মল্লিকার চোখে এবার সত্যি-সত্যি জল এসে গেল। ভাঙা গলায় ও কোনওরকমে উচ্চারণ করল, আপনি..আপনি একটা রেপিস্ট!
মল্লিকা কী ভেবে এসেছিল, আর কী হচ্ছে! ও মন শক্ত করে এসেছিল মোকাবিলা করতে, লড়াই করতে, শোধ নিতে–অথচ এভাবে ভেঙে পড়ছে। কোনও রেপিস্টের সামনে মেয়েদের মনটাই বোধহয় আগে তছনছ হয়ে যায়, তারপর শরীর।
মোহনদাস জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করে বলল, মল্লিকা, তুমি বড় উলটোপালটা কথা বলো! ব্যাপারটা রেপ হবে কি হবে না তার সবটাই ডিপেন্ড করছে তোমার ওপরে। তুমি যদি কোনওরকম ঝামেলা না করে ব্যাপারটা ইয়ে…মানে…এনজয় করো, তা হলে সেটাকে মোটেই রেপ বলা যায় না। আর তুমি যদি ফালতু-ফালতু চিৎকার-চেঁচামেচি করো, হাত-পা ছুঁড়ে ঝামেলা পাকাও তা হলেও রেজাল্ট সেই একই–তবে তখন ব্যাপারটা ওই রেপ হয়ে দাঁড়াবে। মোহনদাস হাসল চাপা শব্দ করে ও এখানে যে লড়াই বা চেঁচামেচি করে বিশেষ সুবিধে হবে না সেটা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে পেরেছ?
হ্যাঁ, বেশ বুঝতে পেরেছে মল্লিকা। এই ঘরটা এই বেপরোয়া জাদটার প্রাইভেট অফিস। তবে বড় বেশি প্রাইভেট।
আজ সকাল থেকেই মল্লিকার মনটা কেমন করছিল। মেঘলা আকাশ, টিপটিপ বৃষ্টি, আর ঝোড়ো হাওয়া। কেন যেন ওর মনে হয়েছিল, আজই মোহনদাসের সঙ্গে মোকাবিলার দিন–অথবা, মোকাবিলার রাত। আর হলও ঠিক তাই।
পাঁচটার পর মোহনদাস জোয়ারদার একগাদা টাইপের কাজ চাপিয়ে দিয়েছে মল্লিকার ওপরে। তারপর, সাতটার সময়, যখন ক্লাস হয়ে গেল, ছাত্রছাত্রীরা সব চলে গেল একে-একে, তখন মোহনদাস মল্লিকাকে ওর ভেতরের প্রাইভেট অফিসে ডেকেছে ডিক্টেশান দেওয়ার জন্য। গোটা অফিসে তখন ওরা দুজন, আর দারোয়ান কাম-সিকিওরিটি গার্ড মনোজিৎ। একটু পরেই মোহনদাস একমিনিট আসছি। বলে উঠে গেছে এবং একমিনিট বা ষাট সেকেন্ড পূর্ণ হওয়ার আগেই ফিরে এসেছে।
মল্লিকা আন্দাজ করতে পেরেছিল, মোহনদাস মনোজিৎকে ছুটি দিয়ে এল। আর তখনই ওর বুকের ভেতরে কেউ ঢিপঢিপ করে কিল মারতে শুরু করেছিল। কিন্তু মল্লিকা ঠিক প্রকৃত অর্থে ভয় পায়নি। সেটা পেয়েছে এখন, একটু আগে। আগের চারটে মেয়ের করুণ অবস্থার কথা মল্লিকা এখন আরও ভালো করে বুঝতে পারছে। ওদের জন্য এক অদ্ভুত দুঃখ আর মমতা উথলে উঠছিল মল্লিকার মনে। এমনকী নিজের জন্যও।
ওই চারজন মেয়ের ঘটনা নিয়ে হইচই কম হয়নি। ব্যাপারটা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ নারী কল্যাণ সমিতি-ও অনেক মিটিং-মিছিল করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনও সুরাহা হয়নি। মল্লিকা খবরের কাগজে এই ঘটনার প্রত্যেকটি রিপোর্ট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছে। আর তখন থেকেই মোহনদাস জোয়ারদার নামের এই লোকটার ওপরে বিজাতীয় এক রাগ আর আক্রোশ তৈরি হয়েছে। মল্লিকার তো আর কিছু হারাবার ভয়ডর নেই। সুতরাং ও সটান বেলঘরিয়ার আস্তানা থেকে একদিন চলে এসেছে রাজা রামমোহন সরণিতে, পশ্চিমবঙ্গ নারী কল্যাণ সমিতি-র ছোট্ট অফিসে। সেখানে ও দেখা করেছে সেক্রেটারি বেলা সরকারের সঙ্গে।
ড্যাম্প ধরা ঘরের দেওয়ালে টাঙানো মাতঙ্গিনী হাজরা, সরোজিনী নাইডু, মাদার টেরেজা, ইন্দিরা গান্ধির আর কিরণ বেদির ছবি। এদিকে-ওদিকে কিছু ঝান্ডা আর পোস্টার। ঘরের কোণে আঠা-রং-তুলি। দুটো বেঞ্চে দুজন মহিলা বসে রয়েছে।
বেলা সরকার একটা বড় টেবিল সামনে রেখে বসেছিলেন। তার বয়েস হয়েছে, চোখে চশমা, পোড়খাওয়া মুখ, সিঁথিতে সিঁদুরের চিহ্ন নেই।
মল্লিকা ওঁর সঙ্গে গোপনে কথা বলতে চেয়েছে। সুতরাং বেলা সরকার নরম গলায় কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন দুই সদস্যাকে। ওরা সঙ্গে সঙ্গেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। মল্লিকা বুঝতে পেরেছিল, বেলাদি-র নির্দেশ সহজে অমান্য করা যায় না।
মল্লিকা নিজের আক্রোশের কথা জানিয়েছিল বেলা সরকারকে। বলেছিল, দিদি, মোহনদাস জোয়ারদারকে আমি শায়েস্তা করতে চাই।
বেলাদি অবাক হয়ে বলেছেন, তুমি তুমি কেমন করে পারবে! সমিতি থেকে লড়াই করে আমরাই কিছু করতে পারলাম না…।
আমি পারব! জেদের গলায় বলেছে মল্লিকা।
বেলা সরকার অবাক চোখে সুন্দরী মেয়েটিকে দেখছিলেন। একে কবজায় পেলে মোহনদাস কিছুতেই ছাড়বে না–চোখের পলকে গতি করে দেবে। সুলক্ষণা নামের মেয়েটা কীভাবে না নাস্তানাবুদ হয়েছে। এবার এই মেয়েটা হেনস্থা হতে চায়সাধ করে।
বেলা সরকারের কোনও বারণই শোনেনি মল্লিকা। শুধু বলেছে, আপনি আমাকে একটা সুযোগ দিন, প্লিজ। আপনাদের না-জানিয়েও আমি যেতে পারতাম…কিন্তু পরে যদি কোনও পুলিশি ঝাট হয়, সেইজন্যে আপনাদের জানিয়ে কাজে নামতে চাই। আপনারা তখন আমার পেছনে দাঁড়াবেন। দাঁড়াবেন তো?
মেয়েটার কথায় কী যেন ছিল। বেলা সরকার অনিচ্ছাসত্ত্বেও মত দিলেন। মল্লিকাকে ওঁর কেমন যেন চেনা-চেনা লাগছিল। কোথায় যে দেখেছেন মেয়েটার মুখ!
মল্লিকা কাজে নামার আগে আরও দুদিন বেলাদির সঙ্গে গোপন বৈঠকে বসেছিল। তারপর সোজা মোহনদাস জোয়ারদারের দপ্তরে।
কিন্তু শায়েস্তা করতে যুদ্ধে নেমে এ কী করুণ অবস্থা মল্লিকার! বারবার বুড়ি মায়ের কথা মনে পড়ছে। চোখ ফেটে জল আসছে। বাইরে বাজ পড়ার শব্দে থরথর করে কেঁপে উঠছে ও।
ভয়ার্ত চোখে মোহনদাসকে দেখল মল্লিকা। ফরসা, টিকোলো নাক, মাথায় টাক, মোটা গোঁফ, গাল দুটো সামান্য ফোলা, চোখে রিমলেস চশমা। বয়েস কত হবে? বড়জোর পঁয়তাল্লিশ। দেখে কে বলবে সুশ্রী ভদ্র এই মানুষটার খোলসের ভেতরে একটা অমানুষ লুকিয়ে আছে।
