সুতপন বেশ উৎসাহ নিয়ে ওর সিরিয়ালের কথা বলতে লাগল। তেরোটা এপিসোডের মধ্যে চারটে এপিসোডের শুটিং শেষ। তারপর…।
রোমি ওদের চা নিয়ে শোওয়ার ঘরে এসে ঢুকল। ছোট টেবিল থেকে বোতল আর গেলাস আগেই সরিয়ে ফেলেছিল কমলেশ। সেটার ওপরেই চায়ের কাপ-প্লেট রাখল রোমি। টেবিলটা টেনে দিল কমলেশ আর সুতপনের মাঝে। তারপর আবার রান্নাঘরের দিকে গেল নিজের চায়ের কাপ নিয়ে আসতে।
একটু আগেই প্যাটিস খাওয়া শেষ হয়েছে। কমলেশ রোমির বারণ শোনেনি। বিকেলে বেরিয়ে ফ্লরিজ-এর প্যাটিস নিয়ে এসেছিল।
কথা বলতে বলতে সুতপন হাসছিল। বেশ সুন্দর চেহারা ছেলেটির। ও নিজেই তো সিরিয়ালে অভিনয় করতে পারে!
রোমি চা নিয়ে এসে বিছানায় বসল। কমলেশের কাছ থেকে একটু দূরে।
সুতপন চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, কমলেশদা, আপনার জন্যে একটা সারপ্রাইজ আছে।
কমলেশ কৌতূহলী চোখে সুতপনের দিকে তাকাল। সুতপন রোমিকে একবার দেখল। চোখে হাসল। তারপর বলল, এখনই যে-সিরিয়ালটার কথা আপনাকে বললাম, মানে, জীবনের সুখ দুঃখ, ওটাতে রোমি অভিনয় করছে–হিরোইন।
কমলেশ চা খাওয়া থামিয়ে রোমিকে দেখল। মুখে তৃপ্তি আর প্রচ্ছন্ন অহঙ্কার। রোমির সৌন্দর্য এবার সকলে দেখবে, তারিফ করবে। কমলেশের সেই কাল্পনিক ডেথ সার্টিফিকেটের কথা মনে পড়ল। তবে তার বেশি কিছু নয়।
রোমির কাছে কমলেশ নিতান্তই সাধারণ। একটু চটাচটি হলেই ও বলত, তুমি নেহাতই একটা সেকেলে ছাপোষা মানুষ–শুধু একটু বিজ্ঞান জানো।
শত চেষ্টা করেও কমলেশ রোমির ওই ডেফিনেশান পালটাতে পারেনি। আর নিজেকেও পালটাতে পারেনি। তবে ছোট্ট রিঙ্কু সবসময় ওকে আশা জোগাত। মনে হত, এই বুঝি সব আবার ঠিকঠাক হয়ে যাবে।
কী হল, তুমি কিছু বলছ না যে!
রোমির কথায় সামান্য অবজ্ঞার রেশ যেন টের পেল কমলেশ। ওর পরনের গোলাপি সাদা সিল্কের শাড়ি চকচক করছে। বড় চোখে লাগছে।
কমলেশ স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল, এ তো খুব ভালো খবর।
রোমি সুতপনের দিকে তাকিয়ে বলল, সুতপন, দ্যাখো না, এই সিরিয়ালটায় কমলেশের কোনও টেকনিক্যাল হেল্প নেওয়া যায় কি না।
আমি তো কমলেশদাকে ওপেন অফার দিয়েই রেখেছি।
কমলেশ বলল, না, না, আমি এখন নতুন একটা মেশিন নিয়ে কাজ শুরু করেছি। ওটার পেছনে তিন-চারমাস লেগে যাবে।
কমলেশ রোমির চোখে তাকিয়েই বুঝতে পারল, ওর মিছে কথা রোমির কাছে ধরা পড়ে গেছে।
রোমি সহজ গলায় বলল, কালই তো তুমি ফোনে বললে কী একটা বিউটি কুইন রোবট তৈরি করেছ।
সত্যি, কমলেশদা! সুতপনের গলায় আগ্রহ।
কমলেশের ভালো লাগল। ও চাইছিল, রোমিই সুন্দরীর প্রসঙ্গ তুলুক, কমলেশের নতুন আবিষ্কার নিয়ে প্রশ্ন করুক।
যাক, ব্যস্ত হওয়ার মতো একটা কাজ পাওয়া গেল। চায়ের কাপ রেখে কমলেশ উঠে এগিয়ে গেল আয়নার কাছে। খবরের কাগজে মুড়ে সুন্দরীকে মেঝেতে শুইয়ে রেখেছিল ও। কাগজের মোড়ক খুলে রোবটটাকে দাঁড় করাল। তারপর সুইচ অন করে দিয়ে বলল, এই হল আমার নিউ ইনভেনশান–।
সজ্ঞান হওয়ামাত্রই সুন্দরী আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে সাজগোজ শুরু করল। আর সেইসঙ্গে গুনগুন করে গান ধরল, আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব।
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই শুরু হয়ে গেল পাগলপারা হাসি। রোমি খিলখিল করে হাসতে শুরু করেছে। শরীর বেঁকিয়েচুরিয়ে মুখ তুলে হাসছে তো হাসছেই।
সুতপনও হাসছিল, তবে অতটা শব্দ করে নয়।
কমলেশ কেমন বোকার মতো সুন্দরীর পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
রোমি হাসির দমক কমিয়ে চোখের জল মুছে বলল, এই তোমার বিউটি কুইন! তারপর আবার হাসি।
সুন্দরী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল রোমির দিকে। তারপর বলল, কমলেশ, ওকে থামতে বলো। আমার কানে লাগছে।
রোমি অনেক কষ্টে থামল। বলল, সত্যি, কী সুন্দর! যেমন চেহারা, তেমনই গলা–কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি!
কমলেশ বিছানার কাছে এগিয়ে এল। রোমি উঠে দাঁড়াল। সুতপনও।
রোমির যা-যা নেওয়ার সবকিছু আগেই বড় একটা শপিং ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। ওকে উঠে দাঁড়াতে দেখেই সুতপন ঝুঁকে পড়ে ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। হাসতে হাসতে বলল, কমলেশদা, আজ একটা দারুণ জিনিস দেখালেন। আপনার হাত খালি হলে আমাদের টেকনিক্যাল হেল্প করার ব্যাপারে একটু ভাববেন কিন্তু।
কমলেশ ঘাড় নাড়ল।
রোমি হেসে বলল, তোমার এই কিম্ভুতকিমাকার বস্তুটিকে বিউটি কনটেস্টে নামিয়ে দাও।
সুন্দরী জোরালো গলায় জবাব দিল, ধন্যবাদ, আমার কনফারমেশনের দরকার নেই। আমি
জানি আমাকে তোমার চেয়েও সুন্দর দেখতে কথা শেষ করেই আবার গুনগুন গান।
রোমির ফরসা মুখ লাল হল। ও কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, আমি যাচ্ছি। তুমি তা হলে লিভ টুগেদারের ভালোই সঙ্গী পেয়েছ।
কমলেশ চাইছিল না রোমি এত তাড়াতাড়ি চলে যাক। ও বলল, তুমি এই রোবটটার কথায় কিছু মনে কোরো না। এটা ভীষণ উলটোপালটা বকে। বড্ড খামখেয়ালি।
রোমি বিরক্তভাবে বলল, তবে তো একেবারে রাজযোটক!
রোমি দরজার দিকে এক-পা বাড়াতেই কমলেশ প্রায় পথ আগলে দাঁড়াল। মরিয়া হয়ে জিগ্যেস করল, রিঙ্কু কেমন আছে? ওকে অনেকদিন দেখিনি।
এখানকার চেয়ে অনেক ভালো আছে।
কমলেশ সুতপনের দিকে একবার দেখল। তারপর বলল, সুতপন, আমি রোমির সঙ্গে কয়েকটা পারসোনাল কথা বলতে চাই।
