কথাটা শেষ করেই রক্তাক্ত হাতটা মুঠো পাকিয়ে টেবিলে এক প্রচণ্ড ঘুসি বসিয়ে দিল স্বপন। তারপর যেমন এসেছিল তেমনই ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল।
সেদিন রাতেই খবর পেলাম ও আত্মহত্যা করেছে।
আকাশবাণীর ঘরে অত্যন্ত বীভৎসভাবে আত্মহত্যা করল স্বপন। মৃতদেহ দেখে ওকে চেনার কোনও উপায় ছিল না। মণিকাকে সঙ্গে নিয়ে যখন ওর দোকানে গেলাম, তখন সেখানে প্রচণ্ড ভিড়। জনতার গুঞ্জন। পুলিশ কর্ডন করেছে। স্বপনের বাড়ির লোকেরা বুকফাটা কান্নায় হাহাকার তুলছে। দোকানের কাউন্টারটা একপাশে সরানো থাকায় ভিতরের দৃশ্য বেশ স্পষ্টই নজরে পড়ছে। অসংখ্য যন্ত্রপাতির মধ্যে ত্রিভঙ্গ অবস্থায় পড়ে রয়েছে স্বপনের দেহটা। পুড়ে কালো হয়ে গেছে। হাতে-পায়ে জড়ানো পোড়া কালো তারের অংশ অতি কষ্টে নজরে পড়ে।
শুনলাম, ও নাকি প্রথমে হাতে-পায়ে তার জড়িয়ে নেয়, তারপর ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের রক্তবাহী শিরাগুলো কেটে ফেলে। আর সবশেষে চারশো চল্লিশ ভোল্টের বিজলি লাইন অন্ করে দেয়। কী বীভৎস মৃত্যু!
আরও শুনলাম, দোকানের সবকটা রেডিয়ো নাকি ফুল ভলিয়ুমে চলছিল। পুলিশ অফিসাররা স্বপনের এই উদ্ভট খেয়ালের কোনও কারণ বুঝতে পারেননি। তবে ও মরার আগে নিজের হাতে স্পষ্ট চিঠি লিখে রেখে গেছে। আমার মৃত্যুর জন্যে আমি নিজেই দায়ী।
মনে আছে, স্বপনের মৃতদেহ দেখে মণিকা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।
.
এ সবই তিন বছর আগের ঘটনা। কিন্তু আজ, একটু আগেই, আমার ও মণিকার জীবনে নতুন এক ঝড় তুলেছে স্বপন।
গত তিন বছরে ওর স্মৃতি বেশ ঝাপসা হয়ে এসেছিল। শুধু মাঝে মাঝে আমার মনে পড়ে যেত ওর বীভৎস পোড়া চেহারাটার কথা। ও মারা যাওয়ার পর আকাশবাণী দোকানটাও উঠে গিয়েছিল। আমি এবং মণিকা ওকে নিয়ে আর বিশেষ মাথা ঘামাইনি। পুলিশি তদন্ত শেষ হওয়ার পর আমরা যথারীতি বিয়ে করেছি। নতুন ফ্ল্যাট নিয়ে পুরোনো পাড়া ছেড়ে চলে এসেছি আমি। আর তার এক বছর পরেই এসেছে চিকু। স্বভাবতই পরিপূর্ণ সংসারী হয়ে চিকুকে কেন্দ্র করে আমি ও মণিকা দৃঢ়তর এক বন্ধনে নতুন করে পরস্পরের কাছে বাঁধা পড়েছি।
আজ রবিবার। খাওয়াদাওয়ার পর অফিসের কয়েকটা কাগজপত্র নিয়ে বসেছিলাম। মণিকা রান্নাঘর গোছগাছ করতে করতে ট্রানজিস্টার রেডিয়োতে নাটক শুনছিল। চিকু অঘোরে ঘুমোচ্ছে। হঠাৎই রান্নাঘর থেকে মণিকার একটা অস্ফুট চিৎকার শুনতে পেলাম।
সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাজ ফেলে আমি উঠে পড়লাম। এবং উদ্ভ্রান্ত মণিকা এসে ঘরে ঢুকল। আটপৌরে শাড়ি ওর সুঠাম শরীরে জড়িয়ে রয়েছে। আঁচল কোমরে গোঁজা। ও হাঁপাচ্ছে। নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে। তিলটা সূক্ষ্মভাবে কাঁপছে। আমাকে দেখেই ও সোজা এসে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, বিজন, বিজন! এইমাত্র রেডিয়োতে স্বপনের গলা শুনলাম!
আমি যেন পাথর হয়ে গেলাম। আমার হাতের বাঁধনে মণিকার শরীর থরথর করে কাঁপছে। ওকে সান্ত্বনা দিয়ে অতিকষ্টে সামলে নিলাম। মনে পড়ল, স্বপন আমাকে যে-খেলা দেখাত, সে খেলা মণিকাকেও বহুবার দেখিয়েছে, হয়তো আচমকা সেই স্মৃতিই ওর মনে এসে ঝাপটা মেরেছে।
সেকথা মণিকাকে বলতেই ও বলল, না, বিজন, তা নয়। আমি স্পষ্ট শুনলাম, নাটক থেমে গিয়ে স্বপনের কথা শোনা গেল। ও বলল, মণিকা, মণিকা, আমি আবার তোমার কাছে এসেছি!
চকিতে দু-কাঁধ ধরে মণিকাকে কিছুটা দূরত্বে দাঁড় করিয়ে দিলাম। ভালো করে সব কথা শুনতে চাইলাম।
ও বলল, ওই একটা কথাই নাকি পরপর তিনবার শোনা গেছে রেডিয়োতে। কেমন যেন এক প্রতিধ্বনিময় কণ্ঠস্বর। প্রথম উচ্চারণের পর ধাপে ধাপে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে ও মণিকা, আমি আবার তোমার কাছে এসেছি!
মণিকাকে চিকুর কাছে যেতে বলে আমি ভাবতে বসলাম। কিন্তু রহস্যের কোনও উত্তর পেলাম না। স্বপন বক্সী মারা গেছে আজ তিন বছর। সেইসঙ্গে চিরস্তব্ধ হয়েছে তার কণ্ঠস্বর। তা হলে এই অলৌকিক আকাশবাণী প্রচারিত হয়েছে কোন প্রেতলোক থেকে? কেউ নিষ্ঠুর ঠাট্টা করছে না তো আমাদের সঙ্গে? কিন্তু কী করেই বা করবে?
সারাটা দিন দুশ্চিন্তায় কাটল। আমাদের হাসিখুশি ছুটির দিনটা ওই একটা ভয়ংকর ঘটনায় যেন হয়ে গেল কালরাত্রি। এমনকী চিকুর আধো-আধো কথাও আর হাসির হুল্লোড় তৈরি করতে পারছে না আমাদের অন্তঃস্থল থেকে।
দুপুরের পর থেকে রেডিয়োর ধারেকাছে ঘেঁষল না মণিকা। শেষ পর্যন্ত রাতে খাওয়ার সময় আমিই সাহস করে রেডিয়ো চালালাম। হিন্দি গান হচ্ছে। চিকু ঘুমিয়ে পড়েছে। মণিকা ওর কথাগুলো ভাঁজ করে বিছানায় মাথার কাছে রাখছে। এমন সময় স্বপন দ্বিতীয়বার কথা বলে উঠল।
বিজন, তুই মণিকাকে কেড়ে নিলি! কেড়ে নিলি!
এই একটা প্রশ্ন আমাকে একেবারে কুঁকড়ে দিল। প্রশ্নটা একটানা ক্রমাগত বেজে চলেছে। তার ছমছমে প্রতিধ্বনি ঘুরে বেড়াচ্ছে চার দেওয়ালের মধ্যে। যেন বিশাল কোনও খাদের অতল গহ্বর থেকে এই প্রশ্ন আমাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিচ্ছে স্বপন।
আমার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। মণিকা বিছানায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
সংবিৎ ফিরে পেয়েই রেডিয়োটা বন্ধ করে দিলাম। বুঝতে পারছি, স্বপনের মৃত্যুর ভয়াল স্মৃতি কালো ছায়া ফেলেছে আমাদের জীবনে।
দিনের পর দিন এই একই নাটক চলতে লাগল।
