তার মানে? অবাক হয়ে জানতে চেয়েছি আমি।
বক্সী! স্বপন বক্সী! তার মানে আমার সমস্ত স্বপ্ন বাক্সে বন্দি হয়ে থাকবে। বক্সী শব্দটা নির্ঘাত বাক্স থেকেই এসেছে।
ওর ওই ঠাট্টায় আমি প্রাণ খুলে হেসেছি। কিন্তু এটা ছিল ওর কাছে এক নিষ্ঠুর তেতো ঠাট্টা।
যখন আমি কলেজ পেরিয়ে চাকরিতে ঢুকলাম তখনও উপার্জনের সমস্যা সমাধান করতে স্বপনের লাগাতার ভাগ্যপরীক্ষা চলছে। এক পাড়াতেই থাকি। ফলে দেখাও হয় প্রায় রোজই। দেখা হলেই ও হেসে বলে, বাক্সের তালা খোলেনি। আমি অস্বস্তিতে পড়ি ওর কথা শুনে।
হঠাৎ একদিন শুনলাম স্বপন রেডিয়ো মেরামতের দোকান খুলেছে। সুতরাং সেদিন সন্ধেবেলাতেই গেলাম ওর দোকানে। দোকানের নাম আকাশবাণী। মাপে ছোট্ট হলেও সুন্দর করে সাজিয়েছে। বেশ কিছু নতুন ও পুরোনো রেডিয়ো শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন তাকে। ওকে অভিনন্দন জানিয়ে বললাম, বক্সীর বাক্সের তালা তা হলে খুলেছে!
ও হেসে জবাব দিয়েছে, মর্তে ঠাই হল না, তাই আকাশে যেতে হয়েছে।
তারপর দুজনে প্রাণভরে গল্প করেছি।
সেদিন থেকে সন্ধে সাতটার পর ওর দোকানে গিয়ে রোজ আড্ডা দেওয়াটা একরকম নিয়মের মধ্যেই দাঁড়িয়ে গেল।
লক্ষ করতাম, রেডিয়ো জিনিসটা স্বপনকে যেন পাগল করে তুলছে। দিনরাত পড়ে থাকে ওই রেডিয়োর পিছনে। নানান রকম অদৃশ্য বেতার তরঙ্গকে রেডিয়োর মাধ্যমে পাকড়াও করে শব্দময় প্রাণবন্ত করে তোলাটাই যেন ওর একমাত্র ব্রত। ছুটির দিনে গেলেও দেখেছি যন্ত্রপাতির গাদার মধ্যে কানে হেডফোন লাগিয়ে কীসব খুটুর খুটুর করছে। ছোট-বড় নব ঘোরাচ্ছে। সেইসঙ্গে কয়েকটা স্পিকারে তীক্ষ্ণ, মিহি, কর্কশ নানান স্বরধ্বনিতে একই কথা বেরিয়ে আসছে। যখনই ওর সঙ্গে গল্প করতে বসতাম, তখনই ওর মুখে থাকত বেতার-তরঙ্গ বিষয়ক মুগ্ধ আলোচনা। ও বলত, বিজন, আমাদের চারপাশে আকাশে-বাতাসে কত শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে জানিস? শুধু একবার তাদের ধরতে পারলেই হল। দেখবি, কত কথা তাদের বলার ছিল। এই তো, কাল রাত দুটো নাগাদ উরুগুয়ের একটা মিউজিক প্রোগ্রাম ধরলাম।
ওর কথা যেন শেষ হতে চায় না। দেখলাম, রেডিয়োর এই কারিগরি খুঁটিনাটি হল একমাত্র বিদ্যে যেটা স্বপন দারুণভাবে আয়ত্ত করেছে। অন্য বিষয়ে পড়াশোনার তেমন কোনও আগ্রহ কিংবা আকর্ষণ না থাকলেও এই একটি বিষয় নিয়ে ও যথেষ্ট চর্চা করে। যন্ত্রপাতি এবং বই একইসঙ্গে ঘাঁটাঘাঁটি করে।
একদিন সন্ধেবেলা ওর দোকানে গিয়ে দেখি দোকান খোলা, কিন্তু দোকানের মালিক তথা কর্মচারী অনুপস্থিত। অথচ ঘরের অসংখ্য রেডিয়োর কোনও একটাতে বেশ উচ্চগ্রামে খবর পড়া হচ্ছে। হঠাত্ খবরের মাঝখানে একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল। অনেকটা খবর পড়ুয়া ঢঙেই কেউ বলছে, নমস্কার, আকাশবাণী থেকে বলছি। বিজন, তুই একটু বোস, আমি এখুনি আসছি।
আমি চমকে উঠলাম। এ তো স্বপনের গলা! চারপাশে তাকালাম ওর খোঁজে। ও নেই। বিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে ভাবছি কী করা উচিত, এমন সময় দোকানের পিছনের অংশ থেকে পরদা সরিয়ে বেরিয়ে এল স্বপন। হেসে বলল, কী রে শালা, কেমন চমকে দিয়েছি।
আমি অবাক হয়ে স্বপনকে দেখছি। ও কি জাদু জানে! রেডিয়োতে ওর গলা আমি শুনলাম কেমন করে!
স্বপন আমার অবস্থাটা অনুমান করতে পারল। কাছে এগিয়ে এসে হাসল ও পরদার ফাঁক দিয়ে তোকে দেখে কথাগুলো বললাম।
কিন্তু রেডিয়োর মধ্যে দিয়ে শুনলাম কেমন করে?
এসব তো আমার কাছে ছেলেখেলা রে! বেতার-তরঙ্গ নিয়ে আমি যখন খুশি যা খুশি করতে পারি।
লক্ষ করলাম, স্বপনের চোখ দুটো অস্বাভাবিক চকচক করছে। এতদিন যে নিজেকে সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ বলে জানত, আজ যেন সে উপলব্ধি করতে পেরেছে এই একটি বিষয়ে সে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অপরাজেয়।
এর পর থেকে যে-কোনও রেডিয়ো প্রোগ্রামের মাঝে কথা বলাটা স্বপন বক্সীকে নেশার মতো পেয়ে বসল। এবং সবসময়েই ও রেডিয়োতে কথা শুরু করতে ওর দোকানের নাম আকাশবাণী উল্লেখ করে।
দিনে দিনে অচল রেডিয়ো সচল করার ব্যাপারে আকাশবাণীর সুনাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বহু দূর দূর থেকে লোক আসে ওর কাছে রেডিয়ো সারাতে। এইভাবেই একদিন এসে হাজির হল মণিকা সরকার।
দিনটা ছিল শনিবার। তখন প্রায় সন্ধে সাতটা হবে। স্বপন একটা ভাঙা রেডিয়ো মেরামতের কাজে নিবিষ্টমনে ব্যস্ত। আমি দোকানের কাউন্টারের একপাশে বসে চা খাচ্ছি। এমন সময় মেয়েটি এল।
পরনে উজ্জ্বল রানি রং শাড়ি। একই রঙের ব্লাউজ। বড় বড় মর্মস্পর্শী চোখ। তীক্ষ্ণ নাকের পাশে একটা বড় তিল। কপালে টিপ। হাতে বাদামি কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট।
মেয়েটির উপস্থিতি আমাকে আচ্ছন্ন করল। সুদর্শন এবং সুপুরুষ হওয়ার খাতিরে বহু মেয়ের সংস্পর্শেই আমি এসেছি। ভালোবাসাবাসিও নেহাত কম করিনি। তাদের কেউ কেউ বেশ রূপসিও ছিল। কিন্তু এই মেয়েটির মতো এমন করে কেউ আমাকে নাড়া দেয়নি।
মেয়েটি মাথা তুলে দোকানের সাইনবোর্ডটা একবার পড়ে নিল। তারপর এগিয়ে এসে আমাকে জিগ্যেস করল, আপনিই স্বপনবাবু? ওর কণ্ঠস্বরও মুগ্ধ করার মতো।
স্বপন কাউন্টারের আড়ালে মেঝেতে বসে কাজ করছিল। সম্ভবত মেয়েটির প্রশ্ন শুনতে পেয়েই ও তড়াক করে সোজা হয়ে দাঁড়াল : আমি স্বপন বক্সী। বলুন, কী দরকার?
