অটো টানেল ধরে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত গাড়ি ছুটে চলেছে। গাড়িতে উঠেই দাসানি আমার বাড়ির স্থানাঙ্ক জানিয়ে দিয়েছেন কম্পিউটারকে। সঙ্গে-সঙ্গে সবচেয়ে সুবিধেজনক পথের ছবি ফুটে উঠেছে কম্পিউটারের পরদায় এবং গাড়িটাও সেই অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছুটতে শুরু করেছে।
শহর ছাড়িয়ে ফাঁকা জায়গায় বেরিয়ে এলাম। সূর্য সবে ডুবে গেছে পশ্চিমে। আকাশে এলোমেলো লাল-হলুদ রং। হঠাৎই ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল গাড়ি। দাসানি পকেট হাতড়াতে-হাতড়াতে বললেন, তোমাকে এই শেষ সুযোগ দিচ্ছি– তারপর একটা জেনারেটর গান বের করে হুমকি দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, এখনও বলো, কে তুমি?
লক্ষ করেছিলাম, ওঁর জেনারেটর গানের সেফটি লক খোলা নেই। সুতরাং চোখের পলকে জোরালো এক ঘুসি বসিয়ে দিলাম দাসানির মুখে। আবার আর-একটা–এবারে রগের ওপরে। অনেক সহ্য করেছি, আর নয়। দাসানির চোখ ঘোলাটে হয়ে গেল, কাত হয়ে পড়ে গেলেন সিটের ওপরে। ওঁর হাত থেকে খসে পড়া জেনারেটর গানটা তুলে নিলাম হাতে। দাসানিকে ঠেলে ফেলে দিলাম গাড়ির বাইরে। তারপর আবার গাড়ি চালিয়ে দিলাম।
আমার বাড়ির সামনে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা ছিল। সেখানে বাগান করেছিলাম। ফুলগাছ লাগিয়েছিলাম নিজের হাতে। এখন শীতের শেষে গোধূলিতে ফুলের গন্ধ পেলাম। দেখলাম, বাড়ির চারটে জানলায় আলো দেখা যাচ্ছে।
গাড়ি থেকে নেমে বন্দুক ফেলে দিলাম। পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেলাম ফুলগাছগুলোর কাছে। বুকভরে ঘ্রাণ নিলাম। আঃ। ঠোঁটের কোণে জ্বালাটা আবার টের পেলাম। একটা ছোট্ট গোলাপ ছিড়ে নিলাম গাছ থেকে। ছোট্ট সুন্দর ফুলটা ওর রূপে আর ঘ্রাণে আমাকে যেন পোষ মানিয়ে নিল। ফুলটা আমাকে সন্দেহ করে না।
ফুলটা পকেটে রেখে বাড়ির দরজার দিকে এগোলাম। ছমাস চাঁদের মাধ্যাকর্ষণে কাটিয়ে এখন যে সামান্য অসুবিধে হচ্ছে না তা নয়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই একটা যান্ত্রিক স্বর আমাকে পাসওয়ার্ড জিগ্যেস করল। একমাত্র বাড়ির বাসিন্দারা ছাড়া পাসওয়ার্ড কেউ জানে না। জানানো হয় না। তবে খুব অন্তরঙ্গ পারিবারিক বন্ধু হলে অন্য কথা। যেমন রাকেশ আমাদের দরজা খোলার পাসওয়ার্ড জানে। আমি, সুমিতা আর রুনু জানি। টুনুকে এখনও শেখানো হয়নি।
আমি পাসওয়ার্ড বলতেই দরজা খুলে গেল এবং ভেতরে কোথাও একটা ঘণ্টি বেজে উঠল।
সামনেই আলোয়-ভেসে-যাওয়া বসবার ঘর। আর-একটু দূরে দু-পাশে দাঁড়িয়ে রুনু আর টুনু।
রুনু-টুনু।
রুনু কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে। টুনু একটু যেন হাসতে চেষ্টা করল। তারপর হঠাৎই কেঁদে চিৎকার করে উঠল, তুমি এক্ষুনি চলে যাও এখান থেকে।
কোথা থেকে যেন আচমকা হাজির হল সুমিতা। ঠিক ওদের দুজনের মাঝে। আমি সুমিতার নাম ধরে ডেকে উঠলাম। আর ঠিক তখনই সুমিতা ওর হাতে ধরা জেনারেটর গান থেকে ফায়ার করল। আমি চৌকাঠের ওপর বসে-পড়লাম ঝরা ফুলের মতো।
সুমিতা তখন আতঙ্কে পাগলের মতো চিৎকার করছে। বলছে, রাকেশ আমাকে ঠিক সময়েই খবর দিয়েছিল। বলেছিল, নরেন্দ্র দাসানি রোবটটাকে সঙ্গে করে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, এটা দাসানিকে শেষ করে তোমাদের বাড়িতে গিয়ে না হাজির হয়। যদি সেরকম কিছু হয় তাহলে তুমি তৈরি থেকো, বউদি। আমি হাতের কাজ শেষ করেই যাচ্ছি। রাকেশের কথাই শেষপর্যন্ত অক্ষরে-অক্ষরে মিলে গেল। আমার স্বামীকে শেষ করে তুমি আমাদের সবাইকে শেষ করতে এসেছ।
সুমিতা কোন লেভেলের ফায়ার করেছে জানি না, কিন্তু ওর কথাগুলো আমি যেন বহুদূর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম। রুনু, টুনু অবাক চোখে আমাকে দেখছিল। সত্যিই তো, আগে কখনও কোনও রোবটকে মরতে দেখেনি ওরা।
ঠিক সেই সময়ে শুনতে পেলাম ভারী বুটের শব্দ। কারা যেন দৌড়ে আসছে অন্ধকার বাগানের পাশ দিয়ে। পায়ের শব্দ কাছে এল। রাকেশ আর দাসানি। সুমিতার হাবভাব আর জেনারেটর গান দেখেই ব্যাপারটা ওরা বোধহয় বুঝতে পারল।
দাসানি ঝুঁকে পড়ে আমার পোশাক তল্লাশ করতে লাগলেন। কিছু কাগজপত্র পেলেন। তারপরেই পেলেন গোলাপটা। লক্ষ করলাম, ওই ছোট্ট তাজা ফুলটা পাথরের মতো মানুষটাকে বদলে দিল। ওঁর চোখ ছোট হল, কপালে ভাঁজ পড়ল। হাঁটু গেড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন আমার মুখের ওপরে। বিড়বিড় করে বললেন, অ্যান্ড্রয়েড কখনও নিজের খেয়ালে গাছ থেকে ফুল ছেঁড়ে না কখনও না। অ্যান্ড্রয়েডদের সব কাজের পিছনেই একটা যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে–কোনও না কোনও কারণ।
উত্তেজিতভাবে রাকেশের দিকে তাকিয়ে দাসানি বললেন, ব্যানার্জি, আমাদের বোধহয় ভুল হয়েছে।
রাকেশ তখন ছোট্ট একটা ডিজিটাল ট্রান্সিভারে কার সঙ্গে যেন বেতার-যোগাযোগে কথা বলছিল। খট করে যন্ত্রটার সুইচ অফ করল ও। দেখলাম, ওর চোখ চিকচিক করছে। ধরা গলায় থেমে-থেমে ও বলল, চাদে ওরা টাইটানের অ্যান্ড্রয়েড-স্পাইয়ের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছে। ওরা যে ইন্দ্রজিৎ সান্যালের নকল করে অ্যান্ড্রয়েড গুপ্তচর পাঠাচ্ছে সেই খবরটা ঠিকই ছিল…কিন্তু মনে হয়, ডিজাইনে কোনওরকম গোলমাল থাকায় ঠিক সময়ের আগেই বিস্ফোরণ ঘটে যায়। তারপর…।
রাকেশ আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে, চিৎকার করে কেঁদে উঠল। বলল, ইন্দ্র…ই…সত্যিই তুই ফিরে এসেছিলি…!
