আমার চোখের সামনে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। আর দূরে গাছের আড়ালে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। আমার মনে হল, অস্ত-যাওয়া সূর্য না দেখতে পেলে কি কোনও ক্ষতি হয়?
আমি চুপচাপ বসে সত্যদেবকে দেখছিলাম। হঠাৎ একটা শব্দ পেয়ে দেখি কুটির থেকে রঘুনাথ ও রণবীর বেরিয়ে আসছে। রঘুনাথ দু-হাতে আঁকড়ে ধরে নিয়ে আসছে ওকে।
সত্যদেব তাড়াতাড়ি উঠে গেল ওদের কাছে। রঘুনাথ বলল, কী করব, শুনছে না। বলছে, বাগানে নিয়ে যেতে।
ওরা দুজনে রণবীরকে এনে বাগানের নরম ঘাস-জমিতে শুইয়ে দিল। রণবীর সেন, সেন্ট্রাল কন্ট্রোলের নামজাদা এনটোমোলজিস্ট–পতঙ্গবিজ্ঞানী, তখন বিহ্বল চোখ মেলে ধূসর আকাশ, রঙিন ফুল, অস্তায়মান সূর্য আর প্রজাপতি দেখছে।
রঘুনাথ একটু উঁচু গলায় বলল, সেন, তুমি দাসের সঙ্গে শহরে ফিরে যাও। সেখানে তুমি সেরে উঠবে।
রণবীর সেন প্রকৃতির দিক থেকে চোখ সরাল না। শুধু হাসল, বলল, মহান্তি, তোমার কি মনে হয় না শহরের একশোটা জীবনের চেয়ে এইখানে এইভাবে মারা যাওয়াটা অনেক বেশি দামি?
সত্যদেবের চোখে জল এসে গিয়েছিল। ও আমার হাত চেপে ধরল।
এমনসময় দেখা গেল, বিক্রম শর্মা জঙ্গলের দিক থেকে এগিয়ে আসছে। হাতে ঝুলছে ছোটখাটো কোনও প্রাণীর মৃতদেহ।
কাছাকাছি এসেই মৃতদেহটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিল বিক্রম। দৌড়ে এল আমাদের পাশে। একপলক আমাকে দেখল। তারপর ঝুঁকে পড়ল রণবীরের ওপরে। রঘুনাথ রণবীরের কপালে হাত রাখল। সত্যদেব ধরল ওর কব্জি। সূর্য ততক্ষণে ঢলে পড়েছে। সিসের আস্তর দেওয়া অন্ধকার নামছে জঙ্গলে। প্রজাপতিরা বেশির ভাগই চলে গেছে, শুধু কয়েকটা আশ্চর্য নিশাচর প্রজাপতি বাগানে উড়ছে। ওদের ডানার রং আধো-আঁধারিতে প্রতিপ্রভ হয়ে জ্বলছে। ঠিক একইভাবে জ্বলজ্বল করছে। কয়েকটা রঙিন ফুলও।
রণবীর সেদিকে একবার দেখল। তারপর অস্ফুটস্বরে কী একটা বলে চোখ বুজল। আচমকাই ওর ঘাড়টা কাত হয়ে গেল একপাশে।
বাকি তিনজন ডুকরে কেঁদে উঠল। আমার মনে হল, কান্নার কি কোনও দাম আছে। কিন্তু টের পেলাম, আমার চোখ জ্বালা করছে।
সত্যদেব চোখ ঢেকে বসে ছিল। অন্ধকার থিতিয়ে বসছে। আগুনের কুণ্ডের লালচে আলো আমাদের মুখে-গায়ে। জঙ্গল থেকে পাখি ডাকছিল। আর শোনা যাচ্ছিল হিংস্র গর্জন। ঝরনার জলের কুলকুল শব্দ এখন আরও স্পষ্টভাবে কানে আসছে।
ঠিক সেই সময়ে আকাশের সন্ধ্যাতারা আমার চোখে পড়ল। আকাশের প্রথম চোখ। আমাদের দেখছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। সারা গায়ে এক অসহ্য জ্বালাপোড়া। ছটফট করতে করতে সমস্ত পোশাক-আশাক-জুতো সব খুলে ফেললাম। ছুঁড়ে ফেলে দিলাম বিপার, ট্রান্সমিটার, ব্লাস্টার, জেনারেটর গান–সব। ওরা তিনজন এবারে অবাক হয়ে আমাকে দেখছিল।
আর আমি দেখছিলাম, অন্ধকার বাগানে ফুটে থাকা উজ্জ্বল রঙিন ফুল, নিশাচর রঙিন প্রজাপতি, সন্ধ্যাতারা। শুনছিলাম, ঝরনার শব্দ, রাতপাখির ডাক, পাতার ফিশফিশ।
জঙ্গলের দুরন্ত বাতাস আমার বুক-পিঠ, মুখ-চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছিল।
স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, প্রতি একশো বছর অন্তর বেশ কিছু মানুষ ফরেস্ট-এক্স-এর আকষর্ণে চিরকালের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে।
কোনও বাধাই সেই হারিয়ে যাওয়া রুখতে পারবে না।
হারিয়ে যাওয়ার ভয় (নভেলেট
সপ্তাহ দুয়েক আগে কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলের একটি ছোট রেস্তোরাঁয় বহু পুরোনো একটা সস্তা ডায়েরি পাওয়া যায়। রেস্তোরাঁর মালিক দিব্যি কেটে বলেছেন, এই নোটবইটা হঠাৎই তাঁর নজরে পড়ার আগে প্রায় ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে কোনও লোক তার দোকানে আসেনি। ডায়েরির লেখাগুলো ভারী অদ্ভুত। কেন অদ্ভুত সেটা মনে হয় পড়লেই বোঝা যাবে।
শনিবার। সকাল।
জানি, এগুলো লিখে রাখা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। রীণা যদি একবার দেখতে পায়, তা হলে কী হবে, সেটা সহজেই আইডিয়া করতে পারছি। আমাদের দশ বছরের বিয়েটা উচ্ছের মতো তেতো হয়ে উচ্ছন্নে চলে যাবে।
কিন্তু না লিখেও যে পারছি না! এই লেখা-লেখা অভ্যেসটা যেন একটা ম্যানিয়ার মতো আমার রক্তে মিশে আছে। যতক্ষণ না সাদা-কালো লেখায় মনের কথাটা লিখতে পারছি, ততক্ষণ শাস্তি নেই। মন হালকা করতে গেলে এই লেখালেখিটা জরুরি। কিন্তু মনকে জটিল করা যত সহজ, হালকা করা বুঝি ততটাই কঠিন।
সুতরাং এখন ফিরে যেতে হবে মাসকয়েক আগে।
কী করে শুরু হল ব্যাপারটা? অবশ্যই ঝগড়া থেকে। এবং এরকম ঝগড়া এই দশ বছরে অন্তত হাজারবার আমাদের মধ্যে হয়েছে। আর সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, সবসময়েই আমাদের ঝগড়ার বিষয় ছিল একটাই টাকা!
তুমি লিখতে পারো কি না পারো, সেটা আমার জানার দরকার নেই। হতে পারে, তুমি হয়তো ঘ্যাম লেখক! তোমার প্রতিভার দাম অপোগণ্ড প্রকাশকরা দিতে পারছে না। কিন্তু তাই বলে সংসার খরচের কথা ভুলে বসে থাকলে তো চলবে না। আমার প্রশ্ন হল একটাই : রোজকার খরচের টাকা আসবে কোত্থেকে?
বক্তব্যটা যে রীণার, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবুও মিনমিনে প্রোটেস্ট করেছি আমি : কীসের রোজকার খরচ? বরং বলো অদরকারি খরচ! যেসব জিনিস আমাদের কেনার কোনও দরকার নেই সেসব কিনে ফালতু।
অদরকারি জিনিস? ফালতু খরচ! ব্যস, শুরু হল তৃতীয় মহাযুদ্ধ।
ওঃ, টাকা ছাড়া এ-দুনিয়ায় জীবনের চাকা অচল। টাকাকে হারিয়ে দিতে পারে এমন কিছুই পৃথিবীতে নেই। এখানে টাকাই প্রথম এবং শেষ কথা।
