কিন্তু এই মালটাকে কমলেশ তৈরি করল কেন?
ওর এখন বেশ মনে পড়ছে, রোবটটা তৈরির জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ধরে খুবই পরিশ্রম করেছে। তারপর গতকালই ফিনিশিং টাচ দিয়ে রোবটটাকে চালু করেছে। কিন্তু কেন?
কমলেশ সেই কথাটাই জিগ্যেস করল, তোমাকে হঠাৎ তৈরি করতে গেলাম কেন বলো তো?
রোবটটা ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাল কমলেশের দিকে। বলল, কী করে জানব! হয়তো তোমার একা-একা লাগছিল, সেইজন্যে।
কমলেশ বিরক্তির একটা শব্দ করে ঘরের চারপাশটা দেখল। ছন্নছাড়া বলতে যা বোঝায় ঘরটার অবস্থা এককথায় তাই। একসময় এই ঘরটার নাম বেডরুম ছিল–যখন রোমি-রিঙ্কু ছিল। তারপর, গত আটমাস ধরে এই ঘরটা ধীরে-ধীরে পালটে গেছে। এখন এটা বসার ঘর, শোওয়ার ঘর, ল্যাবরেটরি সবকিছু।
বিছানার পায়ের দিকটায় ড্রেসিং টেবিল, আয়না লাগানো। আর ওদিকের কোণটায় জামাকাপড়ের দুটো স্টিলের আলমারি। একটায় কমলেশের জামাকাপড় উঁই করা। অন্যটায় রোমি আর রিঙ্কুর পোশাক-আশাক। রোমি বলে গেছে, ওর নতুন ফ্ল্যাটে সবকিছু সাজানো-টাজানো হয়ে গেলে তখন এটা নিয়ে যাবে। নিয়ে গেলেই ভালো। নইলে সবসময় পুরোনো কথাগুলো বড় বেশি করে মনে পড়ে। তখন খারাপ লাগে। একা-একা লাগে। কষ্ট হয়।
কমলেশ আয়নার পাশে দেওয়ালে ঝোলানো টুথব্রাশ কিপার থেকে ব্রাশ নিল। নানা রঙের রেক্সিন দিয়ে তৈরি জোকারের হাসি-হাসি মুখ। তার টুপিতে গুড মর্নিং লেখা। রিঙ্কু পছন্দ করে এই টুথব্রাশ কিপারটা কিনেছিল। কমলেশের গোলাপি ব্রাশের পাশেই সবুজ ও নীল রঙের দুটো ব্রাশ। রোমির আর রিঙ্কুর। ওরা কখনও এলে যদি দরকার হয়, তাই ও-দুটো এখনও ফেলে দেয়নি কমলেশ।
মাঝে-মাঝে রোমি আসে, কখনও কখনও সঙ্গে নিয়ে আসে রিঙ্কুকে। তবে এলেও বেশিক্ষণ থাকতে চায় না। একমাত্র সুতপন এলে তেমন একটা তাড়াহুড়ো করে না।
সুতপন বোধহয় কমলেশকে পছন্দই করে। ও কমলেশের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে গল্প করে। ওর টিভি সিরিয়াল তোলার কোম্পানি আছে। তার ব্যাপারে অনেক সময় কথা বলে। টিভি দর্শকদের তাক লাগিয়ে দেওয়ার জন্য কমলেশ অভিনব কিছু আবিষ্কার করতে পারে কি না, তা জিগ্যেস করে।
রিঙ্কুর পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করে সুতপন। কিন্তু রোমির কথা কখনও তোলে না। রোমির সঙ্গে ওর সম্পর্ক নিয়ে বোধহয় মনে-মনে একটা অস্বস্তি আছে।
কমলেশ সাধারণত নিজের আবিষ্কার নিজে ব্যবহার করে না। তাই সাবেকি পদ্ধতিতে দাঁত মেজে মুখ টুখ ধুয়ে ও চলে গেল রান্নাঘরে। ফ্রিজ খুলে দুটো মিষ্টি আর একটা স্যান্ডউইচ বের করে নিল।
ফ্রিজ খুলতেই সুন্দর একটা মিউজিক বেজে উঠল। এটা কমলেশের বৈজ্ঞানিক কীর্তি। আর ফ্রিজের ভেতরটা যে যেমন-তেমন অগোছালো, সেটাও কমলেশের কীর্তি। ফ্রিজের ভেতরে উলটোপালটা খাবার-দাবারের সঙ্গে এখানে ওখানে আই. সি. চিপ, ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্টও খুশিমতো রাখা আছে।
গত সাত-আটমাস ধরে এই ফ্রিজটা কমলেশের তত্ত্বাবধানে আছে। আর রান্নাঘরটা রয়েছে। ছুটির মায়ের তত্ত্বাবধানে। ছুটির মা এখনও আসেনি। দশটা-সাড়ে দশটায় আসবে।
কোনওরকমে খাওয়া শেষ করে শোওয়ার ঘরে ফিরে এল কমলেশ। গা ম্যাজম্যাজ করছে, মাথা দপদপ করেছে। অবশ্য এ ঝামেলাগুলো আজকাল গা-সওয়া হয়ে গেছে।
শোওয়ার ঘরে ঢুকতেই দেখল, রোবটটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারা বেঁকিয়েচুরিয়ে দেখছে আর বারবার বলে উঠছে, অপূর্ব! মারভেলাস! বিউটিফুল!
কমলেশ হাই তুলল। বিছানায় গিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বসল। তারপর আর থাকতে না পেরে মুখ তুলে জিগ্যেস করল, কী ব্যাপার? কী দেখে অমন বারবার অপূর্ব, মারভেলাস আর বিউটিফুল বলছ?
রোবটটা ঢং করে বলল, আ-হা, বোঝে না যেন! নিজের রূপ দেখেই বলছি! এমন সুন্দর একটা রোবট তৈরি করতে পারবে কখনও ভেবেছিলে? এটা তোমার জীবনের সেরা কীর্তি।
কমলেশ এবার সত্যি-সত্যি হো-হো করে হেসে উঠল। সেরা কীর্তি! গত ছসাত মাস ধরে কমলেশের খুব টানাটানি চলছে। রোমি স্কুলে চাকরি করে। সেই আয় তো গেছেই, উপরন্তু নিজের চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছে কমলেশ।
এখন এটা-ওটা আবিষ্কার করে সেগুলো বিক্রি করে দিন চালাচ্ছে।
সুপারটয় করপোরেশন-এর সিনিয়ার ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার ছিল কমলেশ। কিন্তু ওর মাথায় প্রতি ঘণ্টায়-ঘণ্টায় যেসব চমৎকার আবিষ্কারের আইডিয়া আসে তার জন্য কোম্পানি কোনওরকম টাকা ঢালতে রাজি নয়। ঝগড়াঝাঁটি অনেকদিন ধরেই চলছিল। রোমি রিঙ্কুকে নিয়ে চলে যাওয়ার পর কমলেশ কেমন দিশেহারা আর রগচটা হয়ে পড়েছিল। সেইসময়েই একদিন ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। তখন কমলেশ বুকে আঙুল ঠুকে বলেছিল, সারাজীবন আপনার কোম্পানিতে চাকরি করার জন্যে আমার জন্ম হয়নি। এ-চাকরি আমি করব না। আমি বাড়িতে বসেই কাজ করব। একদিন আপনাকে এসে আমার জীবনের সেরা আবিষ্কার দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেব।
তা এই সেই তাক লাগানোর বস্তু! যেটার কোনদিক সোজা আর কোনদিক উলটো সেটাই ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না!
কমলেশের চিন্তায় বাধা দিয়ে রোবটটা বলে উঠল, আস্তে, আস্তে! তুমি যে হাসির চোটে আমার কান ফাটিয়ে দিলে!
কমলেশ খানিকটা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, তোমার কান খুব সেনসিটিভ বুঝি?
হ্যাঁ। আমি সাবসনিক থেকে সুপারসনিক–সবরকম শব্দ শুনতে পাই। দ্যাখো না, তোমার ফ্ল্যাটের বাইরে সিঁড়ির কাছটায় একটা বেড়াল ঘুরঘুর করছে, আমি তার পায়ের ধুপধুপ আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।
