গোটাপাঁচেক বড়-বড় ঘর। মার্বেল পাথর বসানো মেঝে, বারান্দা, অলিন্দ। যদিও পাথরে লম্বা-চওড়া ফাটল ধরেছে।
ইশ, মেঝেগুলো কী ঠান্ডা! কল্যাণী খালি পায়ে মেঝেতে পা দিয়েই মন্তব্য করলেন।
স্রেফ ভূতের কল্যাণে বাড়িটা এমন সস্তায় পেয়ে গেলাম। সুনন্দ খুশির সুরে বললেন।
তাও আবার এমন ভূত যে, আগে বোঝা যায় না।
মায়ের কথা শুনে অনুপম অবাক হয়ে গেল, বলল, তার মানে?
কল্যাণী তখন বিপিন চ্যাটার্জির কথাগুলো ছেলেকে মজা করে শোনালেন। মনে হল, বহুদিন পর কল্যাণী আর সুনন্দ ছেলেকে কাছে ফিরে পেয়েছেন। কল্যাণীর বুকের পাথরটা কখন যেন অণু পরমাণু হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
অনুপম বলল, মা, আমি দোতলার বারান্দাওলা ঘরটায় থাকলে তোমাদের প্রবলেম হবে?
প্রবলেম? কল্যাণীর দিকে তাকিয়ে হাসলেন সুনন্দ? আমরা তো মনে-মনে ওই ঘরটাই তোর জন্যে ঠিক করেছি!
দু-চারদিনের মধ্যেই নতুন বাড়িতে ওঁরা গুছিয়ে বসলেন।
প্রথম-প্রথম টেলিফোন ছাড়া বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। টেলিফোন ট্রান্সফারের অ্যাপ্লিকেশান সুনন্দ অনেক আগেই করে দিয়েছিলেন। ফলে কুড়ি-বাইশ দিনের মাথায় টেলিফোন চলে আসামাত্রই ওঁরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। নতুন বাড়িতে আর কোনও অসুবিধে রইল না।
সুনন্দর অফিস, কল্যাণীর স্কুল আর অনুপমের কলেজ নতুন বাড়ির সঙ্গে ছন্দে মানিয়ে গেল। এ ছাড়া পাড়াটাও বেশ নিরিবিলি আর নির্জন। পাবলো শিকদারের মতো উৎপাত এখানে নেই।
কল্যাণীর মনে হল, এখানকার বাতাসে অক্সিজেন বোধহয় বেশি। অ্যাজমার টানটা কমে গেছে। ভেতরটা সবসময় কেমন চঞ্চল উদ্দাম হয়ে উঠতে চায়। ছাদের খোলা হাওয়ায় বেড়ানো, বাগানে শুকনো পাতা মাড়িয়ে পায়চারি, পাখির ডাক…ওঃ ভাবা যায় না!
সুনন্দ কিন্তু প্রথম দিন থেকেই বাড়ির আনাচেকানাচে ভূত খুঁজে চলেছেন। তা নিয়ে বউ কিংবা ছেলের সঙ্গে ঠাট্টা-মজাও কম করছেন না। রাত দশটার পর বাড়ির অন্ধকার ঘর, বারান্দা, কি অলিন্দে হঠাৎ করে পায়চারি শুরু করে দেন। চেঁচিয়ে কল্যাণীকে বলেন, শোনো, আমি এখন চিরুনি তল্লাশি করে ভূত খুঁজছি। আমাকে এখন ডিসটার্ব করবে না।
তারপর সিগারেট ধরিয়ে পায়চারি, তার সঙ্গে আবৃত্তি : পরশু রাতে পষ্ট চোখে দেখনু বিনা চশমাতে, / পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা করছে খেলা জোছনাতে…ওরে আমার বাঁদর-নাচন আদর গেলা কোঁকা রে, / অন্ধবনের গন্ধগোকুল, ওরে আমার হোঁকারে! আয়, আয়–দেখা দে বাবা, দেখা দে…।
জীবনের ছন্দ যখন বেশ সহজ আর স্বাভাবিক হয়ে এল তখন একদিন কল্যাণী ছেলেকে একা পেয়ে শ্রীকান্তর কথাটা বললেন।
পাবলো শিকদার মার্ডার করেছে শুনে তুই খুব আপসেট হয়ে গেছিস। আসলে ওইসব লোক তো এই টাইপেরই হয়। ওখান থেকে সরে এসে কত ভালো হয়েছে বল তো!
বুবু মায়ের দিকে একবার তাকাল। তারপর দাঁত দিয়ে বাঁ-হাতের নখ কাটতে লাগল।
বাইরে বেলা চড়ে এসেছে। গাছগুলো খসখসে আওয়াজ তুলে হাওয়ায় দুলছে। ঘুঘু পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। বারান্দার মার্বেলের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। রোদ পড়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।
বুবু হঠাৎ এক অদ্ভুত চোখে মায়ের দিকে তাকাল। কয়েক লহমা চুপ করে থাকার পর বলল, শ্রীকান্ত পুরোটা জানে না। তোমাকে সত্যি কথাটা বলে দেব? ভয় পাবে না তো?
কল্যাণীর মুখ পলকে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চেরা গলা দিয়ে ভালো করে আওয়াজ বেরোল না। বেশ কষ্ট করে বললেন, নাবল।
পাবলোদা যখন ওই নাইটগার্ডটাকে মার্ডার করে তখন আমি দেখে ফেলেছি। পালোদাও আমাকে দেখে ফেলেছিল। পরদিন একথা আমার কাছ থেকে শোনার পর স্যান্টো আর অভিরূপ…ওরা আমার খুব বন্ধু…আমাকে বলেছিল, পালোদা মার্ডারের কোনও সাক্ষী রাখে না। আমি যখন বললাম, পালোদা আমাকে ছোটভাইয়ের মতো ভালোবাসে, খুব লাইক করে–তখন স্যান্টো বলে, বাইরে থেকে দেখে তুই পালোদার ভেতরটা কিছু বুঝতে পারবি না। আর…আর অভিরূপ আমার দিকে আঙুল তুলে হাতটা রিভলভারের মতো এইরকম করে মুখে স করে গুলি করার শব্দ করেছিল…।
কল্যাণী অনুপমের কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ছেলের মুখটা কী করুণ আর মলিন দেখাচ্ছে! তা হলে সেই সময়ে ও মৃত্যুভয়ে পাগল ছিল!
এখানে আর কোনও ভয় নেই, বলো, মা– কল্যাণীর দিকে চেয়ে হাসল অনুপম ও তা ছাড়া আমি তো আর পুলিশকে কিছু বলিনি!
ধীরে-ধীরে হাত বাড়িয়ে ছেলের ডানহাতটা আলতো করে চেপে ধরলেন কল্যাণী। অনুপমের হাতটা কেমন ঠান্ডা মনে হচ্ছিল।
বিড়বিড় করে কল্যাণী বললেন, তোর কোনও ভয় নেই…আমরা তো আছি…।
জানলার বাইরে থেকে বুলবুলি পাখির ডাক শোনা গেল।
ওরাও আমার পাশে আছে। ভাবলেন কল্যাণী।
আর-একটা কথা তোমাকে বলব,? আচমকা কথা বলল অনুপম।
কী, বল–
গতকাল রাতে আমার একটা ফোন এসেছিল। বাবা ধরে আমাকে ডেকে দিয়েছিল। আমি যখন ফোনটা ধরে হ্যালো বললাম তখন ওপাশ থেকে কোনও সাড়া পেলাম না। অনেকক্ষণ ধরে হ্যালো হ্যালো করেও যখন সাড়াশব্দ না পেয়ে রিসিভার নামিয়ে রাখতে যাচ্ছি তখন চাপা গলায় কে যেন বলল, অনু তো? তারপরই লাইন কেটে গেল।
অনুপমের মুখে কালো ছায়া নেমে এল হঠাৎ। নিচু গলায় অস্পষ্টভাবে ও বলল, পালোদা আমাকে অনু বলে ডাকত। আমাদের ফোন নাম্বার পাবলোদা জেনে গেছে, মা।
কল্যাণী ভয় পাচ্ছিলেন, তবে প্রাণপণ চেষ্টায় সেটা ছেলের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখলেন। ওর হাতে চাপ দিয়ে পুরোনো কথাটাই আবার বললেন, আমরা তো আছি…।
