বৃদ্ধের চোখে বোধহয় জল এসে গিয়েছিল। হাত দিয়ে সেটা মোছার চেষ্টা করে সে আবার বিড়বিড় করতে শুরু করল, তারপর..শীতের পর…বাকি জীবনটা চলে যাবে বর্ষার দখলে। তখন তোমার এক চোখে থাকবে আষাঢ়, অন্য চোখে শ্রাবণ। ঠিক আজকের দিনটার মতন। তাই তোমাকে আজ সাবধান করতে এসেছি। শুধু বসন্ত দিয়ে জীবন তৈরি করা যায় না।
কথা শেষ করে বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকের খাঁচাটা হাপরের মতো ওঠা নামা করছিল।
আদিত্য কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল। সাঁতরে ভেসে ওঠার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু কিছুতেই যেন পেরে উঠছিল না।
বৃদ্ধ আবার কাঁদতে শুরু করেছিল। কান্না-ভাঙা গলায় আর্তস্বরে সে বলল, আজ আমি যাই। তুমি একটু সাবধানে থেকো। এই বসন্তটাকে যতদিন পারো আঁকড়ে ধরে রেখো।
কী করে ধরে রাখব? উদ্ভ্রান্তের মতো প্রশ্ন করল আদিত্য।
তুমি অনুরাধাকে আঁকড়ে ধরে রেখো। তোমার মা-কে আঁকড়ে ধরে রেখো। এটা মনে রেখো, হাতের মুঠো আলগা হলেই ওরা সরে যাবে আর বসন্তও তোমাকে ফাঁকি দিয়ে পালাবে। তারপর…তারপর..শীত আসবে। আর বর্ষা তার পেছন থেকে উঁকি দেবে…।
আদিত্য কোনও কথা বলতে পারল না। ও ভাবছিল, অতীত বর্তমান তৈরি করে। আর বর্তমান থেকেই তৈরি হয় ভবিষ্যৎ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই তিনটের মধ্যে এত তফাত কেন!
ভাবতে-ভাবতে আদিত্য আনমনা হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ খেয়াল হতেই দেখল বৃদ্ধ আর নেই। ও একা-একা শাওয়ারে নীচে দাঁড়িয়ে ভিজছে।
আদিত্যর স্নান শেষ হতে অনেক সময় লাগল। ও মনে-মনে ঠিক করল, মাকে আর অনুরাধাকে ও আঁকড়ে ধরে রাখবে। ওরা ছাড়া তো ওর জীবনে আর কেউ নেই!
.
০২. এই ভালোবাসা অকারণ
হ্যালো, অনুরাধা?
হ্যাঁ, বলছি।
এখন কী করছিলে?
মাম্মির সঙ্গে গল্প করছিলাম।
কী গল্প?
সেরকম কিছু না–টিডবিটস–।
জানো, আজ একটা ফ্যানট্যাসটিক ব্যাপার হয়েছে।
কোথায়?
বাথরুমে।
ওরে বাবা! না, না, আমি শুনতে চাই না!
না, না–তুমি যেরকম ভাবছ নাথিং লাইক দ্যাট।
কে জানে! তোমার মুখে তো কিছু আটকায় না!
একটা ওল্ড ম্যান ঢুকে পড়েছিল বাথরুমে। আমি তখন শাওয়ারের নীচে।
তার মানে?
মানে আর কী! আমিও ভীষণ সারপ্রাইজড হয়ে গিয়েছিলাম। লোকটা হেভি উলটোপালটা কথা বলছিল। আমার জন্য কাঁদছিল–
ইজ নট আ জোক?
না, অনুরাধা, না। লোকটা দেখলাম আমার ব্যাপার-ট্যাপার সবই জানে। তোমার কথা বলছিল, মায়ের কথা বলছিল। বলছিল এই রিলেশানগুলোকে হাত মুঠো করে আঁকড়ে ধরে রাখতে কিছুতেই যেন মুঠো আলগা না হয়।
লোকটা কাঁদছিল কেন?
ঠিক জানি না। বলছিল যে, আমার জন্যে কাঁদছে। তারপর…তারপর ছটা ঋতুর কথা বলছিল। বলছিল, এখন বসন্ত চলছে। তারপর শীত আসতে পারে…তারপর বর্ষা। আমি লোকটার কথার মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে পারিনি, তবে লোকটা আমার মুড অফ করে দিয়ে গেছে।…লোকটা তোমার কথাও বলছিল…।
কী বলছিল আমার কথা?
বলছিল, তোমাকে তিনদিন না দেখে আমি থাকতে পারব কি না। একটানা তিনদিন ফোন করে থাকতে পারব কি না!
তুমি কী বললে?
বললাম, পারব।
তা হলে এখন ফোন করেছ কেন?
তুমি কি চিরকাল ছেলেমানুষ থেকে যাবে? মানুষের কিছু-কিছু উইকনেস গোপন রাখা দরকার। তোমার কাছে গোপন করি না, কারণ, তোমাকে আমি আলাদা বলে ভাবি না। কিন্তু লোকটা আমার কে যে ওকে সব বলতে যাব!
ওই লোকটা কে তুমি বুঝতে পারোনি?
না। তা ছাড়া তুমি তো জানো, অনেক কিছুই আমি ঠিকমতো বুঝতে পারি না।
যেমন?
যেমন, তোমাকে আমি কেন এত ভালোবাসি জানি না। কখনও এর কোনও কারণ খুঁজে পাই না। তাই মনে-মনে বলি ও সম্পূর্ণ অকারণে তোমাকে আমি এত ভালোবাসি। এতে আমার খুব আনন্দ হয়।
কেন?
ভালোবাসার কোনও কারণ খুঁজে পেলেই তা থেকে স্বার্থের গন্ধ বেরোতে চায়। মা-কে যে আমি ভালোবাসি তারও সেরকম কোনও কারণ নেই।…তোমার ভালোবাসার কি কোনও কারণ আছে, অনুরাধা?
আগে কখনও এভাবে ভাবিনি। তবে মনে হচ্ছে, আমারটাও ঠিক তাই সম্পূর্ণ অকারণে।
তোমাকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে।
বুঝতে পারছি, কিন্তু কিছু করার নেই।
জানো, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কাছে আমি আপাদমস্তক ঋণী–?
হোয়াট? আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল!
হ্যাঁ–টেলিফোন আবিষ্কার করার জন্যে। নইলে তোমাকে রোজ ফোন করতাম কী করে!
ধন্য ইমাজিনেশান!
ইমাজিনেশান নিয়েই তো আমি বেঁচে আছি, অনুরাধা। ছোট-বড় স্পষ্ট-অস্পষ্ট কতকগুলো স্বপ্ন। আলটপকা বুড়োটা স্বপ্ন নিয়েও অনেক কথা বলছিল। বলছিল, সুন্দর স্বপ্ন যখন সত্যি হয়ে ওঠে তখন নাকি আর ততটা সুন্দর থাকে না।
সরি, একমত হতে পারলাম না।
জানো, আমার কাছে গোটা ব্যাপারটা কেমন মিস্টিরিয়াস মনে হচ্ছে। যদি শুধু স্বপ্ন নিয়েই আমাকে বাঁচতে হয়, তা হলে যে-স্বপ্ন কোনওদিন সত্যি হতে পারে না সেরকম অলীক স্বপ্ন নিয়েই বাঁচব।
এসব কী বলছ!
ওই লোকটার কথা মনে পড়লেই আমার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একা-একা কেমন দিশেহারা লাগছে। সেইজন্যেই তোমাকে আরও বেশি করে দেখতে ইচ্ছে করছে।…আমি এখন চলে যাব তোমাদের বাড়ি? জানলা দিয়ে শুধু তোমাকে একটিবার উঁকি মেরে দেখব, তারপর ফিরে আসব–
পাগল নাকি!
পাগল তো দু-বছর আগেই হয়েছি। দ্বিতীয়বার কি আর পাগল হওয়া যায়! একা-একা আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে…আমার কিছু ভাল্লাগছে না…।
