মধুমিতা যখন জানাল, ব্যাপারটা মোটেই সিরিয়াস কিছু নয়, তখন ও বলল, থ্যাংক গড। তুমি ওষুধগুলো এক্ষুনি আনিয়ে নাও।
তারপর আরও দু-চারটে কথা বলে মা-কে ফোন দিতে বলল।
কর্ডলেসের রিসিভারটা লাবণ্যর হাতে তুলে দিল মধুমিতা, বলল, আপনার ছেলে।
মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলল দীপ্তিমান। তারপর ফোন রেখে দেওয়ার সময় বলল, ফিরতে ফিরতে আমার সাতটা হবে।
মধুমিতা বলল, যাই, আপনার ওষুধগুলো আনানোর ব্যবস্থা করি।
লাবণ্য এবার টিভি দেখবেন। সারদা সেটা জানে। তাই ও টিভির সুইচটা অন করে দিয়ে রিমোটটা লাবণ্যর হাতে এনে দিল।
বাবুন আর দীপ্তিমান বেরিয়ে যাওয়ার পর বাড়িটা বেশ চুপচাপ হয়ে গেছে। লাবণ্যর এটা ভালো লাগে না। তাই সবসময় রবিবারের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। সেদিনটা দারুণ হইহই করে কাটে।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর দীপ্তিমানের দুটো শার্ট নিয়ে বসলেন লাবণ্য। একটায় বোতাম বসাতে হবে, অন্যটায় দুটো বোতাম-ঘর তৈরি করতে হবে। রেডিমেড শার্টগুলোর কবজির কাছটা যা ঢিলে থাকে!
নাকের ওপরে সোনালি ফ্রেমের চশমা বসিয়ে উঁচ-সুতো কঁচি নিয়ে কাজ করছিলেন লাবণ্য। সেলাই করতে ওঁর ভালোই লাগে। অল্পবয়েসে সেলাইয়ের শখ ছিল। প্রমথনাথের প্রশংসাও পেয়েছেন বহুবার। তাই এখনও বাড়ির সমস্ত সেলাই-ফেঁড়াইয়ের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে ভালোবাসেন। মধুমিতাও বলে, মায়ের মতো সেলাই আমি জীবনেও করতে পারব না! আচ্ছা-আচ্ছা দরজি মায়ের কাছে হার মেনে যাবে।
কিছুক্ষণ সেলাইয়ের পর চোখে একটু কষ্ট হচ্ছিল। তাই সেলাই রেখে লাবণ্য বিশ্রাম নিতে চাইলেন। সারদার খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। ও বিছানাটা ঠিকঠাক করে দিল।
বিছানায় শরীর গড়িয়ে লাবণ্য বেশ আরাম পেলেন। অথচ একটা সময় ছিল যখন দুপুরে মোটেই ঘুমোতেন না। সময় নিজেও বদলায়, মানুষকেও বদলায়।
ঘুম যখন ভাঙল তখন বিকেল প্রায় গড়িয়ে গেছে। সারদাকে বললেন, সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে, আমাকে ডাকোনি!
সারদা মিনমিন করে বলল, আপনার শরীরটা ভালো নয়…বিশ্রাম দরকার…তাই…।
বিকেলের চা নিয়ে আবার বারান্দায় বসলেন।
মধুমিতা বাবুনকে নিয়ে কাছেই পার্কে গেছে। ছটা নাগাদ ফিরবে।
বিকেলের আকাশের রং দেখতে লাবণ্যর ভালোই লাগছিল। একটা বিকেল মরে যায় পরদিন একটা নতুন সকাল জন্ম নেবে বলে। নতুন একটা দিন এসে আগের দিনটাকে স্মৃতিকোঠায় ঠেলে দেয়।
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দেওয়ার আগেই শুনলেন একতলায় বাবুনের হইচই। পার্কে বেড়ানো সেরে মধুমিতা আর বাবুন ফিরে এসেছে।
লাবণ্য ঘরে চলে এলেন। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে দুদ্দাড় করে ঘরে ঢুকল বাবুন। ছুটে এসে লাবণ্যকে জড়িয়ে ধরল ও দিদুন, দিদুন, বলো তো তোমার জন্যে কী এনেছি?
ছাড়, ছাড় পড়ে যাব… বলতে-বলতে লাবণ্য কোনওরকমে বিছানায় গিয়ে বসলেন।
বাবুন একটা ক্যাডবেরি চকোলেট বাড়িয়ে দিল লাবণ্যর দিকে ও বলতে পারলে না তো! এই নাও…।
মধুমিতা হেসে বলল, নিজে চকোলেট কেনার বায়না ধরল। তারপর কেনার সময় বলে, দিদুনের জন্যেও একটা কিনতে হবে নইলে আমি চকোলেট খাব না। তখন…।
লাবণ্য বাবুনের চিবুকে হাত দিয়ে আদর করলেন। চকোলেটের মোড়ক ছাড়িয়ে একটুকরো ভেঙে নিলেন। তারপর বাকিটা নাতির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এই নাও, বাবুসোনা। আমি তো বুড়ো মানুষ–তাই বেশি চকোলেট খেতে নেই।
বাবুন চকোলেটটা নিয়ে বলল, তোমাকে চকোলেট দিলাম, থ্যাংক য়ু বলো!
ও হ্যাঁ, হ্যাঁ–থ্যাংক য়ু, বাবুসোনা।
মধুমিতা বলল, এখন ওকে নিয়ে গিয়ে হোমটাস্কে বসাই। সাড়ে সাতটার সময় আপনাকে চা করে দেব।
দিদুন, হোমটাস্ক হয়ে গেলে গোস্ট স্টোরি–মনে থাকে যেন!
লাবণ্য হেসে মাথা নাড়লেন : হ্যাঁ রে বাবা, মনে আছে।
বাবুন পড়তে চলে যাওয়ার পর লাবণ্য আবার দীপ্তিমানের শার্ট নিয়ে বসলেন। সেলাইয়ের কাজটা শেষ করে ফেলতে হবে।
কিন্তু সেলাই করতে করতে একটা অঘটন ঘটল।
কীভাবে যেন ছুঁচটা ফুটে গেল লাবণ্যর আঙুলে। বাঁ-হাতের তর্জনীর ডগায় রক্তের ফোঁটা দেখা দিল–ঠিক যেন একটা ছোট্ট চুনি।
সারদা তাড়াতাড়ি কাছে এগিয়ে এল পরিচর্যা করতে। আসার সময় একটা ছোট টেবিলে সামান্য ধাক্কা খেল। একটা স্টিলের বাটি টেবিল থেকে পড়ে গেল মেঝেতে। ঝনঝন করে শব্দ হল।
সঙ্গে-সঙ্গে মধুমিতা দৌড়ে এসে ঘরে ঢুকল।
কী হয়েছে, মা! কী পড়ল?
বিছানায় বসে থাকা লাবণ্যর আঙুলের দিকে তাকিয়ে মধুমিতা একেবারে আঁতকে উঠল। লাবণ্যর আঙুলটা চট করে টেনে নিল মুখে। খানিকটা রক্ত চুষে বের করে দিল। তারপর ছুটল স্যাভলন মলম আর ব্যান্ড-এইড নিয়ে আসতে। বারবার বলতে লাগল, সন্ধেবেলা কেন যে সেলাই নিয়ে বসলেন! দেখুন তো, কী সব্বনেশে কাণ্ড হল!
লাবণ্যর আঙুলটা ব্যান্ডেজ করেই দীপ্তিমানকে অফিসে ফোন করল মধুমিতা। সব শুনে। দীপ্তিমান বলল, ও মাই গড! আমি এক্ষুনি বাড়ি আসছি।
তারপর সে এক হইহই কাণ্ড।
ছেলে, ছেলের বউ, নাতি, সারদা, ডাক্তার! অনুকে ব্যাপারটা জানাতে বারণ করলেন লাবণ্য।
সত্যি, একফোঁটা রক্তের জন্য এত উৎকণ্ঠা, এত যত্ন, এত ভালোবাসা! না, না, লাবণ্যর আর কিছু চাই না। প্রমথনাথের ছবির দিকে তাকিয়ে মনে-মনে বললেন, তুমি সব দেখছ তো! আমার কোনও দুঃখ নেই।
