টেলিফোনের ও-প্রান্তে রোমি হাসল, বলল, তবে যে বললে খুব সুন্দর দেখতে!
কমলেশ নিজেকে সামলে নিতে একটু সময় নিল। তারপর বলল, না, না, রোবটটা নিজেই নিজেকে বিশ্বসুন্দরী খেতাব দিয়ে বসে আছে–তাই ও কথা বলেছি।
তা হলে আর কী, বিউটি কনটেস্টে নামিয়ে দাও। হাসল রোমি।
কমলেশ যেন হঠাৎ পুরোনো হাসির ছোঁয়া খুঁজে পেল। কিন্তু তাতে কী!
কাল সন্ধেবেলা যাচ্ছি তা হলে। বলে লাইন কেটে দিল রোমি।
কমলেশ রিসিভার নামিয়ে রাখামাত্রই সুন্দরী বলে উঠল, কী, বাবুর প্রেমালাপ শেষ হল?
কোনও উত্তর না দিয়ে কমলেশ বিছানায় গিয়ে বসে পড়ল। সামনের ঝুলবারান্দার মেঝেতে রোদ নেমে এসে শুয়ে পড়েছে। আগেকার সময় হলে বারান্দার রেলিঙে এখন রোমির ভিজে শাড়ি শুকোত।
কমলেশের মাথার দপদপানিটা বেশ কয়েক ধাপ চাড়া দিয়েছে। একইসঙ্গে মাথার ভেতরে অসংখ্য স্মৃতিকোষে পুরোনো দিনের জলছবিগুলো এলোমেলো ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছিল।
কমলেশ, আমার কথায় দুঃখ পেলে?
কমলেশ মাথা তুলে আয়নার দিকে দেখল। আমুল স্প্রে-র ভাঙা টিন ইত্যাদি এখন ওর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। একটু আগের কথাটা বলার সময় গলার ধাতব স্বর যথেষ্ট মোলায়েম করার চেষ্টা করেছে।
না, কমলেশ মোটেই দুঃখ পায়নি। একটা হতকুচ্ছিত যন্ত্রের মন্তব্যে কে-ই বা দুঃখ পায়! তা ছাড়া কমলেশের এখন কোনওদিকে মন ছিল না। শুধু ভাবছিল, কাল রোমি এলে ওকে কী বলবে। নিজেকে কি বড় বেশি ভিখারি মনে হচ্ছে?
কমলেশ উঠে আয়নার কাছে যেতে চাইল। রোবটটা ওর পথ আগলে দাঁড়িয়ে। এটাকে বিকল করে ভেঙেচুরে শেষ করে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু কাল রোমি যে এটা দেখবে। কমলেশের নতুন আবিষ্কার।
কমলেশ সুন্দরীকে পাশ কাটিয়ে আয়নার দিকে এগোনোর চেষ্টা করতেই রোবটটা আগের মতো ঢং করে আঁতকে উঠে খানিকটা সরে গিয়ে বলল, আবার দুষ্টুমি! না, কমলেশ, না প্লিজ, ওসব আমার ভালো লাগে না। ওঃ, রূপই হয়েছে আমার যত জ্বালা!
কমলেশ কী করবে ভেবে পেল না। শুধু বিরক্তভাবে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ভয় নেই, তোমার সঙ্গে ফুলশয্যা করার কোনও বাসনা আমার নেই।
কামনা-বাসনাই তো মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুন্দরী।
হায় রে আবিষ্কার! কমলেশ আসলে নেশার ঘোরে নিজের জন্য একটি বাঁশ আবিষ্কার করেছে।
তখনই কমলেশ টের পেল, বেশ খিদে পেয়েছে। ও দেওয়ালে টাঙানো ডিজিটাল ঘড়ির দিকে তাকাল। লাল-হলদে-সবুজ এল. ই. ডি. বাতি জ্বলজ্বল করে জানান দিচ্ছে এখন প্রায় পৌনে এগারোটা। ছুটির মা কখন আসবে?
কমলেশের ভালো লাগছিল না। ও রাস্তায় বেরোনোর জন্য তৈরি হতে লাগল। শেভ করে, জামা-প্যান্ট পরে নিয়ে যখন আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে যাচ্ছে, তখন ও খেয়াল করল, সুন্দরী বেশ মনোযোগ দিয়ে ওর প্রতিটি কাজ লক্ষ করছে।
কমলেশের কেমন যেন অস্বস্তি হল। ও নেহাত কথা বলার জন্যই বলল, আমি একটু বেরোচ্ছি। তুমি ফ্ল্যাটে একা থাকতে যেন ভয় পেয়ো না। এখুনি অবশ্য ছুটির মা এসে পড়বে।
সুন্দরীর চোখে আলো জ্বলছিল। ও বলল, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, বেশি দেরি কোরো না যেন।
সুন্দরীর কথার মধ্যে এমন একটা আপন ভাব ছিল যে, কমলেশ চুল আঁচড়াতে- আঁচড়াতে থেমে গেল। রোবটটাকে দেখল। ওটা সত্যি-সত্যি লোহালক্কড়, আই. সি. চিপ আর তার-টার দিয়ে তৈরি তো!
কমলেশ আলতো গলায় বলল, তোমাকে সঙ্গে নিয়ে বেরোতে পারতাম, কিন্তু…।
না, না, দরকার নেই। সুন্দরী ঝটপট বলে উঠল, রাস্তায় বেরোলেই আবার ছেলে-বুড়োর দল আমার ওপর একেবারে হামলে পড়বে। রোবটটা আয়নায় দিকে এক পা এগিয়ে গেল : নাও, সরো, এবার একটু আয়নাটা দেখি।
কমলেশ আর দেরি করল না। ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। ছুটির মা এলে কোনও অসুবিধে নেই। তার কাছে ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি আছে।
একতলার সদর দরজা দিয়ে বেরোতেই গুরুপদবাবুর সঙ্গে দেখা। ফ্ল্যাটবাড়ির লাগোয়া বাগানের পাশে ভদ্রলোক ছোট-ছোট পায়ে ঘুরঘুর করছেন। বোধহয় রোদ পোয়াচ্ছেন। পরনে একই পোশাক এবং হাতে পাচালো লাঠি।
বাতাসে নতুন শীত শীত ভাব, আকাশ মেঘলা।
কমলেশ আকাশের দিকে একবার দেখল। তারপর বলতে হয় তাই বলল, মেসোমশাই, রোদ চড়া হলে আপনার বেশ আরাম লাগত।
গুরুপদ সরকার পায়চারি থামিয়ে কমলেশের খুব কাছে এসে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে চেঁচিয়ে বললেন, হ্যাঁ, বাবা, জানি, রোজ ভাড়া পেলে আমার বেশ আরাম লাগত। কিন্তু তোমরাই তো ভাড়া বাকি ফেলে-ফেলে–
কমলেশের হঠাৎই খেয়াল হল, ভদ্রলোক কানে কম শোনেন। ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ঠিক আছে, মেসোমশাই, এ নিয়ে পরে কথা হবে এবং হনহন করে হাঁটা দিল। নাঃ, ভদ্রলোকের জন্য একটা ফার্স্ট ক্লাস হিয়ারিং এইড তৈরি করে দিতে হবে।
.
সবকিছু আবার যেন আগের মতো লাগছিল।
রান্নাঘরে কাপ-প্লেট-চামচের টুংটাং শব্দ। রোমি চা তৈরি করছে। কমলেশ কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছোট-ছোট শব্দগুলো শুনছিল। শব্দগুলো ওকে রান্নাঘরের দিকে টানছিল। কিন্তু সামনেই চেয়ারে সুতপন বসে আছে। তাই কমলেশ আবার এলোমেলো কথা শুরু করল ওর সঙ্গে।
তোমার নতুন টিভি সিরিয়ালের কাজ কেমন চলছে?
আচ্ছা, ঠিক কতদিন পর রোমির হাতে চা খাবে কমলেশ? ও মনে-মনে একটা হিসেব কষতে শুরু করল।
