প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে চলল হুলস্থূল।
ছেলের কথায় সেলাই-ফেঁড়াই বন্ধ করতে হল লাবণ্যকে। মধুমিতাও ওঁকে কম-বেশি বকুনি দিল।
এই শাসন যে কী মধুর!
রাত দশটায় রাতের খাওয়া শেষ হলে লাবণ্যকে বলে মধুমিতা আর দীপ্তিমান ওদের ঘরে চলে গেল। বাবুন ভূতের গল্প শুনে দিদুনের গালে চুমু দিয়ে গুডনাইট বলে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুমোতে গেল।
সারদা লাবণ্যর শোওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। তারপর মেঝেতে নিজের বিছানা পাততে শুরু করল।
একটা দিন শেষ হল।
বিছানায় বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাবণ্য আচমকা হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। ওঁর বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। শরীরটা বারবার ফুলে-ফুলে উঠতে লাগল।
সারদা একবার লাবণ্যর দিকে দেখল, তারপর নিজের মনেই বিছানা করতে লাগল–যেন কিছুই হয়নি। কারণ, এটা রোজকার ব্যাপার-সারদার সয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর কান্না সামলে উঠে দাঁড়ালেন লাবণ্য। চোখের জল মুছে ঘরের দরজার দিকে এগোলেন।
সারদা হাঁটুগেড়ে বসে বিছানা ঠিক করছিল, আলতো করে জিগ্যেস করল, কোথায় যাচ্ছেন, মা?
পিছন ফিরে না তাকিয়েই লাবণ্য বললেন, কম্পিউটার রুমে।
সারদা আর কোনও কথা বলল না।
.
লম্বা বারান্দা ধরে হেঁটে দোতলার শেষ প্রান্তের ঘরটায় এসে পৌঁছলেন লাবণ্য।
ঘরের দরজা ভেজানো ছিল, সেটা ঠেলে খুললেন। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোর একটা চিলতে ছিটকে ঘরে ঢুকে অন্ধকার মেঝেতে শুয়ে পড়ল।
বাইরে নরম বাতাস বইছিল–তাতে বোধহয় একপশলা বৃষ্টির গন্ধও ছিল। লাবণ্য একটা শ্বাস নিলেন, তারপর মন শক্ত করে ঘরের আলো জ্বাললেন।
কথা-বলা পুতুলগুলো ঘরের একপাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে।
মধুমিতা, দীপ্তিমান, বাবুন, ডক্টর মুখার্জি, অনুরিতা, অরুণাভ, গুডু–সবাই হাজির। চেহারায় মানুষের মতো কথা-বলা এই রোবটগুলো লাবণ্য একটা কম্পিউটার কোম্পানিকে অর্ডার দিয়ে তৈরি করিয়েছেন। তাদের আচার-ব্যবহার কেমনতরো চান সেটাও জানিয়ে দিয়েছিলেন সেই কোম্পানিকে। তারা লাবণ্যর পছন্দসই সফ্টওয়্যার ঢুকিয়ে দিয়েছে এই অ্যানড্রয়েডগুলোর ভেতরে। ফলে সারাটাদিন এই নকল মানুষগুলো প্রোগ্রাম অনুযায়ী কথা বলে, হাঁটা-চলা করে। এই রোবটগুলোর ভেতরে সপ্তাহের সাতটা দিনের জন্য সাতরকম প্রোগ্রাম ভরা আছে। যখন ব্যাপারটা একঘেয়ে হয়ে যায় তখন লাবণ্য সেই কোম্পানিকে একটা ই-মেইল করে দেন। যেমন এখন করবেন।
ঘরের দেওয়াল-ঘেঁষে রাখা কম্পিউটার টেবিল। তাতে সাজানো রয়েছে মনিটর, স্পিকার, কিবোর্ড, মাউস, সিস্টেম ইউনিট সব।
কম্পিউটার অন করে চেয়ারে বসলেন লাবণ্য। কোম্পানিকে ই-মেইল করে জানালেন সফ্টওয়্যারগুলো এবার বদলে দিতে হবে নইলে একঘেয়ে লাগছে।
কাজ শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। দরজার কাছে এসে আলো নেভানোর আগে যন্ত্র মানুষগুলোকে আর-একবার দেখলেন। আসল মানুষগুলোর ফটোগ্রাফ দেখে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই মডেলগুলো তৈরি করা হয়েছে। লাবণ্যকে ঘিরে ওরা আসল মানুষের মতো ঘোরাফেরা করে, লাবণ্যর ফাঁকা বুকটা ভরাট করার চেষ্টা করে।
কিন্তু আসল মানুষগুলো কোথায়? কী করছে ওরা এখন?
আবার চোখ ফেটে জল আসতে চাইল।
বিয়ের পর-পরই দীপ্তিমান আলাদা হয়ে গেছে। তার দু-বছরের মধ্যেই চলে গেছে আমেরিকায়। কার মুখে যেন খবর পেয়েছিলেন আইওয়াতে আছে। প্রথম-প্রথম দু-চারবার ফোন টোন করেছিল। তারপর…তারপর সব শেষ।
অনুরিতার গল্পটাও অনেকটা একইরকম। বালিগঞ্জে থাকলেও ব্যাপারটা আমেরিকায় আইওয়ার মতন। একটা দিনও খোঁজ নেয় না, মা কেমন আছে। মাসদুয়েক আগে একবার ফোন করে জানতে চেয়েছিল টাকার দরকার আছে কি না।
না, দরকার নেই। প্রমথনাথ মারা যাওয়ার সময় ওই একটা জিনিসের অভাব রেখে যাননি। কিন্তু তা ছাড়া লাবণ্যর জীবনের বাকি দিকগুলো খাঁখাঁ করছে। এই শূন্যতার কথা লাবণ্য আর সারদা ছাড়া আর কেউ তেমন জানে না।
আলো নিভিয়ে পায়ে-পায়ে শোওয়ার ঘরে ফিরে এলেন লাবণ্য।
সারদা ততক্ষণে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে।
লাবণ্যর খাটের পাশে একটা ছোট টেবিলে একটা ট্যাবলেটের পাতা আর এক গ্লাস জল রাখা ছিল। একটা ট্যাবলেট ছিঁড়ে নিয়ে জল দিয়ে গিলে ফেললেন লাবণ্য। খাওয়ার আগে একবার ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছেন–এখন আর-একটা। তাতে যদি ঘুম আসে!
আলো নেভানোর সময় প্রথমনাথের ছবির দিকে চোখ গেল। ছবি থেকে লাবণ্যর মৃত স্বামী চাপা গলায় জিগ্যেস করল, বউ, কেমন আছ?
লাবণ্যর বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। অতি কষ্টে চোখের জল রুখে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ভালো আছি…সুখের সংসার নিয়ে দারুণ আছি…।
তারপর সুইচ টিপে অন্ধকারে নিজেকে ডুবিয়ে দিলেন!
সুন্দরী
রিঙ্কু বিছানায় বসে বই পড়ছিল। কমলেশ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে-আঁচড়াতে জিগ্যেস করল, অ্যাই, খুব সুন্দর একটা কবিতার লাইন শুনবি?
রিঙ্কু আয়নার মধ্যে দিয়ে বাবার দিকে তাকাল। বলল, কী, শুনি?
কমলেশ মুচকি হেসে বলল, পদার্থবিদ্যা পড়ছে একটি অপদার্থ মেয়ে।
রিঙ্কু গম্ভীরভাবে বইয়ের পাতায় মনোযোগ দিয়ে মন্তব্য করল, বুঝেছি, আমাকে অপদার্থ বললে। আমি তো ভৌতবিজ্ঞান পড়ছি, তাই।
কমলেশ হো-হো করে হেসে উঠে বলল, নাঃ, তোর দেখছি বুদ্ধি আছে। আমি তোর বুদ্ধি পরীক্ষা করছিলাম।
