তখন হাতের প্যাকেটটি খুলে একটা ট্রানজিস্টার রেডিয়ো এগিয়ে দিলে মেয়েটি এই রেডিয়োটা অনেকদিন ধরেই ভীষণ গোলমাল করছে। বহু দোকানে সারানোর চেষ্টা করেছি, লাভ হয়নি। আপনার দোকানের খুব নাম শুনেছি, তাই।
আমাকে ডিঙিয়ে আগ্রহের সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিল স্বপন ও দিন তো, দেখি–।
তখন আমি ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বলেছি, পরদিন সন্ধ্যায় আসব। কেন জানি না, মনে মনে সামান্য আহত বোধ করেছিলাম। হয়তো মেয়েটির মনোযাগ স্বপনের প্রতি নিবিড় হয়েছিল বলেই। অথচ জানি, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ সে রেডিয়ো সারাতে এসেছে। আমার সঙ্গে আলাপ করতে নয়।
স্বপনের আকাশবাণীতে এরপরে যেদিন গেলাম তখন প্রায় এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। একটা হতাশা, ক্ষোভ, আর ব্যর্থতা কোন এক অজ্ঞাত কারণে আমার মনটাকে চেপে ধরেছে। মেয়েটির মুখ কিছুতেই আমি ভুলতে পারছি না। সুতরাং সাতদিন পর যেদিন স্বপনের দোকানে গেলাম, তখন তাকে দেখতে পাব এ-জাতীয় একটা ক্ষীণ প্রত্যাশা মনে যে ছিল না তা নয়। এবং সে-প্রত্যাশা পূর্ণ হল পুরোমাত্রায়।
স্বপন দোকানের ভিতরে বসে মেয়েটির সঙ্গে গল্প করছিল। আমাকে আসতে দেখে বলল, আয় বিজন, মণিকার সঙ্গে তোর আলাপ করিয়ে দিই।
সেইদিনই মণিকার সঙ্গে প্রথম আলাপ। মণিকা সরকার। পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে বি.এ. পড়ছে। ফাইনাল ইয়ার।
তিনজনে মিলে আড্ডায় বসলেও আচ্ছা তেমন জমল না। বারবারই নিজেকে ভীষণ বাড়তি মনে হল। কারণ ওরা দুজনে নিজেদের গল্পে মশগুল।
একটা সন্দেহ আমার মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। মণিকা চলে যেতেই আমিও উঠলাম। কিন্তু স্বপন আমাকে ছাড়ল না। জোর করে আটকে রাখল। চা খাওয়াল। এবং গত সাতদিনে কী করে সে ও মণিকা পরস্পরের প্রেমে পড়েছে তার বিশদ কাহিনি শোনাল। আমার সন্দেহ প্রমাণিত হল। জিভে চায়ের স্বাদ সাপের বিষের মতো ঠেকল।
সে-রাতে ঘরে ফেরার পথে একটা পরাজয়ের গ্লানি অনুভব করলাম। যুক্তি দিয়ে মনকে বোঝালাম, এর কোনও মানে হয় না। কিন্তু আমার অবুঝ মন জেদ ধরে ফুসতে লাগল। কী আছে স্বপন বক্সীর? অতি সাধারণ রোগা চেহারা। গায়ের রং মিশকালো। বিদ্যে স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। ভালো করে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতেও জানে না। পোশাক-আশাকে রুচির ছিটেফোঁটাও নেই। ওঃ অসহ্য!
অনেক চিন্তা করে দেখলাম, স্বপনের একটিমাত্র দক্ষতা মণিকাকে আকর্ষণ করেছে। সেটা হল বেতারবিদ্যা। স্বপনের কাছেই শুনেছি রেডিয়ো তৈরি করাটা মণিকার অত্যন্ত প্রিয় শখ। স্বপন যে শুধু ওকে সেই ট্রানজিস্টার রেডিয়োটা সারিয়ে দিয়েছে তা নয়, নতুন দুটো রেডিয়ো উপহারও দিয়েছে। যে-রেডিয়োতে মণিকার প্রিয় বিদেশি গান শোনা যায়। মণিকা নাকি খুব সুন্দর গান করে। সেই গান একই সঙ্গে তিন-চারটে রেডিয়োতে শুনিয়ে ওকে একেবারে তাক লাগিয়ে দিয়েছে স্বপন। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আমার গায়ের জ্বালা ক্রমশ বাড়ছিল।
কিছুদিন নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে আমি অন্য পন্থা নিলাম। একরকম জোর করেই স্বপন ও মণিকার সঙ্গে মিশতে লাগলাম। সময় ও সুযোগ পেলেই মণিকাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করি। ওর মোহভঙ্গের জন্যে তুণের সবকটি শাণিত তির একে একে নির্ভুল লক্ষ্যে নিক্ষেপ করি। একদিন, দুদিন, প্রতিদিন। স্বপন দু-একবার যে সন্দেহ করেনি তা নয়। তবে মুখে কিছু বলেনি।
অনন্ত প্রচেষ্টার পুরস্কার একদিন পেলাম।
মণিকা আমার সঙ্গে বেরোতে রাজি হল। এবং সেইদিনই আমি ওর কাছে আমার উৎকর্ষ অতি সুকৌশলে প্রতিষ্ঠিত করলাম। ওকে বোঝালাম, একজন মেকানিকের ভবিষ্যৎ মেকানিকের বেশি কিছু নয়। তা ছাড়া, রেডিয়োর প্রতি মণিকার এই আকর্ষণটা নেহাতই সাময়িক। সেটা উবে গেলে স্বপনের অস্তিত্বটুকুই কি ওর কাছে মিথ্যে হয়ে পড়বে না?
সে-রাতে বাড়ি ফেরার সময় মনে হল আমার জিত হয়েছে। আমি মণিকাকে সরল বাস্তব বোঝাতে পেরেছি। একটা আত্মপ্রসাদের ঢেউ আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল। তখন ভাবিনি, এক আকস্মিক ঝড় আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। পরদিন স্বপন আসবে আমার সঙ্গে বোঝাঁপড়া করতে।
.
চুপ করে থাকিস না! জবাব দে, বিজন! স্বপনের ভারী কণ্ঠস্বর আমাকে চমকে দিল। কাচের গ্লাসটা এখনও ওর হাতে ধরা।
পুরোনো পরাজয়ের লজ্জা ও অপমানের কথা নতুন করে আমার মনে পড়ল। সুতরাং স্বপনকে কঠিন আঘাত দেওয়ার একটা নিষ্ঠুর ইচ্ছে আমাকে হঠাৎই পেয়ে বসল। সরাসরি ওর চোখে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বললাম, স্বপন, কাল আমি মণিকাকে নিয়ে গঙ্গার ধারে ঘুরতে গেছি। ওকে চুমুও খেয়েছি। ও তোকে আর–।
স্বপনের হাতের মুঠোয় কাচের গ্লাসটা মটাস শব্দে ভেঙে গেল। কাচের টুকরো মিহি ঠুনঠুন শব্দে ঠিকরে পড়ল মেঝেতে। জল ও রক্তের মিশ্র ধারা স্বপনের হাতে, প্যান্টে, মেঝেতে। ওর মুখের সেই জেহাদি ভাবটা চুপসে গেছে।
আমি ওকে ধরতে উঠে দাঁড়ালাম, কিন্তু ও হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিল। হাতের যন্ত্রণায় বিন্দুমাত্রও ভুক্ষেপ না করে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল আমার দিকে। তারপর ওর চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। গড়াতে লাগল গাল বেয়ে। ওর দেহটা কেঁপে উঠল কান্নার দমকে। ভাঙা অস্পষ্ট গলায় ও বলল, বিজন, তোকে আমি দোষ দিই না। আমার কী-ই বা আছে মণিকাকে দেওয়ার মতো। তবে জানিস, এই একটিমাত্র স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল আমার জীবনে–একটা মেয়ে আমার প্রেমে পড়েছিল। আমি নিজেও সেটা বিশ্বাস করতে পারিনি। সত্যি সত্যি কি একটা স্বপ্ন আমার বন্ধ বাক্স থেকে বেরিয়ে পড়ে সত্যি হয়ে উঠল? কিন্তু না, বরাবরের মতোই আমি হেরে গেছি।…না, তোর কাছে নয়, নিজের কাছে। বলতে পারিস, এর পরে আমি কী নিয়ে বাঁচব? এ-ঘটনা তো আমার জীবনে দ্বিতীয়বার আর ঘটবে না!
