ও যদি কোনও শাগরেদকে পাঠিয়ে থাকে। মানে, ওই অভ্র নামের আনোন ছেলেটা যদি ওর গ্যাং-এর হয়… সুনন্দ আর কী বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।
এই দেখুন না, ওখানকার লোকাল থানা থেকে আমরা পাবলোর ফাইলের কপি আনিয়েছি। তাতে ওর দলের লিস্টে অ নামটা পাইনি। হাতের ফাইলটা খুলে ও. সি. পাতা ওলটাচ্ছিলেন।
ফাইলের দিকে চোখ পড়তেই সুনন্দ চমকে উঠলেন। এ কী! ওই ছবিটা কার?
আচমকা ফাইলের ওপরে ঝুঁকে পড়ে হাত বাড়িয়ে একটা পৃষ্ঠা চেপে ধরলেন সুনন্দ। সেই পৃষ্ঠায় আঁটা একটা পাসপোর্ট ফটো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে কঁপা গলায় চেঁচিয়ে বললেন, এই তো! এই তো অভ্র! এই..এই ছেলেটাই সেদিন বুবুকে খুঁজতে এসেছিল!
কল্যাণী প্রায় ছুটে চলে এলেন সুনন্দর পাশে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আঁচ করতে চাইলেন, এই ছেলেটিকেই তিনি দশ তারিখে ছাদ থেকে দেখেছিলেন কি না।
অফিসার অবাক হয়ে তাকালেন স্বামী-স্ত্রীর দিকে।
কী বলছেন আপনি! অভ্র কেন হবে! এটা তো ওই গ্যাংস্টার পাবলো শিকদারের ছবি!
সঙ্গে-সঙ্গে যেন শীত নেমে এল ঘরের মধ্যে। প্রাচীন বাড়িটা অন্তর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সুনন্দ ঘামতে শুরু করলেন। কল্যাণী বড়-বড় শ্বাস ফেলতে লাগলেন। অ্যাজমার টানটা ওঁকে কষ্ট দিচ্ছিল।
দশ তারিখে পাবলো শিকদার কখন গুলি খেয়েছে? জানতে চাইলেন কল্যাণী। ওঁর কঁপা গলা উত্তেজনায় টান-টান।
সুনন্দর হাতটা সরিয়ে দিয়ে ফাইলের পাতা ওলটালেন ও. সি.। পকেট থেকে রিডিং গ্লাস বের করে মনোযোগ দিয়ে দেখে বললেন, রিপোর্টে আছে সাড়ে চারটে থেকে পাঁচটার মধ্যে।
সুনন্দ অবাক চোখে কল্যাণীর দিকে তাকালেন। কী বলতে চাইছেন কল্যাণী ছেলের শোকে ওঁর কি মাথার গোলমাল হয়ে গেল!
পরদিন পাবলো শিকদার কটার সময় মারা গেছে? ভাঙাচোরা গলায় কল্যাণী আবার প্রশ্ন করলেন।
ফাইলের পাতায় তর্জনীর দাগ টানতে টানতে উত্তরটা খুঁজে পেলেন অফিসার।
সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ…।
সবাইকে চমকে দিয়ে কান্নায় ভাঙচুর হয়ে গেলেন কল্যাণী। সুনন্দর হাত আঁকড়ে ধরে বুকফাটা গলায় হাহাকার করে উঠলেনঃ বুবু আর কোনওদিন ফিরে আসবে না গো, আর কোনওদিন ফিরে আসবে না। ও…মাগো..মা…।
কী হল তোমার! পাগলের মতো এসব কী বলছ! সুনন্দ কল্যাণীর দুকাঁধ ধরে জোরে আঁকুনি দিলেন : তুমি শান্ত হও। প্লিজ…।
মুখে আঁচল গুঁজে কান্না বন্ধ করতে চাইলেন কল্যাণী। জড়ানো গলায় স্বামীকে বললেন, এখনও তুমি বুঝতে পারোনি! তোমার বন্ধু ঠিকই বলেছিল ও আগে বোঝা যাবে না। পরে, অনেক পরে, যখন বুঝবে…তখন…তখন আর কিছু করার থাকবে না। অনেক দেরি হয়ে যাবে…অনেক দেরি হয়ে যাবে।
সুনন্দ এবার বোধহয় একটু একটু করে বুঝতে পারছিলেন। বিপিন চ্যাটার্জি তা হলে একবর্ণও মিথ্যে বলেননি।
ও. সি. কল্যাণীর কথার কোনও মাথা-মুণ্ডু খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি সুনন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে ইশারায় প্রশ্ন করলেন? কী ব্যাপার?
কল্যাণী তখন জল-ভরা শূন্য দৃষ্টি মেলে ভূতে পাওয়া মানুষের মতো বিড়বিড় করে বলে চলেছেন : …দশ তারিখ বিকেলে পালো শিকদার গুলি খেয়ে মরতে-মরতেও মরেনি। তাই ও আসতে-আসতেও আসেনি। ওর প্রেতাত্মা আমাকে আবছাভাবে দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেছে। পরদিন সকালে পাবলো শিকদার মারা যেতেই ওর প্রেতাত্মা সটান এসে হাজির হয়েছে। নিশির ডাকে ভুলিয়ে আমার ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। বুবু আমাকে বলেছিল, পাবলো শিকদার মার্ডারের কোনও সাক্ষী রাখে না। ওঃ মাগো…।
সুনন্দ মাথা ঝুঁকিয়ে দু-হাতে কপাল চেপে ধরলেন। চাপা কান্নায় ওঁর শরীরটা ফুলে-ফুলে উঠছিল।
ও. সি. কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।
কল্যাণী ফিসফিস করে নিজের মনেই কীসব বলছিলেন।
তবে ওঁরা তিনজনেই বুঝতে পারছিলেন, অনুপম আর কোনওদিনও ফিরে আসবে না।
আপনার নির্বাচন
আপনাকে আমি একটু সমস্যায় ফেলতে চাই। খুব বড় মাপের কিছু না হলেও এটাকে মোটামুটি মাঝারি মাপের সমস্যা বলা যায়। আসলে আমাদের গোটা ব্যাপারটাই মাঝারি। যেমন, আপনার বয়েস মাঝারি, বুদ্ধিবৃত্তি মাঝারি, যদি বউ থাকে তো বউয়ের সৌন্দর্য মাঝারি, এমনকী উচ্চতা–তাও মাঝারি।
এই মাঝারি মাপের সমস্যাটা হল নির্বাচন ও আপনার পছন্দ করার ক্ষমতা। উঁহু, ভুল হল। বরং বলা উচিত একই ধরনের কয়েকটা জিনিসের মাঝ থেকে নিজের পছন্দটি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা।
যেমন ধরা যাক, তিন-তিনটে মেয়েকে আপনি ভালোবাসেন। অথবা ভালোবাসেন বলে নিজে মনে করেন। মেয়ে তিনটির নাম ধরা যাক, রূপবতী, ধনবতী ও কলাবতী। রূপ, ধন ও কলা সংক্রান্ত গুণাবলি ওদের সকলেরই প্রায় সমান-সমান। আপনি ওদের তিনজনকেই চেনেন, জানেন, পছন্দও করেন। এমন অবস্থায় হঠাৎই একদিন আপনাকে বলা হল, তিনজনের মধ্যে থেকে একজনকে আপনার বেছে নিতে হবে। তখন আপনার অবস্থাটা কী হবে একবার ভাবুন তো!
আমি জানি, আপনি তিন-তিনটি রাত জেগে কাটাবেন। দাঁত দিয়ে নখ কাটবেন। কিংবা মাথার মাঝারি-সংখ্যক চুলের বেশ কিছু উপড়ে নেবেন। অথচ এতসবের পরেও আপনি নিঃসন্দেহ হয়ে বলতে পারবেন না কোনটি আপনার পছন্দ।
রূপবতী, ধনবতী, কলাবতী–এই তিন নারীর গোলকধাঁধায় আপনি ঘুরপাক খাবেন। অবশেষে মরিয়া হয়ে যদি বা কিছু নির্বাচন করেন, তাহলে সন্দেহ নেই, কয়েক দিন, কিংবা মাস, কিংবা বছরের পর আপনি সুনিশ্চিত প্রমাণ পেয়ে যাবেন যে, আপনার নির্বাচনে গলদ ছিল।
