বুবু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মলিন হাসল।
কিন্তু সন্ধেবেলাতেই অনুপম সবকিছু ভুলে হুল্লোড়ে মেতে উঠল। ওর কলেজের তিন বন্ধু সুমিত, কিশোর আর সুবর্ণা এল ওদের বাড়িতে। ঘণ্টাখানেক পড়াশোনা চলার পর টেপ রেকর্ডার চালিয়ে গানবাজনা শুরু হল। সঙ্গে কল্যাণীর হাতে তৈরি চিংড়ির পকোড়া, ফিঙ্গার চিত্স, আর কফি।
আরও ঘণ্টাখানেক হইহই করে আড্ডা দিয়ে ওরা চলে যাওয়ার পর সুনন্দ বুবুকে বললেন, তোর বন্ধুবান্ধবদের মাঝে-মাঝেই আসতে বলিস। তা হলে অন্তত ভালো-মন্দ খাবার কিছু কপালে জুটবে। আড়চোখে কল্যাণীর দিকে তাকালেন তিনি।
কল্যাণী রাগ দেখিয়ে বললেন, তুমি ছেলের সামনে মিথ্যে কথা বললে! কেন, তোমাকে প্রন পকোড়া কি ফিঙ্গার চিত্স কখনও করে খাওয়াইনি?
হাসলেন সুনন্দ : খাইয়েছ। তখন বুবু ছোট ছিল হামাগুড়ি দিত।
বুবু মজার চোখে মা-কে দেখছিল।
কল্যাণী ওকে জিগ্যেস করলেন, কী রে, তোর মনে নেই?
কী করে মনে থাকবে। আমি তো তখন হামাগুড়ি দিতাম।
বাবা আর ছেলে একসঙ্গে হেসে উঠল। কল্যাণী কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, আমিও শোধ নেব। তারপর রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
সেদিন রাতে আবার সেই ফোনটা এল। সুনন্দ ফোনটা ধরে বুবুকে দোতলা থেকে ডাকলেন।
বুবু ফোন ধরে অনেকবার হ্যালো বলেও ও-প্রান্ত থেকে কোনও সাড়াশব্দ পেল না। ও বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দিল। তারপর যেভাবে সিঁড়ি লাফিয়ে দোতলায় উঠল তাতে মনে হল ভয়টা এবার ওকে কামড় বসাতে পারেনি।
পরদিন বুবু কলেজে বেরিয়ে গেল, সুনন্দও অফিসে রওনা হলেন, কিন্তু কল্যাণীর ছুটি থাকায় অলসভাবে একা-একা দিনটা কাটালেন। বিকেলে ছাদে উঠে আনমনাভাবে পায়চারি করতে করতে নানান পুরোনো কথা ভাবছিলেন। এইভাবে কখন যেন ছাদের আলসের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। বড়-বড় গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সদরের লোহার গেটটা দেখা যাচ্ছিল। গেটটা সবসময় ফুটদুয়েক ফাঁক করে চেন-তালা দিয়ে বাঁধা থাকে। গেট থেকে যে-পথটা বাড়ির দিকে এগিয়ে এসেছে সেটা গাছের সবুজ পাতায় খানিকটা আড়াল হয়ে গেছে। পথের এখানে-ওখানে শুকনো পাতা ছড়িয়ে আছে। কাল সকালে কাজের মাসি আবার আঁট দেবে।
কখন ফিরবে বুবু? বলেছিল সন্ধের আগেই ফিরবে।
হঠাৎই কল্যাণী দেখলেন, একটি ছেলে গেট দিয়ে ঢুকে বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। ছেলেটার রোগা চেহারা অনেকটা অনুপমের মতোই। তবে একটু বেশি লম্বা মনে হল। মাথাটা সামান্য ঝুঁকে থাকায় কল্যাণী মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন না।
ছেলেটা এগিয়ে আসতে-আসতে দোতলার বারান্দার নীচে আড়াল হয়ে গেল। এইবারই বোধহয় কলিংবেল বাজাবে!
তাড়াতাড়ি নীচে নেমে এলেন কল্যাণী। দরজার কাছে যেতে-যেতে কলিংবেলের শব্দ আশা করছিলেন, কিন্তু কোনও শব্দ হল না।
দরজা খুলে অবাক হয়ে গেলেন।
কেউ নেই!
এলোমেলো শুকনো পাতা ছড়ানো পথটা চুপচাপ একা-একা লোহার গেট পর্যন্ত গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। আর কেউ নেই!
রাস্তা দিয়ে যাওয়া গাড়ির শব্দ, গাছের মাথায় পাখিদের শেষ বিকেলের কিচিরমিচির, বাতাসে দোল-খাওয়া পাতার খসখসানি শুনতে পাচ্ছিলেন কল্যাণী। কিন্তু কারও পায়ের শব্দ নেই।
বাইরে বেরিয়ে বাড়িটার চারপাশে তন্নতন্ন করে খুঁজলেন। না, কেউ নেই।
তখন কল্যাণী বাইরের লোহার গেটের কাছে গেলেন। রাস্তায় পা দিয়ে এপাশ-ওপাশ দেখলেন। নাঃ, ওরকম চেহারার কোনও ছেলেকে চোখে পড়ছে না।
গেট থেকে খানিকটা দূরে একটা ঝুপড়ি-দোকান। চা-ঘুগনি রুটি বিক্রি করে। ওই দোকানদারকে কি জিগ্যেস করা যায়? না, জিগ্যেস করলে লোকটা ভাববে কল্যাণী ভূতের ভয় পেয়েছেন।
কল্যাণী বাড়িতে ঢুকে পড়লেন আবার। মনে হয়, তিনি যখন নীচে নামছিলেন, ছেলেটা তখন গেট দিয়ে বেরিয়ে চলে গেছে। বোধহয় ভুল করে এ-বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল।
সুনন্দ আর অনুপম বাড়িতে ঢোকামাত্রই ব্যাপারটা ওদের জানালেন। দুজনেই আহ্বাদে একেবারে লাফিয়ে উঠল : এতদিনে তা হলে ভূতের দেখা পাওয়া গেছে।
সুনন্দ ঠাট্টা করে বললেন, বিপিন দেখছি ঠিকই বলেছিল? আগে বোঝা যায় না। তবে মানতেই হবে, এ নিতান্ত নিরিমিষ ভূত। এল আর মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল!
বুবু চাপা গলায় বলল, বাবা, মা কিন্তু এবার রেগে যাবে।
কল্যাণী গম্ভীরভাবে বললেন, আমি ভূতের কথা কিছু বলিনি–মানুষের কথাই বলেছি। আমি ভেবেছি তোমাকে বা বুবুকে কেউ খুঁজতে এসেছে।
দেখতে কেমন, মা? বুবু জিগ্যেস করল।
ওপর থেকে মুখটা ভালো করে দেখা যায়নি।
বোধহয় ভুল করে এ-বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল। সুনন্দ মন্তব্য করলেন, আমি তোমার সঙ্গে এতক্ষণ মজা করছিলাম। এবার কি একটু চা খাওয়াবে?
কল্যাণী হেসে বললেন, অত তোয়াজের দরকার নেই–এমনিতেই চা খাওয়াতাম।
ঠোঁটে একচিলতে হাসি নিয়ে মায়ের চলে যাওয়া দেখল বুবু। সত্যি, এ-বাড়িতে এসে ওদের জীবনটাই যেন বদলে গেছে! চারপাশটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনটাও কেমন সবুজ আর খোলামেলা হয়ে গেছে।
সেদিন রাতে ও অনেক সুন্দর-সুন্দর স্বপ্ন দেখল।
.
পরদিন সকালে সুনন্দ একটু বেলা করেই বাজারে বেরোচ্ছিলেন, গেটের কাছে একটি লোকের সঙ্গে ওঁর দেখা হল।
বয়েস আঠাশ কি তিরিশ হবে। চোখে সাধারণ ফ্রেমের চশমা। ফরসা সৌম্য মুখে একটা হাসি-হাসি ভাব। নাকের বাঁ-পাশে একটা বড় তিল। চুলগুলো সামান্য উশকোখুশকো–যেন দু-চারদিন তেল কি চিরুনি পড়েনি। গায়ে রঙিন চেক শার্ট, পায়ে জিম্স।
