মোহনদাস তখন আবার গুনগুন করে গান ধরেছে : চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়, চুনরি কে নীচে কেয়া হ্যায়…।
সুর ভাঁজতে-ভাঁজতেই গ্লাস-বোতল ইত্যাদি আবার ক্যাবিনেটের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখল মোহনদাস। চোখ থেকে চশমা খুলে রেখে দিল ক্যাবিনেটের ওপরে। তারপর আবার এসে বসল সোফায়। গদির ওপরে হাতের চাপড় মেরে বলল, এসো, আর দেরি কোরো না…তোমাকে তো আবার বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। এসো, এসো–তোমার কোনও চিন্তা নেই–এটা সোফা নয়, সোফা কাম-বেড। বিশ্রীভাবে হাসল, গদিতে আলতো করে তিনটে চাপড় মেরে বলল, সোফা মানে তো জানোই। আর কাম কিংবা বেডও তোমার নিশ্চয়ই জানা। কাম, কাম..ফালতু ঝামেলা কোরো না, লক্ষ্মীটি সোফা থেকে উঠে তার কলকবজা নেড়ে পিঠের গদিটাকে পেতে দিল মোহনদাস, বলল, সোফায় কাজ শেষ। এখন শুধু কাম আর বেডের ব্যাপার…
হঠাৎই মল্লিকার বুকের ভেতরে সমস্তরকম ঝড়-ঝা থেমে গেল। চোখের কোণে জল থাকলেও বুকের গভীরে উথালপাতাল আর নেই। সাপ যখন ছোবল মারবেই তখন আর কীসের ভয়।
প্রতিশোধের কথা মনে পড়ছিল মল্লিকার, মনে পড়ছিল ওই চারটে মেয়ের কথা। আর একটু পরেই মল্লিকা ওদের দলে যোগ দেবে। তারপর? তারপর সত্যিই কি ক্ষান্ত হবে মোহনদাস? মল্লিকা কি পারবে লোকটার বিষদাঁত ভেঙে দিতে?
মল্লিকা অবাক হয়ে দেখল, ও ধীরে-ধীরে মোহনদাসের সোফা কাম-বেডের দিকে এগিয়ে চলেছে সাপের চোখের টানে মুগ্ধ হয়ে এগিয়ে যাওয়ার মতো। তবে মল্লিকার শরীরটা এক স্থির কম্পাঙ্কে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। আর কান্না অথবা গোঙানির একটা আওয়াজ পা টিপে টিপে উঠে আসতে চাইছিল গলা দিয়ে। কিন্তু মল্লিকা দাঁতে দাঁত চেপে শব্দটাকে বন্দি রেখে দিয়েছে গলার ভেতরে।
মল্লিকাকে বেশিদূর এগোতে হল না। অধীর উত্তেজিত মোহনদাস নিজেই উঠে এল সোফা কাম-বেড থেকে। ঘরের মাঝামাঝি জায়গায়ে একেবারে জাপটে ধরল মল্লিকাকে। মল্লিকা যে সামান্য বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল সেটা বোধহয় প্রতিবর্তী ক্রিয়ার বশে। কারণ, ওর চোখে তখন কোনও দৃষ্টি ছিল না, হৃৎপিণ্ডে কোনও শব্দ ছিল না, ফুসফুঁসে কোনও বাতাস ছিল না। একটা কোমল মৃতদেহ যেন আত্মসমর্পণ করল মোহনদাস জোয়ারদারের হাতে।
ঘরে টিউব লাইট জুলছিল। সেই ঝকঝকে আলোতেই মল্লিকার জামাকাপড় ধরে বেপরোয়া টানাটানি শুরু করে দিল মোহনদাস। আর একইসঙ্গে মল্লিকাকে আঁকড়ে ধরে নিয়ে চলল সোফা কাম-বেডের দিকে। বলল, রুমিনি, রুমিনি, শাদি কে বাদ কেয়া কেয়া হুয়া….হাঃ, হাঃ, উ-উ উ– মল্লিকার গলার খাঁজে মুখ ঘষতে ঘষতে আরও বলল, ফুল ছাড়াই ফুলশয্যা করছি বলে রাগ কোরো না, লক্ষ্মীটি… মোহনদাসের মুখ থেকে হুইস্কি মেশানো বাতাস বেরিয়ে এল।
মল্লিকা আর বাধা দিচ্ছিল না। ওরা পৌঁছে গেল শয্যায়। উজ্জ্বল আলোয় জীবনে এই প্রথম সম্পূর্ণ নগ্ন হল মল্লিকা। মোহনদাস নিজের পোশাক ছিঁড়ে-টিড়ে কোনওরকমে খুলে একেবারে হামলে পড়ল মল্লিকার শরীরের ওপরে।
ঘরের টিউব লাইটটা এ-দৃশ্য বহুবার দেখেছে, কিন্তু মোহনদাসের জানোয়ারের মতো আচরণে সে-ও একবার কেঁপে উঠল। আর বাইরের বৃষ্টি যেন নিষ্ফল আক্রোশে নিজের মাথা কুটে মরতে লাগল বাইরের দেওয়ালে, জানলার শার্সিতে।
আর ঠিক তখনই অদ্ভুত কান্না একেবারে ভাসিয়ে দিল মল্লিকাকে।
মোহনদাস জোয়ারদার মল্লিকার কান্না খেয়াল করেনি। কারণ মল্লিকা কঁদছিল প্রায় নিঃশব্দে– শুধু ওর শরীরটা ফুলে-ফুলে উঠছিল। মোহনদাস অর্ধেক চোখ বোজা অবস্থার সেটাকে মল্লিকার সুখের সংকেত বলে ভুল করল, এবং দ্বিগুণ উৎসাহে ওর আদরের তীব্রতা বাড়িয়ে দিল। ব্যাট করার আনন্দে খেলার নিয়ম-কানুনের ব্যাপারটা মোহনদাসের আর খেয়াল ছিল না।
খেলা যখন শেষ হল মল্লিকা তখনও কাঁদছে। এক অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছিল ওর মনের ভেতরে। কাজটা কি ঠিক হল? শাস্তির পরিমাণটা পাপের তুলনায় বেশি হয়ে গেল না তো! ও চারটে অসহায় মেয়ের কথা ভাবতে চেষ্টা করল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওর মন থেকে দুঃখবোধটা মুছে যাচ্ছিল না। মোহনদাস যখন ওকে ছেড়ে দিল, তখনও ওর চোখে জল।
মোহনদাস ক্লান্তভাবে নিজের পোশাক ঠিকঠাক করে নিচ্ছিল, আর সতর্ক চোখে দেখছিল মল্লিকাকে। মেয়েটা দারুণ। কিন্তু হঠাৎ করে কোনও পাগলামি করে বসবে না তো! বেশ মনে আছে, অনুশ্রী না তনুশ্রী নামের বছর পঁয়ত্রিশের মেয়েটা সবকিছু মিটে যাওয়ার পর হঠাৎই ঘরের টেবিল থেকে একটা পেন-স্ট্যান্ড তুলে নিয়ে ক্ষিপ্তের মতো আক্রমণ করেছিল মোহনদাসকে। কিন্তু সুবিধে করতে পারেনি। মোহনদাস সতর্ক তো ছিলই, তা ছাড়া ওর গায়ে জোরও যথেষ্ট। প্রচণ্ড থাপ্পড়ে মেয়েটাকে কাহিল করে দিয়েছিল মোহনদাস।
কাঁদতে কাঁদতে শাড়ি-ব্লাউজ ইত্যাদি পরে নিল মল্লিকা। টিউব লাইটের আলোয় ওর দু-গাল আশুতে চকচক করছিল।
মোহনদাস বিরক্ত-জড়ানো গলায় জিগ্যেস করল, কী হল, এখন আবার কঁদছ কেন? কান্নার কী আছে?
মল্লিকা ঠান্ডা গলায় জবাব দিল, আপনার জন্যে কাঁদছি।
বাইরে বৃষ্টির তেজ যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল পলকে। কোথাও বাজ পড়ল কান-ফাটানো শব্দে।
ব্যঙ্গের একটুকরো হাসি তেরছাভাবে ছড়িয়ে গেল মোহনদাসের মুখে : কেন, হঠাৎ আমার জন্যে দুঃখু হচ্ছে কেন?
