কমলেশের কী যেন হল। ও একছুটে শোওয়ার ঘর পেরিয়ে ঢুকে পড়ল একফালি ড্রইংরুমে। ড্রইংরুমের নানা জায়গায় কমলেশের নানা আবিষ্কারের চেষ্টার ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। এ ছাড়া মোটর, ট্রান্সফর্মার, পিসিবি, লোহার টুকরো, কাঠের ফ্রেম, আরও কত কী! সেগুলো ডিঙিয়ে পাশ কাটিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই দেখল, একটা হুলো বেড়াল লেজ উঁচিয়ে ওর দিকে সবুজ চোখে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে।
কমলেশ সদর দরজা বন্ধ করে ফিরে এল রোবটটার কাছে। সে তখন গুনগুন করে তোমার মুখটা কী সুন্দর, আমি বলবই বলব গানটা গাইছে, আর গালে-কপালে আঙুল ঘষে মেকাপে পালিশ দিচ্ছে।
কমলেশের গোল-গোল চোখের দিকে তাকিয়ে রোবটটা বলল, কী মশাই, এবারে বিশ্বাস হল তো!
কমলেশ কোনও উত্তর দিতে পারল না। কে জানে, মদের নেশার ঘোরে কমলেশের অবচেতন বিজ্ঞান প্রতিভা কোন-কোন আশ্চর্য গুণ আর কোন-কোন জটিল প্রোগ্রাম গুঁজে দিয়েছে এই যন্ত্রদাসের মধ্যে!
রোবটটা এবার ঘুরে দাঁড়াল কমলেশের দিকে। ধাতব শব্দ তুলে দু-পা এগিয়ে এসে বলল, আমাকে তুমি সুন্দরী বলে ডেকো। অনেক ভেবে দেখলাম, নামের সঙ্গে মিল থাকাটাই ভালো। নইলে কানা ছেলের নাম পদ্মলোচনের মতো দশা হবে।
কমলেশ সুন্দরীকে দেখছিল।
টিন-লোহা-নাটবল্টু সারাটা শরীর জুড়ে দাঁতখিঁচিয়ে আছে। চোখজোড়া একেবারে বেমানান। কান দুটোও তাই। মাথা প্রায় ন্যাড়া। শুধু পিছনদিকটায় একগোছা পরচুলা। রোমির বাতিল করে দেওয়া নকল কেশরাশি। হাত-পায়ের আঙুলগুলো বেঢপ মাপের। হাঁটু আর কনুইয়ের জোড় কাজের চেয়ে শব্দ করে বেশি। আর এখানে-ওখানে কিছু বৈদ্যুতিক তার চোখে পড়ছে।
শুধু পরচুলাটুকু ছাড়া সুন্দরীর জেন্ডার কনফার্ম করার আর কোনও উপকরণ নেই। ওটা কি কমলেশই নেশার ঘোরে কাল রাতে জুড়ে দিয়েছে? কে জানে! কমলেশের মনে নেই। গত কয়েকমাসে ওর অবচেতন মনের যা হাল হয়েছে তাতে ওটাকে দিব্যি অপারেশন করে বাদ দিয়ে দেওয়া যায়!
কমলেশ সুন্দরীর খুব কাছে এগিয়ে গেল। আর তক্ষুনি রোবটটা এক পা পিছিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, অ্যাই, কী হচ্ছে! হুট করে কে কখন দেখে ফেলবে। প্লিজ, কমলেশ–
কমলেশ স্তম্ভিত হয়ে গেল। শয়তান মেশিনটা বলে কী! ওর মাথার দপদপানিটা হঠাৎ সাত ডিগ্রি বেড়ে গেল। মাথার ওপরে ঢিমে তালে ফ্যান ঘুরছে, আর ফ্যানের সঙ্গে তালে-তালে লাল নীল-হলদে বাতি জ্বলছে কমলেশের সায়েন্টিফিক মডিফিকেশান। সেই পাখার হাওয়া কমলেশের মাথায় লাগছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। এসব স্বপ্ন, না সত্যি! কমলেশ জেনুইন জেগে আছে তো!
সামনের রংচটা দেওয়ালে ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ছে। ১৯৯৪ সাল। কোনও ভুল নেই। বড় মাপের জানলা দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকে পড়েছে ঘরে। পাশের বাড়ির টিভি অ্যান্টেনা দেখা যাচ্ছে। তার মাথায় বাংলাদেশ-টিভি প্রোগ্রাম দেখার জন্য মাছের কাঁটার মতো ছোট অ্যান্টেনা। তাতে একজোড়া পাতিকাক বসে আছে।
কোনওটাই স্বপ্ন নয়। ঘোর বাস্তব।
এমনকী ডানদিকের দেওয়ালে টাঙানো কমলেশ, রোমি আর রিঙ্কুর রঙিন ফটোটাও যে সত্যি!
কমলেশ তাকাল সুন্দরীর চোখে।
সে তখনও বলছে, না, কমলেশ, না–এখন না। তুমি নিজেকে একটু কন্ট্রোল করো, লক্ষ্মীটি।
কমলেশ আর সহ্য করতে পারল না। একেবারে খেঁকিয়ে উঠল, কীসব আবোলতাবোল বকচ্ছ!
না গো, তোমার চোখ দেখেই আমি সব বুঝতে পেরেছি। তোমার আর কী দোষ বলো। সব দোষ আমার। আমার রূপই আমার কাল হয়েছে।
কমলেশ বোধহয় মাথার চুল ছিঁড়তে যাচ্ছিল, এমন সময় দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল। ঠিক আড়াইবার। দুটো লম্বা টোন, আর তারপরই একটা হাফটোন।
এরকম বিশেষ স্টাইলে কলিংবেলে সুর তোলেন একমাত্র গুরুপদবাবু। গুরুপদ সরকার। এ ফ্ল্যাটবাড়ির বাড়িওয়ালা। একেবারে ওপরতলার ফ্ল্যাটে থাকেন।
সুন্দরীর দিকে কটমট করে একবার দেখল কমলেশ। তারপর চটপটে পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
দরজা খুলতেই তাঁকে দেখা গেল।
দশাসই চেহারা। পরনে পাজামা আর গেঞ্জি। হাতে কালচে রঙের শক্তপোক্ত পাচালো লাঠি। মাথার চুল সাদা। দু-ভুরু আর দুকানে যেন একখাবলা করে গ্লাসউল বসানো। মুখের চামড়ায় অনেক ভাজ। চোখ কুতকুতে। কানে একটু কম শোনেন। স্ত্রী গত হয়েছেন অন্তত একযুগ। তবে যাওয়ার আগে অকালকুষ্মাণ্ড একটি পুত্র রেখে গেছেন। গত পাঁচবছর ধরে ভদ্রলোকের একমাত্র খাদ্য বোধহয় চ্যবনপ্রাশ। কারণ, পরিচিত সকলকেই তিনি নিয়মিত এই বস্তুটি সেবনের উপদেশ দেন।
কমলেশকে দেখেই গুরুপদবাবু চেঁচিয়ে বললেন, বাবা কমলেশ, তোমার ভাড়াটা
কমলেশ একটু অবাক হয়ে বলল, এখন তো সবে বিশ তারিখ…।
গুরুপদ সরকার হেসে বললেন, না বাবা, আমি গতমাসের ভাড়াটার কথা বলছি। তুমি যে চেক দিয়েছিলে সেটা বাউন্স করেছে। এই ভাড়া কালেকশান যে কী ঝামেলার! নেহাত ছেলেটা অপোগণ্ড, তাই আমাকেই কালেকশানে বেরোতে হয়।
আমার চেক বাউন্স করেছে? কমলেশ বেশ অবাক হল যেন।
হ্যাঁ বাবা, তুমি যখনই চেক দাও তখনই বাউন্স করে, বারবার বাউন্স করে। কেন বলো তো?
বোধহয় রবারের তৈরি তাই। একটু থেমে আবার বলল, তা ছাড়া ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের ব্যাপারটা সবসময় আমার খেয়াল থাকে না।
শুধু ব্যাঙ্কে কেন, ব্যালেন্স বোধহয় কোথাও ঠিক নেই কমলেশের। সামান্য এই ষোলোশো টাকা মাসে-মাসে দিতে বেশ অসুবিধে হচ্ছে ওর। যখনই কোনও আবিষ্কার বিক্রি করতে পারে তখনই রাজার জীবনযাত্রা শুরু করে দেয়। মনপ্রাণ ঢেলে নেশা করে। এমনকী লাগামছাড়া দাম দিয়ে ভ্যাট সিক্সটিনাইন কিংবা জনি ওয়াকার কিনে ফ্যালে। কিন্তু এখন এই ভদ্রলোককে ঠেকানো যায় কী করে? আচ্ছা, রোবটটা এঁকে বেচে দেওয়ার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
