মল্লিকা শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে সেটা দিয়ে চোখ-গাল মুছে বলল, আপনি আর নেই বলে।
কী যে সব উলটো-পালটা কথা বলো! সোফা কাম-বেড থেকে উঠে দাঁড়াল মোহনদাস জোয়ারদার। ক্যাবিনেটের ওপরে রাখা চশমাটা চোখে দিয়ে মল্লিকাকে কাছে ডাকল ও এসো, এদিকে এসো। আর-একটু আদর করি। তুমি খুব লক্ষ্মী মেয়ে। দেখলে তো, একটু-আধটু বুলবুলি করে তোমার লাইফ একটুও নষ্ট হয়নি! আরে বাবা, এ কি ঘটি-বাটি যে টোল খেয়ে যাবে!
মল্লিকা পিছিয়ে গিয়েছিল ঘরের এককোণে রাখা একটা টেবিলের কাছে। আলোয় দিকে পিঠ করে দাঁড়ানোয় ওর মুখটা আবছা দেখাচ্ছিল। মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে শক্ত গলায় মল্লিকা বলল, আমি লক্ষ্মী নই–অলক্ষ্মী। তা ছাড়া আমার লাইফ বলে কিছু থাকলে তবে তো আপনি নষ্ট করবেন। তখন ভয় পেয়ে আর পাঁচটা মেয়ের মতো কথা বলেছি। আসলে আমি আপনার কাছে চাকরি নিয়েছিলাম আজকের দিনটার জন্যে। আপনি যে একটার-পর-একটা মেয়ের সর্বনাশ করে যাচ্ছিলেন, সেটা রোখবার জন্যে…আর আপনাকে শায়েস্তা করার জন্যে।
শায়েস্তা! আমাকে! বেশ জোরে হেসে উঠল মোহনদাস।
কিন্তু মল্লিকার কানে হাসিটা ফঁপা শোনাল। ও বলল, খুব খারাপ লাগছে, জানেন– আঁচল দিয়ে মুখ মুছে নিল মল্লিকা? কিন্তু কী করব! আমার তো আর কোনও উপায় ছিল না।
তুমি কী করেছ আমাকে? চাপা কর্কশ গলায় মোহনদাস কথা বলল।
মল্লিকা ঘাড় ঘুরিয়ে অদ্ভুত চোখে দেখল মোহনদাসকে। হেসে বলল, এখনও বোঝেননি? আপনার না আই. কিউ. ভীষণ কম। এইস-এর নাম শুনেছেন?
মোহনদাস জোয়ারদারের চোখের সামনে গোটা ঘরটা দুলে উঠল। এইচ. আই. ভি., এই — কাগজে এ-নিয়ে কত লেখালেখি চলেছে গত কয়েকবছর ধরে। মেয়েটা কি সত্যি বলছে, না মিছিমিছি ভয় দেখাচ্ছে? মোহনদাসের শরীরের ভেতরে কতকগুলো অশরীরী পোকা যেন কিলবিল করে উঠল। ও এপাশ-ওপাশ তাকাল অসহায়ভাবে। আবার বসে পড়ল সোফায়। আমতা-আমতা করে বলল, তুমি…তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ। ঠাট্টা করছ।
মল্লিকার ভীষণ স্নান করতে ইচ্ছে করছিল। মাথায় টিপটিপ ব্যথা আর গা-বমি ভাব। ও সোফায় বসে থাকা লম্পট জানোয়ারটাকে দেখছিল। ওটার দাঁত-নখ আর নেই। সব খতম। মল্লিকার কেমন যেন মায়া হল। বলল শান্ত নরম গলায়, না ভয় দেখাচ্ছি না। আপনার অবস্থাটা এখন ঠিক কীরকম জানেন? ধরুন, সাঁতার জানে না, এমন একজন লোক হাওড়া ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিল গঙ্গায়। হিসেবমতো জলে ডোবার পর কিছুক্ষণ হাবুডুবু খেয়ে তারপর লোকটা মারা যাবে। ওর ফুসফুঁসে বাতাসের বদলে হুহু করে ঢুকে পড়বে গঙ্গার জল। তারপর একসময় বেচারা মরবে।
একটু থামল মল্লিকা। কপাল থেকে চুল সরাল। আয়না দেখার কোনও উপায় নেই। গলার কাছে, গালে সামান্য জ্বালা করছে। শরীরে সামান্য ব্যথা। হাতব্যাগটা রয়েছে রিসেপশান কাউন্টারের ডেস্কের মধ্যে। ওটা পেলে নিজেকে একটু ঠিকঠাক করে নিত।
এ তো গেল ডাক্তারি হিসেব। মল্লিকা আবার বলতে শুরু করল। এতটা মন খুলে নিজের অসুখের কথা কাউকে বলতে পারেনি ও : কিন্তু আমার হিসেব কী বলে জানেন? যে-মুহূর্তে লোকটা ব্রিজের আশ্রয় ছেড়ে শূন্যে ঝাঁপ দিয়েছে সেইমুহূর্তেই খতমের খাতায় ওর নাম উঠে গেছে। শুন্যে ভেসে থাকার সময়টুকুই ওর বিচিত্র জীবন–যা থেকেও নেই–অনেকটা মরীচিৎকার মতো।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল মল্লিকা : আপনার-আমার জীবনটা এখন তাই। আমার..আমার স্বামী জাহাজে কাজ করত। কোথা থেকে, কোন বিদেশ থেকে, সে এইডস-এর জীবাণু নিয়ে এসেছিল আমি জানি না। যখন সব জানা গেল, তখন সে-ও শেষ…আর, আমিও।
মল্লিকা, এসব তুমি কী বলছ! শিশুর মতো অসহায় সুরে কথা বলল মোহনদাস জোয়ারদার। ওর গলার স্বরে আতঙ্ক নিশ্চিত ছাপ ফেলেছে। ও ভাবতেই পারছে না, ওর জীবনটা এখন শুধু মায়া–আছে অথবা নেই, এই দুয়ের মাঝখানে দুলছে। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর পশ্চিম আকাশের লালচে আভার কথা মনে পড়ল মোহনদাসের। সেতারের তারে শেষবারের মতো টান মেরে সেতারি যখন চলে যায়, তখন সেই সুরের রেশ কী চেষ্টাই না করে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে! মোহনদাসের বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল। একটু আগেই ওর জীবন কী সম্পূর্ণ ছিল! আর এখন…সব ফাঁকা!
মল্লিকা তখন আপনমনেই বিড়বিড় করে নিজের কথা বলে যাচ্ছে? ..আমার স্বামীর প্রথম ফ্লু মতো হয়েছিল। তারপর জ্বর, গলা ব্যথা। আর দেখতে-দেখতে বছরখানেকের মধ্যে, সব শেষ।…কিন্তু আমি রয়ে গেলাম…হাওড়া ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দেওয়া ওই মানুষটার মতো…শুন্যে…এখনও গঙ্গা ছুঁতে পারেনি।
পায়ে-পায়ে মোহনদাসের কাছে এগিয়ে এল মল্লিকা : ..গত বছর কাগজে আমার ছবি বেরিয়েছিল। আপনি বোধহয় ছবিটা খেয়াল করেননি। অবশ্য কেই-বা খেয়াল করে! জানেন, অসুখটা হওয়ার পর এটা নিয়ে কত খোঁজখবর করেছি, কতবার সুইসাইড করার কথা ভেবেছি। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। আমি মরে গেলে আমার বুড়িমা-টাকে যেন দেখার কেউ নেই! হাত দিয়ে মুখ মুছে নিল মল্লিকা। এমনভাবে বারবার মুখে হাত বোলাতে লাগল যে অদৃশ্য কতকগুলো মাছি ঘনঘন বসছে ওর মুখের ওপরে । আপনি হয়তো জানেন না, এইডস ছড়ালে ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের ২৬৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা আছে। তাতে ছ-মাস পর্যন্ত জেল হতে পারে। আবার ২৭০ নম্বর ধারায় এ-জাতীয় রোগ ছড়ালে দু-বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে, ফাইন হতে পারে, এমন কথাও লেখা আছে। হাসল মল্লিকা তেতো হাসি, বলল, এসব আইনই হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে, প্লেগের কথা ভেবে। তবে প্লেগের বদলে লেখা হয়েছিল বিপজ্জনক কোনও সংক্রামক অসুখ। এখন তো এই এসেছে…আর, প্লেগও একবার উঁকিঝুঁকি মেরে গেছে।…কিন্তু শাস্তির ভয় আমার থাকবে কী করে! ফাঁসির আসামি কখনও জেলের ভয় পায়। তা ছাড়া আমি তো আপনাকে শায়েস্তা করতে এসেছিলাম।
