কাকু, অনুপম আছে? হাসিমুখে জিগ্যেস করল ছেলেটি।
মুখটা চেনা-চেনা লাগছে কি? সুনন্দ ঠিক ঠাহর করতে পারছিলেন না। ওঁর কপালে কয়েকটা ভাজ পড়ল।
চিনতে পারছেন না! আমি অভ্র। অনুপম কি পড়ছে এখন?
কী জানি, পড়ছে বোধহয়। তুমি যাও না, ও দোতলার ঘরে আছে।
অভ্র হেসে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। সুনন্দ চলে এলেন গেটের বাইরে। হঠাৎই ওঁর মনে হল, অভ্রর জামার ফাঁক দিয়ে তিনি যেন একটু ব্যান্ডেজমতো দেখতে পেয়েছেন। কে জানে, ফুটবল খেলতে গিয়ে হয়তো পাঁজরে চোট পেয়েছে।
বাজার করে ফিরতে ফিরতে প্রায় ঘণ্টাখানেক লেগে গেল।
সদরের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই কল্যাণীকে দেখতে পেলেন। একটা গাছের আড়াল থেকে এমন উদভ্রান্তের মতো বেরিয়ে এলেন যেন কাউকে খুঁজছেন।
সুনন্দকে দেখেই কাছে এগিয়ে এলেন কল্যাণী। হাঁপাতে হাঁপাতে জিগ্যেস করলেন, বুবুকে বাইরে কোথাও দেখলে?
না তো! কী হয়েছে? সুনন্দ কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন।
তুমি বাজারে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ওকে আর দেখতে পাচ্ছি না। ঘরে ব্রেকফাস্ট দিতে গিয়ে দেখি নেই। তারপর এখানে-ওখানে সবজায়গায় খুঁজলাম… যন্ত্রের মতো মাথা নাড়লেন কল্যাণী ও কোথাও নেই…।
অভ্র নামে ওর এক বন্ধু যে ওকে খুঁজতে এল…আমি বললাম, তুমি যাও, ও দোতলায় আছে…সেই ছেলেটা কোথায়?
অভ্র? দেখা করতে এসেছিল? আমি তো টের পাইনি!
তুমি হয়তো রান্নাঘরে কি টয়লেটে ছিলে–টের পাওনি। দ্যাখো, ওর সঙ্গেই কোথায় বেরিয়েছে। এক্ষুনি চলে আসবে।
সুনন্দ কল্যাণীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন। বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, তাড়াহুড়ো করতে হবে, নইলে অফিসে দেরি হয়ে যাবে।
কল্যাণীর মন মানছিল না। যেতে-যেতে বারবার পিছন ফিরে তাকাচ্ছিলেন। স্কুলে যাওয়া তখন ওঁর মাথায় উঠেছে।
সুনন্দর কাছে অভ্রর চেহারার বর্ণনা শুনে কল্যাণী বললেন, মনে হচ্ছে, কাল বিকেলে এই ছেলেটাই গেট দিয়ে ঢুকেছিল। পরে কী ভেবে চলে গেছে।
সুনন্দ চুপ করে রইলেন। সাড়ে দশটায় তিনি যখন অফিসে বেরোলেন তখনও বুবু ফিরল না।
রাস্তায় বেরিয়ে এদিক-ওদিক দোকানদারদের কাছে খোঁজখবর করে জানতে পারলেন, অনুপমকে তারা একটি ছেলের সঙ্গে হেঁটে যেতে দেখেছে। এর বেশি আর কেউ কিছু জানে না।
সুনন্দর অফিসে বারবার ফোন যেতে লাগল ও বুবু এখনও ফেরেনি। সুনন্দ বাধ্য হয়ে অফিস থেকে বাড়ি চলে এলেন। তারপর শুধু একে-তাকে ফোন করা, বুবুর খোঁজ করা।
বুবুর ঘর সার্চ করে ওর একটা ছোট্ট ডায়েরি পাওয়া গেল। তাতে বেশ কিছু ফোন নম্বর পাওয়া গেল। তারপর আবার ফোন। ফোনের পরে ফোন।
কিন্তু কোনও লাভ হল না। বুবু কোথাও নেই।
রাত দশটার সময় স্বামী-স্ত্রীতে মিলে এলাকার থানায় মিসিং ডায়েরি করলেন। ছেলের একটা ফটো জমা দিয়ে সব খুলে বললেন। অভ্র নামের ছেলেটির চেহারার বর্ণনাও দিলেন।
থানার অফিসার-ইন-চার্জ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মতো ওঁদের আশ্বাস দিলেন আপনারা বাড়ি যান। আমরা কাজ শুরু করে দিচ্ছি। হসপিটাল, নার্সিংহোম সব খোঁজ করে দেখছি কোনও অ্যাক্সিডেন্টের কেস গেছে কি না। আর অভ্র ছেলেটাকেও আমরা ট্রেস করার জন্যে লেভেল বেস্ট চেষ্টা করছি। দরকার হলে আপনাদের পুরোনো পাড়াতেও এনকোয়ারি করব। ওর যেসব বন্ধুদের নামধাম দিলেন তাদেরও ইন্টারোগেট করে দেখব। মোদ্দা কথা, উই আর পুটিং ইন আওয়ার বেস্ট
এফার্টর্স। কোনও লিডই আমরা বাদ দেব না।
রাতের নির্জন পথ ধরে ওঁরা বাড়ি ফিরে এলেন। এতক্ষণ কল্যাণী বারবার চোখ মুছছিলেন। বাড়িতে এসে লাজলজ্জার মাথা খেয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। আর সুনন্দর বুকের ভেতরটা থেকে-থেকেই মুচড়ে উঠছিল।
ওঁরা দুজনেই বুঝতে পারছিলেন বুবুকে ওঁরা কত ভালোবাসেন।
*
চুলচেরা তদন্ত করেও পুলিশ অনুপমের কোনও হদিশ পেল না।
প্রতিদিন থানায় খবর নিয়ে নিয়ে সুনন্দ আর কল্যাণী ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। ওঁদের ওপরে অভিমান করে বুবু কি চিরদিনের জন্য ওঁদের ছেড়ে চলে গেল? কিন্তু কেন যাবে! আর অভ্রকেই বা কেন সঙ্গে নেবে!
দশদিনের দিন ও. সি. একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে করে সুনন্দদের বাড়িতে এলেন।
রাত তখন প্রায় সাড়ে নটা।
মুখটাকে পাথরের মতো করে সুনন্দ টিভি দেখছিলেন। কল্যাণী ভেতরের ঘরে গোছগাছের কাজ করে নিজেকে ব্যস্ত রাখছিলেন। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠল।
দরজা খুলে অফিসার ইন-চার্জকে দেখেই সুনন্দর মুখ শুকিয়ে গেল। ও. সি.-কে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি কোনও খারাপ খবর নিয়ে এসেছেন। ওঁর মুখ গম্ভীর। হাতে একটা ফাইল।
ওঁকে বসতে দিয়ে কল্যাণীকে চেঁচিয়ে ডাকলেন সুনন্দ। টের পেলেন, গলা কেমন যেন চিরে গেল।
ও. সি. বললেন, সরি, মিস্টার চৌধুরী, আপনার ছেলেকে এখনও আমরা ট্রেস করতে পারিনি। আমরা যা-যা করার সব করেছি…বাট য়ু নো…মানে, এখন লালবাজারের মিসিং পারসন্স স্কোয়াডের হাতে ব্যাপারটা ছেড়ে দিতে হবে।
কল্যাণী কখন যেন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন। নিথরভাবে অফিসারের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।
সুনন্দ ইতস্তত করে বললেন, এখন….এখন আমাদের কী করার আছে?
সেটাই তো ভাবছি… একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোয়ালে হাত বোলালেন অফিসার। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎই বললেন, ও হ্যাঁ, যে জন্যে এসেছি। ইনভেস্টিগেট করে একটা ব্যাপার আমরা কনফার্ম করতে পেরেছি। আপনাদের ছেলের কিডন্যাপিং-এর পেছনে মানে, যদি কেসটাকে আমরা কিডন্যাপিং বলে ভাবি–ওই পাবলো শিকদারের কোনও হাত নেই। কারণ, অনুপম মিসিং হয় এগারো তারিখ সকালে আর ওই অ্যান্টিসোশ্যালটা দশ তারিখে দুটো গ্যাং-এর এনকাউন্টারে গুলি খেয়ে সিরিয়াস ইনজুরি নিয়ে হসপিটালাইজড হয়। আর তার পরের দিনই মারা যায়…।
