দেখেছেন, কুয়োর ভেতরের গা বেয়ে জং ধরা লোহার সিঁড়ি কেমন খাড়া নেমে গেছে? আগেকার দিনে এইরকম সিঁড়ি খুব ব্যবহার হত।…এই সিঁড়ি বেয়েই তো ভেতরে নেমে গিয়েছিল তিতিরের স্বামী। তুলে এনেছিল কচি বউয়ের ডেডবডি। ভাবা যায় না, তাই না? কিন্তু লোকটা বুঝতে পেরেছিল, ওর জন্যেই ওর বউ সুইসাইড করেছে। সেইজন্যেই হয়তো ওইরকম সাহসের কাজ করতে পেরেছিল।
তিতিরের স্বামীর খবর জিগ্যেস করছেন? কেন, শোনেননি আপনি? ওই ঘটনার পর লোকটা পাগল হয়ে যায়। তখন তাকে পাঠানো হয় পাগলা-গারদে। এখনও সে সেইখানেই খাঁচায় বসে আছে।
যদ্দুর আমি শুনেছি, মেয়েটা অনেকদিন ধরেই স্বামীর আড়ালে ওইসব লটরপটর চালিয়ে যাচ্ছিল–বুঝতেই তো পারছেন…। তারপর একদিন যখন মেয়েটা বুঝল, ওর পেটে বাচ্চা এসেছে, তখন ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ল। এত খোলামেলা ভালোবাসার জন্যে নিজেকেই শাপশাপান্ত করতে লাগল। তারপর একদিন ও গেল ওর ভালোবাসার লোকের কাছে। জানতে চাইল, এখন ও কী করবে।
লোকটা ওকে বোকার মতো কথা বলতে মানা করল। বলল, এর মধ্যে করাকরির কী আছে? ওর তো জলজ্যান্ত স্বামীদেবতা রয়েছে একটা; তা হলে আবার ভয় কীসের! শুধু ওকে যা করতে হবে, তা হল মুখে কুলুপ এঁটে চুপচাপ বসে থাকা। ব্যস!
কিন্তু সে বুঝল, তার প্রস্তাবটা তিতিরের পছন্দ হয়নি। নিজের স্বামীকে ঠকিয়ে বাচ্চার দায় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা ওর মোটেই ভালো লাগছে না। তিতির চেয়েছিল, সেই বিপদের সময় সে এসে ওর পাশে দাঁড়াক। চেয়েছিল, পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে। চেয়েছিল, নিজের স্বামীকে আবার আগের মতো ফিরে পেতে। কারণ, আমার মনে হয়, মেয়েটা ওর স্বামীকে সত্যিই প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। শুধু ওই লোকটার চটকের কাছে ওর ভালো-মন্দ জ্ঞান কদিনের জন্যে গুলিয়ে গিয়েছিল…।
যাকগে, সেকথা থাক, আসল কথায় ফিরে আসি। তারপর সেই লাভার ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। বলল, কিছুদিন তাকে ভাবার সময় দেওয়া হোক। তারপর তারা এ নিয়ে আবার আলোচনা করবে। দেখবে, কী করা যায়। কিন্তু পরদিন তিতিরকে ফেলে রেখে সে গ্রাম ছেড়ে সটকে পড়ল–জানি না কোথায়।
না, স্যার, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি তো তখন এখানে ছিলাম না, তাই সব কিছু ঠিক ঠিক জানাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি শুধু কল্পনার রং মিশিয়ে গল্পটা আপনাকে বলছিলাম। হয়তো আসলে ঘটনাটাই ছিল অন্যরকম। না, আপনার কথামতন, মিস্টার সেনগুপ্তই যদি সেই লোক হন, তা হলে তিনি পালাননি–গ্রামেই ছিলেন এবং তাঁকে নিয়ে যথারীতি জঘন্য কাদা ছোঁড়াছুড়িও হয়েছিল। কিন্তু এখন শুধু আমি নয়, গ্রামের আরও অনেক লোকের ধারণা, মিস্টার সেনগুপ্ত হয়তো সত্যিই কোনও দোষ করেননি।
যাই হোক, মেয়েটা ওর স্বামীর কাছে গিয়ে সরাসরি সব খুলে বলল–শুধু তার নামটুকু ছাড়া–সে-নাম ও কাউকেই বলেনি। সব শুনে স্বামী লোকটা একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তা হওয়ারই কথা। কারণ, লোকে বলে, সে নাকি বউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করত, ভীষণ ভালোবাসত ওকে। শুনেছি, তিতিরকে সে কোনওরকম বকাঝকা করেনি। শুধু শান্ত চুপচাপ থেকে মেয়েটার অবাক চোখের সামনে ঘর থেকে আস্তে-আস্তে বেরিয়ে গিয়েছিল। তারপর যখন জলভরা চোখ নিয়ে মেয়েটা তাকে অনুসরণ করল, পা জড়িয়ে ধরল, তখন সে আর সইতে পারেনি–ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা চড় মেরেছিল বউয়ের গালে। নিজের কষ্ট-পাওয়া মনের অবস্থাটা সে আর চাপতে পারেনি। বলেছিল, শেষ পর্যন্ত এই আমার পাওনা ছিল।
হ্যাঁ, স্যার, আপনার কথা আমি মানছি। আমি একটু সিনেমা-টিনেমা দেখতে ভালোবাসি। নইলে বানিয়ে বানিয়ে ছবির মতো সব বলছি কী করে! আপনি তো জানেন, গাইডদের একটু আধটু গল্প বানানোর ক্ষমতা না-থাকলে চলে না। তা ছাড়া, আপনি যদি আমার মতো দিনের পর-দিন, একা, এই নির্জন নিঝঝুম দুর্গে ঘুরে বেড়াতেন, তা হলে আপনিও সমস্ত কিছু ছবির মতো দেখতে পেতেন। জানেন, মাঝে-মাঝে রাতের দিকে আমি ওদের স্পষ্ট দেখতে পাই! হয়তো আমার মনের ভুল। আর কিছু না হোক, বয়েস তো হয়েছে।
জানেন, আমার মনে হয়, এটুকুও সেই অবুঝ মেয়েটার বোঝার ক্ষমতা ছিল না যে, কত দুঃখে, কত হতাশায়, ওর স্বামী ওর গায়ে হাত তুলেছে। ও ভাবল, এই বোধহয় ওদের সম্পর্কের শেষ। আর সে যদি ওকে ছেড়ে চলে যায়, তা হলে জীবনের আর রইল কী! তাই তিতির পারল
অপেক্ষা করতে, পারল না সে আঘাত সইতে, পারল না আশায় বুক বাঁধতে। ও দিশেহারা হয়ে ছুটে এল এই পোড়ো দুর্গে..বুক-ভরা কান্না নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল কুয়োর ভেতরে।
তারপর মাত্র পাঁচমিনিট–তার বেশি নয়। সে ফিরে এল ছুটতে ছুটতে। পাগলের মতো ডাকতে লাগল বউয়ের নাম ধরে–কিন্তু তখন বড় দেরি হয়ে গেছে। যখন সে তিতিরকে কুয়োর ভেতর থেকে তুলে আনল, তখন ও মারা গেছে। ওর কালো চুল ভিজে লেপটে রয়েছে মুখের ওপর, সুন্দর উজ্জ্বল চোখজোড়ায় জমে রয়েছে কাদা। তিতিরের বডিটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে ওর স্বামী কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।
..ঠিক এইখানটায়, যেখানে এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি। তারপর থেকেই এই ভারী লোহার ঢাকনাটা লাগিয়ে দেওয়া হল কুয়োর মুখে। যাতে সহজে কেউ এটাকে খুলতে না-পারে–শুধু আমি ছাড়া।
