অবশ্য, রীণা এখন অনেক ভালো আছে। এইটুকুই যা সান্ত্বনা।
রবিবার। রাত।
আবার গণ্ডগোল! আবার ঝগড়া! কী থেকে শুরু হল, কী নিয়ে শুরু হল, বুঝতেই পারলাম না। ও রাগ করে গোমড়া মুখে বসে আছে। আর রাগে আমার সারা শরীর জ্বলছে। এইরকম অবস্থায় লেখা যায়! লেখা আসে না। রীণা সেটা ভালো করেই জানে।
ইচ্ছে হচ্ছে নয়নাকে ফোন করি। ও অন্তত আমাকে লেখায় উৎসাহ দিয়েছিল। মনে হচ্ছে, সবকিছু ছেড়ে-ছুঁড়ে নেশায় গা ভাসিয়ে দিই, হাওড়া ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে বসি, কিছু একটা করে বসি।
শিশুরা যে সুখী হবে এতে আর আশ্চর্য কী! ওদের কাছে জীবন অনেক সহজ-সরল। একটু খিদে, একটু ঠান্ডা আরামের পরিবেশ, অন্ধকারকে একটু ভয় পাওয়া ব্যস। ওরা জানে না, কষ্ট করে বড় হওয়ার অনেক কষ্ট। জীবন অনেক জটিল হয়ে ওঠে।
একটু আগেই রীণা খেতে ডেকে গেছে। খাওয়ার ইচ্ছে আর নেই। এমনকী বাড়িতেও একমুহূর্ত থাকতে ইচ্ছে করছে না। দেখি, নয়নাকে পরে একটা ফোন করব। শুধু জানতে ইচ্ছে করছে, ও কেমন আছে।
সোমবার। সকাল।
এই ছিল এদের মনে!
উপন্যাসটা আট মাস ধরে আটকে রেখেও ওদের শান্তি হয়নি। পাণ্ডুলিপির আগাপাশতলা জুড়ে চা-সিগারেটের দাগ খোদাই করে দিয়েছে। আর পাঠিয়েছে একটা এক লাইনের চিঠি ও দুঃখিত, এটা পাবলিশ করতে পারলাম না।
হাতের কাছে পেলে আমি ওদের হয়তো খুন করে বসতাম! ওরা জানে না, আমার জীবনের ওপরে ওরা একটা প্রকাণ্ড পাথর আজ চাপিয়ে দিয়েছে।
চিঠিটা রীণার চোখ এড়াল না।
এবার কী করবে ঠিক করলে? বিরক্ত গলায় ও বলল।
মানে? উত্তরে জানতে চাইলাম। অতি কষ্টে গলা মোলায়েম রাখলাম।
এখনও তোমার বিশ্বাস তুমি লিখতে জানো?
ফেটে পড়লাম হ্যাঁ, ওদের কথাকেই তো বেদ-বাক্য বলে মেনে নিতে হবে! ওরা যা বলবে তা-ই ঠিক! আমার লেখার কতটুকু বোঝে ওরা বলতে পারো? রাগে আমার গলা কাঁপছে।
বারো বছর ধরে তুমি লিখছ, কিন্তু কোনও লাভ হল না। তাই না?
আমি আরও বারো বছর ধরে লিখব। দরকার হলে একশো, হাজার বছর ধরে লিখে যাব।
সমীরবাবুর কাগজের চাকরিটা তুমি তা হলে নেবে না?
না, নেব না।
তুমি বলেছিলে, এই উপন্যাসটা যদি না ওতরায় তা হলে চাকরিটা নেবে।
চাকরি আমার একটা রয়েছে তার সঙ্গে পার্ট-টাইম কাজ। সুতরাং যেমন চলছিল তেমনই চলবে।
কিন্তু সেভাবে আমি তো চলতে পারছি না! ও মুখিয়ে উঠল।
রীণা কি আমাকে ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যাবে? যাক। দেখে-দেখে আমিও টায়ার্ড হয়ে পড়েছি। টাকা, টাকা। লেখা, লেখা। আর প্রকাশকদের কাছ থেকে ফেরত, ফেরত, আর ফেরত!
শুধু আমার চালাক-চতুর জীবন জটিলতার প্যাঁচ একের পর এক পেঁচিয়ে জটিলতার এক প্রকাণ্ড জিলিপি গড়ে চলেছে।
তুমি! তোমাকে বলছি! যে এই পৃথিবী, গোটা সোলার সিস্টেমটাকে ক্রমাগত ঘুরিয়ে চলেছে, তাকে বলছি। যদি আমার কথা শুনতে পেয়ে থাকে তা হলে মন দিয়ে শোনো। এই পৃথিবীটাকে একটু অন্তত সহজ-সরল করে দাও। কোনও কিছুতে আমার আর বিশ্বাস নেই। কিন্তু আমার এই ছোট্ট রিকোয়েস্টটা যদি রাখো, তা হলে তুমি যা চাইবে তা-ই দিতে আমি রাজি! শুধু যদি…।
কিন্তু কী লাভ? এ নিয়ে আর মাথা ঘামাব না। শালা, যা হওয়ার হোক!
নয়নাকে আজ রাতে ফোন করব।
সোমবার। সন্ধ্যা।
একটু আগেই নয়নাকে ফোন করতে গিয়েছিলাম। ইচ্ছে আছে শনিবার ওর সঙ্গে দেখা করব। কারণ, শনিবার সন্ধেবেলা রীণা ওর বোনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। আমাকে ও যাওয়ার কথা কিছু বলেনি, আর আমিও যেচে সে কথা আর তুলছি না।
কাল রাতেও নয়নাকে ফোন করেছিলাম–ওর বাড়িতে। ওদের বাড়িটা ওয়ার্কিং গার্লস হোস্টেল গোছের। কিন্তু অন্য একটা মেয়ে জানাল, ও বাড়ি নেই।
তাই ঠিক করলাম, আজ ওর অফিসে ফোন করব। সেখানে নিশ্চয়ই ওকে পাওয়া যাবে।
সুতরাং, মোড়ের ইলেকট্রিকের দোকানটায় গিয়ে ফোন গাইডে ওর নাম্বারটা খুঁজতে লাগলাম। হয়তো সেটা আমার মুখস্থ করে ফেলা উচিত ছিল, কিন্তু কী কারণে জানি না, সেটা করা হয়নি। কারণ, হাতের কাছে টেলিফোন ডিরেক্টরি তো সবসময়েই রয়েছে।
ও প্রসাধন না প্রসাধনী নামে একটা ম্যাগাজিনে কাজ করে বলে জানতাম। আশ্চর্য, ম্যাগাজিনের নামটাও আমার ঠিকঠাক মনে নেই। হয়তো তেমনভাবে ব্যাপারটা কখনও ভেবে দেখিনি।
অবশ্য ওর অফিসটা কোথায় সেটা আমার বেশ মনে আছে। মাসকয়েক আগে একদিন অফিস থেকে ওকে আর কৃতান্তকে এমব্যাসিতে খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম। মনে পড়ছে, রীণাকে বলে বেরিয়েছিলাম ন্যাশন্যাল লাইব্রেরিতে যাচ্ছি। স্টাডি করতে।
নয়নার অফিসের টেলিফোন নাম্বারটা বহুদিনের অভ্যাস থেকে জানি–ফোন-গাইডের ডানদিকের পাতার ওপরে কোনায় থাকে বারবার সেটাই দেখে এসেছি। বহুবার ওকে ফোন করেছি, কখনও জায়গাটা পালটে যায়নি।
কিন্তু পালটে গেছে আজ।
ফোন-নাম্বারটা সেই চেনা জায়গায় নেই!
প্রসাধন দিয়ে শুরু এমন যে-কটা শব্দ পেলাম সবকটাই বাঁ-পাতার নীচে, বাঁ-দিকে। এতদিন যা দেখে এসেছি, ঠিক তার উলটো।
সেই পাতায় চোখ বুলিয়ে এমন কোনও নাম চোখে পড়ল না যেটা স্মৃতিকে উসকে দেয়। অন্যান্য দিনের মতো, ও, এই তো! মনে-মনে বলে দরকারি ফোন-নাম্বারটা আজ খুঁজে পেলাম না।
খুঁজে চললাম। পাতার পর পাতা উলটে চললাম, কিন্তু প্রসাধনী নামে কোনও পত্রিকার নাম আমার চোখে পড়ল না। অবশেষে মনকে বোঝালাম, ওটা প্রসাধনী নয়, প্রসাধন হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটা খটকা মনের মধ্যে রয়ে গেল। কেউ যেন বলতে লাগল, তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে।
