আদিত্য বৃদ্ধের কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। কে এই লোকটা? কোথা থেকেই বা ঢুকে পড়ল এই কলঘরে!
আমার জীবন নিয়ে আপনি মাথা ঘামাচ্ছেন কেন? আদিত্যর গলা একটু রুক্ষই শোনাল নিজের কানে।
হাসল বৃদ্ধ। দড়ির মতো শিরা বের করা হাত নেড়ে বলল, তোমার জীবন আর আমার জীবনে কোনও তফাত নেই গো–শুধু সময়ের তফাত। তুমি বর্তমান–আর আমি ভবিষ্যৎ। তোমার জীবনের কষ্ট আমি আর সইতে পারছি না। নাকি আমার জীবনের কষ্ট আমি আর সইতে পারছি না?
আমি নির্ঘাত স্বপ্ন দেখছি, ভাবল আদিত্য। সন্ধেবেলা যদি ও অনুরাধাকে এই ব্যাপারটা বলে তা হলে আর দেখতে হচ্ছে না। লেগ পুল করে করে ওকে একেবারে শেষ করে দেবে।
আপনাকে, আমি আগে কখনও দেখেনি– আদিত্য যেন আপনমনেই মন্তব্য করল।
দ্যাখোনি কারণ আমি দেখা দিইনি।
আজ তা হলে হঠাৎ এলেন কেন?
তোমাকে সাবধান করতে। তোমার জীবনে অনেক কষ্ট আছে। অথচ তুমি কিছুদিন ধরেই দারুণ সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখছ–।
স্বপ্ন দেখা কি অন্যায়?
মোটেই না। আমরা স্বপ্ন দেখি সেই সব জিনিসের, যা সত্যি হলেও হতে পারে। পুরোপুরি যা অবাস্তব বা অলীক সেগুলো আমরা স্বপ্ন দেখি না, কারণ সেগুলো যে আগাপস্তলা স্বপ্ন তা আমরা সেই মুহূর্তেই বুঝতে পারি। যেমন, তুমি নিশ্চয়ই এখন নোবেল প্রাইজ পাওয়ার স্বপ্ন দ্যাখো না?
না, দেখি না, কিন্তু তাই বলে মানুষ কি স্বপ্ন দেখবে না!
তা কেন, তা কেন– হাত নেড়ে হাসল বৃদ্ধ, বলল, স্বপ্ন দেখার অসুখ কি সহজে যেতে চায়! কিন্তু তুমি সাবধানে স্বপ্ন দেখো–সে কথাই আমি বলতে এসেছি। তুমি যদি একটু কম স্বপ্ন দ্যাখো, তা হলে আমার কষ্ট একটু কম হয়, আমাকে একটু কম চোখের জল ফেলতে হয়।
বৃদ্ধের কথায় আদিত্য বেশ অবাক হচ্ছিল। একটা অদ্ভুত ঘোর লাগছিল ওর মনে। শাওয়ারের তলায় ভিজতে ভিজতেই ও বলল, আমি তো খুব বেশি কিছু চাই না–শুধু সুখী হতে চাই।
ওর কথা শুনে হাসল বৃদ্ধ। হাসতে-হাসতে কাশি পেয়ে গেল তার। বেশ কয়েকবার কেশে লাল হয়ে যাওয়া চোখ-মুখ মুছে নিয়ে সে বলল, বেশ বলেছ। সুখী হতে চাই। এ যেন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মতোই সহজ-সরল ব্যাপার। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার কাকে বলে তুমি জানো। তাই সেটা হতে চাওয়া তেমন কঠিন ব্যাপার নয়। কিন্তু তুমি কি জানো, সুখী কাকে বলে?
আদিত্য কোনও জবাব দিতে পারল না।
তখন হেসে বৃদ্ধ বলল, যা তুমি জানো না, চেনো না, তা কি কখনও হওয়া যায়! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত দিয়ে মুখ মুছে নিল । আমি জানি, তোমার খুব ইচ্ছে তোমার দেখা সুন্দর সুন্দর স্বপ্নগুলো সত্যি হয়ে উঠুক। কিন্তু বিশ্বাস করো, সেগুলো সত্যি হলেই দেখবে ব্যাপারটা আর ততটা সুন্দর লাগছে না।
আপনি আমাকে ভয় দেখাতে এসেছেন? প্রতিবাদের ঢঙে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল আদিত্য, আমি বেশ ভালো আছি। আমি ভালো থাকতে চাই। দরকার হয় জোর করে ভালো থাকব। কিছুতেই মন খারাপ করব না। আমার ভেতরে-বাইরে যত দুঃখ কষ্টই থাক, আমি সেগুলোকে ভুলে থাকব ভালো থাকব।
তোমার মনের জোর আছে। অন্তত তুমি মনের জোর দেখাতে চেষ্টা করছ। ভালো। কিন্তু অনুরাধার সঙ্গে যদি পর-পর তিনদিন দেখা না হয় তুমি ভালো থাকতে পারবে? তুমি পারবে একটানা তিনদিন ওকে ফোন না করে থাকতে?
অনুরাধা! অনুরাধার কথা লোকটা জানল কেমন করে?
সন্দেহের চোখে বৃদ্ধকে দেখল আদিত্য। জিগ্যেস করল, আপনি কি অনুরাধার কেউ হন?
না, তুমি যেরকম ভাবছ সেরকম কেউ না– একটু হাসল বৃদ্ধ, বলল আসলে তুমি একটু ভুল করছ। তোমাকে তো প্রথমেই বললাম, তোমাতে আমাতে কোনও তফাত নেই–শুধু সময়ের তফাত ছাড়া…তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর এখনও দাওনি।
অনুরাধাকে তিনদিন না দেখে থাকা! তিনদিন ফোন না করে থাকা! ওর সঙ্গে একদিন দেখা না হলেই আদিত্যর বুকের ভেতরটা কেমন করে। পরপর দুদিন ফোন না করতে পারলে ওর শ্বাসকষ্ট হয়। কিন্তু এই দুর্বলতার কথা বৃদ্ধকে বলা ঠিক হবে না।
তাই আদিত্য বলল, হ্যাঁ, পারব।
একথা শুনে বৃদ্ধের মুখ আবেগে ভেসে গেল। সে বলল, বাঃ, খুব ভালো। আমার কষ্ট তা হলে অনেক কমবে। এখন যে অনুরাধা তোমার কাছে থাকলেই তোমার ভালো লাগে, এমন দিন হয়তো আসতে পারে যখন ও কাছে থাকলেই তুমি বিরক্ত হবে।
শাওয়ারের বৃষ্টির মধ্যেই হো-হো করে হেসে উঠল আদিত্য। কিছুক্ষণ পর অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, আপনার কল্পনাশক্তির প্রশংসা করতে হয়। আর-একটু আগে আপনিই আমাকে স্বপ্ন দেখতে বারণ করছিলেন!
বিষণ্ণ গলায় বৃদ্ধ বলল, আমি তো চাই তুমি সবসময় ভালো থাকো। তুমি ঠিক যেমনটা চাও তোমার জীবনটা ঠিক সেইরকম হোক। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত-শীত-বসন্ত–এই ছটা ঋতু পরপর নিয়মমাফিক বয়ে যাক তোমার জীবনে। কিন্তু… একটু থেমে বৃদ্ধ নীচু গলায় বলল, কিন্তু তা তো হয় না! কারও জীবনে বর্ষা খুব দীর্ঘ হয়ে যায়, কারও জীবনে শীত। আবার কারও জীবনে বসন্ত বেশিক্ষণ থেকে যায়। আসলে ব্যাপারটা কী জানো! একটা পয়সা নিতে হলে তার দুটো পিঠই নিতে হয়। এক পিঠ নেওয়া যায় না। তাই শুধু বসন্ত দিয়ে জীবন তৈরি করা যায় না– তার সঙ্গে অল্পবিস্তর শীত অথবা বর্ষা থেকে যায়। এদের তুমি বাদ দিতে পারো না। তুমি ভাবছ তোমার জীবনে বসন্ত খুব বেশি। অথচ চল্লিশ বছর পর আমার জায়গায় পৌঁছেলে তুমি বুঝতে পারবে, তোমার জীবনে শীতও কিছু কম ছিল না। অবশ্য সেই শীত তুমি এখন টের পাচ্ছ না– কারণ, শীত এখনও তোমাকে জানান দেওয়ার কাজটা শুরু করেনি। কিন্তু আমি তো জানি!
