কেউ জানে না, একুয়ো কত গভীর। দাঁড়ান, আলোটা আর-একটু তুলে ধরি। নিন, এবার ভালো করে দেখুন। সহ্যের শেষ সীমায়–পৌঁছোলে কোনও মেয়ে কখনও এভাবে প্রাণ দিতে পারে? আপনিই বলুন?
(তিতু–আমার তিতু, সোনামণি, তুই কোথায়?)
না, স্যার, আমি তো কিছু বলিনি। বরং আমার মনে হল, আপনি বোধহয় কিছু বলতে চাইছেন। দাঁড়ান, একমিনিট…।
কী করছি জিগ্যেস করছেন? চাবিটা ঘুরিয়ে দেখছি, তালাটা ঠিকমতো কাজ করছে কি না। এখন তো সব মহলের দরজাতেই চাবি লাগাতে হবে, তাই একবার দেখে নিলাম, যাতে পরে ভুল না-হয়। জানেনই তো, মিস্টার সেনগুপ্ত এই ঘরটা সবসময় বন্ধ করে রাখারই পক্ষপাতী। গত পাঁচ সাত বছরে এ-ঘরে আমি ছাড়া আর কেউ কখনও আসেনি–অন্তত আজ রাতের আগে। আর আমার মনে হয়, আগামী পাঁচ-সাত বছরেও এ-ঘরে কেউ আসবে না। আর যদিও-বা আসে, কুয়োর ঢাকনাটা নিশ্চয়ই কেউ খুলে দেখবে না, কী বলেন? এই সমস্ত মহলের দেখাশোনা আমি নিজেই করি। এ ছাড়া সবকিছু ঝকঝকে তকতকে রাখতে আমি ভীষণ ভালোবাসি–দেখুন না, এই বর্শাটাই দেখুন! কেমন নতুনের মতো ঝকঝক করছে! ফলাটা দেখেছেন, কীরকম ধারালো!
ওঃ, কিছু মনে করবেন না, স্যার, আপনার লাগল নাকি?
পাগল বলছেন, স্যার? না, স্যার, আমি পাগল নই। পাগল তো ছিল তিতিরের স্বামী, এর মধ্যেই ভুলে গেলেন? সে তো এখন বন্দি রয়েছে পাগলাগারদে। আমার শুধু সামান্য স্ট্রোকমতন হয়েছিল–তা-ও বছরদশেক আগে। তাতে আমার শরীরের তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। মিস্টার সেনগুপ্ত কিছু টাকা দিয়ে আমাকে হালকা কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন বটে, কিন্তু এখনও আমার গায়ের জোর দেখলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। সেইজন্যেই বলছি, আমি হলে এই মুহূর্তে এই বর্শাটাকে ঠেকানোর কথা চিন্তাও করতাম না, স্যার। তাতে আপনার ভালোর চেয়ে খারাপই হবে।
জানেন স্যার, বেশি জানাটাই অনেক সময় মানুষের বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। তিতু সরকার, তাই না? ওই নামটাই তো প্রথমে বলেছেন আপনি? কিন্তু, স্যার, আপনি কি জানেন, মেয়েটার নাম ছিল সুবর্ণা। ওই নামটাই ছাপা হয়েছিল সব খবরের কাগজে। তিতির ছিল ওর ডাক নাম। তবে চেনাশোনা লোক আর রিলেটিভরা ওকে তিতির নামেই ডাকত। আর আমার কাছে, হয়তো ওর স্বামীর কাছে, হয়তো আরও একজনের কাছে ওর আদরের নাম ছিল তিতু। আর তা ছাড়া, আপনি কী করে জানলেন যে, ওর চোখ ছিল একটু কটা কালো নয়? রিপোর্টাররা যখন এখানে আসে, তখন ওর চোখজোড়া বোজাই ছিল। কিন্তু ওর সেই ভালোবাসার লোক জানত।
হ্যাঁ, স্যার, এখন আমি আপনাকে বেশ চিনতে পারছি। সেই সময় আপনি মিস্টার সেনগুপ্তের কাছে প্রায়ই আসতেন দরকার ছাড়াও আসতেন। হয়তো তিতুর জন্যেই আসতেন। তিতিরের ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আমার কিছু বোঝাঁপড়া বাকি আছে। ওর স্বামী এখানে থাকলে ভালোই হত–তা হলে আসরটা বেশ জমত, হয়তো বেচারার পাগলামো কিছুটা সারত। যাক, সে যখন নেই, তখন মিছিমিছি তার কথা ভেবে লাভ কী! আসুন, এবার কাজের কথায় আসা যাক…।
ভাবতে অবাক লাগে, তাই না? ভালোভাবে চিন্তা করতে গেলে একে নিয়তির খেলা অথবা ঈশ্বরের লীলা ছাড়া আর কীই-বা বলবেন? কে জানত, আপনি এইভাবে, একা পায়ে হেঁটে এখানে আসবেন! এবং এই বর্শা আর চাবিটা আমি বাজি রাখতে পারি যে,–এ দুটো জিনিস আমার কাছে যে কত দামি, তা কি এখনও আপনাকে খুলে বলতে হবে, স্যার?–আপনি কোথায় যাচ্ছেন সে কথা কাকপক্ষীকেও বলে আসেননি। অথচ এ-জায়গা ছেড়ে চলে যেতেও আপনি পারেননি। হয়তো তিতু আপনাকে দিনের-পর-দিন নিশির ডাকের মতো টেনেছে। আপনি বা আমি হয়তো কোনওদিনই বুঝতে পারব না, এখানে আসার পেছনে আপনার আসল কারণটা কী।
আপনি কি স্বপ্নেও ভেবেছিলেন, তিতুর বুড়ো বাপ আজ দশটা বছর ধরে শুধু আপনারই অপেক্ষা করেছে? সুতরাং, আমার বিশ্বাস, আমার ইচ্ছেই আজ আপনাকে টেনে নিয়ে এসেছে এই নরকের দরজায়…।
উঁহু, আমি হলে কিন্তু এরকম করে মোটেই চিৎকার করতাম না, স্যার। তাতে শুধু-শুধু আপনার গলারই ক্ষতি হবে। কারণ জানেনই তো, এখানে আপনার চিৎকার শোনার লোক এক আমি ছাড়া আর কেউই নেই। আর আগেই তো আপনাকে বলেছি, এখানকার দেওয়ালগুলো ভীষণ মোটা।
বিশ্বাস করুন, সত্যিকারের পাথরের তৈরি একটুও বাড়িয়ে বলছি না…।
আস্তিনের তাস
প্রথমে হুমকি দেওয়া কয়েকটা ফোন পেয়েছিলাম। তারপর অফিসে দুবার হানা দিয়েছিলেন ভদ্রলোক। তারপর আর আসতে পারেননি।
প্রথমবারে যখন আসেন তখন ওঁর চেহারায় পরিপাটি একটা ব্যাপার ছিল। ভেতরে উত্তেজনা থাকলেও মুখে শান্ত ভাব বজায় রেখেছিলেন। আমার চেম্বারে ঢুকে পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, আমি সীমারেখার হাজব্যান্ড-অশোকেন্দু–মানে, অশোক বোস…।
সীমারেখা। ওর শরীর আর যৌবনের কোনও সীমানা নেই। তাই ওকে সবসময় আমি অসীমা বলে ডাকতে ভালোবাসি।
এই লোকটা–এই কালো চেহারার হোঁতকা কালাচাঁদ পাবলিকটা সীমারেখার স্বামী! ভাবাই যায় না।
সীমা অবশ্য বলেছিল, ওর স্বামীকে কুৎসিত দেখতে–শুধু দেখতে নয়, ভেতরটাও কুৎসিত। সুযোগ পেলেই ওকে মারধোর করে। আর ওই স্যাডিস্টটার সঙ্গে বিছানা মানে লাঞ্ছনা আর যন্ত্রণা।
আমি লোকটাকে বসতে বলিনি ইচ্ছে করেই। কারণ, আমার অনুমান যদি ভুল না হয় তা হলে এই লোকটাই গত কদিন ধরে আমাকে টেলিফোনে হুমকি দিচ্ছে।
