চিঠির উত্তর কী এল আপনারা আশা করি বুঝতেই পারছেন।
ইন্দ্রজিৎ লিখল যে, সে আমার চিঠি পেয়ে খুব অবাক হয়েছে। সবিতা তার সঙ্গে মোটেই যায়নি। সবিতা কোথায়, তাও সে জানে না।
চিঠি পেয়ে অবাক হওয়ার ভান করলাম। সম্ভব-অসম্ভব সব জায়গাতেই সবিতার খোঁজ করলাম। কিন্তু কোথাও ওর খোঁজ পাওয়া গেল না।
ইতিমধ্যে নিয়মিত ফর্মালিন ঢেলে মৃতদেহটাকে ঠিকঠাক রাখার চেষ্টা করেছি–আর মনমরা হয়ে থাকার ভান করেছি। এমনকী দু-চারদিন অফিসও কামাই করে ফেলেছি। শেষে পাড়ার কয়েকজন প্রতিবেশীর অনুরোধে আমি গেলাম পুলিশে খবর দিতে। সঙ্গে কয়েকজন হিতাকাঙ্ক্ষীও গেলেন। সেখানে ডায়েরি করে ক্লান্ত পায়ে বেরিয়ে এলাম থানা থেকে।
আমার এই অভিনয় চালাতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছিল না। বরং রাখীর কাছ থেকে সহানুভূতি পাওয়ার আশায় একদিন রাখীকে না দেখার ভান করে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ফুলে-ফুলে কাঁদছিলাম। রাখী এসে আমার পিঠে হাত দিল। জানি না, বোধহয় আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। ওইটুকু মেয়ে, কিন্তু আমার মতই মেধা পেয়েছে–এটাও বুঝেছে যে, ওর মা-কে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
.
পরদিন সকালবেলা পুলিশ এল। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, আমি তৈরি ছিলাম–তাই এতটুকু ছটফটে ভাব প্রকাশ পেল না আমার ব্যবহারে। ওদের অভ্যর্থনা করে বাইরের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালাম। কিছুক্ষণ আলোচনার পর একজন অফিসার আমাকে সবিতার বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। আমি অবিচলিত কণ্ঠে বলে গেলাম যে, সবিতার কাছে শিলং যাওয়ার একটা রিজার্ভেশান টিকিট দেখেছিলাম, এবং এও জানালাম যে, ও আমার কাছে বলেছিল ইন্দ্রজিতের সঙ্গে শিলং যাবে। কথাসূত্রে ইন্দ্রজিতের পরিচয়, ঠিকানা, ইত্যাদি বললাম এবং আমার চিঠির উত্তরে পাওয়া ওর চিঠিটাও দেখালাম। একইসঙ্গে বললাম যে, আমি নিজে গাড়ি করে সবিতাকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছি।
ইনস্পেক্টর সবিতার ঘর সার্চ করলেন, কিন্তু দরকারি বিশেষ কিছুই পেলেন না। বোধহয় এরকম অদ্ভুত নিরুদ্দেশের কেস তিনি আগে পাননি। যাওয়ার সময় তিনি বললেন, এই অন্তর্ধান রহস্য সমাধান করার জন্যে আমি আটমোস্ট চেষ্টা করব–তবে আমার মনে হয় আপনার স্ত্রী আর বেঁচে নেই।
ইনস্পেক্টর একথা বলামাত্র আমি খুব অবাক হওয়ার ভান করে বললাম, নানা, অফিসার, এ কখনওই হতে পারে না। এ যে আমি চিন্তাও করতে পারছি না…ইত্যাদি ইত্যাদি।
পরের সপ্তাহে ইনস্পেক্টর আবার এলেন। তিনি বললেন, আপনার ইনফরমেশানের ওপরে বেস করে আমি খোঁজ করেছি, মিস্টার বর্মন। কিন্তু সমস্ত জায়গায় এনকোয়ারি করেও আপনার মিসেসের খোঁজ আমরা পাইনি। এটা আমাদের পক্ষে সত্যিই খুব লজ্জার কথা। তবে একটা বিষয়ে আমার একটু সন্দেহ জেগেছে। আশা করি আপনি সে-বিষয়টার এক্সপ্লানেশান দিতে পারবেন।
আমার ভুরু কুঁচকে উঠল। একটু চিন্তিত হলাম, বললাম, কী ব্যাপার?
মিস্টার বর্মন, একটি লোক আমাদের বলেছে যে, সে যখন আপনাকে আর আপনার স্ত্রীকে গাড়ি করে স্টেশানের দিকে যেতে দ্যাখে, তখন সে লক্ষ করে যে, আপনার ওয়াইফের চোখে একটা কালো চশমা ছিল…।
আমি বললাম, হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছে লোকটি। সবিতা চায়নি যে, ওর বাইরে যাওয়ার খবর আর-কেউ জানুকবোঝেনই তো, বিবাহিতা হয়ে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া…।
আপনি বাধা দেননি?
আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম, না বাধা দিইনি। কারণ, দিয়ে কোনও লাভ হত না।
ইনস্পেক্টর এবার রাখীকে নিয়ে পড়লেন। কিন্তু রাখী আমার ধারণামতোই সুন্দরভাবে সব জবাব দিয়ে গেল। ইনস্পেক্টর কোনও হদিশ করতে না পেরে চলে গেলেন।
সবকিছু আমার প্ল্যানমতো ঘটতে লাগল। আমার ইচ্ছে আছে, তদন্তের ঝামেলা মিটে গেলে মৃতদেহটার একটা বন্দোবস্ত করব।
একদিন এইসব সাত-পাঁচ ভাবছি, এমন সময় ইনস্পেক্টর এলেন দলবল নিয়ে। আমি তাদের নিয়ে সবিতার ঘরে গেলাম। ইনস্পেক্টর আজ সবিতা সম্পর্কে অনেক কথা জিগ্যেস করলেন– বারবার। আমিও সাধ্যমতো জবাব দিয়ে গেলাম। রাখীকেও এ-কথা সেকথা জিগ্যেস করলেন। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, মিস্টার বর্মন, এ-কেস সভ করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। হয়তো আপনার ওয়াইফ কোথাও নিজের ইচ্ছেয় লুকিয়ে আছেন, কিন্তু তার যে ভালো-মন্দ কিছু হয়েছে তার কোনও সূত্রই আমাদের হাতে নেই। তবে ভগবান করুন, তাঁর যেন কোনও অমঙ্গ ল না হয়। আপনার কথা ভেবে আমার সত্যিই খারাপ লাগছে।
বলতে-বলতে উঠে দাঁড়ালেন ইনস্পেক্টর।
রাখী আলনার কাছে বসে-বসে কী যেন করছিল, হঠাৎই উঠে দৌড়ে এল আমার কাছে। ওর ওই ছোট্ট গলায় তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, বাবা, মা যদি শিলং গিয়ে থাকবে তবে মায়ের বারোজোড়া চটিই আলনার পড়ে আছে কেন? মা কি কোনওদিন খালি পায়ে বাড়ির বাইরে গেছে?
সমস্ত পৃথিবী আমার সামনে দুলে উঠল। পায়ের নীচে মাটি নড়ে উঠল। টলে পড়ে যাওয়ার আগে শুধু দেখলাম, ইনস্পেক্টর চলে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন।
হারান স্যারের ভূত
ঠিক সক্কালবেলাতেই বিশ্বকাকু হইহই করে বাড়িতে ঢুকলেন। চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন, বাবান-মউ! শিগগির আয়! কোথায় গেলি তোরা সব? বউদি! শুনে যাও শিগগির! জবর খবর আছে তোমাদের জন্যে।
আমি সবে বই নিয়ে পড়তে বসেছি। আর মউ হাত-মুখ ধুয়ে আয়নায় মুখ দেখছে। বিশ্বকাকুর চিৎকারে দুজনেই একছুটে দরজায় গিয়ে হাজির।
