হঠাৎই মোহনদাস হাউমাউ করে ভাঙা গলায় কাঁদতে শুরু করল। জড়ানো গলায় কীসব বলতে লাগল কে জানে!
মল্লিকা শাড়ি-টাড়ি ঠিকমতো গুছিয়ে নিল শেষবারের মতো। মুখে আঁচল ঘষল কয়েকবার। তারপর বলল, নিন, এবার দরজা খুলে দিন…আমি বাড়ি যাব..মা চিন্তা করবে। একটু হেসে? নাকি আপনি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন!
আচমকা মল্লিকার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল মোহনদাস জোয়ারদার। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে টিপে ধরল মল্লিকার গলা। লোকটার মুখ থেকে জন্তুর মতো শব্দ বেরোচ্ছিল। তার সঙ্গে মদের গন্ধ।
মল্লিকা প্রাণপণে বাধা দিল। হাঁফাতে-হাঁফাতে বলল, কী ছেলেমানুষি করছেন! আপনি বুঝতে পারছেন না, আমরা দুজনে কেউই আর ঠিকমতো বেঁচে নেই। আপনি আমাকে খুন করতে চান করুন, কিন্তু তাতে কোন লাভ নেই। একটা মড়া আর একটা মড়াকে খুন করলে কার কী আসে। যায়– ধস্তাধস্তি করতে করতেই হাসি পেয়ে গেল মল্লিকার। ও হেসে উঠল শব্দ করে।
মোহনদাস কেমন যেন হতভম্ব হয়ে ছেড়ে দিল মল্লিকাকে। লোকটার ফরসা মুখ নীলচে দেখাচ্ছে। আচ্ছা, প্রথম সুযোগেই কি এইচ. আই. ভি. বাসা বাঁধে শরীরে? মল্লিকার মুখের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজল মোহনদাস। ওর শরীরের সব শক্তি কে যেন শুষে নিয়েছে। ও সম্মোহিতের মতো প্রাইভেট অফিসের দরজা খুলে দিল। ভয়ংকর সুন্দরী মেয়েটা সহজ পা ফেলে বেরিয়ে গেল বাইরে। মোহনদাসকে রেখে গেল শূন্যে হাওড়া ব্রিজ আর গঙ্গার মাঝখানে।
তুমুল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল মল্লিকা। মায়ের কথা মনে পড়ল ওর। মনে পড়ল, মোহনদাসের হাতে হেনস্থা হওয়া চারটে মেয়ের কথা। ওদের কথা ভাবতে-ভাবতে মল্লিকা নিজের ভেসে থাকা জীবনের একটা মানে খুঁজছিল।
সাত ঋতুর জীবন
০১. এসো, জলধারা এসো
আজ সকাল থেকেই দিনটা শ্রাবণে শ্রাবণ।
তাই যতই সময় গড়াতে লাগল আদিত্যর মন খারাপ ততই বাড়তে লাগল। অথচ মন খারাপ হওয়ার তেমন কোনও কারণ নেই। গতকাল রাতে ওর বেশ ভালোই ঘুম হয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে অনুরাধাকে স্বপ্ন দেখেছে। অবশ্য স্বপ্নের অনেকক্ষণ বাস্তবের নাকি কয়েকটা মুহূর্তমাত্র। কিন্তু যা-ই হোক, ওকে স্বপ্নে দেখতে আদিত্যর ভালোই লাগছিল। অনুরাধার কথা ভাবলেই ওর মন ভালো হয়ে যায়। আদিত্য ওকে বলে মন-ভালোকরা মেয়ে।
তারপর ঘুম ভাঙতেই মায়ের আদেশে ছাতা মাথায় দিয়ে বাজারে দৌড়োনো।
বাজার করার ব্যাপারটা সাংঘাতিক বিরক্তিকর। অনুরাধাকে ও এ-কথা বহুবার বলেছে। অনুরাধা অবাক হয়ে বলেছে, সে আবার কী! বাজার না করলে আমরা খাব কী!
তুমি কাছে থাকলে আমার খাওয়ার কোনও প্রবলেম হবে না। আদিত্য হেসে বলেছে, তুমি তোমার ব্যাপারটা ভাবো।
অনুরাধা মুখ গম্ভীর করে বলেছে, হুম্। বিয়ের পর আমাদের দেখছি অনেক ঝামেলা হবে। দু-চার বছর পর সেপারেশান না হয়ে যায়!
সে সেপারেশান হয় তোক গে। শুধু বাজার করতে পারব না, আর তোমাকে ছাড়তে পারব না।
অনুরাধা চোখ কপালে তুলে বলেছে, তার মানে!
এসব কথা ভাবতে-ভাবতে আপনমনেই হেসে ফেলল আদিত্য। বৃষ্টির তেজ বাড়ছিল, কিন্তু ওর মনটা ধীরে-ধীরে ভালো হতে শুরু করল।
ঠিক দশটার স্নান করতে ঢুকল আদিত্য। এগারোটার মধ্যে সায়েন্স কলেজে পৌঁছোতে হবে। রিসার্চের কাজে ঢিলে দিলে চলবে না। পি-এইচ. ডি.-টা তাড়াতাড়ি দরকার। তার ওপর ওর গাইড বড় খিটখিটে লোক। লেখাপড়া ছাড়া আর কিছু জানে না মানুষটা।
বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের কল শেষ প্যাঁচ পর্যন্ত খুলে দিয়ে আদিত্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। ও আর অনুরাধা সিনেমা দেখে ফেরার পথে বৃষ্টিতে ভিজছে।
বাইরে মেঘ ডাকছিল। ফলে শাওয়ারের নীচে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে স্বপ্নটাকে বাস্তবের অনেক কাছাকাছি মনে হচ্ছিল।
ঠিক তখনই একটা চাপা কান্নার শব্দ শুনতে পেলে ও। কে যেন ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
চমকে উঠে চোখ খুলল আদিত্য।
অবাক হয়ে দেখল, বাথরুমের এককোণে হাঁটু মুড়ে উবু হয়ে বসে একজন বৃদ্ধ কাঁদছে। তার ফরসা পিঠ স্থির কম্পাঙ্কে ফুলে-ফুলে উঠছে। চামড়ার ভাঁজগুলো কখনও আবছা হচ্ছে, কখনও গম্ভীর হচ্ছে।
শাওয়ারের জলধারা আদিত্যর ওপরে অঝোরে ঝরে পড়ছিল। সে কথা ভুলে গিয়ে আদিত্য শীর্ণ ফরসা বৃদ্ধকে দেখতে লাগল। শাওয়ারের জলের ফোঁটা ছিটকে পড়ছে তার মাথায়, পিঠে। অথচ সেদিকে তার কোনও খেয়ালই নেই।
কে আপনি? এখানে বসে এভাবে কাঁদছেন কেন?
আদিত্যর প্রশ্নে চোখ তুলে তাকাল বৃদ্ধ। প্রশান্ত গভীর চোখ। চোখের কোণে জল চিকচিক করছে।
বৃদ্ধ বাথরুমের দেওয়াল ধরে উঠে দাঁড়াল। পরনে শুধু একটা ধুতি–তার বেশ খানিকটা ভিজে গেছে। বাথরুমের আয়নায় বৃদ্ধের মুখের পাশটা দেখতে পাচ্ছিল আদিত্য। তার ডান কানের নীচে একটা লালচে তিল।
এভাবে কাঁদছেন কেন আপনি? আদিত্য আবার জিগ্যেস করল।
এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল বৃদ্ধের ঠোঁটে। তাতে কান্নাটা আরও ব্যথাতুর হয়ে উঠল। ছোট্ট করে কেশে বৃদ্ধ বলল খসখসে গলায়, কাঁদছি তোমার কথা ভেবে।
আদিত্য কিছুক্ষণ কোনও কথা খুঁজে পেল না।
আমার কথা ভেবে!
হ্যাঁ, কী কষ্টের তোমার জীবন।
কোথায় কষ্ট! কীসের কষ্ট? অনুরাধার কথা ভাবল আদিত্য। ওর মন ভালো হয়ে গেল নতুন করে।
বৃদ্ধ কাপড়ের খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছে নিল। তারপর বলল, এখন তো কষ্ট টের পাওয়ার বয়েস নয়, বাবু। টের পাবে আমার বয়েসে পৌঁছেলে।
