এই অলৌকিক ঘটনার কথা কাউকে বলতে পারি না। বলা যায় না। শুধু দুজনে মুখ বুজে সহ্য করি। তা ছাড়া আমার শিক্ষিত যুক্তিবাদী মন এইসব ঘটনা মেনে নিতেও চায় না। আবার আমি স্বপনের কাছে হেরে যাব!
যতই দিন যায় লক্ষ করি মণিকা ক্রমেই নিজেকে গুটিয়ে ফেলছে। বুঝতে পারি, যে-সময়টা আমি বাড়িতে থাকি না, ও প্রাণভরে রেডিয়ো শোনে। শোনে সেই অলৌকিক কণ্ঠস্বর। সম্ভবত মণিকা বুঝতে পারে, তিন বছর আগে স্বপনকে ও ঠকিয়েছিল। সেই কারণেই নিজেকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে দিনরাত ও স্বপনের অভিযোগ-অনুযোগ শুনতে চায়। নিজের অপরাধবোধে ক্রমে ক্রমে ও ডুবতে চলেছে।
একদিন বাড়িতে ফিরে শুনলাম রেডিয়োতে প্রতিধ্বনিময় কণ্ঠস্বর বাজছে? …আমি এতদিন অপেক্ষা করেছি, মণিকা। চেয়েছি, সংসারের চরম সুখ বলতে কী সেটা তুমি আগে বোঝো। এখন তুমি সেই চরম সুখের খোঁজ পেয়েছ। ছেলের আধো-আধো কথা, স্বামীর আদর, নিজের তৃপ্তি। মণিকা, এখন তুমি বুঝতে পারবে, আমার কাছ থেকে তুমি কী জিনিস কেড়ে নিয়েছ! আর বিজন, বিজন আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু।
আমি ঘরে ঢুকতেই মণিকা রেডিয়ো বন্ধ করে দিল। তারপর আমার বুকে মুখ রেখে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। আমি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিলাম। একটা যন্ত্রণা আমার কণ্ঠনালীতে জমাট বেঁধে ওঠানামা করছে। মণিকার এই কষ্ট আমি আর সইতে পারছি না।
আর একদিন স্বপন যখন আমাকে লক্ষ্য করে নানান অভিযোগ করছিল, আমি হঠাৎ চিৎকার করে উঠেছি, স্বপন, তুই কী চাস?
রেডিয়োতে শোনা ওর কণ্ঠস্বরকে উদ্দেশ্য করে আমি এই প্রথম কথা বললাম। এবং ওর জবাব পেলাম সঙ্গে-সঙ্গেই। যেন ও আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। প্রচণ্ড রাগের সঙ্গে তীব্র গলায় ও বলে উঠল, জানিস না, শালা? মণিকাকে, মণিকাকে আমার চাই।
তাকিয়ে দেখি মণিকার মুখ রক্তহীন, দুধের সরের মতো সাদা।
সেই মুহূর্তে আমি বুঝেছিলাম, স্বপনের কাছে হয়তো আমাকে হারতেই হবে।
পরদিন সারা সকাল মণিকা খুশিতে একেবারে মেতে উঠল। চিকুকে নিয়ে দুরন্তপনার চূড়ান্ত করল। আমি অবাক হলেও ভীষণ খুশি হলাম। ওর মন থেকে পাষাণের ভারী টুকরোটা বোধহয় গলে বেরিয়ে আসছে বাইরে। অফিসে বেরোনোর মুহূর্তে হঠাৎই আমাকে জাপটে ধরে দুবার চুমু খেল। হাসল। তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে কেমন ডুকরে কেঁদে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, না, কিছু না। শুধু তুমি খুব ভালো হয়ে থেকো।
দুপুর দুটো নাগাদ অফিসে ফোন পেলাম।
সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে এলাম বাড়িতে। মানুষজনের ভিড় ঠেলে শোওৰার ঘরে এলাম। সিলিং পাখার সঙ্গে শাড়ি বেঁধে গলায় ফাঁস দিয়েছে মণিকা। চিকুকে প্রতিবেশীদের কেউ কোথাও সরিয়ে নিয়ে গেছে। এখনও থানায় খবর দেওয়া হয়নি। ঘরে রেডিয়ো চলছে। তাতে একটা বাংলা নাটক শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎই এক প্রতিধ্বনিময় কণ্ঠস্বর ভেসে এল রেডিয়ো থেকে : কী রে শালা, এসেছিস! তোর বাক্স থেকে একটা স্বপ্ন চুরি করে নিয়ে গেলাম রে!
উপস্থিত কেউই সেকথার তাৎপর্য বুঝল না। ভাবল রেডিয়ো-নাটকেরই কোনও অংশ। কিন্তু, হে ঈশ্বর, আমি তো জানি!
দু-হাতে মুখ ঢেকে আমি বসে পড়েছি মেঝের ওপর। জীবনে এই প্রথম কান্নার ঢেউ আমাকে বিপর্যস্ত, অসহায় করে দিল।
আকাশে কীসের শব্দ
আপনারা সকলেই জানেন, গত ১১ নভেম্বর, শনিবার, বেলা বারোটা নাগাদ দক্ষিণ কলকাতা ও দক্ষিণের শহরতলির বিস্তীর্ণ এলাকায় এক ভয়ংকর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এই শব্দের রেশ মিলিয়ে যাওয়ার আগে গড়িয়াহাট, টালিগঞ্জ থেকে শুরু করে আমতলা, নরেন্দ্রপুর পর্যন্ত সবাইকে জানান দিয়ে গেছে। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার, কিছুতেই এই শব্দের উৎসের হদিস পাওয়া যায়নি। কোনও বিস্ফোরণের ঘটনাও টের পাননি কেউ, অথবা কেউ যে হতাহত হয়েছেন এমন খবরও শোনা যায়নি। ফোর্ট উইলিয়ামের চিফ অফ স্টাফ জে. কৌশিক বলেছেন, সেদিন কোনও শব্দ তারা শোনেননি। আওয়াজের ধরনের বিবরণ শুনে তিনি বলেন, ব্যাপারটা সনিক বুম হতে পারে। সুপারসনিক কোনও প্লেন আকাশপথে উড়ে গেলে একটা শক ওয়েভ তৈরি হয়। তার ফলে নির্দিষ্ট কোনও জায়গায় বাজ পড়ার মতো জোরালো শব্দ হতে পারে। অথচ তার আশপাশের মানুষজন সেরকম কোনও শব্দই শুনতে পাবেন না। শনিবার বারবেলার শব্দটা ছিল হয়তো তাই।
শব্দের রহস্যটা রহস্যই থেকে গেছে, কারণ সেদিন বেলা বারোটা নাগাদ কোনও অজ্ঞাতকুলশীল সুপারসনিক প্লেন কলকাতার আকাশপথে উড়ে গেছে এমন কোনও প্রমাণ কেউই দিতে পারেননি।
অথচ প্রচণ্ড শব্দ যে একটা হয়েছে তাতে কোনও ভুল নেই। আর বহু বাড়ির কাচের জানলাও যে তখন ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়েছে তাও তো মিথ্যে নয়!
তা হলে কীসের শব্দ শোনা গিয়েছিল নভেম্বরের ১১ তারিখে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরাও বিস্তর মাথা ঘামিয়েছেন। সনিক বুম, মাক নাম্বার, মাক কোন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে নানা রচনা প্রকাশিত হয়েছে নানান পত্রপত্রিকায়। এমনকী অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞানী আস্ট মাকের জীবনীও ছাপা হয়েছে একটি কিশোর-পত্রিকায়। তার ফলে, বিজ্ঞানী মাকের নাম থেকেই যে মাক নাম্বার, মাক কোন্–এইসব নামকরণ করা হয়েছে, সেটাও জনসাধারণ জেনে গেছে।
কিন্তু এত সত্ত্বেও শব্দের কারণটা কেউই জানতে পারেনি।
