টাকা-টাকা-টাকা…এই অসংখ্য জটিল সমস্যা নিয়ে শান্তিতে দুকলম আমি লিখি কী করে? নতুন ফ্রিজ আর টিভির সেকেন্ড ইনস্টলমেন্টের টাকা বাকি। তার ওপর রীণা নতুন একটা কয়ারের ম্যাট্রেস সমেত খাট কিনতে চায়–জানি না, এইসব প্রবলেম কী করে সম্ভ হবে…।
কিন্তু এত সমস্যা সত্ত্বেও আমি হদ্দ বোকার মতো সমস্যাকে আরও ঘোরালো করে তুলেছি।
সেদিন কি অমনভাবে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে না গেলে আমার চলত না? আগে তো কোনওদিন আমি এমন করে রেগেমেগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাইনি!
আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল ঠিক কথা, কিন্তু ঝগড়া তো আমরা আগেও করেছি। জানি, ইগোই এর একমাত্র কারণ। এই লম্বা বারো বছরের হ্যাঁ, একডজন বছর!–লেখক-জীবনে লেখা থেকে আমার আয় মাত্র দু-হাজার সাতশো ষোলো টাকা! এবং সেই কারণেই আমাকে এখনও ওই হতচ্ছাড়া স্টেনো-টাইপিস্টের চাকরিটা করে যেতে হচ্ছে। সুতরাং, আমার লেখার ক্ষমতাকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ ওর রয়েছে। সেইজন্যেই, সমীর ওর ম্যাগাজিনে যে-চাকরিটা আমাকে দিতে চাইছে, সেটা নেওয়ার জন্যে রীণা রোজই আমাকে তাড়া দিচ্ছে।
সবকিছুই ডিপেন্ড করছে আমার ওপর। স্ট্রেটকাট হার মেনে নিয়ে সমীরের এগিয়ে দেওয়া চাকরিটা নিলেই সব সমস্যা চুকে যায়। অন্তত এখনকার মতো। পার্ট-টাইম কাজও আমাকে আর করতে হয় না। রীণাও শান্তিতে ঘরে বসে আয়েশ-আরাম করতে পারবে।
কিন্তু আমি? আমি করে বসেছি ঠিক উলটো কাজগুলো। মাঝে-মাঝে এইজন্যে নিজেকে ভীষণ গুড ফর নাথিং বলে মনে হয়।
হঠাৎই সুবোধ-সুশীল আমি একদিন বেরিয়ে পড়েছিলাম কৃতান্তের সঙ্গে। কৃতান্ত আমার কলেজ লাইফের বন্ধু। বরাবর কারণবারির ভক্ত। আমি ওসব খাই-টাই না। তাই ওকে সবসময় বারণ করি। আর রেগুলার বারণ করতে করতে ও-ই শালা কখন যেন আমার জলপথে হাতেখড়ি করিয়ে দিয়েছে।
রাগ করে বেরিয়ে গিয়ে আমি কৃতান্তকে ফোন করেছিলাম। তারপর ওর সঙ্গে জোট বেঁধেছিলাম। ও তখন একটা সাউথ ইন্ডিয়ান ফুডের রেস্তোরাঁয় বসে দুটো ইয়াং মেয়ের সঙ্গে গল্প করছিল। তার মধ্যে একজনকে আবার দারুণ দেখতে! সুন্দর তো বটেই। তার সঙ্গে মেশানো ছিল দুষ্টু দুষ্টু ভাব। আর অন্যজন ছিল ফরসা, রোগাটে।
কৃতান্ত বলেছিল, ওরা দুজন ওর বেশ ইন্টারেস্টিং ফ্রেন্ড। রাসেল স্ট্রিটের একটা লেডিজ হস্টেলে থাকে।
ইন্টারেস্টিং ফ্রেন্ড! কে জানে, কৃতান্তর সব উলটোপালটা পাগলা ব্যাপার!
রেস্তোরাঁয় আড্ডা শেষ হলে আমি আর কৃতান্ত জলপথে সাঁতার কাটতে গিয়েছিলাম। তারপর আর কী করেছি মনে নেই। কপাল ভালো যে, রীণা থানায় খবর দেয়নি।
তবে ওই দুষ্টু-দুষ্টু মেয়েটার হাবভাব অনেকটা রীণার মতন লাগছিল–দশ বছর আগে রীণা যেমন ছিল।
না, কাজটা আমি ঠিক করিনি। তাই খুব খারাপ লাগছে। রীণাকে আমি এখনও ভীষণ ভালোবাসি। ভেতরে-ভেতরে সেটা আমি বেশ ভালো করে জানি।
শুক্রবার। বিকেল।
যাক বাবা, রীণা আমাকে ক্ষমা করেছে। আশা করি সব আবার ঠিকঠাক হয়ে যাবে। পরদিন একটু বেলার দিকে বাড়ি ফিরে চোরের মতো মুখ করে বিছানায় গিয়ে বসতেই রীণার ঘুম ভেঙে গেল। ও প্রথমে তাকাল আমার দিকে, তারপর দেওয়াল-ঘড়ির দিকে। ওর ফোলা-ফোলা চোখে-মুখে স্পষ্ট কান্নার ছাপ।
কোথায় ছিলে কাল সারা রাত? ভয় পাওয়া শিশুর গলায় জানতে চাইল ও।
কৃতান্তর সঙ্গে। আলতো গলায় বললাম, ওর বাড়িতে শুয়ে-বসে কাটিয়েছি।
একটা ফোন করতেও ইচ্ছে করল না? ধরা গলায় বলল। আমার দিকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর আমার হাতটা নিয়ে গালে চেপে ধরল।
আমাকে ক্ষমা করো। প্লিজ। ভেজা চোখে কান্না-ভেজা গলায় বলল।
মুখ লুকোতে ওর শরীরে মুখ ডুবিয়ে দিলাম ও রীণা, রীণা–আমাকে ভুল বুঝো না, প্লিজ।
আমি সারা রাত কোথায় ছিলাম সে কথা নেশার ঘোরে আমিও ভুলে গেছি। তবে এটুকু মনে আছে, কৃতান্ত ওর দুজন গার্ল ফ্রেন্ডের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। তার মধ্যে একজনকে দেখতে ফ্যান্টা। কী যেন নাম? কী যেন নাম মেয়েটার? নাঃ, মনে পড়ছে না। তবে অন্যজনের নাম ছিল রোজি।
কিন্তু এ কথাটা কিছুতেই রীণাকে বলা যাবে না। ও শুধু-শুধু কষ্ট পাবে। ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। রাগের মাথায় মানুষ অনেক উলটোপালটা কাজ করে। আমিও তো তাই-ই করেছি– মাত্র একবারের জন্যে। তাও শুধু গল্পগুজব আর কিছু নয়। এটা ওর ক্ষমা করে দেওয়া উচিত।
তা ছাড়া, রীণা ছাড়া আমার কাছের মানুষ আর কে আছে!
কিন্তু কী যেন নাম ছিল ওই মেয়েটার? কৃতান্তর ওই সুন্দর দেখতে গার্ল ফ্রেন্ডের? নয়না? নয়না বোস? তাই কি?
শনিবার। রাত।
আজ সন্ধেবেলা রীণাকে নিয়ে বউবাজারে ফার্নিচারের দোকানে গিয়েছিলাম। নতুন পছন্দসই খাটটা কেনার সময় রীণা আমার কানে কানে বলেছে, একসঙ্গে এতগুলো টাকা খরচ করা কি ঠিক হবে?
সে তোমাকে ভাবতে হবে না। মিষ্টি হেসে জবাব দিয়েছিঃ পুরোনো খাটটার অবস্থাটা দেখেছ! আমি চাই আমাদের ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা থেকেই একটু আয়েশ করে ঘুমাক।
দোকানদারের চোখ এড়িয়ে আড়ালে ছোট্ট করে ভালোবাসার শব্দ করল রীণা। বিছানায় গদির ওপর বসে বাচ্চা মেয়ের মতো দুলতে চাইল। বলল, দ্যাখো, কী নরম! বলে আমার হাতটা ধরে বুলিয়ে দিল গদির ওপরে।
সবকিছু আবার ঠিকঠাক চলেছে। শুধু আমার ধারের অঙ্কটা বেড়ে যাচ্ছে, আমার নতুন গল্পটা কেউ কিনতে চাইছে না, আর আমার সাধের উপন্যাসটা মাত্র পাঁচ জায়গা থেকে ফেরত এসেছে। তবে এবার প্রকাশক ভবনকে ওটা ছাপতেই হবে। ওরা অনেকদিন ধরে লেখাটা আটকে রেখেছে। ওদের ওপর ভরসা করেই আমি অপেক্ষায় আছি। বুঝতে পারছি, আমার লেখার দিন ফুরিয়ে এসেছে। শুধু লেখার কেন, সবকিছুরই। দিনের পর দিন, ক্রমশ যেন বুঝতে পারছি, আমি একটা হেরো ঘোড়া হয়ে যাচ্ছি।
