লোকটাকে সুনন্দ বা কল্যাণী কখনও চোখে দেখেননি, তবে তার অনেক গল্প শুনেছেন।
ছেলের দিকে তাকিয়ে কল্যাণী চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। এঁদের একমাত্র সন্তান কখন যে বড় হয়ে গেল, কখন যে এরকম হয়ে গেল, ওঁরা টের পাননি। এই তো সেদিন ও টলোমলো পায়ে মাম, মাম বলতে-বলতে কল্যাণীর কোলে ঝাঁপিয়ে আসত। টেলিফোনে কথা বলার জন্য বায়না করত। হ্যালো বলতে পারত। আর থ্যাংক য়ু-কে বলত খ্যাংকু। হইহই করে গোটা বাড়ি মাতিয়ে রাখত। সুনন্দ বাজার থেকে মাগুর মাছ নিয়ে এলে জুজুমাছ বলে থাবা মারতে চাইত।
সকলের আদরের বুবুসোনা কী তাড়াতাড়ি অনুপম হয়ে গেল। নার্সারি, প্রাইমারি, মাধ্যমিক, এইচ, এস, তারপর কলেজ। ছুটে যাওয়া ট্রেনের জানলা দিয়ে যেন সিনেমা দেখছিলেন কল্যাণী। ফ্ল্যাশব্যাক। বুবু থেকে অনুপম পর্যন্ত।
তারপর পাবলো শিকদার!
কল্যাণীর ভেতরটা ভাঙচুর হয়ে গেল। চোখে মেঘ-বৃষ্টি। মুখে হাত চাপা দিয়ে ছেলের কাছ থেকে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলেন। ভেতরে-ভেতরে একটা তরাস কাজ করছিল। যে করে তোক অনুপমকে বাঁচাতে হবে। যে করে হোক!
সে-রাতেই সুনন্দর সঙ্গে কথা বললেন। এতক্ষণ গলা টিপে রাখা কান্নাটা উথলে বেরিয়ে এল বাইরে। স্বামীকে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে জড়ানো গলায় কী যে বললেন বোঝা গেল না। মুখের বাক্য না বুঝলেও অন্তরের কথা শুনতে পেয়েছিলেন সুনন্দ। অনুভব করেছিলেন, একজন মা কথা বলছে।
আর তারপর থেকেই সুনন্দ আর কল্যাণী নতুন বাড়ির খোঁজে পাগলের মতো হয়ে উঠেছেন। তবে বাড়ি খোঁজার আসল কারণটা কাউকে বলেননি। কখনও বলা যায়!
টিভিতে একটা জোরালো মিউজিক বাজিয়ে বিজ্ঞাপন শুরু হতেই কল্যাণী স্মৃতিপথ থেকে ফিরে এলেন। তখনই দেখলেন, অনুপম জিনসের পাঞ্জাবি আর সরু পাজামা পরে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে-গোটাতে ফ্ল্যাটের দরজার দিকে এগোল অনুপম। চটি পায়ে গলাতে গলাতে দেওয়ালকে বলল, আমি একটু বেরোচ্ছি।
কল্যাণী বললেন, তাড়াতাড়ি ফিরিস।
কিন্তু ততক্ষণে শব্দ করে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।
.
বাড়ি বদলের তোড়জোড় চলতে লাগল। বিপিন চ্যাটার্জি সাধ্যমতো দৌড়ঝাঁপ করতে লাগলেন। আর কল্যাণী অনুপমকে ব্যাপারটা জানানোর জন্য একটা সুবর্ণ মুহূর্তের খোঁজে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
একদিন রাতে মরিয়া হয়ে অনুপমের মুখোমুখি হলেন কল্যাণী।
বুবু, আমরা এ-পাড়া ছেড়ে চলে যাচ্ছি।
অনুপম টেবিলে বসে কীসব হিসেবপত্র করছিল। টেক্ল-ল্যাম্পের আলো ছিটকে পড়েছে। ওর মুখে। কল্যাণী আলোর ছটার বাইরে আঁধারি উপচ্ছায়া অঞ্চলে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মায়ের কথায় অনুপম মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। আলো পড়ে ওর মাথার চুল চকচক করতে লাগল, তবে মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। তাই বিরক্তির ছাপটা কল্যাণী দেখতে পেলেন না।
এ-পাড়া ছেড়ে চলে যাচ্ছি মানে!
এই ভাড়ার ফ্ল্যাটে আমাদের…খুব অসুবিধে হচ্ছে। আমাদের বয়েসও বাড়ছে। তা ছাড়া নতুন যে-বাড়িটার খোঁজ পেয়েছি সেটা বেশ খোলামেলা। ওখানে গেলে আমার অ্যাজমার টানটা কমবে।
হাতে ধরা পেনটা টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে দিল অনুপম, চাপা গলায় বলল, হোপলেস!
কল্যাণী বেপরোয়া হয়ে ছেলের কাছাকাছি চলে গেলেন। বহু বছর যা করেননি তাই করলেন, সাহস করে ওর মাথায় আদরের হাত রাখলেন!
আমাদের ভালো তুই চাস না?
অনুপম চুপ করে রইল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে থাকার পর কল্যাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর মলিন গলায় বললেন, আমরা প্রতিমুহূর্তে তোর ভালো চাই।
অনুপমের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা বুবুটা অল্প-অল্প জেগে উঠল। মায়ের দিকে সামান্য চোখ তুলে আলতো করে জিগ্যেস করল, বাড়িটা কোথায়?
শোভাবাজারে। ভুতুড়ে বাড়ি বদনাম নিয়ে বাড়িটা বহুবছর পড়ে ছিল। বিপিনকাকা ওটার খবর দিয়েছে। ভূতের ভয় আছে বলে দারুণ সস্তায় পাওয়া গেছে।
ভূতের ব্যাপারটা শুনে অনুপম মজা পেল। বলল, ভূত! আজকাল পাওয়া যাচ্ছে না কি? তাও আবার সস্তায়!
কল্যাণী ওর কাছ থেকে সরে এসে বিছানার ওপরে বসলেন। অনুপম বোধহয় একটু-একটু করে সহজ হচ্ছে। যেহেতু ভূতে ওর কোনওকালেই ভয়-ডর নেই, তাই একটা মজা মেশানো চ্যালেঞ্জ হয়তো তৈরি হচ্ছে।
আমি তোর বাবাকে বলেছি, ও-বাড়িতে ভূতের ছিটেফেঁটা যদি থাকেও বুবু তাকে উদ্বাস্তু করে ছাড়বে। তোমার কোনও চিন্তা নেই। তুই একদিন বাড়িটা দেখতে চল।
অনুপম হাসল ও বাড়িটা বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে…।
তা ছাড়া শোভাবাজার তো কাছেই। ইচ্ছে করলে তুই রোজই এ-পাড়ায় আসতে পারবি। পাতাল রেলে এসপ্ল্যানেডে নেমে বাসে এইটুকু পথকতক্ষণ আর লাগবে!
আরও কিছুক্ষণ একথা সে কথা বলার পর ছেলের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন কল্যাণী। ওঁর মনে হচ্ছিল, বরফ গলতে শুরু করেছে।
বাড়িটা রেজিস্ট্রি হয়ে যাওয়ার পর প্যাঁচ রিপেয়ারের কাজে হাত দিয়েছিলেন বিপিন। সেটা শেষ হতে প্রায় মাসদেড়েক লাগল। তারপর একটা লাগসই ছুটির দিন খুঁজছিলেন সুনন্দ। অফিসের নানান ঝামেলা। ইউনিয়নের মিটিং, ফ্ল্যাটবাড়ির বাড়িওয়ালার কাছ থেকে অ্যাডভান্সের টাকা ফেরত নেওয়া, এইসব মিলিয়ে সময় কাটতে লাগল।
তারই মধ্যে একদিন রাত দশটা নাগাদ অনুপম বাড়ি ফিরল উদভ্রান্তের মতো।
