বাবার শরীর এবং মাথাকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আবিষ্কার করেও বিচলিত হল না সুকান্ত। কারণ, ইতিমধ্যেই ও সবরকম ভাব এবং আবেগ নিঃশেষে খরচ করে বসে আছে। শুধু শ্লথ পায়ে ও ফিরে এল বসবার ঘরে। আধঘণ্টার চেষ্টায় অনেক টানাটানি করে ও সরিয়ে ফেলল সোফাসেটগুলো। তারপর ভাঙা দরজা পেরিয়ে টর্চ জ্বেলে রওনা হল তিনতলার দিকে। এখন ও খুঁজতে চলেছে পিসিকে।
তিনতলা, দোতলা, একতলায় খোঁজ করেও পিসিকে পেল না ও। তাই ফিরে এল বসবার ঘরে। কালো-পোশাকি লোকটার গায়ে টর্চের আলো ফেলে কী চিন্তা করল। তার পর ফিরে চলল খাওয়ার ঘরের দিকে।
বারান্দার বাঁ-কোণে খাওয়ার ঘরের দরজার ঠিক মুখেই থাকে কেরোসিন তেলের টিনটা। সেটাকে একহাতে নিয়ে অন্য হাতে টর্চ জ্বেলে বসবার ঘরে ফিরে এল। টর্চটাকে জুলন্ত অবস্থায় একটা সোফার ওপরে রেখে কেরোসিন তেলের টিনটা লোকটার গায়ে উপুড় করে দিল।
একটু পরে খালি টিনটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলল। পকেট থেকে লাইটারটা বের করে জ্বালল। আগুন ধরিয়ে দিল কালো পোশাকে। তারপর লাইটার ফেলে দিয়ে বেরিয়ে এল বসবার ঘর থেকে। আগুনের শিখা তখন লোকটার শরীরটাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে।
অন্ধকারেই সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল সুকান্ত।
সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে অন্ধকার অফিস-ঘরের সামনে একমুহূর্ত দাঁড়াল ও। তারপর এগিয়ে চলল সদর দরজায় দিকে। অন্ধকার থাকলেও এবারে অবিনাশের মৃতদেহে হোঁচট খেল না ও। পা যথাসম্ভব উঁচু করে দরজায় ছিটকিনিটা খুলে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।
তারপর মেঠো পথ ধরে দিগ্ভ্রান্তের মতো হাঁটতে শুরু করল
আকাশবাণী নরক
মণিকার কথা শুনে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
একটা নামগোত্রহীন আতঙ্ক পায়ের পাতায় বরফঠান্ডা স্রোতের মতো প্রবেশ করে সূক্ষ্মতন্তুজাল বেয়ে আঁকাবাঁকা পথে উঠে আসতে লাগল মস্তিষ্কের দিকে। ঘরের মেঝেটা মনে হল নরম একতাল জেলি হয়ে গেছে। ভারসাম্য রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ কষ্ট হচ্ছে আমার।
মণিকা অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মুখ পূর্ণিমার চাঁদের মতো সাদা হয়ে গেছে। ওর সৌন্দর্য উবে গিয়ে ভীষণ কুৎসিত দেখাচ্ছে। ওর আয়ত চোখে আতঙ্কের ঢেউ ঝাপটা মারছে। ও বলল, এখন কী করব?
টের পেলাম মণিকার গলা বিশ্রীভাবে কেঁপে গেছে। কে বলবে একদিন ওর অলৌকিক সুরেলা গান আমাকে পাগল করে দিয়েছিল–আজও দেয়! অন্তত এই মুহূর্তটুকুর আগে আমার এটাই বিশ্বাস ছিল।
সত্যিই তো! কী করব এখন? মণিকা জানতে চাইছে।
স্বপন–স্বপন বক্সী এভাবে কখনও যে ঝড় তুলবে এ তো কোনওদিন ভাবিনি।
কিছুক্ষণ পর মণিকাকে বললাম, তুমি যাও। চিকুর কাছে শোও গিয়ে। আমি দেখছি, কী করা যায়।
মণিকা চলে গেল। চোখে-মুখে অবিশ্বাস। আমার ওপরে এই মুহূর্তে ওর কোনও আস্থা নেই। তার জন্যে ওকে দোষ দেওয়া যায় না। আস্থা আমার নিজেরও কি আছে! মনের মধ্যে দুশ্চিন্তার ওলটপালট শুরু হল। মণিকার জন্যে। চিকুর জন্যে। আমাদের দু-বছরের ছেলে চিকু।
তিন বছর আগে ঠিক এরকমই একটা ঝড় তুলেছিল স্বপন।
.
স্বপন বক্সী। আমার বন্ধু। একদিন হঠাৎই ও ঝোড়ো বাতাসের মতো এসে হাজির হয়েছিল আমার ঘরে। তখন আমি এ-ফ্ল্যাটে আসিনি। উত্তর কলকাতায় একটা ঘর ভাড়া করে থাকি–যাকে সোজা কথায় বলা যায় ব্যাচেলার্স ডেন। এবং এক ওষুধ কোম্পানিতে সেলসম্যানের চাকরি করি।
অফিসে বেরোব বলে তৈরি হচ্ছিলাম। দেওয়ালে ঝোলানো ছোট আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চেহারার পালিশ শেষবারের মতো শানিয়ে নিচ্ছি, এমন সময় প্রচণ্ড দড়াম শব্দে দরজা খুলে গেল। কাঠের জীর্ণ পাল্লা দেওয়ালে বাড়ি খেয়ে কঁপতে লাগল।
চৌকাঠে দাঁড়িয়ে স্বপন।
কাল বিকেলে মণিকার সঙ্গে তুই ঘুরতে গিয়েছিলি?
ওর এই আচমকা অভিযোগমূলক প্রশ্নে আমি বিব্রত-বিচলিত। লক্ষ করলাম, স্বপনের চুল উশকোখুশকো, চোখ লালচে, মুখে না কামানো দাড়ি, পরনে অতি সাধারণ জামা, অতি সাধারণ প্যান্ট। যেমনটি বরাবর থাকে।
ডাক্তার-বাড়ি আর হাসপাতালের দোরে দোরে ওষুধ বেচে বেড়াস সেটাই জানতাম, আজকাল কি প্রেমও ফিরি করছিস? স্বপনের তীব্র শ্লেষ আমার শরীরে যেন কেটে বসল।
মনের রাগ অতি কষ্টে চেপে রেখে আমি বললাম, এখন অফিসে বেরুচ্ছি। তোর কী বলার আছে তাড়াতাড়ি বল।
স্বপন খুঁটিয়ে আমার চেহারা ও বেশবাস দেখল। যেন এই প্রথম দেখছে। আমি টাইয়ের না ঠিক করে নিয়ে বিছানায় বসলাম। অদ্ভুত চাউনি আমার শরীরের ওপরে স্থির রেখে স্বপন ঘরের একমাত্র চেয়ারটায় বসল। পাশেই টেবিল। টেবিলে একটা কাচের গ্লাসে জল ঢাকা ছিল। ও কোনও কথা না বলে গ্লাস থেকে কয়েক ঢোক জল খেয়ে নিল।
তারপর মুখ মুছে নিয়ে বলল, বিজন, সত্যি কথা বল। কাল তুই মণিকার সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিলি?
স্বপনের গলার স্বর অনেক শান্ত।
একটু বিরক্ত হয়েই জবাব দিলাম, সেটা মণিকাকেই জিগ্যেস কর না।
না! আমি তোর মুখ থেকে শুনতে চাই!
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম। সত্যি কথা বলাটা কি ঠিক হবে? এইরকম উত্তেজনার মুহূর্তে আমার জবাবটা শুনে স্বপন একটা কাণ্ডই না করে বসে! মণিকার সঙ্গে স্বপনই আমার আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। প্রায় মাসখানেক আগে ওর দোকানে একটা রেডিয়ো সারাতে এসেছিল মণিকা।
.
স্বপন আমার বহুদিনের বন্ধু। স্কুল পেরিয়ে আমি কলেজের পথে পা বাড়ালেও ওর পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। কারণ, হায়ার সেকেন্ডারিতে বার দুয়েক ঠেকবার পর ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিজনেস করবে। জমানো পুঁজি যে খুব একটা ছিল তা নয়। বাবা-মা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে ধার করে ও একটার পর একটা ব্যবসাতে ভাগ্যপরীক্ষা করতে লাগল। এবং ব্যর্থ হতে লাগল ক্রমাগত। তখন ও ঠাট্টা করে বলত, বিজন, জানিস, বাপ-মা অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমার নাম রেখেছিল স্বপন। কিন্তু পদবিটার কথা কেউ খেয়াল করেনি।
