মেসোমশাই, কিছু মনে করবেন না, ভুল হয়ে গেছে। আমি আপনার ছেলের মতো।
না! গুরুপদ সরকার চেঁচিয়ে বললেন, তুমি আমার ছেলের চেয়ে অনেক ভালো। ও ব্যাটা একটা–।
সন্তান সম্পর্কে নামাবলী শুরু হওয়ার আগেই বাধা দিল কমলেশ, কতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন? আসুন, ভেতরে আসুন, আপনাকে একটা নতুন জিনিস দেখাব। একটু সাবধানে আসবেন।
কমলেশকে অনুসরণ করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে পড়লেন বৃদ্ধ।
শোওয়ার ঘরে ঢুকেই গুরুপদবাবুর নাক কুঁচকে গেল। আমতা-আমতা করে জিগ্যেস করলেন, কীসের একটা গন্ধ পাচ্ছি।
চকিতে কমলেশের চোখ চলে গেল টেবিলে রাখা মদের বোতলের দিকে। একটু আগেই যিনি বলেছেন, তুমি আমার ছেলের চেয়ে অনেক ভালোে তাঁকে এখন কী বলবে কমলেশ!
সুন্দরী বোধহয় কমলেশকে লক্ষ করছিল। ফস করে বলে উঠল, ও কিছু নয়, ওষুধের গন্ধ। আপনার তো দেখছি ঘ্রাণশক্তি বেশ প্রবল।
সুন্দরীর আচমকা কণ্ঠস্বরে রীতিমতো আঁতকে উঠলেন গুরুপদ সরকার। হাতের লাঠিটা দুবার ঠুকলেন মেঝেতে। তারপর কাছে গিয়ে ভালো করে দেখতে লাগলেন সুন্দরীকে। ওঁর মুখচোখের ভাব দেখে মনে হল না তেমন একটা খুশি হয়েছেন।
আপনি এই রোবটটা নিয়ে নিন, মেসোমশাই। কাজে লাগবে। বদলে শুধু আমার চারমাসের ভাড়া ইয়ে করে দেবেন।
সঙ্গে-সঙ্গে মাথা নাড়লেন গুরুপদবাবু? না, বাবা, ওসব ইয়েটিয়ের মধ্যে আমি নেই। আমি বরং ও-সপ্তাহে তোমার কাছে আসব।
সুন্দরীর মুখ দিয়ে হুঃ গোছের একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ বেরিয়ে এল। তারপর কী একটা বলতে যাচ্ছিল, কমলেশ গুরুপদবাবুর নজরের আড়ালে হাতজোড় করে অনুনয়ের ভঙ্গি করল। সুন্দরী চাপা গলায় বলল, এবারের মতো ছেড়ে দিলাম।
ছন্নছাড়া ঘরটার চারপাশে চোখ বুলিয়ে গুরুপদবাবু জিগ্যেস করলেন, তোমার ওয়াইফের ট্রেনিং এখনও শেষ হয়নি?
ট্রেনিং? কমলেশ কেমন বিভ্রান্ত হয়ে গেল। তারপরই ওর মনে পড়ল, রোমি ওকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর কমলেশ এই ট্রেনিং-এর গল্পটা তৈরি করেছিল। যারাই ভুরু ওপরে তুলেছে তাদেরই বলেছে, রোমিকে ওর স্কুল থেকে একটা স্পেশাল ট্রেনিং-এর জন্য বাঁকুড়া পাঠিয়েছে। কিন্তু প্রায় আটমাস হয়ে গেল, ট্রেনিংটা এখনও শেষ করতে পারছে না কমলেশ।
ও মিনমিন করে বলল, না, মেসোমশাই, এখনও তো শেষ হয়নি দেখছি…।
এরকম লম্বা ট্রেনিং-এ ভরতি করলে কেন বউমাকে? একবার শুরু হলে আর শেষ হতে চায় না–।
কমলেশের ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরোনোর সময় বৃদ্ধ বিড়বিড় করে অনেকটা যেন আপনমনেই বলে উঠলেন, মেয়েসমেত এ বড় অদ্ভুত ট্রেনিং!
দরজা বন্ধ করে শোওয়ার ঘরে ফিরে এল কমলেশ। সত্যি, এ বড় অদ্ভুত ট্রেনিং! স্বামীকে ছেড়ে থাকার প্রশিক্ষণ, বাবাকে ছেড়ে থাকার প্রশিক্ষণ–আর সেইসঙ্গে কমলেশেরও বউ-মেয়েকে ছেড়ে নির্জন বসবাসের প্রশিক্ষণ।
কিন্তু এখনও কমলেশ যে এই নতুন ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারল না! দেওয়ালে ছবিটার দিকে চোখ গেল ওর। রোমির ছবির দিকে তাকালেই ওর বুকের ভেতরটা হু-হু করে ওঠে এখনও। আর রিঙ্কু! ও যে সবচেয়ে বেশি মিষ্টি।
রোমি-রিঙ্কুর ট্রেনিং ধীরে-ধীরে শেষ হয়ে আসছে। তারপর…তারপর ফেরার আর পথ থাকবে না। ছবি থেকে চোখ সরিয়ে নিল কমলেশ। বিছানায় বসে ভাবতে লাগল।
আজ বোধহয় মঙ্গলবার। আজই কিশোর আহুজার আসার কথা। বিশাল চেহারার এই ব্যবসায়ী ভদ্রলোক বেশি বয়েসে বিপত্নীক হয়েছেন। ছেলেমেয়ে নেই কিন্তু অঢেল টাকা আছে। তাঁর খুব শখ একটা প্রমাণ মাপের মেয়ে পুতুলের। পুতুলটায় কলকবজা তেমন একটা না থাকলেও চলবে, তবে বডিটা পাঁউরুটির মতো নরম হওয়া চাই। কমলেশ বহুবার ভদ্রলোককে ফিরিয়ে দিয়েছে। বলেছে, এরকম খেলনা আমি তৈরি করি না। কিন্তু আহুজা নাছোড়বান্দা। বারবার শুধু বলেন, আপনি রিফিউজ করলে আমার জিন্দেগিটা একদোম বরবাদ হয়ে যাবে, সায়েন্টিসবাবু। আমি যে কী লোনলি সে আপনাকে আর কী বলব! ভেরি-ভেরি লোনলি–মনে হোয় কি চারপাশে কুছু নাই–সির বিরানি আর তনহাই…।
কমলেশের হাসি পেয়েছিল। যার চারপাশে কুছু নাই, একটা খেলার পুতুল ধরে দিলেই তার কিছু নাই মিছে হয়ে যাবে! আজ যদি কিশোর আহুজা আসেন তা হলে স্পষ্ট দুকথা শুনিয়ে দেবে কমলেশ।
ঠিক এমনসময় টেলিফোনটা বেজে উঠল।
মদের বোতল আর গেলাসের পাশেই টেলিফোন। কমলেশ টেলিফোন ধরতে উঠে দাঁড়াল। কার ফোন হতে পারে? সুপারটয় করপোরেশন-এর এম. ডি.? কমলেশকে আবার চাকরিতে জয়েন করার জন্য সাধাসাধি করতে চাইছেন? উঁহু, কমলেশ কিছুতেই রাজি হবে না। আবিষ্কারের স্বাধীনতা বলে একটা ব্যাপার আছে।
সুন্দরী যথারীতি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রূপচর্চায় মশগুল। আপনমনে গুনগুন করে কী একটা গানের সুর ভাঁজছিল। ও ড্যাবড্যাবে চোখ দিয়ে কমলেশকে একবার দেখল। তার পর গুনগুন করা থামিয়ে বলল, ডার্লিং, যদি আমার ফোন হয় তা হলে বলে দিয়ে আমি বাড়ি নেই।
কমলেশ থমকে দাঁড়িয়ে হাঁ করে সুন্দরীকে দেখল। মাত্র কয়েকঘণ্টাতেই এই বকযন্ত্রটা ডার্লিং এ পৌঁছে গেছে! সত্যি, আজকের রাতটা ভালোয়-ভালোয় কাটলে হয়! শোওয়ার আগে এটার সুইচ অফ করতে ভুলে গেলে চলবে না।
ও কাটাকাটা সুরে বলল, তোমাকে আবার কে ফোন করতে যাবে! তুমি যে আমার ফ্ল্যাটে জন্ম নিয়েছ তাই-ই তো কেউ জানে না!
