বিশ্বকাকু আমাদের দেখেই চোখ গোল-গোল করে বললেন, জানিস, আজ ইস্টিশানের রাস্তায় হারান মাস্টার সুইসাইড করেছেন?
শুনে তো আমরা দুজনেই অবাক।
কাকু দু-হাতে আমাদের কাঁধ খামচে ধরে বললে, চ, ঘরে চ। তোদের মা কই?
সুতরাং আমি আর মউ চিৎকারে গলা ফাটিয়ে মা-কে ডাকতে শুরু করলাম। বাবা বাজারে গেছেন। সেইজন্যেই আমরা এতটা গলা চড়াতে পারছি। নইলে বকুনি বাঁধা ছিল।
বিশ্বকাকু গায়ের চাদরটা জম্পেশ করে গায়ে জড়িয়ে বিছানার ওপর ধপাস করে বসে পড়লেন। চেঁচিয়ে হাঁক পাড়লেন, বউদি, জলদি এসো। সঙ্গে এক কাপ গরম চা। ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। তার ওপরে এই বাঘের সর্দিধরা ঠান্ডা।
হারান মাস্টারমশাইকে আমরা সবাই চিনি। অবশ্য এই আধা-শহুরে জায়গায় প্রায় সব্বাই সব্বাইকে চেনে। হারান মাস্টারমশাই আমাদের জেলা হাই স্কুলে পড়ান। মানে পড়াতেন। রোগা পাকাটির মতো চেহারা। গায়ে ধুতি-পাঞ্জাবির সঙ্গে তেলচিটে চাদর। নাকে চশমা মাথায় কাঁচাপাকা চুল। তিনকুলে তাঁর কেউ ছিল না। তবে তার পড়ানোর খুব শখ ছিল। পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের খুব যত্ন নিয়ে পড়াতেন। এ-অঞ্চলে হারান মাস্টারের কোচিং ক্লাস যাকে বলে খুব বিখ্যাত। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, আমি সেই কোচিংয়ে রোজ সন্ধেবেলা পড়তে যাই। ক্লাস ফাইভে উঠলে মউকেও ওখানে ভরতি করা হত। অন্তত মা-বাবা সেইরকমই ঠিক করে রেখেছিলেন।
বিশ্বকাকু আমার বাবার পিসতুতো ভাই। লোকে বলে ওঁর নাকি অনেক অভিজ্ঞতা। অন্তত পাঁচশো পঁয়তাল্লিশ রকম ব্যবসা করেছেন। দু-হাজার নশো তিয়াত্তরটা ইংরিজি বই পড়েছেন। আর হায়ার সেকেন্ডারিতে ছ-ছবার ফেল করেছেন। এককালে খুব ব্যায়াম করতেন, কিন্তু সে-অনুপাতে চেহারা ফেরেনি। বাবা একদিন জিগ্যেস করেছিলেন, হ্যাঁ রে বিশু, এত যে এক্সারসাইজ করলি, তা তোর চেহারা ফেরে না কেন?
উত্তরে বিশ্বকাকু হাতের গুলি ফোলানোর চেষ্টা করে বলেছিলেন, দাদা, শুধু মাংসপেশি ফোলালেই কি চেহারা ভালো হয়। আমার ব্যায়ামের এমনই কায়দা যে, শুধু হাড়গুলো মজবুত হবে। বাইরে থেকে দেখে কিচ্ছুটি বোঝা যাবে না। তবেই না হল গিয়ে রিয়েল এক্সাইজ!
বাবা গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, এক্সাইজ নয় বিশু, এক্সারসাইজ।
বিশ্বকাকু গম্ভীর গলায় উত্তর দিয়েছেন, ওই একই হল। হনলুলুর লোকেরা সংক্ষেপে এক্সাইজ বলে। আমি যেবার হনলুলু গিয়েছিলুম…!
থাক। তুমি এখন কাজে যাও।
বিশ্বকাকু জানতেন, বাবা রেগে গেলে আর তুই বলেন না, বলেন, তুমি। সুতরাং চুপচাপ কেটে পড়েছিলেন সঙ্গে-সঙ্গেই।
হারান মাস্টারমশাই কীভাবে আত্মহত্যা করলেন, কাকু? আমি প্রথম সুযোগ পেয়েই প্রশ্ন করলাম।
একেবারে গলায় চাদর দিয়ে সটান ঝুলে পড়েছেন দেবদারু গাছের ডাল থেকে। চোখ উলটে জিভ বের করে মরে যাওয়ার অভিনয় করলেন বিশ্বকাকু।
মউ চেঁচিয়ে উঠল, মা, কাকু ভয় দেখাচ্ছে।
মা ইতিমধ্যে গরম চায়ের কাপ নিয়ে হাজির।
কী ছোড়দা, যা বলছ সব সত্যি নাকি? মা বিশ্বকাকুকে ছোড়দা বলে ডাকেন।
বউদি, সত্যি আর কাকে বলে! কী যে দুঃখ ছিল হারান মাস্টারের মনে, তা কে জানে! চায়ের কাপ নিয়ে আরাম করে চুমুক দিলেন কাকু–জানো তো, ইস্টিশানের পথটা কীরকম অন্ধকার। দুপাশে সারি-সারি ঝাকড়া গাছ। তার ওপর এবড়োখেবড়ো মাটির পথ। এমনিতেই রাত্তিরে ও রাস্তা দিয়ে হাঁটা মুশকিল, তার ওপর এখন বোঝো! হারান মাস্টার নির্ঘাত ভূত হয়ে ও-পথে পায়চারি করবেন, আর কোচিং ক্লাসের জন্যে ছাত্র-ছাত্রী খুঁজে বেড়াবেন। বলবেন, আঁই, আঁমার কোচিংয়ে ভঁরতি হবি?
মউ আবার নাকি সুরে বলে উঠল, মা, আবার ভয় দেখাচ্ছে বলে সোজা মায়ের শাড়ির ভঁজে ঢুকে পড়তে চাইল।
বিশ্বকাকু দু-চার চুমুকে চায়ের কাপ খালি করে বললেন, বউদি, তোমার মেয়েটা রামভিতু। আমার নাম ডোবাবে। তবে এই বাবানটা আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন বিশ্বকাকু?
এ দারুণ সাহসী। বড় হয়ে ঠিক আমারই মতো দুর্দম, দুর্জয়, অপরাজেয়, অপ্রতিরোধ্য, আর অসমসাহসী বীর হবে। তুমি দেখে নিয়ো।
বিশ্বকাকুর কথায় আমার বুকটা একটু যে ফুলে উঠল না তা নয়। কিন্তু আবার ভয়ও করতে লাগল। কারণ, আজ সন্ধেবেলাতেই কোচিংয়ে যাওয়ার কথা। বিশেষ করে হারানস্যার যখন মারা গেছেন তখন তো আরও যাওয়া উচিত। অন্তত খোঁজখবরটা তো নিতে হয়। কিন্তু যেতে হবে ওই বিপজ্জনক পথ দিয়েই। মনে-মনে ঠিক করলাম, কাকুর মতো বীর হয়ে আমার কাজ নেই। স্কুলে না গিয়ে বিকেল-বিকেল বরং কোচিংয়ে যাব। সুসান, বিলু আর মৃণালের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে একসঙ্গে দল বেঁধে বাড়ি ফিরব। কিন্তু হারান স্যার তো ভালো লোক ছিলেন। তিনি কি মরে ভূত হবেন!
কথাটা বিশ্বকাকুকে জিগ্যেস করতেই তিনি হো-হো করে হসে উঠলেন। বললেন, আরে বোকা, মরে গেলেই কি তার এতদিনের একটা অভ্যেস চলে যাবে! ছাত্র ঠেঙানো ভুলে যাবেন একেবারে! যাক বউদি, আমি চলি। সকালেই খবরটা পেলুম, তাই ভাবলুম দিয়ে যাই। বাবানের সাহসটাও একবার পরীক্ষা হয়ে যাবে। আমি তো ইচ্ছে করেই ওই কাঁচা রাস্তা ধরে আজ থেকে দিনে সতেরোবার করে যাতায়াত করব। হারান মাস্টামশাই আমাকে অনেকবার কান মুলে দিয়েছিলেন, তার শোধ নেব।
এ কথা বলেই বিশ্বকাকু সঙ্গে-সঙ্গে পগারপার। যেমন হঠাৎ এসেছিলেন তেমনই হঠাৎ চলে গেলেন।
