সুতপন ভদ্র ছেলে। রোমি কিছু বলার আগেই ও বলল, আমি বাইরের ঘরে আছি– তারপর সহজ পা ফেলে বেরিয়ে গেল শোওয়ার ঘর থেকে।
ঝুলবারান্দার দরজার দিকে চোখ গেল কমলেশের। বাইরের রাত কুচকুচে কালো। সেই কালো রাত নতুন শীতের হিমেল বাতাস পাঠিয়ে দিচ্ছিল ঘরের ভেতরে।
রোমি–।
বলো।
কী বলবে কমলেশ! নিজেকে ভীষণ খাটো মনে হচ্ছে। অথচ ও তো কোনও অন্যায় করেনি! এই অপদার্থ বেঁচে-থাকা তো সাধ করে বেছে নেয়নি!
রোমি, এভাবে আমি আর পারছি না। তোমার সব কথা আমি মেনে নেব, কিন্তু এভাবে আমাকে আর কষ্ট দিয়ো না..প্লিজ… কমলেশের কান্না পেয়ে যাচ্ছিল।
রোমি কোনও জবাব দিল না।
রোমি, তুমি…রিঙ্কু…তোমরা…হয় এখানে চলে এস, নয়তো আমাকে তোমাদের কাছে নিয়ে যাও। এভাবে আমি…আমি… কমলেশের গলায় বুকে কষ্ট হচ্ছিল।
রোমি এবার কথা বলল, এইজন্যেই তোমার সঙ্গে কোনওরকম রিলেশান রাখা প্রবলেম। আমাদের বনিবনা হয়নি, আলাদা আছি, ঠিক আছে। কিন্তু হ্যালো-হাই রিলেশান রাখতে তো কোনও ক্ষতি নেই! সেটা দেখছি তোমার এই বস্তপচা সেন্টিমেন্টের জন্যেই রাখা যাবে না। এমন ছেলেমানুষি করো না! এরপর থেকে দরকারি জিনিসপত্র যা কিছু নেওয়ার সুতপনই এসে নিয়ে যাবে।
কমলেশ পাথরের মতো হয়ে গেল। আর কী বলবে ভেবে পেল না। সেন্টিমেন্টের কোনও দাম নেই! সেটাও তাতে কী হয়ে গেছে! কমলেশের চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।
কমলেশ–।
রোমি নয়, সুন্দরী ওর নাম ধরে ডেকেছে। আয়না ছেড়ে এক-পা এগিয়েও এসেছে ওদের দিকে।
কাকে কী বলছ, কমলেশ! তোমার কথা ও বুঝবে না। ওর…ওর শুধু বাইরেটা সুন্দর। আমার সঙ্গে ওর কোনও তুলনাই হয় না। হোপলেস বেচারি হতভাগিনী।
আগুন জ্বলে গেল।
রোমি চিৎকার করে উঠল, তুমি যেমন, ঠিক সেরকম রোবটই তৈরি করেছ। এসব তোমার শয়তানি কারিকুরি। অভদ্র, ছোটলোক! আমাকে ডেকে এনে…।
রোমি, প্লিজ। রোমি– কমলেশ আকুলভাবে কিছু একটা বলতে চাইল।
সুতপন হন্তদন্ত হয়ে এসে ঢুকল ঘরে।
রোমি ধারালো চোখে একবার সুন্দরীকে দেখল, তারপর সুতপনকে নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ফ্ল্যাটের দরজা খোলা এবং বন্ধ করার শব্দ এ-ঘর থেকেই স্পষ্ট শুনতে পেল কমলেশ।
অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে শীতের হাওয়া অনুভব করল। তারপর রবারের পা নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসল। ওর ভেতরে কিছু একটা হচ্ছিল। একটা বালিশ আঁকড়ে উপুড় হয়ে শুয়ে কমলেশ বোকার মতো হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল।
আর সুন্দরী শুধু অবাক হয়ে কমলেশকে দেখছিল।
.
অনেক…অনেকক্ষণ পর কমলেশ যেন কারও ডাক শুনতে পেল। চোখ খুলতেই দেখল, ঘর অন্ধকার। কখন লোডশেডিং হয়েছে টের পায়নি। বারান্দার খোলা দরজা দিয়ে বাইরের রাত আবছাভাবে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু আর কিছুই কমলেশ দেখতে পাচ্ছে না। শুধু অন্ধকার।
কমলেশ—
খুব কাছ থেকে নরম গলায় সুন্দরী ওর নাম ধরে ডাকছে।
অন্ধকারে বাঁ-হাতের কাছটায় ধাতব ছোঁয়া টের পেল কমলেশ।
সুন্দরী আবার ডাকল, কমলেশ–।
একটা সুন্দর গন্ধ কমলেশের নাকে এল। ও বড় করে শ্বাস নিল। হাত বাড়াতেই এবড়োখেবড়ো শীতল ধাতুর ছোঁয়া লাগল। কমলেশের হাত আলতো করে ছুঁয়ে যেতে লাগল রোবটটার শরীর। গন্ধটা যেন আরও তীব্র হয়েছে। কমলেশের নেশা ধরে যাচ্ছিল। ডানহাতটা সুন্দরীর বুকের কাছটায় যেতেই ছোট্ট দরজার নবটা টের পেল।
গন্ধটা কি ওর ভেতর থেকেই আসছে?
কমলেশের মাথা ঠিকঠাক কাজ করছিল না। চোখ জ্বালা করছিল, মাথা দপদপ করছিল।
নব টেনে দরজাটা খুলে ফেলল কমলেশ।
মনে হল, গন্ধটা আরও বেড়ে গেছে। কমলেশকে নিশির মতো টানছে।
রোবটটাকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে কোনওরকমে উঠে বসল কমলেশ। অনুমানে ভর করে মুখটা নিয়ে গেল খোলা দরজার খুব কাছে। বুক ভরে শ্বাস নিল। তারপর অন্ধকারের মধ্যেই চোখ মেলে সুন্দরীর ভেতরটা দেখতে চেষ্টা করল।
কমলেশ–।
দরজার ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে দিয়ে আচ্ছন্ন কমলেশ নরম গলায় ডেকে উঠল, সুন্দরী–। তোমার ভেতরটা কী সুন্দর…!
হঠাৎ বজ্রপাত
এখন আমি আপনাদের যে-খুনটার কথা বলব সেটা কিন্তু যথেষ্ট চাতুর্যপূর্ণ। সাধারণ হত্যাকারীরা খুনের পেছনে টাকা খরচ করে, কিন্তু বুদ্ধি খরচ করে না। ছোটবেলা থেকেই স্কুলের মাস্টারমশায়রা আমার মেধা লক্ষ করেছিলেন। সেই মেধা আমি লক্ষ করেছি আমার একমাত্র মেয়ে রাখীর মধ্যেও। ক্লাস ফোরে পড়লে কী হবে, সবাই ওর বুদ্ধির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তবে ওর মা– আই মিন আমার ওয়াইফ, সবিতা কিন্তু মোটেই সুবিধের নয়। যদি এরকম বউ কারও থেকে থাকে, তবে একমাত্র তিনিই বুঝতে পারবেন। মোটকথা ওরকম বউকে খুন করতেও কারও বাধে না–অন্তত আমার নয়।
সত্যিই আশ্চর্য ধাতুতে গড়া সবিতা। দিনরাত পার্টি, ফুর্তি আর কসমেটিক্স-এর পেছনে লেগে আছে তার সঙ্গে বারোজোড়া চটি–আটান্নখানা শাড়ি (এসবই রাখীর দৌলতে আমার জানা–ওর মায়ের কোন জিনিস কটা আছে তা ওর মুখস্থতা ছাড়া নতুন কিছু কেনা হলেই সবিতারও রাখীকে ডেকে কোলে বসিয়ে দেখানো চাই। ভয় হয়, শেষে রাখীও না ওর মায়ের মতো হয়!), আংটি, ঘড়ি, উইগ ইত্যাদির ঠেলায় আমার প্রাণ বর্তমানে গলার কাছে। আমি মাঝে-মাঝে চোখে অন্ধকার দেখি। পরে ভেবে দেখেছি, অফিসের ক্যাশ ভাঙার চেয়ে বউকে খুন করা অনেক সহজ।
