মাম্মি তোমার রিসার্চের প্রগ্রেস জানতে চাইছিল।…এই তো, মাম্মি আমার সামনে বসে আছে।
আমার কিচ্ছু ভাল্লাগছে না…তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে…।
মাম্মিকে বলছি কাল সায়েন্স কলেজে গিয়ে তোমার রিসার্চের প্রগ্রেস রিপোর্ট নিয়ে আসব।
একা-একা আমি আর পারছি না…।
রিসার্চ নিয়ে এত আপসেট হওয়ার কিছু নেই। কাল তো তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমাকে বাঁচাও, অনুরাধা…।
এত আপসেট হলে আমার খারাপ লাগে। প্লিজ।
কাল আসবে তো?
বললাম তো, যাব। এখন একটু মন দিয়ে পড়াশোনা করে দেখি।
রাখছি তা হলে…।
হ্যাঁ—
টা-টা, লাভ য়ু…।
.
০৩. জড়িয়ে ধরো, মাতৃস্নেহলতা
বারান্দায় বসে রাতের আকাশ দেখছিল আদিত্য। বিধাতা বীজধান ছড়ানোর মতো নক্ষত্র ছড়িয়ে দিয়েছেন আকাশে। আর হতবাক সুন্দর চাঁদ নয়ন মেলে সেই অনুপম দৃশ্য দেখছে। কে বলবে আজ সারাটা দিন মেঘ-বৃষ্টির দখলে ছিল!
বারান্দায় লাগোয়া ঘর অন্ধকার। ডানদিকের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা খাটে মা শুয়ে আছে। খাটের মাথার কাছে রাখা ছোট টেবিলে টেপরেকর্ডার চলছে।
আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলি ফুরায় যায় মা– পূর্ণ-আশা, পূর্ণ-সাধ কোনও মানুষ কখনও দেখেনি আদিত্য।
প্রায় তেরো বছর আগে বাবা যখন ক্যানসারে মারা যান তখন তার সাধ অপূর্ণ ছিল। পরিণাম নিশ্চিত জেনে বাবা অপারেশনে রাজি হননি। ভাঙা গলায় দিনরাত শুধু অস্পষ্ট স্বরে বলতেন, তোমাদের ছেড়ে যেতে মন চায় না। কিন্তু কী যে করি…নিয়তির টান…।
আদিত্য মেঝেতে বসে বই পড়ত, আর বাবা কখন যেন নিঃশব্দে ওর কাছটিতে এসে দাঁড়াতেন। তারপর উবু হয়ে বসে ওর মাথায় হাত বোলাতেন।
দিতু, আমার সময় হয়ে এল রে…।
আদিত্য অবাক হয়ে দেখত বয়স্ক পুরুষমানুষটা নিলজ্জের মতো কাঁদছে।
অনেক কেঁদেছি কাঁদিতে পারি না বুক ফেটে ভেঙে যায় মা / সকলি ফুরায়ে যায় মা…।
শ্যামাসংগীত মায়ের খুব প্রিয়। প্রায়ই রাতে ঘর অন্ধকার করে মা গান শোনে। মন ভেঙে গিয়েছিল তেরো বছর আগেই–তারপর, এই তেরো বছরে, শরীরটাও ভেঙে গেছে। কিন্তু তাই বলে আদিত্যকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনায় কখনও এতটুকু টান পড়েনি। প্রতিমুহূর্তেই আদিত্য শেকড়টা টের পায়। এখনও পাচ্ছিল।
বারান্দা ছেড়ে ঘরে এসে ঢুকল আদিত্য।
দেখল, মা বিছানায় টান-টান হয়ে শুয়ে আছে। জানলা দিয়ে ছিটকে আসা কয়েক টুকরো আলোয় মাকে ভারি অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
মা, তোমার মনে পড়ে ছোটবেলার দিনগুলো? উনুনে বসানো কড়াইয়ে মশলার আঁঝ, তোমার ঘামতেল মুখ, খেলনা মোটরগাড়ি ভেঙে গিয়ে আমার কান্না, বাবা অফিস বেরোবেন, তোমার ছুটোছুটি, পাশের বাড়ির ছুটকির মা এসে তোমাকে ডাকাডাকি, ছুটকির কান বেঁধাতে হবে তোমাকে, আমাকে স্কুলে দিয়ে আসা নিয়ে আসা, রাতে কত গল্প শোনানো…। এই করে করে এক ক্লাস ডিঙিয়ে আর এক ক্লাসে, বড় হয়ে ওঠা, কত গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত পার করে দেওয়া। ঋতুরা আসা-যাওয়া করেছে। ছায়াছবির মতো।
আদিত্যর মনে পড়ল, এক শীতের রাতে তিন-চার জ্বরে কপালে মায়ের ঠান্ডা হাত। সেই স্পর্শ আজও টের পায় ও।
এইভাবে তিলতিল করে গড়ে উঠেছে সম্পর্ক, আর সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়ার ক্ষণটিও এগিয়ে এসেছে কাছাকাছি। কিন্তু তবুও তো মানুষ সম্পর্ক আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়!
আদিত্য হাত মুঠো করল প্রাণপণ শক্তি দিয়ে। আধো-আঁধারিতে ওর মুঠো করা হাত ঘিরে এক আকুল মায়া জড়িয়ে ছিল। ভালোবাসা দিয়ে এই সম্পর্কও আঁকড়ে ধরে রাখবেকিছুতেই আঁকড়ে ধরা মুঠো খুলবে না–যতই গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত-শীত-বসন্ত আসুক। ভালোবাসা এইসব ঋতুর চেয়ে কিছু কম নয়। ছটা ঋতুই মাত্র দু-মাস করে থাকে–যায়, আবার আসে। কিন্তু ভালোবাসার ঋতু কখনও যায় না–থেকে যায় চিরকাল।
আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল…।
পূর্ণর্সাধ কোনও মানুষ আদিত্য কখনও দেখেনি, দেখতে চায় না। যে-জীবনে কোনও আকাঙ্ক্ষা নেই, তাকে জীবন বলতে ইচ্ছে করে না আদিত্যর। সামান্য মানুষ হিসেবে যৎসামান্য আকাঙ্ক্ষা বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখাটা কোনও পাপ নয়।
অন্ধকারে অন্ধকার ছবির মতো দাঁড়িয়ে আদিত্য তাই ভালোবাসার ঋতুর কথা ভাবছিল– আর ভাবছিল, যদি সেই আলটপকা বুড়ো আবার ওকে দেখা দেয়, তা হলে তাকে ও কেমন মুখের মতো জবাব দেবে।
সাবধান! সাপ আছে (১)
চোখ বুজে ঘুরে দাঁড়াও, বিশ্বাস, অনন্ত কর মিঠে সুরে বললেন। সুতরাং আমি চোখ বুজলাম, ঘুরে দাঁড়ালাম, অনেকটা ঘুমিয়ে-চলা মানুষের মতো। শুনলাম, অনন্ত কর সিন্দুক খোলার কম্বিনেশান ডায়াল ঘোরাচ্ছেন।
ক্লিক ক্লিক ক্লিক ক্লিক।
ডানদিকে ষোলো ঘর। মনে-মনে হিসেব করলাম।
ক্লিক ক্লিক ক্লিক ক্লিক।
বাঁদিকে এগারো ঘর। শয়তানি হাসি হাসলাম।
ক্লিক ক্লিক ক্লিক ক্লিক।
ডানদিকে ছাব্বিশ, জোরে বলে উঠলাম আমি। কিন্তু সৌভাগ্যবশত অনন্ত কর কানে কম শোনেন।
ঠিক আছে, বিশ্বাস বললেন অনন্ত কর, এবার ফিরে দাঁড়াতে পারো।
ফিরে দাঁড়ালাম। লুব্ধ চোখে দেখলাম দশ আর একশোর নোটের বান্ডিলগুলো : দু-লক্ষ চল্লিশ হাজার টাকা। আমার শোওয়ার ঘরের তাকে রাখা তাসের প্যাকেটের মতো সুবোধ শিশু হয়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে বান্ডিলগুলো।
অনন্ত কর আরও একটা একশোর বান্ডিল সযত্নে আগেরগুলোর সঙ্গে যোগ করলেন।
