মা সেদিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, বাবান, আজ সন্ধেবেলা তোর কোচিংয়ে গিয়ে কাজ নেই।
মউ শাড়ির আড়াল থেকে উঁকি মেরে বলল, যাক না, সঙ্গে-সঙ্গে ঘাড় ধরে মটা।
আমি কোনও প্রতিবাদ করার আগেই বাবা বাজার থেকে ফিরলেন। বাজারের থলে দুটো মায়ের হাতে তুলে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, শুনেছ, হাই ইস্কুলের হারানবাবু আত্মহত্যা করেছেন?
মা ঘাড় নেড়ে জানালেন, হ্যাঁ শুনেছেন।
.
সামনে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু আকাশের দিকে তাকালে মিটিমিটি তারা চোখে পড়ে। তা ও আবার মাঝে-মাঝে ঢেকে যাচ্ছে কঁকড়া-মাথা গাছের উশকোখুশকো চুলের আড়ালে। ঝিঁঝি পোকা কোথায় যেন একটানা ডেকে চলেছে। সব মিলিয়ে রোজকার চেনা রাস্তাটা যেন অচেনা লাগছে। মনে সাহস জোগানোর চেষ্টা করলাম। ভাবতে লাগলাম বিশ্বকাকুর দুর্জয় সাহসের কথা–অন্তত তার মুখে যেরকম শুনেছি। কিন্তু তাতেও ভরসা পাচ্ছি কই! তা ছাড়া এ তো সবে সেই ভয়ংকর কাঁচা রাস্তার শুরু।
ঢিপঢিপে বুকে ধীরে-ধীরে এগোলাম। দু-পাশে সারি-সারি বিশাল গাছ। বট-অশ্ব-দেবদারু জাম আরও কত কী। এ-রাস্তা দিয়ে কত যাওয়া-আসা করেছি, কিন্তু ভয় কখনও পাইনি। এখন শুধু হারান স্যারের কথা মনে পড়ছে। কীভাবে তিনি চলতেন, কীভাবে হাসতেন, কীভাবে কথা বলতেন–সব।
আজ কোচিংয়ে গিয়ে কোনও লাভ হয়নি, উলটে বিপদে পড়েছি। সুসান, মৃণাল ওরা কেউ আসেনি। ভূতের ভয়ে কি না কে জানে! ফলে আমি একেবারে একা পড়ে গেছি। মাস্টারমশায়ের ভাইয়ের সঙ্গে কথায় কথায় কখন যে শীতের বেলা পড়ে গেছে টেরই পাইনি। বাড়ি ফেরার সময় উনি একবার জিগ্যেস করেছিলেন, এগিয়ে দিতে হবে কি না। আমি লজ্জায় বারণ করেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এগিয়ে দিলেই ছিল ভালো।
হঠাৎই হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম। বেশ ব্যথা লাগলেও চটপট উঠে হাত-পায়ের ধুলো ঝেড়ে নিলাম। কোন দিকে চলেছি সেটাই কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় কোথাও একটা শেয়াল ডেকে উঠল, হুক্কা-হুঁয়া। ব্যস, আমার তো হাত-পায়ে কঁপুনি ধরে আর কি! শুনেছি অনেকে জোরে-জোরে গান গেয়ে ভূতের ভয় তাড়ায়। কেউ বা রাম-নাম করে। আমি তো গান বলতে শুধু জনগণমনঅধি– ছাড়া আর কিছুই জানি না। আর রাম-নাম?রাম-রাম বলতে বলতে যদি মরা-মরা হয়ে যায়! তা হলেই সর্বনাশ! হারান স্যার সঙ্গে-সঙ্গে তার ভূতুড়ে কোচিংয়ের প্রথম ছাত্রটি পেয়ে যাবেন। আচ্ছা, জোরে-জোরে চিৎকার করলে কেমন হয়? উঁহু, লোকে ভাববে আমি ভয় পেয়েছি। তার চেয়ে হো-হো করে অট্টহাসি হাসাই ভালো। তাতে ভয়টা কেটে যাবে। আর যে শুনবে সে ভাববে আমি একটুও ভয় পাইনি।
এইসব নানান কথা ভাবছি, হঠাৎই কোথা থেকে ভেসে এল ডানা ঝাপটানোর ঝটপট শব্দ। তারপরই হুতুম পাচার চিৎকার। আর সব শেষে একদল শেয়ালের কান্না।
আর দেরি করলাম না। আধো-আঁধারির মধ্যে দিয়ে টেনে ছুট মারলাম। আর হা-হা-হি হি-হো-হো করে গলা ফাটিয়ে হাসতে লাগলাম। ওঃ, মনে যেন কিছুটা ভরসা পাচ্ছি। বই-খাতা হাতে নিয়ে কোনওরকমে ছুটে চলেছি, আর যত কষ্টই হোক না কেন হাসি থামাচ্ছি না। দুপাশে ঘন কালো ছায়ার মতো গাছের গুঁড়িগুলো পেরিয়ে যাচ্ছে। কোনটা তার মধ্যে হারান স্যারের আস্তানা কে জানে। এখুনি হয়তো পেছন থেকে আমার হাফ-শার্টের কলার চেপে ধরে বলে উঠবেন, কী রে, পালাচ্ছিস কেন?
ছুটতে ছুটতে বুকে আমার হাঁফ ধরে গেল। চিত্তারের চোটে গলা ব্যথা করছে। এদিকে রাস্তাও প্রায় শেষ হয়ে আলোর ঝিলিক দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ দেখি দূরে মাটির ওপরে একটা সাদা মূর্তি টান-টান হয়ে পড়ে আছে।
বুকটা আমার ছাত করে উঠল। পারাবার পার হয়ে এসে শেষকালে– হারান স্যার নয় ত! পুলিশ কি মৃতদেহটা রাস্তার ওপরেই ফেলে রেখে গেছে! কই, যাওয়ার পথে এ-রকম তো কিছু দেখিনি!
ততক্ষণে হাসি আমার বন্ধ হয়ে গেছে। চলার গতিও আপনা থেকেই কমে এসেছে। সাদা মূর্তিটা যেন নড়ছে।
আরও কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখি একটা লোক। চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে আছে। আর গো গোঁ করে বিচিত্র শব্দ করে চলেছে। না, এ তো তাহলে ভূত নয়। এ যে সত্যিকারের মানুষ।
কে আপনি? কী হয়েছে? ভয়ার্ত স্বরে প্রশ্নটা করতেই চাদর মুড়ি দেওয়া লোকটা উঠে বসল।
চাদর সরিয়ে উঁকি মারতেই চিনতে পারলাম বিশ্বকাকু! চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসবে। মুখটা হাঁ হয়ে রয়েছে। আমাকে দেখে একেবারে জড়িয়ে ধরলেন। হাঁফাতে-হাঁফাতে বললেন, বাবান রে, তুই আজ তোর এই কাকুটার লাইফ বাঁচালি! নইলে হারান মাস্টারের গোস্ট আমাকে দিয়েছিল অলমোস্ট শেষ করে!
আমি এবার অনেকটা সাহস পেয়েছি। বিশ্বকাকুর পাশে বসে পড়ে বললাম, কী হয়েছিল, কাকু? ভয় পেয়েছ কেন?
আর বলিস কেন! সতেরোবার টহল মারব বলে বারবার এ-রাস্তার এ-মাথা ও-মাথা করছি, ঠিক তেরোবারের মাথায় একটা রক্ত হিম করা অট্টহাসি কানে এল। আমি ভাবলুম, কে? মানুষ, না প্রেত? তারপরই আর সন্দেহ রইল না, এ হারান মাস্টারের অট্টহাসি। তুই বিশ্বাস করবি না বাবান, আমার মতো দুর্দম, দুর্জয়, অপরাজেয়, অসমসাহসীও এমন ভয় পেয়ে গেল যে, আমি তোদের বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করলাম। কিন্তু তাতেও কি রেহাই আছে! শুনতে পেলাম, প্রেতটা সেই হাড় কাঁপানো অট্টহাসি হাসতে হাসতে আমাকে তাড়া করে আসছে, হা-হা-হি-হি-হো-হো! ওঃ, ভয়ে আমার তো গায়ে কাঁটা দিয়েছে। দরদর করে এই শীতেও ঘামছি। তারপর ছুটতে ছুটতে এখানটায় এসে মুখ থুবড়ে পড়লাম। চাদর মুড়ি দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছি, এমন সময় তুই এলি–
