আমার মুখে ওর হাতের ছোঁয়া টের পেলাম। ঠিক তখনই সুমিতারুনু-টুনু একসঙ্গে কেঁদে উঠল। চোখে জল ওদের সন্দেহ ধুয়ে-মুছে দিয়েছে।
প্রিয়জনেরা যদি চোখের জলে বিদায় জানায় তা হলে মরতে কারও খারাপ লাগে না। আমারও লাগবে না।
সন্ধের পর, একা
মল্লিকা বেশ বুঝতে পারছিল চেঁচিয়ে কোনও লাভ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটা বিকৃত চিৎকার ওর ঠোঁট চিরে বেরিয়ে আসতে চাইল। আজকের এই মুহূর্তটার জন্য ও মনে-মনে বহুবার তৈরি হয়েছে। তাতে ওর মনে হয়েছিল, বেশ শান্তভাবে ঠান্ডা মাথায় ও ব্যাপারটার মোকাবিলা করতে পারবে। কিন্তু এখন, নির্জন ঘরে, ভয়ংকর মানুষটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মল্লিকার সব হিসেব গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল।
মোহনদাস জোয়ারদার তখন ঘরের একমাত্র দরজাটা লক করে মল্লিকার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। মেয়েটার মুখের অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে, ভয় পেয়েছে। আজ পর্যন্ত মোহনদাস এমন কাউকে দেখেনি যে ভয় পায়নি। আচ্ছা-আচ্ছা সাহসী মেয়েও এই অবস্থায় ভয় পেয়েছে। অনেকে তো আবার কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। মেয়েগুলো ছিচকাদুনে হলে মোহনদাস তেমন মজা পায় না। বরং বিরক্ত লাগে।
কী, দিদিমণি, ভয় করছে? চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে? রীতিমতো স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন দুটো করল মোহনদাস।
মল্লিকা জোর করে মাথা নাড়ল।
মোহনদাস কী বুঝল কে জানে! হেসে বলল, ভয়ের কী আছে! কিস্যু নেই। আমি তো তোমাকে আর খেয়ে ফেলছি না। শুধু একটু আদর করব। এ-কথা বোলো না যে, লাইফে কেউ কখনও তোমাকে আদর করেনি। তোমাদের গায়ে তো আর কিছু লেখা থাকে না–মানে, কজন লোক আদর করেছে তাদের নাম-ঠিকানা তো আর ট্যাক্সির মিটারের মতো তোমাদের কপালে বা…ইয়ে…বুকে লেখা হয়ে যায় না। তোমাদের বডি যদি কম্পিউটার হত তা হলে কী হত সেটা বলা মুশকিল।
মোহনদাস জোয়ারদার একটা গানের কলি গুনগুন করে ভাজতে-ভজতে ঘরের বাঁ-দিকে রাখা একটা বড় সোফায় গিয়ে বসল। তার পাশের একটা ক্যাবিনেট থেকে ধীরেসুস্থে মদের বোতল, গ্লাস, আর সোডা বের করে নিল। কাজ করার ফাঁকে-ফাঁকে সে মল্লিকার দিকে আড়চোখে দেখছিল। মল্লিকা ঘরের কোণে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বাইরে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ হচ্ছে। একটু পরেই হয়তো জওহরলাল নেহরু রোডে জল দাঁড়িয়ে যাবে। গাড়িঘোড়া যানবাহন সব জট পাকিয়ে যাবে। বাড়ি ফেরার সময়ের কোনও ঠিক-ঠিকানা থাকবে না কারও। সুতরাং মল্লিকার আজ দেরি হওয়াটা কারও কাছেই তেমন অস্বাভাবিক বলে মনে হবে না। আর মল্লিকাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করার লোক এখন তো একজনই বুড়ি মা। অথচ গত বছরেও ওকে নিয়ে চিন্তা অথবা দুশ্চিন্তা করার দুজন মানুষ ছিল। এখন একজন আর নেই।
জওহরলাল নেহরু রোডের ওপরে মস্ত বাড়ি ব্যানার্জি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার। বড় রাস্তার দাঁড়িয়ে ছাদের দিকে তাকাতে হলে আকাশমুখো হতে হয়, ঘাড় ব্যথা হয়ে যায়। পরিভাষায় এ ধরনের বাড়িকেই বোধহয় বলে গগনচুম্বী অট্টালিকা। এই বাড়িরই টেন্থ ফ্লোরে মোহনদাস জোয়ারদারের কম্পিউটার ট্রেনিং স্কুল।
মল্লিকা এখানে রিসেপশনিস্টের চাকরিতে ঢুকেছে প্রায় একমাস। ও নিজেই একদিন চাকরির জন্য এসে হাজির হয়েছিল মোহনদাসের অফিসে। মল্লিকার যোগ্যতা ছিল তিনটি? পাস কোর্সে বি.এ. পাশ, অল্পসল্প টাইপিং-এর জ্ঞান, এবং ওর রূপযৌবন। মল্লিকা জানত, এরমধ্যে তৃতীয় যোগ্যতাটিই মোহনদাসের সবচেয়ে বেশি মনে ধরবে। কারণ, মোহনদাস জোয়ারদার সম্পর্কে খুঁটিনাটি খোঁজখবর নিয়ে তবেই মল্লিকা যেচে ওর কাছে এসেছে–ওর ফাঁদে নিজে থেকে এসে ধরা দিয়েছে। কারণ, মল্লিকার লক্ষ্য ছিল একটাই ও মোহনদাস জোয়ারদারকে শায়েস্তা করা। এই জানোয়ারটা গত দেড় বছরে অন্তত চারটি মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। বেচারা মেয়েগুলো নিতান্ত পেটের দায়ে মোহনদাসের কাছে চাকরি করতে এসেছিল–রিসেপশনিস্টের চাকরি। লাঞ্ছিত চারজনের মধ্যে দুজন ব্যাপারটা চেপে যায়। কিন্তু বাকি দুজন পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করলেও শেষ পর্যন্ত মোহনদাসের গায়ে আঁচড়টি পর্যন্ত পড়েনি। পুলিশ ও উকিলের যৌথ কেরামতিতে মোহনদাস ছাড়া পেয়ে যায়।
আপনি…আপনি আমাকে ছেড়ে দিন… কথাটা বলতে গিয়ে মল্লিকার গলা কেঁপে যায়? এভাবে আমার লাইফটা নষ্ট করবেন না, প্লিজ…।
গ্লাসে চুমুক দিয়ে মোহনদাস হাসল। মেয়েটা দেখতে সত্যি সুন্দরী। আগের চারটে মেয়ের মধ্যে সুলক্ষণা নামের মেয়েটা সবচেয়ে সুন্দরী ছিল। মেয়েটা ঘটনার পর বিস্তর কান্নাকাটি করেছিল। করবেই তো! ওর বয়েস যে ছিল মাত্র উনিশ। তবে মোহনদাস ওকে দু-হাজার টাকা দিয়েছিল। বিয়ে করবে এরকম একটা বেহুদা শপথও করেছিল। এতে সুলক্ষণার কান্না থেমে গিয়েছিল। এবং মোহনদাস প্রায় দু-মাস মেয়েটাকে ভোগ করতে পেরেছিল।
এভাবেই দিব্যি চলছিল, কিন্তু কে যে সুলক্ষণার মাথায় কুমতলব ঢোকাল কে জানে! মেয়েটা হঠাৎই একদিন উধাও হয়ে গেল। তার কদিন পরেই পুলিশি ঝাট, কোর্টকাছারি। বহু টাকা আর বুদ্ধি খরচ করে সেবার মোহনদাস পিঠ বাঁচাতে পেরেছিল।
এই মেয়েটার বয়েস হয়তো সাতাশ-আঠাশ হবে, তবে সুলক্ষণার চেয়েও সুন্দরী দেখতে, আর জিনিসও ভালো।
মল্লিকার কথার উত্তরে মোহনদাস অভয় দেওয়ার হাসি হাসল দ্বিতীয়বার। বলল, কী যে বাচ্চা মেয়ের মতো কথা বলো! তোমাকে ছেড়ে দেব না-তো কি আটকে রাখব! তুমি লাইফ নষ্ট করার কথা বলছ কেন, মল্লিকা? আমরা দুজনে এই বৃষ্টির সন্ধ্যায় যদি বন্ধ ঘরে একটু বুলবুলি করি তাহলেই তোমার লাইফ নষ্ট হয়ে যাবে! আরে, দিদিমণি, লাইফ কি এতই সস্তা! গলাখাঁকারি দিল মোহনদাস। আর-একবার চুমুক দিল গ্লাসে। না, বেশি মদ গিললে চলবে না। তাতে শরীরের আঁকুপাঁকু ভাবটা বাড়বে, শরীরটা চাগাড় দিয়ে উঠবে কিন্তু বেশিক্ষণ ব্যাট করা যাবে না। কিছুক্ষণ ঠুকঠুক করেই আউট। মল্লিকার সঙ্গে মোহনদাস অনেকক্ষণ তারিয়ে-তারিয়ে ব্যাট করতে চায়। এরমধ্যেই মোহনদাস বেশ বুঝতে পারছে, ওর শরীরটা অধীর হয়ে উঠেছে।
