যাকগে, পরে অন্য আর-একটা দোকান থেকে ট্রাই করব।
আমি..থাক লেখাটা পরে শেষ করব। রীণা এইমাত্র খেতে যাওয়ার জন্যে ডাক দিয়ে গেল। দেরি হলে হয়তো আবার নতুন কোনও ঝামেলা হবে।
পরে।
তৃপ্তি করে খেলাম। সত্যি, রীণা রান্নাটা করতে জানে। ইশ, মাঝে-মাঝে ওই টুকরো অশান্তিগুলো যদি না থাকত! জানি না, নয়না এরকম রান্না করতে পারে কি না।
খাওয়া-দাওয়ার পর একটু হালকা হলাম। বুঝলাম, আমার মন শান্ত করার জন্যে মাঝে এই সময়টুকু দরকার ছিল। কারণ, ওই টেলিফোন নাম্বারের পিকিউলিয়ার ব্যাপারটা আমার ভালো লাগেনি। বরং আমাকে বেশ ধাক্কা দিয়েছে।
আজ আমার অফিস ছুটি, কিন্তু নয়নার পত্রিকা-অফিস খোলা। রাস্তায় বেরিয়ে ওকে একবার ফোন করলে হয়!
কিন্তু প্রসাধনী, না কি প্রসাধন?
অবশেষে প্রসাধন-এর নাম্বারটা ফোন গাইড থেকে খুঁজে বের করে ডায়াল করলাম। একজন মহিলা ও-প্রান্তে রিসিভার তুললেন।
প্রসাধন পত্রিকা অফিস। সুরেলা কণ্ঠ ভেসে এল।
আমি মিস বোসের সঙ্গে কথা বলতে চাই। চেষ্টা করে গলা স্বাভাবিক রাখলাম।
কার সঙ্গে?
মিস নয়না বোসের সঙ্গে।
এক মিনিট। ও-প্রান্ত থেকে তিনি বললেন। এবং সেই মুহূর্তে বুঝলাম, আমি ভুল নাম্বারে ফোন করেছি। অন্যান্যবার ফোন করামাত্রই যে-মেয়েটি ফোন ধরত, সে দিচ্ছি বলে সঙ্গে-সঙ্গে নয়নার টেবিলে লাইন দিয়ে দিত।
নামটা কী যেন বললেন? ও-প্রান্ত থেকে ভদ্রমহিলা আবার একই প্রশ্ন করলেন।
মিস নয়না বোস। দেখুন আপনি যখন ঠিক চিনতে পারছেন না, মনে হয়, আমি হয়তো ভুল নাম্বারে ফোন করেছি।
আপনি মিস্টার ঘোষকে চাইছেন না তো?
না, না। সবসময় ফোন করামাত্রই মিস বোসের লাইন পেয়ে যাই। আমারই হয়তো রং নাম্বার হয়েছে। শুধু-শুধু আপনাকে ট্রাক্ল দিলাম। রিসিভার নামিয়ে রাখলাম।
অস্বস্তির পোকাটা লম্বায় বড় হতে লাগল। নয়নার অফিসে আমি এতবার ফোন করেছি যে, আজকের ঘটনাকে মনের ভুল বলে হেসে উড়িয়ে দিতে পারছি না।
সত্যিই ফোন-নাম্বারটা আমার মনে নেই। অথবা, মনে পড়ছে না।
প্রথমটা নিজেকে তেমন আপসেট হতে দিইনি। হতে পারে, এই দোকানের ফোন গাইডটা হয়তো পুরোনো–এখনও পালটানো হয়নি। কে জানে!
সুতরাং, মোড় ছাড়িয়ে বড় ডাক্তারখানাটায় গেলাম, এবং চেক করলাম। না, সেখানেও সেই একই বই।
ঠিক আছে, কাল অফিস থেকে আবার ওকে ফোন করব। কিন্তু এখন ওকে পেলে ভালো হত। বলে দিতাম, শনিবার সন্ধেটা ও যেন শুধু আমার জন্যেই রেখে দেয়। কৃতান্তকে না ডাকে।
হঠাৎ একটা কথা খেয়াল হল। একটু আগেই যে-মহিলার গলা ফোনে শুনলাম, তার গলাটা আমার খুব চেনা। কারণ প্রসাধনীর অফিসে ফোন করে বরাবর এর গলাই আমি শুনে এসেছি।
কিন্তু…নাঃ, সবকিছু যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার। দুপুর।
প্রথম সুযোগেই রীণার আড়ালে বাড়ি থেকে নয়নাকে ফোন করেছি। ওর হস্টেলে।
ও-প্রান্ত থেকে চেনা গলায় উত্তর এসেছে।
আশ্বস্ত হয়ে নড়েচড়ে বসলাম। গত কয়েকমাসে বহুবার বলা কথাগুলোই আবার বললাম, আমি মিস নয়না বোসের সঙ্গে কথা বলতে চাই। নয়না ম্যাডাম।
ধরুন। এক মিনিট।
ওপাশে অনেকক্ষণ সব চুপচাপ। আমার ধৈর্যে টান পড়তে লাগল।
তারপর আবার রিসিভার নড়াচড়ার শব্দ পেলাম। উত্তরও পেলাম।
নামটা কী যেন বললেন? মেয়েটি প্রশ্ন করল।
মিস নয়না বোস, মিস নয়-না বোস, জোরের সঙ্গে বললাম, আগেও আমি ওঁকে বহুবার ফোন করেছি…।
দাঁড়ান, আর-একবার দেখছি।
সুতরাং আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা।
তারপর আবার মেয়েটির গলা শুনতে পেলাম।
সরি, স্যার। এ-নামে এখানে কেউ থাকে না।
কিন্তু বললাম যে, আমি আগেও অনেকবার এখানে ফোন করেছি।
আপনার রং নাম্বার হয়নি তো?
না, না। নাম্বার ঠিকই আছে। এটা সতেরো নম্বর রাসেল স্ট্রিট তো?
হ্যাঁ–।
তা হলে তো ফোন-নাম্বারও ঠিক আছে।
কী জানি মেয়েটির স্বর অপ্রস্তুত, বাট, স্যার, এটা আপনাকে কনফার্ম করে বলতে পারি, ওনামে এখানে কোনও বোর্ডার নেই।
কিন্তু কাল রাতেও তো আমি ফোন করেছিলাম। আপনি বললেন মিস বোস এখন নেই–কোথায় বেরিয়েছেন।
সরি, স্যার, ঠিক মনে করতে পারছি না।
কী বলছেন! আপনার কোথাও একটা মেজর মিসটেক হচ্ছে।
দেখুন, আপনি যদি চান তা হলে আমি আরও একবার খোঁজ করতে পারি। বাট ইউ নো, কোনও লাভ হবে না। কারণ, ও-নামে এখানে কেউ থাকে না, বিশ্বাস করুন।
গত কয়েকদিনের মধ্যে কেউ এ-হস্টেল ছেড়ে চলে যায়নি তো?
গত এক বছরে আমাদের এখানে কোনও রুম খালি হয়নি। জানেন তো, কলকাতায় ঘর পাওয়া কী ঝামেলার।
জানি। রিসিভার নামিয়ে রাখলাম।
ক্লান্ত পা ফেলে ফিরে এসে বসলাম। দেখি রীণা কতকগুলো কাগজপত্র হাতে নিয়ে আমারই দিকে এগিয়ে আসছে। বোধহয় ওর হাবিজাবি কিছু টাইপ করাতে। কাগজগুলো আমার টেবিলে নামিয়ে রেখে ও জানতে চাইল আমি একটু আগে কাকে ফোন করছিলাম।
বুঝলাম, আমার ফোন করার ব্যাপারটা ও কোনওভাবে লক্ষ করেছে।
বললাম, ওই চাকরিটার ব্যাপারে সমীরকে ফোন করেছি।
জানি, এবার রীণার তাগাদায় আমাকে ওষ্ঠাগত প্রাণ হতে হবে, কিন্তু তাড়াতাড়িতে এর চেয়ে ভালো মিথ্যে মাথায় এল না।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কিছুক্ষণ টাইপ করলাম। মন এলোমেলো থাকায় আচ্ছন্নের মতো কাজ করে চললাম।
নয়না বোস নেহাত উবে যেতে পারে না, মনে-মনে ভাবলাম। কোথাও না কোথাও ও আছেই। কারণ, গত কয়েকমাসের ঘটনা তো আর কল্পনা নয়, বাস্তব সত্যি! রীণার কাছে কৃতান্ত আর নয়নার সঙ্গে রেগুলার মিট করার ব্যাপারগুলো গোপন রাখার জন্যে কত মিথ্যেই বলেছি!
