আপত্তি! কেউ উপকার করতে চাইলে মানুষ কখনও আপত্তি করে! সুনন্দ বিপিনের হাত চেপে ধরলেন কৃতজ্ঞতায়। মনে-মনে ভাবলেন, বিপিন জানে না বিপিন আমাদের কী বিপদ থেকে উদ্ধার করতে চলেছে।
বিপিন চলে যাওয়ামাত্রই ঘরের আবহাওয়াটা কেমন যেন বদলে গেল। হাসি-খুশির ছবিটাও মুছে গেল। সুনন্দ আর কল্যাণী বুক-চাপা অস্বস্তি নিয়ে বসে রইলেন। চুপচাপ–যেন ট্রেনের কামরায় অচেনা দুই সহযাত্রী।
সুনন্দ চোখের চশমাটা অকারণেই ঠিক করলেন। তারপর টেবিলের একপাশে পড়ে থাকা খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে পড়ার ভান করলেন। সেদিকে চোখ রেখেই বললেন, কী, এবার তুমি খুশি তো?
কল্যাণী স্বামীর দিকে তাকালেন : কেন, তুমি খুশি না?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সুনন্দ, বললেন, হুঁ খুশি। আশা করি এই এলাকা ছেড়ে চলে গেলে সমস্যাটা মিটে যাবে, কিন্তু তুমি ওকে রাজি করাতে পারবে তো?
করাতেই হবে। ওকে বোঝাতে হবে। মনে হয় ও বুঝতে পারবে।
বাইরে সন্ধে গাঢ় হয়েছিল অনেকক্ষণ। কল্যাণী উঠে ভেতরের ঘরে গেলেন। সুনন্দ টিভি অন করে রিমোট হাতে চ্যানেল সার্ফিং করতে লাগলেন।
এমন সময় ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে উঠল।
সুনন্দ চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগেই কল্যাণী ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজা খুলে দিলেন।
ঘরে ঢুকল অনুপম।
রোগাটে ফরসা চেহারা। ব্যাকব্রাশ করা চুল। ঘন ভুরুর নীচে সামান্য টানা চোখ। চোয়ালের উঁচু হয়ে থাকা হাড় কুড়ি বছরের নবীন মুখে রুক্ষতার তুলি চালিয়েছে।
কী ব্যাপার! এত তাড়াতাড়ি চলে এলি? কল্যাণী জিগ্যেস করলেন।
কল্যাণীকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় অনুপম জবাব দিল, কোচিং হল না। স্যারের শরীর খারাপ।
নিজের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সুনন্দর দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল অনুপম। তারপর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
সুনন্দ কল্যাণীর অসহায় মুখের দিকে তাকাল। তারপর আবার টিভির দিকে।
কল্যাণী পায়ে-পায়ে সুনন্দর কাছে এগিয়ে এলেন।
সুনন্দ টিভির দিকে চোখ রেখেই চাপা গলায় বললেন, এখন কিছু বোলো না। আমি যখন বাড়ি থাকব না তখন মুড বুঝে নতুন বাড়ির ব্যাপারটা বোলা।
কল্যাণী যেন অচেতনভাবে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। টিভির রঙিন ছবির দিকে তাকিয়ে অনুপমের কথা ভাবতে লাগলেন।
যখন সন্তান আসবে না এই সত্যিটা একরকম মেনে নিয়েছিলেন তখন চিকিৎসাশাস্ত্রের কী এক কারিকুরিতে অনুপম এসে পড়েছিল। তারপরই জীবনটা কী সুন্দর হয়ে গেল। হাসি, খুশি, আর ফুর্তি ছাড়া কিছু ছিল না সংসারে। কোনওরকম দুঃখ-কষ্ট গায়ে আঁচড় কাটতে পারত না।
এইভাবে আঠেরোটা বছর কীভাবে গড়িয়ে গেল কে জানে! আঠেরোটা বছরের হিসেব সেইদিন মনে পড়ল যেদিন কল্যাণী ছেলের মুখে মদের গন্ধ পেয়েছিলেন।
এলাকাটা যে খুব ভালো নয় এটা ওঁরা স্বামী-স্ত্রী আঁচ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা যে ওঁদের জীবনে আঁচ লাগাবে তা বুঝতে পারেননি।
এরপর যতই দিন যেতে লাগল ব্যাপারটা তত খারাপের দিকে গড়াতে শুরু করল।
সুনন্দকে কল্যাণী যখন জানালেন তিনি বললেন, বয়েসের ঝোঁক–পরে ঠিক সামলে নেবে।
মুখে এ কথা বললেও ভেতরে-ভেতরে সুনন্দ দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন।
একদিন সন্ধেবেলা অনুপমের বই-খাতা হাতড়ে কল্যাণী কতকগুলো বাজে ছবি পেয়েছিলেন।
সঙ্গে সঙ্গে সুনন্দর কথাটা মনে পড়েছিল : বয়েসের ঝোঁক। কিন্তু যেদিন ছেলের টেবিলের ড্রয়ার থেকে কল্যাণী সাড়ে দশহাজার টাকা পেলেন সেদিন তিনি কেঁপে গিয়েছিলেন।
পাঁচশো টাকার নোটগুলো ওঁর হাতে কিলবিল করছিল।
কোথা থেকে এত টাকা পেল অনুপম!
সুনন্দ সত্যনিষ্ঠ মানুষ। কল্যাণীও তাই। অনুপমকে সেই মূল্যবোধের ওপরে দাঁড় করিয়ে অত্যন্ত যত্নে ওঁরা মানুষ করতে চেয়েছেন। এত কষ্টের ফল এই!
কল্যাণীর চোখে জল এসে গিয়েছিল। একটু সময় নিয়ে নিজেকে শক্ত করলেন তিনি। তারপর অনেক রাতে ছেলের ঘরের দরজায় টোকা দিলেন।
আলো জ্বেলে ঘুম-চোখে দরজা খুলল অনুপম। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, পায়ে পাজামা।
কী ব্যাপার? ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করল।
তোর সঙ্গে কথা আছে। কল্যাণী ঘরে ঢুকে সোজা গিয়ে বসলেন ছেলের বিছানায়। অপলকে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কী কেস বলো তো?
তোর কথাবার্তাগুলো বদলে যাচ্ছে।
এই কথা বলার জন্যে এত রাতে ঘুম ভাঙালে? অনুপম হাই তুলল। মুখের সামনে বারকয়েক টুসকি দিল।
সাড়ে দশহাজার টাকা তুই কোথায় পেলি?
অনুপম বেশ অবাক এবং বিরক্ত হয়ে তাকাল মায়ের দিকে ও আজকাল লুকিয়ে আমার ঘর সার্চ করছ নাকি?
টাকাটা কোথায় পেয়েছিস? আমার কাছে লুকোবি না।
ও বিজনেসের টাকা।
বিজনেস! তুই বিজনেস করছিস নাকি?
হ্যাঁ।
কীসের বিজনেস?
জমি-বাড়ি কেনাবেচার বিজনেস।
কল্যাণী পাথর হয়ে গেলেন। আর সাত-আটমাস পরে যার বি. এসসি. অনার্সের পার্ট ওয়ান পরীক্ষা সে বিজনেস করছে! জমি-বাড়ির দালালির বিজনেস!
তুই কি পাগল হয়ে গেছিস! সামনে তোর পার্ট ওয়ান পরীক্ষা…তুই…তুই…।
এবার ধৈর্য হারাল অনুপম। বেশ রুক্ষভাবে বলল, বি. এসসি. পাশ করার পর কী করব বলতে পারো? চাকরি-বাকরির ব্যাপক ক্রাইসিস। এখন থেকে টুকটাক বিজনেসের লাইন ধরতে পারলে পরে আর চিন্তা থাকবে না। পালোদা বলেছে বিজনেস পার্টনার করে নেবে।
পাবলো!
শিউরে উঠলেন কল্যাণী। এই এলাকার কুখ্যাত মাস্তান এবং প্রমোটার পাবলো শিকদার। পুলিশের খাতায় ওর নাম উঠতে-উঠতে খাতার পাতা ফুরিয়ে গেছে।
