্তির পূজার্চনায় বিঘ্ন ঘটলে শ্ৰেয়লাভের নানা বিঘ্ন এসে উপস্থিত হয়। প্রাচীন ভারতে রাজাদের মধ্যে নিমি, নহুষ প্রমুখ প্রবল পরাক্রান্ত রাজা হওয়া সত্ত্বেও পূজনীয় ব্রাহ্মণদের অপমান করার জন্য তাঁরা বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। বাচ্চা ব্রাহ্মণ পূজনীয়, বৃদ্ধ ব্রাহ্মণও পূজনীয়। পুরাণগুলি পাঠ করলেই স্পষ্ট হয়। ব্রাহ্মণগণ মোটেই ষড়রিপুমুক্ত ছিলেন না; কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য –সবই বিদ্যমান ছিল। অত্যন্ত অন্যায়ভাবে অযাচিত মায় আগ বাড়িয়ে ব্রাহ্মণ বাল্মীকি অভিসম্পাত করলেন শিকারি নিষাদকে (ব্যাধ)। প্রণয়মিলনে মত্ত এক ক্রৌঞ্চমিথুনের পুরুষটিকে তীরবিদ্ধ করে জনৈক ব্যাধ হত্যা করে। পুরুষ সঙ্গীর মৃত্যুশোকে নারী ক্রৌঞ্চীর করুণ বিলাপ আকাশ-বাতাস মুখরিত হল। এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বাল্মীকির মনে হল শিকারি নিষাদ অত্যন্ত গর্হিত এবং নিষ্ঠুর কাজ করেছে। তখন তাঁর মুখ থেকে স্বভাবসিদ্ধ আচরণে শাপবাণী তীব্র গরলের মতো নির্গত হল —

“মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিত”।

অর্থাৎ, ক্রৌঞ্চযুগলের থেকে প্রেমবিবশ একটি পাখিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে সে যে পাপকর্ম করেছে তার ফলে সেই ব্যাধ চিরকালের জন্য কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। কোনোদিন সুখৈশ্বর্য, গৌরব, প্রতিপত্তি কোনোরকম প্রতিষ্ঠা সে পাবে না, অর্থাৎ সে নির্বংশ থাকবে।

ওঃ, ভাবা যায় না। ‘রামায়ণম্‌’ নামক একটি মহাকাব্য শুরুই হল অভিসম্পাত দিয়ে। এই সেই রামায়ণম্‌, যা পবিত্র– যেখানে এক উচ্চজাতি তথা ব্রাহ্মণ দ্বারা অভিসম্পাত বর্ষিত হল এক অন্ত্যজ ব্যাধের জীবনে। এটিই বোধহয় সর্বকালের বিখ্যাত অভিসম্পাত।

মজার ব্যাপার হল পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারতের ক্ষত্রিয়গণ কেউ যৌনক্ষম, কেউ বা জন্মদানে অক্ষম। অক্ষম পুরুষে ছড়াছড়ি। বীর্যহীন পুরুষের কাহিনি। অথচ ব্রাহ্মণগণ দেখুন কেমন বীর্য বিতরণে সক্রিয়! ব্রাহ্মণগণ ঘোষণা দিলেন “পুত্রার্থে ভার্যা”। বললেন অপুত্রক রাজার মুখ দেখা অশুভ। রাজাগণও সন্তান নয়, পুত্রলাভের জন্য অস্থির। বিচিত্রবীর্য, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, দশরথ, দিলীপ প্রমুখ। অসংখ্য ক্ষত্রিয় রাজাগণ অপুত্রক ছিলেন। ব্রাহ্মণদের শয্যাসুখেই তাঁরা পুত্রবান হলেন। কীভাবে? সবার কথা এখানে আলোচনা করার পরিসর নেই। কালিদাস বিরচিত মহাকাব্য ‘রঘুবংশ’ থেকে অমিত পরাক্রমশালী বীর রাজা দিলীপের অপুত্রক থেকে পুত্রবান হওয়ার পুরাণকথা শুনব।

সন্তানলাভের উপায় অন্বেষণের জন্য চড়ে এক সন্ধ্যায় সমবেত হয়ে ব্রহ্মার মানসপুত্র গুরু বশিষ্ঠ এবং গুরুপত্নী অরুন্ধতীর চরণ বন্দনা করেন। এরপর পরস্পর কুশল বিনিময়ের পর রাজা দিলীপ আসল কথাটি বলে ফেললেন। বললেন, রাজ্ঞী সুদক্ষিণার গর্ভে পুত্র না-হওয়ায় অনন্ত রত্নপ্রসবিনী বিশাল পৃথিবীও তাঁকে সুখদান করছে না। তাঁর পিতৃপুরুষগণ পিণ্ডলোপের আশঙ্কায় ভুগছেন। তাই কুলগুরু বশিষ্ঠ যেন তাঁর পিতৃঋণ মোচনের জন্য সন্তানলাভের ব্যবস্থা করে দেন। ব্রাহ্মণ শিরোমণি বশিষ্ঠ প্রত্যুত্তরে বললেন, সেবার দ্বারা নন্দিনীকে (স্বর্গের কামধেনু, বশিষ্ঠের হোমধেনু) প্রসন্ন করলে দিলীপের পুত্রলাভের যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর হবে। কেমন সেই সেবা? অভ্যাস দ্বারা যেভাবে বিদ্যাকে আয়ত্ত করতে হয়, সেইভাবে ফলমূলাদি (বন্যবৃত্তি অবলম্বনের দ্বারা) আহার করে ব্রহ্মচর্য পালনের দ্বারা এবং সর্বদা অনুগমনের মধ্য দিয়ে নন্দিনীকে প্রসন্ন করতে হবে। অর্থাৎ নন্দিনী প্রস্থান করলে রাজাও প্রস্থান করবে, সে অবস্থান করলে রাজাও অবস্থান করবেন। নন্দিনী জলপান করলে রাজাও জলপান করবেন। তপোবনের সীমান্ত পর্যন্ত নন্দিনীকে করতে হবে। যেই কথা সেই কাজ। নন্দিনী চরতে চরতে এমনভাবে প্রতিদিনই সীমান্ত অতিক্রম করে এবং রাজাও বশিষ্ঠের কুঠির ত্যাগ করে বহুদূর চলে আসে। সেইসময় এই অবকাশে সুদক্ষিণার সঙ্গে বশিষ্ঠের সম্ভোগ-সুখ বিনিময় হতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। অবশেষে পুত্রলাভের আশীর্বাদ। সুদক্ষিণা গর্ভবতী হলেন। বাকিটা অনুমেয়।

পুরাণে উল্লেখ্য ছিল ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য সব বর্ণের মানুষ শংকর, তাঁরাই শুধু আদি অবিমিশ্র রক্তধারার আর্য এবং সেই কারণেই তারা শ্রেষ্ঠতম। তৈত্তিরীয় সংহিতায় বলা হয়েছিল রাজাদের পুরোহিতদের সহায়তা অবশ্য প্রয়োজনীয়, এমন কি রাজার পক্ষে সঠিক পথে চলার নিমিত্ত পুরোহিতদের প্রয়োজন। পুরোহিত ক্ষত্রিয়ের আত্মা, কারণ পুরোহিত ব্যতীত রাজার অন্ন দেবতারা গ্রহণ করে না কিনা! অর্থাৎ, ক্ষত্রিয়রা শাসক সম্প্রদায় হলেও ব্রাহ্মণদের আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রেখেই রাজ্যশাসন করতে থাকবে। শরভঙ্গ, সুতীক্ষ্ণ, অগস্ত্যভ্রাতা ইধ্ববাহ, অগস্ত্য নামক ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায় ঐন্দ্রধনু, খ, অক্ষয় বাণ, তূর্ণী দ্বারা ক্ষত্রিয় ভগবান (?) শ্ৰীমান রামচন্দ্র দণ্ডকারণ্যে প্রায় চোদ্দো হাজার অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদের (যাঁদেরকে রামায়ণে রাক্ষস-খোক্ষস বলে চিহ্নিত করা হয়েছে) নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন। “রক্ষসাং নিহতান্যাসন্ সহস্রাণি চতুর্দশ” (রামায়ণ–বালকাণ্ড–প্রথম সর্গ, ৪৯তম শ্লোক)। প্রাচীনকালে রাজারা সজ্ঞানেই ব্রাহ্মণদের কখনও ঘাটতে যাননি, কারণ শাস্ত্র সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষের কাছে ব্রাহ্মণরা ঈশ্বর এবং ধর্মের নামে নিজেদের চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তার অনেক আগে থেকেই। তাই রাজারা ব্রাহ্মণদের হোশামোদ করেই প্রজাদের শাসন-শোষণ নিরবচ্ছিন্নভাবে করতে চাইতেন। ঠিক এই সময়েই ব্রাহ্মণরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের কীর্তন-গাঁথা রচনায় মনোযোগ দেন। তাতেও যখন কাজ হচ্ছিল না তখন তাঁরা কর্মফল, পুনর্জন্ম, আত্মা-পরমাত্মা, জন্মান্তরবাদ ইত্যাদি তত্ত্ব রচনাতে মনোনিবেশ করেন। পার্থিব ব্রাহ্মণ হত্যাকে ‘ব্রহ্মহত্যা পাপ’ নামে স্বর্গীয় পাপের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আরও কঠোর করা হল ব্রাহ্মণদের অস্পৃশ্যবাদী প্রকল্পের চূড়ান্ত।

ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুধর্মটি আসলে ব্রাহ্মণ্যধর্মের শোরুম। বেদ বা বৈদিক আশ্রিত নয়, পুরাণ বা পৌরণিক আশ্রিত। অনেক বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণদের মতবাদই ব্রাহ্মণ্যবাদ কায়েম হয়ে গেল। এ এমন এক মতবাদ, যা মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ শূদ্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করল। শুধু শূদ্রদের নয়, ক্ষত্রিয়-বৈশ্যদেরও কবজা করে ফেলেছিল ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়গণ। ক্ষত্রিয়দের অস্ত্রশিক্ষাও তাঁরা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন জটিল কৌশলে। পরশুরাম, দ্রোণাচার্য প্রমুখ ব্রাহ্মণগণ ক্ষত্রিয়দের অস্ত্রগুরু হিসাবে খুবই প্রসিদ্ধ হয়েছেন। এমনকি রাজকার্য পরিচালনাতেও ক্ষত্রিয়দের অভিভাবক এই ব্রাহ্মণই। বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য, বশিষ্ঠ প্রমুখ ক্ষত্রিয়দের গুরু ছিলেন। আর তাই বশিষ্ঠের নির্দেশেই ক্ষত্রিয় রামচন্দ্র শূদ্র-তপস্বী শম্বুককে নিজের হাতে হত্যা করেছিলেন। ক্ষত্রিয়গণ বহুবার চেষ্টা করেছিলেন ব্রাহ্মণ্য প্রভাব থেকে মুক্ত হতে। পারেনি। যতবারই চেষ্টা করেছে ততবারই ব্রাহ্মণগণ নির্মমভাবে শাস্তিবিধান করেছেন। ব্রাহ্মণ পরশুরামের কথা মনে পড়ছে? ইনি পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। মানে ক্ষত্রিয়দের ধরে কচুকাটা করেছিলেন।

অপরদিকে ক্ষত্রিয়-সন্তান বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত জনসাধারণের উপর ব্রাহ্মণ-সম্প্রদায়ের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল অপ্রতিরোধ্য। ধর্মচিন্তাকে সুসংঘবদ্ধ করতে সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি নিজেদের আধিপত্য অব্যাহত রাখতে তৈরি করেছিলেন উপাসনালয় এবং এর কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নিয়োগ করতে হয়েছিল উপাসক বা পুরোহিত সম্প্রদায়। প্রাচীন ভারতে উপাসকদের মনোনীত করতে হত। ক্রমশ এই উপাসক বা পুরোহিতদের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এই সুবাদে তাঁরা হস্তগত করে ফেলেন উপাসনা পদ্ধতি প্রণয়নের অধিকারও। যাঁদের কাজ ছিল বিশ্বাসীদের জন্য বিশেষ বিশেষ প্রথার জন্ম দিয়ে ঈশ্বর এবং তার কল্পিত অনুচরদের তুষ্টি বিধানের পাশাপাশি নিজেদের তুষ্টি এবং পুষ্টিসাধন। উপাসনার নেতৃত্ব দিতে উপাসক বা পুরোহিতরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করেছিলেন সেটি হচ্ছে দৈবশক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দুর্বোধ্য সংস্কৃত ভাষায় ভাষ্যরচনা সৃষ্টি, যাকে বলা হয় ‘মন্ত্র’। প্রথমদিকে বৈদিক ধর্মগুরুরা ছিলেন মন্ত্র রচয়িতা। এরপর মূলত ব্রাহ্মণ এবং শাস্ত্রকাররা সনাতন ধর্মের সাংগঠনিক রূপ দেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালীরা শাসক সম্প্রদায়ের ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে আঁতাত করে চতুর্বর্ণ প্রথার জন্ম দেন। এই বর্ণপ্রথার বর্ণপ্রধান হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন ব্রাহ্মণগণ এবং স্বাভাবিকভাবেই উপাসনার জন্য মন্ত্র-স্তোত্র-স্তব রচনা করার ক্ষমতা অধিকার করেন। সম্ভবত ব্রাহ্মণরাই একমাত্র পূজারী শ্রেণি যাঁরা জন্ম সুত্রে এই অধিকার পান (যদিও এ ব্যাপারটি অশাস্ত্রীয়)। অবশ্য শুরুর দিকে ব্রাহ্মণরা উত্তরাধিকার সূত্রে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না। এজন্য বিশেষ গুণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হত। বর্ণপ্রথা পাকাপাকিভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সনাতন ধর্ম চেপে বসার আগে মন্ত্র রচনা করে ব্রাহ্মণ হতে পারতেন যে কেউ। এমনকি জন্মসুত্রে ব্রাহ্মণরা উপাসনার দায়িত্ব ছেড়ে বেছে নিতে পারত অন্য যে-কোনো পেশাও।

সমাজের সুবিধাবাদী মন্ত্র-রচয়িতা ব্রাহ্মণরা খুব সহজেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ধর্মীয় কাজ মায় ঈশ্বরের উপাসনা কর্মটি একাধারে আধ্যাত্মিক এবং পার্থিব প্রাধান্য বিস্তারে একটি শক্তিশালী নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে এবং এই চিন্তাসুত্রে ক্রমশ শাসক এবং মন্ত্র-রচয়িতা সম্প্রদায় নিজ নিজ স্বার্থের তাগিদে তৈরি করতে থাকে উপাসনা প্রকল্প। মগধীয় যুগ এবং মৌর্য যুগ– এসময়ই ব্রাহ্মণরা নিজেদের শ্রেষ্ঠতর দাবি করে শাস্ত্র রচনা শুরু করেন। এরপর আবিষ্কার করা হল বারো মাসে তেরো পার্বণ। জন্ম থেকে মৃত্যু– কোথায় নেই তাঁরা, এঁটুলি পোকার মতো আষ্টেপৃষ্টে রইলেন! আবিষ্কার করা হল কোটি কোটি দেব-দেবতার কোটি কোটি পুজো-পার্বণ– সারা বছর, প্রতিদিন এবং প্রতি মুহূর্তের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। মানুষকে স্বর্গে পৌঁছে দেওয়ার এইরকম বিশাল এবং সফল ইন্ডাস্ট্রি পৃথিবীতে আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।

ব্রাহ্মণগণ সবচেয়ে বেশি লাভবান হতেন শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে। প্রচুর সম্পদ সংগ্রহ হত। কেমন ছিল সেই সেকালের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান? তার আগে জেনে নিই হিন্দুদের আদি বা মূল ধর্মগ্রন্থ বেদ হিন্দুদের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান নিয়ে কী নির্দেশ দিয়েছেন প্রাঙ্গণ। বৈদিক সংস্কারে মৃতের শেষকৃত্য সমাপনে যে মন্ত্রাদি ব্যবহৃত হয় তা পৌরাণিক নিয়ম অর্থাৎ হিন্দুদের বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম বা মন্ত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈদিক নিয়মে মৃতের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে দুই থেকে তিনদিন লাগে। মানুষ মারা গেলে তাকে দাহ করার নাম “অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া। অন্ত্যা’ অর্থে অন্তিম, চরম বা সর্বশেষ এবং ইষ্টি’ অর্থে যজ্ঞ, শুভকর্ম বা সংস্কারকে বোঝায়। বৈদিক পণ্ডিত শ্রীমদ্ দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর রচিত “সংস্কার বিধি”-তে বলেছেন, “এখানে ‘ইষ্টি’ বলিতে যজ্ঞ বা শুভকর্ম বোঝয় বলিয়া অন্ত্যেষ্টি কর্মে পুণ্যই হইয়া থাকে। ইহাতে পাপ বা অশৌচ হইলে ইহার নাম ‘ইষ্টি’ হইত না। ‘অন্ত্যেষ্টি’ শব্দ স্বয়ং ঘোষণা করিতেছে যে, মৃতদেহ দাহ করাই পুণ্যের কাজ”। বড়োজোর, স্বামী দয়ানন্দ বলেছেন, শব দাহান্তে যে গৃহে মৃত্যু হয়েছে সেই গৃহ মার্জন, লেপন ও প্রক্ষালন করে বিশুদ্ধ করে নেওয়া যেতে পারে। এমনকি স্বস্তি বাচন ও শান্তি প্রকরণাদি মন্ত্র দ্বারা ঈশ্বরের উপাসনা করা যেতে পারে। কিন্তু পুরাণগুলির (বিশেষ করে গরুড়পুরাণ) ছত্রে ছত্রে যজমানদের নিঙড়ে কামানোর ফরমান। সবৎস্য গোরু দান, ভূমিদান, স্বর্ণদান, ষোড়শদান (১৬টি দ্রব্য –ভূমি বা ভূমিমূল্য, আসন, শয্যা, অন্ন, বস্ত্র, গোরু, জল, প্রদীপ, তাম্বুল, ছত্র বা ছাতা, গন্ধ, মাল্য বা মালা, ফল, পাদুকা, সোনা, রুপো। এগুলি দান করলে মৃত ব্যক্তি ৯৬০ হাজার বছর স্বর্গে সুখে কাল কাটাতে পারবে। মৃতের আত্মীয়গণ যত ভালো ভালো দ্রব্যাদি ব্রাহ্মণকে দান করতে পারেন তত ভালো ভালো দ্রব্যাদি মৃত ব্যক্তি স্বর্গে পাবেন। ), মৃতের পছন্দের জিনিসপত্র, ব্রাহ্মণভোজন ইত্যাদি কঠোর বিধান। সামর্থ্য থাক-বা-থাক, প্রয়োজনে ভিক্ষা করে এসবের আয়োজন করতে হবে। এইসব ব্রাহ্মণগণ মৃত আত্মীয়ের স্বর্গে পাঠানোর বাহানায় সমগ্র হিন্দুজাতিকে ভিখিরি করে ছেড়েছে। তবে বহুদিন হল ওইসব নিয়মের অনেক কাটছাঁট হয়ে গেছে। মৃত আত্মীয়ের বুকে ‘গীতা’ রাখলেই তিনি স্বর্গে চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার গীতাপাঠও করান। যদিও যাঁর উদ্দেশে পাঠ করা হচ্ছে তিনি কিছুই শুনতে পান না। কারণ তিনি মৃত, জড়বস্তু মাত্র।

কিন্তু ব্রাহ্মণগণ বুঝেছিলেন এই বেদ অনুসরণ করলে ব্যাপক কোনো ফায়দা হবে না। অথচ মৃতের পরিবারের কাছ থেকে ব্যাপক ফায়দার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যু একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। কোন্ পরিবার -চায় তাঁর মৃত সদস্য স্বর্গসুখ পাক? অতএব মৃত সদস্যের স্বর্গের সমস্ত রকম সুখ দেওয়ার সবরকম ব্যবস্থার বিধি সৃষ্টি করতে হবে। অতঃপর ব্রাহ্মণগণ পুরাণের মতো গ্রন্থগুলি রচনার কাজে হাত দিলেন। রচিত হল ১৮টি প্রধান পুরাণ এবং ১৮টি উপপুরাণ নামক আকর গ্রন্থ। এই পুরাণগুলির পাতায় পাতায় বর্ণিত ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ বিষয়ক ভয়ংকর সব বক্তৃতা এবং স্ববিরোধী নিয়ম-বিধি-বিধান। এই পুরাণগুলিই হল ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্ষাকবচ। ব্রাহ্মণ্যবাদের আলোচনায় পরে আসছি। এখন ফিরে যাই শ্রাদ্ধের প্রসঙ্গে। নিয়ম করলেন শোকার্ত পরিবারের কাছ থেকে কীভাবে কতটা চুষে খাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে চার্বাক সম্প্রদায়ের বাণী মনে পড়ছে– বেদ ভণ্ড, ধূর্ত, ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের রচনা। জীবিকা অর্জনের স্বার্থে তাঁরা স্বর্গ, নরক, পাপ, পুণ্য, ঈশ্বর, কর্মবাদ, কর্মফল, জন্মান্তরবাদ, আত্মা ইত্যাদি মিথ্যা অলৌকিক ধারণা প্রচার করে সাধারণ অসহায় মানুষদের যাগযজ্ঞ বাধ্য করে।

নিয়ামক– হ্যাঁ, সেই নিয়ামকের মিশনে পৌঁছে যেতে ব্রাহ্মণরা কুলশ্রেষ্ঠের মর্যাদাটি দখল করে নেয়। তাঁরা রচনা করতে থাকে দুর্বোধ্য সব মন্ত্রাদি, বেছে নেন সংস্কৃত ভাষার মতো দুর্বোধ্য এবং অপ্রচলিত কৃত্রিম ভাষা। যে ভাষা ওরা ছাড়া কেউ বুঝত না, বোঝার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সমাজের মাঝে প্রধান হয়ে উঠার জন্য এটিই ছিল অমোঘ হাতিয়ার। মন্ত্রের ঐন্দ্রজালিক মোহ দিয়ে তাঁরা ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। মন্ত্রকে ঈশ্বরের বাণী বলে প্রচার করতে থাকেন এবং সমাজের প্রায় সবার সমর্থনে আসন গেঁড়ে বসেন সমাজের শিখরে। সেখান থেকে যাতে কোনোভাবেই প্রত্যাবর্তন না-করতে হয় সেইজন্য দ্বিতীয় কুলশ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয় বা রাজা-শাসকদের সঙ্গে বজায় কূটনীতিক সদ্ভাব অব্যাহত রাখা হত। পুরাণে উল্লেখ্য ছিল ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য সব বর্ণের মানুষ শংকর, তারাই শুধু আদি অবিমিশ্র রক্তধারার আর্য এবং সেই কারণেই তাঁরা শ্রেষ্ঠতম। তৈত্তিরীয় সংহিতায় বলা হয়েছে, রাজাদের পুরোহিতদের সহায়তা অবশ্য প্রয়োজনীয়, এমনকি রাজার পক্ষে সঠিক পথে চলার জন্য পুরোহিতদের প্রয়োজন। পুরোহিত ক্ষত্রিয়ের আত্মা (রাজার আত্মা) কারণ পুরোহিতবিহীন রাজার অন্ন (দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য তুলে দেওয়া প্রাসাদ) দেবতারা গ্রহণ করে না। সে সময়ে ব্রাহ্মণগণ ক্ষত্রিয়দের পিঠ চাপড়াতেন, ক্ষত্রিয়ের সপক্ষে কাব্য-মহাকাব্য লিখতেন –অন্যদিকে ক্ষত্রিয়গণ ব্রাহ্মণদের পিঠ চাপড়াতেন, প্রশংসা করতেন, উপাধি দিতেন, অর্ধেক রাজ্য দিতেন ইত্যাদি– এভাবেই ধীরে ধীরে আম-আদমিদের অভিশাপ-আশীর্বাদের ভয়-ভরসা প্রদর্শন করে গড়ে তোলা হয়েছিল সনাতন ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ, যা আরও অনেক পরে হিন্দুধর্ম হিসাবে প্রকাশিত হয়। অপরদিকে ক্ষত্রিয়রা শাসক সম্প্রদায় হলেও ব্রাহ্মণদের আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রেখেই রাজ্যশাসন করবে –এই হল অদৃষ্ট, নিয়তি।

ব্রাহ্মণকে হত্যা করা যায় না, হাজার গর্হিত অন্যায় কাজ করলেও নয়– পার্থিব ব্রাহ্মণ হত্যাকে ‘ব্রহ্মহত্যা পাপ’ নামে স্বর্গীয় পাপের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আরও কঠোর করা হল ব্রাহ্মণদের অস্পৃশ্যবাদী প্রকল্পের চূড়ান্ত। চাউর করে দেওয়া হল ব্রাহ্মণ হত্যা করলে বেহ্মদত্যি হয়। বলা হল ৬৪ লক্ষ যোনি ভেদ করে ব্রাহ্মণের জন্ম হয়। ইতিহাসবিদ এবং পর্যটক মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে জানা যায়, মৌর্যযুগে ধর্ম এবং ধর্মীয় কাজে ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য ছিল। অপ্রতিরোধ্য। রাজ-দরবার এবং আইন-আদালত সর্বত্র প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কারণে এবং সব শ্রেণির কাছ থেকে দানদাক্ষিণ্য পেয়ে এক বিশাল বিত্তশালী শ্রেণীতে পরিণত হয় ব্রাহ্মণগণ। অনেকে আবার সরাসরি রাজকর্মও নির্বাহ করতেন। একসময় মগধ এবং মৌর্য রাজ্যগুলিতে রক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তুলনামূলক ভাবে অরক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের চিন্তাগত দ্বন্দ্ব দেখা যায়।

বৌদ্ধধর্ম মতে ব্রাহ্মণের বেশ কিছু ব্যাখ্যা এবং সংজ্ঞা পাওয়া যায়। আসুন, আমরা একটু অনুধাবন করার চেষ্টা করি। কিছুই ফেলা যায় না।

প্রকৃত ব্রাহ্মণ : বুদ্ধের জম্মের পূর্বে ভারতে ব্রাহ্মণেরা তাদের নিজ মাহাত্ম্য প্রচারছলে জাতি অভিমান প্রকাশ করত মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ। কিন্তু বুদ্ধের সঙ্গে তেবিজ্জের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, কেবল ত্রিবেদ জ্ঞাত হলে প্রকৃত ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করা যায় না। ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার জন্য অসমার্থক তর্ক ও বেদ, মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ভাবনা করা প্রয়োজন। যাঁরা এরূপ ভাবনার অধিকারী হয়ে অনাসক্ত নিষ্কলুষ, রজঃমুক্ত, লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন হয় এবং যিনি পাপ পঙ্কিল দূরতিক্রম্য মোহপূর্ণ সংসারাবর্ত মুক্ত হয়েছেন তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ।

জাতি দ্বারাই প্রকৃত ব্রাহ্মণ : হিন্দুদের বিশ্বাস জাতি দ্বারাই প্রকৃত ব্রাহ্মণ অধিকারী হয়। অর্থাৎ, প্রকৃত ব্রাহ্মণ হতে হলে ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংবা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হতে হবে। কিন্তু বুদ্ধ মতে, ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংবা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হয়ে পাপ মলত্যাগ করতে না করলে তাঁকে প্রকৃত ব্রাহ্মণ বলা যাবে না। তাঁকে কেবল ব্রাহ্মণ বলে সম্বোধন করা যায়। বংশগৌরব অথবা উচ্চবংশে জন্ম লাভ করেও শীল গুণে বিভূষিত না-হলে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারে না। বহুলোক নীচু কুলে জন্মগ্রহণ করেও শীলাচার সম্পন্ন হয়ে পরিশ্রমের দ্বারাই সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বর্গে গমন করতে পারে। তাই বুদ্ধ বলেছেন, জন্মের দ্বারা কেউ চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয় না, কর্মের দ্বারাই চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয়।

প্রকৃত ব্রাহ্মণ তৃষ্ণামুক্ত : যিনি বন্ধনমুক্ত, অনাশ্রব, কামচিন্তা বিরহিত তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ নামের যোগ্য। ব্রাহ্মণ ধ্যানী, একক বিচরণশীল, বস্তুকাম ও ক্লেশকাম পরিহার করে চলেন। যিনি সর্ব সংযোজন ছিন্ন করে ভয়মুক্ত, অনাসক্ত, শৃংখলামুক্ত তিনিই তৃষ্ণাক্ষয়ী ব্রাহ্মণ। ক্রোধপূর্ণ, জটাধারী, অজিনচর্ম পরিহিত ব্যক্তি ব্রাহ্মণের যোগ্য হতে পারে না। ক্রোধবিহীন, ব্রতপরায়ণ, শীলবান, সংযমী ও অন্তিম দেহদারী ব্যক্তি তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ বলে যোগ্য হন। যিনি গৃহস্থ ও অনাগরিক উভয়ের প্রতি অসংশ্লিষ্ট অল্পেচ্ছ ও আলয়বিহীন তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ। যিনি ছোটো-বড়ো সর্বপ্রকার অদত্ত গ্রহণে বিরত, যার কোনো প্রকার তৃষ্ণা বিদ্যমান নেই যিনি সংশয়মুক্ত ও নির্বাণ প্রাপ্ত তিনিই ব্রাহ্মণ।

জাত্যাভিমানী প্রকৃত ব্রাহ্মণ : তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণেরা অভিমান বা অহংকার করে নিজের গৌরব করে বলত তারাই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে জাতি অভিমান ব্রাহ্মণের কাজ নয়। কারণ জাতি হিসাবে মানুষ মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। তঙ্কালীন মানবজাতির মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শুদ্রের পদচিহৃ একই ধরনের। কিন্তু হাতি, ঘোড়া, বাঘ প্রভৃতি প্রাণীদের মতো মানুষ মানুষের মতো পার্থক্য দেখা যায় না। প্রাণীদের মধ্যে স্ত্রী, পুরুষ, বর্ণ, শারীরিক গঠন, লোম, চঞ্চু, প্রভৃতি পার্থক্য আছে। কিন্তু মানুষ মানুষে তেমন পার্থক্য দেখা যায় না। বুদ্ধ মতে, যে-কোনো ব্যক্তি সৎকর্ম করলে ব্রাহ্মণের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন। সভাব ও কৃচ্ছসাধনের দ্বারা যে-কোনো লোক ব্রাহ্মণ অর্জন করতে পারেন।

ধ্যানীপরায়ণ প্রকৃত ব্রাহ্মণ : পণ্ডিতগণ বলেছেন, বনের প্রাণীরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। ঠিক তেমনি প্রকৃত শ্ৰমণ বা ব্রাহ্মণ ধ্যানপরায়ণ হলে শোভা পায় এবং অনাসক্ত, নিষ্কলুষ, রজযুক্ত লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন হয়। দিনেরবেলায় সুর্য আলো দিয়ে দিনের শোভা বৃদ্ধি করে, রাতের বেলায় চন্দ্র প্রদীপ্ত হয়ে রাতের শোভা রক্ষা করে এবং সৈন্য, সামন্ত, অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত হলে রাজার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। সেরূপ প্রকৃত শ্ৰমণ বা ব্রাহ্মণ ধ্যানপারয়ণ হলে শোভিতক হয়। বুদ্ধ নিজের জ্ঞানের প্রতিভায় দিন-রাত্রি প্রদীপ্ত হন। শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ পাপ পুণ্য ধ্যানরত হয়ে প্রকৃত প্রব্রজিত নামে অভিহিত হন।

পুরাণ মতেও ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত হলেই কেবল ব্রাহ্মণত্ব অর্জিত হয়। তারপরও সনাতন ধর্ম যুগ যুগ ধরে চতুর্বর্ণভেদ টিকে ছিল প্রায় হাজার বছর ব্যাপী। তবে ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় চাতুরি কার্যকারিতা হারাতে থাকে উনিশ শতকের শেষের দিকে। ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে উদ্ভূত কয়েকটি কদাচার-কুৎসিত সংস্কারের পর থেকেই এই অবরোহণের শুরু। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সহ প্রমুখ প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বের সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মণরা ক্ষমতা হারাতে শুরু করেন। এই শতকে নেওয়া দেবদাসী প্রথার আইনানুগ অবসান, সতীদাহ প্রথা নিবারণ, বিধবা-বিবাহের প্রচলন, কৌলীন্য প্রথার বিলোপ, ব্রাহ্মধর্ম প্রবর্তন এবং ছুৎমার্গের বাড়াবাড়ি অনেকটা কমে আসা থেকে ব্রাহ্মণদের খর্বতা শুরু হয়েছিল। কেন ব্রাহ্মণদের এরকম খর্ব শুরু হয়েছিল? কেন ব্রাহ্মণদের সম্মান নষ্ট হতে শুরু করল? কবে থেকে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ব্রাহ্মণ’ প্রবন্ধে লিখছেন, “ব্রাহ্মণও যখন আপন কর্তব্য পরিত্যাগ করিয়াছে, তখন কেবল গায়ের জোরে পরলোকের ভয় দেখাইয়া সমাজের উচ্চতম আসনে আপনাকে রক্ষা করিতে পারে না। কোনো সম্মান বিনামূল্যের নহে। যথেচ্ছ কাজ করিয়া সম্মান রাখা যায় না।”

অপরদিকে প্রাজ্ঞ পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী একটি প্রবন্ধে বলেছেন– “ত্যাগ বৈরাগ্য-কৃচ্ছতা নেই, ঋজুতা নেই, তপস্যা নেই, অথচ অর্থগুঘ্নতা আছে, আত্মম্ভরিতা আছে, মাতব্বরি আছে, ভয় দেখানো আছে, এমন ব্রাহ্মণ্য সামাজিক মানুষের সম্মান লাভ করতে পারে না। …..প্রথাগত ব্রাহ্মণ্যের বিরুদ্ধে, জন্মব্রাহ্মণ্যের বিরুদ্ধে অথবা ব্রাহ্মণ্য-প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থোপার্জন করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং গুপ্ত সমালোচনা কিন্তু অনেকদিনই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল এবং সেটা ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের মধ্যেই হয়েছিল। শুধুমাত্র শুষ্ক আচার দেখিয়ে, গুরুর গৌরব দেখিয়ে, পিতার গৌরব দেখিয়ে অধস্তন বর্ণকে অপমান করার একটা আদত ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের মধ্যে এমনভাবে নিহিত হয়ে গিয়েছিল যে, গৌরবযুক্ত পিতামাতার পুত্র-কন্যারা এবং অনুপযুক্ত শিষ্যরাও সমাজভুক্ত অধর বর্ণকে কথায় কথায় অপমান করে বসত। একদা ক্ষত্রিয়ের ক্ষাত্রবৃত্তি যেমন ব্রাহ্মণকে আশ্রয় করে উজ্জীবিত থাকতেন, ঠিক তেমনিই ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ্যও ক্ষত্রিয়ের দয়া-দাক্ষিণ্য-উপঢৌকন-উপাধি প্রাপ্তের উপরই নির্ভর ছিল। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় দুই বর্ণই পরস্পরের পরিপূরক– সংসৃষ্টং ব্ৰহ্মণা ক্ষত্রং ক্ষত্রেণ ব্ৰহ্ম সংহিতম। অবশ্য কালের নিয়মে একদিন কার্তবীর্য বললেন, ব্রাহ্মণরা ক্ষত্রিয়দের আশ্রয় করে আছেন, এটা ঠিক। কিন্তু কোনোভাবেই ক্ষত্রিয়রা ব্রাহ্মণদের আশ্রয় করে নেই– “ব্রাহ্মণাঃ সংশ্ৰিতাঃ ক্ষত্রং নক্ষত্রং ব্রাহ্মণাশ্রিতম”।

অথচ ভাবুন ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় রাজনীতি থেকে উদ্ভূত প্রভাব প্রবল বাধাগ্রস্ত হয়েছিল সপ্তম থেকে নবম শতকের মধ্যে। এ পর্বে ‘ভক্তিবাদ আন্দোলন গড়ে উঠে গোটা ভারতবর্ষে। ভক্তিবাদীরা প্রত্যাখ্যান করেন ব্রাহ্মণদের বর্ণবাদী শ্রেষ্ঠতের ধারণা। এতে ধ্বনিত হয় সামাজিক প্রতিবাদের সুর। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা ব্রাহ্মণ্য রাজনীতির সঙ্গে শেষপর্যন্ত টিকতে না-পারলেও “ভক্তিবাদ’ আন্দোলনই সনাতন ভক্তদের মনে জন্ম দেয় বর্ণবাদ এবং বর্ণশ্রেষ্ঠতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার।

বললে অত্যুক্তি হবে না যে, ভারতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মের আগ্রাসনে আক্রমণে-অত্যাচারে বারবার বিপন্ন-বিপর্যস্ত হয়েছে সনাতন ধর্ম তথা ব্রাহ্মণ্যধর্ম তথা হিন্দুধর্ম। ব্রাহ্মণগণ বিপন্নতা থেকে মুক্তি পেতে ধর্মীয় অনুশাসনগুলিকে আরও কঠোর থেকে কঠোরতম করতে গিয়ে হিন্দুধর্মের সর্বনাশ করেছে। ব্রাহ্মণগণের অমানবিক বিধানে জর্জরিত হয়ে তথাকথিত নীচুতলার মানুষগুলো দলে দলে কেউ মুসলমান, কেউ খ্রিস্টান, কেউ বৌদ্ধ হয়ে গেছে। কখনো শুনিনি অন্য কোনো ধর্মের মানুষ হিন্দুধর্মকে ভালোবেসে হিন্দু ধর্মাচরণ করছে। খানখান হয়েছে ব্রাহ্মণ্যবাদ কঠোরতার কারণেই। বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো। পরবর্তীকালে কেরলিয়ান ব্রাহ্মণ শঙ্করাচার্য (আদি) নরমে-গরমে একবার চেষ্টা করেছিলেন এবং সফল হলেন ভারতে ব্রাহ্মণ্যশাসন কায়েম করতে। এ ছাড়া বিভেদনীতির মাধ্যমে ক্ষত্রিয়শক্তিকে দুর্বল করে তোলেন। ফলে অতি সহজেই মুসলমান শক্তি ভারতে দ্রুত প্রসার লাভ করে। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধধর্মকে প্রায় শেষ করে দিতে সক্ষম হলেও অষ্টাদশ শতাব্দী নাগাদ ব্রাহ্মণদের চক্রান্তে এবং সহায়তায় মুসলমান শক্তিকে পরাভূত করতে ভারতে ব্রিটিশ শাসন কায়েম হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বেনিয়া-নেতা গান্ধিজিকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ভারতের শাসনক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে প্রয়াসী হন। সেই বিষয়টি ব্রিটিশপুঙ্গবগণ আন্দাজ করতে পেরে তার সদব্যবহার করেছিল। দ্বিজাতিতত্ত্বের আঁতুরঘর এখান থেকেই। মোদ্দা কথা, ব্রাহ্মণ্যবাদের জাঁতাকলে পড়ে হিন্দুধর্ম আজ বিপন্ন, বিপর্যস্ত, ছিন্নভিন্ন। প্রাচীন যুগ থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। জন্ম নিয়েছে বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্মের মতো ধর্মবাদ। ব্রাহ্মণ্যবাদের অস্পৃশ্যতা এবং প্রাণীহত্যাকে হাতিয়ার করে ব্রাহ্মণ্যবাদকে নিকেশ করতে উঠেছিল বৌদ্ধধর্ম। বিশেষ করে ভারতবর্ষের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষরা ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুশাসনের নামে অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পেতে দলে দলে বৌদ্ধধর্মে চলে আসতে থাকলেন। ভীত-সন্ত্রস্ত ব্রাহ্মণবাদের পুরোধারা কখনো বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে অস্ত্র শানালেন, কখনো-বা কৌশল অবলম্বন করে বৌদ্ধদের ভারত থেকেই প্রায় উৎখাত করে দিলেন। এই বৌদ্ধদের ঠান্ডা করতে ডাণ্ডা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কেরলের ব্রাহ্মণ শংকরাচার্য এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গো-শাগরেদরা। বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ্য-সন্ত্রাস চালিয়েও বৌদ্ধদের যখন দমানো গেল না তখন কৌশলে ঘোষণা করে দেওয়া হল বৌদ্ধধর্মও যা, হিন্দুধর্মও তাই এমন একটা অবস্থা তৈরি করে নিল। কারণ ভগবান বুদ্ধদেব বিষ্ণুর দশমাবতারের এক অবতার (যথাক্রমে মৎস্যাবতার, কূর্মাবতার, বরাহ অবতার, নৃসিংহ অবতার, বামনাবতার, পরশুরাম, শ্রীরাম, কৃষ্ণাবতার, বুদ্ধদেব, কল্কি)। এরপর বেশ কিছুকাল ভালোই কাটছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুশাসন। শুরু হয়ে গেল সুদূর আরব থেকে মুসলিমদের ভারতে আগমন এবং আগ্রাসন। একে একে হিন্দু রাজাদের পরাস্ত এবং সিংহাসনচ্যুত করে মুসলিম শাসন শুরু হয়ে যায়। তারপর ৭০০ বছর ব্রাহ্মণ্যবাদ কোণঠাসা। চরম অবক্ষয় দৃশ্যমান হয়। ব্রাহ্মণ্যবাদকে অস্বীকার করা শুরু হল গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে। অন্ত্যজ শ্রেণি তো বটে, উচ্চবর্ণের অনেক মানুষও ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হতে থাকল। আবার অস্তিত্বের বিপন্নতা। আরবি-ফারসি ভাষা শিখতে বাধ্য হল সবাই। ভারতবর্ষে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তেই থাকল। দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় শক্তি হয়ে উঠল। এরই মধ্যে ভারতবর্ষে পোর্তুগিজ, ফরাসি, ব্রিটিশদের বণিকরূপে আবির্ভূত হয়ে অবশেষে হাতে উঠে এল শাসকের দণ্ড। শুরু হয়ে গেল নতুন অধ্যায়– ব্রিটিশশাসন। সেইসঙ্গে খ্রিস্টধর্মের আবির্ভাব– মিশনারিদের প্রভাবে আবার ধর্মান্তরকরণ। তবে খ্রিস্টধর্ম নয়, ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে রইল ইসলাম ধর্ম। অতএব খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে পীড়িত বাড়িয়ে মুসলিম বিরোধিতায় পরোক্ষে-প্রত্যক্ষে ব্রিটিশদের ইন্ধন জোগানো। দ্বিজাতিতত্ত্ব খাঁড়া করে টুকরো টুকরো হয়ে গেল আমাদের সাধের স্বাধীন ভারত, ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদ আর উঠে দাঁড়াতে পারল না। শত বিভক্ত হয়েই রইল। এই ব্রাহ্মণবাদকে উৎখাত না-করলে হিন্দুধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে না। হিন্দুত্ববাদীরা শূদ্র, দলিত, অন্ত্যজদের হিন্দুভুক্তি করে না, যারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীকে বাইরে রেখে কখনো কোনো ধর্ম শক্তিশালী হতে পারে? একদা যে দেশ বৌদ্ধদের ছিল, সেই দেশ ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কজা করে নিলেও একছত্র হতে পারল না। ভারতের সকল মতবাদকে এক ছাতার তলায় আনতে পারল না, যেটা আরবে হজরত মোহম্মদ সফলতার সঙ্গে পেরেছিল।

ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে যে বদনামগুলি সর্বজনবিদিত, সেগুলি কি অনর্থক?– (১) লাখ টাকার ব্রাহ্মণ ভিখারি। (২) খাদ্য-লোভী ব্রাহ্মণ। এ কথাগুলি ব্রাহ্মণদের কতটা সম্মান প্রদর্শন করে! যজমানদের বাড়িতে গিয়ে ব্রাহ্মণদের হামলা হামলি করাই লাখ টাকার ভিখারি প্রতিপন্ন হল। কিছু সুবিধাবাদী ধান্ধাবাজ ব্রাহ্মণ রাজানুগত্য পেয়ে রসেঘিয়ে থাকলেও অধিকাংশ ব্রাহ্মণদের হাল মোটেই ভালো ছিল না। কারণ শাস্ত্রানুযায়ী ব্রাহ্মণগণ যজন-যাজন, অধ্যয়ন-অধ্যাপনা নিয়ে থাকবে, পরের চাকরি করবে না, কৃষিকার্য করবে না এবং রাজবাড়ি বা ধনীদের গৃহে-দপ্তরে খিদমদগারির মাধ্যমে অর্থোপার্জন করবে না। ব্রাহ্মণ হয়ে অন্য উপায়ে টাকাপয়সা করলে সমাজ নিন্দা করে। সবচেয়ে ঘৃণা করা হত রাজবাড়ির অর্থপুষ্ট ব্রাহ্মণকে। তা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণগণও অন্য পেশায় নিযুক্ত না হয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারল না। পেট বড়ো বালাই। বামনাইগিরির নিকুচি করেছে! অবশেষে মরা পোড়ানোর (ডোমের চাকরি!) চাকরি হলেও আবেদনপত্র প্রেরণ। রিক্সা চালানো, মোট বওয়া, জুতো পালিশ করা –এরকম সব কাজেই ব্রাহ্মণদের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

ব্রাহ্মণদের খাওয়াতে পারলে যজমানরা যেমন খুশি হন, তেমনি ব্রাহ্মণগণও যারপরনাই খুশি হন। সঙ্গে সন্তুষ্টজনক দক্ষিণা তো আছেই। তাই আজও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য এবং অবজ্ঞা-ভরে হলেও কোনো অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণভোজন করানোর রীতি চালু আছে। কেননা —

“মুখ না থাকায় প্রেতাত্মা ব্রাহ্মণের মুখে করে যে ভোজন।
ব্রাহ্মণ ভোজন না করালে প্রেতাত্মা করে যে রোদন।।

মনুসংহিতার ১/৯৫ নং শ্লোকে যে বিধান আছে, তা দেখব —

“যস্যাস্যেন সদাশ্নতিহব্যানি ত্রিদিবৌকনঃ।
কব্যানি চৈব পিতরঃ কিস্তুতমধিকং ততঃ”।

অর্থাৎ, বাস্তবিক স্বর্গবাসী দেবগণও যাঁর মুখে হবনীয় দ্রব্য সামগ্রী সবসময় ভোজন করে থাকেন, শ্রাদ্ধাদিতে প্রদত্ত অন্নাদি পিতৃগণ যাঁর মুখে গ্রহণ করেন,সেই ব্রাহ্মণ অপেক্ষা অধিকতর শ্রেষ্ঠ এই পৃথিবীতে আর কেই-বা আছেন। তাই “তুষ্যন্তি ভোজনৈর্বিপ্রা ময়ূরাঃ ঘনগর্জিতৈঃ” এবং অবশ্যই “নৃত্যন্তি ভোজনৈর্বিপ্রা”।

শাস্ত্রমতে কর্মের ভিত্তিতে চার বর্ণে ভাগ করা হয়েছে। ব্রহ্ম সম্পর্কে জ্ঞান। অর্জনকারীরাই ব্রাহ্মণ। এখনকার সব পুরোহিতকে কে ব্রাহ্মণ বলছেন! আর বললেও কোন্ যুক্তিতে বলছেন? সব ব্রাহ্মণ কিন্তু পুরোহিত নয়। পুরোহিত এবং ব্রাহ্মণ আলাদা ব্যাপার। তবে আপনি যদি কোনো পুরোহিতকে জিজ্ঞাসা করেন তবে দেখবেন তাঁরা নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে পরিচয় দেন। আর তাঁরা তাঁদের বর্ণের পরিচয় এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, কারও হাতের অন্নগ্রহণকে পাপ বলে মনে করেন। যা হাস্যকর একটি ব্যাপার! একজন জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকে কেউই এই ধরনের ব্যবহার আশা করে না। আগেই বলেছি, জন্মগতভাবে তো কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারে না। এটা শুধুমাত্র একটা পদ বলতে পারেন। যেমন শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এরকম! যোগ্যতার ভিত্তিতে! রামায়ণ, মহাভারত গ্রন্থগুলিতে লক্ষ করলেই আমরা তা জানতে পারব। ব্রাহ্মণ হল ব্ৰহ্ম সম্পকে জ্ঞান অর্জনকারী। আমি যতটুকু জানি, কোনো নির্দিষ্ট দু-একটি গ্রন্থ পড়ে ব্ৰহ্ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। যাঁরা একটি ধর্মের শাস্ত্রীয় গ্রন্থের নাম বলতে অক্ষম, তাঁদের ব্রাহ্মণ বলার যুক্তি কোথায় আমি বুঝি না!

হলায়ুধ, যিনি লক্ষ্মণসেনের সমসাময়িক এবং তাঁর যুগের প্রধান স্মৃতিকার ছিলেন। তাঁর ব্রাহ্মণসর্বস্ব গ্রন্থরচনার সমর্থনে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, রাঢ় ও বরেন্দ্র ব্রাহ্মণরা বেদ পাঠ করে না। ফলে তাঁরা বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানের নিয়মাবলির সঙ্গে পরিচিত নয়। তাতে কী হয়েছে? ব্রাহ্মণ্যবাদ জাঁকিয়ে বসেছে এখানেও।

ব্রাহ্মণ্যবাদ মুক্ত একটা সমাজ চাই। পৌরহিত্যই ভারতের সর্বনাশের মূল। পুরোহিতগিরি পেশাকে নির্মূল করতে না-পারলে তোক ঠকাবার ব্যাবসা বন্ধ হবে না। সমাজ থেকে পুরোহিতগিরি বর্জন করতে হবে। পুরোহিতদের প্রত্যাখ্যান করেই বিয়ে, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠান করা শুরু করতে হবে। সংস্কৃত ভাষার মোহ ত্যাগ করে বাংলায় প্রার্থনা করুন। ঈশ্বর অবশ্যই শুনবেন এবং মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। ডঃ আম্বেদকরের বক্তব্য যথার্থ –“ধূর্ত ব্রাহ্মণরা শাস্ত্র রচনা করে হিন্দুদেরকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে একেবারে বোকা বানিয়ে ফেলেছে।” অতএব পুরোহিত বর্জন।

এ প্রবন্ধ ব্রাহ্মণ-বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেয় না এবং অবশ্যই ব্রাহ্মণ্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করছি। যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিগণ প্রচলিত শ্রাদ্ধ না করে শুধু শ্রদ্ধাই জানান, বাকি সব বর্জন করুন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর বাণী ও রচনার দশম খণ্ডে লিখলেন, “মৃত্যুর পর মানুষ স্বর্গে যায় এটা কল্পনামাত্র। সজ্জন ব্যক্তি মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়া অনন্ত সুখময় জীবনযাপন করে– এই ধারণা স্বপ্নমাত্র। স্বর্গ ও নরক এসব আদিম ধারণা।” ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকলে আপনার মাতৃভাষায় নিজেরাই তার কাছে প্রার্থনা জানানো যায়। হিন্দুধর্মকে রক্ষা করতে চাইলে অবিলম্বে ব্রাহ্মণ্যবাদের নিষ্পত্তি করতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দের নাম ভাঙিয়ে যাঁরা নানা কিছু করেন, তাঁরা সোচ্চারে বলুন এবং অক্ষরে অক্ষরে পালন করুন। কী বলবেন? পড়ন, স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর “জাতি, সংস্কৃতি ও সমাজ” গ্রন্থে যা বলেছেন– “পৌরহিত্যই ভারতের সর্বনাশের মূল। যেখানেই পুরোহিততন্ত্রের আবির্ভাব, সেখানেই ধর্মের গ্লানি। …এসো মানুষ হও। প্রথমে দুষ্টু পুরুতগুলোকে দূর করে দাও। কারণ এই মস্তিষ্কহীন লোকগুলো কখনও শুধরোবে না। …আগে তাঁদের নির্মূল করো।”

মনু, মনুসংহিতা এবং হিন্দুবাদের ভারতবর্ষ

ঋগবেদে মনুকে মানবজাতির পিতা বলা হয়েছে। তিনি আদিত্য বিবস্বতের পুত্র বলে বিবস্বান, স্বয়ম্ভু ব্ৰহ্মার পুত্র বলে স্বায়ম্ভুব মনু, যাস্কের নিরুক্তে মনু দুস্থানীয় দেবতা, তৈত্তিরীয় সংহিতায় মনু এক পরিবারের পিতা, শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে সুপ্রসিদ্ধ মনুমৎস্যকথা অংশে তিনি মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা। তিনি মানবজাতির পিতা, তাই তিনি নৈতিক ও সামাজিক আদর্শের প্রবর্তক –মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি, যজ্ঞানুষ্ঠানের সৃষ্টিকর্তা, শাসক ব্যবহার বিষয়ে প্রামাণ্য ব্যক্তি, মহর্ষি, বেদবিদ্যায় বিদ্বান, পৃথিবীর উৎপত্তি-স্থিতি-প্রলয়ের কারণ তিনি জানেন।

পুরাণ মত অনুযায়ী মনু ব্ৰহ্মার দেহ থেকে তৈরি হয়েছেন। সুতরাং, পৃথিবীতে ভগবান ব্রহ্মার একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন মনু। যাকে স্বায়ম্ভব মনু বলা হয়। তবে জানা গেছে ব্রহ্মার ইচ্ছায় ১৪ জন মনু [স্বায়ম্ভব (ব্রহ্মা ও গায়ত্রী থেকে সম্ভূত),স্বরোচিষ, উত্তম, তামস, রৈবত, চাক্ষুষ, বৈবস্বত বা সত্যব্রত,সাবর্ণি, রোচ্য, ভৌত, মেরূ সাবৰ্ণি,ঋভু, ঋতুধামা, বিস্বব] জন্ম নিয়েছেন এবং এদের সবাই ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছেন। স্বায়ম্ভুব মনু ব্ৰহ্মার কাছ থেকে স্মৃতিশাস্ত্র পাঠ করা শিখে তা তার শিস্যদের তা পাঠ করান। পরবর্তীতে ভৃগু নামে একজন মনুর আদেশে এই ধর্মশাস্ত্র ঋষিদের কাছে ব্যাখা করেন। যা এখন ‘মনুসংহিতা নামে পরিচিত। এই মনুসংহিতাই ব্রাহ্মণ্যবাদের আকরগ্রন্থ, প্রাণভোমরা। বলা হয় বেদের পরে মনুসংহিতা সৃষ্টি হয়েছে। ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনুর দেখানো পথ অনুসরণ করে বাকি ১৪ জন মনু এই শাস্ত্র ধারণ ও পরিবর্ধন করেছেন। মুলত “ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনু” এর বর্ণিত শ্লোকগুলিই বাকি মনুরা সম্পাদনা ও টীকা বা ব্যাখ্যা যোগ করেছেন এবং কিছু কিছু আইন ও আচরণ পদ্ধতির প্রবর্তন করেছেন। এরকমই একটা পরিচয় অনেকেই বিশ্বাস করেন।

এখন প্রশ্ন হল মনু কি সত্যিই ‘ভগবান’ ছিলেন? আমরা এ লেখার পরতে পরতে দেখতে চেষ্টা করব মনু কেমন ভগবান ছিলেন। মনুসংহিতার পাতাতেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারি। উত্তর সেখানেই লুকিয়ে আছে। বস্তুত মনু ছিলেন একজন শাসক বা রাজা, ব্রাহ্মণ-শাসক –ভগবান কখনোই নয়। ভগবান যে নয়, তার প্রমাণ মনুর সৃষ্টিতত্ত্ব। সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি তিন জায়গায় তিন রকম বর্ণনা করেছেন। পড়ুন–

(১) মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ের পঞ্চম থেকে উনিশতম শ্লোকে সৃষ্টিতত্ত্বে। বলছেন, আদিতে এই বিশ্ব অন্ধকারময় ছিল, তার অস্তিত্ব বোঝা যেত না, কোনো কিছুরই লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন ছিল না, প্রমাণগ্রাহ্য ছিল না। সব কিছু ছিল অবিজ্ঞেয়। যেন সবদিকে প্ৰসুপ্ত, তারপর অপ্রতিরোধ্য শক্তিসম্পন্ন অন্ধকারনাশক ভগবান স্বয়ংভূ স্বয়ং