সুনন্দর স্ত্রী কল্যাণী মিষ্টি করে হেসে ঠাট্টার সুরে বললেন, তবে তো দারুণ ভালো। ভূতের ভয় পাওয়ার কোনও চান্সই নেই! কারণ, ভূত দেখার সময় ভূত বলে বুঝতে পারব না। যেমন, আপনি এখন গল্প করছেন, চা-বিস্কুট খাচ্ছেন–ব্যাপারটা এইরকমই মনে হবে। তারপর…আপনি যেমন বললেন…অনেক পরে–মানে, দু-চারদিন পরেও হতে পারে বুঝতে পারব যে, সেদিন আসলে ভূতের সঙ্গে কথা বলেছি, গল্প করেছি। তখন ভয় পাওয়ার কোনও মানে হয় না। সুতরাং আপনার ওই ভূত কাউকে ভয় দেখাতে পারবে না। এরকম দয়ালু বিবেচনা-বুদ্ধিওয়ালা ভূত সত্যিই খুব রেয়ার।
কল্যাণী বেশ কষ্ট করে হাসি থামিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। আড়চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, তোমার কী ওপিনিয়ান?
সুনন্দ হাতে হাত ঘষলেন। টেবিলে রাখা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ধরালেন। তারপর বন্ধুর দিকে তাকালেন। হাসি চেপে রাখতে ওঁরও বেশ কষ্ট হচ্ছিল।
বিপিন চ্যাটার্জি একটু আহত ভঙ্গিতে চোখ নামিয়ে টেক্ল-ক্লথের নকশাটাকে জরিপ করছিলেন। সুনন্দ ছোট্ট করে কাশির শব্দ করায় ওঁর দিকে চোখ ফেরালেন। দেখলেন, সুনন্দও রীতিমতো হাসি চাপতে চেষ্টা করছেন।
বিপিন পাছে রাগ করেন, তাই সুনন্দ হাসির ঝোঁকটা সামলে নেওয়ার সময় দিলেন। তারপর বেশ সিরিয়াস মুখ করে বললেন, দ্যাখো, বিপিন…কল্যাণী মজা পেয়ে হাসছে বলে তুমি কিছু মাইন্ড কোরো না। তুমি তো জানোই, কল্যাণী বা আমি কোনওদিনই ভূতে বিশ্বাস করিনি। আমাদের যত লেনদেন শুধু বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে। তবে ভূত আছে এই কারণে তোমার ওই ইয়েদের বাড়িটার যদি দাম কম হয়, তা হলে আমাদের তো লাভ বই লোকসান নেই! সুতরাং তুমি এগোতে পারো…।
বিপিন তক্ষুনি কোনও জবাব দিলেন না। সিগারেটে বারকয়েক টান দিয়ে তারপর চাপা গম্ভীর গলায় বললেন, তোমরা যে ভুতে বিশ্বাস করো না সেটা জানি। আর জানি বলেই সরকারদের শোভাবাজারের বাড়িটা ভূতুড়ে জেনেও কথাবার্তা এগিয়েছি। ও-বাড়িতে বছর দশেক ধরে কেউ থাকে না। সরকার ফ্যামিলির সবাই আমেরিকায় সেন্ড। শুধু একজন, বামদেব সরকার, হরি ঘোষ স্ট্রিটে থাকেন। ওঁর বয়েস হয়েছে, বিয়ে-থা করেননি। বদনামী বাড়িটা কেউ কিনতে চাইলে তিনি রীতিমতো বর্তে যান। সেইজন্যেই মাত্র সাড়ে তিনলাখ টাকা চেয়েছেন। বাড়ির পেপারস তিনি সব ক্লিয়ার করে রেখেছেন। বাড়ি বিক্রি করার রেজিস্টার্ড পাওয়ার অফ অ্যাটর্নিও ওঁর কাছে আছে….।
বাড়িটা কেনার পর রিপেয়ার খরচ কীরকম পড়বে?
তা ধরো প্রায় লাখখানেক। তবে ফার্নিচারপত্র যা আছে সবই তুমি ফ্রিতে পেয়ে যাচ্ছ। বামদেববাবু ওসব কিছু নেবেন না বলেছেন।
কেন, ওগুলো কি অভিশপ্ত? কল্যাণী জানতে চাইলেন। ওঁর কথায় একটু ব্যঙ্গের খোঁচা ছিল।
বিপিন চ্যাটার্জি উত্তর দিতে একটু সময় নিলেন। ছোট-ছোট টান দিয়ে সিগারেটটা শেষ করলেন। তারপর মুখ তুলে ঘরের খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
জানলা দিয়ে ঠিকরে আসা আলোয় ওঁর খোঁচা-খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ি চকচক করছিল। চশমার কাঁচেও খানিকটা আলো ছিটকে পড়েছিল।
সবাই চুপচাপ থাকায় কেমন একটা চাপ তৈরি হচ্ছিল ঘরের মধ্যে।
কী বললেন? অভিশপ্ত? ঠোঁটের কোণে আচমকাই হাসলেন বিপিন হয়তো হবে–আমি ঠিক জানি না। তবে একজনের কাছে যেটা অভিশাপ আর একজনের কাছে সেটা আশীর্বাদও হতে পারে। আমি দুর্বল, ভীতু মানুষজমি-বাড়ির দালালি করে পেট চালাই। বামদেব সরকারের বাড়িটা বিক্রি করিয়ে আমি সাতহাজার টাকা পাব ঠিকই, কিন্তু জোর করে কাউকে ওটা গছিয়ে দিতে চাই না..আপনাদের তো নয়ই! সুনন্দ আমার ছোটবেলার বন্ধু–একপাড়ায় থাকি। সেইজন্যেই আগে সবকিছু খোলসা করে জানিয়ে দিচ্ছি। সরকারদের বাড়িটার বেশ বদনাম আছে। তবে পিকিউলারিটি হচ্ছে, ভূতের ব্যাপারটা আগে বোঝা যায় না।
সুনন্দ মিত্র বামপন্থী মানুষ। যুক্তি দিয়ে সব খতিয়ে দেখেন। আধুনিক খোলা মন নিয়ে প্রগতির কথা ভাবেন। অফিসে ইউনিয়নের একজন হর্তাকর্তা। ওঁর স্ত্রী কল্যাণী হাই স্কুলের শিক্ষিকা। সাহিত্য, সিনেমা, সংস্কৃতি নিয়ে যথেষ্ট মাথা ঘামান। বিয়ের আগে নাটকের দল চালাতেন। পরে সময় কমে আসায় সরে এসেছেন।
বিপিন জানতেন, এই বাড়িটা নিতে ওঁরা আপত্তি করবেন না। অন্য দু-একটা বাড়ির খোঁজও বিপিন দিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলো সুনন্দর বাজেট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আর-একটু সময় পেলে বিপিন হয়তো একটু বেশি খোঁজখবর করতে পারতেন…সুনন্দর বাজেটের মধ্যেই কিছু হয়তো জুটে যেত, কিন্তু সুনন্দ আর কল্যাণী এমন তাড়াহুড়ো করছেন যে, সে-সময় আর মেলেনি। সুনন্দ বলেছেন, এ-মাসের মধ্যেই আমার বাড়ি চাই…যেভাবে হোক…।
ওঁদের তাড়াহুড়োর কারণ বিপিন জানেন না। দু-একবার বন্ধুকে জিগ্যেস করেছেন, কিন্তু সুনন্দ এড়িয়ে গেছেন। কল্যাণীও কিছু ভাঙেননি। শুধু বলেছেন, ফ্ল্যাটবাড়িতে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না।
এখন ওঁরা সি. আই. টি. রোডের যে-ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন সেটা এমনিতে খারাপ নয়। কিন্তু হঠাৎ করে কী যে হল, ফ্ল্যাটে ওঁদের আর মন বসছে না।
আরও কিছুক্ষণ ভূত, ভুতুড়ে বাড়ি, এইসব নিয়ে আলোচনার পর বেশ হালকা মেজাজেই বিপিন চ্যাটার্জি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, বামদেববাবুর সঙ্গে কথা বলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমাদের বাড়িটা দেখিয়ে নিয়ে রেজিস্ট্রির দিন ঠিক করছি। আর তুমি যখন পাকা কথা দিলে তখন আমার চেনা এক কন্ট্রাকটরকে রিপেয়ারের ব্যাপারটা আগাম জানিয়ে রাখছি…যদি অবশ্য তোমার আপত্তি না থাকে…।
