সুন্দরী প্রায় মুখঝামটা দিয়ে কমলেশকে দাবড়ে দিল :! তুমি ওই আনন্দেই থাকো। আজকালকার জোয়ান ছোঁড়াগুলোকে কিছু বিশ্বাস নেই। ওরা রূপের গন্ধ পায়।
কথা শেষ করেই আবার গুনগুন, আবার প্রতিবিম্বের সামনে দাঁড়িয়ে রূপচর্চা।
কমলেশের ইচ্ছে হল টেনে-টেনে নিজের মাথার চুলগুলো ছিঁড়ে ফ্যালে।
কিন্তু টেলিফোন তখনও বাজছিল।
ও তাড়াতাড়ি রিসিভার তুলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, হ্যালো।
সুপারটয় করপোরেশন-এর এম. ডি. নয়, ওপাশ থেকে রোমির তীব্র কণ্ঠস্বর ভেসে এল? আজকাল কি কানেও কম শুনছ নাকি?
রোমি, রোমি…কমলেশের মাথা ঝিমঝিম ভাবটা পলকে কেটে গেল। গলার ভেতরে সুপুরির একটা কুচি আটকে গেছে বলে মনে হল।
শোনো, কাল সন্ধেবেলা সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ আমি যাব। তুমি ঘরে থেকো। ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে হুট করে কোথাও চলে যেয়ো না।
না, না, থাকব। একটু থেমে তারপর, রিঙ্কুকে নিয়ে আসবে তো?
রোমি ঠান্ডা গলায় বলল, ওর সামনে পরীক্ষা। আজেবাজে সময় নষ্ট করলে পড়ার ক্ষতি হবে।
এক-দেড়ঘণ্টার জন্যে এলে কী আর এমন ক্ষতি হত! অনেকদিন ওকে দেখিনি। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, বিশ্বাস করো।
দেখি, পরীক্ষার পর যদি একদিন নিয়ে যেতে পারি।
কমলেশ মনে-মনে রিঙ্কুর মুখটা ভাবল। ও যদি আসত তা হলে কমলেশ আইসক্রিম, ক্যাডবেরি চকোলেট, ঘুগনি, ফুচকা–আরও কত কী নিয়ে আসত কে জানে! এগুলো সবই রিঙ্কুর ফেবারিট ডিশ।
কমলেশ বলল, কাল সন্ধেবেলা তোমার জন্যে ফুরিজ-এর চিকেন প্যাটিস আর থার্স আপ এনে রাখব।
এগুলো রোমির ফেবারিট, কমলেশ জানে। ফুরিজ-এ ওরা একবারই খেতে গিয়েছিল। তবে কমলেশ মাঝেমধ্যে চিকেন প্যাটিস কিনে নিয়ে আসত।
রোমি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, না, না, ওসব ঝামেলা করতে যেয়ো না। আমি তো যাব আর কয়েকটা শাড়ি-জামাকাপড়, ব্যাঙ্কের চেকবই-পাশবই, আর মিক্সিটা নিয়েই চলে আসব। মনে আছে, কবছর আগে আমাদের অ্যানিভারসারিতে ওটা বড়দি আমাকে প্রেজেন্ট করেছিল?
মনে আছে। রোমির বড়দি জামশেদপুরে থাকে। স্বামী টাটার বিশাল অফিসার। এইট্টি নাইনে ওদের বিবাহবার্ষিকীর সময়ে ওরা কলকাতায় ছিল। তখনই মিক্সিটা প্রেজেন্ট করেছিল।
রোমি মিক্সি নিতে আসবে। পাশবই-চেকবই, আর শাড়ি-জামাকাপড় নিতে আসবে। মাঝেমাঝেই ও এরকম আসে। দরকারি জিনিসগুলো নিয়ে যায়। পাশবইটা জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট হলেও ওতে রোমিরই টাকা থাকত। আর মিক্সি দিয়ে কমলেশ এখন কী করবে! কিছুই আর মেশানোর নেই। বরং রিঙ্কু ম্যাংগো জুস খেতে খুব ভালোবাসত। রোমি নিয়ে গেলে মেয়েটা খুশি হবে।
রোমি…রোমি…।
রোমি ফোন নামিয়ে রাখতে যাচ্ছিল, একটু অধৈর্য হয়ে বলল, বলল, কী? আমার স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে।
কমলেশের পুরোনো কথা মনে পড়ছিল। ও প্রাণপণে ভুলতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারছিল না।
কমলেশ থেমে-থেমে বলল, রোমি–আবার সবকিছু ঠিকঠাক করে নেওয়া যায় না? আগের মতো।
অন্য কোনও কথা থাকলে বলো।
তোমার পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে না?
পড়ে–তাতে কী?
তাতে কী! কমলেশ যেন পাথর হয়ে যাচ্ছিল। বিয়ের আগে রোমির সঙ্গে দু-বছরের দুরন্ত ভালোবাসা; মাঠ-ময়দান, ভিক্টোরিয়া, রেস্তোরাঁ, সিনেমা হল, বকখালি বেড়িয়ে আসা; পাগলের মতো চুমু খাওয়া, আদর করা–সব এখন তাতে কী!
একদিন শীতের পড়ন্ত বেলায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পুকুরপাড়ে কাঠের বেঞ্চে বসে ছিল ওরা। সূর্য ঢলে পড়ছিল ডানদিকের আকাশে, আর সামনে শান্ত জলের আয়নায় শ্বেতপাথরের স্মৃতিসৌধটির ছায়া পড়েছিল। রোমির নরম চিকন হাতের পাতা কমলেশের হাতে ধরা ছিল। কমলেশ ওর কররেখা দেখতে-দেখতে বলেছিল, স্মৃতির ছায়া পড়েছিল শীতল জলতলে, প্রতিশ্রুতি আঁকা ছিল তোমার করতলে।
রোমি ওর হাতটা মুঠো করে আঁকড়ে ধরেছিল।
সেই প্রতিশ্রুতিও এখন তাতে কী হয়ে গেছে।
এর আগেও রোমি কয়েকবার ফোন করেছে, এই ফ্ল্যাটেও এসেছে কোনও না-কোনও দরকারে। কিন্তু তখন কমলেশের সংযম ছিল, আহত অভিমান ছিল, আর ভেবেছিল রোমি আবার নিজে থেকেই ফিরে আসবে। সেটা হয়নি।
ইদানীং কমলেশের কেমন যেন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। বুকের ভেতরটা কেমন করতে থাকে। এখনও করছিল।
রোমি, আমি যদি কোনও অন্যায় করে থাকি তা হলে।
কমলেশ, কী হচ্ছে! এসব বলে বোর কোরো না। যাকগে, তোমার ইনভেনশান আর ডিসকভারি কীরকম চলছে বলো।
কমলেশ সুন্দরীর দিকে একবার তাকাল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তখন সেজে চলেছে। পাউডার, ক্লিনজিং মিল্ক, ময়েশ্চারাইজার, পারফিউম–রোমির উপকরণ যা কিছু আছে একের পর এক মেখে চলেছে। আর ড্রয়ার থেকে রিঙ্কুর একটা লাল রঙের বো বের করে নিয়ে মাথার একখাবলা পরচুলায় আটকে দিয়েছে। এদিক ওদিক ঘাড় বেঁকিয়ে রোবটটা আয়নার নিজেকে দেখছে আর গুনগুন করে গাইছে, আমি তোমায় বড় ভালোবাসি, তোমায় বড় ভালোবাসি।
টেলিফোনে কথা বলতে গিয়ে কমলেশের গলা ভেঙে গেল। একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে কয়েকবার টোক গিলে ও বলল, কালই একটা নতুন রোবট তৈরি করেছি। খুব সুন্দর দেখতে।
আমার চেয়েও? রোমি ঠাট্টার সুরে বলল।
তোমার চেয়ে সুন্দর আমার কাছে আর কেউ নেই, রোমি। কমলেশের গলা ধরে যাচ্ছিল।
ওরা রাস্তায় বেরোলে সবাই হাঁ করে রোমিকে দেখত–যেন তাজমহল দেখছে। অস্বাভাবিক কিছু নয়। রোমি যে আপাদমস্তক সুন্দর! কতজন যে ওকে সিনেমায় নামার অফার দিয়েছে তার কোনও হিসেব নেই। তবে ফিমের ব্যাপারে কমলেশের বরাবরই কেমন একটু অ্যালার্জি আছে। তাই রোমি উৎসাহ দেখালেও কমলেশ আপত্তি করেছে। রোমি বলেছে, তুমি চাও না, টিভি-সিনেমায় সবাই আমাকে দেখুক? সবাই জানুক তোমার বউ কত রূপসি! কমলেশ ওর ছেলেমানুষি গোঁয়ারতুমির সুরে বলেছে, না, চাই না। তোমার সুন্দরটুকু শুধু আমার জন্যে। সবাই তোমাকে ওভাবে দেখলে আমি হিংসেয় মরে যাব। আমার ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা থাকবে, হিংসেয় আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। কথাটা বলে কমলেশ হেসেছে। রোমিও হেসেছে। কিন্তু সেটাই ছিল বোধহয় শুরু। তারপর একই কথা অনেকবার উঠেছে। ধীরে-ধীরে সুর কেটে গেছে। আর তখনই সুতপন এসেছে রোমির কাছাকাছি।
