একটু দূরে দাঁড়িয়ে রোমি ঠোঁটে লিপস্টিক ঘষছিল। রুক্ষ গলায় বলল, তোমার আয়নার কাজ হয়েছে? তা হলে এ পাশে এসে মেয়ের সঙ্গে কবির লড়াই করো। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
কমলেশ বউয়ের দিকে তাকাল। সেজেগুজে কোথায় যেন বেরোচ্ছে! বিউটি পারলার, কিংবা হ্যান্ডিক্র্যাফট-এর স্কুল, অথবা কুকিং রেসিপি-র স্পেশাল কোর্স অ্যাটেন্ড করতে। নয়তো অন্য কিছু। কমলেশ ঠিক জানে না। জানার তেমন একটা ইচ্ছেও আর নেই।
কমলেশ কোনও কথা না বলে আয়না ছেড়ে দিল। রোমি চটপট পা ফেলে আয়নার সামনে এসে সাজগোজের শেষ ধাপটুকু মন দিয়ে শেষ করতে লাগল।
কমলেশ আড়চোখে বউকে একবার দেখল।
রোমি দারুণ সুন্দরী। এত সাজগোজের কোনও দরকার নেই ওর। কিন্তু তবুও সাজে। রূপ নিয়ে ঠিক দেমাক না হলেও ওর একধরনের আত্মতুষ্টি আছে। মাঝে-মাঝে কমলেশকে আড়ালে কথা শোনায়, রিঙ্কু তেমন সুন্দর দেখতে হয়নি বলে।
আয়নার মধ্যে দিয়ে রোমিকে দেখতে দেখতেই হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল। আয়নার ছায়াটা ঢেউয়ের মতো কাঁপতে লাগল, তারপর সেখানে একটা অদ্ভুত বেঢপ চেহারা দেখা গেল। ধাতুর পাতে তৈরি হাত-পা-ওয়ালা একটা মানুষ যেন!
কমলেশ বুঝতে পারল, ও এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। কারণ এই ঘরে রোমি বা রিঙ্কু থাকতে পারে না। অন্তত এখন।
তো চোখ খুলে ভালো করে তাকাল চারপাশে।
মাথা ঝিমঝিম করছে। ঘরের দেওয়ালগুলো দোল খাচ্ছে। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা শব্দ হচ্ছে। আয়নাটা মনে হল দুলছে। এমনকী আয়নার সামনে দাঁড়ানো বেঢপ চেহারার বস্তুটাও সামান্য টলছে।
ওইরকম আচ্ছন্ন অবস্থাতেও কমলেশ মোটামুটি শুনতে পাচ্ছিল। ওর কানে এল, বিচিত্র ধাতব গলায় কে যেন সুর করে গাইছে?
ভোর হইল, জগৎ জাগিল
চেতনে চাহিল নারী-নর–।
আর তার ঠিক পরেই সেই ধাতব কণ্ঠ হাঁফ ছাড়ার ভঙ্গিতে বলল, যাক, তোমার ঘুম ভেঙেছে তা হলে! ওঠো দ্যাখো, ভোর হয়ে গেছে। আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল। প্রাণের পর কেমনে পশিল গুহার আঁধারে। প্রভাত পাখির গান–
থামো, থামো, থামো! প্রায় চেঁচিয়ে উঠল কমলেশ। বিছানায় উঠে বসে ও হাতের পিঠ দিয়ে চোখ ঘষতে লাগল। তারপর মুখের সামনে ডানহাতের তর্জনী ও মধ্যমা ভি অক্ষরের মতো করে বারকয়েক নাড়ল। না, দুটো আঙুলই দেখতে পাচ্ছে কমলেশ–চারটে নয়। এমনকী পাশের ছোট টেবিলে রাখা ভ্যাট সিক্সটিনাইনের বোতলের গায়ের লেখাটাও বাংলায় নির্ভুলভাবে ভ্যাট উনসত্তর বলে পড়তে পারল। নাঃ, নেশার ঘোের তা হলে আর নেই। শুধু এই হতচ্ছাড়া মস্তক বেদনাটি ছাড়া।
কিন্তু তবুও আয়নার সামনে দাঁড়ানো বিচিত্র রোবটটাকে কমলেশ কিছুতেই বাস্তব বলে মেনে নিতে পারছিল না। একে তো রোবট, তায় আবার নিঝরের স্বপ্নভঙ্গ আওড়াচ্ছে!
রোবটটা আহত গলায় বলল, জানি, আমার পাংচুয়েশানে একটু-আধটু ডিফেক্ট আছে, তা বলে অমন মুখ করে থামিয়ে দেওয়ার কী ছিল! ভোরের রূপ দেখে আমি একটু ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম!
কমলেশ হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না। আয়নার সামনে দাঁড়ানো রোবটটাকে দেখে ওর মনে ঠিক পাঁচটি মৌলিক প্রশ্ন জাগল : কে, কী, কেন, কবে, কোথায়?
এলোমেলো বিছানা থেকে নেমে কোনওরকমে সোজা হয়ে দাঁড়াল কমলেশ। বিরক্ত গলায় পাঁচটি প্রশ্নের প্রথমটা ছুঁড়ে দিল রোবটটার দিকে।
কে তুমি?
ও মা! বিস্ময়ে ডানহাত তুলে গালে ঠেকাল রোবটটা। খনখনে গলায় বলল, আমার জন্মদাতা হয়ে আমাকেই ভুলে গেলে!
জন্মদাতা!
হ্যাঁ, কাল রাতে তুমিই তো আমাকে তৈরি করলে! ঠিক রাত বারোটা বেজে তেতাল্লিশ মিনিটে আমাকে কমপ্লিট করে সুইচ অন করে দিয়েছ তুমি।
কমলেশ এই যন্ত্রপাতিটাকে তৈরি করেছে! হতে পারে, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। গত ছমাস ধরে যা কিছু ও আবিষ্কার করেছে তার শতকরা নব্বই ভাগই মাতাল অবস্থায়, নেশার ঘোরে। তা ছাড়া, রোবটটার চেহারার মধ্যেও কমলেশের পেটেন্ট ধাঁচ রয়েছে।
কমলেশ বেশিরভাগ সময়েই বাতিল করে দেওয়া জিনিসপত্র ব্যবহার করে নতুন-নতুন আবিষ্কার করে ফেলে। ফলে অল্প খরচে তৈরি করা অভিনব সব মেশিনপত্তর জনগণের কাছে চটজলদি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন, নিমের ডাল, জামাকাপড় ছড়ানোর প্লাস্টিকের ক্লিপ আর পুঁচকে একটা মোটর দিয়ে ও তৈরি করেছে দন্তধাবন যন্ত্র। এই যন্ত্রের সাহায্যে দাঁত মাজার সময়ে মাথা একটুও নাড়াতে হয় না। শুধু যন্ত্রে দাঁত ঠেকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে থাকলেই কাজ হয়। যন্ত্র নিমেষে বাকি কাজটুকু সেরে দেয়। তা ছাড়া এতে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিমের দাঁতনের আয়ুর্বেদিক গুণ। আর দাম মাত্র পঁচাত্তর টাকা। শুধু মাঝে-মাঝে নিমের দাঁতনের একটা নতুন টুকরো ক্লিপের মধ্যে ফিট করে দিতে হয়।
তা এই রোবটটাও সেইরকম। ভাঙা টিনের পাত্রতার মধ্যে মোটর গাড়ির বডি থেকে শুরু করে আমুল স্প্রে-র খালি টিন পর্যন্ত রয়েছে, পুরোনো গিয়ার, সাইকেলের চেন, কয়েকটা টুনি বা, খানিকটা স্বচ্ছ প্লাস্টিক, কয়েকটা মোটর আর আই. সি. চিপ দিয়েই ব্যাপারটা মোটামুটি কমপ্লিট হয়ে গেছে। মেশিনটার বুকের কাছটায় একটা নব লাগানো দরজা রয়েছে। বোধহয় ব্যাটারি ভরার জন্য আর কানেকশান রিপেয়ার করার জন্য।
স্বাভাবিকভাবেই রোবটটা দেখতে তেমন একটা আহামরি কিছু হয়নি। চোখের বা দুটো মাঝে-মাঝেই জ্বলে উঠছে, আর তালপাতার সেপাইয়ের মতো ল্যাকপ্যাক করে টিনের হাত-পা নাড়ছে।
