কল্যাণী রান্নাঘরে ছিলেন। অনুপম সেখানে উঁকি মেরে চাপা গলায় বলল, মা, একবার শুনবে।
ওর গলায় এমন একটা টেনশান ছিল যে, কল্যাণীর খুন্তি-ধরা হাত কেঁপে গেল। গ্যাসের আঁচ কমিয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
কী হয়েছে রে?
কেউ আমাকে ডাকতে এলে বলে দেবে বাড়ি নেই।
ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কল্যাণী ওর ভেতরটা পড়ে ফেলতে চাইলেন। মনে হল যেন একটা অচেনা ভয় অনুপমের ভেতরে তিরতির করে কাঁপছে।
কী ব্যাপার? কোনও গোলমাল হয়েছে না কি?
কল্যাণীকে কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেল অনুপম। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, নাঃ, কিচ্ছু হয়নি। তারপর চটপট চলে গেল নিজের ঘরের দিকে।
কল্যাণী নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটা বিষধর সাপ মসৃণ মেঝের ওপর দিয়ে খুব ধীরে-ধীরে যেন ওঁর দিকে এগিয়ে আসছিল। কিন্তু সাপটা ঠিক কোথায় ছোবল মারবে সেটা কল্যাণী আঁচ করতে পারছিলেন না।
পরদিন থেকেই সুনন্দ আর কল্যাণীকে অবাক করে দিয়ে অনুপম নতুন বাড়িতে যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে উঠল। বাড়িটা একদিন দেখেও এল ও। তারপর বলতে গেলে একরকম ওর তাড়াতেই এক রবিবার দুপুরে নতুন বাড়িতে চলে এল ওরা।
কৌতূহলের তাড়নায় সুযোগ বুঝে অনুপমকে বারকয়েক বিরক্ত করেছেন কল্যাণী। জানতে চেয়েছেন, অনুপম হঠাৎ ভয় পেয়েছে কেন। মুখে কুলুপ এঁটে থাকলেও শেষ পর্যন্ত অনুপম এইটুকু বলেছে, পালোদা খুব ডেঞ্জারাস টাইপের লোক। ওঁর সঙ্গে আর বিজনেস করব না।
এরপর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বহু প্রশ্ন করেও অনুপমের কাছ থেকে আর কোনও কথা কল্যাণী বের করতে পারেননি।
অনুপম শুধু একই কথা বারবার বলেছে, নতুন বাড়ির ঠিকানা এ-পাড়ার কাউকে দেবে না। ওখানে ফোন এলে ফোন নাম্বারও কাউকে দেবে না।
কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়লেও কল্যাণী ছেলের কথায় সায় দিয়ে বলেছেন, না–দেব না।
রবিবার সকালে ওঁরা যখন লরিতে মাল লোড করে সঙ্গে প্রাইভেট কার নিয়ে রওনা হবেন, ঠিক তখনই শ্রীকান্তকে দেখতে পেলেন কল্যাণী।
চোখে চশমা, কদমছাট চুল, পড়ুয়াগোছের দেখতে এই ছেলেটি স্কুলে বুবুর সঙ্গে পড়ত। এখন কলেজেও। মাঝে-মাঝেই বাড়িতে আসে। আজ ওঁরা চলে যাবেন শুনে দেখা করতে এসেছে।
প্রাইভেট কারের জানলা দিয়ে বুবুর সঙ্গে কথা বলার পর সুনন্দ আর কল্যাণীর সঙ্গে সৌজন্যের দু-চারকথা বলে চলে যাচ্ছিল শ্রীকান্ত। কল্যাণী ওকে লরির আড়ালে ডাকলেন। অনুপমের অনেক খবর রাখে শ্রীকান্ত। হয়তো ওর কাছে অনুপমের আতঙ্কের একটা কারণ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
শ্রীকান্ত, শোনো।
কী, কাকিমা? কল্যাণীর কাছে এগিয়ে এল শ্রীকান্ত।
পাবলো শিকদারের সঙ্গে বুবুর কি কিছু হয়েছে? চাপা গলায় জানতে চাইলেন কল্যাণী। ওঁর বুকের ভেতরে একটা পাথর এপাশ-ওপাশ গড়াচ্ছিল।
না তো! কেন?
তখন কল্যাণী অনুপমের ভয় পাওয়ার কথা বললেন। বললেন, বুবু বলেছে, পালেদা খুব ডেঞ্জারাস টাইপের লোক। ওঁর সঙ্গে বুবু আর বিজনেস করবে না।
দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে চারপাশে একবার দেখে নিল শ্রীকান্ত। তারপর নিচু গলায় বলল, আমি বুবুকে বহুবার বারণ করেছি, কাকিমা। আপনারা এখান থেকে চলে যাচ্ছেন, খুব ভালো হয়েছে। আসলে লাস্ট উইকে সোমবার রাতে রেললাইনের ধারে শর্মাদের সিমেন্ট গোডাউনের একজন নাইটগার্ড মার্ডার হয়েছে। রিভলভারের গুলিতে মাথার খুলি উড়ে গেছে…।
কল্যাণীর ভয়ে বুক কাঁপছিল। শ্রীকান্তর কথা আর শুনতে চাইছিলেন না তিনি। কিন্তু শ্রীকান্তকে বারণ করার শক্তি ছিল না এতটুকু।
….পাড়ার অনেকেই খবরটা জানে। তবে কাগজে কিছু আসেনি। একটু দম নিয়ে শ্রীকান্ত বলল, নাইটগার্ডটাকে পাবলো শিকদার মার্ডার করেছে। তাতেই বুবু মনে হয় ভয় পেয়ে গেছে।
বুকের ভেতরটা কেমন করছিল। শ্রীকান্তকে কোনওরকমে আসি বলে প্রায় টলতে টলতে প্রাইভেট কারের কাছে গেলেন কল্যাণী। ওঁকে দেখে সুনন্দ দুবার জিগ্যেস করলেন, কী হয়েছে? কিন্তু দুবারই কল্যাণী মাথা নেড়ে বোঝালেন কিছু হয়নি।
অনুপম মাকে দেখছিল। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বাবার প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাইছিল।
দুটো গাড়ি রওনা হতেই স্বস্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কল্যাণী। মনে-মনে ভাবলেন, উৎকণ্ঠা আর দুঃস্বপ্ন চিরতরে পিছনে পড়ে থাক।
নতুনের পথ চেয়ে ওঁরা তিনজন অপেক্ষা করতে লাগলেন।
হাজার পোশাক বদল করেও আভিজাত্যকে লুকোনো যায় না। ঠিক তেমনই রং-চং বা রিপেয়ার করে বাড়িটার প্রাচীন সৌন্দর্য চাপা পড়েনি। এক অদ্ভুত গর্ব এবং দীপ্তি নিয়ে দোতলা বাড়িটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গার ওপরে দুকাঠা জুড়ে বাড়ি। জানলাগুলোর ওপরে ঢালাই লোহার নকশা–তাতে রংবেরঙের কাচ লাগানো। দোতলার বারান্দার রেলিংও ব্রিটিশ আমলের ঢালাই লোহার জাফরি দিয়ে তৈরি। কার্নিশে সিমেন্টের কারুকাজ। যেকটা থাম চোখে পড়ে সবই যেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা।
বিশাল লোহার গেট পেরোলেই দু-পাশে ছোট-বড় গাছের দল এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে। অনেকটা যেন না-আঁচড়ানো চুলের মতো। তারই ফাঁকফোকর থেকে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।
গেট থেকেই সাদা রঙের বাড়িটা দেখা যায়। গেট দিয়ে কেউ ঢুকলে দোতলার বারান্দা কিংবা তেতলার ছাদ থেকে তাকে স্পষ্ট চোখে পড়বে। বাড়ি আর গাছপালা মিলে জায়গাটা এমন যে, ভূতের যদি সত্যি-সত্যি কোনও অস্তিত্ব থাকত তা হলে এই আস্তানা তাদের বিলক্ষণ পছন্দ হত।
